গল্প:: রাখে বুড়ো, মারে কে! - বুম বোস


রাখে বুড়ো, মারে কে!
বুম বোস

“বুড়োদা লুক, পেঁজা কটনের মতো ক্লাউড...,” পটল উপরে আকাশের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলল।
বুড়োদা একটু আগেই একটা পাকা পেয়ারা গোটা হজম করেছে। এখন একটা কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। মানে পটল কথাটা বলার আগের মুহূর্ত পর্যন্তও খোঁচাচ্ছিল, এখন খানিক থমকে, মুখটা অবিকল হিন্দি সিনেমার অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠীর মতো বেঁকিয়ে বলল, “অ্যাঁ, এয়েচে আমার বাংলা মায়ের অ্যাংলো সন্তান। পেঁজা কটনের মতো ক্লাউড আবার কী রে হতচ্ছাড়া, বল পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। রবি, নজরুল, সুকুমার রায়রা বেঁচে থাকলে তোকে দেখেই আবার সঙ্গে সঙ্গে মরে যেতেন।”
পটল মুখ ফেটকে বলল, “যাহ বাবা, হোয়াট ইজ মাই ফল্ট?”
“ফল্টকে ভল্টে ঢোকা, তারপর গুটিগুটি পায়ে আবার বাংলায় ফিরে আয় বাবা...,” ভানু চোখ টিপে বলল।
আমি বসে বসে ওদের কাণ্ডকারখানা দেখে মুচকি মুচকি হাসছিলাম। সেটা দেখে বুড়োদা আবার আমার উপর খিঁচিয়ে উঠল।
“অ্যাই টিপু। মিটি মিটি হাসছিস যে বড়ো? যা এক্ষুনি সবার জন্য চা আর প্রজাপতি বিস্কুট নিয়ে আয়। নইলে তোকে এক্ষুনি ব্যান করব আমাদের ক্লাব থেকে।”
এই কথাটা শুনে আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। বললাম, “সে না হয় চায়ের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু তুমি আজ এমন খাপ্পা হয়ে আছ কেন বলো তো?”
“সব বলব, আগে তুই চা-টা নিয়ে আয়। তুই তো জানিস টিপু, গলাটা না ভিজলে গুছিয়ে কথা বলতে পারি না আমি।”
অগত্যা ছুটলুম মাঠের ধারে দিনুদার চায়ের দোকানে। একটা জংধরা থালার উপর চায়ের ভাঁড়গুলো বসিয়ে, ঠোঙার মধ্যে চারটে বিস্কুট ভরে, থালাটি নিয়ে এসে বুড়োদার সামনে রাখলাম। পকেট থেকে বিস্কুটের ঠোঙাটি বের করতেই সেটি উড়ন্ত চিলের মতো ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, ঠোঙা থেকে গোটা দুয়েক প্রজাপতি বিস্কুট বের করে ঠোঙাটা আবার আমায় ফিরিয়ে দিল সে। বলল, “বাকিটা ভাগ করে নে তোরা।”
“বাকি আর থাকল কী!” ভানু খোঁচাল।
“অ্যাঁ, ওটুকু তো পেট তোদের, আর কত খাবি?” বুড়োদাও গরম তেলে ফোড়ন ছাড়ল।
ভানু আবার তেড়েফুঁড়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, আমি তাকে চিমটি কেটে থামিয়ে দিলাম। বললাম, “আহ ভানু! বুড়োদা সিনিয়র, ওর সঙ্গে এমন ব্যবহার করা তোর মোটেই শোভা পায় না।” তারপর সটান বুড়োদার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুমি এবার বলো তো, সকাল থেকে অমন খেপচুরিয়াস হয়ে আছ কেন?”
বুড়োদা প্রজাপতি বিস্কুটটা একটু ভেঙে, চায়ে ডুবিয়ে মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে বলল, “খুব হিংসে হচ্ছে।”
“সে আর নতুন কী? ও তো তোমার সবার উপরেই হয়। এই তো গত সপ্তাহে মুম্বাই থেকে আমার ছোটোমামা এসেছিল আমাদের বাড়িতে বেড়াতে। তাই সেদিন মামাকে সঙ্গে নিয়ে হাউমাউচাউতে একটু চাইনিজ খেতে গেছিলাম। মামা আমায় হাক্কা নুডলস আর গার্লিক চিকেন খাইয়েছিল। ওমা, পরেরদিন দেখা হতে না হতেই তুমি আমায় কী কথাটাই না শোনালে, এমনকি বেইমান অবধি বললে। এও তো হিংসারই লক্ষণ।”
ভানুর কথা শুনে বুড়োদার ঢ্যাঁড়সের মতো লম্বা এবং ফরসা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। আরেকটু হলেই একটা কেলেঙ্কারি ঘটত, তার আগেই আমি ভানুর টাকে একটা কষিয়ে চাঁটি মারলাম। ভানুও একটা আর্তচিৎকার করে চুপ করে গেল।
পটল, এতক্ষণ হাঁ করে কী যেন একটা ভাবছিল, হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই, বলে উঠল, “বুড়োদা আর ইউ আ হিংসুটে?”
আমি ভাবলাম, গেল, বুড়োদা আর আস্ত রাখবে না। কিন্তু ওমা, পটলের কথায় দেখি বুড়োদার তেমন হেলদোল হল না। চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে সে বলল, “হতে হয় রে, হতে হয়। মাঝেমধ্যে হিংসুটেও হতে হয়।”
“তা কেন হল তোমার হিংসা আর কার উপরেই বা হল?” আমি শুধোলাম।
বুড়োদা ভাঁড়ের চাটুকু শেষ করে সেটি মাঠের পাশে ঝোপের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “মান্নাপাড়ায় আমার মেজদিদি থাকে জানিস তো? ওই যে যাদের বাড়ির পাশে বিশাল করে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়?”
আমরা সকলে একত্রে ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিলুম যে জানি।
বুড়োদা আরও বলল, “মেজদিদির একটা অদ্ভুত ট্যালেন্ট আছে বুঝলি?”
“হোয়াট কাইন্ড অফ ট্যালেন্ট?” পটল জিজ্ঞেস করল। ওর মা আসলে ইংরেজির টিচার তো, তাই হরদমই সে ইংরেজিতে কথা বলে।
“টাকা জমানোর ট্যালেন্ট। মেজদিদি টাকা জমালে সে টাকা জমেই থাকে, খরচ হওয়ার জো নেই।”
ভানু বলল, “এতে আবার স্পেশাল ট্যালেন্ট লাগে নাকি? ব্যাংকে টাকা জমালেই হয়!”
বুড়োদা ভানুর করা টিটকিরিটা না শোনার ভান করেই বলে চলল, “সেদিন দিদির বাড়ি গেছি খোঁজখবর নিতে। আমায় এক গ্লাস সরবত আর একটু মিষ্টি দিয়েছে। আমি সেগুলোর সদ্ব্যবহার করছি। এমন সময় শুনি দিদির হৃদয়বিদারক চিৎকার। সে এমন চিৎকার যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার খাওয়ার গতিও স্লথ হয়ে গেছিল। কিন্তু খাওয়াদাওয়ার সময় আমি কেমন নির্লিপ্ত থাকতে পারি, তা তো তোরা জানিসই। তাই যথারীতি আবারও নিজের প্লেটে রাখা মিষ্টান্নে মন দিলাম। কিন্তু খাওয়াতে আবার ব্যাঘাত ঘটল। তাকিয়ে দেখি দিদি আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফাতে লাফাতে ছুটে এসেছে বসার ঘরে। ওর হাতে ছিল বেশ অনেকগুলি হাজার টাকার লাল লাল নোট। দিদির মুখে এমন লম্বা হাসি, যেন মনে হল ওর মুখের ভিতর কেউ একটা হ্যাঙ্গার ঢুকিয়ে দিয়েছে।
“জিজ্ঞেস করলুম, ‘কী ব্যাপার রে মেজদি? অমন শিম্পাঞ্জির মতো লম্ফঝম্প করছিস কেন?’
“অন্যদিন হলে ঠাটিয়ে একটা চড় মারত আমায়, কিন্তু সেদিন গাল এঁটো করে হেসে বলে কিনা, ‘দেখ ভাই, এই সাত হাজার টাকা পুরী থেকে কিনে আনা একটা ছোট্ট পার্সে রেখে জাস্ট ভুলে গেছিলাম। আজ তোর জামাইবাবুর একটা জামা খুঁজতে গিয়ে পার্সটা পেয়ে খুলে দেখি...’
“আমি ওর কথা কেটে বললুম, ‘পুরী! সে তো গেছিলি আগের বছর সেপ্টেম্বরে! প্রায় বছর ঘুরতে চলল, এতদিনে তোর একবারও টাকাগুলোর কথা মনে পড়েনি?’
“দিদি নোটগুলো আরও একবার গুনতে গুনতে বলল, ‘আরে এই টাকাগুলোর যে অস্তিত্ব আছে সেটাই তো ভুলে গেছিলাম। আমার এমন মাঝেসাঝেই হয়।’
“ব্যস, আমার মেজদিদির উপর দারুণ হিংসে হল। আরে বাবা ভোলার ট্যালেন্ট কি আমারও কিছু কম আছে নাকি? চাইলে আমিও অমন টাকা লুকিয়ে রেখে ভুলে যেতে পারি, কিন্তু আমার কাছে যেহেতু লুকানোর মতো টাকাই নেই, তাই ঠিক সুবিধা করতে পারছি না। ইশ, টাকা জমানোর কী ভালো উপায় বল তো?”

বুড়োদার কথা শুনে আমার মাথায় একটা দারুণ আইডিয়া খেলে গেল। আমাদের আড্ডা শেষে বাড়ি ফেরার পথে বুড়োদাকে একা পেয়ে ধরলাম আমি। বললাম, “বুড়োদা, আমি একটা ভালো কোয়ালিটির টিভি ভিডিও গেম কিনব বলে একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছি। অনেকটাই জমিয়েছি, কিন্তু রাখতে পারছি না। নানান কাজে খুচখাচ যখন তখন খরচ হয়ে যাচ্ছে।”
“তুই ওটুকু ছেলে, তোর আবার অত খুচুরখুচুর খরচা কীসের রে? কানের গোড়ায় এক দেব কষিয়ে, খরচ করা ভুলে যাবি।” বুড়োদা চোখ পাকিয়ে বলল।
আমি বললাম, “বাজে খরচ না গো বুড়োদা, সবই কাজের খরচ। এই দেখো না, আজ চা বিস্কুট খেতেই পনেরো টাকা বেরিয়ে গেল। এমন কত খরচ হয় এদিকসেদিক। তাই বলছি আমার টাকাগুলো তুমি লুকিয়ে রেখে ভুলে যাও। আমার যখন দরকার হবে আমি তোমার থেকে নিয়ে নেব।”
বুড়োদা প্রথমে গাঁইগুঁই করছিল একটু, কিন্তু শেষে আমার জোরাজুরিতে রাজি হল। কথামতোই আমি একদিন সন্ধেবেলায় আমার জমানো সব টাকা বুড়োদার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম।
এরপর একটা বছর কেমন যেন ঝড়ের বেগে কেটে গেল। এর মাঝে বেশ কয়েকবার আরও কিছু জমানো টাকা বুড়োদার কাছে গিয়ে ডিপোজিট করে এসেছি।
তারপর একদিন মনে মনে হিসেব করে দেখলাম যে ভিডিও গেম কেনার মতো টাকা আমার জমে গেছে। যথারীতি বুড়োদাকে গিয়ে বললাম, “বুড়োদা এবার আমি টাকাগুলো উইথড্র করব।”
বুড়োদা বলল, “যাক বাবা! এবার আমায় দায়িত্ব থেকে মুক্ত কর দিকি। চল বাড়ি চল। তোর টাকা তোর হাতে তুলে দিয়ে একটু ক্ষান্ত হই।”
আমি খুশি খুশি মনে বুড়োদার সঙ্গে ওর বাড়ি গেলুম। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় জেঠিমা মানে বুড়োদার মায়ের মুখোমুখি পড়ে গেলাম। আমি টুক করে প্রণাম করতেই তিনি বললেন, “কী রে টিপু, এখন আর আসিসই না তোরা! আগে তো সব এখানেই এসে পড়ে থাকতিস।”
আমি আলতো হেসে বললাম, “উঁচু ক্লাস হয়ে গেছে জেঠিমা, টিউশনিও বেড়েছে, তাই বেশি সময় পাই না।”
“বাব্বা, খুব বড়ো হয়ে গেছিস তো। যাহ পালা।”
জেঠিমা ছাড়তেই আমি এগোলাম বুড়োদার ঘরের দিকে। সে বোধহয় এতক্ষণে লুক্কায়িত জায়গা থেকে টাকাগুলো বের করে ফেলেছে।
নতুন ভিডিও গেম কেনার আনন্দে লাফাতে লাফাতে বুড়োদার ঘরে ঢুকতেই কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা মেরে গেলুম। এ কী লঙ্কা কাণ্ড শুরু করেছে বুড়োদা!
দরজার মুখে দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখলাম বুড়োদা নিজের ঘরটি ইতিমধ্যেই সুনামি বিধ্বস্ত উপকূল অঞ্চল বানিয়ে ফেলেছে। জামাকাপড়, বইপত্র, আরও নানান আনুষঙ্গিক জিনিস এদিক সেদিক রীতিমতো লণ্ডভণ্ড হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আর সেই সব ঘাঁটতে ঘাঁটতে বুড়োদা বিড়বিড় করে একটাই কথা বারবার করে বলে চলেছে, “এহে! কোথায় যে রাখলাম, কিছুতেই মনে পড়ছে না। ছিঃ ছিঃ, সো এম্ব্যারেসিং!”
আমি এবার খানিক সন্ত্রস্ত হয়ে বললুম, “কী গো, টাকা নেই?”
বুড়োদা চিড়িয়াখানার বাঁদরগুলোর মতো বিচ্ছিরিভাবে দাঁত খিঁচিয়ে বলল, “থাকবে না কেন! থাকবে না তো যাবে কোথায়? এই ঘরেই আছে।” তারপর আচমকাই কেমন যেন ভেবলে গিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “তোকে বলেছিলাম না ভোলাতে আমি এক্সপার্ট, দিদির চেয়েও বেশি। ওটাই আমার কাল হল। টাকাটা যে কোথায় লুকিয়েছি, কিছুতেই মনে করতে পারছি না।”
“তাহলে আমার ভিডিও গেমের কী হবে?” আমার চোখদুটো ছলছল করে উঠল।
“ধুর বোকা, কাঁদছিস কেন! আমি এক্ষুনি বাজার থেকে এক আঁটি ব্রাহ্মীশাক কিনে আনছি। কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে হালকা করে ভেজে, ভাত দিয়ে মেখে খেলেই মনে পড়ে যাবে তোর টাকাগুলো কোথায় রেখেছি। তুই এখন বাড়ি যা, আমি সন্ধেবেলায় তোর বাড়ি গিয়ে টাকাটা দিয়ে আসব। চিন্তা নেই, তোর টাকা মার যাবে না।”
আমি ভালো ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে বাড়ি চলে এসেছিলাম সেদিন।

তারপর আজ বছর দেড়েক কেটে গেছে। আজও বুড়োদার মনে পড়েনি টাকাগুলো সে কোথায় লুকিয়েছিল। বললেই বলে, “টিপু রে, মনে পড়তে পড়তেও পড়ছে না। তবে আর এক-দুদিনের মধ্যে সিওর মনে পড়ে যাবে। চিন্তা নেই, তোর টাকা মার যাবে না।”
কথাটা প্রথম যেদিন ভানুকে বলেছিলাম, ও ব্যাটা হাসতে হাসতে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, বিষম-টিষম খেয়ে একাকার কাণ্ড বাঁধিয়েছিল। কেন যে সেদিন ভানু অমন করে হেসেছিল, আজও বুঝতে পারিনি।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment