গল্পের ম্যাজিক:: রাষ্ট্রপতির মেডেল - কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়


রাষ্ট্রপতির মেডেল
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়

আমাদের পাড়ার ব্রজেনবাবু আর নীতিশবাবুকে নিয়ে গল্পের আর শেষ নেই ওঁদের নিয়ে আমি বেশ কিছু গল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ভয়ে ভয়ে লিখেছি ভয়ে ভয়ে বলছি কারণ সেই লেখা কোনোক্রমে ওঁদের চোখে পড়লে আমি আর আস্ত থাকব না
প্যাকাটি কাঠির মতো চেহারার নীতিশবাবু আর দশাসই চেহারার ব্রজেনবাবু আমাদের পাড়ায় বসবাস করছেন তিন পুরুষ ধরেএকেবারে মুখোমুখি ওঁদের বাড়ি। কিন্তু ব্রজেনবাবুর সঙ্গে নীতিশবাবুর পাঁচ বছর বয়স থেকে এখন ষাট পেরিয়েও ভয়ানক শত্রুতা। পাঁচ বছর বয়সে প্রথম শত্রুতার সূত্রপাত হয়েছিল ডাংগুলি খেলা থেকে। সেই ইস্যু বাড়তে বাড়তে এখন একশো ষোলোতে এসে দাঁড়িয়েছে ব্রজেনবাবু নীতিশবাবুকে ফড়িং’ বলে ডাকেন আর নীতিশবাবু ব্রজেনবাবুকে বলেন হাতি অথচ ব্রজেনবাবু আর নীতিশবাবুর চোখের আড়ালে দু’বাড়ির সম্পর্ক বেশ ভালো। ব্রজেনবাবুর ভাইপো টিটো আর নীতিশবাবুর ভাগ্নে বিল্টু গলায় গলায় বন্ধুদু’জনেই এক স্কুলে পড়ে থার্ড বেঞ্চে পাশাপাশি বসে টিটো আর বিল্টু। জেঠু আর মামার চোখের আড়ালে ওরা আপ্রাণ চেষ্টা করে এই ভয়ংকর শত্রুতার থেকে উদ্ভূত যাবতীয় অপ্রীতিকর পরিস্থিতিকে কীভাবে সামাল দেওয়া যায়
আজ সকাল থেকেই পাড়াতে বেশ শোরগোল পড়ে গিয়েছে। খবর রটেছে নীতিশবাবু নাকি রাষ্ট্রপতির মেডেল পাচ্ছেন। এই খবরের দুটো অভিঘাত। এক, পাড়ার সবাই ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছে না নীতিশবাবু কোন কৃতিত্বের জন্য এই মেডেল পাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বের জন্য নাগরিকদের এই মেডেল দেন। মিলিটারি, পুলিশ থেকে আরম্ভ করে সমাজসেবা, সিনেমা, গানবাজনা, সাহিত্য, খেলাধুলো ইত্যাদি নানান ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী কাজের জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার দেন। সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু নীতিশবাবু করেছেন বলে কারও জানা নেই। অথচ খবরটা নাকি খাঁটি। সকাল ছ’টার সময় রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকে নীতিশবাবুর ল্যান্ডলাইনে ফোন করে খবরটা জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিঘাতটা সাংঘাতিক। এই খবর কানে পৌঁছনো মাত্র ব্রজেনবাবু থমথমে মুখে বিছানার ওপর গুম মেরে বসে রয়েছেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা ছেড়ে এখনও মাটিতে পা রাখেননি। মাথা দিয়ে আগুন ভাপ বেরোচ্ছে। আইসব্যাগ দিতে হচ্ছে। মাঝেমাঝে ব্রজেনবাবু হুঙ্কার ছাড়ছেন, “অবজেকশন,  অবজেকশন।”
খবরটা জানলেন কী করে ব্রজেনবাবু? নীতিশবাবু বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে খ্যানখ্যানে গলায় বক্তৃতা দিতে শুরু করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি ভবনে মেডেল গলায় পরে যে জবাবি ভাষণটা দেবেন, সেই বক্তৃতা। সেটা শুনেই ব্রজেনবাবুর ঘুম ভেঙেছে। সকালে মর্নিং ওয়াক করতে করতে পাড়ার অনেকেই সেই বক্তৃতা শুনেছে। জানতে চেয়েছে, কীসের বক্তৃতা। তখন নীতিশবাবু আরও জোর গলায় বলেছেন রাষ্ট্রপতির মেডেল পাওয়ার কথা। সেই থেকেই জানাজানি। যদিও জবাবি বক্তৃতার অংশবিশেষ শুনে অনেক মাথা চুলকেও কেউ অনুমান করতে পারেনি নীতিশবাবু মেডেলটা কোন কৃতিত্বের জন্য পাচ্ছেন।
যথারীতি ব্রজেনবাবুর বাড়ি থেকে অবনী ডাক্তারকে খবর দেওয়া হয়েছে। অবনী ডাক্তার গলায় স্টেথো আর হাতে প্রেশার মাপার যন্ত্র নিয়ে ব্রজেনবাবুর বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছেন, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে ঠিক সাহস পাচ্ছেন না। চিকিৎসা শুরু করার আগে উপসর্গর কারণটা জানা ভীষণ জরুরিএক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে কী  কারণে নীতিশবাবু মেডেল পাচ্ছেন সেটা জানা।
এরকম পরিস্থিতিতে পাড়ার অনেকে আজ অফিসে, স্কুল কলেজে যাবে না ঠিক করল। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে দেখে জেঠিমা টিটোকে বললেন, “যেভাবে হোক অবনী ডাক্তারকে বাড়িতে ঢোকা। নাহলে কিন্তু জেঠুর এবার খুব খারাপ একটা কিছু হয়ে যাবে। এদিকে আমি সকাল থেকে নারায়ণকে জল বাতাসা দিতে পারছি না।”
টিটোর একজনই ভরসা, বিল্টু। যদিও মুখোমুখি বাড়ি। বারান্দায় দু’জনে দাঁড়ালে এমনিই কথা বলা যায়। কিন্তু দু’জনে যে হরিহর আত্মা বন্ধু এটা ব্রজেনবাবু আর নীতিশবাবু ঘুণাক্ষরেও জানেন না। ওরা তাই ছাদের চিলেকোঠায় গিয়ে লুকিয়ে মোবাইলে কথা বলে। টিটো ছাদে এসে বিল্টুকে মোবাইলে ফোন করল।
“খবরটা সত্যি?”
“সত্যিই মনে হচ্ছে। আমাদের বাড়ির ল্যান্ডলাইনটা তো আজকাল আর ব্যবহারই হয় না। কেউ ফোনও করে না। সেই ল্যান্ডলাইনটা সকাল ছ’টায় বেজেছিল। বিছানায় শুয়ে অনেকেই শুনেছে। মামা গিয়েই ফোনটা ধরেছিল। তারপর মামা শুধু লাফাচ্ছে আর লাফাচ্ছে।”
টিটো উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “ঠিকই। শুনেছি সরকারি কাজে সব খবর ল্যান্ডলাইনেই আসে। কিন্তু উনি মেডেলটা পাচ্ছেন কীসের জন্য?”
“সেটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন। কিছুতেই বলছে না। বলছে অত্যন্ত গোপনীয়। আজ বাড়িতে প্রেস কনফারেন্স ডাকবে বলে সব তোড়জোড় করছেটিভি, খবরের কাগজের লোকেরা সব আসবে। তখন বলবে। এই তো এক্ষুনি আমাকে পাঁচশো টাকার একটা নোট দিয়ে বলেছে সুবল স্যুইটস থেকে রসগোল্লার হাঁড়ি নিয়ে আসতে। প্রেসের লোকদের খাওয়াবে।”
“সর্বনাশ। ততক্ষণ অপেক্ষা করা যাবে না। জেঠুর কিছু একটা হয়ে যাবে। অবনী ডাক্তারকে ইমিডিয়েটলি বাড়ির মধ্যে ঢোকাতে হবে। ডাক্তারবাবু সব শুনে কিছুতেই জেঠুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। আমাদের বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছেন।”
“তুই মান্টুদাকে ফোন কর।”
মান্টু হচ্ছে আমাদের পাড়ার সেক্রেটারি। এক ব্রজেনবাবু আর নীতিশবাবু ছাড়া মান্টুদাকে পাড়ার সবাই সমীহ করে চলে। মান্টুদার বাঁ হাতে একটা তামার বালা আছে। কেউ কেউ মান্টুদার বিরুদ্ধে কোনও কথা বললে বা গলা উঁচু করে কথা বললে মান্টুদা পাঞ্জাবির আস্তিনটা অল্প নামিয়ে বালাটা ধরে বাঁ হাতটা অল্প মোচড় দেয়। তাতেই এক মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে সব যেমন কীরকম নিশ্চুপ হয়ে যায়। পাড়ার সব সমস্যা মান্টুদা মিটিয়ে দেয়। সুতরাং টিটোকে মান্টুদাকে ফোন করতেই হল।
মোবাইলটা ধরেই মান্টুদা বলল, “আজকে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শরীরটা কীরকম ম্যাজ ম্যাজ করছে। বাড়ি থেকে বেরোব না, কথা বলতেও গলায় কীরকম ব্যথা ব্যথা করছে রে টিটো।”
টিটো জানে মান্টুদা হাতের বালা ঘুরিয়ে পাড়ার সব সমস্যার সমাধান করলেও ব্রজেনবাবু নীতিশবাবুর ঝামেলার থেকে শত হস্ত দূরে থাকে। আর এও বুঝল মান্টুদার কাছে খবর ঠিক পৌঁছিয়ে গিয়েছে।
“তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না মান্টুদা। আমাদের বাড়ির সামনে অবনী ডাক্তার ঘোরাঘুরি করছে। ওঁকে একবার বাড়ির ভেতরে পাঠিয়ে দাও।”
মান্টুদা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এটা সোজা কাজ। টিটো ছাদের পাঁচিলের কাছে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। অবনী ডাক্তার সেইরকমই অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। এবার বুক পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠল। প্রেশার মাপার যন্ত্রটা সামলে অবনী ডাক্তার ফোনটা কানে ধরেই কীরকম যেন কেঁপে উঠলেন। তারপর সোজা টিটোদের বাড়ির সামনে এসে কলিং-বেলটা চেপে ধরেই থাকলেন।
অবনী ডাক্তার ব্রজেনবাবুর ঘরে এলেন। পাথরের মূর্তির মতো ব্রজেনবাবু খাটের ওপর বসে রয়েছেনঅবনী ডাক্তার ঘেমে নেয়ে প্রেশার মাপলেন। প্রেশার সাংঘাতিক বেড়ে রয়েছে। সেটা আর বাড়লে সত্যিই বড়ো রকমের বিপদ হয়ে যেতে পারে। অনতিবিলম্বে একটা ইঞ্জেকশন দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সিরিঞ্জে ইঞ্জেকশন ভরেও অবনী ডাক্তারের হাত ভীষণভাবে কাঁপতে থাকল। অতীতে একবার এরকম স্ট্যাচু হয়ে গুম মেরে থাকা ব্রজেনবাবুকে ইঞ্জেকশন দিতে যাওয়ার সময় ব্রজেনবাবু অবনী ডাক্তারকে কামড়ে দিয়েছিলেন।
এর মধ্যে আরও ভয়ংকর খবর এসে পড়ল। অবশেষে জানা গেল নীতিশবাবু কেন রাষ্ট্রপতির মেডেল পাচ্ছেন। সাহসিকতার জন্য। সেটা নাকি উনি নিজেও ভাবছিলেন এতক্ষণ, এই চরম গোপনীয় কারণটা আগে প্রেসকে বলবেন না পাড়ার লোককে। শেষ পর্যন্ত ওঁর বিবেক বলেছে, পাড়ার লোককেই আগে বলা উচিত। বারান্দায় এসে খ্যানখ্যানে গলায় সেটা ঘোষণা করে দিলেন।
ব্যস, অবনী ডাক্তার সবে ইঞ্জেকশনের সূচটা ফুটিয়ে ওষুধটা পুশ করছেন এমন সময় নীতিশবাবু বারান্দায় এসে ‘বল বীর বল উন্নত মম শির...’ আবৃত্তি করে ঘোষণটা করে দিলেন। কেঁপে উঠে ব্রজেনবাবু হুঙ্কার ছাড়লেন, “ফড়িং আর সাহসিকতা? সত্যিকারের ফড়িং-রাও টিকটিকিকে অত ভয় পায় না, যত ও পায়।”
নীতিশবাবুও ছেড়ে কথা বলার লোক নন। পালটা চিৎকার করলেন, “হাতি যে আরশোলাকে এত ভয় পায় সে সত্যিকারের হাতিরা দেখলে লজ্জায় আর লোকালয়ে আসবে না। আরে বাবা ছোটোবেলা থেকে আমি অমিত সাহসীযেবার পাড়ার কালো কুকুরটা পাগলে গেল কেউ তো সাহস করে কাছে আসতে পারেনি। এই একমাত্র আমি, এই বারান্দা থেকে লাঠি উঁচিয়ে দেখিয়েছিলাম। কোনও হাতির সেই সাহস হয়নি।”
বাকযুদ্ধ শুরু হল। সর্বনাশ! সর্বনাশ! এটা থামাতেই হবে। টিটো লাফাতে লাফাতে ছাদে এসে বিল্টুকে আবার মোবাইলে ফোন করল।
“ভাই, এবার কী হবে?”
“দাঁড়া, দাঁড়া। কিছু খবর জোগাড় করেছি। সেটা দিয়েই সমাধান বার করতে হবে।”
“কী খবর?”
“ল্যান্ড লাইনে তো সিএলআই নেই। তাই আমরা বুঝতে পারছিলাম না ফোনটা কোথা থেকে এসেছিল। টেলিফোন অফিসে ফোন করেছিলাম। ওরা বলল, লাইন টেস্ট করতে ফোন করেছিল। ফোনটা অনেকদিন ডেড ছিল।”
“আর নীতিশমামা সেটাকে ধরে নিল যে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের ফোন? কী আশ্চর্য!”
“আসলে মামা কাল একটা স্বপ্ন দেখেছিল। রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে মামার গলায় মেডেল পরিয়ে দিচ্ছেন। তারপরে টেলিফোনের আওয়াজে ঘুমটা ভেঙেছে। মামার ধারণা ভোরের স্বপ্ন কখনও মিথ্যে হয় না। এক বছর ধরে যে ল্যান্ডলাইনটা ডেড ছিল সেটা রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে ঠিক করিয়ে দিয়েছে এই সুসংবাদটা জানানোর জন্য।”
“উফ! এবার উপায়? অবনী ডাক্তার বলে দিয়েছেন জেঠুর প্রেশার যদি আর একটুও বাড়ে, সোজা হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এদিকে নীতিশমামার বক্তৃতাও তো আর শেষ হচ্ছে না।”
একটু ভেবে বিল্টু বলল, “উপায় একটাই। তুহিনদা।”
তুহিনদা হচ্ছে আমাদের পাড়ার একজন নাম করা ভয়েস আর্টিস্ট। নানান রকম গলায় হরবোলা করতে পারে। বিল্টু টিটোকে লাইনে নিয়ে তুহিনদাকে কনফারেন্স কল করল। ব্যাপারটা গোটা পাড়ার মতো তুহিনদারও ততক্ষণে জানা হয়ে গিয়েছিল। তিন জনে মিলে শলাপরামর্শ করে তুহিনদা বিল্টু আর টিটোকে বলল, তোদের বাড়ির ল্যান্ড লাইন নম্বর দুটো দে।
একটু পরে আবার বেজে উঠল নীতিশবাবুর বাড়ির ল্যান্ড লাইন। নীতিশবাবু বক্তৃতা ছেড়ে হুড়মুড় করে একতলায় বসার ঘরে এসে ফোনটা ধরে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “হ্যালো।”
“আপ নীতিশবাবু?” তুহিনদা হিন্দি গলা করে বলল।
“ইয়েস স্যার।”
“রাষ্ট্রপতিজি কা অফিস সে বোল রহা হুঁ। থোরা হোল্ড কিজিয়ে। প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারিজি আপ কা সাথ বাত করেগা।”
একটু থেমে তুহিনদা গলাটা পালটে ভারিক্কি জলদগম্ভীর করে বলল, “নীতিশজি?”
নীতিশবাবু তখন উত্তেজনায় ফুটছেন। একবারের জায়গায় দু’বার বললেন, “ইয়েস স্যার। ইয়েস স্যার।”
তুহিনদা ধমকে উঠল, “আপকো বোলা থা না ইয়ে সমাচার কিসিকো নেহি বোলনে কে লিয়ে। রাষ্ট্রপতিজি বহুত রুষ্ট হুয়া।”
নীতিশবাবু মিইয়ে গেলেন, “ইয়েস স্যার। নো স্যার। স্যরি স্যার।”
“আব স্যরি বোলকে কোই ফায়দা নেহি।”
“প্লিজ স্যার। ও হাতি হ্যায় না স্যার...” নীতিশবাবুর গলা কান্নাভেজা হয়ে গেল।
“চুপ হো যাইয়ে। আওর এক ভি শবদ নেহি। মগর এক বাত হ্যায়। রাষ্ট্রপতিজি শান্ত হো জানে কা বাদ হাম আপকা নাম ভারতরত্ন কে লিয়ে রেকমেন্ড করেগা।”
নীতিশবাবুর দম আটকে এল, “একেবারে ভারতরত্ন স্যার?”
“ইয়েস ভারতরত্ন। মগর ইয়াদ রাখিয়ে, ইস বারে মে কিসিকো ভি এক শবদ ভি নেহি বোলিয়েগা। আওর পড়োশি মে পুরা শান্তি বজায় রাখিয়েগা।”
কটাস করে লাইনটা কেটে দিল তুহিনদা। নীতিশবাবু অদ্ভুত একটা মন নিয়ে আবার বারান্দায় ফিরে এসে বেসুরো গলায় গান ধরলেন, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে...” এমন সময় ব্রজেনবাবুর ল্যান্ডলাইটা বেজে উঠল।
“আমি ধরব,” ব্রজেনবাবু লাফিয়ে উঠলেন। বহুদিন পরে ব্রজেনবাবুর বাড়িতেও ল্যান্ডলাইনটা বেজে উঠল।
“হ্যালো।”
“আপ ব্রজেনবাবু?” তুহিনদা সেই হিন্দি গলা করে বলল।
“ইয়েস স্যার।”
“রাষ্ট্রপতিজি কা অফিস সে বোল রহা হুঁ। থোরা হোল্ড কিজিয়ে। প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারিজি আপ কা সাথ বাত করেগা।”
“রাইট। রাইট। আই ওয়াজ এক্সপেক্টিং আ কল ফ্রম হিম।”
একটু থেমে তুহিনদা গলাটা পালটে সেই ভারিক্কি জলদগম্ভীর করে বলল, “ব্রজেনজি?”
“ইয়েস স্যার।”
তুহিনদা মোলায়েম গলায় বলল, “রাষ্ট্রপতিজি বহুত প্রসন্ন হুয়া। বহুত বড়া গলতি হোনে যা রহা থা।”
“ইয়েস স্যার। হাম আপকো ফোন করনেই বালা থা। নম্বর নেহি মিল রহা থা। মগর আপলোক ক্যায়সে...”
“আপকা আওয়াজ দিল্লি তক পৌঁছ গ্যয়া।”
“ইটস মাই ন্যাশানাল ডিউটি স্যার,” ব্রজেনবাবু গদগদ গলায় বললেন।
“হাম আপকা নাম ভারতরত্ন কে লিয়ে রেকমেন্ড করেগা।”
ব্রজেনবাবুর চোখ কপালে উঠল, “ভারতরত্ন স্যার?”
“ইয়েস ভারতরত্ন। ইউ ডিজার্ভ ইট। মগর ইয়াদ রাখিয়ে ইয়ে বহুত কনফিডেন্সিয়াল হ্যায়। ইস বারে মে কিসিকো ভি এক শবদ ভি নেহি বোলিয়েগা। টেক কেয়ার অফ ইয়োর হেলথ অ্যান্ড পড়োশি মে পুরা শান্তি বজায় রাখিয়েগা।”
ব্রজেনবাবু কিছুক্ষণ নিস্পলক রিসিভারটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন তারপর সোল্লাসে বলে উঠলেন, “কই হে গিন্নি, লুচি ভাজো। আজ লুচি খাবঅবনীকেও খাওয়াও।”
টিটো ঠিক এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। লাফিয়ে ছাদে চলে এল। ততক্ষণে বিল্টুও ছাদে চলে এসেছে। দু’জনে দু’জনকে থামস আপ দেখাল। এমন সময় বেজে উঠল বিল্টুর ফোন। মান্টুদা। ফোনটা ধরতেই মান্টুদা বলল, “এক্ষুনি আমার ফোনে রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকে ফোন এসেছিল। তোদের বাড়িতে সুবল সুইটস থেকে যে দু’হাঁড়ি রসগোল্লা এসেছে সে দুটো অনতিবিলম্বে ক্লাবে নিয়ে আসতে বলেছে।”
_____

ছবিঃ বিল্টু দে

1 comment: