Showing posts with label সহেলী চট্টোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label সহেলী চট্টোপাধ্যায়. Show all posts

গল্প রেল:: গল্পের অডিও:: কানপুরের মিলিমাসি - রচনা: আশাপূর্ণা দেবী; পাঠ: সহেলী চট্টোপাধ্যায়

গল্প রেল
গল্প পাঠের অডিও
শুনতে হলে ক্লিক করো নীচের ভিডিওতে
 
********
 গল্প: কানপুরের মিলিমাসি
রচনা: আশাপূর্ণা দেবী
পাঠ: সহেলী চট্টোপাধ্যায়

________

স্মৃতিকথা:: দাদু আর দিদার গল্প - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


দাদু আর দিদার গল্প
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

আমার অনেক গল্প লিখতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু সময় আর সুযোগ না থাকার কারণে ছোট্ট বন্ধুদের জন্য কিছুই লিখতে পারি না। গল্প লেখার থেকে সংসারকে দেখা বেশি দরকার। যখন দাদু দিদা ছিলেন, অনেক গল্প বলতেন আমাকে। এখনকার দিনে গল্প কেউ পছন্দ করে না, বলা তো দূরের কথা। প্রত্যেকে সংসারের গল্প করে, অসুখবিসুখের গল্প করে, কী সম্পত্তি পেল না পেল তার গল্প করে। শ্বশুর-শাশুড়ি কেমন বদ বা কী মার্কেটিং করবে, কী রান্না করবে এই সব গল্প করতে পছন্দ করে। তাই আমার কারোর সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয় না। আর কোনো কাজ না থাকলেও টেনে টেনে কাজ করবে বা ফোন দেখে সময় নষ্ট করতে চায়। অবসর চায় না। সব সময় গতি চায়। দিদা দাদুর জন্য মনটা খুব খারাপ লাগে। এঁরা আমাকে কত ভালো ভালো গল্প বলেছেন! আবার কাজও কত করতেন! ওদের বলে যাওয়া সেই সব গল্প মনে করার চেষ্টা করি। ম্যাজিক ল্যাম্পের বন্ধুদের জন্য কিছুটা লিখে রাখলাম।
আমি দাদুকে কোনোদিন কোনো গল্পের বই পড়তে দেখিনি। হোমিওপ্যাথির বই পড়তেন হ্যানিম্যানের লেখা বা কাগজ পড়তেন, কিন্তু অনেক গল্প জানতেন। কলেজ লাইফে যা পড়তেন সব মনে থাকত। সাহিত্য ভালো পড়াতে পারতেন। ইংরাজি, সংস্কৃত, বাংলা ভালো পড়াতেন। তিনি উর্দু এবং হিন্দিও ভালো জানতেন। ছোটোবেলায় মাদ্রাসায় পড়েছেন। অনেক মুসলিম বন্ধু ছিল দাদুর। একজন লন্ডনের বড়ো ডাক্তার হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলাম। দাদুকে ফোন করতেন মাঝে মাঝে। সেই গল্প অন্য দিন করা যাবে। দাদুও ডাক্তার হতে পারতেন, কিন্তু হননি। তিনি সবসময় প্রথম হতেন। দাদু খুব ঠাকুরভক্ত, হরিনাম করতেন। মা কালী আছেন বাড়িতে, আবার এত মুসলিম বন্ধুবান্ধব কী করে হল? ভেবেই আমার খুব আশ্চর্য লাগত। দাদু বলতেন, ‘আমি যতই বাছবিচার করি না কেন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের বুকে জড়িয়ে ধরব।’
দিদা ছিলেন খাস কলকাতার। মানিকতলার লোক। দিদাদের বাড়ির কাছে জৈন মন্দির ছিল। রোজ বিকেলে বেড়াতে আসতেন নিজের কাজিনদের সঙ্গে। সবাই মিলে খুব আনন্দ করেছেন। দিদা পুরোনো কলকাতার অনেক গল্প বলতেন। নেতাজিকে দেখেছেন খুব ছোটো বয়সে। গান্ধিজিকে দেখেছিলেন। সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোর কথা বলতেন। ছেলেরা লাঠি খেলত। একটা কোন স্বদেশি মেলার কথা বলেছিলেন কয়েকবার। সেখানে সব ভারতের জিনিস, যেমন কাপড় চরকা ইত্যাদি বিক্রি হত। আমি অনেক জিনিস ভুলে গেছি। জিজ্ঞাসা করে যে জেনে নেব তারও উপায় নেই। দুজনেই চলে গেছেন। দিদা কলকাতায় থাকতেন এবং প্রচুর বই পড়তেন। প্রাথমিক শিক্ষার পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। খাস কলকাতার মেয়ের বিয়ে হল রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের জন্মস্থান হাওড়া জেলার পেঁড়ো বসন্তপুর গ্রামে। দিদার ষোলো বছর আর দাদুর কুড়ি হবে হয়তো। দিদার গায়ের রং কালো ছিল, তাই কলকাতার কোনো পাত্র দিদাকে বিয়ে করতে চায়নি। কেউ কেউ আবার অনেক টাকা পণ চেয়েছিল। দিদার বাবা এক সময় দাদুকে পেয়ে যান। দাদু পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন। দাদুর সঙ্গে দিদার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর দিদার খুব অসুবিধা হতে লাগল। আলো ঝলমলে কলকাতার বদলে এমন গণ্ডগ্রাম দিদার ভালো লাগত না। তারপর শাড়ি পরে থাকা বা গরমের মধ্যে একগলা ঘোমটা দেওয়া খুব কষ্টকর ব্যাপার। দিদা বিয়ের আগে বাড়িতে ফ্রক পরতেন। বাইরে গেলে শাড়ি পরতেন। দিদার আবার রাত্তির হলেই টয়লেট পেত। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে টয়লেট ছিল না। সেই দূরে পুকুর পাড়টাই বাথরুম হিসেবে ব্যবহার করত সবাই। আর সেখানেই একটা বড়ো ভয়ের জায়গা ছিল। জমিদার বাড়ি ছিল কাছেই। একজন অত্যাচারী জমিদার ছিল অনেক আগে। রটে গেছিল সেই জমিদারবাবু ভূত হয়েছিলেন। ওনার নাম ছিল গোলোক টকাল। তাঁকে সবাই যমের মতো ভয় পেত। ইনি অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খুনও করেছেন অনেক। এক সময় লুকিয়ে বেড়াতেন। ব্রিটিশ পুলিশ গুপ্তচর পাঠিয়ে এঁকে ধরেছিল। পুলিশের সি আই ডি অফিসার ছেঁড়া-ফাটা জামা পরে গরম শিঙাড়া বিক্রি করত রোজ। সব দিকে লক্ষ রাখত আর হাঁক দিত, ‘গরম শিঙাড়া, গরম শিঙাড়া’। সেই সি আই ডি সাহেব কোনোভাবে টকালকে ধরেছিল। এসব বহু আগের কথা। গোলোক টকালের অনেক গল্প ছিল। এই গোলোক টকাল ভূত হয়েছিলেন। আমার দিদার যখন রাতে বাথরুমে যাওয়ার দরকার হত তখন সব ভৌতিক গল্পগুলো মনে পড়ে যেত। আর জমিদারের আত্মা যদি চলে আসে তাহলে কী হবে! টকাল বাড়ি তো কাছেই। তাই দিদা ননদকে, আমার আরেক দিদাকে, সঙ্গে নিয়ে যেতেন।
আমার দাদুর বাড়িতে মা কালী আছেন। তিনি পরিবারের অনেক দিনের সদস্যা। এখনও যাই যখন তাঁকে দেখে আসি। মহাদেব আছেন। দামোদর আছেন। দামোদর টকাল বাড়ির ঠাকুর। টকাল পরিবারে একবার একটা অদ্ভুত ঘটনা হয়েছিল। একজন মৃত্যুর পর ফিরে এসেছিলেন। এটি খুব জনপ্রিয় গল্প ছিল। ওই অঞ্চলের প্রতিটা মানুষই জানত গল্পটা। ঘটনাটা হয়েছিল এই রকম, একই পরিবারের দুই ভাই এক রাত্তিরে মারা যায়। একজনকে আবার যমরাজ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তার সময় হয়নি বলে। আরেক ভাইকে খুব খাতির করছিলেন যমরাজ। যা যা খেতে চাইছেন সব এনে হাজির করছেন। কিন্তু এই ভাইটিকে যেন চোখেই দেখতে পাচ্ছেন না। এই ভদ্রলোক বেশ খানিকক্ষণ চেঁচামেচি করার পর দুটো ছোটো ছোটো রসকড়া হাতে ধরিয়ে দিল দুটো যমদূত। ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার ভাইকে এত খাতির করা হচ্ছে, অথচ আমার বেলায় দুটো ছোটো রসকড়া!’ (ওই অঞ্চলের খুব সুন্দর মিষ্টি ছিল। খুব ভালো খেতে ছিল। এক সময় খেয়েছি, কিন্তু এখন আর কেউ করে না।) যমদূতেরা বলেন যে, ‘যাকে খাতির করছি সে সবাইকে ভালোবাসত, অনেক দানধ্যান করেছে। দামোদরের কত ভক্ত ছিল। তাই ওর এত খাতির হচ্ছে। ও এবার বিষ্ণুলোকে যাবে। তুমি কখনও কারোর জন্য কিছু করনি। টাকা থাকার পরেও গরিব প্রজাদের জন্য কিছু ভালো কাজ করনি। রসকড়া যে পেয়েছ তাই অনেক। দামোদরকেও তো এই দিতে শুধু।’ এই সব কথা হতে হতে সেই লোকটির জ্ঞান ফিরে আসে। এরপর থেকে তিনিও খুব ভালো মানুষ হয়ে ওঠেন। এই ঘটনার কথা দিদার কাছে বহুবার শুনেছি। দাদু দিদা যা শুনতেন যা পড়তেন সব মনে রেখে দিতেন।
আমার দিদার ভৌতিক অভিজ্ঞতা অবশ্য জনবহুল কলকাতা শহরেই হয়ে গেছে। দিদা, দিদার মা, আমার বড়োদিদা মানে আমার দিদার বড়ো বৌদি, আমার মা - এঁদের প্রত্যেকের ভৌতিক অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু আমার হয়নি, আর আমি চাইও না এমন অভিজ্ঞতা আমার হোক। কলকাতায় একবার দিদা একজন পাড়ার ভদ্রমহিলাকে ডাকতে যান। কোথাও হয়তো বেরুবেন ঠাকুর দেখতে। দিদার মা বলেন, ‘পাশের বাড়ির কাকিমাকে ডেকে আন।’ একসঙ্গে যাবেন সবাই। দিদা একজনকে দেখেন, সে ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। দিদা ভাবেন সেই কাকিমাই হবেন। সেই ভদ্রমহিলাকে ডাকার পর সে কিছুটা আসে দিদার সঙ্গে। তারপর নাকি একটা পাঁচিলের মধ্যে মিলিয়ে যায়। এটা দেখে দিদা খুব ভয় পেয়ে যান। পরে বড়োদের বলেন। সবাই ভাবেন কোনো আত্মাই ছিল এটি। দিদার মা দেখেছেন নিজের মৃত জা-কে। মৃত্যুপথযাত্রী শাশুড়ির কাছে তিনি আসতেন। দিদার মা তাঁকে চলে যেতে বলতেন। এই সব ঘটনা শুনেছিলাম।
দিদার মামার বাড়ি গুজুরপুর গ্রামে। সেখানেও অনেক ভূত গিজগিজ করত। মাখন মামা তো প্রায় সেলিব্রিটি হয়ে গেছিলেন আমার মতো ছোটোদের কাছে। মাখন মামা দিদার মামার বাড়ির কাছেই থাকতেন। ওনাদের পরিচিত ছিলেন। তাঁর অকালপ্রয়াণ হয়। এরপর তিনি দিদার দিদিমাকে ধরেছিলেন। বাড়িতে খুব বিরক্ত করতেন। জিনিসপত্র ওপরে শূন্যে উঠিয়ে দিতেন। এমনকি খাটও শূন্যে ঝুলিয়ে দিতেন। নিজের স্ত্রী এবং পরিবারের ভরণপোষণের ভার নিতে হয়েছিল, তারপর তিনি দিদার মামার বাড়ি থেকে বিদায় নেন। মাখন মামার পর্ব অনেক বড়ো ছিল। ওঝা এসে সর্ষে পড়ার ছ্যাঁকা দিয়ে তবে মাখন মামাকে জব্দ করতে পেরেছিল। যাওয়ার সময় বাগানের একটা গাছের ডাল ভেঙে দিয়ে যান। গুজুরপুর নাম শুনলেই আমার ভয় করে এখনও, কারণ এই গ্রামে অনেক ঘটনা হয়েছে।
মিনে পিসির কথা শুনেছিলাম। মিনে পিসি যখন খুব ছোটো তখন তার মা মারা যায়। তার মায়ের আত্মা রাত্তির বেলায় এসে মিনে পিসিকে ডাকত। খোনা স্বরে শুধু বলে যেত, ‘মিঁনে কেঁ দেঁ না! মিঁনে কেঁ দেঁ না!’ এই গল্পটা শুনে খুব ভয় লাগত। কে যে ডাকত তা দেখার সাহস কারও হয়নি। হয়তো কোনো জন্তুও হতে পারে। আগেকার দিনের মানুষ গল্প শুনতে পছন্দ করত, কারণ তাদের কাছে টিভি বা ফোন ছিল না। সময় কাটাবার তেমন কিছু ছিল না। তাই অবসর সময়ে নানান কল্পনা করত তারা। বা সবটা হয়তো কল্পনা নয়। কিছু সত্যও ছিল। গুজুরপুরের সব গল্প বলা সম্ভব হল না। পরে আবার চেষ্টা করব।
আমরা এখন বসন্তপুরে যাব। দাদুদের পরিবারে মা কালী আছেন। মন্দিরে আরও কয়েকটি পরিবারের পালা পড়ে। অনেক জ্ঞাতিরা আছেন। প্রত্যেকের সময় আসে। নির্দিষ্ট দিনে তাদের পুজোর দিনক্ষণ পড়ে। আমাদের পড়ে ফাল্গুন মাসে, শিবরাত্রির পরের দিন যে অমাবস্যা পড়ে সেই দিন। দিনের বেলায় পুজো হয়। ওইদিন বাস্তু মনসাকে পুজো দেওয়া হয়। গ্রামে যত ঠাকুর আছেন প্রত্যেককে পুজো দেওয়া হয়। আমি কয়েকবার গেছি। ভালো লাগে খুবই। দাদু মন্দিরে চণ্ডীপাঠ করতেন। ন’দাদুও পুজো করতেন। কখনও মনসার পুজো করে দিতেন। এখন আমার এক মামা পুজোপাঠ খুব ভালো করেন। আমার দাদুর মা যখন ছিলেন তখন তাঁর কাছে কিছু গল্প শুনেছিলাম। মা কালী রাত্রিবেলায় বেরিয়ে পড়তেন। তাঁর পায়ের নূপুরের শব্দ পেয়েছেন আমার বড়োমা মানে দাদুর মা। ঝমঝম শব্দ হত। মাঝখানে থামত একটু। পুকুরের জলে শব্দ হত যেন কেউ ঝাঁপাল। আবার কিছুক্ষণ পর ঝমঝম শব্দ। দিদার শাশুড়ি-মা মানে বড়োমার কখনও সাহস হয়নি যে জানলা খুলে দেখি কে যায় নুপূর পরে। তাঁর মনে হত গভীর রাতে মন্দির থেকে বেরিয়ে মা কাছাকাছি একটা পুকুরে স্নান করতেন। তারপর আবার একটু ঘোরাঘুরি করে মন্দিরে চলে যেতেন। মন্দিরে মায়ের ঘটের মধ্যে সাপ থাকত। ঘটের জল বছরে একবার পালটানো হত। মন্দিরেও অনেক সাপ থাকত। তবে তারা কাউকে কামড়াত না। আমার দিদার জাঠ-শাশুড়ি সংসারী মানুষ হলেও আধ্যাত্মিকতায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি মায়ের কাছ থেকে দৈব ওষুধ এনেছিলেন। মায়ের কাছে ওষুধ চাওয়ার একটা উপায় হল রাত্তির বেলায় কালীঘরে চুপচাপ শুয়ে থাকতে হবে। একে হত্যে দেওয়া বলে। কিন্তু সাধারণ মানুষ চেষ্টা করলেও পারত না। মা কালী তাদের নানাভাবে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। এক তো অনেক সাপ থাকত, তারা গায়ে এসে উঠবে। সেটা সহ্য করতে হবে। ভূত প্রেত এসেও ভয় দেখাত। শিব মন্দিরের কাছে একটা চাঁপা গাছ ছিল, সেখানে ব্রহ্মদত্যি থাকত। দাদুর মা তাঁকে দেখেছিলেন। তিনি রাত্তিরবেলায় শিবঠাকুরকে জল দিতেন আর মন্ত্র পড়তেন। ঘণ্টা নাড়তেন। চোখ দুটো লাল। এক শিবরাত্রির রাতে বড়োমা সেই ব্রহ্মদত্যিকে দেখেছিলেন। বড়োমার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। তিনি যে মানুষ ছিলেন না তা তাঁর চেহারা দেখেই মনে হয়েছিল। মা কালীর পাশে থাকেন ডাকিনী যোগিনী। তাই কেউ থাকব মনে করলেই থাকতে পারে না। একবার দাদুর বড় জেঠিমা, যাঁর কথা বলছিলাম, তিনি দু-বার ঠাকুরের ঘরে হত্যে দিয়েছিলেন। কয়েকদিন পর মা কালী তাঁকে ওষুধ দিয়েছিলেন। একটা পাথর দিয়েছিলেন, তাগা করে পরতে বলেন। ওটা পরার পর থেকে জেঠিমা হিস্টিরিয়া রোগ থেকে চিরতরে মুক্তি পান। আরেকবার মা কালী ভেলিগুড়ের ডেলা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ওষুধটি জেঠিমার মুঠো থেকে পড়ে গেছিল। পরে আর পাওয়া যায়নি। আর কেউ কালীঘরে রাত কাটাতে পারেনি। ভয় পেয়ে উঠে যেত। দাদুর বাবা চেষ্টা করেছিলেন। দাদুর বাবা খুব ভালো পুজো করতে পারতেন। তিনি মন্ত্র পড়ে ঘট থেকে ফুল ফেলতে পারতেন। অনেকে নিজের কোনো কাজ করানোর আগে দাদুর বাবা, মানে বড়ো বাবাকে দিয়ে পুজো করাতেন মায়ের কাছে। ঘট থেকে ফুল পড়ে যাওয়াটা শুভ বলে মনে করা হত। দেবীর আর্শীবাদ পাওয়া হয়ে গেল।
বড়ো বাবা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখনও সেই মাদ্রাসা আছে। দাদুও ওখানেই পড়েছেন। প্রচুর হিন্দু মুসলিম ছাত্র তিনি তৈরি করেছিলেন। সবাই তাঁকে বাবা বলত। তিনি যেদিন মারা যান প্রচুর মুসলিম মানুষ, মৌলবীরাও এসেছিলেন শেষ বিদায় জানাতে।
শুনেছিলাম মা কালী চাইতেন না যে বাড়িতে আর কোনো প্রতিমা আসে। একবার সরস্বতী পুজোর দিন কালী ঘরে আগুন লেগে যায়। মায়ের প্রতিমা পুড়ে যায়। বহুবছর সরস্বতী পুজোয় আর প্রতিমা আনা হত না। আমার মামারা বড়ো হয়ে বায়না করে সরস্বতী ঠাকুর আনতেন। তবে তখন দাদু দিদা কাঁচরাপাড়ায় চলে এসেছেন। মায়ের মন্দিরে মা নিজেই দু-বার আগুন লাগিয়েছিলেন। তিনি নিজেই স্বীকারও করেছিলেন। মা চেয়েছিলেন মন্দির সংস্কার হোক। মূর্তিও নতুন করে গড়া হোক। মা কাকে বলতেন নিজের কথা? মটরের মা নামে পরিচিত মহিলার মুখ দিয়ে তিনি কথা বলতেন। লোকে জানত তাঁর ভর হচ্ছে। পরীক্ষা করার জন্য সংস্কৃতে কেউ প্রশ্ন করে। মটরের মা লেখাপড়া জানত না, কিন্তু নির্ভুল সংস্কৃতে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়।
আমার দিদা আরেকটি গল্প বলেছিলেন যা শুনে দুপুরে ছাদে ওঠা বন্ধ হয়ে গেছিল আমার। অনেক দিন আগে বসন্তপুরেই একজন তান্ত্রিক লোক বাস করতেন, তিনি কামরূপ থেকে তন্ত্র বিদ্যা শিখেছিলেন। একবার নিজে কতদূর কী শিখেছেন তার পরিচয় দিয়েছিলেন। ভর দুপুরবেলা আকাশ থেকে তিনি ডাকিনীকে নামিয়েছিলেন। ডাকিনীরা কারও ক্ষতি করে না। নিজেদের সাধনা নিয়েই থাকে। এদের ঠিক কী বলে জানি না। ডাকিনীই বলে মনে হয়। এসব বিষয়ে বেশি চর্চা হয়নি। সেই মেয়েটিকে দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়। মেয়েটি বলেছিল সে কামরূপ যাচ্ছে বা কামরূপ থেকে আসছে। তান্ত্রিক মেয়েটিকে চলে যেতে বলেন। এদের সাধারণ লোকে দেখলে ভয় পাবে। এরা গাছ নিয়ে বা এমনিও উড়ে বেড়ায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। তখন ধুলোর ঝড় ওঠে, শুকনো পাতা ওড়ে। ওদের গায়ের স্পর্শ লাগলে অসুখ করবে। গরমের দিনে ভরদুপুরে তাই ছাদে বা বাইরে থাকতে নেই। দিদা খুব বোঝাতেন আমায়। দাদু বলতেন লু লাগলে অসুখ করবে। আমি ভুগতামও বেশ। দাদুর থেকে দিদার কথাই বেশি যুক্তিসঙ্গত মনে হত আমার। এখন দেখি যে চৌষট্টি যোগিনীর মন্দিরগুলোতে ছাদ থাকে না। জব্বলপুর বা হীরাপুরের চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে ছাদ নেই। কারণ ওরা আকাশপথে উড়ে আসেন। এখনও গরমের দুপুরে এমন হাওয়া দিলে মনে হয় ওনারা যাচ্ছেন। দিদা যে সব ভুল বলতেন তা নয়। এই ঘটনাটা দিদারও শোনা গল্প ছিল। এই তান্ত্রিক ভদ্রলোকের এটি একটি অবিস্মরণীয় কীর্তি ছিল। আরও অনেক কিছু জানতেন তিনি।
বসন্তপুরে আরেকটি বিশাল দিঘি ছিল। সেখানে একজন হতভাগ্য বালককে যখ দেওয়া হয়েছিল। আমি সেই দিঘি দেখেছিলাম কিনা মনে নেই। মনে হয় যেন দেখেছি। যখের পুকুর বলত অনেকে। যখ দেওয়া কী তা কবিগুরুর সম্পত্তি সমর্পণ গল্পে আমরা দেখেছি। এক জন ধনী ব্যক্তি, যার উত্তরাধিকারী আপাতত নেই, নিজের সব সম্পত্তি মাটির নীচে কোনো ঘরে রেখে দেন। একজন হতভাগ্য বালককে সেই ঘরে রেখে দেওয়া হত। সেই বালকটি আর বেরুতে পারত না বেসমেন্টের ঘর থেকে। মনে করা হত সে যক্ষ হয়ে বিশাল সম্পত্তি রক্ষা করবে এবং সঠিক উত্তরাধিকারীর হাতে তুলে দেবে। কিছু মানুষ কতই না নিষ্ঠুর ছিল! আমার দাদুও ছেলেবেলায় ভয় পেয়েছেন এই দিঘির পাড় ধরে হাঁটার সময়। মনে হত কেউ পিছু নিয়েছে। ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। দাদু বলতেন যে, যখ নাকি ঘুরে বেড়াবার সময় ঝমঝম শব্দ হত। তার পিঠে অনেক মুদ্রা থাকত। সেগুলো নাড়াচাড়া পড়লে শব্দ হত। আমার বাঁশঝাড় দেখলেও গা ছমছম করে। ওখানে নাকি বেঁশো ভূত থাকে। বাঁশ মাটিতে ফেলে রাখে। কোনো মানুষ পার হতে গেলে বাঁশ শুদ্ধু উঠিয়ে নেয়। আমার দাদুকে একবার ভুলো ভূতে ধরেছিল। দাদু কাঁচরাপাড়া থেকে বসন্তপুর যাচ্ছেন। বাড়ির কাছে এসে দাদুর পথ কেমন ভুল হয়ে গেল। আমার দাদুর পথ ভোলার কথাই নয়। নিজের পরিচিত জায়গা কেউ ভুল করে না। খুব মেধাবী মানুষ। রাস্তাঘাট সব মনে থাকত। কলকাতায়ও অফিস করেছেন। সেই দাদু কিছুতেই আর চেনা পথে ফিরতে পারছেন না। অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। অনেকক্ষণ ধরে ঘুরছেন। তারপর একজন পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। দাদুকে সেই লোকটি বাড়িতে পৌঁছে দেয়। শুনেছিলাম একদল ঠ্যাঙাড়েও দাদুর পিছু নিয়েছিল, কিন্তু ওরাও দাদুকে চিনতে পেরে ছেড়ে দেয়। দাদুর বাবাকে সবাই চিনত। সেই কারণে দাদুরও ভালো পরিচিতি ছিল। দাদু কিছুদিন ভারতচন্দ্র স্কুলে পড়িয়েছেন। তারপর রেলে চাকরি পেয়েছিলেন। প্রথম পোস্টিং গয়া। তারপর কাঁচরাপাড়ায় পোস্টিং হল। এখানেই থেকে গেলেন। এই জায়গাটি দাদু-দিদার খুব ভালো লেগে যায়। তখনও কল্যাণীর জন্ম হয়নি। যেদিন কল্যাণীর জন্ম হল, দাদু বিধান রায়কে দেখতে এসেছিলেন। কল্যানীতে নাকি চিতা জাতীয় বাঘ বেরুত। কতদিন আগের কথা! কিন্তু মনে করতে আজও বড়ো ভালো লাগে! বসন্তপুরে মা কালী, বাবা মহাদেব এবং দামোদর তিন জনের কাছে যেতে খুব ভালো লাগে আমার। মনে হয় কত পুরোনো জায়গা। কত স্মৃতি আছে এখানে। তিনজনকেই আমার প্রণাম জানাই।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: তাপস মৌলিক)

গল্প রেল:: গল্পের অডিও:: পৃথিবী ধ্বংস - রচনা: দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী; পাঠ: সহেলী চট্টোপাধ্যায়

গল্প রেল
গল্প পাঠের অডিও
শুনতে হলে ক্লিক করো নিচের ভিডিওতে
 
********
 
গল্প: পৃথিবী ধ্বংস
রচনা: দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী
পাঠ: সহেলী চট্টোপাধ্যায়

________

প্রবন্ধ:: অন্ডাল দেবী এবং শ্রীরঙ্গনাথজি - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


অন্ডাল দেবী এবং শ্রীরঙ্গনাথজি
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

দক্ষিণ ভারতের মীরা কাকে বলা হয় জানো? যদিও মীরার অনেক আগেই তাঁর জন্ম। কিন্তু তাঁর কথা আলোচনা করতে বসলে মীরাকেই বার বার মনে পড়ে। দেবী গোধা বা অন্ডাল ছিলেন ভূদেবীর অবতার। মানে মা লক্ষ্মীর অংশ। মীরাবাঈ যেমন শ্রীগিরিধারী লাল-কে নিজের পতি বলে মনে করতেন, ঠিক তেমনভাবেই অন্ডাল দেবীও শ্রী রঙ্গনাথ-কে নিজের পতি ভাবে ভজনা করতেন। দক্ষিণ ভারতের বারো জন আলভার-এর মধ্যে একমাত্র মহিলা আলভার। তিনি মীরার মতোই পদ রচনা করতেন শ্রীরঙ্গনাথের উদ্দেশে। গান রচনা করতেন, নিজেই সুর দিতেন আবার গাইতেনও।
অন্ডাল দেবীর জন্ম হয় অষ্টম বা সপ্তম শতাব্দীতে তামিলনাড়ুর শ্রীভিলিপুথুর শহরে। তিনি ছিলেন, রঙ্গনাথজির পরম ভক্ত পুরোহিত পেরিয়ালভারের বা বিষ্ণুচিত্তের পালিতা কন্যা। পুরোহিত দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না। তাঁরা ঠাকুরের কাছে খুব প্রার্থনা করতেন। রঙ্গনাথজি পুরোহিত দম্পতিকে দেখা দিয়ে বলেছিলেন তোমাদের ঘরে ভূদেবীর অবতার আসবেন। তোমরা তাকে লালন পালন কোরো। কিছুদিন পর দেখা গেল তুলসী বনের মধ্যে এক সদ্যোজাত কন্যা খেলা করছে। আশেপাশে কেউ নেই। পেরিয়ালভার বা বিষ্ণুচিত্ত সেই শিশুটিকে নিজের ঘরে নিয়ে আসলেন। শিশুর নাম রাখলেন গোধা। গোধা দেবীর অনেক নাম। গোধা মানে মালা। আরও দুটি নাম হল কোথাই এবং নাচিয়ার। এই শিশুকে রঙ্গনাথজির কথামতো যত্ন করে বড়ো করতে লাগলেন পুরোহিত দম্পতি।
শিশুটি আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে। রঙ্গনাথজি তার খুব প্রিয়। সময় পেরিয়ে যায়। অন্ডাল বা গোধা দেবী এখন কিশোরী। তিনি রঙ্গনাথজির জন্য প্রতিদিন ফুল তুলে মালা গাঁথতেন। একদিন কি খেয়াল হল, সেই গাঁথা মালা নিজে গলায় পরে নিলেন। তারপর আবার খুলে রেখে দিলেন থালায়। মালা প্রতিদিন তাঁর বাবা ঠাকুরের গলায় পরাতেন। অন্ডাল রোজ রোজ এমন করতে লাগলেন। মালাটা গলায় পরে একটা কূপের জলে নিজের ছায়া দেখতেন। দেখতেন কেমন লাগছে তাঁকে মালা পরে। একদিন রঙ্গনাথজিরও রঙ্গ করতে ইচ্ছা হল। তিনি মালায় এক দলা চুল জড়িয়ে রেখে দিলেন। পুরোহিত রঙ্গনাথজির শ্রী বিগ্রহে মালা পরাতে গিয়ে দেখলেন সেই ফুলের মালায় এক দলা চুল জড়িয়ে! মেয়েদের লম্বা চুল! দেখে তিনি খুব রেগে গেলেন। এই মালা তো গোধা তৈরি করে, তাহলে এটা নিশ্চয় ওরই চুল! তিনি প্রথমেই মেয়েকে বকাবকি করলেন না। ঠিক করলেন ব্যাপারটা কী আগে ভালো করে জানতে হবে। পরের দিন তিনি লুকিয়ে থেকে দেখে নিলেন যে গোধা দেবীই মালা আগে পরেন, এই দেখে তিনি খুব রেগে গিয়ে মেয়েকে তিরস্কার করলেন। নিজের ব্যবহার করা কোনো জিনিস তো ঠাকুরকে দিতে নেই। সেবাপরাধ হয়। আমরা নিজেদের ব্যবহার করা জিনিস ঠাকুরকে দিই না। নতুন জিনিস দিই। তা সে ফুল হোক বা অন্য কোনো জিনিস হোক। কিন্তু গোধা দেবী বললেন রঙ্গনাথজিই তাঁর পতি। তাই তিনি কোনো ভুল করেননি। পত্নীর মালা তো পতি পরতেই পারে। পুরোহিত মশাই খুব অবাক হলেন। চিন্তিতও হলেন। কেউ কেউ তাঁকে বোঝাল বাচ্চা মেয়ে! কী বলতে কী বলেছে! রঙ্গনাথজিকে তো সে নিজের সখাই মনে করে! ওতে দোষ হয় না! বিষ্ণুচিত্ত এবার গোধা দেবীকে মালা তৈরির দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিলেন। বললেন, তোমাকে আর মালা বানাতে হবে না। কিছুদিন পরে রঙ্গনাথজিই স্বপ্নে তাঁকে বোঝালেন যে গোধা আসলে লক্ষ্মী বা ভূদেবীর অবতার। তাই বিষ্ণুচিত্ত যেন মেয়ের ওপর রাগ না করেন। গোধা দেবীর তৈরি করা মালাই তিনি পরবেন। গোধা দেবী ধরিত্রীতে আসার আগেও তিনি বলেছিলেন যে গোধা আসলে লক্ষ্মী বা ভূদেবীর অবতার হবেন, কিন্তু বিষ্ণুচিত্তের আর সে সব কথা মনে নেই। স্বপ্ন ভেবে ভুলে গেছেন।
সুলতানি আমলে শক্তিশালী হিন্দু রাজ্য বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের নাম আমরা অনেকেই জানি। তিনি এই মালার ঘটনা লিখেছেন তাঁর আমুক্তমাল্যদা নামক কাব্যগ্রন্থে। গোধা দেবীর ঘটনা নিয়ে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। অনেক রকম উৎসব পালন করা হয়। এই মালা পরানোর উৎসব তো আছেই। এক সময় গোধা দেবীর বিবাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি বিবাহ করলেন না। তিনি বলে দিলেন ভগবান রঙ্গনাথই তাঁর পতি, সখা - জীবনের সব কিছু। অনেক বাধা বিপত্তি এলেও নিজের সিদ্ধান্তে তিনি অটল থাকলেন। তিনি সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। লেখা নিয়ে গান নিয়ে থাকতে ভালোবাসতেন। বড়ো বড়ো সভায় অংশ নিতেন। তিনি চেয়েছিলেন, মেয়েরা স্বাধীনভাবে থাকবে, স্বাধীনভাবে ভাবনাচিন্তা করবে। তাদের ইচ্ছামতন তারা সৎভাবে জীবন কাটাবে। কিন্তু বড়োই আপশোশের বিষয় তাঁর সেই স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি।

ভগবানের সঙ্গে ভক্ত নানারকম সম্পর্ক তৈরি করেন। শ্রীরঙ্গনাথজিকে তিনি পতি ভাবে ভজনা করতেন। ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের এমন নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক বেশি দেখা যায় না। তিনি শ্রীকৃষ্ণের অষ্ট সখী এবং রাধারানির লীলা চিন্তা করতেন। শোনা যায় তিনি রাধারানি এবং সখীদের ন্যায় ক্যাতায়ণী ব্রতও করেছিলেন। নিজেকে তিনি একজন গোপী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন স্বরচিত কাব্যগ্রন্থ তিরুপ্পাভাইতে। আরেকটি বিখ্যাত রচনা নাচিয়ার তিরুমোই। তিনি ছিলেন নারী স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক। দক্ষিণ ভারতের রক্ষণশীল সমাজের কঠিন শাসনকে তিনি মানতেন না। নিজের ইচ্ছামতন জীবন কাটিয়ে গেছেন, যা এ যুগেও আমরা পেরে উঠি না। তিনি মনে করতেন, জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঈশ্বরের চরণে আত্মসমর্পণ। শ্রীরঙ্গনাথের সঙ্গে গোধা দেবী বা অন্ডালের বিবাহ হয়। তাঁকে বধূবেশে সজ্জিত করে ঠাকুরের সামনে নিয়ে আসা হয়। শ্রীরঙ্গনাথজি তাঁকে গ্রহণ করেন। বিষ্ণুচিত্তকে শ্রীরঙ্গনাথজি গোধা দেবীর একটি মূর্তি উপহার দেন, কিন্তু গোধা দেবীকে আর শরীরে দেখা যায়নি। তিনি ভগবানের মূর্তির সঙ্গে মিশে যান। অনেকে মনে করেন গোধা দেবী যেভাবে চুল বাঁধতেন মাথার এক দিকে চূড়া করে, ঠিক সেইভাবে দক্ষিণী মেয়েরা চুল বাঁধে। দক্ষিণ ভারতের অনেক মন্দিরে শ্রী রঙ্গনাথের পাশে গোধা দেবীর মূর্তি বিরাজ করে। জুঁই ফুল দিয়ে মালা করে তাঁর খোঁপায় বেঁধে দেওয়া হয়, আর সঙ্গে থাকে টিয়া পাখি। তিনি যে মালা পরিয়েছিলেন সেই ঘটনা স্মরণে রেখে এখনও এই উৎসব পালন করা হয়। শ্রীভিলিপুথুর অন্ডাল মন্দির থেকে অন্ডালের মালা তামিল মাস পুরতাসি-র (সেপ্টেম্বর -অক্টোবর) সময় গারুড়োৎসবমের তিরুমালা বেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে প্রেরণ করা হয়।

শ্রীভিলিপুথুর অন্ডালের হাতে তৈরি তোতাপাখি প্রতিদিন তাজা সবুজ পাতা দিয়ে তৈরি করা হয়। অন্ডালের বাম হাতে রাখা হয় এই তোতাপাখি। চঞ্চু ও মুখের জন্য একটি ডালিম ফুল, পায়ের জন্য বাঁশের লাঠি, কলা গাছ, গোলাপি করবীর পাপড়ি এবং নান্দিয়াভট্টাই এই তোতাপাখি প্রস্তুত করতে ব্যবহৃত হয়।
দেবীকে নাচিয়ার বা আন্দাল নাচিয়ার নামেও ডাকা হয়। তাঁকে চুডিকোডুথা সুদারকোডি-ও বলা হয়, মানে ভগবানকে যিনি মালা পরিয়েছিলেন। শুরুতেই বলেছি অন্ডাল দেবীর অনেক নাম আছে। তাঁর এবং শ্রীরঙ্গনাথজির এই কাহিনিকে নিয়ে অনেক রকম উৎসব পালন করা হয়। অন্ডাল দেবীর কথা এখানেই শেষ করলাম। তোমরা কি কেউ গেছ অন্ডাল দেবীর মন্দিরে? গিয়ে থাকলে অবশ্যই জানিও কেমন লেগেছে।
----------
ফোটো - লেখক

গল্প:: সেদিন যা ঘটেছিল - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


সেদিন যা ঘটেছিল
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

সেদিন যা ঘটেছিল তার কোনো ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। আসল গল্পে আসার আগে আমার শহরের কথা একটু বলে নিই। আমাদের শহরের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। শহরের একটা অংশ কেমন যেন ইংল্যান্ডের মতন। পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত শহরের সঙ্গে ইংল্যান্ডের মিল কী করে হবে? শহরের একটা দিক খুব সুন্দর। এক সময় ইংল্যান্ড থেকে আসা কিছু ইংরেজ এখানে বসতি বানিয়েছিল। তাদের বানানো চার্চ, লজ, সিনেমা হল, কোয়ার্টার সব আছে। যেমনভাবে তারা রাস্তাঘাট বানাত, পার্ক বানাত ঠিক তেমনভাবেই সব কিছু সাজিয়েছিল। এদিকে এলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। কেমন ফাঁকা ফাঁকা নিঝুম চারিদিক। কত গাছপালা, বন জঙ্গল চারিদিকে। হাতে গোনা কিছু লোক এখানে কোয়ার্টারগুলোয় বসবাস করে। আমার ছেলেবেলায় অনেক লোক বাস করলেও এখন লোকসংখ্যা অনেক কমে গেছে। কোয়ার্টারে কেউ থাকতে চায় না। মাইনে থেকে অনেক টাকা কেটে নেয়, তাই কেউ থাকতে চায় না। এক যারা ভিন রাজ্য থেকে এসেছে তাদের কোয়ার্টার ছাড়া গতি নেই। আমার ছেলেবেলায় এই জায়গাটা খুব সুন্দর ছিল। সরকার থেকে ভালো করে রক্ষণাবেক্ষণ করত। আমি নিজে যেদিকে থাকি সেখানে জনবসতি বেশি। শপিং মল বেশি। আমার মনটা ভালো লাগে না। হাঁটতে বেরিয়ে একটুও ভালো লাগে না। শুধু দোকান আর দোকান। বাড়ি ঘর, বিউটি পার্লার। এই সবের মধ্য দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগে না। তাই মাঝে মাঝে আমি রেল কোয়ার্টারের দিকে আসি। রেলের মাঠে একটু পায়চারি করি। বেঞ্চিতে একটু বসি। কতরকম পাখির ডাক শোনা যায় এখানে। চোখ গেল চোখ গেল করে একটা পাখি ক’দিন ধরে খুব ডাকাডাকি করছে। পুরানো বাড়ি বা কোয়ার্টারগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। অনেক বাড়ির আবার পেছন দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি। মনে হয় ভেতরে কত রহস্য লুকিয়ে আছে। যারা বানিয়েছিল তারা কত দূর থেকে এসেছিল। আজ তারা কোথায় গেল! সময় কত শক্তিশালী। তার থেকে শক্তিশালী কেউ নেই। সময়ই হয়তো ঈশ্বর। অনেক বাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখে বুকের মধ্যে একটু কষ্ট হয়। এই দিকে অনেক স্কুল আছে। ওপেন ইউনিভার্সিটিও আছে। পার্কে বেঞ্চিতে বসে বসে ছোটো বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি দেখছিলাম। কাঁধে একটা হাত এসে পড়ল। দেখি অনিন্দ্য। আমার প্রিয় বন্ধু বা বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
“হ্যাঁ রে। তুই যে এখানে আসবি আমাকে আগে জানাসনি তো।”
“অনিন্দ্য বলল, আরে অত চেঁচাস না। আমি তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। আমি এই শহরে বদলি হয়ে এসেছি।”
অনিন্দ্য সেন আমার অনেক দিনের বন্ধু। সেই ওয়ান থেকে আমরা বন্ধু। মাঝে কিছুদিন পড়াশোনার জন্য অনিন্দ্য অনেক দূরে চলে গেছিল। তাও ফোনে বা হোয়াটস-অ্যাপে আমাদের যোগাযোগ ছিল। বছরে একবার আসত দেখা করতে। কলকাতায় অনিন্দ্যর বাবা বাড়ি করেছেন বহুদিন। আসাযাওয়া অনেক কমে গেছিল। অনিন্দ্য বলল, “আমার এই জায়গাটা খুব প্রিয়। তাই এখানেই কোয়ার্টারে থাকব। বাবা যে কোয়ার্টারে ছিল আমিও সেটাতেই থাকব।”
মনে মনে ভাবলাম এখানে যে একবার থেকেছে তার আর কোনো জায়গা ভালো লাগবে না। কিছু একটা ব্যাপার তো আছেই। আমিও ছোটোবেলায় কোয়ার্টারেই থেকেছি, তাই মায়া কাটাতে পারিনি। পরে বাবা অন্য দিকে বাড়ি করেন। আমি একটা সাইবার ক্যাফে চালাই। প্রায় তিরিশ ছুঁই ছুঁই আমি। জীবনে বেশি কিছু করে উঠতে পারিনি। ছোটো ছেলেমেয়েদের ফর্ম-টর্ম ফিল আপ করে দিই। অনিন্দ্য আমাকে হাত ধরে টানতে টানতে কোয়ার্টারে নিয়ে এল। বাংলো টাইপের কোয়ার্টার। সামনে শাল শিরীষ অর্জুন জারুল আরও অনেক রকম গাছ। ছোটোবেলায় এই বাংলোয় অনেকবার এসেছি। অনিন্দ্য বলল, “দেখ অজয়, আজ তুই রাতে এখানেই থাকবি। আমি জানি কাকু কাকিমা বেনারস গেছেন। এখন সহজে ফিরবেন না।”
“এই তুই কী করে জানলি রে!” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি।
“তুই খুব বোকা অজয়। কাকু কাকিমার সাথে আমি ফেসবুকে আছি। ওঁরা ছবি পোস্ট করছেন। আমি দেখি। লাইক কমেন্ট করি।”
অনিন্দ্যর সঙ্গে অনেক গল্প করলাম। মুড়ি চানাচুর, চা দিয়ে বন্ধু প্রথমে অভ্যর্থনা করল, তারপর ডিনারের জন্য মাংস রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি অনেক বারণ করলাম, কিন্তু ও শুনল না। রান্না করা তার অনেকদিনের শখ। একজন কাজের লোক ছিল। সে রুটি কিনে আনল। তারপর অনিন্দ্য তাকে ছুটি দিয়ে দিল। আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম। দিন পনেরো হল অনিন্দ্য এখানে জয়েন করেছে। এর আগে কেরালায় ছিল। সেই সব গল্প হচ্ছিল। রাত বাড়তেই ঝিঁঝিঁর শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। বাতাবি লেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধ আসছে। আমরা বারান্দায় বসে ছিলাম। চারদিকে বেশ অন্ধকার। শুধু ল্যাম্প পোস্টের আলো জ্বলছে। এদিকে আর বেশি কোয়ার্টার নেই। একটু দূরে আছে। তবু ভালো যে অনিন্দ্যর কোয়ার্টারে সিকিউরিটির ব্যবস্থা আছে। সেই ভদ্রলোক গেটের পাশে টুলে বসে বসে মোবাইলে রামায়ণ গান শুনছে। এখান থেকে শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ঝিরিঝিরি শব্দ উঠছে। কোথাও থেকে কিশোর কুমারের একটা ডিস্কো গান ভেসে আসছে। মার্চ মাস বড়ো মনোরম। রাত দশটা পর্যন্ত গল্প করে আমরা রাতের খাওয়া সেরে নিয়ে বিছানায় গেলাম। আমরা পাশাপাশি দুটো ঘরে শুয়েছিলাম। শোয়ামাত্র ঘুম। মাঝে একবার ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম কারা যেন উঁচু গলায় খুব কথা বলছে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলল অনিন্দ্যই। আজ সোমবার। ওর অফিস আছে। আমাকে অনিন্দ্য বলল, “তুই আমার সঙ্গে থাকতে পারিস যতদিন কাকু কাকিমা না ফিরছেন।” আমি বললাম, “আমি তোর সাথে রাতে থাকব, কিন্তু এখন বাড়ি যাব। কিছু কাজ সেরে আসছি।” চা আর ডিম টোস্ট খেয়ে বাড়ি ফিরলাম। ঘরগুলো ঝাঁট দিলাম, মুছলাম। জামা কাপড় ধুলাম। স্নান সেরে ঠাকুরের পুজো দিলাম। আমাদের বাড়িতে যিনি কাজ করেন সেই মাসিকে ক’দিন ছুটি দিয়েছি। একা মানুষ এখন। কাজের লোকের দরকার নেই। আমি সব কাজই করতে পারি। দুপুরে মাছের ঝোল ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। বিকেলে মনে হল দু-দিন ধরে আমার ক্যাফে বন্ধ। কাল থেকে আবার খুলতে হবে। টোটো করে আবার আমি অনিন্দ্যর বাড়ি এলাম। টোটো চালক লোকটা বড়ো অদ্ভুত কথা বলল। বলল আমার নাকি বিপদ আছে সামনে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “দাদা কি জ্যোতিষচর্চা করেন নাকি?”
“তা একটু করে থাকি,” বলে আমাকে তার ফোন নম্বর লেখা একটা কার্ড দিল।
আমি কার্ডটা রেখে দিলাম। আজ বোধ হয় অমাবস্যা। জায়গায় জায়গায় কালী পুজোর প্রস্তুতি চলছে।
অনিন্দ্যর কোয়ার্টারে এসে দেখি সে অফিস থেকে ফিরেছে। গা-টা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বসেছে। আমরা ছাদে গিয়ে দেখলাম কিছুদূরে একটা বাড়িতে ছাদে প্যান্ডেল খাটিয়েছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, “কালকেও তো এই বাড়িটা ছিল না! আজ কোথা থেকে এল!”
অনিন্দ্য বলল, “নিশ্চয় ছিল। আমাদের নজর এড়িয়ে গেছিল। রাতারাতি তো আর বাড়ি গজাতে পারে না।” আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বলতে পারলাম না। কর্ম সহায়ক চা আর চপ মুড়ি নিয়ে এসেছে। সামনের ওই কোয়ার্টার বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল খাটানো। ছাদে টেবিল চেয়ার রেখে বসার ব্যবস্থা হয়েছে। কিছু লোক টেবিল চেয়ার পাতছে। কেউ কেউ তদারকি করছে। কী যেন একটা গান চলছে। চপ মুড়ি খেতে খেতে এই সব দেখছি। “মনে হচ্ছে বিয়ে বা রিসেপশন,” অনিন্দ্য ফিসফিস করে বলল। বাতাবি লেবু ফুলের গন্ধে মনটা ভরে যাচ্ছে।
আমি বললাম, “জন্মদিন বা অন্য কিছুও হতে পারে। বাতাসে ফিশ ফ্রাই-এর গন্ধ ভেসে আসছে।”
বলতে বলতে আমাদের চোখ কেমন জড়িয়ে এল ঘুমে। আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।
তারপর যা দেখেছিলাম, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম না সত্যি দেখেছিলাম এখনও বুঝে উঠতে পারি না। বিয়ে বাড়ির (বিয়ে বাড়িই বলছি) ছাদে সুন্দর পোশাক পরা লোকজনেরা উঠে আসছে। সানাই-এর সুর বাজছে। টেবিল চেয়ারে কিছু লোক বসে গল্প করছে। সব দূর থেকে দেখছি। কিন্তু স্পষ্ট। কেউ মোবাইল ব্যবহার করছে না। নারী পুরুষদের পোশাক-আশাক আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের লোকেদের মতন। সব যেন স্পষ্ট দেখতে পারছি। হই হই করে একটা কোলাহল আসছে। কিছু লোক কাঁধে গামছা ফেলে পরিবেশন করছে। অনিন্দ্য ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে বলল, “চল এবার ঘরে যাই।”
আমরা উঠতে গিয়েও পারলাম না। কী এক অদৃশ্য শক্তি আমাদের যেন চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। বিয়ে বাড়িতে এবার বাজি পোড়ানো শুরু হল। সঙ্গে ব্যান্ডপার্টির বাজনা। নানা রং-এর বাজি আকাশে গিয়ে তারা হয়ে ফাটছে। নানান রকম রং সৃষ্টি করছে। আবার আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিছু লোক খুব চিৎকার করছে আনন্দে। কিন্তু এই আনন্দের চিৎকারটা হঠাৎ বদলে গেল বিষাদের চিৎকারে। কানফাটা সেই চিৎকার আজও মনে পড়লে লোম খাড়া হয়ে যায়। দেখলাম বিয়েবাড়িতে আগুন লেগে গেছে। পোড়া একটা গন্ধ বাতাসে ভাসছে। সেই গন্ধে মনে হচ্ছে আমাদের প্রাণ বেরিয়ে যাবে। কিছু লোক প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে লাফ দিচ্ছে ছাদ থেকে। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই সাজগোজ করা নারী পুরুষদের দেখে আমরা চমকে উঠি। কিছু কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চস্বরে তারা কাঁদছে। আমরা উঠে পালাতে গেলাম, কিন্তু পারলাম না। ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম। দেখলাম সামনের বাড়ি অন্ধকারে পড়ে আছে। নিকষ কালো আঁধার চারিদিকে। কোথাও কিছু নেই। এমন সময় কেউ আমাদের কাঁধ ধরে খুব জোর ঝাঁকুনি দেয়। চোখ মেলে দেখলাম, অনিন্দ্যর সেই লোকটি। লোকটা বলল, “আপনারা ছাদে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমি আপনাদের অনেকক্ষণ ধরে ডাকছি। শেষে কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিলাম বলে কিছু মনে করবেন না। আপনাদের রুটি তরকারি করে রেখেছি। আমার এবার যাওয়ার সময় হয়েছে।”
অনিন্দ্য বলল, “তুমি খুব ভালো কাজ করেছ। আমরা কীভাবে যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সামনের ওই বাড়িটার ব্যাপারে কিছু জান গো?” অনিন্দ্য নিজের তর্জনী দিয়ে সেই জরাজীর্ণ বাড়িটা দেখাল।
“আমি কিছু জানি না বাবু। শুনেছি এক সময় এই বাড়িতে আগুন লেগে অনেক লোক মারা গেছিল। মাঝে মাঝে বাড়িটা সেই ঘটে যাওয়া ঘটনাটা দেখায়। সে আমার দাদুর আমলের কথা।”
“কিন্তু আগেও তো এখানে ছিলাম। কখনও এমন ঘটনা দেখিনি।” অনিন্দ্য দম বন্ধ করে বলল।
“বাড়িটা আজ হয়তো দেখাতে চাইছিল নিজের অতীতের কথা; বা আমাদের মধ্যে হয়তো কোনো শক্তি জেগে উঠেছে যার জন্য আমরা দেখতে পেলাম; বা কাকু কাকিমা খুব পুজো-আচ্চা করতেন, তাই কখনও কিছু ফিল করিসনি। কোনো অলৌকিক ঘটনার কার্যকারণ ব্যাখ্যা করা খুব শক্ত রে।” কোনোমতে আমি কথাগুলো বললাম। কাজের লোকটি রাম রাম বলতে বলতে বাড়ি গেল। সেই রাতটা খুব ভয়ে ভয়ে কাটল। সারা রাত ঘরে আলো জ্বেলে অনিন্দ্য আর আমি বসেছিলাম। সিকিউরিটির লোকটি কিছু বুঝতে পারেনি। সে দিব্যি ফোন দেখছিল। আমরা ওকে আর কিছু জানাইনি।
এরপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত।
আমরা দুজনেই প্রায় এক মাস জ্বরে ভুগেছিলাম। অনিন্দ্য বদলি নিয়ে অন্য শহরে চলে যায়। নির্জন জায়গা আমাদের আর ভালো লাগে না।
----------
ছবি - সুজাতা চ্যাটার্জী