গল্প:: নাককাটি রানি ও ল্যাপিস লাজুলির অন্তর্ধান রহস্য - পূবালী চট্টোপাধ্যায়


নাককাটি রানি ও ল্যাপিস লাজুলির অন্তর্ধান রহস্য
পূবালী চট্টোপাধ্যায়

এক

আজ বিকেল থেকেই বাবাইদাদা আর মিঠাইদিদির সে কী ঝগড়া! আমরা ছোটোরা ওদের থামাতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে হিমসিম। ওরা দুজন এই বছর কলেজে গেছে, তাই ওদের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। আমরা ছোটো বলে পাত্তাই দিচ্ছে না, আর আমাদের কথা শুনে ঝগড়াও থামাচ্ছে না।
বাবাইদাদা মিঠাইদিদিকে বলল, “শোন মিঠাই, যতই তর্ক করিস না কেন, তোরা খুব ভালো জানিস আমাদের সঙ্গে তোরা গায়ের জোরে পারবি না।”
অমনি মিঠাইদি বলে উঠল, “গায়ের জোরটাই সব কিনা! দিন-দিন তোর বুদ্ধিটাই কেমন মোটা হয়ে যাচ্ছে, বুঝলি বাবাই!”
পাশ থেকে শিবাইদাদা ফোড়ন কাটল, “সে যাই বলিস মিঠাই, নারী পুরুষ কোনোদিনই সমান নয়, আর সমান হতেও পারবে না। আজকাল তোরা খুব ফেমিনিস্ট হয়েছিস কিনা, তাই এত বড়ো বড়ো কথা, কিন্তু কাজের বেলায় সেই তো আমাদের হেল্প লাগবে সব বিষয়ে। ট্রেনে বাসে সব জায়গায় তোদের স্পেশাল ট্রিটমেন্ট, আবার বলবি আমরা সমান সমান! কী অদ্ভুত দাবি তোদের!”
মিঠাই দিদিকে সাপোর্ট করে মুনাইদিদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, অমনি নীচ থেকে ছোটোকাকির গলা ভেসে এল, “না না, তুমি এখন যাও দেখি। আমাদের ওসব কিছু লাগবে না। বলছি তো, অত দামি জিনিস নিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই।”
আমরা সবাই ব্যাপারটা কী দেখার জন্য নীচে নেমে গেলাম। ওখানে দেখি একটা মাঝবয়েসি লোক, মাথায় বড়ো বড়ো বাবরি চুল, পরনে অত্যন্ত নোংরা একটা আলখাল্লা আর ততোধিক নোংরা দাঁতের পাটি বের করে হেসে হেসে ভাঙা ভাঙা বাংলাতে বলছেন, “মাতাজি, হামাকে ছোটোবাবু আসতে বলেছিল। আপনি ইকবার দেখুন জিনিসটা, ভালো না লাগলে লিবেন না। একবার দেখে তো লিন।”
বাবাইদাদা বলল, “কী আছে তোমার ব্যাগে দেখাও দেখি।”
লোকটা ব্যাগ থেকে একটা পাথরের মূর্তি বের করল। মূর্তিটা একটা হাতের সাইজের। শ্বেতপাথরের নারীমূর্তি। অপূর্ব সব কারুকাজ করা। মূর্তিটার বিশেষ অ্যাট্রাকশন হল ওর গায়ের নীল রঙের গয়নাগুলো। তার উপর সোনালি রঙের চাকচিক্য। আর পরনে আছে সুন্দর কাজ করা নানা দামী স্টোন বসানো এক রাজকীয় পোশাক।
আমরা সবাই মূর্তিটির দিকে অপলকে তাকিয়ে আছি।
বাবাইদাদা ওর হাত থেকে নিজের হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বলল, “এ তো ল্যাপিস লাজুলি! তার উপর সোনার কাজ। এ তুমি কোথায় পেলে?”
লোকটি আধা বাংলাতে যা বলল তা হল এই যে, ওর কাছে পূর্বপুরুষের সময় থেকে এই সুন্দর মূর্তিটি আছে। এখন পেটের দায়ে এই জিনিস বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ছোটোকাকা ওকে বলেছে এটা নাকি ওর থেকে কিনে নেবে।
বাবাইদাদা বলল, “কিন্তু এর দাম তো অনেক হবে।”
“না দাদাবাবু, আমি খুব কম দামে ইটা দিয়ে দেব।”
আমাদের ছোটোকাকা ইতিহাসের প্রফেসর। পুরোনো নানা জিনিসের সংগ্রহ তার কাছে। কাকিমাও সে সব জানে, কিন্তু আজ কোনো এক অজ্ঞাত কারণবশত এই মূর্তিটি দেখেই কাকিমা বড্ড রেগে গেল।
আমাদের কথার মাঝে বাজারের ব্যাগ হাতে ছোটোকাকা সাইকেল নিয়ে বাড়ি ঢুকল।
“আরে বাহাদুর সিং যে! তুমি কতক্ষণ?”
“এই তো ছোটোবাবু কিছুক্ষণ। মাতাজিকে বলছি লিতে তো…”
ছোটোকাকি কটমট করে একবার কাকার দিকে তাকাল, তারপর বাহাদুরের দিকে ফিরে বলল, “কত দাম ওটার শুনি?”
“বেশি লয় মাতাজি…”
বাহাদুরকে আর কথা শেষ করতে দিল না ছোটোকাকা। বাজারের ব্যাগটা কাকিমার হাতে কোনোরকমে ধরিয়ে দিয়ে বাহাদুরকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল।
মূর্তিটা শেষ পর্যন্ত নেওয়া হবে কিনা এই নিয়ে আমরা ভাই-বোনরা খানিক ধন্দে থাকলাম।

দুই

রাত প্রায় দুটো হবে। হঠাৎ আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। আজ কালীপুজোর রাত। বাইরে ঘোর অমাবস্যা। মা, কাকিমা আর জেঠিমা বাড়ি নেই, পুজো দিতে গেছে পাশের মন্দিরে। বাড়ির আর সবাই ওখানেই আছে। কেবল আমি আর আমার কাকার মেয়ে তুতাইদিদি বাড়িতে আছি বাড়ির বিশ্বস্ত পাহারাদার তিনকড়িকাকার সঙ্গে। আমাদের পায়ের কাছের জানালাটা খোলা। একটা শীতল বাতাস জানলা দিয়ে ঘরে আসছে। ঘুমটা কেন ভাঙল তা বুঝে উঠতে পারলাম না। পাশ ফিরে আবার ঘুমোনোর চেষ্টা করতেই হালকা একটা পাখির ডাকের শব্দ পেলাম। আর তারপরেই পাশের ঘর থেকে কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দ। আমি ছুটে ওই ঘরে দেখতে গেলাম, অমনি একটা ছায়ামূর্তি আমাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে খুব জোরে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
আমি তুতাইদিদিকে চেঁচিয়ে ডাকলাম, ও বেচারা ঘুম চোখে আমাকে দেখে অবাক।
“কী করে পড়ে গেলি তুই সোনাই!”
“আরে আগে তোল আমায়, তারপর সব বলছি।”
ও আমাকে তুলতেই আমরা দুজনে ছুটে কাকার সংগ্রহশালাতে ঢুকলাম। চোর ব্যাটা তালা ভেঙে ঢুকেছে। ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দেখি সেই মূর্তিটি যেখানে ছিল সেই কাচের তালাবন্ধ বাক্সটা ফাঁকা। খুব কৌশলে কেবলমাত্র সামনের দিকের কাচটা কেটে কেউ ওটা বের করে নিয়েছে।
তুতাইদিদি আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, “এবার কী হবে বল তো? আর তিনকড়িকাকাকেও তো দেখছি না। কোথায় গেল বল দেখি?”
আমরা দুজনে নীচে নেমে এলাম। গেটের সামনে যেতেই দেখতে পেলাম তিনকড়িকাকা মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। ওর মুখে চোখে জল দিয়ে ওকে ডেকে তুললাম। কাকা বলল, একটা লোক ওর কাছে আগুন চাইল, ও দেশলাই দেবার পর আর কিছু মনে নেই।
তুতাইদিদি আমার বাবাইদাদাকে ফোন করল, “দাদা, একবার শিগগির বাড়ি এসো, একটা কাণ্ড হয়েছে।”
আমাদের চার দাদা-দিদি বাড়িতে এলে আমরা তিনকড়িকাকাকে নিয়ে ছোটোকাকার সংগ্রহশালাতে গেলাম। সেখানে গিয়ে ওদের সকলকে দেখালাম মূর্তিটা নিজের জায়গায় নেই।
বাবাইদাদা বলল, “এটা ছোটোমামার একটা বিরাট লস হয়ে গেল। এই মূর্তিটি একটা অমূল্য জিনিস।”
এই বছরই বাবাইদাদা ইতিহাসে অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে ভরতি হয়েছে, তাই পুরোনো জিনিস নিয়ে পড়াশোনাও শুরু করেছে। যদিও ছোটো থেকেই এসব নিয়ে ওর খুব ইন্টারেস্ট।
আমি বললাম, “বাবাইদাদা, সেদিন তুমি ল্যাপিস লাজুলি না কী একটা যেন বলেছিলে মূর্তিটা দেখে, ওটার মানে কী বলবে?”
বাবাইদাদা বলল, “তোরা কি লক্ষ করেছিলি ওই মূর্তিটার গায়ে অদ্ভুত সব নীল গয়নার কারুকাজ?”
শিবাইদাদা বলল, “হ্যাঁ, আমি জিনিসটা কাকার কাছ থেকে নিয়ে দেখেছি একদিন, কিন্তু এই স্টোন এখানে কীভাবে এই মূর্তিতে এল? এই মূর্তিটি মনে হয় মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় তৈরি।”
মিঠাইদিদি বলল, “এখন এইসব নিয়ে গবেষণা না করে ভাব কীভাবে চোরকে ধরা যায়। এখন চোর ধরাটা বেশি ইমপরট্যান্ট। ও নিশ্চয় পরিচিত কেউ হবে, না হলে এই বিষয়ে এত তাড়াতাড়ি জানবে কীভাবে?”
আমাদের আলোচনার মাঝেই ছোটোকাকা ঘরে ঢুকল। কাকাকে দেখেই তিনকড়িকাকা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“ছোটোবাবু, আমাকে কীভাবে যে ঘুম পাড়িয়ে দিল বুঝতে পারলাম না।”
“থাম তিনকড়ি, কাঁদিস না। তোর কোনো দোষ নেই জানি। কী হয়েছিল রে বল তো এবার।” ছোটকা জানতে চাইল।
আমি অমনি পুরোটা খুলে ছোটকাকে বললাম। আমার মুখে পুরো ঘটনা শুনে ছোটকা চুপ করে থাকল খানিকক্ষণ। তারপর ভাঙা কাচের বাক্সটার সামনে গিয়ে নাক নীচু করে গন্ধ শুঁকল। তারপর আমাদের শুতে যেতে বলল।
আমরা ঘুমোতে তো গেলাম, কিন্তু সে রাত্রে আর কারোর চোখে ঘুম এল না।

তিন

পরের দিন আমরা ছয় ভাইবোন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বাড়িটা একবার রেকি করতে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই আমরা ছাদে গেলাম। কালীপুজোর পরের দিন, তাই হিম পড়েছে। ছাদে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল না। কেবল ছাদের কার্নিশে একটা আধখাওয়া সিগারেট দেখতে পেলাম। আমি শিবাইদাদাকে ওটা দেখাতেই ও কার্নিশে নেমে একটা রুমাল জড়িয়ে তুলে আনল।
এবার নীচে এসে আমরা বাড়ি আর বাগানটা ভালো করে খুঁজে দেখতে থাকলাম কিছু পাওয়া যায় কিনা। হঠাৎ মিঠাইদিদি বলল, “বাবাই, এদিকে আয়, দেখ একটা কী চকচক করছে।” আমরা সবাই ওই দিকেই গেলাম, দেখলাম ছোট্ট একটা রাজস্থানী উটের শো-পিস। এটার আর একটা জোড়া ছিল।
বাবাইদাদা বলল, “তার মানে কাকার এই দামি জিনিসটার জোড়ের একটাকে কাল নিয়ে গেছে। আর কী কী চুরি গেছে কে জানে!”
আমরা মনখারাপ করে কাকার কাছে গেলাম। কাকা নিজের সংগ্রহশালাতেই ছিলেন। হাতে চায়ের কাপ আর টেবিলের উপর রাখা সেই মূর্তিটি।
কাকা আমাদের বসতে বলল, তারপর মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই মূর্তিটা কার বল তো?”
আমরা এর ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।
তুতাইদিদি বলল, “বাবা, এ তো একটা খুব অভিজাত বংশের কোনো নারীমূর্তি মনে হয়। তবে এটা কীভাবে এখানে এল?”
মুনাইদিদি বলল, “মামু, কাল তো এটা চুরি হয়ে গেছিল। তুমি এটা পেলে কীভাবে?”
“সে কথা পরে বলছি তোদের।”
বাবাইদাদা বলল, “ছোটকা, তোমার শখের উটের জোড়ের মধ্যে একটা কিন্তু চুরি গেছে।”
কাকা বলল, “জানি। তবে ওটা নিয়ে এখন ভেবে লাভ নেই। যেটা বলতে তোদের ডেকেছি সেটা শোন। এই মূর্তিটা তোরা ভালো করে দেখ সবাই।”
আমরা হাতে নিয়ে মূর্তিটা দেখতে থাকলাম। আমার কাছে যখন মূর্তিটা এল, দেখলাম মূর্তিটার একদম নীচে নীল রং দিয়ে খুব ছোটো করে লেখা আছে রানি কর্ণাবতী।
আমি কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কে এই রানি কর্ণাবতী?”
কাকা বাবাইদাদার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “বল তো বাবাই, কে এই রানি কর্ণাবতী?”
মিঠাইদিদি বলল, “গাড়ওয়ালের রানি উনি, যা এখন উত্তরাখণ্ডে অবস্থিত। রাজা মহিপতের স্ত্রী ছিলেন।”
কাকা বলল, “ইতিহাসের পাতায় তিনি নাককাটি রানি নামে পরিচিত সেটা জানিস কি? আমরা ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের কথা মনে রেখেছি, কিন্তু গাড়ওয়ালের এই যোদ্ধা সাহসী রানির কথা বিস্মৃত হয়েছি।”
“এরকম অদ্ভুত নাম কেন ছোটকা?” আমি জানতে চাইলাম।
“বলছি সেই কথাই – সময়টা সেভেনটিন্থ সেঞ্চুরি, রানি কর্ণাবতী তাঁর স্বামী মহিপত শাহের মোঘলের হাতে মৃত্যুর পর তাঁর সন্তান পৃথ্বীপতির অভিভাবক হিসেবে সিংহাসনে বসেন। তখন তাঁর সন্তানের বয়স সবেমাত্র সাত বছর। স্বাভাবিকভাবেই চারপাশের শত্রুরা ভাবল, এই সময় গাড়ওয়ালের উপর আধিপত্য বিস্তার করা খুব সহজ। তাই কুমায়ুন প্রভৃতি সমস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ওই সময় রানির উপর ক্রমগত বিপদ আসতে থাকে। রানি অতি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সেসব প্রতিহত করেন।
“১৬৪০-এ শাহজাহানের জেনারেল নবজাত খানের নেতৃত্বে ৩০,০০০ সৈন্য গাড়ওয়াল আক্রমণ করলে রানি সরাসরি সমতলে নেমে যুদ্ধ না করে পাহাড়ি উপত্যকায় এক ফাঁদ রচনা করেন। মুঘলবাহিনী রানির সেই সুচতুর ফাঁদে পা দেয় এবং বন্দি হয়। দীর্ঘ যুদ্ধে তাদের রসদ ফুরিয়ে গেলে মুঘল সেনারা রানির কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর বুদ্ধিমতী রানি তখনই শর্ত দেন, বেঁচে ফিরতে হলে মুঘল সেনাদের নিজেদের নাক কেটে রেখে যেতে হবে। মুঘল সেনাদের এই চরম অপমানের কারণেই তিনি ইতিহাসে নাককাটি রানি নামে পরিচিত।”
আমরা সকলে কাকার কাছে এই গল্প শুনতে শুনতে হারিয়ে গিয়েছিলাম ইতিহাসের সেই সময়ে।
ছোটকা খানিক থামল, তারপর বলতে শুরু করল, “আর এই যে মূর্তিটা দেখছিস, এর বিশেষত্ব হল এটা রানি যে ধরনের গহনা বা পোশাক পরতেন সেই সব মূল্যবান অলঙ্কার আর পোশাক দিয়ে বানানো। আর এই নীল পাথরের নাম ল্যাপিস লাজুলি।
“আসলে এটা এত প্রাচীন এবং রানির আর কোনও ম্যুরাল, কোনো কিছুই সংগ্রহে নেই বলে এর বর্তমান ঐতিহাসিক মূল্য বেশ খানিক। আমার পেছনে ক’দিন থেকেই কিছু লোক লেগেছে এটা কিনে নেবার জন্য। কিন্তু এই জিনিস আমি কাউকে দেব না।”
হঠাৎ তিনকড়িকাকা এসে খবর দিল, কাকার সঙ্গে কোন এক সাহেব আর এক মোটাসোটা হিন্দিভাষী লোক দেখা করতে চাইছে।
কাকা আমাদের বলল, “তোদের এই মূর্তি সম্বন্ধে আরও কিছু বলার আছে। আজ সন্ধেবেলা তোরা আসিস আমার কাছে।”
এই বলে ছোটকা নীচে নেমে গেল। আমরা সবাই ব্রেকফাস্টের জন্য মা-জেঠিমার কাছে গেলাম। ব্রেকফাস্ট শেষ করে নীচে গিয়ে দেখলাম কাকা তখনও ওই লোকগুলোর সঙ্গে কথা বলছে। ওরা দুজনেই খুব উত্তেজিত। কাকা কিন্তু শান্ত।
মোটা লোকটা যাবার আগে বলে গেল, “অগর সিধে উঙ্গলি সে ঘি নেহি নিকলতে তো উসকো হাম টেরা ভি করনা জানতে হ্যায় প্রফেসর সাহাব। অব সোচকে রখিয়ে, হাম কাল সুবা ফির সে আয়েঙ্গে।”
কাকা এবার খুব শান্ত গলায় বললেন, “ও জিনিস আমার কাছে নেই। আর থাকলেও আমি আপনাকে দিতাম না। আগেও বলেছি, এখনও ওই একই কথাই বলছি।”
এই সব কথা আমরা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনলাম। ওপরে এসে মিঠাইদিদি বলল, “আজ একটা বড়োসড়ো বিপদ হবে, বুঝলি। এখনই কিছু কাজ আমাদের করে ফেলতে হবে।”

চার

আমরা মিঠাইদিদির মুখে সব প্ল্যান শুনে বেরিয়ে পড়লাম। মিঠাইদিদি আর আমি গেলাম বাজারের দিকে বেশ কিছু জিনিস নিতে। মিঠাইদিদি বাবাইদাদা আর শিবাইদাদাকে পাঠাল ওই লোকদুটোর পিছু নিতে। সোনাইদিদি আর মুনাইদিদি বাড়িতে পাহারাতে থাকল।
আমরা এক ঘণ্টা পরে সবাই কাকার সংগ্রহশালাতে জড়ো হলাম।
মিঠাইদিদি বলল, “আজ রাতে সত্যি কিন্তু ছোটোমামার বড্ড বিপদ। ওই মূর্তি আজ চুরি যাবেই। মামা ওটাকে আর একা একা রক্ষা করতে পারবে না।”
শিবাইদাদা বলল, “ওরা একটা হোটেলে আছে, গোলচকের দিকে। ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলতে শুনলাম, বলছে আজ রাতেই ওটা আমাদের কব্জাতে চলে আসবে।”
মুনাইদিদি আমাদের সামনে আগের দিনের মতোই আর একটা আধখাওয়া সিগারেট রাখল।
তুতাইদিদি বলল, “এই চোরগুলোই রাজস্থানী উটটা চুরি করেছে। এদের ধরতে পারলেই কেল্লা ফতে।”
আমি বললাম, “আজ আসছে ওই রানির মূর্তিটা চুরি করে নেবে বলে।”
হঠাৎ দেখি সন্ধের দিকে বাড়িতে ছোটোকাকার এক বন্ধু এসে হাজির। কাকা নাকি ওকে ফোনে এই মূর্তির কথা বলেছে। সেই শুনেই দেখতে এসেছে এই অপূর্ব সুন্দর প্রাচীন মূর্তিটি।
এই মূর্তিটি আসার পর থেকে যা যা চলছে তা নিয়ে মা কাকিমা খুব বিরক্ত।
কাকা যখন সংগ্রহশালায় তার বন্ধুকে মূর্তিটি দেখাচ্ছেন তখন মিঠাইদিদি ওখানেই ছিল। ভদ্রলোকটি মিঠাইদিদিকে বলেছেন, “এই রানির মতো সাহসী আর বুদ্ধিমতী হতে হবে তোমাদের। তবেই প্রকৃত উওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট হবে।”
আমি ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিলাম। ওই ঘর থেকে মিঠাইদিদি আমাদের কাছে এসে এইসব কথা বলতে বলতে একটু হাসল। তারপর আমার পিঠে হাত দিয়ে বলল, “বুঝলি সোনাই, আজ বোধহয় চোরের শেষ রাত।”
রাত্রি তখন তিনটে, আমরা প্রত্যেকে মুখে মাস্ক পড়ে আছি যা মিঠাইদিদির কথামতো বাজারের ওষুধের দোকান থেকে নিয়ে এসেছিলাম। বাবাইদাদা নীচের গেটের পেছনে পাঁচিলের আড়ালে তিনকড়িকাকার সঙ্গে লুকিয়ে আছে হাতে একটা ব্যাট আর দড়ি নিয়ে। শিবাইদাদা আর মুনাইদিদি আছে ঘাপটি মেরে ছাদে। ওদের কাছে আছে দড়ি আর মশারি। আমি আর তুতাইদিদি সিঁড়ির কাছে আছি দু-বালতি সাবানজল নিয়ে।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমরা দেখলাম একটা ছায়ামূর্তি কাকার সংগ্রহশালার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর তালাটা খুলল চাবি দিয়ে খুব আস্তে করে। কিছুক্ষণ পরে একটা বাক্স হাতে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছে, আমরা ওপর থেকে দু-বালতি সাবানজল ঢেলে দিলাম। অমনি ছায়ামূর্তি তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ল।
মিঠাইদিদি সিঁড়ির নীচেই ছিল। লোকটার হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে তখন বাইরের দিকে ছুটেছে। লোকটাও মিঠাইদিদির পিছু নিয়েছে। আমরাও ততক্ষণে নীচে নেমে এসেছি। বাইরে বেরিয়ে দেখি চোরপুলিশের দৌড় চলছে। একসময় দুজন লোককে বাবাইদাদা আর তিনকড়িকাকা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল।
ওদিকে ছাদ থেকেও ওরা একজনকে মশারির মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে এসে বাড়ির হাতার সামনে দাঁড় করাল।
আমি আর তুতাইদিদি কাকাকে ডাকতে গিয়ে দেখি কাকা কিছুতেই সাড়া দিচ্ছে না। তাই উপায় না দেখে কাকার মুখেচোখে জল দিলাম।
তুতাইদিদি বলল, “বাবা, শিগগির চলো, চোর ধরা পড়েছে।”
ছোটকা বলল, “বলিস কী রে?”
“আরে তুমি চলোই না,” এই বলে কাকার হাত ধরে আমি নিয়ে চললাম।
সবাই তখন বসার ঘরে। বাড়ির বাকি বড়োরা তখনও এত কিছুর পরেও কেন ঘুমোচ্ছে বুঝে উঠতে পারলাম না।
ছোটকা এসে ওদের মুখ থেকে কালো মাস্কগুলো টেনে খুলে ফেলল।
আমরা তো হাঁ হয়ে গেলাম কাকার সেই বন্ধুকে বিদেশি আর মোটা লোকটার সঙ্গে ধরা পড়তে দেখে।
উনি কাকাকে বলার চেষ্টা করলেন যে উনিও নাকি এই পোশাক পরে চোর ধরতে বেরিয়েছিলেন, আমরা নাকি ভুল করে ওঁকে ধরেছি।
ছোটকা একবার আমাদের দিকে তাকাল। তারপর ওর বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল, “না, ওরা কোনো ভুল করেনি অর্পণ। তোমার যে ও জিনিসের প্রতি বহুদিনের লোভ তা আমাকে বাহাদুর সিং বেশ কিছুদিন আগেই জানিয়েছে। তবে আমারই একটু অসুবিধে হচ্ছিল তোমার সম্বন্ধে এরকম ভাবতে। আসলে মানুষের মধ্যেই অমানুষ লুকিয়ে থাকে এটা ভুলে গেছিলাম।”
বাবাইদাদা বলল, “কিন্তু এই মূর্তিটা এত কেন ভ্যালুয়েবল?”
ছোটকা বলল, “তোরা বোধহয় খেয়াল করিসনি, ওই ল্যাপিস লাজুলির মধ্যেই একটা সলিড ডায়মন্ড আছে।”
মিঠাইদিদি বলল, “মামু, আমি দেখেছিলাম, তাই এতটা সতর্ক হয়েছিলাম। তাছাড়া আর একটা জিনিসে খটকা লেগেছিল, মিস্টার অর্পণের সিগারেটের ব্র্যান্ডে। ওই পোড়া সিগারেটের ব্র্যান্ডও সেম।”
আর কারও কিছু বলার নেই। ভোরের আলো ফুটতেই পুলিশ এসে ওদের ধরে নিয়ে গেল।
আমি বললাম, “মিঠাইদিদি, তুমি আমাদের মাস্ক পরতে বলেছিলে কেন?”
“আরে ওরা সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দিত ঘুমের ওষুধ স্প্রে করে।”
“আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি এইবারে।”
ওদিকে মা আর ছোটকাকি এসে তাড়া দিল, “যা যা, রেডি হয়ে আয় দেখি, এক্ষুনি ভাইফোঁটার সময় হয়ে যাবে।”
তুতাইদিদি বলল, “আরে তাই তো! আজ তো ভাইফোঁটা। এসবের জন্য পুরো ভুলে গেছি।”
আমরা রেডি হয়ে ভাইফোঁটা দিতে এলাম। মিঠাইদিদি আর বাবাইদাদা সবচেয়ে বড়ো, তাই ওদের দিয়েই শুরুটা হল।
ছোটকা বলল, “কী রে বাবাই, তোর ফেমিনিস্ট বোন কেমন চোর ধরে ফেলল বল।”
মুনাইদিদি বলল, “তাহলে বাবাইদা, মেয়েরা শুধু বাসের সিট দখল করে না বল, প্রয়োজন হলে চোরও ধরে।”
ছোটকাকি পাশ থেকে বলল, “এভাবেই মেয়েরা এমপাওয়ার্ড হবে বুদ্ধি, বিবেক, সাহস আর সহমর্মীতায়।”
শিবাইদাদা বলল, “ছোটকা, তোমার বন্ধুর কিন্তু আজ সত্যি নাক কাটা গেল মিঠাইয়ের জন্য।”
মিঠাইদিদির মুখে তখন জয়ের আর আনন্দের হাসি।
বাবাইদাদা এই সুযোগটা লুফে নিয়ে বলল, “আজ থেকে মিঠাই তোর নামও নাককাটি মিঠাই রানি!”
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment