
আশ্চর্য প্রদীপ
সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত
তাকে
বললাম, “তুমি কে?” সে কোনো
জবাব না দিয়ে হাসল৷ ভারি মিষ্টি সে হাসি৷ নিটোল সুন্দর মুখখানিতে সে হাসি মানিয়েছেও৷
বয়েস এগারো-বারো। তার
বেশি নয় কিছুতেই।
হাত-ভরতি কাদা৷ চেয়ে দেখি, ছোট্ট
একখানি প্রদীপ গড়েছে মাটি দিয়ে৷ এখনও মাটি কাঁচা৷ কালকে সকালে হয়তো শুকিয়ে যাবে৷ একটি
মাটির সরায় জল-মাটি মেশানো৷
বললাম, “তুমি কি কেয়ারটেকারের মেয়ে?” সে একগাল
হেসে ‘হ্যাঁ’ জানিয়ে মাথা
নাড়ল৷
আশ্চর্য, এ ক-দিনে দেখেছি
কি? মনে পড়ল না। গরিবের
ঘরে এমন লক্ষ্মীশ্রী রূপ! পাশেই আসানসোলের
কোল বেল্ট৷ তিন রাজ্যের মাফিয়া লুটছে আর নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করছে৷ সেরকম একটা গণহত্যার
রিপোর্ট লিখতেই আসা৷ ফ্রিল্যান্স করলেও এটা জমিয়ে লিখলে ভালো পয়সা পাব৷ ডাকবাংলোর খরচাও
কাগজ টানছে৷ আগেও লিখেছি কাগজটাতে। ওরা
ভরসা রাখছে ইদানীং আমার উপর।
ঘরে
ফিরেও মনটা কেমন হয়ে রইল৷ আশ্চর্য! আজ চারদিন হল এখানে আছি, মেয়েটাকে খেয়ালও
করিনি৷ কী হবে এই স্নিগ্ধ রূপের পরিণতি? গরিবির জ্বালায়
হয়তো মান বাঁচাতে আধবুড়োর সঙ্গে বিয়ে দেবে৷ তাতেও হয়তো শেষরক্ষা হবে না৷ বুড়ো তো দু-দিন বাদে পটল তুলবে। তারপর
পরিবারের অত্যাচারের শিকার হয়ে সারাজীবন বাঁচবে। কারও
কিছু করার নেই এসব অঞ্চলে৷
কেয়ারটেকার
রাতে দুর্দান্ত তন্দুরি চিকেন রেঁধেছিল৷ তাকে আর কিছু বললাম না, কী না কী ভাববে শেষে৷ হিসেব মিটিয়ে দিলাম৷ কাজ শেষ হয়ে গেছে
আমার৷ ভোররাতের এক্সপ্রেস ট্রেন ধরব বলে তাড়াতাড়ি শুয়েও পড়লাম৷
উঁকিঝুঁকি
মেরেও তাকে আর দেখতে পাইনি কোথাও৷ নানা চিন্তার শেষে ঘুম এসে গেল একসময়৷
ভোররাতে
মৃদু ঠকঠক দরজায়৷ লাফ মেরে উঠলাম৷ খুলে দেখি,
কেউ নেই৷ দরজার কাছে মাটিতে রাখা সেই মাটির প্রদীপটি৷
তুলে
নিলাম! উপহার দিতে চায়ই যখন, নিয়ে নেওয়াটা
কর্তব্য।
দিনকয়েক
বড়ো ব্যস্ততায় কাটল৷ লেখাটায় কয়েকজন ওজনদার লোকের উল্লেখ ছিল, যারা আবার সম্পাদকের ‘বন্ধুবর্গের’ মধ্যে পড়ে৷ টানাহ্যাঁচড়া চলল৷ আমার আবার মেজাজ চড়লে পারিপার্শ্বিক, হিতাহিত ইত্যাদি লোপ পায়৷ সহজে অন্যের কথা মানি না৷ শেষমেষ অবশ্য
পেটের দায়ে বিক্রি হয়ে গেলাম৷ কাটছাঁট করে লেখাটা যা দাঁড়াল, তাতে আসল দোষী কাঁচকলা দেখিয়ে বেরিয়ে গেল৷ ক-টা টাকা পেলাম আর বাজারে সাংবাদিক বলে টিকে রইলাম পরের অপ্রিয়
কাজটি করার জন্য৷
মনমরা
হয়ে ক-দিন ঘরে বন্দি হয়ে রইলাম৷ বাবা অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকে৷
ছেলে কী করে, দেখার অবসর নেই৷ আসলে, বহুকাল ধরেই আমরা যে যার মতো থাকি৷ মা চলে যাবার পর থেকে এটা
হয়েছে আজ বছর সাত-আটেক। অলস
চিন্তা আর বইপত্রে ডুবে থাকলাম গোটা একটা সপ্তাহ৷ কারোর সঙ্গে দেখাও করলাম না। এমনকি
ইস্টবেঙ্গলের খেলাও ছেড়ে দিলাম।
কেবল
ফল্ট ছিল এক সন্ধ্যায়৷ হঠাৎ মনে পড়াতে ব্যাগ হাঁটকে প্রদীপটা বার করলাম৷ সাইডের খোপপকেটে
চেন আঁটা ছিল! কী ভাগ্যিস, ভাঙেনি!
আমাদের
আবার চারতলার টপ ফ্লোর৷ ভালো গরম হয়৷ কী মনে হল, তেল
আর সলতে নিয়ে সোজা ছাদে চলে গেলাম৷ গতবারের কালীপুজোর জন্য কেনা প্রদীপের সলতে ছিলই৷
ছাদে গিয়ে এককোণে জ্বালালাম প্রদীপটা৷
ক-মুহূর্ত পরে এই ভরা আশ্বিনের শরতে বাজ পড়ল৷ ঝলসানো বিদ্যুৎ, কড়কড় আওয়াজ৷ বিনা মেঘে৷ চেতনা লুপ্ত হয়ে গেল।
* * *
বাড়ি-বাড়ি গিয়েছে মেয়েটি৷ দরজায় করাঘাত করে বলেছে, “এসো, আজ থেকে আবার
শুরু হবে৷ আমার সঙ্গে চলো৷ আমি নিয়ে যাব৷ আমি নিতেই এসেছি তোমাদের৷”
চেনা
চেনা লাগে মেয়েটিকে৷ মিষ্টি, পানপাতা মুখ৷
শামলা রঙ৷ নাকটি একটু চাপা৷ সদ্য যুবতি৷
“কোথায় দেখেছি, বলো তো রুদ্ররূপ?” আমি শুধোই৷ রুদ্ররূপ মাথা নাড়ে৷ আমি হতাশ হই৷ নালন্দায় ওর মতো
শ্রুতিধর ছিল না একটিও৷ আজ সাত বছর বিদ্যাচর্চার অভাবে রুদ্ররূপের মতো প্রতিভাও স্মৃতির
সঙ্গে লড়ছে৷ আজ সাত বছর নালন্দা ধ্বংসস্তূপে পরিণত৷ বহু ভিক্ষু ওই অগ্নিতে প্রাণ দিয়েছেন৷
কেবলমাত্র আমরা ক-টি প্রাণ নিয়ে পালিয়েছিলাম৷
নয়-নয় করেও গোটা পঁচিশজন আমরা জড়ো হয়েছি এই আশ্চর্য অকাল আহ্বানে৷
আমি, ভিক্ষু সোমদত্ত, আজ বিদ্যাচর্চা ভুলে পারিবারিক পেশা বস্ত্রশিল্প-বাণিজ্যে নিয়োজিত! আমার সহপাঠী
বন্ধুরা অনেকেই মৃত বা দূরদেশে অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত৷ যে ক-জন এই মগধ, রাজগৃহ, নালন্দায় আছি, তারা ভয়ে ভয়ে
মুখটি বুজে থাকি যবন-শাসনে৷ প্রাণের ভয় বড়ো ভয়৷ গৌড়-মগধ শাসন করছেন আলি মর্দান। বখতিয়ার
খিলজি তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন কামরূপ অভিযানে। খিলজি
রাজ্যবিস্তার ছাড়া কোনোকিছুই ভাবতে পারেন না।
ভিক্ষু
সুগত বলল, “আমি সবে মাছধরা জাল গুটিয়ে নদীতীরে উঠব-উঠব করছি, সে সময়েই এই
বোধকন্যা এসে জানাল, আজ থেকে পাঠ আবার চালু।”
অন্যান্যরা
সায় দিল৷ তাদেরকেও খবর দিয়েছে এই কন্যা৷ কিন্তু কেউই চিনতে পারছে না একে৷ সবাই নিজেদের
মধ্যে জল্পনা করছে৷ দু-একজন আবার বলল, এসব যবনদের চাল নয় তো? সবাইকে
জড়ো করে হত্যা করার পরিকল্পনা! যবন সব পারে৷
তারা দূরদেশ থেকে ধ্বংসলীলা চালাতেই এসেছে। নইলে
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানমন্দির ধ্বংস করে কোন মূর্খে? তিন মাস ধরে সে আগুন জ্বলেছিল এত লক্ষ পুঁথি গ্রাস করে। এখনও
ধ্বংসস্তূপ থেকে ইতস্তত ধোঁয়া বেরোয়।
পাঠ
শুরু হবে, ভালো কথা। কিন্তু, কে চালু করবে?
* * *
অস্তি
নদীতীরে আমরা সবাই এখন সমাগত৷ সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে ভালোভাবেই৷ মেয়েটি জানাল, মশাল নিরাপদ নয়৷ এতগুলো মশাল একসঙ্গে জ্বলা
মানেই প্রহরীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা৷ প্রদীপ হাতে করে নদী পেরোতে হবে৷
বর্ষা
শুরু হলেও তেমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি৷ অস্তি নদী এখন কোমর-জল৷ বোধকন্যা নিজেই পঁচিশটি প্রদীপ বের করে হাতে হাতে দিল৷ ক-মুহূর্ত পরে পঁচিশটি দীপ আলোর মালার মতো এগিয়ে চলল গাঢ় অন্ধকারের
মধ্য দিয়ে নদীর বুকের উপর৷ ওপারে সামান্য বনাঞ্চল৷ তার উত্তর প্রান্তেই অপেক্ষা করে
রয়েছেন আচার্যদেব৷ কতদিন পরে দেখা হবে ভেবে আনন্দে আমার বুক ধুকপুক করছিল৷ উনি বেঁচে
আছেন কিনা, তাই নিয়েই সন্দেহ ছিল।
উত্তরপ্রান্তে
পৌঁছে দেখলাম, কেউ নেই কোথাও৷ বোধকন্যাও কোথায় অদৃশ্য৷
আচমকা
ভয় ঘিরে ধরল আমাদের৷ যবনরাজ নালন্দার মূল কক্ষ, যেখানে
মঞ্জুশ্রী ও বোধিসত্ত্বের মূর্তি ছিল, তা ভয়বশত ধ্বংস
করেনি, একটি সৈনিকের অকস্মাৎ মৃত্যুর পর৷ কিন্তু
খবর এসেছে, যবনরাজ বখত নিজের সেনাপতির দ্বারা নিহত
হয়েছেন ক-দিন আগে৷ নতুন শাসক কে, তা এখনও
আমরা জানি না৷ আন্দাজ—আলি মর্দান। এখন
সে শাসক যদি মহাবিদ্যালয়ের বাকি অংশ ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেয়, আর সেইসঙ্গে শ্রমণদেরও একেবারে নিশ্চিহ্ন করবে বলে ঠিক করে? তখন? কিছুই তো বিশ্বাস নেই এই বিদেশিদের৷ একেই তারা ক্ষুব্ধ, ধনরত্ন মহাবিদ্যালয়ে বিশেষ না পাওয়ার জন্য৷ জ্ঞান যে শ্রেষ্ঠ
ধন, তা হানাদারদের কে বোঝাবে!
“কন্যা গেল কই, সুদত্ত?” কে যেন ফিশফিশ করে শুধোল আমায়৷
“পালাও সবাই, মরব এখানে বেশিক্ষণ
থাকলে!” ভয়ে কাঁপা গলায় বলে ওঠে ভিক্ষু অনমিত্র৷
ভিক্ষু সৌভদ্র, কৃতবিদ্য তালে তাল দেয়৷ দোষ নেই কারোরই৷
যে ধ্বংসলীলা আমরা দেখেছি গত দশ বছরে, তাতে এতদিনের
বিদ্যা, বিশ্বাস ও ভক্তির ভিত নড়ে গেছে৷ গুটিকয়
শ্রমণ আমরা লুকিয়ে দিন কাটাই কোনোমতে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে৷
অন্ধকারে
নিজেকে লুকোনোর জন্য আমরা অধিকাংশ প্রদীপই নিভিয়ে দিয়েছিলাম৷ গুটিকয়মাত্র জ্বলছিল৷
হঠাৎই সে আলোয় দূরে একটি ছায়ামূর্তি নজর এল৷ ধীরগতিতে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আসছে৷ আতঙ্কে
দমবন্ধ হয়ে এল আমাদের৷ একের পিছনে এক হাজার যে নেই, কে বলবে? একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে আমরা কাঁপছি যখন, তখনই ভিক্ষু অনমিত্র চিৎকার করে উঠল৷
“আচার্যদেব! মহাধ্যক্ষ...”
ধীর, শ্লথগতিতে খানিকটা দূরে এসে দাঁড়িয়েছেন আচার্য ভিক্ষু রাহুলভদ্র৷
একটি গাছে ভর দিয়ে হাঁফাচ্ছেন৷ আমরা ছুটে এলাম৷ তিনি আতঙ্কিত হয়ে প্রথমে পিছিয়ে গেছিলেন৷
তারপর বললেন, “সুদত্ত, অনমিত্র... তোমরা?”
কেউ
এগিয়ে এসে বলল, “আপনিই তো আসতে বলেছেন৷ আজ থেকে নাকি পাঠ
শুরু আবার নালন্দায়? ক-দিন
শুধু জঙ্গলে হবে৷ তারপর বুদ্ধের কৃপায় পুনরুদ্ধার হবে নালন্দার৷ সেনরাজা খবর পাঠিয়েছেন
যশোহর থেকে নাকি!”
“আমি বলেছি?” আচার্য আকাশ
থেকে পড়লেন৷ “আমি তো সন্ধ্যায় গোপনে এসেছি অশ্বগন্ধার মূল খুঁজতে৷
যে-পরিবারটিতে আমি আশ্রয় নিয়েছি, আজ ক-বছর তাদের একটি
যুবকের স্নায়বিক দৌর্বল্য দেখা দিয়েছে! তাই... আর তাছাড়া, আমি একা কী করব? অধিকাংশ শিক্ষকই তিব্বত রাজের আমন্ত্রণে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন৷
ভিক্ষু জয়দত্ত না থাকলে বিনয়পিটকের সূত্র কে পড়াবেন? ব্যাকরণ
কে পড়াবেন বিভূতিচন্দ্র ছাড়া? ন্যায়শাস্ত্র
ভিক্ষু দানশীল ছাড়া রস পাবে তোমরা? ভিক্ষু মহাবোধি, ভিক্ষু সুগতশ্রী, ভিক্ষু জীবগুপ্ত
সবাই তো প্রাণ বাঁচাতে তিব্বত রাজের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন৷ একা আমি...”
“কিন্তু সেই বোধকন্যা? তাকে
আপনি খবর দিয়ে পাঠাননি?” এবারে আমি প্রশ্ন
করলাম৷ সবাই অবাক, বিমূঢ়৷ পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি৷
অশীতিপর
বৃদ্ধ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলেন৷ কয়েক মুহূর্ত পরে বললেন, “কেমন
দেখতে, বলো তো? পানপাতার মতো মুখ... চাপা নাক... রং অনুজ্জ্বল...”
আমরা
চেঁচিয়ে উঠলাম৷
“হিন্দুদের আছে সাতটি চক্র৷ আর তথাগত বলেছেন সাতটি মন্দিরের কথা৷
যার মধ্যে দিয়ে মানুষের মননকে যেতে হবে৷ তবে হবে বোধিপ্রাপ্তি... তবে মুক্তি এই জন্মচক্র থেকে...”
আমরা
জঙ্গলের মধ্যেই একটি মোটামুটি ফাঁকা দেখে জায়গা হাত দিয়ে পরিষ্কার করে বসেছি সবাই৷
ভিক্ষু আচার্যদেব রাহুলভদ্র পাঠ শুরু করেছেন৷
“প্রজ্ঞা অর্থ জ্ঞান৷ পারমিতা অর্থ যা সব কিছুর উপরে৷ সর্বোচ্চ৷
যা সময়াতীত, কালাতীত৷ প্রজ্ঞাপারমিতা অর্থ সেই জ্ঞান, যা আসছে সর্বোচ্চ স্তর থেকে৷ প্রজ্ঞাপারমিতার পাঠটি অসম্পূর্ণ
ছিল যবন আক্রমণের জন্য৷ মনে পড়ে তোমাদের?
“কিন্তু পাঠ শুরু হবার আগে আমরা সমবেতভাবে একবার তাঁকে স্মরণ
করব৷ সেই মহীয়সী রমণীকে, যিনি রাজ্যসুখ
উপেক্ষা করে তপোব্রতচারিণী হয়েছিলেন বহু-বহু শতাব্দী
আগে৷ যিনি অনুরাধাপুরে (শ্রীলঙ্কা) বোধিবৃক্ষ নিয়ে গেছিলেন দুরূহ সমুদ্রযাত্রা করে৷ যিনি সম্রাট
ধর্মাশোকের অন্তিম সময়ে আবার ফিরে এসে কথা দিয়েছিলেন, যখন
যখন ধর্মচক্র বিনাশের মুখে আসবে, তখনই তিনি আবির্ভূত
হবেন৷ তাঁর হাতে থাকবে একটি বোধিবৃক্ষের চারা৷ আদিবৃক্ষটির মূল থেকে নেওয়া৷”
আমি
এগিয়ে এসে বোধিবৃক্ষটির চারা এনে রাখলাম আচার্যের সম্মুখে৷ নদী পেরোনোর সময়ে বোধকন্যা
আমার হাতে দিয়ে বলেছিল, “ভিক্ষু সুদত্ত, একটু ধরবেন৷ এই দীপ আর এই পুঁটুলিটি একসঙ্গে বওয়া অসম্ভব৷ দুটিমাত্র
হাত দিয়েছেন তথাগত৷” অন্ধকারে তখন বুঝিনি, কী জিনিস হাতে নিয়েছি৷ ওপারে পৌঁছে আর কন্যাকে দেখা যায়নি, আগেই বলেছি।
“অশোককন্যা সংঘমিত্রা, সংঘজননী
সংঘমিত্রাকে স্মরণ করে পুনরায় আমরা আরম্ভ করছি নবপর্যায়ের নালন্দা৷ এই চারা একদিন যেমন
মহিরুহ হবে, তেমনি এই মহাজ্ঞান মন্দিরের বিদ্যা দিকে
দিকে ছড়িয়ে পড়বে৷ দেশ থেকে দেশান্তরে... কাল থেকে কালান্তরে...”
পঁচিশটি
দীপ আবার জ্বলে উঠেছে অরণ্যে৷ তমসাচ্ছন্ন প্রান্তরে পঁচিশটি উজ্জ্বল বিন্দু আবার ঘোষণা
করছে জ্ঞানের জয়, মানবতার জয়, সহস্র
যুগের মানবমনের হিঃস্র অন্ধকারের বিরুদ্ধে৷ বিন্দু বিন্দু আলো ছড়িয়ে পড়ছে জ্যোতির্বলয়
হয়ে মহারণ্যে...
* * *
অঝোরে
বৃষ্টি পড়ছে৷ টর্চ হাতে পাগলের মতো আমি বাগানের এখানে-ওখানে
খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম৷ কেয়ারটেকার আর তার বউ ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে আমায় দেখছিল৷
পাগলই ভাবছিল হয়তো৷ হঠাৎ এসেছি রাতের ট্রেনে। কোনো
কথা না জানিয়ে।
“এইখানে কোথাও আছে৷ অশ্বত্থের চারা৷ নিশ্চয়ই আছে৷ উনি এলেই
নিয়ে আসেন৷ আদি বৃক্ষের চারা৷”
“বাবু, পিপল কি পেড় হ্যায় এক,
বাহার মে... পর উয়ো তো কায়ি বর্ষোসে... ইতনা বড়া...”
“না না... রাহুলভদ্র
বলেছেন আমায়৷ সংঘ যখন বিপদগ্রস্ত হয়, তখন শুধু
নয়, কোনো কৃতবিদ্য প্রাচীন শ্রমণ পথভ্রষ্ট বা দিক্ভ্রষ্ট
হলেও তিনি আসেন... একটি প্রদীপ আর একটি চারা নিয়ে... আমি বলছি... এখানেই
কোথাও... তিনি রেখে গেছেন আমার জন্য... প্রদীপ পেয়েছি... কিন্তু চারা...”
অঝোরধারায়
কাঁদছিলেন ভিক্ষু সুদত্ত! সেই সেদিনের মতো। আটশো
বছর আগে যেমন পাঠ নিতে নিতে ওঁরা সবাই কাঁদছিলেন।
“লেখা ছাপাবে না তো কী হয়েছে! আমি
বই লিখব। সবাই জানবে। নিজে
ছাপাব। কারোর সাহায্যের দরকার নেই আমার। আমার
উনি আছেন... উনি...”
ওরা
দুজন অবাক হয়ে দেখছিল৷
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment