
বই: বাঙালির দুগ্গাপুজো - শুভম ভট্টাচার্য্য
প্রকাশক: বুকফার্ম,
মূল্য: ২৯৮ টাকা
আলোচনা:
সুলগ্না ব্যানার্জ্জী
মানুষের ঢল দোকানে বাজারে
কেনাবেচা হইহুল্লোড়
উৎসবের রং মন জুড়ে আজ
ক্লাবে ক্লাবে শুরু তোড়জোড়
ঘরের মেয়ে ফিরছে ঘরে
আনন্দ সবার আজ
আগমন তার বয়ে আনাই
পূজাবার্ষিকীর কাজ।।
ম্যাজিক ল্যাম্প-এর ছোট্ট বন্ধুরা, আশা করি সকলেই খুব
ভালো আছ। সামনেই তো উমার বাপের বাড়ি আসার পালা… কী প্ল্যান
তোমাদের! নতুন জামা নতুন জুতো নতুন সব কিছুর পাশাপাশি নতুন বই কেনা এবং পড়ার
জন্যও এক্কেবারে উপযুক্ত একটা সময় হল পুজোর ছুটি। তাই আজ তোমাদের এমন একটা বইয়ের
সন্ধান দেব যা পুজোর গন্ধে এক্কেবারে ম ম করছে। এবারের বইটা কোনো গল্প বা
উপন্যাসের নয়, এমনকি কমিক্স বললেও ভুল বলা হবে। এবারে যে বইয়ের সন্ধান তোমাদের দেব তা যেন তোমাদেরই দিনলিপি।
এমনকি এটি তোমাদের বাড়ির বড়োদের ফেলে
আসা ছোতোবেলা আবার ফিরিয়ে দেবে। বই নিয়ে তো অবশ্যই আলোচনা
হবে, তার আগে একটু বলি আমাদের সময় পুজোটা কেমন ছিল।
বইমেলার পর একটানা অনেকদিন ছুটি বলতে
আমাদের ছিল বছরে তিনবার ছুটি। একবার গরমের ছুটি, একবার পুজোর ছুটি আর
বছরের শেষ ছুটিটা ছিল ক্রিসমাসের ছুটি। বইমেলায় কেনা বই তো বটেই, গরমের ছুটিতে বন্ধুরা ভাইবোন দাদাদিদিরা মিলেও বই ভাগাভাগি করে পড়তাম।
ছুটি শেষে স্কুল খুললেই বর্ষা প্রায় দোরগোড়ায় কড়া নাড়ত, আর
বর্ষা মানেই রথযাত্রা। ব্যস, আর-কি!
শুরু হত দিন গোনা। আমাদের সময়ে রথযাত্রা মানেই কিন্তু অনেক বড়ো বড়ো পুজোর ক্লাবের খুঁটিপুজো হয়ে যেত। ওই যে কথায়
বলে ‘রথ টানলে দুগ্গা আসে’ - রথযাত্রা
মানেই আমাদের সময়ে প্রায় আগমনীর সুর বেজে ওঠা। তার মধ্যে যদি পড়ে পাওয়া ছুটি
কিছু জুটত আনন্দটা আরও বেড়ে যেত। রথ মিটতে না মিটতেই জন্মাষ্টমী, রাখী অবশেষে ‘বিশ্বকর্মা পুজো’।
আমাদের সময় ছোটোদের জন্য কাজ ছিল
কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম। গল্প উপন্যাস ইত্যাদির জন্য মূলত ছিল আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর ভারতী এবং চাঁদমামা। তারও আগে শুনেছি
‘পক্ষ্মীরাজ’ ইত্যাদি কিছু ছিল। তবে বড়োদের জন্য অনেকরকমের পত্রিকা হত। আজও মনে আছে, যখন
পূজাবার্ষিকীর মর্ম অতটা বুঝিনি তখনও পুজোর সময় আমাদের নতুন বই হিসেবে পাওনা ছিল
কমিকস, রূপকথার গল্প, ভূতের গল্প। সে
যাই হোক, এখন তো রথ কাটতে না কাটতেই বেশিরভাগ পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত হয়ে যায়, আমাদের সময়
কিন্তু পূজাবার্ষিকী প্রকাশের সময়টাই ছিল সেপ্টেম্বর মাস। আকাশে শরতের সাদা মেঘের
ভেলা বয়ে আনত পূজাবার্ষিকীর সংবাদ আর পুজোসংখ্যাগুলো প্রকাশ পেয়ে জানান দিত ‘উমা’ সন্তানদের নিয়ে আবার আসছেন বাপের বাড়ি। ওই
তিন-চারটে পূজাবার্ষিকীর মধ্যেই ছিল তখনকার পুজোর আনন্দ।
সেপ্টেম্বর মাস এলেই প্রতিদিন নজর থাকত বাড়িতে আসা দু-চারটে খবরের কাগজের প্রতিটা
পাতায়। যেই মুহূর্তে বিজ্ঞাপন চোখে পড়ত, শুরু হয়ে যেত বড়োদের পেছনে ঘোরা। রোজ কখনও
অদ্ভুতুড়ে সিরিজের উপন্যাস, কখনও
কাকাবাবু, কখনও মিতিন মাসি, কখনও কিকিরা ইত্যাদির টিজারের পাশাপাশি চলত আমাদের
বায়না, তবে বাপু একটা সত্যি কথা এইবেলা বলে যাই, ঐ বই পাওয়ার লোভ দেখিয়ে আমাদের তখন যা হুকুম করা হত আমরা লক্ষ্মী ছানার
মতো পালন করতাম।
তারপর একদিন সকালবেলা বাজার থেকে
জেঠুরা কাকারা বা বাবা, আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে সেদিন বাজার করার পালা যার
থাকত তার বাজারের ব্যাগ থেকে বড়োদের পত্রিকার পাশাপাশি যখন
আমাদের প্রিয় পূজাবার্ষিকীগুলো উঁকি দিত, সেই সপ্তাহে
রবিবার লাল লাল রেওয়াজি মাটনের ঝোল আর ফ্রায়েড রাইসের
পার্টি হত। তারপর দুপুরবেলা ছাদের ঘরে চলত যুদ্ধ, কে কোনটা
আগে শুরু করব। আর সপ্তাহান্তের ঠিক বিকেলগুলোতে বাড়ত বন্ধুদের আগমনও…
- “আমার বাড়িতে এখনও
আসেনি, তোরটা একটু পড়তে দিবি রে…!”
কখনও চলত - “একপাতা তুই পড়বি, একপাতা আমি পড়ব…”
তখন তো আজকের মতো এতরকম কাজ হত না। বড়োদের থ্রিলার বলতে যতদূর
মনে পড়ে ‘রোমাঞ্চ পত্রিকা’ ছিল, আবার ‘রহস্য রোমাঞ্চ’ বলেও
একটি পত্রিকা ছিল। এখন তো ছোটোবড়ো সকলের জন্য নানান রকম কাজ
হয় এবং সে কাজ সমাদর যে পায় না তাও নয়। তখন যুগ এত উন্নত ছিল না, এখন তো জনসমক্ষে প্রিন্ট করা হোক বা অনলাইন বেশ ভালো ভালো কাজ হয় যে কোনো
বইপ্রেমী মানুষের জন্য।
এবার আসি কেন এত কথা বললাম সেই
প্রসঙ্গে। ওই যে বললাম, পুজোর আগে পুজোর গন্ধ কেবলমাত্র পূজাবার্ষিকী এবং নতুন বই
বয়ে আনে। ঠিক তেমনই আজকে যে বইটির কথা তোমাদের বলব, সেটি
বুকফার্ম প্রকাশনী থেকে পুজোর আগে এমন একটি বই যেখানে পাতায় পাতায় রয়েছে
আদ্যিকাল থেকে আজকের পুজোর সুন্দর বর্ণনা। সোশ্যাল মিডিয়ায়
সাড়া ফেলে দেওয়া একটি পেজ ‘ভট্টবাবুর পাতা’ যেখানে আর্টওয়ার্কের মাধ্যমে সুন্দর সুন্দর আঁকা ছবির সঙ্গে তৎক্ষণাৎ
পরিস্থিতির খবরাখবর দেন ‘শুভম ভট্টাচার্য্য’। বুকফার্ম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত উক্ত বইটির নাম ‘বাঙালীর
দুগ্গাপুজো’ যার পাতায় পাতায় রয়েছে পুজোর সেই স্মৃতি যা বড়োদের ফিরিয়ে দেবে তাদের ছোটোবেলা আর ছোটোদের মন পুজোর
ভরপুর আনন্দে ভরে যাবে পুজো শুরু হবার আগেই।
শুভম ভট্টাচার্য্য যে কেবলমাত্র একজন
অঙ্কনশিল্পী নন তার প্রমাণ ‘বাঙালির দুগ্গাপুজো’ গ্রন্থ যার পাতায়
পাতায় রয়েছে কখনও কিউট মহিষাসুর বা শুভমবাবুর ভাষায় ‘কিউটাসুর’ - এর সঙ্গে মা দুগ্গার বাহন আফ্রিকার
জঙ্গলের রাজার মজাদার কথোপকথন, কখনও বা
রয়েছে স্বয়ং দেবী দুগ্গার বাপের বাড়ি আসার প্রস্তুতির ছবি। কোথাও রয়েছে
জগন্নাথের রথযাত্রা তো কোথাও শরতের মেঘলা আকাশে ঘুড়ির লড়াই। আবার কোথাও বাঁশ
বাঁধার ছবি, আর তার সঙ্গে শিল্পীর অপূর্ব ভাষাশৈলী।
শুধুমাত্র দুগ্গাঠাকুরের আসার আনন্দই নয়, তাঁর পুনরায়
শ্বশুরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন। এক কথায় শুভম ভট্টাচার্য্যের এই বইটি ছাপার অক্ষরে তাঁর
প্রথম বই হলেও এটিকে বুকফার্ম প্রকাশনীর পূজাবার্ষিকী বললে খুব একটা ভুল বলা হবে
না।
সব শেষে বলব, এই বইটি কেবলমাত্র ছোটোদের জন্য নয়, যে কোনো বয়সের মানুষের জন্য এই বই। এই
বই পাঠকদের পরিবারের সেই মানুষের কথাও মনে করিয়ে দেবে যাঁর ইহলোকের মায়া কেটে
গেছে। বড়োদের যেমন এই বই ফিরিয়ে দেবে ছেলেবেলা ঠিক তেমনই
তোমরা ছোটোরাও এই বইতে পাবে পুজোর সেই ছোঁয়া যা সারা বছর
পুজোর রেশ কাটতে দেবে না। তাহলে আর দেরি কেন! মহালয়ার ভোরে
রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র-বাবুর কণ্ঠ শোনার পর যখন টিভিতে
সব চ্যানেলে মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠান শেষ হবে তারপরেই বসে পরো ‘বাঙালির দুগ্গাপুজো’ নিয়ে।
আজ তবে এইটুকুই, পুজোর ছুটি খুব ভালো
কাটুক। আনন্দ করো, কিন্তু সাবধানে।
----------
No comments:
Post a Comment