গল্পের ম্যাজিক:: মিস্টার পাই ও নেকড়ে বাঘ - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী


মিস্টার পাই ও নেকড়ে বাঘ
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

১৮ সেপ্টেম্বর
“কমো এস্তাস প্রফেসরা পাই?”
অর্থাৎ প্রফেসার পাই কেমন আছ?
ফোনের কণ্ঠস্বর শুনেই বুঝতে অসুবিধে হল না কে ফোন করেছে!
কার্লোস–এর ফোন।
মাদ্রিদে এসেছি এক সপ্তাহ। কার্লোস যে মাদ্রিদ থেকে মোটে এক ঘণ্টা দূরে থাকে সেটা একদম ভুলে গিয়েছিলাম।
কার্লোসের সঙ্গে আমার এত বছরের আলাপ, যে কবে কোথায় প্রথম দেখা হয়েছিল, তাই ভুলে গেছি। ও জুওলজিস্ট বা প্রাণীবিদ। গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও প্রাণীজগতের উপরে তার প্রভাবের উপরে ওর রিসার্চের জন্য বিজ্ঞানী মহলে ও সুবিদিত
আমি এসেছি একটা বিখ্যাত সায়েন্স কনফারেন্সে। সেখানে অবশ্য কার্লোস আসেনি। কিন্তু আমি যে স্পেনে এসেছি সে খবরটা পেয়েছে।
ফোনে কার্লোস ফের বলে উঠল, “কবে আসছ তাহলে আমার বাড়িতে?”
আগে ফোন না করার অপরাধে মনে মনে লজ্জিত ছিলাম। সে অপরাধবোধ থেকেই হয়তো যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলাম। এখানে আছি আরও দু’দিন। সকালে গিয়ে বিকেলের মধ্যে ফিরে আসব এরকম জানালাম। কিন্তু কার্লোস সেটা শুনে হাই-হাই করে উঠল।
“এক বেলা থাকলে হয় নাকি! কথাই হবে না! অন্তত একদিন রাতে থাকার প্ল্যান করে এসমনে আছে তোমাকে বলেছিলাম সেই নেকড়েটার কথা, যাকে আমি চারনোবিল থেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম দু’সপ্তাহ আগে! তোমার মতো গবেষেকও ওকে দেখে অনেক চিন্তাভাবনার ইন্ধন পেয়ে যাবে। তাছাড়া এতদিন বাদে দেখা
“নেকড়ে? সেদিন যেন বেড়ালের কথা শুনেছিলাম। অবশ্য ভুল শুনে থাকতে পারি
“হ্যাঁ, নেকড়ে বলেছিলাম না! কোথায় নেকড়ে আর কোথায় বেড়াল! তুমি বেশ কয়েকবার বললে খুব ইন্টারেস্টিং
উত্তরে কিছু বললাম না। হ্যাঁ, অস্পষ্ট মনে পড়ছে। এরকম একটা কথাবার্তা হয়েছিল বটে কয়েক সপ্তাহ আগের কথা আসলে তখন আমার মন অন্য দিকে ছিল
আমি তখন আমার বাড়ির ল্যাবে কাজ করছিলামখুব দরকারি একটা এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে ছিলাম আমার আবিষ্কৃত আরটিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নির্ভর চুল কাটার যন্ত্র ‘মেঘনাদ’ দিয়ে গণেশের চুল কাটছিলাম যন্ত্রটা তার কয়েক ঘণ্টা আগেই সবে তৈরি করেছি। যার চুল কাটবে তার মুখের শেপ অনুযায়ী আর তাকে কয়েকটা প্রশ্ন করে তার স্বভাব বুঝে সেরকম মানানসই চুল কাটবে
আইডিয়াটা পাড়ার কানা হাবুল গুন্ডার ঘাসের লনের মতো ছোটো করে কাটা চুল আর লম্বা ঝুলপি দেখে পেয়েছিলাম
যন্ত্রটা মেশিন লার্নিং-এর উপরে নির্ভর করে কাজ করে। সেটা দিয়েই আমার সহকারী গণেশের উপরে পরীক্ষা করছিলাম। ওর মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। একদম আইডিয়াল টেস্ট সাবজেক্ট। নিজের উপরে তো আর পরীক্ষা করা যায় না। তার মধ্যে আমার ল্যাবের ফোনটা বেজে উঠেছিল। প্রথমে ধরিনি। দীর্ঘ রিং-এর পরে থেমে গেলতারপরে আবার যখন বাজতে শুরু করল, তখন বাধ্য হয়ে চুল কাটার যন্ত্রটাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে ফোন ধরলাম।
দেখি কার্লোসের ফোন। তখনই প্রথম এই বেড়ালের বা নেকড়ের কথা শুনি। ও তখন রীতিমতো উত্তেজিত। এরকম বুদ্ধিমান প্রাণী নাকি আগে কখনও দেখেনি। চারনোবিলের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে জন্য চারনোবিল থেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রাণীটার উপরে নানান ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চায়।
স্বাভাবিকভাবেই আমি তখন একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। তাই অত মন দিয়ে কথা শুনিনি। ওই যে খানিকক্ষণ ফোনে কথা বলেছিলাম, তার জন্য সেদিন ফল খুব একটা ভালো হয়নি। গণেশের মাথায় ছোটো ছোটো বারোটা চুলের গোল আইল্যান্ড রেখে বাকিটা পুরো সাফ করে দিয়েছিল। আমার যে খুব খারাপ লেগেছিল তা নয়। তবে গণেশের আদৌ পছন্দ হয়নি
“তা কবে আসছ?” উলটোদিক থেকে কার্লোস ফের বলে উঠল, “আমি আমার ড্রাইভারসহ গাড়ি পাঠিয়ে দেব। তোমার আসতে কোনও অসুবিধে হবে না। কবে কখন আসতে পারবে শুধু জানিয়ে দিও
সেরকমই কথা হল। গিয়ে এক রাত থেকে তার পরের দিন ফিরে আসব।
এখানে এত কাছে এসে ওর বাড়ি যাব না, এটা হয় না। তার উপরে সেই বিশেষ নেকড়ে দেখারও ইচ্ছে আছে ওরা এখানকার পুরোনো পরিবার। শুনেছিলাম পুরোনো দিনের বিশাল ব্যারোক প্যালেসে থাকে। সেটাও দেখা যাবে।
আমার সঙ্গে এখানে আমার বন্ধু বিজ্ঞানী ডেভ বোল্টন আছেন। তাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব ভাবছি।

২১ সেপ্টেম্বর
কাল সকাল আটটায় বেরোচ্ছি। কার্লোস–এর বাড়ি।
এখানে এ ক’দিন বেশ ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে। এরকম সায়েন্স কনফারেন্সে এলে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথাবার্তা আলাপ আলোচনার সুযোগ হয়। অনেক সময় একই আবিষ্কারের পিছনে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারা কাজ করে কথা বললে অনেক নতুন আইডিয়া আসে।
আমি অবশ্য আমার বড়ো আবিষ্কারগুলোর কথা এসব কনফারেন্সে বলি না। আমার বেশ কিছু আবিষ্কার সময়ের থেকে এতটাই এগিয়ে আছে যে সেটা উপস্থিত অন্য বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করবে। তাদের মনোবল ভেঙে দেবে। ছোটোখাটো আবিষ্কারগুলোর কথাই বেশি বলি।
যেমন এবারে বলেছি আমার আবিষ্কৃত গিল্ট অ্যাডমিশন যন্ত্রটা নিয়ে। এটা মাথায় পরালে অপরাধী দশ থেকে কুড়ি মিনিটের মধ্যে তার সব অপরাধ স্বীকার করে নেবে। এটা ব্রেনের হিপ্পোক্যাম্পাসের কিছু অংশকে এমনভাবে উদ্দীপ্ত করে যাতে অপরাধীর অপরাধবোধ ক্রমশ তীব্রতর হয়। শেষে অপরাধী যদি জ্ঞানত অপরাধ করে থাকে তাহলে সে স্বীকার করতে বাধ্য।
বেশ কয়েকজন অপরাধীর উপরে কীভাবে এটা কাজ করেছে, সেই ভিডিও কনফারেন্সে দেখানো হয়েছিল। কীভাবে কাজ করে সেটা জেনে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ। কনফারেন্সের পরে একটা সুইস ম্যানুফাকচারিং সংস্থার অধিকর্তার সঙ্গে কথা হল। তারা এটা বড়ো স্কেলে তৈরি করার ব্যাপারে খুব আগ্রহী আমার তাতে আপত্তি নেই। তবে তার থেকে যা লাভ হবে তার পঞ্চাশ শতাংশ কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর কাজে খরচ করতে হবে। এখনও লোকে বুঝতে পারছে না গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্য কী হতে চলেছে। তার জন্য অবিলম্বে ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার কমাতে হবে। তবে তাতেও যে ২০৫০-এর আগে কিছু লাভ হবে না তা আমি জানি। একদিন নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যে অন্য জায়গায় উদ্বাস্তু হয়ে যেতে হবে সেটাও বোঝে না। এত সহজে যে এরকম একটা যন্ত্র বার করা যায়, সেটাই অনেকের ধারণার বাইরে ছিল। ভারতীয় টাকায় এ যন্ত্র তৈরির খরচ পড়বে মোটে পাঁচশ কুড়ি টাকা।
আজ দুপুর একটা নাগাদ কনফারেন্স শেষ হয়ে গেলতারপরে ঘুরে ঘুরে মাদ্রিদ শহরটা দেখেছি। রয়াল প্যালেস অফ ম্যাদ্রিদ দেখেছি। এখানে অবশ্য এখন স্পেনের রাজা থাকেন না। থাকলে সমস্যায় পড়তেন। যে প্যালেসে ৩৪১৮টা ঘর, সেখানে পথ হারানো খুব স্বাভাবিক।
তারপরে গ্র্যান্ড ভিয়া ধরে খানিকক্ষণ হাঁটলাম। বিশাল চওড়া রাস্তা। দু’ধারে পাব, রেস্টুরেন্ট, বড়ো বড়ো দোকান। জমজমাট পরিবেশআমার মূল আগ্রহ ছিল অবশ্য প্রাদো মিউজিয়াম ফ্রান্সিসকো গয়া-র অনেক বিখ্যাত পেন্টিং আছে ওখানে‘লা মাহা ভেস্তিদা’-র মতো অনেক বিখ্যাত পেন্টিং আছে এখানে। স্পেনের লোকেদের সঙ্গে ভারতীয়দের অনেক ব্যাপারে মিল আছে। খুব সহজে আলাপ করা যায়। ব্যবহারে একটা সহজ সরল ব্যাপার আছে, উষ্ণতা আছে।
আমার হাতে সাধারণত একটা ব্যাগ থাকে। আজ সেটা নিয়ে বেরোইনি। কী ভাবে জানি না অন্যমনস্ক হয়ে মেট্রো থেকে বেরোনোর পথে খেয়াল করলাম আজও আমার হাতে একটা ব্যাগ এসে গেছে। ভালো করে দেখলাম যে সেটা আমার কোনোভাবেই হতে পারে না। এর একটাই কারণ হতে পারে। ভুল করে অন্য কারুরটা নিয়ে চলে এসেছি।
কী আর করা যায়! ওখানেই অপেক্ষা করলাম খানিকক্ষণ। যদি কেউ এসে খোঁজখবর নেয়। ঠিক হলও তাইদেখি এক টাকমাথা ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে কী সব বলে আমার হাত থেকে ওটা ছিনিয়ে নিয়ে ফের চলে গেলেনমনে হল ব্যবহারে সেই উষ্ণতা আছে।
হোটেল ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা হয়ে গেল
কাল সকাল আটটায় আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে কার্লোসের গাড়ি আসবে।
একদিন থেকে পরশু দুপুরবেলা ফিরে আসব। পরশু রাতে আমার ভারতের ফ্লাইট। তবে আমি একা যাচ্ছি না। সঙ্গে ডেভ বোল্টনও যাচ্ছে। ডেভ কেম্ব্রিজের প্রফেসার। রোবটিক্সের রিসার্চের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত আছে। শুনেছি বর্তমানে আনম্যানড সম্পূর্ণ স্বশাসিত যুদ্ধজাহাজ তৈরির কিছু কাজে ব্যস্ত আছে। ডেভ শুধু নামকরা বিজ্ঞানী নয়, শুনেছি ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির সঙ্গে কাজ করে। ওর সঙ্গে অবশ্য কার্লোসের কোনও আলাপ নেই। তবে ও কার্লোস-এর নাম শুনেছে।
কার্লোসের বাড়ি দেখতে ডেভ খুব আগ্রহী। কার্লোস খুব ধনী পরিবারের। শুনেছি রাজপরিবারের সঙ্গেও ওদের রক্তের সম্পর্ক আছে বাড়িতে নাকি রাজপরিবারের অনেক ব্যক্তিগত জিনিস আছে।
এখন শুয়ে পড়ি। দূরে গির্জার ঘড়িতে এগারোটার ঘণ্টা বাজল

২২ সেপ্টেম্বর, বিকেল ৩ টে
টলেডো-তে কার্লোস-এর বাড়ি পৌঁছোতে দু’ঘণ্টা লেগেছে। টলেডো খুব পুরোনো শহর। একটা বড়ো অংশ জুড়ে ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইট। অবশ্য হবে নাই বা কেন! দীর্ঘ সময় ধরে এই শহরের পরিচিতি ছিল ‘রাজার শহর’ বলে। চার্লস ফাইভের প্যালেস ছিল এখানে। ১৫০০ থেকে ১৫৫৬ সাল অবধি এখান থেকেই ইউরোপের একটা বড়ো অংশ জুড়ে রাজত্ব চালিয়েছেন চার্লস ফাইভ।
তারও অনেক আগে রোমান সাম্রাজ্যে ঘোড়ায় টানা রথের দৌড় হত এখানকার সার্কাসে। তখনকার দিনে সে সার্কাসে পনেরো হাজার লোকের বসার আয়োজন ছিল। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পরে ভিসিগথিক রাজত্বের সময় টলেডোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তখন প্রায় দুই শতক ধরে টলেডো ছিল রাজধানী। ক্রিশ্চান, মুসলিম, ইহুদি তিন ধর্মের মানুষই এ শহরে বহু শতক ধরে একসঙ্গে বাস করেতাই গাড়িতে করে যেতে যেতেই চার্চ, মসজিদ আর সিনাগগ তিনটেই সমানভাবে চোখে পড়ল
কার্লোস-এর বাড়ি শহরের বাইরে। দুশো বছর ধরে ওদের পরিবার এখানে থাকে। পাঁচিল ঘেরা বিশাল বড়ো তিনতলা পাথরের বাড়িদেয়াল জোড়া বিশাল বিশাল কাচের জানালা। কিছু দূর দিয়ে লিকলিকে কালো সাপের মতো বয়ে গেছে ট্যাগাস নদী। বাড়ির ভিতরে বিশাল দশ একর জমি। সেখানে শুনলাম বেশ কিছু ভেড়া, শুয়োর, গরু, ঘোড়া এসব আছে। তাছাড়া বাড়িতে ভাইন ইয়ার্ড আছে। সেখান থেকে স্পেশাল রেড ওয়াইন তৈরি করা হয়।
আমরা আসায় কার্লোস অত্যন্ত খুশিঅনেকদিন পরে দেখলাম। ওর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছিমাথা জোড়া টাক। তবে দেখেই বোঝা যায় বেশ ফিট। রীতিমতো রেগুলার জিম করা চেহারা।
দুপুরে ট্যাপাস খাওয়ার পরে বাইরে বাগানে এসে বসলাম।
আমি কথায় কথায় বলে উঠলাম, “তুমি যে তোমার ওই নেকড়ে বাঘ দেখাবে বলেছিলে, সেটা কোথায় খাঁচায়?”
কার্লোস হাতে একটা ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে বসে ছিল। প্রশ্নটা শুনে যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল তারপরে আবার আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলে উঠল, “কী-কীসের কথা?”
“ওই যে তুমি বলেছিলে না যে চারনোবিল থেকে একটা নেকড়ে বাঘ এনেছিলে!”
“ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার খেয়াল ছিল না। ডিয়েগো
কার্লোস তারপরেই ওর এক কর্মচারীকে ডেকে বলে উঠল, “ডিয়েগোকে এখানে আসতে বল
লোকটা দেখি ওকে বলে উঠল, “স্যার, ও তো এখন খাচ্ছে। খাওয়া হলে আসবে
লোকটার কথা শুনে একটু অবাক হলাম। বলার ধরন যেন বাড়ির পরিবারের কোনও সদস্যকে আসতে বলছে। সে যেন সব কথা বুঝতে পারে। আসতে বললে সে তার সময়মতো চলে আসবে।
কার্লোসকে জিজ্ঞেস করলাম, “তা, চারনোবিলে গিয়েছিলে কেন? ওখানে তো সেই নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ হওয়ার পর থেকে আর কেউ থাকে না বলেই শুনেছি!”
“হ্যাঁ, সেজন্যই তো গিয়েছিলামআসলে আমরা সচরাচর প্রকৃতির কাছ থেকে সব কিছু কেড়ে নিই। উলটোটা কমই হয়। কিন্তু সেটাই হয়েছে চারনোবিলে। ১৯৮৬ সালে সেই প্ল্যান্টের চার নম্বর রিয়াকটরে বিস্ফোরণের কথা তো জানোই! তারপর থেকে ওই এলাকায় রেডিও অ্যাকটিভিটির মাত্রা অস্বাভাবিক বেশি থাকার জন্য সবাই শুধু ওখান থেকেই নয়, আশেপাশের সব শহর ছেড়ে চলে যায়। বহু লোক মারা গিয়েছিল। এত বছরেও কোনও মানুষের বাস নেই ওখানে। পরিত্যক্ত শহর জুড়ে এখন ঘন জঙ্গল। শুধু জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে বিশাল বিশাল বিল্ডিংতার গা বেয়ে লতা পাতা, গাছ আগাছার রাজপাট
ডেভিড পাশ থেকে বলে উঠল, “শুনেছি কুড়ি হাজার বছর পর্যন্ত কেউ ওখানে আর থাকতে পারবে না। তা তুমি গেলে কী করে? এখনও রেডিয়েশন এর মাত্রা নিশ্চয়ই বিপজ্জনক!”
“হ্যাঁ, সে অনেক সতর্কতা নিয়ে উপযুক্ত পোশাক পরেই গিয়েছিলাম একটা গ্রুপের সঙ্গে। আসলে আমাদের কাজ ছিল ওখানকার এই অস্বাভাবিক রেডিয়েশনে বন্য প্রাণীরা কীরকমভাবে আছে, তা দেখা। ওদের উপরে কোনও প্রভাব পড়ছে কিনা তা লক্ষ করা
“ওখানে কি বন্য প্রাণী আছে?”
“আছে মানে, তারা বেশ বহাল তবিয়তে আছে। ওখানে আর পাশের শহর প্রিপেয়াত, যেখানে ওই ফ্যাকটরির কর্মীরা থাকত – সেখানে লোকজন আর নেই। সে জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে বন-জঙ্গল আর বন্য প্রাণী। আমি আর আমার সঙ্গে আরও তিন জনের দল ওই শহরের পরিত্যক্ত রাস্তাঘাট দিয়ে ঘোরার সময়ে মনে হচ্ছিল যেন অন্য কোনও গ্রহে এসে গেছি। সে যে কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা কী বলব! ঠিক মনে হচ্ছিল যেন এক মৃত শহর। তারপরে বুঝলাম মৃত শহর নয়। মানুষ নেই বটেতবে আরও অনেকে আছে। হরিণ, শেয়াল, নেকড়ে - আরও অনেক বন্য প্রাণীসেরকম কোনও প্রভাব পড়েনি ওদের উপরে। সেখানেই ডিয়েগোকে প্রথম দেখলাম। একাই ছিল। একটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আমাদের লক্ষ করছিল
“একা ছিল? নেকড়েরা সাধারণত দলে ঘোরে
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। সাধারণত এরা মানুষ এড়িয়ে চলে। একটা দলে থাকে। সাধারণত মানুষ আক্রমণ করে নাতবে একটু দূরত্ব রেখে চলা ভালো। এদের সঙ্গে কিছু কুকুরের প্রজাতির অনেক মিল থাকলেও এরা অত সহজে পোষ মানে নাসেরকমই ধারণা ছিল যতক্ষণ না ডিয়েগোকে দেখি
একটু থেমে ওয়াইনে ঠোঁট ঠেকিয়ে আবার যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল কার্লোস। খানিকক্ষণ চুপ করে ফের বলে উঠল, “তা যা বলছিলাম, আমরা একটা বিশেষ বিল্ডিং-এর খোঁজ করছিলাম। খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কেন জানি না মনে হল ও যেন আমাদের আলোচনা বুঝতে পারছে। হঠাৎ দেখি আমাদের আগে আগে যাচ্ছে। ওই পথ দেখিয়ে ওই বিল্ডিং অবধি নিয়ে গেলতারপরেও আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই সারাদিন ছিল। যখন গাড়িতে উঠব, মনে হল যেন ও আমাদের সঙ্গে আসতে চায়। ওকে আমার এত ভালো লেগে যায় আমি জিপে করে ওকে আমাদের হোটেলে নিয়ে আসি। তারপরে এখানে
ফের খুব আস্তে আস্তে বলে উঠল, “এক দিক থেকে মনে হয় ও খুব সাধারণ নেকড়ে বাঘঅন্যদিক থেকে মনে হয় ও যেন কোথায় একদম অন্যরকম
বলে উঠলাম, “নেকড়েরা এমনিতেই খুব বুদ্ধিমান হয়! এরা মূলত অসুস্থ প্রাণীদের শিকার করেবলা হয় এভাবে নেকড়ে নাকি প্রাণীজগতে অসুস্থ প্রাণীর সংখ্যা বাড়তে দেয় না। মানুষদের শুনেছি খুব কমই আক্রমণ করে। তোমার বক্তব্য অনুযায়ী যদি ও তোমার সব কথা বুঝতে পারে সেটা অবশ্যই অস্বাভাবিক ক্ষমতাকিন্তু তার বাইরেও অন্য কোন ক্ষমতার কথা বলছ?”
কার্লোস বলে উঠল, “ঠিক বলে বোঝানো যাবে না। এই এখনই এখানে আসবে। তোমরাই দেখে নিও
কার্লোস-এর কথার মধ্যেই দেখি একটা নেকড়ে বাঘ বাড়ির মধ্যে থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকেসত্যি বলতে কী দেখে একটু ভয়ই লাগছিল। খয়েরি রঙের। বেশ বড়ো সাইজের কুকুর যেরকম হয়। কিন্তু কানটা যেন ছোটো, ছুঁচলোচোখে হিংস্র দৃষ্টি। ডেভিডও দেখি সতর্ক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে দেখছে।
ও আমাদের কাছে এসে দাঁড়াল।
ঠোঁটে একটু মুচকি হাসি নিয়ে কার্লোস নেকড়ে বাঘটাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, “ডিয়েগো, তুমি তো মিস্টার পাই-এর ছবি দেখেছ, কোনটা মিস্টার পাই বলতে পারবে?”
বলতেই নেকড়েটা আমার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য যে সে দৃষ্টি। স্থির নির্মম চাহনি। একই সঙ্গে খুব গভীর দৃষ্টি যেন আমাকে একটা মাইক্রোস্কোপের নিচে ফেলে দেখছে।
কার্লোস আমার মনের ভাব বুঝে আবার বলে উঠল, “ওকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। একঘণ্টা এখানে থাকলেই বুঝতে পারবে যে ও একদম অন্যরকম। এমনকি ও আমাদের সব কথাও বুঝতে পারে
শেষ কথাটা অবশ্য তখনও বিশ্বাস হয়নি।

২২ সেপ্টেম্বর, রাত দশটা
নাহ। দিনের শেষে বলতেই হবে ডিয়েগোর মতো বুদ্ধিমান প্রাণী আমি মানুষের বাইরে দেখিনি। হয়তো সেটাও বলা ঠিক হল নাঅনেক মানুষের থেকে বুদ্ধি-বিবেচনায় এগিয়ে আছে ওপ্রত্যেকটা কথা বুঝতে পারে। উত্তর হাবেভাবে ঠিক বুঝিয়ে দেয়।
কার্লোসের ফার্মহাউসে অনেক ধরণের প্রাণী আছে। আমরা সন্ধে ছ’টা নাগাদ দেখতে গিয়েছিলাম প্যাডকে চারটে ঘোড়া, প্রায় গোটা কুড়ি ভেড়া, গোটা দশেক শুয়োর, বেশ কিছু রাজহাঁস আছে। কেন জানি না মনে হল ওদের সবার নেতা হল ডিয়েগো। ও যখনই তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, সব ক’জন যেন ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। ওর অদৃশ্য আদেশ মানছে। সে ভাষা আমরা না বুঝতে পারলেও বাকি সবাই যেন বুঝতে পারছে। মাঝে মধ্যে ডিয়েগো ডাকছিল। একটা অদ্ভুত সুরে। কেন জানি মনে হচ্ছিল ও যেন বাকিদের কিছু আদেশ দিচ্ছে। সবাই সেটা ফলো করছে।
ওর এই আশ্চর্য বুদ্ধির হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম ডিনারের সময়ডেভিড শোওয়ার ঘরে ফোন ফেলে এসেছিল। সেটা কথায় কথায় একবার শুধু বলেছিল। আমরা সবাই ড্রয়িং রুমে বসে গল্প করছিলামকিছু দূরে ডিয়েগো দাঁড়িয়ে ছিল।
খানিকক্ষণ ডিয়েগোকে দেখলাম না। খানিক বাদে দেখি মুখে করে একটা কাগজে জড়িয়ে ডেভিডের ফোন নিয়ে এসেছে যাতে দাঁতের চাপ ফোনে না লাগে। তার মানে শুধু আমাদের কথা বোঝা নয়, আমরা কে কোন ঘরে আছি সেটা পর্যন্ত লক্ষ করেছে। এত কিছু একটা নেকড়ে বাঘের পক্ষে করা সম্ভব! এতটাই ইন্টেলিজেন্ট!
ডেভিড ওর কাজের কথা বলছিল। রোবটিক্সের উপরে ও এখন কী কাজ করছে ইত্যাদি।
আমার দৃষ্টি ছিল ডিয়েগোর উপরে। দেখলাম ডিয়েগো মন দিয়ে শুনছেকান খাড়া করে। যেন প্রত্যেকটা কথা বোঝার চেষ্টা করছে।

কথায় কথায় আমার বিভিন্ন আবিষ্কার নিয়েও আলোচনা চলছিল। ডিয়েগো যে শুনছে সেটার প্রমাণ পেলাম। কথায় কথায় আমার ‘ডগ ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর’-এর কথা উঠল যেটা কানে লাগিয়ে আমার বাড়ির বেড়াল ভূতো আশেপাশের বাড়ির বকাটে কুকুরগুলোর সঙ্গে আড্ডা মারে, সেটা। শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে মুখের ভাব করে আমার দিকে তাকাল, তাতে স্পষ্ট ব্যঙ্গের ছোঁয়া। ভাবখানা এরকম, এ আবার কী এমন আবিষ্কার!

২৩ সেপ্টেম্বর, সকাল সাতটা
রাতে ভালো ঘুম হয়নি। কেন জানি না একটা অদ্ভুত ভয় মনের মধ্যে দানা বাঁধছে
একটু আগে থেকে শুরু করি। একটা কথা কাল মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল। গতকাল শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল কার্লোস যেন খুব অন্যমনস্ক। যেন অনেক কথা শুনেও শুনছে না। কার্লোস এমনিতে বেশ চালাকচতুর মিশুকে লোক, একই সঙ্গে খুব সপ্রতিভ বা স্ট্রিট স্মার্ট বলা যায়। কিন্তু গতকাল অনেক দিন বাদে ওকে দেখে মনে হল ও যেন সব কিছু খুব শ্লথ গতিতে করছে, যেন এক কল্পনার জগতে মাঝে মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
রাত সাড়ে দশটার সময় ডেভিড শুতে চলে গেলতার খানিক বাদে ডিয়েগো দেখি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল
আমি আর কার্লোস গল্প করতে লাগলাম। কার্লোস নিজেই বলে উঠল, “ক’দিন থেকে আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে নামনে হচ্ছে নিজের চিন্তাভাবনাগুলো কীরকম যেন এলোমেলো, অবিন্যস্ত হয়ে যাচ্ছে
“ডাক্তার দেখিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ, দেখিয়েছিলাম। কিছু ধরতে পারেনি। কিছুই অস্বাভাবিক খুঁজে পায়নি
কাঁপা কাঁপা হাতে সামনে রাখা অরেঞ্জ জুসের গ্লাসটা তুলে নিয়ে ফের বলে উঠল, “ডিয়েগোর বিশেষ ক্ষমতা কী বুঝতে পারলে?”
আমি আশপাশ দেখে বলে উঠলাম, “অবশ্যই খুব ইন্টেলিজেন্ট। তাছাড়া, কিছু একটা আছে ওর হাবেভাবেমনে হয় যেন ওই বাড়ির মনিব
বলেই মনে হল কী একটা অবান্তর কথা বলে উঠলাম। কার্লোস দেখি কিছুই বলল না। কী যেন চুপ করে ভাবছে মনে হল।
ও দাবা খেলতে বেশ ভালোবাসে জানি। কিন্তু দাবা খেলার অনুরোধ এড়িয়ে গেলআমার সঙ্গে গল্প করার সময় দেখি একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
যেখানে বসেছিলাম, সেখানে কিছু দূরে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছিলদেখি বইটাকে পাশের টেবিলে রেখে ওই আগুনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কী যেন ভাবছে!
খানিক বাদে ফের বলে উঠল, “ডিয়েগোর গায়ের রঙটা যেন একটু একটু করে পালটে যাচ্ছে। সবজেটে হয়ে যাচ্ছে
“সেরকম কিছু বোঝা যাচ্ছে না তো?”
“আমি খেয়াল করেছি। সেটা দেখে ওর উপরে বেশ কিছু টেস্ট করেছিলাম। শেষ রিপোর্টে কিছু অদ্ভুত জিনিস পেয়েছি
“কী?”
“ব্লাড রিপোর্ট দেখে মনে হচ্ছে ওর মধ্যে যেন কিছু ইনফেকশন হয়েছে। কী বুঝতে পারছি না
“কোনও ছত্রাক - ফাঙ্গাস ইনফেকশন!”
আমার প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে তাকাল কার্লোস। তারপরে বলে উঠল, “হতে পারে
যেখানে আমরা বসে আছি, সে ঘরে অন্য দেয়ালে সার দিয়ে বুক কেস। দেখি কার্লোস উঠে গিয়ে তার থেকে একটা বই নিয়ে এসে বসলবইটা বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকের উপরে। তারপরে তার থেকে একটা চ্যাপটার বার করে পড়তে শুরু করলঅফিও করডিসেপ্স ফাঙ্গাস-এর উপরে। এই ফাঙ্গাস-এর কথা আমি অবশ্য আগে থেকেই জানি।
বলে উঠলাম, “হঠাৎ করে ওদের উপরে পড়াশোনা শুরু করলে?”
“তুমি এদের কথা জান?”
“হ্যাঁ, কিছুটা জানি। এদের সঙ্গে পিঁপড়েদের পরজীবী সম্পর্ক খুব অদ্ভুত। এরা পিঁপড়েদের প্রভাবিত করে কাছে টেনে আনে। কীভাবে সেটা করে সেটা অবশ্য আমরা জানি না। তারপরে পিঁপড়ের মধ্যে এরা এদের বীজবপন করে। শেষে সেই পিঁপড়েদের মেরে ফেলে। এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর পরজীবী সম্পর্ক
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ
আবার বইটা রেখে দিয়ে কার্লোস বলে উঠল, “জানি না কেন কোনও কিছুতেই মন বসাতে পারছি না” একটু বাদে ফের বলে উঠল, “আসলে প্রাণীজগত এত ইন্টারেস্টিং, আমরা আর কতটুকুই বা জানি! তুমি ‘অ্যালকন ব্লু’ প্রজাপতিদের কথা জান তো?”
“হ্যাঁআরেকটা ইন্টারেস্টিং জীবনচক্র। হাঙ্গেরিতে ওদের দেখা যায়। পড়েছিলাম ওই প্রজাপতি এক বিশেষ ধরনের গাছের পাতায় ডিম পাড়ে। সেই ডিম থেকে শুঁয়োপোকা যখন হয়, তখন তারা পাতা থেকে নিচের ঘাসের উপরে গিয়ে পড়ে। সেই শুঁয়োপোকা নাকি পিঁপড়েদের রানির মতো করে আওয়াজ করতে পারে। কীভাবে তারা এই আওয়াজ করতে শেখে, সেটাই আশ্চর্য। শ্রমিক পিঁপড়েরা তখন ওই শুঁয়োপোকাকে দেখে ওদের রানি ভেবে খাতির করে ওদের বাসায় নিয়ে যায়। তারপরে সে বাসায় নাকি বছর দুয়েক ভারী আদরযত্নে জামাই আদরে থাকে। শেষে প্রজাপতি হয়ে ওই বাসা ছেড়ে বেরিয়ে আসে
“তুমি যে কোন বিষয়টা জানো না মিস্টার পাই, তা ভেবেই অবাক হই। আজকাল বিজ্ঞানীরা এত স্পেসালাইজড হয়ে গেছে যে তারা নিজেদের বিষয়ের বাইরে অন্য কোনোকিছুরই খবর রাখে না। এই আমার কথাই ধর। আমি আমার বিষয়ের বাইরে কোথায় কী হচ্ছে, কিছুই খবর রাখি না। এখানে একটা কথা আরও বলি, ওই প্রজাপতি হবার পরে ওরা কিন্তু আর মাত্র কয়েকদিন বেঁচে থাকে। কী অদ্ভুত লাইফ সাইকেল, তাই না?”
আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হল। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ করছিলাম। ওর মধ্যে অদ্ভুত অস্থিরতাকখনও ফায়ার প্লেসের সামনে গিয়ে বসছে। কখনও সোফায়। কখনও বা ঘরের ভিতরে হাঁটছে।
আমি বলে উঠলাম, “তোমার ফ্যামিলির সবাই ভালোই আছে তো?”
ও কোনও কথা বলল না খানিকক্ষণ তারপরে বলে উঠল, “না, আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীর ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। সেই আইনি প্রসেসটা চলছে
বুঝতে পারলাম এজন্যই হয়তো ও টেনশনে আছে।
আমি আমার ব্যাগ থেকে খুলে একটা বড়ি দিলাম। এটা আমার তৈরি ভেষজ বড়ি। যে কোনও ধরনের উত্তেজনা প্রশমিত করে। আমাদের মনের বিভিন্ন ধরনের পরষ্পরবিরোধী চিন্তাভাবনার স্রোতের মধ্যে কোনটা ঠিক করা উচিত, সেটা বুঝতে সাহায্য করে। কোন কাজটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
আমি বলার পরে ও আমাকে বিশ্বাস করে খেল। তার খানিক বাদে একটা ভারী অদ্ভুত কথা বলে উঠল, “কেন জানি না খুব হরিণ দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। বড়ো হরিণ
এ কথার কোনও অর্থ হয় না। হয়তো কোনও মানসিক চাপে ভুগছে।
রাত অনেক হচ্ছিল। বারোটা নাগাদ আমি শুতে চলে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসছিল না।
আমার পাশে ডেভিডের ঘর। রাত একটা নাগাদ মনে হল ওর ঘরের থেকে সামান্য আওয়াজ আসছে মনে হল যেন কিছু একটা ওর ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝে কাঠের দেয়াল। খেয়াল করতে বুঝলাম একটা চারপেয়ে কিছুর ঘুরে বেড়ানোর, নিশ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ।
ডেভিডের ঘরে কি ডিয়েগো এসে ঢুকেছে? কিন্তু এত রাতে! এখানকার ঘরগুলো বন্ধ করার উপায় নেই। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মিনিট দুয়েক বাদে দেখি আমার ধারণা ঠিক। ডেভিডের ঘর থেকে ডিয়েগো বেরিয়ে এলবেরিয়ে প্যাসেজ দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলআমার দিকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আমার উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ফের ওদিকে এগিয়ে গেলডেভিডের দরজা সামান্য খোলা ছিল। ঠেলে ওর ঘরে ঢুকলাম। ল্যাম্পের আলোয় দেখলাম ডেভিড নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। বিরক্ত না করে আবার আমার ঘরে ফিরে এলাম।
কিন্তু ঘুম আর এল না। ফের খানিকক্ষণ শোওয়ার চেষ্টা করে উঠে পড়লাম। আমার ঘরে জানালা দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের আলো এসে ঢুকেছে। জানালার কাছে এসে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। অপূর্ব দৃশ্য। জানলা দিয়ে কার্লোস-এর বিশাল বাগানটা দেখা যাচ্ছে। আশেপাশে কোনও বাড়ি নেই। বাগান দূরে যেখানে শেষ হয়েছে, তার পরে ঘন জঙ্গল। দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। যেন চাঁদের আলোর ক্যানভাসে আঁকা কোনও শিল্পীর ছবি।
হঠাৎ দেখলাম ডিয়েগো বাড়ির পিছনের গেট দিয়ে বাগানে বেরিয়ে এলজঙ্গলের দিকে যেতে শুরু করল। সে যেতেই পারে। কিন্তু ওর পিছু পিছু কে যাচ্ছে? কার্লোস? এত রাতে? ওদিকে কেন যাচ্ছে?
ডিয়েগোর বাধ্য শিষ্যের মতো কার্লোস ওর পিছু পিছু যাচ্ছে। আস্তে আস্তে দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ওরা। আমি ওদিকে তাকিয়ে রইলাম। মিনিট পাঁচেক বাদে দূর থেকে একটা নেকড়ে বাঘের ডাক বা হাউলিং শুনতে পেলাম। চারদিক নিস্তব্ধ বলেই হয়তো মোটা কাচের জানালার এপার থেকে শুনতে পেলাম। কীরকম যেন গায়ে শিহরণ জাগানো ডাক। উ উ উ। আবার দ্বিতীয়বার ডাকটা শুনলাম।

২৩ সেপ্টেম্বর, রাত দশটা
চুপ করে অন্ধকারের মধ্যে বসে আছি। এখন একটু ঠাণ্ডাও লাগছে। এটা যে কোথায় তা জানি না। তবে এই বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ির অজস্র ঘরের মধ্যে কোনও একটা, সেটা জানি।
মাথায় এখনও অসহ্য যন্ত্রণা। মাথা ফেটে যায়নি তো! মাথায় হাত বোলালাম। নাহ, বেশ খানিকটা ফুলে গেছে বটে, কিন্তু ফেটে যায়নি। তাহলে চুল ভিজে থাকত। মনে হচ্ছে আমার ঝাঁকড়া চুলই আমাকে বাঁচিয়েছে। তা না হলে...
মনে করার চেষ্টা করলাম শুরু থেকে। উফ, কী ভয়ানক!
সকালে ন’টা নাগাদ নিচে ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখি সেখানে ডেভিড বসে আছে। আমাকে দেখেই বলে উঠল, “আচ্ছা, তুমি কার্লোসকে দেখেছ? সকাল থেকে কাউকে এখানে দেখছি না। বাড়ির কাজের লোকেরাও উধাও
আমিও একটু অবাক হলাম। সত্যি, তাই। আমি নিজেও আগে নিচে চলে আসতাম কার্লোস–এর ডাক পেলে।
বাইরে সব চুপচাপ দেখে ভাবছিলাম, হয়তো কারুর ঘুম ভাঙ্গেনি। ব্যাগ থেকে বার করে ‘অদ্বিতীয় টেনিদা’ পড়ছিলাম। এরকম কিছু বাংলা বই সবসময় আমার সঙ্গে থাকে। পড়তে পড়তে সময়ের খেয়াল ছিল না।
এখানে সবাই তাড়াতাড়ি ব্রেকফ্রাস্ট করে। আটটার মধ্যে। কোথায় গেল সবাই?
এই কথার মধ্যেই দেখি পায়ের শব্দ ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে আসছে। কার্লোস–এর এক কর্মচারী, গতকাল দেখেছি, নামটা জানা হয়নি, আমাদের ব্রেকফাস্ট দিয়েছে। ডাইনিং রুমে ডাকছে। কার্লোস কোথায় জিজ্ঞেস করতে ভারী অদ্ভুত উত্তর পেলাম। কার্লোস বাড়ি নেই। কোথায় গেছে তারও কোনও খবর জানে না।
শুনেই জিজ্ঞেস করলাম, “ডিয়েগো কোথায়?”
লোকটার উত্তর দেওয়ার দরকার পড়ল না। দেখি আমাদের ড্রয়িং রুমের দরজার কাছে ডিয়েগো দাঁড়িয়ে আছেকীরকম যেন হিংস্র দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেকুকুর আর নেকড়ে বাঘের মধ্যে যে অনেক তফাৎ আছে, সেটা ওই চোখের দৃষ্টি বুঝিয়ে দিচ্ছে।
আমি ডেভিডকে বলে উঠলাম গত রাতের ঘটনা। রাতে দেখেছি ডিয়েগোর সঙ্গে কার্লোসকে বাগানে যেতে।
ওর এই কর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলাম, “এখানকার পুলিসে খবর দেওয়া দরকার। এখানে ওর কোনও আত্মীয় আছে?”
“না, স্যার এখানে একাই থাকেন। কাছাকাছি কেউ থাকে না। তবে স্যারের বোন আছেন বারসিলোনায়। ওকে ফোন করবেন? দাঁড়ান, নাম্বারটা দিচ্ছি। কিন্তু তার আগে আরেকটু দেখে নিলে হত না?”
“এই বাড়িতে এখন আর কে আছে?”
“এই আপনারাই
“মানে? গতকাল তো আরও বেশ কয়েকজন কাজের লোক ছিল। তারা কোথায়?”
“তারা সব আজ ছুটিতে। আজ রোববার। ওদের রোববার ছুটি দেওয়া হয়
আমি বেশ অবাক হলাম। আমরা দু’জন এখানে আসছি, সেটা জেনেও কার্লোস সবাইকে ছুটি দিয়েছে? লোকটাকে সেটাই বলে উঠলাম।
লোকটা ফের বলে উঠল, “জানি না, স্যার কী ভেবে দিয়েছিলেন। হয়তো আগে জানতেন না বলে
আমার মনে কিছু অশুভ চিন্তা আসছিল। খেতে ইচ্ছে হল না।
বলে উঠলাম, “চলো, আমরা আগে ভালো করে বাড়িটা দেখে আসি। আমার সঙ্গে আসো
বলে দরজার দিকে এগোলাম।
দেখি ইতিমধ্যে ডিয়েগো ঘরের মধ্যে ঢুকে এসেছে। একটা দিকে সরে দাঁড়িয়ে আছেড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে প্যাসেজে এসেছি, ঠিক তখনই কেউ যেন আমার মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করল। ব্যস। তারপরেই চোখে অন্ধকার।
খানিক আগে জ্ঞান ফিরেছেফোনটা জ্যাকেটের মধ্যে ছিল। নেটওয়ার্ক নেই এখানে। এখন সময় দেখাচ্ছে রাত ন’টা। মাঝে এতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম!
এবারে আমি ফোনের আলোয় ঘরটাকে দেখলাম। মনে হল একটা সময় এ ঘর আস্তাবলের কাজে ব্যবহার করা হত। কাঠের পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা চারটে ঘোড়া রাখার জায়গা। খড়–বিচুলিও ছড়ানো আছে। কিন্তু ঘোড়া নেই। শুধু নেই তাই নয়, মনে হয় না যে সেই কাজে এটা বহু বছর ব্যবহার করা হয়েছে। সেটা এই ঘরের চেহারা দেখে বোঝা যায়। চারদিকে নোংরা, আবর্জনা ছড়ানোমাটিতে পায়রা জাতীয় কোনও একটা পাখির কঙ্কাল পড়ে আছে
ঘরে কোনও জানালা নেই। উঁচু ছাদ। ঘরের একদিকে দুই পাশে বিশাল উঁচু কাঠের দরজা। দুটোই বাইরে থেকে বন্ধ। দরজার কাঠ যা মোটা তাতে এ দরজা ভাঙা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বেশ খানিকক্ষণ দরজায় ধাক্কাধাক্কি করলাম। কিন্তু কোনও সাড়া পেলাম না।
ঘরের অন্ধকার আমার চোখে সয়ে এলেও, কীরকম যেন দমবন্ধ লাগছে। ঘরের মধ্যে এমন কিছু নেই যা দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করা যায়। ফোনের চার্জ কমে আসছে।

২৫ সেপ্টেম্বর
এখন টলেডো রয়্যাল হাসপাতালে আছি। শরীর খুব দুর্বল লাগছে। আসলে প্রায় দু’দিন ঘরে বন্দি ছিলাম জলখাবার কিছুই পাইনি। তাছাড়া বন্ধ ঘরের বাতাসে অক্সিজেনের অভাব অনুভব করছিলাম
একটু আগে থেকে পুরো ঘটনাটা বলার চেষ্টা করি।
কী হচ্ছে ব্যাপারটার একটা ধারণা করতে পারছিলাম। কিন্তু এই ঘর থেকে বেরোনোর কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
একটাই ভরসা। কল্যাণগড়ের ল্যাবে আমার তৈরি রোবট লিও জানে যে আমার দিক থেকে কখনও আটচল্লিশ ঘণ্টার বেশি কোনও নির্দেশ না এলে আমার বড়ো কিছু একটা বিপদ হয়েছে। সেক্ষেত্রে ও প্রথম আমাকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। সেটা না করতে পারলে গণেশকে জানাবে। তারপরে ও আর গণেশ মিলে পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
কিন্তু কলকাতায় থাকলে একরকম। আমি এখন স্পেনে। খোঁজাখুঁজি করলে আমি যে এখানে এসেছি সেটা অবশ্য ওরা ঠিক বুঝতে পারবে। সেটা বোঝার অনেক উপায় আছেআমার ফোন ট্রেস করা যেতে পারে। আরও অনেক কিছু। কিন্তু তার জন্য সময় লাগে।
কিন্তু তার আগেই যে যে কোনও মুহূর্তে বিপদ এগিয়ে আসতে পারে, তা জানতাম। যদি এ ঘরে ডিয়েগো আসে।
ঠিক সেটাই হল। আমি ক্লান্ত হলেও সজাগ ছিলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম বন্ধ দরজার সামনে একটা চতুষ্পদ জীব এসে দাঁড়িয়েছে। কার্লোসের যা হয়েছে, একই জিনিস হতে চলেছে আমার ভাগ্যে।
সাধারণত আমার কাছে আত্মরক্ষার্থে একটা পেন থাকে, যা থেকে হাইভোল্টেজ ইলেকট্রিক শক দেওয়া যায়। কিন্তু ঘটনাটা এত আচমকা হয়েছে যে আমার কাছে কিছুই নেই এখন
একটা জান্তব গন্ধ দরজার ওপার থেকে আসছে। কিন্তু ডিয়েগো কি একা? নাকি সঙ্গে সেই চাকরটাও আছে যে আমাকে পিছন থেকে মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করেছিল।
মনে হয় সেই লোকটাও আসছে। আর তার জন্যই অপেক্ষা করছে ডিয়েগো। নেকড়ে বাঘের যতই বুদ্ধি থাকুক না কেন তার পক্ষে একা দরজার লক খোলা সম্ভব নয়। লোকটার পায়ের শব্দ দরজার সামনে এসে থামল।
কিছুক্ষণের মধ্যে দরজা খুলে গেলবাইরের থেকে একরাশ আলো এসে চোখ ধাঁধিয়ে দিল। আর তার পরক্ষণেই আমার দিকে এগিয়ে এল ডিয়েগো। ওর সরু হিংস্র হলুদ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। একটা চাপা গর্জন করে উঠল ও তখন দেখতে পেলাম ওর ধারালো দাঁতগুলো।
আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, প্রস্তুত হচ্ছি ওর ঝাঁপিয়ে পড়ার, এর মধ্যে হঠাৎ করে গুলির আওয়াজ হল। দু-দুটো। দেখি ডিয়েগো ছিটকে দূরে গিয়ে পড়েছে।
তারপরে আরও বেশ কয়েকটা গুলি। একটা দেখলাম ওই চাকরটার পায়েও লেগেছে। লোকটা চিৎকার করে বসে পড়েছে।
ডেভিড দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ডিয়েগো আহত। তবু ডেভিডের দিকে না গিয়ে এগিয়ে আসছিল আমার দিকেডেভিডের আরও একটা গুলিতে ওর নিথর দেহটা এবারে দূরে ছিটকে পড়ল।

২৬ সেপ্টেম্বর
টলেডোর পুলিসের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টরকে বলছিলাম ঘটনাটা। ডেভিডও শুনছিল। সঙ্গে ছিল আইবেরিয়া পুলিসের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের আরও বেশ কয়েকজন।
এখানে বলে রাখি কার্লোসের ক্ষতবিক্ষত দেহটা ওর বাড়ির পিছনের দিকে ঘন জঙ্গলের মধ্যে গতকাল পাওয়া গিয়েছে।
ওর মৃত্যু যে নেকড়ের আক্রমণে তা নিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কোনও দ্বিধা নেই। দাঁত আর নখের দাগ ডিয়েগোর সঙ্গে মিলে গেছে। প্রশ্ন - কেন ডিয়েগো আক্রমণ করেছিল ওর মনিবকে? নেকড়ে কুকুরের মতো অত প্রভুভক্ত হয় না ঠিকই, কিন্তু এরকম মানুষকে আক্রমণের কথাও খুব বেশি শোনা যায় না।
অবশ্য এখানে প্রশ্ন মনিব কে? ডিয়েগো না কার্লোস?
আমি বলে উঠলাম, “বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই আমার ধারণা হয়েছিল যে বাড়ির আসল কর্তা আর কেউ নয়, ডিয়েগো। এটাই ছিল ডিয়েগোর আসল বিশেষত্ব। সে শুধু কার্লোসকে নিয়ন্ত্রণ করত না, করত বাড়ির সবাইকে। এমন কি খামারবাড়ির অন্য জীবজন্তুদের। কিন্তু সে দোষ কিন্তু ডিয়েগোরও ছিল না
“তবে?” অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল ইন্সপেকটর ন্যাকো।
“ডিয়েগোকেও নিয়ন্ত্রণ করত অন্য এক অনুজীবীআমার ধারণা এক ধরনের অজানা ছত্রাক। যার প্রমাণ আপনারাও পাবেন ডিয়েগোর শরীরে। পরজীবীর মতো ডিয়েগোর শরীরে আশ্রয় নিয়েছিলওর চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিল ওর শরীরে বাসা বেঁধে
“আনবিলিভেবল। ইনক্রেডিবল হ্যাঁ, আমরাও ওর উপরে কিছু টেস্ট করব
“আমার ধারণা চারনোবিলের রেডিয়েশনের মাত্রা অস্বাভাবিক হওয়ার জন্য এরকম নতুন ছত্রাক গড়ে উঠেছিল চারনোবিলেসেই ছত্রাকই বাসা গড়ে ডিয়েগোর শরীরে। ডিয়েগোই ছিল ওই ছত্রাকের প্রাইমারি হোস্ট। হয়তো ওখানে গেলে আরও কেউ সংক্রমিত হতে পারে। ডিয়েগোর শরীরে ওই ছত্রাক পাওয়া গেলে আমাদের এ বিষয়ে ইউক্রেন সরকারকে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে হবে
“যাক, আপনার জন্যই হয়তো আমরা আসল রহস্যের সন্ধান পাবঅনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমাদের দেশে এসে যে আপনাকে এরকম বিপদে পড়তে হল, তার জন্য আমার খারাপ লাগছে,” বলে উঠলেন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর
আমি বলে উঠলাম, “আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে কী হবে। ধন্যবাদ দিন ডেভিডকে। যে আমাকে উদ্ধার করল ওই ঘর থেকে
বলতে গিয়েই থেমে গেলাম।
ডেভিডকে কেন ডিয়েগো নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না? এ প্রশ্নটা আগে মাথায় আসেনি কেন! ডিয়েগো তো যথেষ্ট সময় পেয়েছিল।

৩০ সেপ্টেম্বর, কল্যাণগড়
আজ সকালে ডেভিডের মৃত্যুর খবরটা পেয়েছি। তখন থেকে মন খুব খারাপ। খুব ভালো লোক ছিল। মাদ্রিদের একটা নামকরা হাসপাতালে মারা গেছে। নামী ডাক্তাররাও কিছু করে উঠতে পারেনি। তবে আমার অনুমান ঠিক। ডিয়েগোর মতো ওর মধ্যেও ওই এক ছত্রাকের ইনফেকশন পাওয়া গেছে। ছত্রাক মারা যাওয়ার আগে তার বসতিও ধ্বংস করে গেছে
সেদিন পুলিসের সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ খেয়াল হল ডিয়েগো কেন ডেভিডকে প্রভাবিত করতে পারেনি! একটু ভাবতেই আসল উত্তরটা খুঁজে পেলাম। এর পিছনে একটাই কারণ থাকতে পারে।
ওই বিশেষ ছত্রাক বুঝতে পেরেছিল যে তাদের নতুন হোস্ট দরকার। বিশেষ করে এমন এক হোস্ট যে এরকম আন-ম্যানড স্বশাসিত যুদ্ধজাহাজ রিসার্চের সঙ্গে যুক্ত আছে। ঠিক সে জন্যই প্রথম রাতে ওই ছত্রাক চলে আসে ডেভিডের শরীরে ডিয়েগোর মাধ্যমে। সেজন্যই ডেভিডের ঘরে ডিয়েগো এসেছিল। এসেছিল তার নতুন বাড়ি, বসতি খুঁজতে। আরও ক্ষমতাশালী হোস্ট খুঁজতে। হয়তো এরকম কিছু হোস্টের মাধ্যমে মানব জগতকে আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করত ওরা।
এটুকু বলতে পারি সেই চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ করে এসেছি। কিন্তু ওরা আসবে। ওরা আবার খোঁজ করবে নতুন শিকারেরওরা শিকারের অপেক্ষায় থাকবে ওদের ওই চারনোবিলের রাজত্বে।
কিন্তু আমিও বসে থাকব না। আমাকে জানতে হবে ওদের কোষীয় গঠন। আমার ল্যাবে আমি এমন ন্যানোবট তৈরি করতে চলেছি, যারা ওদের ধ্বংস করবে ওদেরই কৌশলে, ওদেরই খেলায়
প্রশ্ন হতে পারে আমি ওই ফাঙ্গাস পাব কোথায়?
আমি নিজে জানি আমার মধ্যেও ওরা আছেআমিও ওই বিশেষ ছত্রাকের শিকার। তবে আমাকে ওরা এখনও কাবু করতে পারেনি। পারবেও না।
ড্রয়িং রুমে আমার ফোন রিং হচ্ছে। বলে উঠি, “গণেশ, দেখ তো কার ফোন?”
খানিক বাদে গণেশের উত্তর আসে।
“স্যার, অনিলিখা ফোন করছে
“অনিলিখা?”
অনিলিখার ফোন ধরতে উঠে যাই সঙ্গে সঙ্গে।
ফোন ধরে বলে উঠি, “কী ব্যাপার অনিলিখা? কোনও খোঁজখবর নেই গত দুই সপ্তাহ। কোথায় তুমি?”
কিন্তু ওর কথা স্পষ্ট শোনা গেল না। কথা কেটে কেটে যাচ্ছে।
“কী বলছ? শুনতে পাচ্ছি না? তুমি কোথায়? তোমার দিকের নেটওয়ার্ক খুব খারাপকিছুই শোনা যাচ্ছে না
আরও কিছু অস্পষ্ট কথা ভেসে এল উলটো দিক থেকে।
“নাহ, কোথায় আছ বলো তো? কীসের বিল?”
এতক্ষণে একটু যেন কথা শোনা গেল উলটোদিক থেকে।
“মিস্টার পাই, আমি ইউক্রেনের চারনোবিল থেকে বলছি
“সর্বনাশ। চারনোবিল?”
“হ্যাঁ, আমি আপনার সঙ্গে একটা জরুরি ব্যাপারে কথা বলতে চাই ফোন কেটে যাওয়ার আগে। এখানে আমরা খুব দরকারি অভিযানে এসেছিলাম। কিন্তু আমার সঙ্গে যে তিনজন এসেছিল, তাদের সবাই গতকাল থেকে নিখোঁজ। আমি এখন এখানে একটা জায়গায় -”
ফোন কেটে গেল।
“হ্যালো, অনিলিখা, হ্যালো শুনতে পাচ্ছ?”

কোনও উত্তর এল না।
_____
ছবিঃ প্রত্যয়ভাস্বর জানা

8 comments:

  1. দুর্দান্ত প্লট, দারুন ফিনিশিং 🙂

    ReplyDelete
  2. সাংঘাতিক গল্প! সাম্প্রতিক কালে আমার পড়া সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কাহিনির মধ্যে থাকবে এটা।

    ReplyDelete
  3. দারুণ লাগলো...অন্যরকম গল্প

    ReplyDelete
  4. অসামান্য !!
    ভাইরাস তো রাজত্ব করছেই, সাথে আবার ছত্রাকও.....বহুমুখী এক কাহিনী এবং শেষটা অপূর্ব ! সম্পূর্ণ উপন্যাস আকারে পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
  5. অভিজ্ঞান, তোমার গল্প "মিস্টার পাই ও নেকড়ে বাঘ" পড়ে হতবাক হয়ে গেছি ! বরং বলা ভালো, শিহরিত হয়ে আছি এখনও। তুমি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি (A.I ) নিয়ে তুমি যে কল্পবিজ্ঞানের দুনিয়ায় নিয়ে গেছ আমাদের সবাইকে, তা এককথায় অসাধারণ! অভিনব প্লট, অনবদ্য উপস্থাপন আর যে মুনশিয়ানায় গল্প শেষ করলে তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে... একেবারে নিখুঁত! তুমি যে সব তথ্য সরবরাহ করেছ, তার অনেকটাই যে এখন বিজ্ঞানীদের করায়ত্ত, তাতে আমি নিঃসন্দেহে । কারণ, তুমি নিজে তোমার চাকরিস্থল লন্ডনে কাজ করছ "A.I" নিয়ে বহু দিন ধরে । তাই কল্পবিজ্ঞান হলেও সবটাই কল্পনাশ্রয়ী নয়, আমি মনে করি। আর একটা কথা না বললে আমার এ রিভিউ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে । সেটা হল, তুমি যেরকম ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে পাঠকের সামনে তুলে ধরলে গল্পটা, তাতে আমার তো মনে হল তুমি আসরে বসে শোনাচ্ছ আমাদেরকে... আর আমরা সব চরিত্রগুলোকে দেখতে পাচ্ছি সামনে !
    আমি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আশা রাখি, A.I মানুষকে নয়, মানুষই নিয়ন্ত্রণ করবে A.I-কে । তোমার জন্যে থাকছে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ।

    ReplyDelete
  6. Darun laglo... Osadharon...R ending ta to aroi valo laglo...Anilikha ke niyeo erpore erokom ekta golpo pele besh valo lagbe..

    ReplyDelete