Showing posts with label পুরোনতুন গল্প. Show all posts
Showing posts with label পুরোনতুন গল্প. Show all posts

পুরোনতুন গল্প:: বীর শিবাজী - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


বীর শিবাজী
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

ম্যাজিক ল্যাম্পের দুরন্ত অভিযান সংখ্যায় এইবার ছত্রপতি শিবাজীকে নিয়ে কিছু গল্প লিখতে বসলাম, যাঁর গোটা জীবনটাই ছিল যেন একটা অ্যাডভেঞ্চার। তোমরা অনেকেই হয়তো তাঁর কথা পড়েছ এবং পড়তে পড়তে তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছ। আমরা অনেকেই শিবাজীর দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হয়েছি। আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তিলক তো শিবাজী উৎসব নামে একটা উৎসবই চালু করে ফেললেন। মারাঠা বীর শিবাজী স্বরাজ্য স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। সম্পূর্ণ বিদেশি শাসন মুক্ত দেশ গড়তে চেয়েছিলেন। তখন বিদেশি শাসন মানে মুঘল শাসন। আর সেই সময় মুঘল শাসন ছিল অত্যাচারী। সাধারণ মানুষের কষ্টের সীমা ছিল না। কারণ, আকবরের মতো মহান সম্রাট সেদিন ছিলেন না, ছিলেন ঔরঙ্গজেব। তাঁর অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে উত্তর ভারতের জাঠ থেকে শুরু করে শিখ, পাতিয়ালা ও আলোয়ারের সৎনামী সম্প্রদায়, রাজস্থানের রাজপুতরা, মধ্য ভারতের বুন্দেলখন্ডের বুন্দেলাগণ প্রত্যেকটা জাতিই বিদ্রোহ করেছিলআর মারাঠায় (আজকের মহারাষ্ট্র) ছিলেন ছত্রপতি শিবাজী ভোঁসলে। শিবাজীও ঔরঙ্গজেবের এই অত্যাচারী শাসনেবিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। শিবাজীকে জীবিত অবস্থায় বাদশাহ আলমগীর কোনদিনই হারাতে পারেননি। বিদ্রূপ করে শিবাজীকে বলতেন পার্বত্য মূষিক।


শিবনের পার্বত্য গিরিদুর্গে তাঁর জন্ম ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দেতাঁর বাবার নাম ছিল শাহজী ভোঁসলে এবং মায়ের নাম জীজাবাঈ। বাবা শাহজী প্রথমে আহম্মদনগর ও পরে বিজাপুরের সুলতানের অধীনে উচ্চ রাজকর্মচারী ছিলেন। জীজাবাঈ ছিলেন দেবগিরির যাদববংশীয় জায়গীরদার যাদব রাওয়ের কন্যা। শাহজী থাকতেন বিজাপুরে নিজের দ্বিতীয় পত্নী তুকাবাঈ এবং শিশুপুত্র ব্যাঙ্কোজীকে নিয়ে। তাই বাবার স্নেহ-ভালোবাসা তিনি কোনদিন পাননি। মা জীজাবাঈ তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলে। মাকে তিনি অসম্ভব ভালোবাসতেন। মহান মানুষদের জীবনী ঘাঁটলে জানা যায়, এঁরা প্রত্যেকেই মাকে খুব ভালোবাসতেন। নিজের মাকে ভালো না বাসলে, শ্রদ্ধা না করলে কখনও বড়ো হওয়া যায় না। মা ছোট্ট শিবাজীকে রামায়ণ মহাভারতের গল্প বলতেন। শিবাজীও এই গল্পগুলো শুনতে শুনতে হারিয়ে যেতেন সেই রামায়ণ-মহাভারতের যুগে। নিজের সমস্ত শিক্ষাদীক্ষা তিনি এই মহাকাব্যদুটি থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন। সম্ভবত তিনি লিখতে পড়তে জানতেন না। দাদাজী কোণ্ডদেব নামে একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত তাঁকে শিখিয়েছিলেন অসিচালনা, ঘোড়ায় চড়া, রণকৌশল এবং এক আদর্শ শাসনব্যবস্থা কীভাবে গড়া যায় যেখানে প্রজাদের ভালো রাখা যায়। স্থানীয় পার্বত্য মাওয়ালি উপজাতির সাথে তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন বন্ধুত্বের দ্বারা। এই মাওয়ালি উপজাতির মানুষদের নিয়েই তিনি প্রথম নিজের সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। এই মানুষগুলো শিবাজীকে খুব ভালোবাসত।
দাদাজী কোণ্ডদেবে মৃত্যুর পর তিনি রাজ্য জয়ে মন দিলেন। ১৬৪৭-এ তিনি তোরণা দুর্গ দখল করেন। তাঁর প্রথম অভিযান ছিল এই তোরণা দুর্গ জয়। এরপর তিনি রায়গড়, বড়ামতি, ইন্দ্রপুর, পুরন্দর, কোন্দন প্রভৃতি দুর্গগুলি জয় করেন। তাঁর নির্দেশে মারাঠা সেনাপতি আবাজী সোন্দর কল্যাণ দুর্গ দখল করে নিলে বিজাপুরের সুলতান ভীষণ ভয় পেয়ে যান। শিবাজীকে আটকাবার জন্য তিনি শিবাজীর পিতা শাহজীকে বন্দি করেন। যে বাবা শৈশবে তাঁকে অবহেলা করেছেন সেই বাবারই মুক্তির জন্য তিনি উঠে পড়ে লাগলেন। দাক্ষিণাত্যের মোগল শাসকর্তা মুরাদের কাছে সাহায্য চাইলেন। বিজাপুরের সুলতান শাহজীকে মুক্তি দিলেনউভয়পক্ষের মধ্যে একটা চুক্তি হয়। ছ’বছর শিবাজী কোথাও কোন অভিযান চালাবেন না। এই ছিল চুক্তির শর্ত। এই ছ’বছর তিনি শান্তভাবে বসে রইলেন এবং নিজেকে আরও ভালোভাবে গড়ে তুললেন।


১৬৫৬-তে বিজাপুরের সুলতানের আকস্মিক মৃত্যু হলে তাঁর নাবালক পুত্র সিংহাসনে বসলেন। এই সময় দাক্ষিণাত্যের মোগল শাসনকর্তা ঔরঙ্গজেব বিজাপুরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। শিবাজী এই সুযোগে জাওয়ালি অধিকার করেন। ঔরঙ্গজেব এরপর দিল্লী চলে যান। বিজাপুরের সুলতান শিবাজীর শক্তি খর্ব করার জন্য সেনাপতি আফজল খাঁকে প্রেরণ করেন। আফজল খাঁ এক ভয়ানক লোক। নানাভাবে চেষ্টা করেও তিনি শিবাজীকে সামনাসামনি হারাতে পারলেন না। আফজল খাঁ এবার ছলের আশ্রয় নিলেন। শিবাজীকে নিজের শিবিরে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গেলেন। আফজল খাঁ শিবাজীকে জড়িয়ে ধরলেন ভালোবেসে। পোশাকের মধ্যে ছুরি লুকোনো, আস্তে আস্তে সেটা বার করে শিবাজীর বুকে বসাতে যাবেন তার আগেই তিনি লুটিয়ে পড়লেন নিচে। শিবাজীও প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। বাঘনখ পরে এসেছিলেন সেই বাঘনখ দিয়েই আফজল খাঁকে হত্যা করলেন। ( বাঘনখ একরকমের অস্ত্র, হাতের আঙুলে পরা হয়। তোমরা মিউজিয়ামে গেলে দেখতে পাবে) শিবাজী জানতে পেরে গেছিলেন, আফজল খাঁ তাঁর সাথে প্রতারণা করছেন। কৃষ্ণজী ভাস্কর নামে এক মারাঠি ব্রাহ্মণ শিবাজিকে সব জানিয়ে দিয়েছিলেন। এই কৃষ্ণজী ভাস্করকেই দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন আফজল খাঁ। কিন্তু শিবাজীর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে এই মারাঠি ব্রাহ্মণ আফজল খাঁর সমস্ত অভিসন্ধি তাঁকে খুলে বলেন। বিজাপুরের সুলতান তাঁর বশ্যতা মেনে নেন।


শিবাজী ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছিলেন। দাক্ষিণাত্যে মোগল রাজ্যগুলিতে আক্রমণ চালাতেন। সরদেশমুখী ও চৌথ নামে দুটি কর আদায় করতেন বিজিত রাজ্যগুলি থেকে। সরদেশমুখী ছিল রাজস্বের এক-দশমাংশ এবং চৌথ ছিল রাজস্বের এক-চতুর্থাংশ। এভাবেই তিনি নিজের সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার মেটাতেন
সম্রাট ঔরঙ্গজেব এবার নিজের মামা শায়েস্তা খাঁকে পাঠালেন শিবাজীকে জব্দ করার জন্য। প্রথমে কিছু যুদ্ধে শিবাজী হেরে গেলেন। শিবাজী বিজাপুরের সাথে আপোস করেন। এক রাত্রিতে শিবাজী আকস্মিকভাবে শায়েস্তা খাঁর শিবির আক্রমণ করেন। শায়েস্তা খাঁ তখন পুণা শিবিরে। রাতে সবাই অসতর্ক ছিল। এই আক্রমণ মোগলবাহিনী সামলাতে পারল না। শায়েস্তা খাঁ কোনরকমে হাতের একটি আঙুল খুইয়ে নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে এলেন।
পরের বছর (১৬৬৪) শিবাজী সুরাট বন্দর লুঠ করে প্রচুর ধনরত্ন লাভ করেন। ইংরাজ ও ওলন্দাজ বণিকরা কোনওভাবে পালিয়ে বাঁচলেন।
শায়েস্তা খাঁ পরাজয়ে প্রচণ্ড রেগে গেলেন আলমগীর ঔরঙ্গজেব। তিনি আবার জয়সিংহ ও দিলীর খাঁকে পাঠালেন শিবাজীকে যুদ্ধে হারাবার জন্য। শিবাজীর এই শক্তিবৃদ্ধি তিনি আর বরদাস্ত করতে পারছেন না। এবার কিন্তু শিবাজী পরাজিত হলেন এবং পুরন্দরের সন্ধি (১৬৬৫) করতে বাধ্য হলেন। নিজের ২৩টি দুর্গ মোগলদের হাতে দিয়ে দিলেন, মাত্র ২১টি থাকবে তাঁর। পুত্র শম্ভুজী পাঁচ হাজারি মনসবদার নিযুক্ত হন। শিবাজী জায়গীর লাভ করেন। জয়সিংহের পরামর্শে তিনি শম্ভুজীকে নিয়ে মোগল রাজদরবারে গেলেন। আসলে তাঁর নিজেরও খুব ইচ্ছা ছিল মোগল দরবার স্বচক্ষে দেখার। সম্রাট কিন্তু শিবাজির সাথে ভালো ব্যবহার করলেন না। সম্রাট চেয়েছিলেন শিবাজীকে কান্দাহারে পাঠিয়ে দিতে কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়ে। কিন্তু তিনি সেখানে যেতে রাজি হলেন না। ঔরঙ্গজেব তাঁকে একজন মনসবদারের পেছনে দাঁড়াতে বলেন শিবাজী এতে অপমানিত বোধ করেন। তিনি রাজদরবার ত্যাগ করে চলে আসেন। বাদশাহের আদেশে তাঁকে পুত্রসহ বন্দী করা হয়। শিবাজী অসুস্থতার ভান করেন। নিজের সেনাবাহিনীর কিছু অংশ দাক্ষিণাত্যে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। সম্রাটকে বলেন, আমি আজ গুরুতর অসুস্থ। আপনার সব আদেশ আমি মেনে নিলাম কিন্তু আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে জাঁহাপনা
শেষপর্যন্ত আমার কাছে আপনাকে অনুরোধ করতে হল। বলুন কী অনুরোধ আলমগীরের কাছে,” অট্টহাস্য করে উঠলেন আলমগীর।
আমার নাম করে রোজ কিছু ফুল, ফল, মিষ্টি উপহার আগ্রার বিভিন্ন মন্দিরে, দরগায়, সাধু-সন্ন্যাসী এবং ফকিরদের কাছে পাঠাতে চাইএ ব্যাপারে আপনার অনুমতি দরকার
কেন? দুই ভুরু কপালে তুলে প্রশ্ন করলেন আলমগীর।
আমি মনে করি ঈশ্বরের আর্শীবাদ পেলে আমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠব। তাই কিছুদিন আমাকে ঈশ্বরের, সাধু-সন্ন্যাসীদের সেবা করার অনুমতি দিন জাঁহাপনা
সম্রাট তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিলেন। আর সেটাই ছিল তাঁর চরম ভুল। শিবাজীর কূটবুদ্ধি সম্বন্ধে তাঁর কোন ধারণাই ছিল না। প্রথম কিছুদিন ফল আর মিষ্টির ঝুড়িই যাতায়াত করতে লাগল। আস্তে আস্তে কড়া পাহারা ক্রমে শিথিল হল। একদিন শিবাজী নিজের পুত্র শম্ভুজীকে ফলের ঝুড়ির মধ্যে লুকিয়ে বার করে দিলেন এবং নিজে একজন পরিচারকের ছদ্মবেশ ধরলেন। পুরো পরিকল্পনায় শিবাজীকে সাহায্য করেছিলেন জয়সিংহ। শিবাজিকে আমন্ত্রণ করে রাজ দরবারে নিয়ে গিয়ে এভাবে অপমান করাটা জয়সিংহ নিজেও সহ্য করতে পারেননি। শেষপর্যন্ত আর শিবাজীকে পরাস্ত করা বাদশাহের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
শিবাজীর রাজ্যাভিষেক হয় ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন রায়গড় দুর্গে। তিনি ছত্রপতি উপাধি ধারণ করেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেব শিবাজীকে ‘রাজা’ উপাধি দিলেন এবং বেরারে একটি জায়গীর প্রদান করেন। তাঁর রাজ্যাভিষেক হিন্দু এবং মারাঠাদের মধ্যে বিপুল উন্মাদনার সঞ্চার করে। তিনি ইসলাম ধর্মের প্রতি কোন বিদ্বেষভাব পোষণ করতেন না যদিও মুসলিম শাসন অর্থাৎ মোগল শাসন সেই সময় জনহিতকর ছিল নাকখনও তাঁর সেনাবাহিনী কোনও মসজিদে লুঠতরাজ চালায়নি বা মসজিদ ধ্বংস করেনিতাঁর সেনাবাহিনীতে পাঠান, পর্তুগিজ, ফরাসী, মোগল প্রভৃতি বিভিন্ন জাতের মানুষদের গ্রহণ করেছিলেন।
মৃত্যুর আগে বিশাল এক সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়েছিলেন তিনি। শাসনব্যবস্থায় তিনি সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। নিরক্ষর হয়েও তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। হিন্দু সন্ন্যাসীদের পাশাপাশি মুসলিম ফকিরদেরও তিনি শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর ব্যয়ে বাবা ইয়াকৎ নামে একজন মুসলমান ফকিরের দরগা নির্মিত হয়েছিলযুদ্ধবিগ্রহের সময় তিনি অযথা অত্যাচার বা হত্যাকান্ড অনুষ্ঠিত করে নিজের চরিত্রকে নষ্ট করেননি। সম্পূর্ণ স্বাধীন রাজা ছিলেন তিনি। ১৬৮০-তে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে আমাদের কাছে তিনি অমর।
তাঁর সম্পর্কে অনেক কথাই বাকি থেকে গেল। এই স্বল্পপরিসরে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করা বেশ শক্ত। কবিগুরুর থেকে দুটো লাইন বলে শিবাজীর গাথা আজ শেষ করলাম।
'মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক কন্ঠে বলো
'জয়তু শিবাজি'
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো
মহোৎসবে সাজি।
আজি এক সভাতলে ভারতের পশ্চিম-পুরব
দক্ষিণে ও বামে
একত্রে করুক ভোগ একসাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।।'

-----
ছবিঃ আন্তর্জাল

তথ্যসূত্রঃ কিছু কল্পনা, কিছু জনশ্রুতি, আন্তর্জাল এবং ভারতের ইতিহাস ( অতুলচন্দ্র রায় এবং প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়)

পুরোনতুন গল্প:: হারকিউলিস - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

হারকিউলিস
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

গ্রিক পুরাণে হারকিউলিস একজন অত্যন্ত শক্তিশালী চরিত্র হেরাক্লেসের আরেক নাম হারকিউলিস। হারকিউলিস নামের উৎপত্তি হয়েছে হেরাক্লেস থেকে হেরাক্লেস থেকে হারকুলেস এবং তার থেকে হারকিউলিস। গদাযুদ্ধে বা মল্লযুদ্ধে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। শক্তিশালী হলেও তিনি খুব দয়ালু ছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন দেবরাজ জিউসআর মা আক্লমিনা ছিলেন পৃথিবীর এক রাজকন্যা। হারকিউলিসের জন্ম থিবসে। থিবসের অন্ধ ভবিষ্যৎদ্রষ্টা টাইরেসিয়াস আক্লমিনাকে বলেছিলেন, হারকিউলিস হবেন মানবজাতির গর্ব। গ্রিকরা তাঁকে মর্ত্যের বীর এবং দেবতা এই দুই পরিচয়েই পুজো করত।
হারকিউলিসের জন্মের খবর পেয়ে বিমাতা জুনো হিংসেয় ছটফট করতে লাগলেন। দুটো বিষধর সাপকে পাঠালেন হারকিউলিসকে মেরে ফেলার জন্য। সাপদুটোর ভয়ানক মূর্তি দেখে সবাই খুব ভয় পেয়ে গেল। কেউ ছোট্ট হারকিউলিসকে বাঁচানোর কোনও চেষ্টাই করল না। সবাই নিজের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত। হারকিউলিস নিজের ছোট্ট দুহাত দিয়ে সাপদুটোর মাথা চেপে ধরলেন। জীবনের শুরু থেকেই এই যে লড়াই শুরু হল, চলেছিল একদম শেষপর্যন্ত। জুনো’র সব চক্রান্ত ব্যর্থ হল।
গ্রিক পুরাণে এক ধরনের জীবের অস্তিত্ব দেখা যায় যারা অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক ঘোড়া। মাথা থেকে কোম পর্যন্ত মানুষের মতো কিন্তু কোম থেকে শরীরের বাকি অংশ ঘোড়ার মতো। এদের বলে সেন্টর। এরকমই একজন সেন্টর হলেন চীরণ। চীরণ অস্ত্রবিদ্যার শিক্ষা দিতেন। হারকিউলিসকে চীরণের কাছে পাঠানো হল অস্ত্রবিদ্যার শিক্ষার জন্য। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি অসাধারণ যোদ্ধা হয়ে উঠলেন। হারকিউলিস সারা পৃথিবী ঘুরতে বেরোলেন নিজের উপযুক্ত কাজ খোঁজার জন্য।

মিনিয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য থিবসের রাজা ক্রেয়ন নিজের কন্যা মেগারার সাথে হারকিউলিসের বিয়ে দিলেন। কিন্তু হারকিউলিস জীবনে সুখী হতে পারেননি। জুনো সবসময় হারকিউলিসের ক্ষতি করার চেষ্টা করতেন। তাঁর চক্রান্তে হারকিউলিস একদিন উন্মাদ হয়ে গেলেন। নিজের স্ত্রী-পুত্র সবাইকে মেরে ফেলেন। তারপর যখন সুস্থ হলেন, বুঝতে পারলেন কী করেছেন! লজ্জায় রাগে ভেবেছিলেন আত্মহত্যা করবেন। এক নির্জন বনে গিয়ে বসে রইলেন। এদিকে জুনো দেবতাদের কুমন্ত্রণা দিতে লাগলেন। দেবতারা ঠিক করলেন একবছর হারকিউলিস আর্গসের রাজা ইউরিসথিউসের ক্রীতদাস হয়ে থাকবে। ইউরিসথিউসের আদেশে তাঁকে বার বার অসম্ভব কাজ করতে হয়। এই কাজগুলোকেই হারকিউলিসের শ্রম বলে। এগুলো ছিল নিমিয়ার এক দুর্দান্ত সিংহকে হত্যা করা।  সিংহটি এতই ভয়াবহ ছিল যে এর সামনে কেউ পড়লে সে আর কোনভাবেই প্রাণ নিয়ে পালাতে পারত না। বাস করত গ্রিসের নেমিয় উপত্যকায়। এলাকার মানুষকে বাঁচাতে হারকিউলিস সিংহটিকে মারার পরিকল্পনা করেন। তিনি ওকগাছের কাঠ দিয়ে বিশাল বড়ো একটি মুগুর তৈরি করেন। মুগুরের আঘাতে সিংহটি ক্লান্ত হয়ে পড়লে হারকিউলিস গলা টিপে সিংহটিকে হত্যা করেন। এই ঘটনার পর নানাস্থানে তাঁর বীরত্বের কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে।


লের্নার জলাভূমিতে হাইড্রাকে হত্যা করাঃ হাইড্রা ছিল বিরাটাকায় একটি সাপ। যার মাথা ছিল নটি। তার মধ্যে আটটি মাথা ছিল মরণশীল, একটি ছিল অমর। হারকিউলিস দেখলেন সাপের মাথাগুলো কেটে ফেললে আবার সেই জায়গায় দুটো মাথা জন্ম নিচ্ছে। শেষে আর উপায় না দেখে তিনি সাপের মাথা কেটে সেই কাটা মাথা আগুনে পুড়িয়ে দেন। হাইড্রার রক্তে তীব্র বিষ ছিল এবং হারকিউলিস নিজের তিরগুলোতে হাইড্রার রক্ত মাখিয়ে নিয়েছিলেন এছাড়া এরিম্যান্থাসের রাক্ষস বরাহকে হত্যা করা, সেরিনিয়ার আশ্চর্য হরিণকে ধরে আনা, রাজা আগিয়াসের আস্তাবল পরিষ্কার করা, হেস্পিরিডিস থেকে সোনার আপেল নিয়ে আসা, স্টিমফ্যালিন পাখিদের তাড়ানো ও অন্যান্য ভয়ংকর সব কাজ। এগুলো তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেন এবং স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত করেন।
এরিম্যান্থাসের রাক্ষস বরাহকে মারার সময় একটা খারাপ ঘটনা ঘটে যায়। এই সময় একদল সেন্টর এসে তাঁর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে ফেলে। হারকিউলিস তখন হাইড্রার রক্তে মাখানো বিষবাণ ছুঁড়ে তাদের মারতে লাগলেন। চীরণ এসে এই যুদ্ধ থামাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু হারকিউলিসের ছোঁড়া তির এসে তাঁর গায়ে লাগে। চীরণের মৃত্যু হল। এভাবে হারকিউলিসের হাতে নিজের গুরুর মৃত্যু হয়। যদিও এর জন্য হারকিউলিসকে দায়ী করা ঠিক হবে না। তবু হত্যা তো হত্যাই। এই ঘটনায় তিনি অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে পড়েন।
হারকিউলিসের বিভিন্ন অভিযান নিয়ে রয়েছে নানান গল্প। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তিনি বিভিন্নরকম কাজ করেছিলেন। ভয়ংকর দানব অ্যান্টিউসের বিরুদ্ধে, নদীর দেবতা অ্যাকিলাসের বিরুদ্ধে লড়াই করেনঅ্যাডমিটাসের মৃত স্ত্রী অ্যালসেস্টিসকে মৃত্যুদেবতার হাত থেকে লড়াই করে ফিরিয়ে আনেন।


হারকিউলিস পরে ডেয়ানিরাকে বিয়ে করেন। এক সেন্টর নেসাস ডেয়ানিরাকে অপহরণ করে নিয়ে যাবার সময় হারকিউলিসের হাতে ধরা পড়ে যায়। হারকিউলিস তাকে সেই বিষাক্ত তির দিয়ে আঘাত করেমারা যাবার আগে নেসাস ডেয়ানিরার কাছে ক্ষমা চায়। বলে, ‘আমার এই জামা তুমি খুলে রাখো। যদি কোনদিন দেখো হারকিউলিস আর তোমাকে আগের মতো ভালোবাসছে না, তাহলে তুমি এই জামাটা হারকিউলিসকে পরিয়ে দিও। এই জামা যতদিন তোমার কাছে থাকবে হারকিউলিসও ততদিন তোমার থাকবে
কিন্তু এসব ছিল নেসাসের চালাকি। ডিয়ানিরা আর হারকিউলিস বেশ ভালোই দিন কাটাচ্ছিলেন। একবার একটা কাজের জন্য হারকিউলিসকে অনেক দূরে যেতে হয়েছিল। তিনি ফিরছেন না দেখে ডেয়ানিরা ছটফট করতে লাগল। ভাবতে থাকে, হারকিউলিস হয়তো আমাকে আর আগের মতো ভালবাসেন না। এক দূতের হাত দিয়ে সেই জামাটা ডেয়ানিরা হারকিউলিসের কাছে পাঠিয়ে দিল। সোনার মতো ঝকঝকে জামা। ডেয়ানিরা খুব যত্ন করে তুলে রেখেছিল এতদিন। জামার গল্প হারকিউলিস কিছুই জানতেন না। দূতের পাঠানো জামা দেখে ভাবলেন ডেয়ানিরা কত ভালোবেসে তাঁকে জামা পাঠিয়েছে! জামা পরার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমস্ত শরীর জ্বলে যেতে লাগল। জামাটা খুলতে গিয়ে দেখলেন জামা তাঁর শরীরের সাথে আটকে গেছে। গায়ের চামড়া উঠে আসছে কিন্তু জামা ছিঁড়ল না। হাইড্রার রক্ত মাখানো বিষাক্ত তিরে নেসাসের মৃত্যু হয়েছিল। সেই বিষ নেসাসের জামায় মিশে গিয়েছিল। নিজের হাতে নিজের চিতা তৈরি করলেন হারকিউলিস। এক বন্ধুকে বলেন, ‘তুমি যদি আমার সত্যিকারের বন্ধু হও তাহলে চিতায় আগুন দাও নিজের সেই বিষাক্ত তিরগুলো বন্ধুকে দিয়ে দিলেন। স্বর্গের দেবতারা তাঁকে নিজেদের মধ্যে ডেকে নিলেন। সেখানে তাঁর বিয়ে হয় দেবী হিবির সাথে।
হারকিউলিসের কাহিনি কাল্পনিক হলেও সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হারকিউলিসকে নিয়ে অনেক সিনেমা এবং টেলিভিশন সিরিজ হয়েছে। লেখা হয়েছে অনেক গল্প, অনেক বইও। বিভিন্ন দেশে হারকিউলিসের বীরত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেকগুলো সিনেমা এবং টিভি সিরিয়াল যেগুলো খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।
_____
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ আন্তর্জাল

পুরোনতুন গল্প:: পিতার মস্তক থেকেই কি গ্রীকদেবী আথেনার জন্ম? - সোহিনী দেবরায়


পিতার মস্তক থেকেই কি গ্রীকদেবী আথেনার জন্ম?
সোহিনী দেবরায়

বৃষ্টিটা আরও জোরে শুরু হল। আকাশ বাতাস সমগ্র অলিম্পাস পর্বত কেঁপে আরও একটা বাজ পড়ল। তখনই শোনা গেল এক শিশুর কান্না। হ্যাঁ, একটু মন দিয়ে শুনলেই বোঝা যাবে এ এক নবজাত শিশুর কান্না। শিশুর পিতা দু’চোখ ভরে শিশুটিকে দেখলেন। কী অপরূপ দীপ্তি শিশুটির চোখে মুখে! সূর্যের মতো গায়ের রঙ, সোনালি চুল। পৃথিবীর সমস্ত রূপ নিয়ে জন্মেছে এই কন্যা। কী নাম রাখা যায় এই দেবকন্যার! না না, এখন অত সময় নেই নাম ভাবার। সে পরে হবে’খনআপাতত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই শিশুকে তার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে। যদিও সে ছোট্ট একটি লোহার বর্ম দিয়ে শিশুটিকে ঢেকে নিয়েছে তবুও একবার মনে হল বটে যে এই সদ্যোজাত শিশু মাকে ছাড়া বাঁচবে তো! কিন্তু তা ভাবার সময় এখন নয়। এই ঝড়জলের রাতেই তাকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। কেউ যেন জানতে না পারে এই শিশুর মা কে কেউ জানবে না। কেউ না। কেউ যাতে না জানে তাই জন্যই তো তিনি এই ঝড়জলের রাতে একা এতটা এসে নিজে সন্তান প্রসব করিয়েছেন। না না না। মেটিস-এর গর্ভে এই সন্তান জন্মেছে তা কিছুতেই জানতে দেওয়া যাবে না। তিনি দেবরাজ জিউস। আর তার মেয়ের মা হবে কিনা জ্ঞান ও হস্তশিল্পের দেবী মেটিস! না, তা কিছুতেই হতে পারে না। মেটিস এখনও অজ্ঞান অবস্থায় আছে। এই সময়েই তাকে নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে।
দেবরাজ জিউস শিশুটিকে বুকে আগলে দ্রুত পায়ে এগোতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি তার রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গেলেন। সারারাত বৃষ্টির পর সূর্যের প্রথম আলোতে সোনার রাজপ্রাসাদ অনেক দূর থেকেই জ্বলজ্বল করছে। মুখটা আরও ভালো করে ঢেকে নিলেন। যদিও প্রয়োজন ছিল না। সৈন্যরা কেউই পাহারায় নেই। অন্যসময় হলে তিনি হুঙ্কার দিতেন। কিন্তু না, আজ সৈন্যরা পাহারায় না থাকায় তিনি বেশ খুশিই হলেন। রাজপথ পেরিয়ে তিনি দ্রুত তাঁর কক্ষে প্রবেশ করলেন। শিশুটিকে সোনার পালঙ্কে শুইয়ে দিলেন। নিজেও পাশে শুয়ে পড়লেন। সারারাত তিনি বৃষ্টিতে ভিজেছিলেন। তাঁর জ্বর এল এবং প্রচণ্ড মাথাব্যথায় তিনি কাতরাতে লাগলেন। ঘরের বাইরে থেকে তাঁর বিশাল শরীরের পাশে ছোট্ট শিশুটিকে দেখা গেল না। দেবরাজকে অনেকক্ষণ ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে ছোট্ট অ্যাপোলো এবং রাজপ্রাসাদের দাসদাসীরা ছুটে এলেন। রাজা তখন অসহ্য মাথাব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছেনসবাই রাজার কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজার অনুমতি ছাড়া তো আর কক্ষে প্রবেশ করা যায় না! কেউই বাইরে থেকে শিশুকে দেখতে পেল নাহঠাৎ এক শিশুর কান্না শোনা গেলরাজা পাশ ফিরলেন। বাইরে দাঁড়ানো সবাই দেখতে পেল এক নবজাত শিশু তার ছোট্ট একখানি হাত রাজার মুখে কপালে দিচ্ছেন। শিশুটির গায়ে লোহার বর্ম। রাজার মাথাব্যথাও কমে গেলতিনি অবাক নয়নে শিশুটিকে দেখতে লাগলেন। তিনি বুঝে ওঠার চেষ্টা করতে লাগলেন সবাই কি সবকিছু বুঝে গেল! এই চিন্তার কাছে তার মাথাব্যথা কিছুই নয়। কিন্তু তাঁর কানে অন্য কথা এল
‘আচ্ছা, দেবরাজ কি কিছু ভাবছেন!’
‘কিন্তু শিশু এখানে এল কীভাবে!’
বাইরে দাঁড়ানো সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলকেউ কেউ বলল, ‘হয়তো দেবরাজ জিউসের মস্তক থেকে এই দেবশিশুর জন্ম
‘হয়তো এই শিশু জন্মাবে বলেই মহারাজের মাথায় এত ব্যথা হচ্ছিল
দেবরাজ নিশ্চিন্ত হলেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর সমস্ত অলিম্পাস পর্বতে ছড়িয়ে পড়ল। রাগী দেবতা জিউসকে কেউ নিজের মুখে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না আর দেবরাজ নিজে মুখেও কাউকে কিছু বললেন না।


সুতরাং শিশুটি দেবরাজ জিউসের মানসকন্যা রূপেই বড়ো হতে লাগলেনরূপে গুণে এই কন্যা অতুলনীয়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই এই মেয়ে সবরকম অস্ত্রচালনায় পারদর্শী। শুধু কি তাই! বছর বারো হতে না হতেই এই কন্যা ন্যায়-নীতি, আইন, হস্তশিল্প, সাহিত্যকলা ইত্যাদি নানান বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠলেনসমগ্র দেবলোকে এই কন্যা বিশেষ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠলেনজিউস জানতেন এই কন্যা অনেক গুণের অধিকারী হবে। কারণ, চিন্তাশক্তি, হস্তশিল্প ও জ্ঞানের দেবী মেটিস এবং সর্বশক্তিমান দেবরাজ জিউসের মিলনে যে তাদের চেয়েও শক্তিশালী কেউ জন্ম নেবে এটাই স্বাভাবিক। দেবরাজ তার কন্যার নাম দিলেন ‘অ্যাথেনা’। অ্যাথেনা হলেন জিউসের প্রিয় সন্তান, চোখের মণি।
সমগ্র গ্রীসদেশের মধ্যে দেবী অ্যাথেনার নাম ছড়িয়ে পড়ল। অ্যাথেনা জ্ঞানের দেবী, যুদ্ধের দেবী। গ্রীসদেশের মানুষ মনে করতেন দেবীর দয়াতেই তারা তাদের দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারছেন। তার নামানুসারেই গ্রীসের রাজধানীর নাম হল এথেন্স। অ্যাথেনাকে এথেন্সের রক্ষাকর্ত্রী বলা হত। গ্রীসে তার মন্দির স্থাপন করাও হয়। তার স্মরণে ‘প্যানাথেনিয়া’ নামে এক বিরাট উৎসব গ্রীকরা পালন করেন। গ্রীক কবি হোমারের ইলিয়াড এবং ওডিসিতে এই দেবীর নাম পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন এক কুমারী দেবী। ভয়-শঙ্কাহীন এক বিরাট যোদ্ধা জিউসের মতোই খুব রাগী ছিলেন এবং অন্যায় ক্ষমা করতেন না।
অ্যাথেনাকে নিয়ে অলিম্পাস পর্বতের সব দেবতারা গর্ব করতেন। শুধু একজন নিজের মেয়ে জেনেও সর্বক্ষণ মেয়ের থেকে দূরে দূরে থাকতেন। হাজার কষ্টে বুক ফেটে গেলেও নিজের মেয়েকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে আদর করতে পারতেন না। আর এভাবেই আথেনার জন্মবৃত্তান্ত সমগ্র অলিম্পাস পর্বতের দেবতা ও গ্রীকবাসীর কাছে অধরাই রয়ে গেলএক ক্ষমতাশালী রাগী রাজার প্রভাব প্রতিপত্তির জোরে এক দুঃখিনী মায়ের কান্না ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে গেল।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল


লেখক পরিচিতিঃ জন্ম ৩রা মার্চ ১৯৯৫, ব্যারাকপুর। বর্তমানে এম.এস.সি. পাঠরতা। লেখালিখির শুরু খুব ছোটবেলায়, ২০০০ সালে স্কুলের দেওয়াল পত্রিকার শিশু-বিভাগে লেখার মাধ্যমে। লেখার বিষয় প্রধানত রূপকথা। তবে বিজ্ঞানবিষয়ক ও সামাজিক গল্প বেশ কিছু লেখা হয়েছে। লেখালিখি আর বিজ্ঞানচর্চা ছাড়াও আরেক নেশা ফুটবল। গান শুনতেও খুব ভালো লাগে।

পুরোনতুন গল্প:: সুবুদ্ধির বুদ্ধি - দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী


সুবুদ্ধির বুদ্ধি
(শ্রী হেমবিজয়গণি রচিত "বৃদ্ধমন্ত্রীকথা" অবলম্বনে)
দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

সমস্যা যতই কঠিন হোক না কেন, যদি বুদ্ধি থাকে ঘটে তবে সবই সহজ বটে। কী? বিশ্বাস হল না মোটে? সংস্কৃতে একটা প্রবাদ আছে - রাজাদের চোখ হল গুপ্তচর, পশুদের চোখ হল তাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয় বা গন্ধ গ্রহণের ক্ষমতা, সাধারণ লোকের দুটিই চোখ কিন্তু পন্ডিতদের চোখ হল তাদের বুদ্ধি
       কিন্তু মগজাস্ত্র নিয়ে এত কথা কেন? আরে বাপু সেই বিষয়েই একটা সুন্দর গল্প তোমাদের বলব।
      অনেক দিন আগের কথা। মন্দাকিনী নদীর তীরে খুব সুন্দর একটি রাজ্য ছিল সুন্দরপুর। যেমন সুন্দর নাম, তেমন সুন্দর রাজ্যের শোভা। বাগানে বাগানে সাজানো একটি রাজ্য। দুঃখের লেশমাত্র নেই। সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন মহাসেন। কিন্তু কী জানি কী এক নাম না জানা অসুখে তিনি হঠাআক্রান্ত হলেন। এবং কিছুদিনের মধ্যে তার মৃত্যু হল। এত ভালো রাজাকে হারিয়ে রাজ্য শুদ্ধু লোকের মনখারাপ। কারণ এরপরে তো সিংহাসন পাবে মহাসেন-এর অযোগ্য পুত্র নরসেন।
      নরসেন ছিলেন খুব অহংকারী। নিজের রূপের গর্বে তার মাটিতে পা পড়ত না। সিংহাসনে বসার পরে তিনি ভাবলেন, বাবার দিন তো গেছে। এখন বাবার সঙ্গে যারা কাজ করত সেই বুড়ো অযোগ্য মন্ত্রীদের দিয়ে আর কিই বা কাজ হবে। বরং ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দূর করে দিই সবাইকে। তাই একদিন সক্কাল সক্কাল তিনি মন্ত্রীদের ডেকে পাঠালেন একে একে মন্ত্রীরা সব এসে দাঁড়ালেন। নরসেন তাদের বিন্দুমাত্র সম্মানও দেখালেন না বিদ্রূপ ভরা চোখে মন্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন
      ইস কী অবস্থা এদের! কেউ ফোকলা, কারো চামড়া ঝুলে গেছে, কেউ চোখে ভালো দেখতে পায় না, কেউ কানে ভালো শুনতে পায়না। প্রশ্ন করলে তৃতীয় বারে উত্তর দেয়। তারপর গলার স্বর ফোকলা দাঁতের মধ্যে দিয়ে এমন ভাবে বেরোয় যে মনে হয় শিশুদের আধো আধো স্বরে কথা। নাঃ এরা বাতিল! জঞ্জালের দলে। নরসেন যে এমন কিছু ভাবছেন তা মন্ত্রীরা আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন।
      নরসেন তাদের বললেন, "আপনারা তো অনেক দিন ধরেই এখানে কাজ করছেন। আমার মনে হয় এখন আপনাদের একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। নিজের নিজের দেশের বাড়িতে ফিরে যান। তীর্থক্ষেত্র থেকে ঘুরে আসুন। আপনাদের এই রাজসভায় আর থাকতে হবেনা।" মন্ত্রীরা ভাবলেন যে কথায় বলে, অহংকারী পুরুষ এর নিজের বলতে কিছুই থাকে না কখনও। ভালো বন্ধু বা আত্মীয় স্বজন, নিজের বাড়ি, সবই সে হারায়। সুতরাং বুড়ো মন্ত্রীরা সকলেই নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গেলেন। কেউ বা তীর্থক্ষেত্রে রওনা দিলেন।
অন্যদিকে মহাসেন মারা গেছে শুনে শত্রু রাজ্যের রাজারা তো মহাখুশি। তারা তো সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। আর নরসেন যে অপদার্থ, মূর্খ, অদূরদর্শী সেটা জানতেও কারও বাকি রইল না। নরসেন বুদ্ধিমান বৃদ্ধ মন্ত্রীদের তাড়িয়ে দিয়েছেন। অতএব এই হল সুবর্ণ সুযোগ। সিন্ধু দেশের রাজার মন্ত্রী রাজাকে পরামর্শ দিলেন, "রাজন, এই হচ্ছে দারুণ সময় আক্রমণের। কিন্তু তার আগে আমাদের জানতে হবে যে এখন নরসেন এর রাজসভায় কোনও পুরনো মন্ত্রী আছেন কিনা। যদি একজনও থেকে থাকেন তাহলে এই কাজ অসম্ভব।" সিন্ধু রাজা বললেন, "তাহলে উপায়?" মন্ত্রী খানিক মাথা চুলকে বললেন, উপায় একটা আছে।" মন্ত্রী করলেন কী, নিজে একজন রাজদূত সেজে তিনটি পুতুল নিয়ে নরসেন এর রাজসভায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। বললেন সিন্ধুরাজা সুন্দরপুরের পরাক্রমী রাজা নরসেন এর জন্যে তিনটি পুতুল পাঠিয়েছেন। নরসেন খুব বুদ্ধিমান এবং শক্তিশালী বলে গুজব শোনা যায়। তাই মহারাজ যদি তিনটে পুতুলের ঠিকঠাক মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন তো বোঝা যাবে সেই গুজব আসলে সত্যি। সিন্ধু রাজা যে অনেক রাজাদের হারিয়ে সুন্দরপুর এর সীমানায় উপস্থিত হয়েছেন তা নরসেন জানতেন। তাই এই পরীক্ষা প্রত্যাখ্যান করা দারুণ অসম্মানের। যে মন্ত্রীরা নতুন বহাল হয়েছেন তারা কেউই কিছু বলতে পারলেন না। শুধু ঘেমে নেয়ে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। নরসেন রাগে লজ্জায় লাল থেকে কালো হয়ে গেলেন কী করবেন বুঝতে না পেরে প্রাসাদের ভেতরে তার মা ধারিণীর কাছে গেলেন।
      রাজমাতা ধারিণী অত্যন্ত জ্ঞানী বিচক্ষণ মহিলা। তিনি নরসেনকে বললেন, "তুমি মূর্খ, তাই অত্যন্ত গুণী, বুদ্ধিমান মন্ত্রীদের রাজসভা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছ। তুমি কারোর কথায় কান দাও নি। এখন একজনই তোমাকে বাঁচাতে পারেন। তিনি হলেন বৃদ্ধ মন্ত্রী সুবুদ্ধি। সবাই চলে গেলেও রাজ পরিবারের প্রতি ভালবাসা কৃতজ্ঞতা বশত তিনি যাননি। শুধু তোমার কাছ থেকে আত্মগোপন করে আছেন। এই প্রাসাদের নীচে একটা গুপ্তকক্ষে তিনি আছেন। যাও গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাও। তিনিই একমাত্র তোমার সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।" ধারিণী’র কথায় নরসেন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। এবং সুবুদ্ধির কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলেন। বৃদ্ধ মন্ত্রী সুবুদ্ধি মৃদু হেসে বলে উঠলেন, "রাজন কাল সকালেই আমি আপনার সমস্যার সমাধান করে দেব।"
পরের দিন সকালে সমস্ত সভাসদ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কী হয় তা দেখার জন্যে। তিনটি পুতুল একই রকম দেখতে। একই তাদের রং, উচ্চতা, সাজ-পোশাক। এমতাবস্থায় কোন পুতুলটি বেশি ভালো বলা অসম্ভব। সুবুদ্ধি এগিয়ে এসে তিনটি পুতুলকেই খুব গভীর ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। একটা সরু কাঠি দিয়ে তিনি পুতুলের চোখ, নাক, মুখ ফোটানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেখানে কোনও ছিদ্র নেই।
      তিনি হঠা দেখলেন প্রথম পুতুলটির দুই কানেই দুটি ছিদ্র আছে। সরু কাঠি একটি ছিদ্রে ঢোকালে আরেকটি কানের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে যায়। দ্বিতীয় পুতুলটির দুটি কানে কোনও ছিদ্রই নেই। তৃতীয় পুতুলটির শুধু মাত্র একটি কানে ছিদ্র সেখান দিয়ে কাঠি ঢোকালে তা পুতুলটির পেটে পৌঁছোয়। সুবুদ্ধি মুচকি হাসলেন। নরসেন এখনও ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে। বাকি সভাসদদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন।
      সুবুদ্ধি বললেন মহারাজ এই তিনটি পুতুল আসলে তিন জাতের মানুষ। প্রথম পুতুলটির দুটি কানে ছিদ্রএই প্রকৃতির মানুষ বড়দের, শিক্ষকদের কথা তো শোনেন কিন্তু একটু পরেই ভুলে যান। যাকে বলে এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেওয়া।
      দ্বিতীয় পুতুলটির কানে কোনও ছিদ্র নেই, তার মানে এই প্রকৃতির মানুষ কারোর কথাই কানে নেয় না। আর তৃতীয় পুতুলটির একটি কানে ছিদ্র। আর সেই ছিদ্রপথ পেটে গিয়ে শেষ হয়েছে। তার মানে সে শুধু শোনেই না, সেই জ্ঞানকে একেবারে হজম করে আত্মস্থ করে নেয়. নিজের জীবনের অংশ করে নেয়। তাই তৃতীয় পুতুলটির দামই হবে সব থেকে বেশি।
      সুবুদ্ধির ব্যাখ্যায় রাজা মুগ্ধ হলেন। শত্রু রাজার মন্ত্রী নিজের জবাব পেয়ে মনে মনে আশাহত হয়ে ফিরে গেলেন। সিন্ধুরাজা বুঝলেন এখন আর সুন্দরপুর আক্রমণ করা যাবে না। যে রাজ্যে এত বুদ্ধিমান মন্ত্রী আছেন সেই রাজ্যের জয় নিশ্চিত। আর নরসেন সমস্ত পুরনো মন্ত্রীদের ফিরিয়ে এনে, অনেক সম্মান দিয়ে, পেট পুরে পোলাও কালিয়া খাওয়ালেন
___________
ছবি – সুজাতা ব্যানার্জি/ চ্যাটার্জি