প্রবন্ধ:: কলকাতার সাহেব আঁকিয়েরা - কৌশিক মজুমদার

কলকাতার সাহেব আঁকিয়েরা
কৌশিক মজুমদার

কলকাতার পত্তন থেকে শুরু করে কালে কালে কলকাতায় এসেছেন কত না শিল্পী কেউ ইংরেজ, কেউ রুশি, কেউ বেলজিয়ান তাঁরা নিজেদের মতো করে দেখেছেন এই দেশকে এঁকেছেন এখানের ছবি আর তখন তো ক্যামেরা ছিল না, তাই হাতে আঁকা এই অপরূপ ছবিগুলো আজও আমাদের তখনকার কলকাতাকে, সেখানের মানুষকে চিনতে সাহায্য করে এই রকমই কিছু আঁকিয়ে আর তাঁদের কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব আজ

টিলি কেটল
ইম্পের পরিবারঃ টিলি কেটল-এর আঁকা ছবি
কেটলের জন্ম ১৭৩৫ সালে লন্ডনে বাবা হাউস পেন্টার বাবার কাছেই ছবি আঁকার হাতে খড়ি ১৭৬৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পেশ করলেন দরখাস্ত ভারতে যেতে চাই একজন পেন্টার হিসেবে নটিংহ্যাম জাহাজে চেপে ভারতে এলেন টিলি প্রথমে মাদ্রাজ প্রথমে কাজ না জুটলেও ধীরে ধীরে পোর্টেট আঁকার কাজ পেলেন আর্কটের নবাব মহম্মদ আলির কাছে খবর গেল এক সায়েব পেন্টার এসেছে দারুন ছবি আঁকে তিনি বরাত দিলেন কেটলকে দুটো ছবি আঁকার একটা তাঁর নিজের আর একটা পাঁচ ছেলের সঙ্গে এর পাশাপাশি দেবদেবী, নর্তকী এমনকি সতীদাহের ছবিও এঁকে চলেছিলেন কেটল ১৭৭১-এর শেষে পা দিলেন কলকাতায় কলকাতার গভর্নর অযোধ্যায় সুজাউদ্দৌলাকে খবর পাঠালেন দারুণ এক শিল্পী এসেছে ফৈজাবাদে নবাব আর তাঁর পরিবারকে নিয়ে আটখানা ছবি আঁকলেন তিনি নবাবের প্রশংসা পেয়ে কাজও জুটতে থাকল বিস্তর ১৭৭৫ সালে স্যার ইলিজা ইম্পের প্রতিকৃতি আঁকার ভার তিনিই পান সে সব ছবি এখনও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গেলে দেখতে পাবে একেবারে জীবন্ত যেন এখুনি কথা বলে উঠবে

মাদাম বেলানস
শিল্পীঃ মাদাম বেলানস
সাধারণ বাঙালীর জীবন প্রথম তুলি কালিতে ধরেন যিনি, তিনি ম্যাডাম এস সি বেলানস জাতে ফরাসী এমিলি ইডেনের বন্ধু কিন্তু ইডেনের মতো ক্ষমতার উপরে না থাকার জন্য যত্র তত্র রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, আর আঁকতেন প্রান্তিক মানুষদের ১৮০৬ সালে স্বামীর সঙ্গে ভারতে আসেন তিনি প্রথমে থাকতেন শ্রীরামপুরে, পরের বছরই কলকাতা চলে এসে ৫৩, কসাইটোলায় বাড়ি নেন তখনই এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে মানুষকে দেখতেন তিনি দেখতেন অন্তর্জলী যাত্রা, চরক, গ্রামের ঘর, পালকি বেহারা, হোলি, বান্দরওয়ালা বা বাঙালী গৃহস্থের কুটিরের ভিতর অদ্ভুত ফটোগ্রাফিক ডিটেলিং ছিল তাঁর আঁকায় স্বয়ং রামমোহন রায় তাঁকে চিঠিতে জানান ".... they are true representations of nature, so much, that they have served to bring to my recollection, the real scenes alluded to of that unhappy country.." ১৮৩২ সালে ২৪টি লিথোগ্রাফ নিয়ে প্রকাশ পায় Twenty Four Plates Illustrative of Hindu and European Manners in Bengal বইটি কলকাতার সাব অল্টার্ন কালচার নিয়ে যারা পড়াশুনো করেন, এই বই তাঁদের বাইবেল সম

ফ্যানি পার্কস
কাছারি, শিল্পিঃ ফ্যানি পার্কস
১৮২২ সালে কলকাতায় আসেন ফ্রান্সেস স্যুজেনা আরচার ফ্যানি পার্কস নামে পরিচিতি পান তাঁর স্বামী চার্লস পার্কস ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থরাইটার মানে কেরানি মিসেস ফ্যানি তাঁর বেড়ানোর গল্প ডায়েরির পাতায় লিখে রেখেছিলেন প্রবাস জীবনের স্মৃতি হিসেবে ফ্যানির বাবাও ছিলেন কোম্পানির অফিসার, সেই সুবাদে ফ্যানির খানিকটা ধ্যানধারণা ছিল ভারত সম্পর্কে নিজে ১৮২২ থেকে ১৮৪৬ টানা ২৪ বছর এদেশে কাটিয়ে ঘরে যখন ফিরে যান, তখন তিনি পৃথুলা এক টিপিক্যাল ইংরেজ মহিলা সঙ্গে ছিল তাঁর ২৪ বছরের ভারত–‌অভিজ্ঞতার দৈনন্দিন নির্যাস বইটি প্রথম বের হয় ১৮৫০ সালে তখন বইটির নাম ছিলঃ ‘‌২৪ বছর প্রাচ্যে সুন্দর দৃশ্যের ও সেখানকার মহিলা মহলের অন্দরের তথ্যে আগ্রহী এক তীর্থযাত্রীর ভ্রমণের ইতিবৃত্ত২০০২ সালে বেরোয় দ্বিতীয় বাহুল্যবর্জিত ছিমছাম এডিশন বইটির ভারত–‌বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিক ডালরিম্পলের সম্পাদনায় নাম ‘বেগমস ঠাগস অ্যান্দ ইংলিশমেন - দ্য জার্নালস অফ ফ্যানি পার্কস তখনকার কলকাতার সাহেবী অন্দরমহল নিয়ে এত ভালো লেখা আর দুটো নেই মহেন্দ্রনাথ দত্তের সাহেবী সংস্করণ বলা যেতে পারে নিঃসন্দেহে... পাতায় পাতায় সোনার খনি... কী অসামান্য সেই কথন দুই একটা উদাহরণ না দিলে পাপ হবে
দুর্গাপুজো নিয়ে তিনি লিখছেন, ‘...সেদিন দুর্গাপূজা দেখতে গিয়াছিলাম একজন ধনিক বাঙালীবাবুর বাড়ি ‘দুর্গা’ নামে হিন্দুদের যে দেবী আছেন তাঁরই ‘অনারে’ এই উৎসব হয় বাবুর চারমহলা বাড়ি, মধ্যিখানে বিরাট উঠোন সেই উঠোনের এক পাশে উঁচু মঞ্চের উপর দেবী দুর্গার সিংহাসন পাতা সিংহাসনের উপর দুর্গার মাটির প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত মঞ্চের দু’ধারে সিঁড়িতে ব্রাহ্মণেরা উপবিষ্ট, পূজার অনুষ্ঠানাদির ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত প্রতিমার ডান হাত দিয়ে তিনি এক ভীষণাকৃতি অসুরকে বর্শাবিদ্ধ করেছেন, বাম হাতে একটি বিষাক্ত সাপের লেজসহ অসুরের ঝুঁটি ধরেছেন, সাপটি অসুরের বক্ষস্থল দংশন করছে বাকি আটটি হাত ডাইনে-বামে প্রসারিত, প্রত্যেক হাতে একটি করে মরণাস্ত্র তাঁর দক্ষিণ হাঁটুর কাছে একটি সিংহ এবং বাম হাঁটুর কাছে অসুর সিংহ দেবীকে বাহন করেছে মনে হয় ...পূজামণ্ডপের পাশের একটি বড়ো ঘরে নানারকমের উপাদেয় সব খাদ্যদ্রব্য প্রচুর পরিমাণে সাজানো ছিল সবই ইয়োরোপীয় অতিথিদের জন্য বিদেশী পরিবেশক ‘মেসার্স গান্টার অ্যান্ড হুপার’ সরবরাহ করেছিলেন খাদ্যের সঙ্গে বরফ ও ফরাসী মদ্যও ছিল প্রচুর মণ্ডপের অন্যদিকে বড়ো একটি হলঘরে সুন্দরী সব পশ্চিমা বাইজিদের নাচগান হচ্ছিল এবং ইয়োরোপীয় ও এদেশি ভদ্রলোকেরা সোফায় হেলান দিয়ে, চেয়ারে বসে সুরা-সহযোগে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিলেন বাইরেও বহু সাধারণ লোকের ভিড় হয়েছিল বাইজিদের গান শোনার জন্য গানের হিন্দুস্থানী সুর মণ্ডপে সমাগত লোকজনদের মাতিয়ে তুলেছিল আনন্দে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলতে থাকে পাঁচদিন পরে ষষ্ঠির দিন দেবী জেগে ওঠেন এবং সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিনে মহাসমারোহে তাঁর পূজা হয় নবমীর দিন বলিদান হয় এবং এক কোপে মুণ্ডচ্ছেদ করতে না পারলে বলি নাকি সার্থক হয় না’ সবশেষে তিনি লেখেন‘...আর ধনিক বাঙালীবাবুরা পূজার সময় যে পরিমাণ অর্থব্যয় করেন তার হিসেব নেই
কলকাতার ভয়াবহ জ্বরের কথাও এসেছে তাঁরই সঙ্গে... "“In July, my husband was seized with one of those terrific Indian fevers, which confined him to his bed about fourteen days; he got up looking very transparent and ghostlike, and in a state of great debility, from which he was some time in recovering. Happily, he was saved from a premature epitaph.”
সেকালের বিখ্যাত বাইজির নাম ছিল ‘নিকি’ অল্প বয়সি এটা সেই সময়ের কথা যখন ৪-৫ টাকা আয়ে একটি একান্নবর্তী সংসার চলে যেত সেই সময়ে এক বাবু নিকিকে হাজার টাকা মাস খরচা দিয়ে নিজের কাছে রেখেছিলেন ১৮১৯ সালের ১৬ অক্টোবর ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল‘শহর কলিকাতায় নিকি নামে এক প্রধান নর্ত্তকী ছিল কোনও ভাগ্যবান লোক তাহার গান শুনিয়া ও নৃত্য দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া এক হাজার টাকা মাসে বেতন দিয়া তাহাকে চাকর রাখিয়াছেন’ ১৮২৩ সনে ‘নেক্কী’-কে (নিকি) পুজো বাড়িতে নাচতে দেখা যায় নাচ-গান, খানাপিনা নিয়ে পূজামণ্ডপে মাতলামি, গণ্ডগোল যে হত না, তা নয়! ১৮১৮ সালের ১৭ অক্টোবর ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকা ‘দুর্গোৎসব’ শিরোনামে লিখল--- ‘গত সপ্তাহে এই উৎসব হইয়াছে কলিকাতার অনেক ভাগ্যবান লোক বিস্তর টাকা ব্যয় করিয়া যথেষ্ট আমোদ করিয়াছে কিন্তু আমরা শুনিতেছি যে এক ঘরে কোনও ইংলন্ডীয় লোক বড়ো ঝগড়া উৎপন্ন করিয়াছিল তাহাতে কলিকাতার ইঙ্গরাজি সমাচার পত্রে তাহাদিগকে অনেক লজ্জা দেওয়া হয়েছে’ ১৮২৩-এ রাজা রামমোহন রায়ের মানিকতলার বাগানবাড়িতে হয়েছিল নর্তকী নিকির নাচ এই আসরের বর্ণনা এবং নিকির খবর ফ্যানি পার্কস-এর ভ্রমণ কাহিনিতে আছে: 1823 May The other evening we went to a party given by Ram Mohun Roy, a rich Bengalee Baboo, the grounds, which are extensive, were well illuminated, and excellent fireworks displayed. In various rooms of the house natch-girls were dancing and singing. The style of singing was curious; at times the tunes procieded finely from their noses; some of the airs were very pretty, one of them was NIKHI, the catalani of the East.” বাংলার অভিজাতদের অন্দরমহল নিয়ে পার্কস লিখছেন --- মার্চ ১৮২৬কলকাতায় এক ধনী হিন্দুর বাড়িতে নাচ দেখার নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম, অনুষ্ঠানের শেষে বাবু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বাড়ির বউ-ঝিদের সঙ্গে দেখা করতে চাই কিনা বিশাল পর্দা সরিয়ে তিনি ভেতরে যেখানে ঢুকলেন, সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার; দু’জন মহিলা আমাকে হাত ধরে অনেকটা সিঁড়ি বেয়ে নিয়ে গেলেন একটি আলোকিত ঘরে, সেখানে তার স্ত্রী ও অন্যান্য মহিলারা আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন দু’জন মহিলা খুবই সুন্দরী, তাদের পোশাক দেখে বুঝলাম কেন তাঁদের স্বামীরা ছাড়া আর কেউ অন্দরে ঢুকতে পারেন না ফিনফিনে বেনারসি কাপড়ে জরির পাড়, তাদের শরীরে দু’প্যাঁচ করে জড়িয়ে কাঁধের ওপরে ফেলা পোশাকটা নিতান্তই স্বচ্ছ, শরীরের কিছুই প্রায় ঢাকে না, গলা ও হাত ভর্তি গয়না
কলকাতার চড়কের কথাও উঠে এসেছে তাঁর জার্নালে, আর কী দারুণ সে বর্ণনা, যেন ছবি--- ‘চড়ক পূজা।। একদিন ঠিক করলাম (চৈত্রসংক্রান্তির দিন) কালীঘাটে মন্দির ও জাগ্রত কালী দর্শন করতে যেতে হবে চৌরঙ্গি থেকে প্রায় মাইল দেড়েক দক্ষিণে কালীঘাটের কালীমন্দির ঘোড়াগাড়ি করে কালীঘাট যাত্রা করলাম সন্ধ্যাবেলা পথে এক দৃশ্য দেখলাম, উৎসবের দৃশ্য অবিস্মরণীয় দেখলাম হাজার হাজার লোক রাস্তায় ভিড় করে রয়েছে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কীসের ভিড়?’ শুনলাম, চড়ক পূজার উৎসব হচ্ছে দীর্ঘ একটা কাষ্ঠদন্ডের মাথায় হুকবিদ্ধ হয়ে ঘুরপাক খাওয়া চড়ক পূজার প্রধান বৈশিষ্ট্য কতরকমের লোক যে কত বিচিত্র বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে জড়ো হয়েছে সেখানে তার ঠিক নেই তার মধ্যে সর্বপ্রথম স্বচক্ষে দেখলাম এদেশের বৈরাগী সাধুদের সর্বাঙ্গে তাদের ভস্ম মাখা, মাথায় লম্বা লম্বা জটা, পরনে একটুকরো কাপড় জড়ানো, প্রায়-নগ্ন বলা চলে একজন বৈরাগী তার শীর্ণ হাত দুটি মাথার উপর তুলে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে রয়েছে, অসাড় হয়ে গেছে হাত ও দেহ, পাখির মতন আঙুলের ধারালো লম্বা লম্বা নখগুলি হাতের পিছন থেকে বিঁধে ফুঁড়ে বেরিয়েছে ভিতরের তেলো দিয়ে ভগবান বিষ্ণুর কাছে মানতের জন্য সে এই ভয়ংকর ক্লেশ স্বীকার করছে নখগুলি প্রথমে বিদ্ধ হবার যন্ত্রণা হয় নিশ্চয়, কিন্তু পরে হাত অসাড় হয়ে গেলে আর কোনও যন্ত্রণা থাকে না এই শ্রেণীর আত্মপীড়নদক্ষ সাধুকে সকলে খুব পুণ্যবান মনে করে, কারণ ভগবানের পরম প্রিয়পাত্র না হলে এরকম কষ্টস্বীকার করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় তাই দেখলাম সকলে ভক্তি-গদগদচিত্তে তার সাধুত্বের তারিফ করছে খুব আরও কয়েকজন সাধু মাথার উপরে এক হাত তুলে চক্ষু উলটে বসেছিল একদল নীচ জাতের হিন্দু বাহুর মাংসপেশী এফোঁড়-ওফোঁড় ছিদ্র করে তার ভিতর দিয়ে বাঁশের লাঠি ও নৌকাশলাকা পুরে ঢোলের বাজনার তালে তালে বীভৎস ভঙ্গিতে তাণ্ডবনৃত্য করছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ লৌহশলাকা দিয়ে জিব ফুঁড়ে বাহাদুরি দেখাচ্ছিল জনতার কাছে কয়েক গজ দূরে তিনটি বড়ো বড়ো কাঠের খুঁটি মাটিতে পোঁতা ছিল প্রায় তিরিশ ফুট লম্বা এক-একটি খুঁটি, তার মাথায় আড়ে একটি বা দুটি করে বাঁশ বাঁধা যে খুঁটির মাথায় একটি বাঁশ বাঁধা তার একদিকে একটি লোক ঝুলে রয়েছে, আর একদিকের লম্বা দড়ি ধরে নিচের লোকজন খুঁটির চারিদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং উপরে ঝুলন্ত লোকটিও তার ফলে ঘুরছে বন্ বন্ করে যে-খুঁটির মাথায় দুটি বাঁশ ক্রস করে বাঁধা আছে তাতে আরও বেশি লোক ঘুরছে আশ্চর্য ব্যাপার হল, উপরের লোকগুলি হুকবিদ্ধ হয়ে ঝুলছে ও ঘুরছে, এবং তাদের বুকে ও পিঠে সেই হুকগুলি বিঁধে রয়েছে উপরের লোকটি খুঁটির মাথায়, বাঁশের ডগায় ঘুরছে তো ঘুরছেই, আর নিচের লোকজন উন্মত্তের মতন তাদের পাক দিচ্ছে তো দিচ্ছেই ঘোরার শেষ নেই, পাকেরও শেষ নেই উপরে ঘুরছে যারা তারা বোধ হয় বেশি পুণ্যবান, কারণ একটি থলি ভর্তি করে ফুল-বাতাসা নিয়ে উপর থেকে তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং নিচের লোকজন মহা উল্লাসে সেগুলি কুড়িয়ে নিচ্ছে দেবতার প্রসাদের মতন কেউ কেউ বুকে-পিঠে কাপড় না জড়িয়েই হুকবিদ্ধ হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল প্রচুর পরিমাণে নেশা করে, গাঁজা-আফিম খেয়ে তাদের চোখমুখের চেহারা পিশাচের মতন ভয়ংকর দেখাচ্ছিল নীচ জাতের হিন্দুরা শুনেছি চড়কপূজার অত্যন্ত ভক্ত পূজা-উৎসবে যোগদানকারীদের মধ্যে তাদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি এরকম একটা পৈশাচিক ভয়াবহ উৎসব আর কোথাও দেখিনি এই ধরনের উৎসবে দুর্ঘটনা ঘটাও স্বাভাবিক চড়ক পূজায় শতকরা তিন-চারজন লোক মারাও যায় ধনী লোকেরা টাকাপয়সা দিয়ে গাজনের সন্ন্যাসীদের চড়কপাঠে চরকিপাক খাওয়ান পুণ্যার্জনের জন্য এইভাবে প্রকসি দিয়েও নাকি পুণ্যলাভ করা যায় উৎসবে ছ্যাকরা গাড়ি ভর্তি হয়ে বাইজিরাও এসেছিল অনেক যেমন তাদের পোশাক তেমনি নাচ-গানের ভঙ্গি যাঁর রুচি আছে তাঁর পক্ষে বরদাস্ত করা কঠিন কিন্তু এই বাইজিনাচ দেখার জন্য বহু হিন্দু ভদ্রলোকের ভিড় হয়েছিল উৎসবে
তবে আমার সবচেয়ে মন কেমনকরা লেগেছে তাঁর আয়ার গল্প একবার ব্যারাকপুরে গিয়েছেন তাঁরা সেখানে এক চিড়িয়াখানায় নাকি বাঘ সিংহ আছে সঙ্গে হায়নাও আছে শুনে তাঁর আয়া এক বেলা ছুটি নিয়ে হায়না দেখে এল ফ্যানি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি শুধু হায়না দেখতে চিড়িয়াখানা গেলে কেন?’ আয়া জানাল, একবার তাঁর ছোটো মেয়েটাকে হায়না ধরে নিয়ে গেছিল লোকেরা তাড়া করে ধরতে পারেনি যখন ফিরে এল, সঙ্গে মেয়ের ছেঁড়াখোঁড়া দেহ ‘আমি কোনোদিন হায়না দেখিনি... আজ দেখতে গেলাম, কোন পশু আমার মেয়ের প্রাণ নিয়েছিল..

জেমস ফ্রেজার
শিল্পীঃ জেমস ফ্রেজার
জাতে স্কটিশ জেমস ফ্রেজার ১৮১৩-তে প্রথমবার কলকাতা আসেন উদ্দেশ্য কলকাতায় ব্যাবসা করে প্রচুর লাভ কামিয়ে দেশে ফেরা দেশে তাঁদের চিনির ব্যাবসার তখন হাঁড়ির হাল এদেশে এসে ফ্রেজার জাহাজের ব্যাবসায় বেশ কিছু আয় করেন সঙ্গে বন্ধু চিনারি আর উইলিয়াম হ্যাভেলের থেকে আঁকা শিখে তখনকার কলকাতার ছবিও আঁকেন ১৮২৬ সালে রডওয়েল এন্ড মার্টিন থেকে প্রকাশিত হয় ২৪ টি ছবিসহ (আটটি খন্ডে, প্রতি খন্ডে তিনটি ছবি) তাঁর বিখ্যাত বই Views of Calcutta and its environs.

ড্যানিয়েল

ড্যানিয়েল
-এর আঁকা ছবি
ড্যানিয়েল খুড়ো-ভাইপোর আঁকা সব থেকে বেশি সংখ্যক ছবি আছে ভিক্টোরিয়াতেই ১৭৮৫-তে যখন দেশ ছাড়েন, তখন টমাস ড্যানিয়েল-এর বয়স ৩৬, আর ভাইপো উইলিয়াম ড্যানিয়েল মাত্রই ১৬ পরের বছর তাঁরা চিন হয়ে কলকাতা পৌঁছন কলকাতার সব থেকে পুরোনো বেশ কিছু দৃশ্য আমরা দেখতে পেয়েছি এই ড্যানিয়েলদের দৌলতেই প্রাচ্যে আট বছর কাটিয়ে তাঁরা যে অজস্র ছবি এঁকেছিলেন, আজও তা রাজ-নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলে ভিক্টোরিয়ায় তাঁদের নামাঙ্কিত আলাদা গ্যালারি রয়েছে ১৭৮৬ সালে ফোলিও সাইজে ১২টি কলকাতার হাতে আঁকা ছবির এচিং নিয়ে ছাপা হয় টমাস ড্যানিয়েলের "Views in Calcutta"... এই বই শেষ করে তিনি ওজিয়াস হামফ্রেকে চিঠিতে লেখেন, The Lord be praised, at length I have finished my twelve views of Calcutta. The fatigue I have experienced in this undertaking has almost worn me out... It will appear a very poor performance in your land, I fear. You must look upon it as a Bengalee work. You know I was obliged to stand Painter, Engraver, Coppersmith, Printer and Printers Devil myself, it was a devilish undertaking but I was determined to see it through at all events.” Calcutta Chronicle পত্রিকায় ১৭৮৬ সালের ১৭ জুলাই এই বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশ পেয়েছিল পরের বছর মে মাসে একই পত্রিকার বিজ্ঞাপনে দেখতে পাই - “Mr. Daniell has completed six of the views and will deliver impressions as soon as is possible.” মানে ১৭৮৬-তে কাজ শুরু হলেও বইটি সেই বছর প্রকাশ পায়নি ড্যানিয়েল নতুন দেশে এসে এনগ্রেভিং-এর পদ্ধতি শিখেছিলেন, তাই একটু সময় তো লেগেইছে এই বইয়ের বিন্যাসে টমাস হজের আঁকা ইংল্যান্ডের Select Views-এর প্রভাব স্পষ্ট প্রসঙ্গতঃ জানাই সেই বইটি প্রকাশ পেয়েছিল ১৭৮৫-র মে মাসে, ফলে ড্যানিয়েলের পক্ষে বইটি দেখা অসম্ভব ছিল না

চার্লস ও ডয়লি
শিল্পীঃ চার্লস ডয়লি
অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে অনেক ব্রিটিশ শিল্পী ভাগ্যান্বেষণে আমাদের দেশে আসছিলেন তাঁদের কাজে তৎকালীন ভারতীয় নিসর্গ ও জীবনধারার বেশ কিছু পরিচয় ধরা পড়েছে প্রথম এসেছিলেন টিলি কেটল ১৭৬৯ সালে তিনি মাদ্রাজে আসেন তার পর কলকাতায় আসেন ১৭৭১ সালে তার পর আসতে থাকেন জন জোফালি (১৭৮৩-৮৯), আর্থার ডেভিস (১৭৮৬-৯৫), জর্জ ফ্যারিংটন, টমাস হিকি, টমাস ও উইলিয়াম ডানিয়েল, ফ্রাঁসেস্কো রিনল্ডি, জর্জ চিনারি (১৮০২-২৫), রবার্ট হোম, জন স্মার্ট (১৭৮৫-৯৫), ওজিয়াস হামফ্রে (১৭৮৫-৮৭), স্যামুয়েল অ্যান্ড্রুজ (১৭৯১-১৮০৭), ডায়না হিল প্রমুখ শিল্পী কলকাতার চিত্রকলার পরবর্তী বিকাশে তাঁদের যথেষ্ট অবদান আছে চার্লস ডয়লির জন্ম ভারতে ১৭৮১-তে তাঁর পিতা ব্যারন স্যার জন হেডলি ডয়লি মুর্শিদাবাদের রাজদরবারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি হিসাবে যুক্ত ছিলেন চার্লস ১৭৮৫-তে ইংল্যান্ড যান এবং সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৭৯৮-এ ভারতে ফিরে আসেন এর পর তিনি কোম্পানির আমলা হিসাবে নানা জায়গায় নানা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ডয়লির ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয়েছিল বেশ অল্প বয়সেই পাশাপাশি শিল্পী চিনারীকে ঢাকায় বন্ধু হিসাবে পেয়ে তাঁর কাছে ছবি আঁকার তালিমও নিয়েছিলেন কিছুকাল চিনারীর পাশাপাশি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এলিজাবেথ জেন রসকেও আমরা তাঁর মেন্টর হিসাবে ভাবতে পারি একদা তিনি চালু করেছিলেন আর্টিস্ট সার্কেল বা শিল্পীচক্র ও লিথোগ্রাফিক প্রেস সেইবেহার স্কুল অফ এথেন্সপ্রেস থেকে তাঁর আঁকা ঢাকা, কলকাতা, গয়া ইত্যাদি নানা জায়গার লিথোগ্রাফিক ছবি ছাপা হত তিনি ভারতের নিসর্গ ও জনজীবন নিয়ে প্রচুর ছবি আঁকেন এই প্রদর্শনীতেভিউজ অব ক্যালকাটা: অ্যান্ড ইটস এনভায়রনশীর্ষক যে ছবিগুলি দেখছি লিথোগ্রাফের অ্যালবাম হিসাবে সেগুলি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৮ সালে লন্ডনের ডিকিনসন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে ১৯৩২ সালে এগুলি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে উপহার দিয়েছিলেন মিসেস জর্জ লিয়েল তাঁর স্বামীর স্মৃতিতে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার নিসর্গ ও জীবন কেমন ছিল, তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা আমরা এই ছবিগুলিতে পাই
তখন ক্যামেরা ছিল না তাই সেই সময়ের দৃশ্য দলিল হিসেবে এই ছবিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম ডয়লি-র আঁকার হাতটিও খুব নিপুণ ছিল অনুপুঙ্খ স্বাভাবিকতায় যে দৃশ্যাবলি তিনি চিত্রপটে লিপিবদ্ধ করেছেন তথ্য ছাড়া তার নান্দনিকতাও খুবই সমৃদ্ধ এত দিন পরও ছবিগুলির উজ্জ্বলতা খুব বেশি কমেনি ছবিগুলি দেখতে দেখতে তখনকার কলকাতার সঙ্গে এখনকার কলকাতার তুলনা করলে যে কেউই বিস্মিত হবেন
তাঁর ছবির কিছু বিখ্যাত সংকলনঅ্যান্টিকুইটিস অফ ঢাকা’ (১৮১৭), ‘দ্য বেহার অ্যামেচার লিথোগ্রাফিক স্ক্র্যাপ’ (১৮২৯), ‘ভিউজ অফ ক্যালকাটা অ্যাণ্ড ইটস এনভাইরনস’ (১৮৪৮), ‘স্কেচেস অফ আ নিউ রোড ইন আ জার্নি ফ্রম ক্যালকাটা টু গয়া’ (১৮৬০) তাঁর একটি হাসির কবিতাটুমরো দ্য গ্রিফিন’-এও আমরা পাই সেই অদ্ভুত ইওরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর আঁকা ঢাকা ও পাটনার ছবিগুলিতে রয়েছে সেইসব অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষের নানান রূপ কিন্তু তারই পাশাপাশি কলকাতার ছবিগুলিতে আছে যথেষ্ট জনসমাগম কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ আবার কোনো সৌধের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেএমনই সব দৃশ্য ডয়লির ছবিতে আমরা অন্যান্য ব্রিটিশ শিল্পীদের থেকে একটু বেশি ভারতীয় গন্ধ অনুভব করি তা হয়তো তাঁর এ দেশের জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠারই ফলশ্রুতি তাঁর ছবিতে সাহেবসুবোর চেয়ে যেন নেটিভরাই বেশি জায়গা জুড়ে আছে সেই সময়কার জামাকাপড়, যানবাহন সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায় তাঁর ছবি থেকে পাশাপাশি স্থানীয় পশুপাখিও তাঁর ছবিতে জায়গা করে নিয়েছে মন্দির মসজিদ গির্জার সুন্দর রূপও তাঁর ছবিতে ফুটে উঠেছে বরং সরকারি কর্মচারী হয়েও সরকার বাহাদুরের কাছারি বাড়ি ইত্যাদি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি তাঁর ছবি যেন ভারতে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সাম্রাজ্য বিস্তারের এক নির্ভরযোগ্য দলিল গার্ডেনরিচ, ফোর্ট উইলিয়াম, ময়দান, চৌরঙ্গি, চিৎপুর বাজার, টালির নালা, শিবপুর, ব্যারাকপুর, ভবানীপুর তাঁর তুলিতে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ভাবতে আশ্চর্য লাগে বাঙ্গালির অতি আপন চড়ক পুজোও তিনি তাঁর তুলিকালিতে অতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন চার্চ এনট্রান্স টু দ্য ধর্মতলাছবিটিতে ধর্মতলা অঞ্চলের পথের দৃশ্য পথের পাশে একটি বড়ো চার্চ আকাশচুম্বী চূড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ স্থাপত্যের সুন্দর নিদর্শন তার দু’পাশে এক তলা ও দোতলা বাড়ি পথের উপর যানবাহন বলতে ঘোড়ার গাড়ি ও ঘোড়া কয়েকটি গরু ঘুরে বেড়াচ্ছে পথের উপর স্থানীয় মানুষ নানা কাজে রত অধিকাংশেরই খালি গা হাঁটুর উপর পর্যন্ত সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত অল্প কিছু মানুষ তার মধ্যেই ব্যস্ততার আভাসভিউ নিয়ার দ্য সারকুলার রোডছবিটিতে পথের পাশে ইটে তৈরি দুই স্তরের চার চালা হিন্দু মন্দির পাশে খড়ের ছাউনির কুঁড়ে ঘর ওপাশে অজস্র নারকেল গাছ পথের উপর একটি গরুর গাড়ি চাকা দুটি লক্ষণীয় চালকের খালি গা কিন্তু মাথায় পাগড়ি তখনকার সাধারণ মানুষ সকলেই মাথাটি আবৃত রাখতেনগভর্নমেন্ট হাউজছবিতে সুন্দর স্থাপত্যের সাদা প্রাসাদ সামনের ময়দানে যানবাহন বলতে পালকি ও ঘোড়া একটি মানুষে টানা রিকশাও রয়েছে আর আছে মানুষ সম্ভ্রান্ত ও দরিদ্র বোঝা যায় পোশাকের ব্যবধানে তখনকার দরিদ্র মানুষ কমই শরীর বস্ত্রাচ্ছাদিত করতেন শহরের ভিতর তখন গ্রামের একটা আবহ ছিলগার্ডেন রিচবাটাউন অ্যান্ড পোর্ট অফ ক্যালকাটা’-র ছবির গঙ্গা তীরবর্তী নিসর্গ খুবই মনোগ্রাহী গঙ্গার উপর নৌকা ও স্টিমারের নানা সমারোহ তীরে ইংরেজ ও দেশীয় মানুষদের সমাবেশে তখনকার জীবনের দুটি পর্যায় এরকম অজস্র ছবির ভিতর দিয়ে তৎকালীন কলকাতা ও আশেপাশের অঞ্চলের অতীত স্মৃতিতে পৌঁছে যেতে পারি আমরা
ডয়লি যে সময় পাটনায় থাকতেন সে সময় পাটনার শিল্পীদের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক জোয়ার আসে স্থানীয় ধোপা-নাপিত-ঝি-চাকর-জেলে জায়গা করে নিতে থাকে তাঁদের ছবিতে ডয়লিও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না তাঁর লিথোগ্রাফেও আমরা দেখতে পাই পাটনার গ্রাম শহরের নানান দৃশ্য গানবাজনার আসর, হাতি, বিভিন্ন পাখপাখালি ইত্যাদি জিনিস উঠে এসেছে তাঁর ছবিতে এই সময় বাঙালি শিল্পী জয়রাম দাস তাঁর সহকারী হিসাবে কাজ করতেন তাঁর সেইসব কাজ দেখে ক্যাপ্টেন স্মিথও মুগ্ধ হয়েছিলেন, স্মিথ নিজেও ছিলেন একজন বিখ্যাত শিল্পী এর পাশাপাশি ড্যানিয়েলদের মতো ডয়লিও ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়ে ছবির রসদ সংগ্রহ করেছিলেন মুঘল ও দ্রাবিড়ীয় সভ্যতার নানান খুঁটিনাটি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল নানান পেন্সিল স্কেচ, ওয়াশ, জলরং, তেলরঙে ধরা আছে সেসব ভ্রমণকাহিনি

বালথ্যাজার সলভিনস
বালথ্যাজার সলভিনস-এর আঁকা দুর্গাপূজার ছবি
আঠারো শতকের বেলজিয়ান শিল্পী ফ্রাঁসোয়া বালথাজার সলভিনস কলকাতায় এসেছিলেন ও এখান থেকেই তাঁর আঁকা ছবির যে অ্যালবাম প্রকাশিত হয় [১৭৯৯] তাতে দুর্গাপূজার ছবিও ছিল তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম লন্ডন থেকে ১৮০৭ সালে ও তৃতীয়টি ১৮১২ সালে পারী থেকে [চার খন্ডে] প্রকাশিত হয়, তৃতীয় খন্ডটির নাম 'Les Hindous' এক রঙে ছেপে ছবিগুলোতে হাতে রং করা হয়েছিল রং করার এই কাজ এদেশীয় শিল্পীদের দিয়েই করানো হয়েছিল বালথাজার সলভিনস সে সময় যে সব মানুষজন, জন্তুজানোয়ার, উৎসব, সতীদাহ আর যানবাহনের ছবি এঁকেছেন - তা তাক লেগে যাওয়ার মতোই তাঁর মতো এত ডিটেইল কাজ আগে পরে কোনও শিল্পী করেননি দক্ষ অ্যান্থ্রোপলজিস্টের মতো তখনকার কলকাতাকে যেন ক্যামেরার চোখে দেখেছেন তিনি তাঁর ছবি ছাড়া কলকাতা চর্চা সম্ভবই না... অক্সফোর্ড থেকে কিছুদিন আগে বইটি আবার মুদ্রিত হয় সঙ্গে রবার্ট হারগ্রেব সাহেবের টিকা

জন জোফানি
জোফানি ও তাঁর আঁকা ‘দ্য লাস্ট সাপার
শেষ করি দারুণ এক বিতর্ক দিয়ে লাস্ট সাপার, তাও আবার খোদ কলকাতার বুকে? আর তা নিয়ে মামলা, মোকদ্দমা, কেচ্ছা? আজ্ঞে হ্যাঁ, তাও হয়েছিল এককালে প্রভু যিশু তাঁর বারোজন শিষ্যকে নিয়ে শেষবারের মতন বসেছেন ভোজসভায় পরিবেশ থমথমে প্রভু ভবিষ্যৎবাণী করলেন, উপস্থিত শিষ্যদের মধ্যেই একজন তাঁকে তুলে দেবেন মৃত্যুদূতের হাতে রুটি ও মদ দিয়ে ভোজন করতে করতে যিশু জানালেন এই রুটি তাঁর দেহ আর মদ তাঁর রক্ত ভবিষ্যৎবাণী মিলল তিরিশটা রুপোর মুদ্রার বদলে জুডাস ইস্কারিওট তাঁকে চিনিয়ে দিল শত্রুপক্ষের কাছে বাইবেলের এমন নাটকীয় দৃশ্য এঁকেছেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি থেকে তিনতোরেত্তো - অনেকেই তবে কলকাতায় বসে আঁকা জন জোফানি সাহেবের ছবির বিতর্কের পাশে এরা কেউ আসে না
রয়্যাল আকাদেমির প্রথম দিকের সদস্য যোহান জফালির জন্ম ১৭৩৩ সালের ১৩ মার্চ জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ১৭৬০ সালে ইংল্যান্ডে পাকাপাকিভাবে চলে আসার সময় অন্য অনেককিছুর সঙ্গে নিজের নাম পদবি বদলে জন জোফানি করে নিলেন তিনি নিজেই রোমে ছবি আঁকা শিখেছিলেন ভেবেছিলেন ইংল্যান্ডে এসে ভাগ্য খুলবে কিন্তু বিধি বাম কাজ মিলল না আলাপ হল স্টিফেন রিম্বস্ট নামে এক ঘড়িওয়ালার সঙ্গে, জুটল ঘড়ির ডায়ালে নকশা আঁকার কাজ কিন্তু তাতে মন ভরে কই? সব ছেড়েছুড়ে টটেনহ্যাম কোর্ট রোডে নিজের স্টুডিও খুলে বসলেন দরজার সামনে বউয়ের দু’খানা পোরট্রেট ওই দুটোই তাঁর বিজ্ঞাপন কীভাবে যেন সে দুটো চোখে পড়ে গেল বিখ্যাত থিয়েটার প্রযোজক ডেভিড গ্যারিকের তিনি জোফানিকে বরাত দিলেন থিয়েটারের অভিনেতাদের অঙ্গভঙ্গি, প্রতিকৃতি আঁকতে সেগুলোই হবে নাটকের বিজ্ঞাপন জোফানির ভাগ্য ফিরল এমন সময় আর এক কাণ্ডলাইফ স্কুলনামে একটা ছবিতে তিনি রানির তরুণী অবস্থার ছবি আঁকলেন আর সঙ্গে তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকের ছবি ব্যস! আর যায় কোথায়? রাজা দ্বিতীয় জর্জ তো খেপে বোম ছবি আঁকা নিয়ে এই ধরনের বিতর্ক চিরকাল তাঁর সঙ্গী ছিল সেই গল্পই বলব
ধীরে ধীরে তাঁর ছবির নামডাক ছড়াতে লাগল ১৭৮৩ নাগাদ পঞ্চাশ বছর বয়সি জোফানি ঠিক করলেন ভারতে আসবেন ভারতে এসেই জোফানি প্রথমে দেখা করলেন তাঁর শিল্পী বন্ধু হজেসের সঙ্গে এই হজেস ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছের লোক তিনিই জোফানিকে হোয়াইট টাউনে একটা বাড়ির ঘরদোর গুছিয়ে দিলেন দিন পনেরো পর থেকেই কলকাতার অভিজাতদের ভিড় লেগে গেল জোফানির স্টুডিওতে ছবি আঁকানোর জন্য পত্রিকায় তাঁকেএ পেন্টার অফ দ্য ফার্স্ট ক্লাসবলে উল্লেখ করা হল খুব দ্রুত ছবি আঁকতে পারতেন জোফানি একের পর এক এঁকে গেলেন ইংরেজ রাজপুরুষদের ছবি, যাদের মধ্যে চিফ জাস্টিস এলিজা ইম্পে আর স্বয়ং গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-ও আছেন হেস্টিংস-এর সঙ্গে ভারতের নানা জায়গা ঘুরলেন জোফানি আঁকলেন চুঁচুড়াতে বাঘ শিকারের ছবি, লখনউতে আসফউদ্দৌলার রাজত্বের অজস্র ছবি রোজগার হল অনেক ফিরে এলেন কলকাতায় তখন গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস যাবার আগে হেস্টিংস এক গুরুতর কাজ চাপিয়ে দিয়েছেন জোফানির উপরে সেন্ট জন গির্জার জন্য একটা অল্টারপিস আঁকতে হবে যার বিষয় হবেদ্য লাস্ট সাপার জোফানি সঙ্গে সঙ্গে রাজি মাত্র ছয় সপ্তাহে শেষ করলেন সেই ছবি ১৭৮৭ সালের ৯ এপ্রিল চার্চকে ছবিটা উপহার দিলেন জোফানি
জুন মাসে ছবিটা টাঙানো হতেই শুরু হল বিতর্ক আর হাসি সমালোচনার ঝড় প্রথমে তো ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে সমালোচনা গাদিন হ্যামিলটন লিখলেন,পটভূমিকায় দেখা যাচ্ছে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারছে পূর্ণিমার চাঁদ, এদিকে চরিত্ররা বসে আছেন এক বারান্দায় যেখানে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল পেটারের তলোয়ারটা ঝুলছে একটা পেরেকের থেকে, যেন এক সাধারণ পিওনের তলোয়ার টেবিলের সামনের পানপাত্রটা পিকদানির মতো দেখতে…” ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু এসব ছাপিয়ে বিতর্ক শুরু হল অন্য জায়গায় ছবির প্রতিটা মানুষই সেদিনের কলকাতার বড়ো চেনা আর বিখ্যাত মানুষ জীবন্ত আর বাস্তব প্রভু যিশু যেন অবিকল কলকাতার গ্রিক যাজক পার্থেনিও, প্রভুর কাঁধে মেয়েলি কায়দায় হেলান দেওয়া সেন্ট জন হলেন পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট মি. ব্ল্যাকোয়ার (যিনি খৃষ্টধর্মকে পাত্তাও দিতেন না, আর চরিত্র রক্ষার দিকেও বেশ উদাসীন ছিলেন) বাকিরাও সেই সব অভিজাতদের মধ্যে যারা একসময় জোফানিকে পয়সা দিয়ে নিজেদের ছবি আঁকিয়েছিলেন শুরু হয়ে গেল ছবি নিয়ে হাসি ঠাট্টা কিন্তু হাসতে পারলেন না একজন তাঁর নাম উইলিয়াম টুলো কলকাতার নামজাদা নিলামকারী বিশ্বাসঘাতক জুডাসের মুখের জায়গায় টুলোর মুখ বসিয়ে দিয়েছেন জোফানি কেউ কেউ বলেন এই টুলো সাহেবের থেকে নাকি জোফানি কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন কান মুচড়ে সে টাকা আদায় করেন টুলো এই ছবি তাঁরই প্রতিদান টুলো ছেড়ে দেবার মানুষ না তিনি সোজা মানহানির মামলা করলেন জোফানির নামে জোফানির ভাগ্য ভালো সরকার তাঁর পক্ষে ছিল মামলার জল বেশিদূর গড়ায়নি তবে বেশ কিছুদিন ক্যালকাটা গেজেটের পাতা ভরেছিল এই ছবি আর তা নিয়ে বিতর্কের খবরে
১৭৮৯-এ দেশে ফিরে গেলেন জোফানি শরীর ভেঙে গেছে অনেকদিন পরে আবার আসতে চেয়েওছিলেন প্রাণের শহর কলকাতায় তখন তিনি বৃদ্ধ পারেননি এখনও কিরণ শঙ্কর রায় রোডের ওপর সেন্ট জন চার্চে ঢুকলেই আপনার মনে হবে বাইরের কোলাহল, যানবাহনের আওয়াজ সব যেন এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেছে ঘুরতে ঘুরতে গির্জা প্রাঙ্গনে দেখতে পাবেন জোব চার্নকের সমাধি, বেগম জনসনের সমাধি, রোহিলা যুদ্ধের স্মারক চার্চের দরজা খুলে ঢুকে পড়ুন সামনে তাকালেই চোখে পড়বে সেই ছবি শিষ্য পরিবৃত প্রভু যিশু সামনেই বসে আছেন জুডাস, নাকি টুলো সাহেব? তাঁর মুখে অদ্ভুত এক মানসিক টানাপোড়েনের আভাস খাস কলকাতায় সবার চোখের আড়ালে প্রায় অজ্ঞাত অবস্থায় পড়ে আছে জোফানির সবচেয়ে বিতর্কিত ছবি লাস্ট সাপার  লিওনার্দোর লাস্ট সাপারের চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই সে এককালে একা হাতে কলকাতার গোটা ইংরেজ সমাজকে সে সমূলে  নাড়িয়ে দিতে পেরেছিল
_____
ছবিঃ সংগৃহীত

3 comments:

  1. অসামান্য লেখা। খুব ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  2. অনবদ্য লেখা। কত কী জানতে পারলুম!

    ReplyDelete