ইতিহাস:: রাজকাহিনী:: সমুদ্রগুপ্তের খাতা (গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী এবং কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক) - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

সমুদ্রগুপ্তের খাতা
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী এবং কুষা সম্রাট কনিষ্ক
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

আমি সমুদ্রগুপ্ত আর একবার হাজির হয়েছি তোমাদের সামনে। এক টুকরো অতীত নিজের খাতার পাতা উল্টে নিয়ে এসেছি শুধু তোমাদেরই জন্য। তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ তাই তোমাদের ওপর আমাদের অনেক আশা। থাক আর কথা বাড়াব না, সরাসরি গল্পে চলে আসি। আজ বলব দুজন মহান রাজার কথা। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী এবং কুষা সম্রাট কনিষ্কের কথা। তার আগে আমাদের মৌর্য পরবর্তী যুগের ভারতের কথা একটু জেনে নিতে হবে।

অশোক কোনও যোগ্য উত্তরাধিকারী তৈরি করে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হয়। শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে বসেন তাঁরই সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ (খ্রিঃ পূঃ ১৮৫-৭৩ পর্যন্ত মগধে এদের শাসন চলেছিল) কালিদাসের ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম’ নাটকে রাজা অগ্নিমিত্র’র সময়ের কিছু ঘটনা জানা যায়। এরা ব্রাহ্মণ ছিলেন। এদিকে উত্তর ভারতে চরম রাজনৈতিক অরাজকতা চলছে। মগধের অধীনে যেসব রাজ্য ছিল, তারা আস্তে আস্তে স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। দাক্ষিণাত্যে সাতবাহনরা মগধ থেকে স্বাধীন হয়ে আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। চেতবংশের নেতৃত্বে কলিঙ্গ আবার স্বাধীন হয়ে যায়। দেশের ভেতরে এই অরাজকতার সুযোগে ব্যাকট্রিয় গ্রিকরা পাঞ্জাব ও সিন্ধুপ্রদেশের এক বিশাল জায়গা দখল করে নেয়। শক, পহ্লব, কুষাণ ইত্যাদি বিদেশী জাতি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজ্য স্থাপন করে।

সাতবাহনদের সম্পর্কে বেশ কম অনুশাসনলিপি পাওয়া গেছে। পুরাণে সাতবাহনদের অন্ধ্র বলা হয়েছে এবং এদের বসবাস ছিল গোদাবরী ও কৃষ্ণা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে
দক্ষিণ ভারতে সাতবাহন বা অন্ধ্ররা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। পুরাণ অনুসারে সিমুক কাণ্ববংশের অবসান ঘটিয়ে সাতবাহন বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। সিমুকের ভাই কৃষ্ণ ছিলেন পরবর্তী রাজা। তৃতীয় রাজা ছিলেন সাতকর্ণী। তাঁর রানি নায়নিকার অনুশাসনলিপি, নাসিক প্রশস্তি এবং গুণাঢ্য রচিত বৃহৎকথা থেকে এই রাজবংশ সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়। সাতবাহন রাজারা নিজেদের মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হতেন। অর্থাৎ নিজেদের নামের আগে নিজেদের মায়েদের নাম বসাতেন। সাতবাহন সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। যেমন গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী, বশিষ্ঠীপুত্র পুলমায়ী, যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী।
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী ছিলেন এই বংশের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজা (১০৬ - ১৩১ খ্রিস্টাব্দ)তাঁর মৃত্যুর ঠিক উনিশ বছর পর তাঁর মা গৌতমী বলশ্রী নাসিক প্রশস্তি রচনা করেন। এই লেখাটি থেকে তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়। তিনি নিজে ছিলেন একজন যোদ্ধা, একজন সংস্কারক, একজন সুশাসক। বহু রাজ্য জয় করে তিনি সাতবাহন সাম্রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি করেন। ‘ক্ষহরত’ গোষ্ঠীর শক রাজা নহপাণকে তিনি পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু ‘করদমক’ শাখার শাসক রুদ্রদমনের কাছে পরাজিত হন। শেষ পর্যন্ত সাতবাহন রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী নিজের পুত্র বশিষ্ঠীপুত্র পুলমায়ীর সঙ্গে রুদ্রদমনের কন্যার বিয়ে দেন। শকদের সাথে কিছুদিন সম্পর্ক ভালো থাকলেও আবার শক-সাতবাহনদের মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয়। তবে রুদ্রদমন তাঁকে দুবার যুদ্ধে হারালেও তাঁর রাজ্য গ্রাস করেননি। সাতবাহনদের রাজধানী ছিল পৈথান বা প্রতিষ্ঠান নগর।
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর পর তাঁর পুত্র বশিষ্ঠীপুত্র পুলমায়ী পরবর্তী রাজা হলেন। যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী ছিলেন এই বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়।

নহপাণ কে পরাজিত করার পর সম্রাটের দরবারে উৎসব
সাতকর্ণীর রৌপ্যমুদ্রা

সাতবাহন রাজ্যে হিন্দু ও বৌদ্ধ এই দুই ধর্মের লোকই বাস করত। এঁরা প্রকাণ্ড সব পাহাড় কেটে গুহা বানিয়ে তার মধ্যে সুন্দর সুন্দর মন্দির নির্মাণ করান। সাতবাহন রাজাদের আমলেই বিখ্যাত অজন্তা গুহা তৈরির কাজ শুরু হয়। পরে অন্য রাজারাও এই গুহার মধ্যে আর অনেক ছবি ও মূর্তি তৈরি করেছিলেন। উত্তর ভারতের আর্য এবং দক্ষিণের দ্রাবিড় সংস্কৃতির মধ্যে এক সমন্বয় ঘটিয়ে সাতবাহনরা ভারতের সংস্কৃতিকে সযত্নে লালন করে গেছেন।
এই হল সাতবাহনদের গল্প। এবার কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক সম্পর্কে কিছু কথা বলে আজকের খাতা বন্ধ করব।

ভারতীয় কুষাণরা ছিল ইয়ো-চি নামক মধ্য এশিয়ার একটি যাযাবর জাতির শাখা। এরা যখন উত্তর পশ্চিম চিনে বসবাস করছিল তখন হূণদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে এরা পশ্চিম দিকে সিরদরিয়া নদীর তীরে এসে উপস্থিত হয়। এখানে তখন শকরা বসবাস করছিল। শকরা এই ইয়ো-চিদের কাছে পরাজিত হয়ে এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়। ইয়ো-চিরা এবার দক্ষিণ দিকে অক্ষু নদীর উপত্যকায় এসে পৌঁছায়। এই সময় ইয়ো-চিরা পাঁচটি আলাদা শাখায় ভাগ হয়ে যায়। কুষাণরা হল এদেরই একটি শাখা। এরা ভারতে প্রবেশ করেছিল। এই বংশের প্রথম রাজা হলেন কুজুল কদফিসেস। তিনি কাবুল, গান্ধার ও দক্ষিণ আফগানিস্তান জয় করেন।  তবে ভারতে এই বংশের প্রতিষ্ঠা করেন বিম কদফিসেস। অনুমান করা হয় যে তিনি শৈব ছিলেন

কণিষ্কের স্বর্ণমুদ্রা

কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন কণিষ্ক। সম্রাট অশোকের মতো তিনিও বৌদ্ধধর্মানুরাগী ছিলেন। আর সেই কারণেই তাঁকে দ্বিতীয় অশোক আখ্যা দেওয়া হয়। ৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহাসনে বসেন। এই বছরই তিনি শকাব্দ নামে এক নতুন বর্ষ গণনার প্রচলন করেন। সাম্রাজ্য বিজেতাই শুধু নয়, ছিলেন সুশাসক এবং শিল্প-সাহিত্যের অনুরাগীও।
হিউয়েন সাং-এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। শুধু ভারতেই নয় ভারতের বাইরে চিনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাশগড়, খোটান, ইয়ারখন্দ অধিকার করেন। তবে চিন সেনাপতি প্যান চাও-এর কাছে তিনি একবার পরাজিত হন। এই অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য তিনি চিন আক্রমণ করেন। এবং সন্ধির জামিন হিসেবে সম্রাটের (হো-তি) এক পুত্রকে নিজের দরবারে এনে রেখেছিলেন। ভারতের গান্ধার ও কাশ্মীর থেকে কোঙ্কণ ও বারাণসী পর্যন্ত এক বিশাল অঞ্চলের তিনি অধীশ্বর ছিলেন।
বিহার ও বাংলাও তাঁর অধীনে ছিল। এই সমস্ত অঞ্চলে তাঁর নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া গেছে।পুরুষপুর বর্তমান পেশোয়ার তাঁর রাজধানী ছিল। কাশ্মীরে তিনি কণিষ্কপুর নামে একটি শহরের প্রবর্তন করেন। (কুষাণ সম্রাট বিম কদফিসেস ভারতে প্রথম স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন।)

কণিষ্ক বহু মঠ ও চৈত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। তাঁরই চেষ্টায় চিন, জাপান, কোরিয়ায় বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটে। হীনযান ও মহাযান এই  দুই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে মতভেদ দূর করার জন্য তিনি চতুর্থ বৌদ্ধসঙ্গীতির আহ্বান করেন। বসুমিত্র, অশ্বঘোষ, নাগার্জুন এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রায় তিনমাস চলেছিল এই অধিবেশনএই দীর্ঘ সম্মেলনে সঙ্কলিত ত্রিপিটকের ব্যাখ্যা করেন বসুমিত্র। এই ব্যাখ্যা মহাবিভাষা নামে পরিচিত। কাশ্মীর, জলন্ধর অথবা কান্দাহারে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই ছিল শেষ বৌদ্ধ সম্মেলন। এটি কণিষ্কের রাজত্বকালে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
তিনি শিল্প ও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। কুষাণদের অন্যতম অবদান হল গান্ধার শিল্প।  গ্রিক, রোমক এবং ভারতীয় শিল্পরীতির সংমিশ্রণের ফলে এই শিল্পকলার উদ্ভব ঘটে। কণিষ্কের সময়েই এই রীতির উদ্ভব ঘটে। এই যুগের বুদ্ধমূর্তিগুলো দেখলে গান্ধার শিল্প সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা করা যায়। রাজধানী পুরুষপুরে তিনি বুদ্ধদেবের দেহাবশেষের ওপর এক বিশাল চৈত্য নির্মাণ করান যার শিল্প সুষমা ছিল অপূর্ব। এক গ্রিক স্থপতি এজিসিলাওস-এর পর্যবেক্ষণে এই চৈত্য নির্মিত হয়েছিল। মথুরা নগরীর শোভাও তাঁর শিল্পরুচির পরিচয় দেয়। তিনি অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
তাঁর সাহিত্যের প্রতিও গভীর অনুরাগ ছিল। তাঁর রাজসভায় বহু গুণীজনের সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। দার্শনিক বসুমিত্র, শাস্ত্রকার নাগার্জুন, দার্শনিক বসুবন্ধু, অশ্বঘোষ তাঁর সভা অলঙ্কৃত করেছিলেন। ‘বুদ্ধচরিত’ অশ্বঘোষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন তিনি। ভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্রে রচয়িতা মহাঋষি চরক তাঁর চিকিৎসক ছিলেন। ‘চরক-সংহিতা’ এবং ‘সুশ্রুত-সংহিতা’ এই যুগেই সংকলিত হয়। অস্ত্রোপচারে পথিকৃৎ ছিলেন সুশ্রুত। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি বৃদ্ধি পেয়েছিল এই যুগে।

কণিষ্কের মৃত্যুর পর কুষাণদের ক্ষমতা আস্তে আস্তে লোপ পেতে থাকে।  ২৩ বছর রাজত্ব করেছিলেন।  তাঁর নিজেরই কিছু সৈনিক তাঁকে হত্যা করেছিল। পরবর্তী সম্রাটরা হলেন বাসিষ্ক, হুবিষ্ক এবং বাসুদেব। বাসুদেবই এই বংশের শেষ স্মরণীয় শাসক। উত্তর ভারতে নাগ বংশের আবির্ভাবের পর কুষাণদের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।
আজ তোমাদের পর পর দুজন রাজার গল্প শোনালাম। সেই সঙ্গে তাঁদের বংশেরও একটু পরিচয় দিলাম। আজ এই পর্যন্তই থাক। দেখা হবে আবার আগামী সংখ্যায়। নিজের খাতার পাতা উল্টে হাজির করব কোনও একজন রাজাকে। আমাদের রাজকাহিনী চলতেই থাকবে। তোমরা ভালো থেকো সবাই।

কণিষ্কের মস্তকবিহীন মূর্তি
_____
ছবি - আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment