গল্প:: বন্ধু - রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস


বন্ধু
রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস

ঝিকাই-এর সঙ্গে গোগোলের বেঁধে গেল তুমুল ঝগড়া। ঝগড়া যখন প্রায় হাতাহাতির রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই বুটুদাদু দুজনের মাঝে এসে দাঁড়াল। বুটুদাদুকে দেখে ঝিকাই আর গোগোল দুজনেই চুপ। বেশ কিছুক্ষণ পর বুটুদাদু বলল, “কী হয়েছে? ঝগড়া কেন?”
গোগোল আর ঝিকাই দুজনেই একসঙ্গে ঝগড়ার কারণ বলা শুরু করল বলে বুটুদাদু ওদের কথা কিছুই প্রায় বুঝতে পারল না। ভুরু কুঁচকে তাকাল। একবার গোগোলের দিকে। একবার ঝিকাইয়ের দিকে। রিমলি, তুতুন, টুকাইও একটু দূরে দাঁড়িয়ে গোগোল আর ঝিকাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আর মনে মনে ভাবছে, এবার নিশ্চয়ই বুটুদাদু শাস্তি দেবে। কিন্তু কাকে শাস্তি দেবে! বুটুদাদু চুপ করে আছেন দেখে কিছুক্ষণ পর ঝিকাই বলে উঠল, “জানো, বুটুদাদু! গোগোল না...”
বুটুদাদু ঝিকাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “বন্ধুর বিরুদ্ধে নালিশ করতে নেই।”
একটু মনখারাপ করে গোগোল বলল, “আমরা আর বন্ধু নেই, বুটুদাদু! আমাদের কাট্টি হয়ে গেছে।”
বুটুদাদু গোগোল আর ঝিকাইয়ের হাত ধরে মুচকি হেসে বলল, “আচ্ছা বেশ! আমার এই গল্পটা আগে শোনো। গল্প শেষে দেখো তো, তোমাদের ভাব হয়ে যায় কিনা!”
গল্পের কথা শুনে টুকাই, রিমলি, তুতুনও ছুটে এল। বুটুদাদুকে গল্পের জন্য সবাই ঘিরে ধরে অধীর আগ্রহে। এমন সময়ে বুটুদাদু বলল, “ঘরে নয়। চলো, সবাই মিলে আজ ছাদে গিয়ে বসি। আজ আগে গল্প। পরে অঙ্ক। গল্প হবে ছাদে। অঙ্ক হবে ঘরে।”

রোজ সন্ধ্যায় স্কুল শেষে রিমলি, তুতুন, টুকাই, গোগোল আর ঝিকাই বুটুদাদুর কাছে অঙ্ক করতে যায়। অঙ্ক শেষে বুটুদাদু সবাইকে একটা করে গল্প বলে। আজ ঝিকাই আর গোগোলের ঝগড়ার কারণেই হয়তো বুটুদাদু আগে গল্প বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বুটুদাদুর সঙ্গে সবাই একসঙ্গে ছাদে গেল। সন্ধ্যা হয়-হয়। সূর্যের আলো প্রায় নিভু-নিভু। পাখিরা বাসায় ফিরতে ব্যস্ত। বুটুদাদুর হাতে একটা বড়ো মোমবাতি আর দেশলাই। একটা শতরঞ্চি বিছিয়ে সবাই বুটুদাদুকে ঘিরে বসে পড়ল। বৈশাখী বাতাসে ফুরফুরে হাওয়ায় দুলছে সবার মন।
“বুটুদাদু, আজ কীসের গল্প বলবে?” তুতুন প্রশ্নটা করেই ফেলল।
“আজ বলব সত্যি ঘটনা। যা আমার নিজের জীবনে ঘটেছিল।”
কথাটা বলেই বুটুদাদু মোমবাতি জ্বালাল। পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন ঢলে পড়েছে, আকাশের লাল আভাকে ঢেকে দিয়েছে মেঘের ভেলা, বুটুদাদু তখন শুরু করল তার গল্প।
“সে অনেকদিন আগের কথা। তখন আমি তোমাদের মতোই ছোটো। লালমোহন গাঙ্গুলি বলে আমার এক বন্ধু ছিল।”
টুকাই মাঝপথে বুটুদাদুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “লালমোহন গাঙ্গুলি মানে ফেলুদার বন্ধু জটায়ু?”
বুটুদাদু মুচকি হেসে বলল, “না। এ লালমোহন গাঙ্গুলি ফেলুদার বন্ধু নয়। আমার বন্ধু। ভালোবেসে আমি যাকে ‘মোহন’ বলে ডাকতাম। যার সঙ্গে আমি ক্লাস ওয়ান থেকে এইট পর্যন্ত পড়েছি। একই স্কুলে। তোমাদের মতো আমাদের ছোটোবেলায় ফোন ছিল না। ছিল না ভিডিয়ো কলের সুযোগ। তাই স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে শুধু স্কুলেই যোগাযোগ। স্কুল ছুটির পর, দিন শেষের সময় গুনতাম। সময় গুনতাম, পরদিন স্কুলে যাবার জন্য। মনের সমস্ত কথা মনের মধ্যেই সাজিয়ে-গুছিয়ে যত্ন করে তুলে রেখে দিতাম বন্ধুর জন্য। মোহনের জন্য। কখন স্কুলে যাব, কখন মোহনের সঙ্গে গল্প করব, খেলব। আর গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি এলেই হয়ে যেত মনখারাপ। আমি আর মোহন দুজন দুজনকে না দেখে যেন থাকতেই পারতাম না। একমাসের ছুটি মানে একমাস দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ। কথা বন্ধ। মনে শুধুই অপেক্ষা। এই অপেক্ষা যে কখনও মাস থেকে বছরেও গড়াতে পারে, শিশু বা কিশোরমনে আমার সে কথা কখনোই মনে হয়নি। ভাবতাম, গোটা জীবনটাই বুঝি এমনি করে কেটে যাবে। আমি আর মোহন একই কলেজেও পড়ব। একসঙ্গে একই জায়গায় চাকরিও করব। মোহনেরও তেমনি ভাবনা ছিল। কোনোদিন আমি স্কুলে যেতে না পারলে সে আমাকে পড়া বুঝিয়ে দিত। নোটস বলে দিত। পড়াশোনায় ভারি ভালো ছিল সে। ক্লাসে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় কখনও হয়নি। সে না এলে আমিও তাকে একইভাবে সাহায্য করবার চেষ্টা করতাম। স্কুলের স্যারেরা আমাদের বলত, ‘মানিকজোড়’। পাশাপাশি বসা। টিফিন ভাগাভাগি করে খাওয়া। সে এক দিন ছিল বটে। দেখতে দেখতে ক্লাস ওয়ান থেকে এইটে উঠে গেলাম। হঠাৎ এক সময়ে অনুভব করলাম, মোহন দিনদিন কেমন যেন মনমরা হয়ে যাচ্ছে। রোজই জিজ্ঞেস করতাম। কিন্তু উত্তরে সর্বদাই সে বলত, ‘তুই শুনলে কষ্ট পাবি। তুই কষ্ট পেলে যে আমার আরও কষ্ট হবে!’
“একদিন খুব করে ওকে চেপে ধরলাম। বললাম, ‘তোর মনখারাপের কথা তুই যতক্ষণ না বলবি, ততক্ষণ আমি জলস্পর্শ করব না।’
“কথাটা শুনে মোহন আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘এমন বলিস না প্লিজ! তাহলে আমার আরও কষ্ট হবে! আজ না হয় কাল, আমার তোকে কথাটা বলতেই হবে। খবরটা শুনলে তোরও খুব মনখারাপ হয়ে যাবে। তাই যত দেরি করে বলা যায় আর কী!’
“আমি আবারও নাছোড়বান্দা হলে ও বলল, ‘আমার বাবা বদলি হয়ে গেছে। ক্লাস নাইন থেকে আমি আর এই স্কুলে পড়ব না।’
“কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করে উঠল। গলার কাছে একটা দলাপাকানো কষ্ট অনুভব করলাম। চোখ ঝাপসা হয়ে যেতেই মোহনের দিকে পিছন ফিরে চোখের জলকে আড়াল করতে চেষ্টা করলাম। মোহন আমার কাঁধে একটা হাত রাখলে ঝাপসা চোখে ওর দিকে ফিরে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম।
“শেষ অ্যানুয়াল পরীক্ষার দিন পরীক্ষার শেষে আমি আর মোহন স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মোহন ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এল। আমার হাতটা ধরে বলল, ‘চিঠি দিবি তো আমায়?’
“একটা কাগজে ঠিকানা লিখে দিয়ে বললাম, ‘এই নে। আমার ঠিকানা। তুই চিঠি দিস। তোর ঠিকানাটা আমায় জানাস।’
“মোহন ঘাড় নেড়ে ঠিকানাটা আমার হাত থেকে নিয়ে ব্যাগে পুরে ফেলল। আমি বললাম, ‘আজই কি আমাদের শেষ দেখা? জীবনে কি আর কখনও আমাদের দেখা...’
“আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে মোহন বলল, ‘দ্যাখ! যে যেখানেই থাকি, আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর পর আমরা মিট করব। করবই।’
“অবাক হয়ে বললাম, ‘পঁচিশ বছর!’
“ও বলল, ‘হ্যাঁ। পঁচিশ বছর। আজ দশই ডিসেম্বর উনিশশো পঁয়ষট্টি। উনিশশো নব্বই সালের দশই ডিসেম্বর আবার আমাদের দেখা হবে।’
“পঁচিশ বছরের মধ্যে আর কখনও মোহনের সঙ্গে দেখা হবে না ভেবে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলেও মেনে নিলাম। ভাবলাম, তবুও তো জীবনে আরও একবার দেখা হবে দুজনের! এটাও তো নাও হতে পারত। বললাম, ‘কোথায় দেখা হবে?’
“মোহন বলল, ‘সেটা তখনই আমরা ঠিক করব। পঁচিশ বছর পর কে কোথায় থাকি, সেটা তো এখনই বলা যাবে না, তাই না? আমাদের চিঠি চালাচালি তো চলতেই থাকবে। চিঠিতেই আমরা দেখা করার জায়গা, সময়, সব ঠিক করে নেব।’
“আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললাম দুজনে।

“এখন আর দিনের অপেক্ষা নয়! মাসের অপেক্ষা নয়! অপেক্ষা বছরের! পঁচিশ বছরের! স্কুল পাস করলাম। কলেজ পাস করলাম। ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে আমি হলাম এক বাংলা মিডিয়াম স্কুলের অঙ্কের মাস্টার আর মোহন হল নামকরা ডাক্তার। চিঠি বিনিময়ের মধ্যে একে অন্যের খোঁজ রাখতে রাখতে চোখের নিমেষে কেটে গেল পঁচিশটা বছর।
“উনিশশো নব্বই। দশই ডিসেম্বর। সোমবার। কিশোর মোহন এখন যুবক। আমি কি ওকে দেখে চিনতে পারব? সকালে ঘুম থেকে উঠে সে কথাই কেবল মনে ঘুরেফিরে আসছিল। গত তিন বছর ধরে মোহনও কলকাতাতেই থাকে। ওর ঠিকানা আমি জানতাম। কিন্তু যেহেতু ও পঁচিশ বছর পর দেখা করবার কথা বলেছিল, তাই আমিও আর অগ্রিম দেখা করবার প্রস্তাব রাখিনি। পঁচিশ বছর কেটে যাবার অপেক্ষাতেই ছিলাম। দুই বন্ধু মিলে চিঠিতেই ঠিক করলাম, আমাদের বাড়িতেই দুজনের আজ দেখা হবে।
“গত পঁচিশ বছরে জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। বাবা-মা গত হয়েছেন। বিয়ে করিনি। বাড়িতে একাই থাকতাম। মনের যে কথাগুলো চিঠিতে লেখা সম্ভব হয়নি, তার সবটাই সেদিন সামনাসামনি মোহনকে বলব বলে মনের মধ্যে পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছিলাম। মোহন বলেছিল, সকাল-সকাল ও চলে আসবে আমাদের বাড়ি। দুপুরে আমরা একসঙ্গে খাব। তারপর সারাদিন একসঙ্গে কাটাব। তাই সেদিন আর স্কুলে গেলাম না। নিজের হাতে মোহনকে রান্না করে খাওয়াব বলে আগের দিন সব বাজার করে রাখা ছিল। মোহন মাংস খেতে বড়ো ভালবাসত। তাই সকাল-সকাল কচি পাঁঠার ঝোল আর গরম-গরম ভাত রান্না করে ফেললাম। সকাল গড়িয়ে দুপুর হল। মোহন তবু এল না। দুপুর তিনটের পর আর অপেক্ষা না করে খেয়ে নিলাম। শীতটা সে বছর বেশ জব্বর পড়েছিল। ভাত খেলে শীত যেন আরও জোরে কামড় বসাল। ছাদে গেলাম রোদ পোহাতে। ছাদ থেকে বাড়ির সামনের গলিপথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। বিকেল গড়িয়ে গেল। সন্ধে পেরিয়ে রাত হয়ে গেল। মোহন এল না। খুব চিন্তা হল মোহনের জন্য। হাতে হাতে তখনও মোবাইল আসেনি। তাই ফোন করে খবর নেবার উপায়ও নেই! রাত এগারোটার পর রাতের খাবারটা বেড়ে নিয়ে ভাতগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবলাম, তবে কি মোহন ভুলে গেল আজকের দিনটার কথা? কিন্তু তেমন তো হবার নয়। শেষ চিঠিতে ও-ই আমাকে আজকের দিনের সব প্ল্যান-প্রোগ্রাম জানিয়েছিল। তবে কি কোনো ইমারজেন্সিতে আটকে গেল? ডাক্তার মানুষ মোহন। কত মানুষ নির্ভর করে ওর ওপরে! আমার তো কোনো ল্যান্ডফোনও নেই যে আমায় কোনো খবর ও দেবে! মনটা খারাপ হয়ে গেল খুব। ঝাপসা হয়ে আসল চোখ। জোর করে একটু সেদ্ধ ভাত মুখে দেবার চেষ্টা করতেই হঠাৎ ডোরবেল বেজে উঠল। মোহনের আশা তখন আমি প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। ভেবে নিয়েছি, এ জীবনে আর তার সঙ্গে দেখা হবার নয়। তবে এত রাতে কে এল! ডোরবেলটা আরও একবার বেজে উঠলে দরজা খুলে দেখলাম, মাঝারি গড়ন, গায়ের রং তামাটে, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, মাথার সামনের দিকটায় হাকা টাক, চোখে চশমা, কোট-প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে আমারই বয়সি এক ভদ্রলোক। আমি ভুরু কুঁচকে তাকাতেই আগন্তুক বলে উঠল, ‘চিনতে পারছিস?’
“আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে দিল, এ আমার সেই ছেলেবেলার বন্ধু মোহন। কিন্তু চিনতে আমি তাকে একবর্ণও পারলাম না। তেরো-চোদ্দো বছরের মোহনের গলার স্বরে এত গাম্ভীর্য ছিল না। তার ছিল হালকা গোঁফের রেখা, ছিল মাথাভরা চুল, গায়ের রং ধবধবে ফরসা না হলেও তামাটে নয়। শুধু চেহারার কথা ভাবলে একে আমি চিনি না। কিন্তু এত রাতে মোহন ছাড়া আর কেই বা আসবে! আমরা যে আজ দেখা করব, সেকথা তো মোহন আর আমি ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়।
“আগন্তুক আবারও বলে উঠল, ‘কী রে, চিনতে পারছিস না! দ্যাখ, এখনও কিন্তু রাত বারোটা বাজেনি। টেন্‌থ ডিসেম্বর উনিশশো নব্বই। আসব বলেছিলাম। এসেছি। কথা রেখেছি। তুই কিন্তু একই রকম আছিস। তোকে রাস্তায় দেখলেও চিনতে পারতাম। সেই একই রকম রোগা, ফরসা। শুধু লম্বা হয়েছিস আরও কিছুটা।’
“আমি জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম, ‘ভেতরে আয়।’
“আগন্তুক মুচকি হেসে বলল, ‘তোর চোখ বলছে, তুই আমাকে চিনতে পারছিস না। আচ্ছা দাঁড়া!’ বলেই ব্যাগ থেকে এক গোছা চিঠি বের করে আমার হাতের মধ্যে গুঁজে দিল। দেখলাম, গত পঁচিশ বছরে যত চিঠি আমি মোহনকে লিখেছি, তার সবটা একসঙ্গে সে কেমন গুছিয়ে রেখেছে। চিঠিগুলো দেখে চোখ ঝাপসা হয়ে এল। দেখলাম, চশমাটা খুলে মোহন দু-হাত দিয়ে ওর চোখদুটোও রগড়ে নিল। আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, ‘নেক্সট দু-তিন দিনের মধ্যে তোকে কিন্তু ছাড়ছি না।’
“মোহন হেসে বলল, ‘থাকতে পারলে আমারও খুব ভালো লাগত রে! কিন্তু...’
‘কোনো কিন্তু শুনব না।’
‘না রে, রাগ করিস না! আজ শেষ রাতে আমাকে ফিরতেই হবে। উপায় নেই।’
“আমি আর কোনো প্রশ্ন করলাম না। মনে মনে ভাবলাম, মোহন এখন কত বড়ো ডাক্তার! হয়তো ভোরে কোনো অপারেশন আছে। কত কাজের চাপ ওর! ও কী আর আমার মতো ছাপোষা স্কুল মাস্টার! মানুষের প্রয়োজনেই তো মোহনের চাইলেও ছুটি নেই। আমি আর আপত্তি করলাম না। কচি পাঁঠার ঝোল আর ভাত খেয়ে সারারাত দুজনে আড্ডা দিলাম। মোহন হঠাৎ বলে উঠল, ‘রাত শেষ হয়ে আসছে, বন্ধু! আমাকে এবার যেতে হবে!’
“বললাম, ‘তুই তো এখন কলকাতাতেই থাকিস। তবে আমরা তো মাঝে মাঝেই দেখা সাক্ষাৎ করতে পারি। তাহলে আজীবন আমাদের বন্ধুত্বটা বেঁচে থাকে।’
“মোহনের হাসিমুখটা ম্লান হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ও বলল, ‘বন্ধুত্বের মৃত্যু কোথায়! সে যে চিরসত্য। শাশ্বত। দেখা হোক না হোক, চিরকাল মনের মণিকোঠায় সে বন্দি থাকে।’
“আমি আর কিছু বললাম না। শেষ রাতে মোহন আমাকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল।
“বিছানায় শুয়ে মোহনের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন স্কুল। যথাসময়ে সকালের অ্যালার্ম বাজলে ঘুম থেকে উঠলাম। দরজার বাইরে থাকা দুধ আর খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে টেবিলে রেখে এককাপ চা করে আনলাম। রোজকার অভ্যাসমতো চা খেতে খেতে খবরের কাগজে চোখ বোলাতে গিয়ে থমকে গেলাম। বলা ভালো, শিউরে উঠলাম। হাত-পা ঘেমে ঠান্ডা হয়ে গেল। খবরের কাগজে মোহনের ছবি দিয়ে হেডিং - বিশিষ্ট চিকিৎসক ডক্টর লালমোহন গাঙ্গুলি গতকাল সকালে রোড অ্যাক্সিডেন্টে প্রাণ হারিয়েছেন।”

গল্প শেষ করে বুটুদাদু চশমা খুলে চোখদুটো রগড়ে নিল। মোমবাতির আলোয় বুটুদাদুর চোখের জল কারোর চোখে পড়ল না। সবাই স্তব্ধ।
বেশ কিছুক্ষণ পর গোগোল আর ঝিকাই দুজন দুজনের হাত ধরে বলল, “আর কখনও আমরা ঝগড়া করব না। কেমন? আর কথা দিলে কথা রাখব সব সময়!”
হঠাৎ একটা ঠান্ডা হাওয়ায় মোমবাতিটা নিভে গেল। নরম গলায় বুটুদাদু বলল, “মোহন! আছিস নাকি? আজ রাতে একবার আসিস...”
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment