
অনন্যা দাশ
মন্টু যখন ফোন করে আমাকে জানাল যে ফুলদাদু দু-দিনের জন্যে পাটনা যাচ্ছেন, তখন আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না। আসলে ফুলদাদু আমার বাবার সেজোমামা। একটু খামখেয়ালি বললে কম বলা হবে। বিয়ে-টিয়ে করেননি। সারাজীবন টো টো করে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন। ওঁর বাড়িটা একটা মিউজিয়ামের চেয়ে কম কিছু নয়। কিন্তু মুশকিলটা হল, এখন উনি নিজেকে একেবারেই গুটিয়ে নিয়েছেন। একমাত্র কাজের লোক মন্টু ছাড়া আর কাউকে বাড়িতে ঢুকতে পর্যন্ত দেন না! কীসের ভয় জানি না। হয়তো মনে হয়, লোকে ওঁর জিনিস চুরি করে নেবে। তা সেহেন ফুলদাদু দু-দিনের জন্যে মেয়ের কাছে পাটনা যাবেন শুনে আমার মনে হল, এটাই সুযোগ। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই আমার বন্ধুদের ফুলদাদুর সংগ্রহের কথা বলেছি। ওরা ওঁর সংগ্রহ দেখার জন্যে খুব আগ্রহী, কিন্তু ফুলদাদু কিছুতেই আমায় ওদের নিয়ে বাড়িতে যেতে দেবেন না। ওরা নাকি হইহই করবে, জিনিসপত্র ভেঙে দেবে! কী অদ্ভুত রে বাবা! আমি বা আমার বন্ধুরা কেউ তো আর বাচ্চা নই! আমরা সবাই কলেজে পড়ি। তাই আমি মন্টুকে বলে রেখেছিলাম যে দাদু যদি কোথাও বেড়াতে যান, তাহলে আমাকে জানাতে। আমি সেই সুযোগে বন্ধুদের নিয়ে চট করে একটা ছোটো ট্যুর দিয়ে আসব দাদুর বাড়ি। হলও তাই। দাদু দু-দিনের জন্যে থাকবেন না শুনেই আমার বন্ধুরা সবাই লাফিয়ে উঠল পদ্মপুকুর যাওয়ার জন্য। আমি অবশ্য বলে দিলাম যে আমরা একটা রাতই থাকব দাদুর বাড়ি, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। শনিবার গিয়ে সেই রাতটা থেকেই রবিবার দিন কলকাতা ফিরে আসব। সবাই তাতেই রাজি।
ফুলদাদু আর মন্টু বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই মন্টু চুপিচুপি আমাকে একটা এসএমএস করে দিল। আমরা সবাই মোটামুটি তৈরিই ছিলাম। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পথে একটা ধাবায় থেমে খেয়ে নিলাম আমরা। রাতের জন্যে খাবারও নিয়ে নিলাম। ফুলদাদুর বাড়িতে কিছু খাবার ব্যবস্থা থাকবে না তেমন, সেটা জানা কথা আর আমাদের রান্নাবান্না করার ইচ্ছে নেই। তাছাড়া, রান্নাঘর নোংরা হয়ে থাকলে দাদু ফিরে এসে বুঝতে পেরে যাবেন। আমাদের উদ্দেশ্য—সবকিছু যেমন আছে, তেমনটাই রেখে দেওয়া।
আমরা এগারোটা নাগাদ বেরিয়েছিলাম আর রাস্তা ঘণ্টা তিনেকের, তাই আমাদের দুটো-তিনটে নাগাদ পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু খাওয়া-দাওয়া আর পথের একটা দুর্ঘটনার জন্য জ্যাম পাওয়ায় আমাদের একটু দেরি হয়ে গেল। ফুলদাদুর বাড়ি পোঁছোতে পৌঁছোতে চারটে বেজে গেল। মন্টু বুদ্ধি করে একটা চাবি আমার জন্যে রেখে দিয়েছিল বাড়ির পিছনের আউটহাউসের একটা বাক্সের মধ্যে। আমি সেটা বার করে নিলাম ওর কথামতন আর ফুলদাদুর বাড়িতে ঢুকে পড়লাম আমরা সবাই।
তা, আমাকে নিয়ে ছ’জন ছিলাম আমরা। ফুলদাদুর বাড়িটা বাড়ি তো নয়, যেন মিউজিয়াম। বাড়িটা ১৯৩৫ সালে তৈরি। এখনকার বাড়িগুলোর মতন নয় মোটেই। মন্টু দুটো ঘর ঠিক করে রেখেছিল আমাদের জন্য। তিনজন মেয়ে নীলা, শিউলি আর মিত্রা ডানদিকের ঘরটা নিল; আর অয়ন আর সোম নিল বাঁদিকের ঘরটা। আমি বাইরের ঘরের সোফাটাতেই শুয়ে পড়ব ঠিক করলাম। একটা রাতের তো ব্যাপার। তা, রাতটা যে আমাদের গল্প করেই কাটবে, সেটাই আশা করছিলাম।
ও! আমার বন্ধুদের সঙ্গেই তো পরিচয় করানো হয়নি। আমাদের মধ্যে মিত্রার মনের জোর সবচেয়ে বেশি, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ সে আহত অবস্থাতেও এসেছে। তার পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ। দু-দিন আগেই ভলিবল খেলতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে পা-টা মচকে গেছে তার। আমরা সবাই ওকে বারণ করছিলাম আসতে, কারণ তার হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে, ক্রাচ নিয়ে হাঁটছে; কিন্তু সে কিছুতেই ফুলদাদুর সংগ্রহ দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নয়। অগত্যা, সেও এসেছে আমাদের সঙ্গে। সোমটা বরাবরই ফক্কড়। সে মিত্রাকে দেখে খালি গাইছিল, “এখন আমি লেংচে মরি, ওরে বাবা লেংচে মরি!” শেষমেশ শিউলির কাছে প্রবল একটা ধমক খেয়ে চুপ করল। শিউলি একটু গম্ভীর প্রকৃতির। ওইসব ফালতু ফাজলামি তার একদম পছন্দ নয়। তার ইতিহাসে ভয়ানক আগ্রহ, সেই জন্যই সে এসেছে। নীলা আবার একেবারেই উলটো স্বভাবের। সে সবসময় এটা-সেটা দুষ্টুমি করেই চলে আর ওকে আটকানো কঠিন।
অয়নের জন্যই অবশ্য আমি অয়ন আর সোমের সঙ্গে এক ঘরে থাকতে রাজি হইনি। যদিও, আমি সে বিষয়ে কিছু বলিনি ওদের। অয়ন প্রচণ্ড নাক ডাকে। ওকে আমরা অনেকবার বলেছি স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য টেস্ট করাতে, কিন্তু সে করাবে না। যখনই বেড়াতে যাই, ওর সঙ্গে এক ঘরে শোওয়া মানে সারারাতের ঘুমটা মাটি। এমন বাজ পড়ার মতন নাক ডাকবে যে ঘুমোয় কার সাধ্যি! সোমই একমাত্র, যে ওর সঙ্গে এক ঘরে থাকতে রাজি থাকে। তার নাকি কোনো শব্দেই ঘুমোতে কোনো অসুবিধা হয় না। সে নাকি কামান দাগার শব্দ হলেও ঘুমিয়ে পড়তে পারে।
কোনোরকমে জিনিসপত্র ঘরে রেখে দিয়েই আমরা সবাই ফুলদাদুর সংগ্রহ দেখতে লাগলাম হামলে পড়ে। সারা পৃথিবী থেকে জোগাড় করা অসামান্য সংগ্রহ তাঁর। আমি বহুকাল আগে একবার দেখেছিলাম। কিন্তু তখন আমি খুব ছোটো, এইসব জিনিসের মূল্য বোঝা আমার কাছে অসম্ভব ছিল। এখন জিনিসগুলোকে দেখে আমার মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছিল আর আমার বন্ধুদের তো কথাই নেই। শিউলি তো পটাপট ছবি তুলে নিচ্ছিল জিনিসগুলোর আর তাদের সঙ্গে লিখে রাখা বিবরণগুলোরও। বলল, পরে ভালো করে সময় নিয়ে পড়বে আর উপভোগ করবে।
দাদুর সব চেয়ে প্রিয় এবং দামি সংগ্রহটার সামনে দাঁড়িয়ে ওরা সবাই থ হয়ে গেল। জিনিসটা আর কিছুই নয়, ইজিপ্টের হাইরোগ্লিফিক্স খোদাই করা একটা পাথর। লেখাগুলো কিছুটা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা রোসেটা স্টোনের মতন, কিন্তু আকারে অনেকটাই ছোটো। ছোটো না হলে দাদু ইজিপ্ট থেকে ওটাকে নিয়েই আসতে পারতেন না। তাও ওটাকে আনতে দাদুকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। দাম যা দিয়েছিলেন, সেটা তো আলাদা; কিন্তু এয়ারপোর্ট, কাস্টমস সব জায়গায় প্রচুর ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল দামের বিল সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও। সবাই নাকি এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, যেন উনি চোরাই মাল নিয়ে আসছেন। সেই গল্প দাদুর কাছেই শুনেছি। ওই গল্পটা বারবার বলতে ভালোবাসেন দাদু। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা বিখ্যাত রোসেটা স্টোনের মতন এটাও খ্রিস্টপূর্ব ১৯৬ অব্দের। ইজিপ্টের এক অত্যন্ত ধনী ব্যক্তির সংগ্রহে ছিল পাথরটা। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলে তাঁর সংগ্রহের সব জিনিস বিক্রি করে দেয় এবং দাদু সেই সময়ে ইজিপ্টে ছিলেন বলে পাথরটাকে কিনতে পারেন। ফুলদাদু আদর করে পাথরটাকে ‘অমু’ বলে ডাকেন। ‘অমূল্য’ থেকে ‘অমু’।
শিউলি ওটাকে দেখে ফিশফিশ করে বলে উঠল, “ওই একটা জিনিস নিয়ে একটা পুরো থিসিস লেখা হয়ে যেতে পারে।”
আমি ভেবেছিলাম আমরা বসে আড্ডা দেব সারারাত, কিন্তু দেখলাম, আমরা সকলেই সারাদিনের ধকলের পর খুব ক্লান্ত। অয়নের জ্বর এসে গেছে। মিত্রা ব্যথায় কাতর। তাই আমরা ঠিক করলাম, তাড়াতাড়ি শুয়েই পড়ব। পরদিন কথা বলা যাবে। ধাবা থেকে আনা খাবারগুলো বার করে খেতে বসেছি আমরা, এমন সময়ে পট করে আলোগুলো নিভে গেল! লোডশেডিং! এই খেয়েছে! মোমবাতি কোথায়, তাও তো জানি না!
“তোদের কারও কাছে টর্চ আছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। সোম তার পকেট থেকে টর্চ বার করল, ছোটো একটা।
আমার হাতে গুঁজে দিতে দিতে বলল, “ছি ছি! তোরা পাড়াগাঁয়ে বেড়াতে এসেছিস টর্চ ছাড়াই! তোদের আর কোনোদিন আক্কেল হবে না।”
আমি টর্চটা নিয়ে মোমবাতি খোঁজার জন্য যাব ভাবছি, এমন সময়ে আলো এসে গেল। আমরা সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে খাওয়া শেষ করলাম। মোমবাতি আর খুঁজতে হল না। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাসন মেজে সবকিছু যথাস্থানে রেখে বারোটার মধ্যে আমরা সবাই শুয়ে পড়লাম। ঘুমও এসে গেল সঙ্গে সঙ্গে, সত্যিই ক্লান্ত ছিলাম।
রাত তিনটে নাগাদ আমার ঘুমটা কোনো কারণে ভেঙে গেল। কিছু একটা শব্দ শুনলাম মনে হল ফুলদাদুর সংগ্রহের ঘরটা থেকে। ইঁদুর ঢুকেছে নাকি? মন্টুকে বলতে হবে ওষুধ দিতে। আমি ভাবলাম উঠে একবার দেখি, কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছিল না। অয়নের নাক ডাকা শুনতে পাচ্ছিলাম ওপাশের ঘরটা থেকে। মনে মনে ভাবলাম, মনে করেছিলাম এখানে শুলে নাক ডাকাটা এড়াতে পারব; কিন্তু তা তো হল না। যাই হোক, সেই সব ভাবতে ভাবতেই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল-সকাল ঘুম ভাঙল নীলার ঝাঁকুনিতে। চোখ খুলে দেখলাম, ওর পাশেই গম্ভীর মুখে শিউলি দাঁড়িয়ে।
আমি উঠে বসে চোখ কচলালাম, “কী হল রে? এত সকাল-সকাল ঘুম থেকে তুললি কেন? খিদে পেয়েছে নাকি?”
“না, খিদে পায়নি। মিশরের পাথরটা হাওয়া!”
“ধুস, মিথ্যে কথা বলার আর জায়গা পেলি না! আমাকে হার্ট অ্যাটাক দেওয়ার ইচ্ছে হল সাতসকালে তোদের! নীলা, তোর কাছে এটা আশা করা যায়, কিন্তু শিউলি তোর সঙ্গে যোগ দেবে, সেটা আশা করিনি।”
নীলা চাপা গলায় বলল, “আমি মজা করছি না!”
শিউলিও মাথা নাড়ল। দুজনের মুখ ফ্যাকাশে।
আমি এবার উঠে বসে সোফা থেকে নেমে ছুটে গিয়ে সংগ্রহের ঘরে গিয়ে দেখলাম, সত্যি পাথরটা নেই! আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। এই রকম কিছু ঘটবে, সেটা আমি একেবারেই আশা করিনি।
নীলা বলল, “তোরা হয়তো ভাববি, আমি নিয়েছি ওটাকে!”
আমি বললাম, “সেটা কেন ভাবব? তুই নিয়েছিস নাকি?”
“না, নিইনি। কিন্তু আমি সকাল পাঁচটা নাগাদ উঠেছিলাম বাথরুম যাওয়ার জন্য। তখন অন্ধকার ছিল।”
বাথরুমটা বাড়িটার সামনের দিকটায়।
“অন্ধকারের মধ্যে বাথরুমটা খুঁজে পাওয়া চাপের ব্যাপার। কোনো একটা জিনিসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি। এই দেখ, কালশিটে পড়ে গেছে! আলোর সুইচ কোথায়, সেটাও খেয়াল করিনি কাল। সেই সুইচ খুঁজতে গিয়ে পা ভেঙে যাবে মনে করে কোনোরকমে বাথরুমে গেলাম। সোমের টর্চটা নিয়ে রাখলে ভালো হত। কিন্তু, পাথর আমি নিইনি।”
“ঠিক আছে। চল, বাকিদের ঘুম থেকে তুলি। চোর ধরার সময় এসে গেছে।”
হঠাৎ ‘খট, খট, খটাস’ করে শব্দ হল। আমি চমকে ফিরে তাকালাম। সামনের দরজাটা খুলে গেল আর মন্টুকে সঙ্গে করে নিয়ে ফুলদাদু এসে ঢুকলেন।
আমাদের দেখতে পেয়েই মন্টুকে বললেন, “আমি বলেছিলাম না, আমি সব কিছু বুঝতে পারি! আমার মনে হচ্ছিল, বাড়িতে কেউ ঢুকেছে আর এই দেখ! একজন নয়, অনেক লোক!”
মন্টু বলল, “ও তো সতুদাদা। তোমার নাতি হয় তো!”
“সতু আমার কে হয়, আমি জানি! কিন্তু বাড়িতে তো ঢুকেছে কেউ! ও, এবার বুঝতে পেরেছি! এটা সব তোর পরিকল্পনা! তোর সাহায্য ছাড়া এখানে কেউ ঢুকতেই পারত না!”
আমি বললাম, “ফুলদাদু, আপনি রাগ করবেন না। আমি শুধু আমার বন্ধুদের আপনার অসামান্য সংগ্রহ দেখাতে এনেছিলাম।”
দাদু আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে চট করে সংগ্রহের ঘরে ঢুকে, মিনিট খানেকের মধ্যেই বেরিয়ে এসে বললেন, “সংগ্রহ দেখাতে এনেছিলে তো বুঝলাম, কিন্তু তাহলে আমার অমুকে দেখছি না কেন?”
“সেটা এখুনি বেরিয়ে যাবে!” আমি বললাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ছ’জন একসঙ্গে এসে বসলাম। দাদুও রইলেন তাঁর প্রিয় আরামকেদারাটায় বসে। মন্টু আমাদের জন্য জলখাবার করতে গেল।
আমি বললাম, “দাদু, এই হল আমার বন্ধুরা – নীলা, শিউলি, মিত্রা, অয়ন আর সোম। আমরা একসঙ্গে কলেজে পড়ি। আর ইনি হলেন আমার ফুলদাদু, যাঁর সংগ্রহ তোরা উপভোগ করছিলি। হ্যাঁ, দাদু ফিরে এসেছেন। কিন্তু দাদুর অমুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আশা করছি, যে নিয়েছে, সে অমুকে ফিরিয়ে দেবে; কারণ দাদুকে দুঃখ দেওয়ার জন্য আমি তোদের এখানে আনিনি। আমি চেয়েছিলাম, দাদুর অসামান্য সংগ্রহ তোরা দেখ!” আমি যে পাথরটা নিয়েছে, তার দিকে তাকিয়ে বললাম।
নীলা আশ্চর্য হয়ে বলল, “কে নিয়েছে, তুই জেনে ফেলেছিস? কী করে বুঝলি?”
আমি নীলাকে বললাম, “তুই নিসনি, আমি জানি; কারণ তুই তো আমাকে বললি, আসবাবপত্রে ধাক্কা খেয়েছিস। কালশিটেও দেখালি। তোদের ঘর থেকে সংগ্রহের ঘর পর্যন্ত কোনো আসবাবপত্র নেই। তাই ধাক্কা লাগার প্রশ্ন নেই। তার মানে তুই বাথরুমে গিয়েছিলি, সংগ্রহের ঘরে নয়।”
নীলা সম্মতিতে মাথা নাড়ল।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুইও নিসনি, কারণ তুই তো নড়তেই পারছিস না ভালো করে। ক্রাচগুলো নিয়ে ওই ঘর পর্যন্ত গেলে আমি শুনতে পেতাম। ওগুলো যা খটাস খটাস শব্দ করে।”
মিত্রা ম্লান হাসি হাসল।
আমি অয়নের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমি রাত তিনটেতে ওই ঘরের দিক থেকে একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। আমার অনুমান, তখনই পাথরটাকে সরানো হয়েছিল। ওই শব্দের সঙ্গে আমি তোর নাক ডাকার শব্দও শুনতে পেয়েছিলাম। তার মানে, তুই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলি। আর তোর জ্বর বলে তুই যে ওষুধটা খেয়েছিলি, তাতে জোর ঘুম পায়, আমি জানি।”
অয়ন বলল, “হ্যাঁ।”
শিউলিকে আমি বললাম, “তুই ফুলদাদুর সংগ্রহের জিনিসগুলোকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিলি। তুই সব জিনিস আর বিবরণের ছবিও তুলেছিস। তোর চুরি করার মতন প্রবৃত্তি বা মানসিকতা নেই।”
এবার আমি সোমের দিকে তাকিয়ে বললাম, “অমুকে তুই নিয়েছিস। ওটাকে ফিরিয়ে দে। একমাত্র তোর কাছেই টর্চ আছে, তাই তোর আলো জ্বালাবার দরকার হয়নি। তুই ওই ঘরে ঢুকে টর্চের আলোতেই অমুকে দেখতে পেয়েছিলি।”
সোম অপরাধী মুখ করে বলল, “আমি তোর দাদুর সঙ্গে একটু মজা করতে চাইছিলাম। যে-জিনিসকে দেখলে সবাই আনন্দ পাবে, সেইসব জিনিসগুলোকে উনি নিজের স্বার্থের জন্য ঘরে বন্দি করে রেখেছেন। শুধু নিজেই দেখেন, নিজেই আনন্দ পান। অন্যকে আনন্দ দিতে চান না তিনি। পাথরটা ওই ঘরেই আছে, সারনাথের বুদ্ধটার পিছনে লুকিয়ে রেখেছি। আমার চুরি করার কোনো বাসনাই ছিল না। আমি শুধু একটু মজা দেখতে চাইছিলাম।”
শিউলি রেগে গিয়ে বলল, “তোকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে মজা দেখবি!”
আমি কিছু বলার আগেই দাদু বললেন, “না, একদম ঠিক বলেছ তুমি! আমি খুব আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিলাম। হ্যাঁ, সুন্দর জিনিস সবাইকে আনন্দ দেওয়ার জন্য হওয়া উচিত। আমি আর কাউকে এখানে আসতে বারণ করব না। তাছাড়া সতুর মতন নাতি যখন রয়েছে, তখন আমার ভাবনা কী? চুরি হলেও সে চোর ধরে দেবে নিমেষে!”
দাদুর কথা শুনে আমরা সবাই হো হো করে হেসে ফেললাম।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment