দাদু আর দিদার গল্প
সহেলী চট্টোপাধ্যায়
আমার অনেক গল্প লিখতে
ইচ্ছা হয়, কিন্তু সময় আর সুযোগ না থাকার কারণে ছোট্ট বন্ধুদের জন্য কিছুই লিখতে
পারি না। গল্প লেখার থেকে সংসারকে দেখা বেশি দরকার। যখন দাদু দিদা ছিলেন, অনেক গল্প বলতেন আমাকে। এখনকার দিনে গল্প কেউ পছন্দ করে না, বলা তো দূরের কথা। প্রত্যেকে সংসারের গল্প করে, অসুখবিসুখের গল্প করে,
কী সম্পত্তি পেল না পেল তার গল্প করে। শ্বশুর-শাশুড়ি কেমন বদ বা কী মার্কেটিং করবে, কী রান্না করবে এই সব গল্প করতে পছন্দ করে।
তাই আমার কারোর সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয় না। আর কোনো কাজ না থাকলেও টেনে টেনে কাজ করবে বা ফোন দেখে সময় নষ্ট করতে চায়।
অবসর চায় না। সব সময় গতি চায়। দিদা দাদুর জন্য মনটা খুব খারাপ লাগে। এঁরা আমাকে কত
ভালো ভালো গল্প বলেছেন! আবার কাজও
কত করতেন! ওদের বলে যাওয়া সেই সব গল্প মনে করার চেষ্টা করি। ম্যাজিক ল্যাম্পের বন্ধুদের
জন্য কিছুটা লিখে রাখলাম।
আমি দাদুকে কোনোদিন কোনো গল্পের বই পড়তে দেখিনি। হোমিওপ্যাথির বই পড়তেন হ্যানিম্যানের লেখা বা
কাগজ পড়তেন, কিন্তু অনেক গল্প জানতেন। কলেজ লাইফে যা
পড়তেন সব মনে থাকত। সাহিত্য ভালো পড়াতে পারতেন। ইংরাজি, সংস্কৃত, বাংলা ভালো পড়াতেন। তিনি উর্দু এবং হিন্দিও ভালো জানতেন। ছোটোবেলায় মাদ্রাসায় পড়েছেন। অনেক
মুসলিম বন্ধু ছিল দাদুর। একজন লন্ডনের বড়ো ডাক্তার হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলাম।
দাদুকে ফোন করতেন মাঝে মাঝে। সেই গল্প অন্য দিন করা যাবে। দাদুও ডাক্তার হতে পারতেন, কিন্তু হননি। তিনি সবসময় প্রথম হতেন। দাদু খুব ঠাকুরভক্ত, হরিনাম করতেন। মা কালী আছেন বাড়িতে, আবার এত মুসলিম বন্ধুবান্ধব
কী করে হল? ভেবেই আমার খুব আশ্চর্য লাগত। দাদু বলতেন, ‘আমি
যতই বাছবিচার করি না কেন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের বুকে জড়িয়ে ধরব।’
দিদা ছিলেন খাস
কলকাতার। মানিকতলার লোক। দিদাদের বাড়ির কাছে জৈন মন্দির ছিল। রোজ বিকেলে বেড়াতে
আসতেন নিজের কাজিনদের সঙ্গে। সবাই মিলে খুব আনন্দ করেছেন।
দিদা পুরোনো কলকাতার অনেক গল্প বলতেন। নেতাজিকে দেখেছেন খুব ছোটো বয়সে। গান্ধিজিকে দেখেছিলেন। সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোর কথা বলতেন। ছেলেরা লাঠি খেলত।
একটা কোন স্বদেশি মেলার কথা বলেছিলেন কয়েকবার। সেখানে সব
ভারতের জিনিস, যেমন কাপড় চরকা
ইত্যাদি বিক্রি হত। আমি অনেক জিনিস ভুলে গেছি। জিজ্ঞাসা করে যে জেনে নেব তারও উপায়
নেই। দুজনেই চলে গেছেন। দিদা কলকাতায় থাকতেন এবং প্রচুর বই পড়তেন। প্রাথমিক
শিক্ষার পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। খাস কলকাতার মেয়ের বিয়ে হল রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র
রায়ের জন্মস্থান হাওড়া জেলার পেঁড়ো বসন্তপুর গ্রামে। দিদার ষোলো বছর আর দাদুর কুড়ি
হবে হয়তো। দিদার গায়ের রং কালো ছিল, তাই কলকাতার কোনো পাত্র দিদাকে বিয়ে করতে
চায়নি। কেউ কেউ আবার অনেক টাকা পণ চেয়েছিল।
দিদার বাবা এক সময় দাদুকে পেয়ে যান। দাদু পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন। দাদুর সঙ্গে দিদার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর
দিদার খুব অসুবিধা হতে লাগল। আলো ঝলমলে কলকাতার বদলে এমন গণ্ডগ্রাম দিদার ভালো লাগত না। তারপর শাড়ি পরে থাকা বা
গরমের মধ্যে একগলা ঘোমটা দেওয়া খুব কষ্টকর ব্যাপার। দিদা বিয়ের আগে বাড়িতে ফ্রক
পরতেন। বাইরে গেলে শাড়ি পরতেন। দিদার আবার রাত্তির হলেই টয়লেট পেত। কিন্তু গ্রামের
বাড়িতে টয়লেট ছিল না। সেই দূরে পুকুর পাড়টাই বাথরুম হিসেবে ব্যবহার করত সবাই। আর
সেখানেই একটা বড়ো ভয়ের জায়গা ছিল। জমিদার বাড়ি ছিল কাছেই। একজন অত্যাচারী জমিদার ছিল
অনেক আগে। রটে গেছিল সেই জমিদারবাবু ভূত হয়েছিলেন। ওনার নাম ছিল গোলোক টকাল। তাঁকে
সবাই যমের মতো ভয় পেত। ইনি অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খুনও করেছেন অনেক। এক সময় লুকিয়ে বেড়াতেন। ব্রিটিশ পুলিশ
গুপ্তচর পাঠিয়ে এঁকে ধরেছিল। পুলিশের সি আই ডি অফিসার
ছেঁড়া-ফাটা জামা পরে গরম শিঙাড়া
বিক্রি করত রোজ। সব দিকে লক্ষ রাখত আর হাঁক দিত, ‘গরম শিঙাড়া, গরম শিঙাড়া’। সেই সি আই ডি সাহেব কোনোভাবে টকালকে ধরেছিল।
এসব বহু আগের কথা। গোলোক টকালের অনেক গল্প ছিল। এই গোলোক টকাল ভূত হয়েছিলেন। আমার
দিদার যখন রাতে বাথরুমে যাওয়ার দরকার হত তখন সব ভৌতিক গল্পগুলো মনে পড়ে যেত। আর
জমিদারের আত্মা যদি চলে আসে তাহলে কী হবে! টকাল বাড়ি তো
কাছেই। তাই দিদা ননদকে, আমার আরেক দিদাকে, সঙ্গে নিয়ে যেতেন।
আমার দাদুর বাড়িতে মা কালী
আছেন। তিনি পরিবারের অনেক দিনের সদস্যা। এখনও যাই যখন তাঁকে দেখে আসি। মহাদেব
আছেন। দামোদর আছেন। দামোদর টকাল বাড়ির ঠাকুর। টকাল পরিবারে একবার একটা অদ্ভুত ঘটনা
হয়েছিল। একজন মৃত্যুর পর ফিরে এসেছিলেন। এটি খুব জনপ্রিয় গল্প ছিল। ওই অঞ্চলের
প্রতিটা মানুষই জানত গল্পটা। ঘটনাটা হয়েছিল এই রকম, একই পরিবারের দুই ভাই এক
রাত্তিরে মারা যায়। একজনকে আবার যমরাজ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তার সময় হয়নি বলে। আরেক
ভাইকে খুব খাতির করছিলেন যমরাজ। যা যা খেতে চাইছেন সব এনে হাজির করছেন। কিন্তু এই
ভাইটিকে যেন চোখেই দেখতে পাচ্ছেন না। এই ভদ্রলোক বেশ খানিকক্ষণ চেঁচামেচি করার পর
দুটো ছোটো ছোটো রসকড়া হাতে ধরিয়ে
দিল দুটো যমদূত। ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার ভাইকে এত খাতির করা হচ্ছে, অথচ আমার
বেলায় দুটো ছোটো রসকড়া!’ (ওই
অঞ্চলের খুব সুন্দর মিষ্টি ছিল। খুব ভালো খেতে ছিল। এক
সময় খেয়েছি, কিন্তু এখন আর কেউ করে না।) যমদূতেরা বলেন যে, ‘যাকে খাতির করছি সে সবাইকে ভালোবাসত, অনেক দানধ্যান করেছে। দামোদরের কত ভক্ত
ছিল। তাই ওর এত খাতির হচ্ছে। ও এবার বিষ্ণুলোকে যাবে। তুমি কখনও কারোর জন্য কিছু
করনি। টাকা থাকার পরেও গরিব প্রজাদের জন্য কিছু ভালো কাজ করনি। রসকড়া যে পেয়েছ তাই অনেক। দামোদরকেও তো এই দিতে শুধু।’ এই সব কথা হতে হতে সেই লোকটির জ্ঞান ফিরে আসে। এরপর থেকে তিনিও খুব ভালো মানুষ হয়ে ওঠেন। এই ঘটনার কথা দিদার কাছে বহুবার শুনেছি। দাদু দিদা যা
শুনতেন যা পড়তেন সব মনে রেখে দিতেন।
আমার
দিদার ভৌতিক অভিজ্ঞতা অবশ্য জনবহুল কলকাতা শহরেই হয়ে গেছে। দিদা, দিদার মা, আমার বড়োদিদা মানে আমার দিদার বড়ো বৌদি, আমার মা - এঁদের প্রত্যেকের ভৌতিক অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু
আমার হয়নি, আর আমি চাইও না এমন অভিজ্ঞতা আমার হোক।
কলকাতায় একবার দিদা একজন পাড়ার ভদ্রমহিলাকে ডাকতে যান। কোথাও হয়তো বেরুবেন ঠাকুর দেখতে। দিদার মা বলেন, ‘পাশের বাড়ির কাকিমাকে ডেকে আন।’ একসঙ্গে যাবেন সবাই। দিদা একজনকে দেখেন, সে ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। দিদা ভাবেন সেই কাকিমাই
হবেন। সেই ভদ্রমহিলাকে ডাকার পর সে কিছুটা আসে দিদার সঙ্গে। তারপর নাকি একটা পাঁচিলের মধ্যে মিলিয়ে যায়। এটা দেখে দিদা খুব ভয়
পেয়ে যান। পরে বড়োদের বলেন। সবাই ভাবেন কোনো আত্মাই ছিল এটি। দিদার মা দেখেছেন নিজের মৃত জা-কে। মৃত্যুপথযাত্রী শাশুড়ির কাছে তিনি আসতেন। দিদার মা তাঁকে চলে যেতে
বলতেন। এই সব ঘটনা শুনেছিলাম।
দিদার মামার বাড়ি
গুজুরপুর গ্রামে। সেখানেও অনেক ভূত গিজগিজ করত। মাখন মামা তো প্রায় সেলিব্রিটি হয়ে
গেছিলেন আমার মতো ছোটোদের কাছে। মাখন মামা দিদার মামার বাড়ির
কাছেই থাকতেন। ওনাদের পরিচিত ছিলেন। তাঁর অকালপ্রয়াণ হয়। এরপর তিনি দিদার দিদিমাকে ধরেছিলেন। বাড়িতে খুব
বিরক্ত করতেন। জিনিসপত্র ওপরে শূন্যে উঠিয়ে দিতেন। এমনকি খাটও শূন্যে ঝুলিয়ে
দিতেন। নিজের স্ত্রী এবং পরিবারের ভরণপোষণের ভার নিতে হয়েছিল, তারপর তিনি দিদার মামার বাড়ি থেকে বিদায় নেন। মাখন মামার পর্ব অনেক বড়ো ছিল। ওঝা এসে সর্ষে পড়ার ছ্যাঁকা দিয়ে তবে
মাখন মামাকে জব্দ করতে পেরেছিল। যাওয়ার সময় বাগানের একটা গাছের ডাল ভেঙে দিয়ে যান। গুজুরপুর নাম শুনলেই আমার ভয় করে এখনও, কারণ এই গ্রামে অনেক ঘটনা হয়েছে।
মিনে পিসির কথা
শুনেছিলাম। মিনে পিসি যখন খুব ছোটো তখন তার মা মারা যায়। তার মায়ের আত্মা রাত্তির
বেলায় এসে মিনে পিসিকে ডাকত। খোনা স্বরে শুধু বলে যেত, ‘মিঁনে কেঁ দেঁ না! মিঁনে কেঁ দেঁ না!’ এই গল্পটা
শুনে খুব ভয় লাগত। কে যে ডাকত তা দেখার সাহস কারও হয়নি। হয়তো কোনো জন্তুও হতে
পারে। আগেকার দিনের মানুষ গল্প শুনতে পছন্দ করত, কারণ
তাদের কাছে টিভি বা ফোন ছিল না। সময় কাটাবার তেমন কিছু ছিল না। তাই অবসর সময়ে
নানান কল্পনা করত তারা। বা সবটা হয়তো কল্পনা নয়। কিছু
সত্যও ছিল। গুজুরপুরের সব গল্প বলা সম্ভব হল না। পরে আবার চেষ্টা করব।
আমরা এখন বসন্তপুরে
যাব। দাদুদের পরিবারে মা কালী আছেন। মন্দিরে আরও কয়েকটি পরিবারের পালা পড়ে।
অনেক জ্ঞাতিরা আছেন। প্রত্যেকের সময় আসে। নির্দিষ্ট দিনে তাদের পুজোর দিনক্ষণ পড়ে।
আমাদের পড়ে ফাল্গুন মাসে, শিবরাত্রির পরের দিন যে অমাবস্যা
পড়ে সেই দিন। দিনের বেলায় পুজো হয়। ওইদিন বাস্তু মনসাকে
পুজো দেওয়া হয়। গ্রামে যত ঠাকুর আছেন প্রত্যেককে পুজো দেওয়া হয়। আমি কয়েকবার গেছি।
ভালো লাগে খুবই। দাদু মন্দিরে চণ্ডীপাঠ করতেন। ন’দাদুও পুজো করতেন। কখনও মনসার পুজো করে দিতেন। এখন আমার এক মামা পুজোপাঠ
খুব ভালো করেন। আমার দাদুর মা যখন ছিলেন তখন তাঁর কাছে
কিছু গল্প শুনেছিলাম। মা কালী রাত্রিবেলায় বেরিয়ে পড়তেন। তাঁর পায়ের নূপুরের শব্দ
পেয়েছেন আমার বড়োমা মানে দাদুর মা। ঝমঝম শব্দ হত। মাঝখানে
থামত একটু। পুকুরের জলে শব্দ হত যেন কেউ ঝাঁপাল। আবার কিছুক্ষণ পর ঝমঝম শব্দ।
দিদার শাশুড়ি-মা মানে বড়োমার কখনও সাহস হয়নি যে জানলা
খুলে দেখি কে যায় নুপূর পরে। তাঁর মনে হত গভীর রাতে মন্দির থেকে বেরিয়ে মা কাছাকাছি
একটা পুকুরে স্নান করতেন। তারপর আবার একটু ঘোরাঘুরি করে মন্দিরে চলে যেতেন।
মন্দিরে মায়ের ঘটের মধ্যে সাপ থাকত। ঘটের জল বছরে একবার পালটানো হত। মন্দিরেও অনেক সাপ থাকত। তবে তারা কাউকে
কামড়াত না। আমার দিদার জাঠ-শাশুড়ি সংসারী মানুষ হলেও
আধ্যাত্মিকতায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি মায়ের কাছ থেকে দৈব ওষুধ এনেছিলেন। মায়ের
কাছে ওষুধ চাওয়ার একটা উপায় হল রাত্তির বেলায় কালীঘরে চুপচাপ শুয়ে থাকতে হবে। একে
হত্যে দেওয়া বলে। কিন্তু সাধারণ মানুষ চেষ্টা করলেও পারত না। মা কালী তাদের নানাভাবে
উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। এক তো অনেক সাপ থাকত, তারা গায়ে এসে উঠবে। সেটা সহ্য
করতে হবে। ভূত প্রেত এসেও ভয় দেখাত। শিব মন্দিরের কাছে একটা চাঁপা গাছ ছিল, সেখানে ব্রহ্মদত্যি থাকত। দাদুর মা তাঁকে দেখেছিলেন। তিনি রাত্তিরবেলায়
শিবঠাকুরকে জল দিতেন আর মন্ত্র পড়তেন। ঘণ্টা নাড়তেন। চোখ
দুটো লাল। এক শিবরাত্রির রাতে বড়োমা সেই ব্রহ্মদত্যিকে
দেখেছিলেন। বড়োমার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। তিনি যে মানুষ
ছিলেন না তা তাঁর চেহারা দেখেই মনে হয়েছিল। মা কালীর পাশে
থাকেন ডাকিনী যোগিনী। তাই কেউ থাকব মনে করলেই থাকতে পারে না। একবার দাদুর বড়
জেঠিমা, যাঁর কথা বলছিলাম, তিনি দু-বার ঠাকুরের ঘরে হত্যে দিয়েছিলেন। কয়েকদিন পর মা কালী তাঁকে ওষুধ
দিয়েছিলেন। একটা পাথর দিয়েছিলেন, তাগা করে পরতে বলেন। ওটা
পরার পর থেকে জেঠিমা হিস্টিরিয়া রোগ থেকে চিরতরে মুক্তি পান। আরেকবার মা কালী
ভেলিগুড়ের ডেলা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ওষুধটি জেঠিমার মুঠো থেকে পড়ে গেছিল। পরে আর
পাওয়া যায়নি। আর কেউ কালীঘরে রাত কাটাতে পারেনি। ভয় পেয়ে
উঠে যেত। দাদুর বাবা চেষ্টা করেছিলেন। দাদুর বাবা খুব ভালো পুজো করতে পারতেন। তিনি মন্ত্র পড়ে ঘট থেকে ফুল ফেলতে পারতেন। অনেকে
নিজের কোনো কাজ করানোর আগে দাদুর বাবা, মানে বড়ো বাবাকে দিয়ে পুজো করাতেন মায়ের কাছে। ঘট থেকে ফুল পড়ে
যাওয়াটা শুভ বলে মনে করা হত। দেবীর আর্শীবাদ পাওয়া হয়ে গেল।
বড়ো বাবা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন। এখনও সেই মাদ্রাসা আছে। দাদুও ওখানেই পড়েছেন। প্রচুর হিন্দু মুসলিম
ছাত্র তিনি তৈরি করেছিলেন। সবাই তাঁকে বাবা বলত। তিনি যেদিন মারা যান প্রচুর
মুসলিম মানুষ, মৌলবীরাও এসেছিলেন শেষ বিদায় জানাতে।
শুনেছিলাম মা কালী
চাইতেন না যে বাড়িতে আর কোনো প্রতিমা আসে। একবার সরস্বতী পুজোর দিন কালী ঘরে আগুন লেগে যায়। মায়ের
প্রতিমা পুড়ে যায়। বহুবছর সরস্বতী পুজোয় আর প্রতিমা আনা হত না। আমার মামারা বড়ো হয়ে বায়না করে সরস্বতী ঠাকুর আনতেন। তবে তখন দাদু দিদা কাঁচরাপাড়ায়
চলে এসেছেন। মায়ের মন্দিরে মা নিজেই দু-বার আগুন লাগিয়েছিলেন।
তিনি নিজেই স্বীকারও করেছিলেন। মা চেয়েছিলেন মন্দির সংস্কার হোক। মূর্তিও নতুন করে
গড়া হোক। মা কাকে বলতেন নিজের কথা? মটরের মা নামে পরিচিত মহিলার মুখ দিয়ে তিনি কথা
বলতেন। লোকে জানত তাঁর ভর হচ্ছে। পরীক্ষা করার জন্য সংস্কৃতে কেউ প্রশ্ন করে।
মটরের মা লেখাপড়া জানত না, কিন্তু নির্ভুল সংস্কৃতে সব
প্রশ্নের উত্তর দেয়।
আমার দিদা আরেকটি গল্প
বলেছিলেন যা শুনে দুপুরে ছাদে ওঠা বন্ধ হয়ে গেছিল আমার। অনেক দিন আগে বসন্তপুরেই
একজন তান্ত্রিক লোক বাস করতেন, তিনি কামরূপ থেকে তন্ত্র বিদ্যা শিখেছিলেন। একবার
নিজে কতদূর কী শিখেছেন তার পরিচয় দিয়েছিলেন। ভর দুপুরবেলা
আকাশ থেকে তিনি ডাকিনীকে নামিয়েছিলেন। ডাকিনীরা কারও
ক্ষতি করে না। নিজেদের সাধনা নিয়েই থাকে। এদের ঠিক কী বলে
জানি না। ডাকিনীই বলে মনে হয়। এসব বিষয়ে বেশি চর্চা হয়নি। সেই মেয়েটিকে দেখে সবাই
ভয় পেয়ে যায়। মেয়েটি বলেছিল সে কামরূপ যাচ্ছে বা কামরূপ থেকে আসছে। তান্ত্রিক
মেয়েটিকে চলে যেতে বলেন। এদের সাধারণ লোকে দেখলে ভয় পাবে।
এরা গাছ নিয়ে বা এমনিও উড়ে বেড়ায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। তখন ধুলোর ঝড় ওঠে,
শুকনো পাতা ওড়ে। ওদের গায়ের স্পর্শ লাগলে অসুখ করবে। গরমের দিনে ভরদুপুরে তাই ছাদে
বা বাইরে থাকতে নেই। দিদা খুব বোঝাতেন আমায়। দাদু বলতেন লু লাগলে অসুখ করবে। আমি
ভুগতামও বেশ। দাদুর থেকে দিদার কথাই বেশি যুক্তিসঙ্গত মনে হত আমার। এখন দেখি যে
চৌষট্টি যোগিনীর মন্দিরগুলোতে ছাদ থাকে না। জব্বলপুর বা হীরাপুরের চৌষট্টি যোগিনী
মন্দিরে ছাদ নেই। কারণ ওরা আকাশপথে উড়ে আসেন। এখনও গরমের দুপুরে এমন হাওয়া দিলে
মনে হয় ওনারা যাচ্ছেন। দিদা যে সব ভুল বলতেন তা নয়। এই ঘটনাটা দিদারও শোনা গল্প
ছিল। এই তান্ত্রিক ভদ্রলোকের এটি একটি অবিস্মরণীয় কীর্তি ছিল। আরও অনেক কিছু
জানতেন তিনি।
বসন্তপুরে আরেকটি
বিশাল দিঘি ছিল। সেখানে একজন হতভাগ্য বালককে যখ দেওয়া হয়েছিল। আমি সেই দিঘি দেখেছিলাম কিনা মনে নেই। মনে হয় যেন দেখেছি। যখের পুকুর বলত অনেকে। যখ
দেওয়া কী তা কবিগুরুর সম্পত্তি সমর্পণ গল্পে আমরা দেখেছি।
এক জন ধনী ব্যক্তি, যার উত্তরাধিকারী আপাতত নেই, নিজের সব সম্পত্তি মাটির নীচে কোনো ঘরে রেখে দেন। একজন হতভাগ্য বালককে সেই ঘরে
রেখে দেওয়া হত। সেই বালকটি আর বেরুতে পারত না বেসমেন্টের ঘর থেকে। মনে করা হত সে
যক্ষ হয়ে বিশাল সম্পত্তি রক্ষা করবে এবং সঠিক উত্তরাধিকারীর হাতে তুলে দেবে। কিছু
মানুষ কতই না নিষ্ঠুর ছিল! আমার দাদুও ছেলেবেলায় ভয় পেয়েছেন এই দিঘির পাড় ধরে
হাঁটার সময়। মনে হত কেউ পিছু নিয়েছে। ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। দাদু বলতেন যে, যখ নাকি ঘুরে বেড়াবার সময় ঝমঝম শব্দ হত। তার পিঠে অনেক মুদ্রা থাকত।
সেগুলো নাড়াচাড়া পড়লে শব্দ হত। আমার বাঁশঝাড় দেখলেও গা ছমছম করে। ওখানে নাকি বেঁশো
ভূত থাকে। বাঁশ মাটিতে ফেলে রাখে। কোনো মানুষ পার হতে গেলে বাঁশ শুদ্ধু উঠিয়ে নেয়। আমার দাদুকে একবার ভুলো ভূতে ধরেছিল।
দাদু কাঁচরাপাড়া থেকে বসন্তপুর যাচ্ছেন। বাড়ির কাছে এসে দাদুর পথ কেমন ভুল হয়ে
গেল। আমার দাদুর পথ ভোলার কথাই নয়। নিজের পরিচিত জায়গা কেউ ভুল করে না। খুব মেধাবী
মানুষ। রাস্তাঘাট সব মনে থাকত। কলকাতায়ও অফিস করেছেন। সেই দাদু কিছুতেই আর চেনা
পথে ফিরতে পারছেন না। অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। অনেকক্ষণ ধরে ঘুরছেন।
তারপর একজন পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। দাদুকে সেই
লোকটি বাড়িতে পৌঁছে দেয়। শুনেছিলাম একদল ঠ্যাঙাড়েও দাদুর
পিছু নিয়েছিল, কিন্তু ওরাও দাদুকে চিনতে পেরে ছেড়ে দেয়।
দাদুর বাবাকে সবাই চিনত। সেই কারণে দাদুরও ভালো পরিচিতি
ছিল। দাদু কিছুদিন ভারতচন্দ্র স্কুলে পড়িয়েছেন। তারপর রেলে চাকরি পেয়েছিলেন। প্রথম
পোস্টিং গয়া। তারপর কাঁচরাপাড়ায় পোস্টিং হল। এখানেই থেকে গেলেন। এই জায়গাটি দাদু-দিদার খুব ভালো লেগে যায়। তখনও কল্যাণীর জন্ম
হয়নি। যেদিন কল্যাণীর জন্ম হল, দাদু বিধান রায়কে দেখতে
এসেছিলেন। কল্যানীতে নাকি চিতা জাতীয় বাঘ বেরুত। কতদিন আগের কথা! কিন্তু মনে করতে
আজও বড়ো ভালো লাগে! বসন্তপুরে মা
কালী, বাবা মহাদেব এবং দামোদর তিন জনের কাছে যেতে খুব ভালো লাগে আমার। মনে হয় কত পুরোনো জায়গা। কত
স্মৃতি আছে এখানে। তিনজনকেই আমার প্রণাম জানাই।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: তাপস মৌলিক)