প্রবন্ধ:: প্রকৃতির ভাস্কর্য - সুগত ব্যানার্জি


প্রকৃতির ভাস্কর্য
সুগত ব্যানার্জি

আমাদের পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা পাথর কেটে ভাস্কর্য তৈরি করতে পারে। এরকম এক-একটা পাথরের ভাস্কর্য বানাতে কয়েক বছর লাগে, আর সেগুলো কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। কিন্তু আজ আমি এমন এক জায়গার কথা বলব, যেখানে প্রকৃতির হাতে তৈরি কয়েক হাজার অদ্ভুত ভাস্কর্য আছে, আর সেগুলো সবই তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে, পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আসারও আগে। আর শেষ? আজও হয়নি।
আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যেখানে ইউটা রাজ্য, সেখানে আজ থেকে ৩০ কোটি বছর আগে মহাসাগরের জল আটকে পড়ে একটা সমুদ্র তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে এই সমুদ্রটা শুকিয়ে যায়, কারণ এতে কোনো নদীর জল এসে পড়ত না। সে সময় এই অঞ্চল ক্রমাগতই ভাঙাগড়া হচ্ছিল, আর তার ফলে পরবর্তী দেড় কোটি বছরে এই একইভাবে আরও ২৮ বার এই সমুদ্রে জল এসে শুকিয়ে গিয়েছিল, শুধু প্রতিবার পড়ে থেকেছে পাহাড় প্রমাণ নুন। আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখন পৃথিবীতে প্রথম ডাইনোসরদের আসতে আরও প্রায় ৫ কোটি বছর দেরি। পরবর্তী কোটি-কোটি বছরে আস্তে আস্তে এই বিরাট নুনের পাহাড় বালিচাপা পড়ল, আর সেই বালি প্রচণ্ড চাপের ফলে পাথরে পরিবর্তিত হয়ে গেল। কিন্তু বাইরে থেকে দেখতে পাথুরে জমি হলেও, এর নিচে থেকে গেল একটা প্রকাণ্ড নুনের স্তর। এর পর কলোরাডো নদী তৈরি হল, তা দিয়ে অনেক জল গড়াল, ওপরের পাথুরে জমিটা এক মাইল পুরু হয়ে আবার ক্ষয়ে পাতলা হয়ে গেল। শেষে আজ থেকে ৬-৭ কোটি বছর আগে ওপরের পাথরের ফাঁক দিয়ে জল ঢুকে নুন গলিয়ে দিল, আর ওপরের পাথরের স্তরটা নীচের অবলম্বন হারিয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। বিস্তীর্ণ রুক্ষ, পাথুরে, নোনা মরুভূমির বুকে জেগে রইল এই পাথরের টুকরোগুলো, যেগুলো মাটির ওপর এমন বাঁকাচোরা এলোমেলোভাবে গেঁথে রইল, যেন কোনো দৈত্য খোলামকুচির মতন ছড়িয়ে দিয়েছে তাদের। ‘টুকরো’ বললাম বটে, কিন্তু তার একেকটাই ছোটোখাটো পাহাড়ের মতন বড়ো। উজ্জ্বল কমলা-লাল রঙের এই পাথরের অনেকগুলোই খাড়া হয়ে জেগে রইল মরুভুমির বুকে, উঁচু উঁচু পাথরের পাঁচিলের মতন। মাছের পাখনার সঙ্গে সাদৃশ্যের জন্য ইংরেজিতে এই পাথরের পাঁচিলগুলোকে ফিন (fin) বলা হয়।

নর্থ উইন্ডো আর্চে সূর্যোদয়

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। এই বেলেপাথর আর চুনাপাথরের টিলাগুলো মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে, হাওয়ায় ওড়া বালি দিয়ে একটু একটু করে ক্ষয়ে যেতে থাকে, আর হাওয়াকে সাহায্য করে জলে কার্বন ডাইঅক্সাইড গুলে তৈরি হওয়া অ্যাসিড বৃষ্টি। এভাবে ক্ষইতে ক্ষইতে এক সময় এই পাহাড়ের গায়ে, পাথরের ফিনের মধ্যে, নানা জায়গায় পাথর ভেঙে পড়ে যায়, সৃষ্টি হয় জানালা বা দরজার মতন গর্তের। পুরোনো দিনের খিলানওয়ালা দরজার সঙ্গে মিল থাকার ফলে এখন এই গর্তগুলোকে আমরা বলি আর্চ (Arch)। এই অঞ্চলে একটা বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে ২০০০-এরও বেশি প্রাকৃতিক পাথরের আর্চ তৈরি হয় প্রায় এক লক্ষ বছর আগে।

ব্যালেন্সড রক

শেষ তুষার যুগের পর থেকে, মানে প্রায় ১০,০০০ বছর আগে থেকেই এখানে মানুষের বসবাস। প্রথমে আমেরিকার নানা উপজাতিরা, পরে ইউরোপীয়রা এখানে আনাগোনা শুরু করে। দেড়শো বছর আগে এর কাছাকাছি মোয়াব (Moab) নামে একটা শহরও তৈরি হয়ে যায়। মার্কিন সরকার ১৯২৯ সালে এই অঞ্চলকে জাতীয় মনুমেন্ট ঘোষণা করে, আর ১৯৭১ সালে সেটা হয়ে যায় আর্চেস ন্যাশনাল পার্ক। আর্চেস ন্যাশনাল পার্কে যেতে হলে আজও সেখানে বিস্তীর্ণ রুক্ষ মরুভূমি পেরিয়ে পৌঁছোতে হয়, তবুও বছরে দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষের পা পড়ে এই পার্কে। এরকম প্রত্যন্ত জায়গায় হওয়ার ফলে আর্চেস ন্যাশনাল পার্ক, আর তার পাশেই ক্যানিয়নল্যান্ডস ন্যাশনাল পার্ক ‘ডার্ক স্কাই পার্ক’-এর তকমা পেয়েছে। তার মানে, পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে অন্ধকার রাতের আকাশ যেসব জায়গা থেকে দেখা যায়, আর্চেস তার মধ্যে অন্যতম।
আজকের আর্চেস ন্যাশনাল পার্কের রাস্তার পাশে যেসব অদ্ভুতদর্শন পাথরের টিলা আর ভাঙাচোরা খাড়া পাথরের ফিন মাথা তুলে রয়েছে, তার এক একটা এমনভাবে ক্ষয়েছে যে তাদের দাঁড়িয়ে থাকাটাই আশ্চর্য। রাস্তা থেকে ১৪০ ফুট উঁচু ‘থ্রি পেঙ্গুইনস’, ৩৫০ ফুট উঁচু ‘থ্রি গসিপস’, ভেড়ার মতন দেখতে ‘শীপ রক’, আর ১২৮ ফুট উঁচু কাঠির মাথায় আলুর দমের মতন ‘ব্যালেন্সড রক’ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হাতির পালের মতন দেখতে একটা পাহাড় আছে, যার নাম ‘প্যারেড অফ এলিফ্যান্টস’। ‘ডেভিল’স গার্ডেন’ বলে একটা জায়গায় অজস্র খাড়া খাড়া পাথরের ফিন আছে। সেখানে ক্যাম্প গ্রাউন্ডও আছে, যারা তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাতে চায় তাদের জন্য।

টারেট আর্চে সূর্যাস্ত

ডেলিকেট আর্চ

কিন্তু যে জিনিসটা আর্চেস-এর সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ, সেটা হল পাথরের আর্চ। ‘নর্থ উইন্ডো’, ‘সাউথ উইন্ডো’, ‘টারেট্ আর্চ’, ‘ল্যান্ডস্কেপ আর্চ’ ইত্যাদি বিরাট বিরাট পাথরের খিলানগুলো দেখতেই মানুষের ভিড় হয় সবথেকে বেশি। আর্চেস-এর সবথেকে আশ্চর্য দুটো আর্চ হল উলটোনো ‘U’ অক্ষরের মতন দাঁড়িয়ে থাকা ‘ডেলিকেট আর্চ’ আর ‘ডাবল আর্চ’, যেখানে একই পাহাড় ক্ষয়ে দুটো আর্চ তৈরি হয়েছে। এই ডাবল আর্চের উঁচু আর্চটা এতটাই উঁচু, যে তার নীচে একটা দশতলা বাড়ি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, আর নীচের ফাঁকটা দিয়ে একটা আস্ত স্পেস শাটল গলে যাবে। হাওয়া আর জল যে লক্ষ লক্ষ বছরে কী অদ্ভুত ভাস্কর্য সৃষ্টি করতে পারে, তারই প্রমাণ এই আর্চগুলো। ভোরে আর সন্ধ্যায় যখন সূর্যের নরম রোদ পড়ে তখন আর্চেস ন্যাশনাল পার্কের পাথরগুলো যেন কাঁচা সোনার রং ধারণ করে। দুপুরের সময় অবশ্য ভয়ংকর গরম, সেসময় পর্যটকদের ভিড়ও কম থাকে। শুকনো মরুভূমির একরকম জুনিপার গাছই এখানে বেশি দেখা যায়। এই গাছগুলোর প্যাঁচানো চেহারা, মাটিতে এমনভাবে পড়ে থাকে যে হঠাৎ দেখলে মরা গাছ মনে হয়। কিন্তু এসব গাছের কোনো কোনোটার বয়স হাজার বছর। তাছাড়া নানারকম সাপ, গিরগিটি, শিয়াল, ভেড়া ইত্যাদি মরুভূমির প্রাণীও আছে এখানে।

ডাবল আর্চ 

সন্ধ্যায় সোনালি থেকে লাল হয়ে যখন পাথরের গায়ে শেষ রোদটুকুও নিভে যায়, তখনও আর্চেস ন্যাশনাল পার্ক খালি হয়ে যায় না। যে পর্যটকেরা এখনও বিভিন্ন আর্চের নীচে পাথরের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে, তারা কীসের যেন অপেক্ষা করছে। আস্তে আস্তে অন্ধকার গাঢ় হয়, আকাশে দেখা দেয় একটা-দুটো তারা। ক্রমে যখন দিগন্তের ওপারে মোয়াবের রেশটুকু ছাড়া আর কোনো আলোর চিহ্নটুকুও থাকে না, তখন, যদি আকাশে মেঘ আর চাঁদ না থাকে, তাহলে আকাশে দৃশ্যমান হয় আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গা - যাকে ইংরেজিতে বলে ‘Milky Way’। একটা প্রকাণ্ড আর্চেরই মতন সেটা আকাশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে সাঁ করে উল্কা খসে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে কেমন ঘোর লেগে যায়, দর্শকদের মনে হয় আবার যেন তারা প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে গিয়েছে - এই আকাশ তখনও যেমন ছিল এখনও বুঝি তেমনই আছে। শুধু এই লক্ষ-কোটি তারার মাঝে একেকটা চলমান বিন্দু সেই ভুল ভাঙিয়ে জানান দেয় যে আমরা এরোপ্লেন আর কৃত্রিম উপগ্রহের যুগে বাস করছি। এই ছায়াপথ দেখতেও বহু লোক আর্চেস আর ক্যানিয়নল্যান্ডস ন্যাশনাল পার্কে আসে।
২০০৮ সালে এক রাতে আর্চেস ন্যাশনাল পার্কের একটি বিখ্যাত আর্চ ভেঙে পড়ে যায়। কেউ অবশ্য সেটা ভাঙতে দেখেনি, বা হতাহতও হয়নি, কিন্তু এই ঘটনা আবার একবার আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে যায় যে প্রকৃতির হাতের কাজ এখনও শেষ হয়নি। আজও প্রতিনিয়ত হাওয়ার সঙ্গে ওড়া বালি দিয়ে, মরুভূমির বিরল বৃষ্টির জলের ফোঁটা দিয়ে, বাতাসে ভেসে থাকা কার্বন ডাইঅক্সাইড দিয়ে, শীতের বরফ দিয়ে একটু একটু করে এই পাথরের চাঁইগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে, একটু একটু করে বড়ো হয়ে যাচ্ছে আর্চের মুখগুলো। এ এক অনিবার্য ক্ষয়, যাকে আটকানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। প্রকৃতির এই শিল্পসৃষ্টি শুরু হয়েছে ডাইনোসরদের আসারও আগে, এ কাজ যখন শেষ হবে তখন হয়তো মানুষ আর পৃথিবীতে থাকবে না। আমরা শুধু আমাদের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিতে পারি, যে আমরা এমন একটা সময়ে বেঁচে আছি, যখন এই অদ্ভুত ভাস্কর্য এতটা সুন্দর রূপ ধারণ করেছে।

টারেট আর্চের ওপর ছায়াপথ
----------
ছবি - লেখক

No comments:

Post a Comment