পুরোনতুন গল্প:: সুবুদ্ধির বুদ্ধি - দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী


সুবুদ্ধির বুদ্ধি
(শ্রী হেমবিজয়গণি রচিত "বৃদ্ধমন্ত্রীকথা" অবলম্বনে)
দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

সমস্যা যতই কঠিন হোক না কেন, যদি বুদ্ধি থাকে ঘটে তবে সবই সহজ বটে। কী? বিশ্বাস হল না মোটে? সংস্কৃতে একটা প্রবাদ আছে - রাজাদের চোখ হল গুপ্তচর, পশুদের চোখ হল তাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয় বা গন্ধ গ্রহণের ক্ষমতা, সাধারণ লোকের দুটিই চোখ কিন্তু পন্ডিতদের চোখ হল তাদের বুদ্ধি
       কিন্তু মগজাস্ত্র নিয়ে এত কথা কেন? আরে বাপু সেই বিষয়েই একটা সুন্দর গল্প তোমাদের বলব।
      অনেক দিন আগের কথা। মন্দাকিনী নদীর তীরে খুব সুন্দর একটি রাজ্য ছিল সুন্দরপুর। যেমন সুন্দর নাম, তেমন সুন্দর রাজ্যের শোভা। বাগানে বাগানে সাজানো একটি রাজ্য। দুঃখের লেশমাত্র নেই। সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন মহাসেন। কিন্তু কী জানি কী এক নাম না জানা অসুখে তিনি হঠাআক্রান্ত হলেন। এবং কিছুদিনের মধ্যে তার মৃত্যু হল। এত ভালো রাজাকে হারিয়ে রাজ্য শুদ্ধু লোকের মনখারাপ। কারণ এরপরে তো সিংহাসন পাবে মহাসেন-এর অযোগ্য পুত্র নরসেন।
      নরসেন ছিলেন খুব অহংকারী। নিজের রূপের গর্বে তার মাটিতে পা পড়ত না। সিংহাসনে বসার পরে তিনি ভাবলেন, বাবার দিন তো গেছে। এখন বাবার সঙ্গে যারা কাজ করত সেই বুড়ো অযোগ্য মন্ত্রীদের দিয়ে আর কিই বা কাজ হবে। বরং ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দূর করে দিই সবাইকে। তাই একদিন সক্কাল সক্কাল তিনি মন্ত্রীদের ডেকে পাঠালেন একে একে মন্ত্রীরা সব এসে দাঁড়ালেন। নরসেন তাদের বিন্দুমাত্র সম্মানও দেখালেন না বিদ্রূপ ভরা চোখে মন্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন
      ইস কী অবস্থা এদের! কেউ ফোকলা, কারো চামড়া ঝুলে গেছে, কেউ চোখে ভালো দেখতে পায় না, কেউ কানে ভালো শুনতে পায়না। প্রশ্ন করলে তৃতীয় বারে উত্তর দেয়। তারপর গলার স্বর ফোকলা দাঁতের মধ্যে দিয়ে এমন ভাবে বেরোয় যে মনে হয় শিশুদের আধো আধো স্বরে কথা। নাঃ এরা বাতিল! জঞ্জালের দলে। নরসেন যে এমন কিছু ভাবছেন তা মন্ত্রীরা আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন।
      নরসেন তাদের বললেন, "আপনারা তো অনেক দিন ধরেই এখানে কাজ করছেন। আমার মনে হয় এখন আপনাদের একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। নিজের নিজের দেশের বাড়িতে ফিরে যান। তীর্থক্ষেত্র থেকে ঘুরে আসুন। আপনাদের এই রাজসভায় আর থাকতে হবেনা।" মন্ত্রীরা ভাবলেন যে কথায় বলে, অহংকারী পুরুষ এর নিজের বলতে কিছুই থাকে না কখনও। ভালো বন্ধু বা আত্মীয় স্বজন, নিজের বাড়ি, সবই সে হারায়। সুতরাং বুড়ো মন্ত্রীরা সকলেই নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গেলেন। কেউ বা তীর্থক্ষেত্রে রওনা দিলেন।
অন্যদিকে মহাসেন মারা গেছে শুনে শত্রু রাজ্যের রাজারা তো মহাখুশি। তারা তো সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। আর নরসেন যে অপদার্থ, মূর্খ, অদূরদর্শী সেটা জানতেও কারও বাকি রইল না। নরসেন বুদ্ধিমান বৃদ্ধ মন্ত্রীদের তাড়িয়ে দিয়েছেন। অতএব এই হল সুবর্ণ সুযোগ। সিন্ধু দেশের রাজার মন্ত্রী রাজাকে পরামর্শ দিলেন, "রাজন, এই হচ্ছে দারুণ সময় আক্রমণের। কিন্তু তার আগে আমাদের জানতে হবে যে এখন নরসেন এর রাজসভায় কোনও পুরনো মন্ত্রী আছেন কিনা। যদি একজনও থেকে থাকেন তাহলে এই কাজ অসম্ভব।" সিন্ধু রাজা বললেন, "তাহলে উপায়?" মন্ত্রী খানিক মাথা চুলকে বললেন, উপায় একটা আছে।" মন্ত্রী করলেন কী, নিজে একজন রাজদূত সেজে তিনটি পুতুল নিয়ে নরসেন এর রাজসভায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। বললেন সিন্ধুরাজা সুন্দরপুরের পরাক্রমী রাজা নরসেন এর জন্যে তিনটি পুতুল পাঠিয়েছেন। নরসেন খুব বুদ্ধিমান এবং শক্তিশালী বলে গুজব শোনা যায়। তাই মহারাজ যদি তিনটে পুতুলের ঠিকঠাক মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন তো বোঝা যাবে সেই গুজব আসলে সত্যি। সিন্ধু রাজা যে অনেক রাজাদের হারিয়ে সুন্দরপুর এর সীমানায় উপস্থিত হয়েছেন তা নরসেন জানতেন। তাই এই পরীক্ষা প্রত্যাখ্যান করা দারুণ অসম্মানের। যে মন্ত্রীরা নতুন বহাল হয়েছেন তারা কেউই কিছু বলতে পারলেন না। শুধু ঘেমে নেয়ে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। নরসেন রাগে লজ্জায় লাল থেকে কালো হয়ে গেলেন কী করবেন বুঝতে না পেরে প্রাসাদের ভেতরে তার মা ধারিণীর কাছে গেলেন।
      রাজমাতা ধারিণী অত্যন্ত জ্ঞানী বিচক্ষণ মহিলা। তিনি নরসেনকে বললেন, "তুমি মূর্খ, তাই অত্যন্ত গুণী, বুদ্ধিমান মন্ত্রীদের রাজসভা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছ। তুমি কারোর কথায় কান দাও নি। এখন একজনই তোমাকে বাঁচাতে পারেন। তিনি হলেন বৃদ্ধ মন্ত্রী সুবুদ্ধি। সবাই চলে গেলেও রাজ পরিবারের প্রতি ভালবাসা কৃতজ্ঞতা বশত তিনি যাননি। শুধু তোমার কাছ থেকে আত্মগোপন করে আছেন। এই প্রাসাদের নীচে একটা গুপ্তকক্ষে তিনি আছেন। যাও গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাও। তিনিই একমাত্র তোমার সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।" ধারিণী’র কথায় নরসেন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। এবং সুবুদ্ধির কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলেন। বৃদ্ধ মন্ত্রী সুবুদ্ধি মৃদু হেসে বলে উঠলেন, "রাজন কাল সকালেই আমি আপনার সমস্যার সমাধান করে দেব।"
পরের দিন সকালে সমস্ত সভাসদ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কী হয় তা দেখার জন্যে। তিনটি পুতুল একই রকম দেখতে। একই তাদের রং, উচ্চতা, সাজ-পোশাক। এমতাবস্থায় কোন পুতুলটি বেশি ভালো বলা অসম্ভব। সুবুদ্ধি এগিয়ে এসে তিনটি পুতুলকেই খুব গভীর ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। একটা সরু কাঠি দিয়ে তিনি পুতুলের চোখ, নাক, মুখ ফোটানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেখানে কোনও ছিদ্র নেই।
      তিনি হঠা দেখলেন প্রথম পুতুলটির দুই কানেই দুটি ছিদ্র আছে। সরু কাঠি একটি ছিদ্রে ঢোকালে আরেকটি কানের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে যায়। দ্বিতীয় পুতুলটির দুটি কানে কোনও ছিদ্রই নেই। তৃতীয় পুতুলটির শুধু মাত্র একটি কানে ছিদ্র সেখান দিয়ে কাঠি ঢোকালে তা পুতুলটির পেটে পৌঁছোয়। সুবুদ্ধি মুচকি হাসলেন। নরসেন এখনও ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে। বাকি সভাসদদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন।
      সুবুদ্ধি বললেন মহারাজ এই তিনটি পুতুল আসলে তিন জাতের মানুষ। প্রথম পুতুলটির দুটি কানে ছিদ্রএই প্রকৃতির মানুষ বড়দের, শিক্ষকদের কথা তো শোনেন কিন্তু একটু পরেই ভুলে যান। যাকে বলে এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেওয়া।
      দ্বিতীয় পুতুলটির কানে কোনও ছিদ্র নেই, তার মানে এই প্রকৃতির মানুষ কারোর কথাই কানে নেয় না। আর তৃতীয় পুতুলটির একটি কানে ছিদ্র। আর সেই ছিদ্রপথ পেটে গিয়ে শেষ হয়েছে। তার মানে সে শুধু শোনেই না, সেই জ্ঞানকে একেবারে হজম করে আত্মস্থ করে নেয়. নিজের জীবনের অংশ করে নেয়। তাই তৃতীয় পুতুলটির দামই হবে সব থেকে বেশি।
      সুবুদ্ধির ব্যাখ্যায় রাজা মুগ্ধ হলেন। শত্রু রাজার মন্ত্রী নিজের জবাব পেয়ে মনে মনে আশাহত হয়ে ফিরে গেলেন। সিন্ধুরাজা বুঝলেন এখন আর সুন্দরপুর আক্রমণ করা যাবে না। যে রাজ্যে এত বুদ্ধিমান মন্ত্রী আছেন সেই রাজ্যের জয় নিশ্চিত। আর নরসেন সমস্ত পুরনো মন্ত্রীদের ফিরিয়ে এনে, অনেক সম্মান দিয়ে, পেট পুরে পোলাও কালিয়া খাওয়ালেন
___________
ছবি – সুজাতা ব্যানার্জি/ চ্যাটার্জি

No comments:

Post a comment