
উড়ান
পারমিতা মণ্ডল
সকাল থেকেই ভীষণ ঠান্ডা হাওয়া বইছে।
শীতকালটায় এত সকালে উঠে স্কুলে যেতে মোটেই ভালো লাগে না অনিশার। লেপ থেকে বেরোতেই
চায় না সে। কিন্তু তা বললে হবে কেন? স্কুল তো যেতেই হবে।
তাই কোনোরকমে উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নেয় অনিশা। ঠান্ডায় ভালো না লাগলেও স্কুলে যাওয়া যে জরুরি সেটা জানে সে। অনিশা খুব ভালো নাচতে পারে। এখনও নাচের স্কুলে ভরতি না হলেও
বাড়িতেই কখনও আপন মনে নাচে, আবার কখনও ইউটিউব দেখে নাচ তুলে নেয়। পাড়ার রবীন্দ্র নজরুল সন্ধ্যা হোক বা ওইরকম ধরনের কোনো অনুষ্ঠান, ডাক পড়ে অনিশার। স্কুলের
অনুষ্ঠানেও অনিশাকে নাচের জন্য প্রথম সারিতেই রাখেন টিচাররা।
বেশ কিছুদিন থেকে জোর কদমে নাচের
অনুশীলন চলছে স্কুলে। সামনেই যে বার্ষিক অনুষ্ঠান। প্রার্থনা হবার পরেই শুরু হল অনুশীলন। হাতে আর একটুও সময় নেই। অন্যান্য বাচ্চাদের
সঙ্গে অনিশাও খুব খুশি নাচবে বলে। কিন্তু নাচতে নাচতে হঠাৎ ওর এক বন্ধু বুঝতে না
পেরে ওকে ধাক্কা মেরে দিল। আর ব্যস্, অনিশাও পড়ল হুমড়ি খেয়ে স্কুলের
সিমেন্ট বাঁধানো মেঝেতে। হাতে পায়ে চোট লাগল। তারপর তার কান্না আর দেখে কে?
বন্ধুটাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে অনিশাকে অনেক করে সরি বলল।
অনিশাও ‘ঠিক আছে’ বলেছে কিন্তু পায়ের
চোটে খুব ব্যথা। ছুটির পর স্কুল থেকে চোট পাওয়া পা নিয়ে অনিশা যখন বেরোল তখন ওর
মা তনু ওকে দেখে তো অবাক! তনু নিতে এসেছে অনিশাকে। নাচের মিস
এসে তনুকে জানাল বিষয়টা। অনিশা খোঁড়াতে খোঁড়াতে মায়ের সঙ্গে বাড়ি এল কোনোরকমে।
তনু তো এসেই বলে দিল, “তোমার আর নেচে দরকার
নেই। এই পা নিয়ে কীভাবে নাচবে শুনি? চুপচাপ
বাড়িতে রেস্ট নেবে।”
শুনেই তো অনিশার ভীষণ মনখারাপ। কিন্তু
কী আর করা যাবে? এই পা নিয়ে সত্যিই কি নাচা সম্ভব? অগত্যা
বাড়িতেই থাকা।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করে
খেয়ে অনিশা একটু ব্যালকনিতে রোদে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ ঠান্ডা পড়েছে। সকালের
মিষ্টি রোদ বেশ ভালো লাগে অনিশার। ব্যালকনিতে মা গাছে জল দিচ্ছে, পরিচর্যা করছে ওদের। হরেকরকম ফুল ফুটেছে টবের গাছগুলোতে। কত রঙের গোলাপ,
ডালিয়া, গাঁদা, পপি,
বোগেনভিলিয়া আরও কত কী! অনিশাও মাকে সাহায্য করে বাগান করায়। জল
দেয়, টবের মাটি খুঁড়ে দেয়। ব্যালকনিতে শুধু ফুলের গাছ আছে
তা নয়। একটুআধটু সবজিও লাগিয়েছে ওরা শখ করে। টমেটো, কাঁচালঙ্কা
ইত্যাদি। মাঝে মাঝে পাখি খেতে আসে ওগুলো। খানিকক্ষণ ফুলের গায়ে হাত বোলাতে থাকল
অনিশা। মা ফুল ছিঁড়তে মানা করলেও বলেছে ওদের গায়ে হাত দিতে পারবে। ফুলগুলোকে আদর করা হয়ে গেলে অনিশা দেখতে লাগল ব্যালকনির আনাচে কানাচে।
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল একটা জিনিসে। ‘কী ওটা?’ অনিশার
কৌতূহলী মন ওকে জিনিসটার কাছে নিয়ে গেল। ভালোভাবে লক্ষ করে
দেখল। “একটা শালিক পাখির ছানা পড়ে আছে মনে হচ্ছে!” একটু অবাক হয়ে বলল সে। ছানাটিকে সযত্নে হাতে তুলে নিল। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। অনিশা দেখল শালিকের
ছানাটির একটা পায়ে ভীষণ চোট লেগেছে। সে ঠিক করে দাঁড়াতেই পারছে না। শুধু ডানা
ঝাপটাচ্ছে। ওর ছোট্ট ছোট্ট চোখগুলোয় যেন কত কষ্ট। অনিশা তনুকে চিৎকার করে ডেকে
বলল, “মা, মা,
এদিকে একবার এসো। দেখো এই পাখির ছানাটাকে। ওর কেমন চোট লেগেছে
পায়ে। ইসস্!”
তনু মেয়ের কথা শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখল
শালিক ছানাটিকে আর বলল, “সেই তো দেখছি। কীভাবে হল এটা কী জানি। আহা রে বেচারা!”
“মা ওকে ঘরে নিয়ে যাই-না প্লিজ। ওর পায়ে ওষুধ লাগিয়ে দেব।”
তনু মেয়ের সরল মনের কথা বুঝতে পেরে
সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। অনিশা শালিক ছানাটিকে নিয়ে সোফায় বসে ফার্স্ট এইড বক্স
খুলে বসল। তারপর তুলো দিয়ে ভালো করে চোট লাগা জায়গাটা মুছে দিয়ে একটা মলম লাগিয়ে
দিল। মেয়ের এই সব কাণ্ডকারখানা দেখে তনু তো অবাক! অনিশা
মাকে বলল, “মা, কিছু চাল ডাল দাও না
একটা বাটিতে, ওকে খাওয়াব। আর একটা বাটিতে একটু জল-ও দেবে।”
মুচকি হেসে তনু সেটাই করল। অনিশা এক
হাতে পাখির ছানাটাকে নিয়ে আর এক হাতে চাল ডালের বাটি নিয়ে খাওয়াতে লাগল, আর জিজ্ঞেস করতে থাকল, “তুই কীভাবে চোট পেলি রে? তোর
মা তোকে ওড়া শেখাচ্ছিল? তোর মা কোথায়? জানিস আমারও পায়ে চোট লেগেছে। আমিও পড়ে গেছি।”
এইভাবে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে, সন্ধে পেরিয়ে রাত
হয়ে গেল। অফিস থেকে বাবা বাড়ি ফিরে সব শুনে তো হেসে কুটিকুটি। তবে মেয়ের এমন
উদার মন দেখে প্রশংসা করতেও ভুলল না। অনিশা রাতে একটা ছোট্ট পিচবোর্ডের বাক্সের
মধ্যে ছানাটিকে রেখে দিল। রাতে একটু চিঁ চিঁ করলেই অনিশা উঠে উঠে ওকে দেখতে থাকল।
এইভাবে কেটে গেল দু-দিন। সব সময় অনিশা তার দেখাশোনা করল।
একটুও কাছছাড়া করেনি। দু-দিন পর সকালে ঘুম থেকে উঠে অনিশা
বাক্সের কাছে গিয়ে অবাক হয়ে গেল।
“আরে কোথায় গেল ছানাটা?
মা, ও মা, পাখির ছানাটা
কোথায় গেল গো?”
তনু মেয়ের চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে
ছুটে এসে দেখল সত্যিই তো, ছানাটা নেই। বলল, “কী জানি, আমি তো দেখিনি। একটু খুঁজে দেখ আশেপাশেই আছে
নিশ্চয়। কোথায় আর যাবে চোট লাগা পা নিয়ে? দেখ ভালো করে সব জায়গায়।”
সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ছানাটাকে
পাওয়া গেল না। অনিশার খুব মনখারাপ হয়ে গেল।
মনখারাপ করে বসে থাকতে দেখে তনু বলল, “এভাবে বসে থাকিস না।
ওর পা প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। তাই হয়তো উড়ে চলে গেছে।”
কিন্তু তা বললে কী হবে? এই দু-দিনে যে অনিশার ভীষণ মায়া পড়ে গেছে শালিক ছানাটার ওপর। তাই মন একটুও ঠিক
হল না ওর। বরং মনখারাপ করে বসেই থাকল। একটু পরে অনিশা ব্যালকনিতে কিচিরমিচির শব্দ
শুনতে পেল। দেখল ওই ছানাটা আর একটা শালিক পাখি ওদের ব্যালকনিতে এসে ডাকাডাকি করছে।
দেখে তো অনিশার আনন্দ আর ধরে না। ‘হয়তো ওটা ওর মা,’ ভাবল সে। অনিশা কাছে যেতেই মা-পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে
গিয়ে পাশের বড়ো আম গাছের ডালে বসল। মা-শালিক উড়ে গেলেও ছানাটা উড়ে গেল না। অনিশা ছানাটার গায়ে হাত বুলিয়ে
দিতে থাকল। একটু পরে মা-শালিকটা কাছে এল। অনিশা ছুটে গিয়ে
রান্নাঘর থেকে চাল ডাল এনে ব্যালকনিতে সেগুলো ছড়িয়ে ওদের খেতে দিল। ওরাও মনের
আনন্দে লাফাতে লাফাতে খেতে লাগল আর গা চুলকোতে লাগল ঠোঁট দিয়ে। অনিশা আনন্দে মাকে
আবার জোরে জোরে ডাকল।
“মা, মা, এসে দেখো একবার এখানে।”
এবার তনু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “কী হয়েছে? বারবার ডাকছ কেন? আমাকে কাজ করতে দাও।”
“মা একবার এসে দেখো-না ওরা কেমন আনন্দ করছে।”
মেয়ের কথায় কৌতূহলী হয়ে তনু এসে সব
দেখে বলল, “তাই
তো! শালিক ছানার পা তো ঠিক হয়ে গেছে। ওর মা-ও এসেছে দেখছি।”
“না মা, আমি লক্ষ করে দেখেছি এখনও পুরোপুরি ঠিক হয়নি ওর পা।”
“কিন্তু তাতে কী?
ওড়ার চেষ্টা তো করছে। মাঝে মাঝে উড়তেও পারছে। চেষ্টাটাই আসল, বুঝলে সোনা। চেষ্টা করলে সব পারা যায়।”
“এই কথা তুমি বলছ মা?”
“কেন? কেন রে এমন বলছিস?”
“তুমিই তো আমার পায়ের
চোটের জন্য নাচ করতে দিলে না। চেষ্টাটুকুও করতে দিলে না। আমার পা তো প্রায় ঠিক
হয়েই গেছে।”
কথাগুলো বলে গুম হয়ে বসে রইল অনিশা।
তনু একটু চুপ করে থাকার পর হেসে বলল, “ঠিক আছে। আমরা তোমার
স্কুলের অনুষ্ঠানে যাব। আমি তোমার মিসকে বলে দিচ্ছি, তুমি
নাচবে।”
মায়ের কথা শুনে অনিশার আনন্দ আর দেখে
কে? ছুটে
গিয়ে মাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে মায়ের গালে চুমু খেয়ে
বলল, “ইউ আর দ্য বেস্ট মম।” মা-ও অনিশাকে খুব আদর করল। ওদিকে মা-পাখি আর ছানা
পাখি পেট ভরে দানা খেয়ে নীল আকাশে ডানা মেলল।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment