বিজ্ঞান:: কী হবে মহাকাশে হারিয়ে গেলে? - সুমনদীপ পাণ্ডে


কী হবে মহাকাশে হারিয়ে গেলে?
সুমনদীপ পাণ্ডে

রাতের আকাশ দেখতে বড়ো সুন্দর লাগে, তাই না? কার না ইচ্ছে করে মহাকাশচারী হয়ে এই অনন্ত ব্রহ্মান্ডের বুকে ঘুরে বেড়াতেকিন্তু কখনও ভেবে দেখেছ, কী হবে যদি কোনও মহাকাশচারী এই মহাকাশে হারিয়ে যান? সামনে, পিছনে, ডায়ে, বাঁয়ে চারিদিকে শুধুই অন্ধকার আর অন্ধকার। কোথায় যাবে? কী করবে সে? কল্পবিজ্ঞানের গল্পে এরকম ঘটনা আমরা প্রায় দেখি। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টা একটুও মজার নয়, বরং বেশ ভয়ানক। এই বিষয়টিকে নিয়ে চিন্তা করলে অনেক পোড় খাওয়া মহাকাশচারীদেরও বুকের রক্ত জল হয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হল ব্যাপারটা কেন এত চিন্তার বা ভয়ের? সত্যি কী হতে পারে যদি কেউ মহাকাশে হারিয়ে যায় তাহলে?

এ প্রশ্নের উত্তরও খোদ ‘নাসা’-ই (National Aeronautics and Space Administration) আমাদের দিচ্ছে। এই বিষয়ের কথা মাথাতে রেখে ‘নাসা’ (NASA) কিছু ‘সেফটি প্রোটোকল’ অর্থাৎ সুরক্ষার নিয়ম চালু করেছে। যেমন কোনও মহাকাশচারী যদি তাঁর স্পেস স্টেশন থেকে কোনও দরকারে বাইরে বেরোন তাহলে প্রথমে তাঁকে ২৬ কিলোমিটার লম্বা স্টিলের তৈরি একটি ‘ব্রেডেড টেথর’ অর্থাৎ শিকল দিয়ে ভালো করে বাঁধা হবে এই শিকল ৫০০ কেজি পর্যন্ত ওজন নিতে সক্ষমকিন্তু যদি কোনও কারণে এই টেথরটি ছিঁড়ে যায় তখন কী হবে? সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় উপায় হল ‘সেফার’ (SAFER) যার পুরো নাম ‘সিমপ্লিফায়েড এড ফর এভা রেসকিউ’ (Simplified Aid For EVA Rescue), এর মধ্যে আবার ‘এভা’-র (EVA) পুরো নাম হল ‘এক্সট্রা ভেহিকুলার অ্যাক্টিভিটি’ (Extra Vehicular Activity) এটা আসলে একটা আপৎকালীন জেটপ্যাক সিস্টেমযার কাজ প্রধানত মহাকাশচারীদের কন্ট্রোল অ্যাকসিলারেশন প্রদান করা। সোজা কথায় বললে মহাকাশচারীরা এই সিস্টেমের সাহায্যে মহাকাশে ইচ্ছেমতন বিভিন্ন দিকে ঘুরে বেড়াতে পারেন কিন্তু যদি ধরো এই ‘সেফার’-ও ফেল করে গেল! কিংবা যে মহাকাশচারী এই জেটপ্যাকটি চালাচ্ছিলেন তিনিও কোনও কারণে অজ্ঞান হয়ে গেলেন, তখন কী হবে? সে ক্ষেত্রে তো আর একটাই উপায় রইল, স্পেস স্টেশনে বাদবাকি যারা রয়েছেন তাঁদেরকেই একসঙ্গে এই উদ্ধারকার্যটি করতে হবে। তবে কাজটি মোটেও সহজ নয় কারণ কল্পবিজ্ঞানের গল্প বা সিনেমার মতন এখনও পর্যন্ত আমরা কোনও মহাকাশযান তৈরি করে উঠতে পারিনি যাতে করে ব্রহ্মাণ্ডে হারিয়ে যাওয়া কোনও ব্যাক্তিকে খুঁজে আনা যায়। তাহলে এবার সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হচ্ছে যদি স্টিলের শিকল ছিঁড়ে যায়, জেটপ্যাক কাজ না করে, উপরন্তু বাকি মহাকাশচারীদের করা উদ্ধারকার্যও ব্যর্থ হয়, তখন কী হবে? কোথায় যাবে সেই মহাকাশচারী?

উত্তর হল স্টিলের টেথরটি ছিঁড়ে যাওয়ার সময় যে শক্তি ক্রিয়া করছিল তারই গতির অভিমুখে মহাকাশচারীও চলতে থাকবেন। সেই সময় ব্যাক্তিটির নিজেকে একদম হালকা মনে হবে এবং হাত পা ছোঁড়া বা কোনও রকম অ্যাক্সিলারেশন ফোর্স তৈরি করার চেষ্টা করেও কোনও লাভ হবে না। যে ডাইরেকসনে এবং যে গতিতে সেই মহাকাশচারী চলতে শুরু করেছিলেন তাঁকে সেই রকমভাবেই চলতে হবে। এর কারণ হল নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র। যেখানে বলা হয়েছে কোনও গতিশীল বস্তু ততক্ষণ গতিশীল থাকবে যতক্ষণ না তার ওপর বাইরে থেকে অন্য কোনও শক্তি ক্রিয়া করছে। আর যেহেতু মহাকাশে বাইরের তেমন কোনও শক্তি নেই ক্রিয়া করার মতন, তাই সেই ব্যাক্তিটিও অনন্তকাল ধরে একইরকম ভাবেই চলবে যতক্ষণ না অন্য কোনও শক্তি তাকে বাধা দিচ্ছে। এবার যদি সেই মহাকাশচারী ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর দিকে চলে আসেন তাহলে পৃথিবী তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়ে সেই ব্যাক্তিকে নিজের কক্ষপথে বন্দি করে ফেলবে এবং তিনিও পৃথিবীকে চাঁদের মতন প্রদক্ষিণ করা শুরু করবেন। তবে অবশ্যই সেই মহাকাশচারী চাঁদের মতন পৃথিবীকে কয়েক লক্ষ যুগ ধরে প্রদক্ষিণ করে যেতে পারবেন নাযদি তাঁর স্পেসস্যুট পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে তাহালেও সেই ব্যাক্তিটি পৃথিবীকে ততক্ষণই প্রদক্ষিণ করতে পারবেন যতক্ষণ না তাঁর অক্সিজেন পুরোপুরি শেষ হচ্ছেতবে কোনও কারণে যদি স্পেসস্যুটটি প্রথমেই নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তো বলাই বাহুল্য মহাকাশচারীর এই যাত্রাপথ আগের চেয়ে অনেকখানি সংক্ষিপ্ত হয়ে যাবেপ্রথমে আউটার স্পেসের এক্সপোজন পনেরো সেকেন্ডের মধ্যেই তাঁকে অজ্ঞান করে ফেলবে। তারপর তাঁর শরীরের সমস্ত রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করবে। এর কারণ, মহাকাশে বায়ুর কোনও চাপ থাকে না। এই ফুটন্ত রক্ত শরীরকে আগের চেয়ে দু’গুন বেশি বেলুনের মতো ফুলিয়ে দেবে, আর এই সবকিছুই হবে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই। অন্য আর একটি সম্ভাবনা হল যদি সেই মহাকাশযাত্রী একটি নির্দিষ্ট কোণ ধরে নির্দিষ্ট বেগের সঙ্গে পৃথিবীর দিকে এগোয় তাহলে সে পৃথিবীর সঙ্গে কোলাইড করতে পারেকিন্তু কোনও ভাবেই সে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারবে না, কারণ তার নিচে পড়ার গতি এতটাই বেশি হবে যে সে পৃথিবীর অ্যাটমোস্ফিয়ারও পেরোতে পারবে না। এত স্পীডে পড়ার সময় তাঁর শরীর ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে হওয়া ঘর্ষণের ফলে যে তাপ উৎপন্ন হবে তাতে সেই মহাকাশচারী ব্যক্তি অনায়াসে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে

এই একই কারণের জন্যই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা সমস্ত গ্রহাণুপুঞ্জগুলি জ্বলে যায়, যাকে আমরা ‘উল্কাপাত’ নামে চিনি।

একবার এরকমই এক সত্যিকারের দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৭ সালে। একটি সোভিয়েত মহাকাশযান ঠিকমতন ল্যান্ডিং করতে না পারার কারণে জ্বলন্ত অবস্থায় ভেঙে পড়েছিল। অতএব আমরা এতক্ষণ ধরে জানলাম যে একজন মহাকাশচারী যদি মহাকাশে হারিয়ে যান তাহলে তাঁর কী কী বিপদ হতে পারে।

কিন্তু আনন্দের খবর হল আজ পর্যন্ত এরকম ঘটনা কোনও দিন ঘটেনি। তার কারণ যারা মহাকাশে যান  তাঁদের সুরক্ষার দিকে অত্যন্ত বেশি নজর দেওয়া হয়। এই বিষয়ে ‘নাসা’-র বক্তব্য হল এরকম কোনও দুর্ঘটনা সুদূর ভবিষ্যতেও ঘটবে না তার সবচেয়ে বড়ো কারণ এই সব সিকিউরিটি প্রোটোকলগুলো।

এখন তোমাদের মনে নিশ্চয় এই প্রশ্নটা এসেছে, যদি কোনও এলিয়েন আক্রমণ করে বসে তখন কী হবে? এরকম কোনও ঘটনা ঘটলে কে বলতে পারে হয়তো আগামী দিনে তোমাদের মধ্যে থেকেই কোনও বড়ো বিজ্ঞানী বেরিয়ে এসে এই সমস্যারও সমাধান করে দেবে।

___________________

তথ্যসূত্র – ১) www.nasa.gov ২) The Universe in a Nutshell - Book by Stephen Hawking

_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment