গল্প:: ইলিশ বিভ্রাট - দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী


ইলিশ বিভ্রাট
দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

সেদিন বাড়িতে ধুন্ধুমার কাণ্ড। মা, মানদা দিদি, নিমকি পিসি, জেঠিমা অবধি সবাই ধরাশায়ী।
জেঠুর আঙুল ফুলে কলাগাছ।
কিছুতেই আর ঢাকনা খুলছে না। নুন তেল সর্ষে পোস্ত দিয়ে ইলিশ মাখিয়ে জাবদা একখানা বাটি কড়াতে বসানো। গরম জল বগবগ করে ফুটছে।
ভাপের আশায় বসে ছিল সব পাণ্ডব আর কৌরবেরা। পাণ্ডব কৌরব বলছি কেন? কে ক’টা পিস্ খাবে তাই নিয়ে এতক্ষণ তুমুল বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। কার কতদিন ইলিশ খাওয়া হয় না তাই নিয়ে চরম নাকি কান্না।
নিমকি পিসি অবশ্যই দু-পিস খাবে। কারণ বিদেশে তো ভালো ইলিশ পাওয়া যায় না।
ছোড়দাও দু-পিস খাবে, কারণ গত বছরের অগাস্টের বারো তারিখ ছোড়দার জ্বর থাকায় একপিস ইলিশ স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছিল। ছোড়দা এই হিসেবগুলো নিখুঁতভাবে ডায়েরিতে লিখে রাখে।
এদিকে সেই বাটির ঢাকনা এমন এঁটে বসেছে যে আজ মনে হচ্ছে কচু শাক আর পটলের ডালনা দিয়েই ভাত খেতে হবে। কারণ ডালনাটা ছানার হওয়া সত্ত্বেও ইলিশের দুঃখে হাড়জ্বালানো ছোড়দা সবক’টা ছানার বড়া হাপিশ করেছে। প্রত্যেকবার ঢাকনা খোলার চেষ্টার নামে রান্না ঘরে যাচ্ছে আর দুটো ছানার বড়া গালে পুরে জাম্বুবানের মতো এসে বলছে, “নাহ, আজকের দিনটাই মাটি হল। সব এই হতচ্ছাড়া অপুর জন্য। বীরত্ব দেখিয়ে বাটির ঢাকনা কে লাগিয়েছিল?”
সত্যিই আমি একটু আমার সদ্য ঠেলে ঠুলে ওঠা পাতিলেবুর মতো পেশীর জোর দেখাতে গিয়েই এই কাণ্ড করলাম।
এদিকে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম উপায় বাতলে যাচ্ছে। কেউ বলছে উপরে চাপ দিয়ে ডান দিকে ঘোরাও, কেউ বলছে নীচে চাপ দিয়ে বাঁ দিকে ঘোরাও। মানদা-দি বলল বাড়ির দেয়ালে কয়েকবার ঠুকলেই খুলে যাবে। তাতে ঝুর ঝুর করে দেয়ালের গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়ল, কিন্তু ঢাকনা খুলল না।
এর মধ্যে কেউ স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে এল, কেউ হাতুড়ি।
মা বলল, “কী বিচ্ছিরি কৌটো বাবা, একবার ইলিশ বেরোক, ওই কৌটো আমি বিসর্জন দিয়ে আসব। কী কুক্ষণে যে এমন কৌটো বের করেছিলাম।”
জেঠিমা বলল, “এর থেকে বেগুন আর কালোজিরে দিয়ে ইলিশের ঝোল করলেই তো হত।”
বুঁচকি বলল, “দই-ইলিশ আমার ফেভারিট। এই কৌটোর ঢাকনা খুলতে গিয়ে আমার নতুন নেলপালিশ লাগানো নখ অবধি উপড়ে গেল। কত দামি ছিল নেলপালিশটা।”
জেঠু এগিয়ে এসে বলল, “আহা তোমাদের ভাপের কথা বলেছিল কে?”
অমনি সবাই আমার দিকে তাকাল। এদিকে ভাপের পাপের চাপে আর রান্নাঘরের তাপে আমার যাই যাই অবস্থা।
তখন আমার বিজ্ঞানী মেজকা এসে কী একটা যন্ত্র দিয়ে বাটিটা পরীক্ষা করতে লাগল। স্টেথোর মতো দেখতে একটা নল বসিয়ে। তারপর ভারী চিন্তার সুরে বলল, “সব বাষ্পীভূত হয়ে একটা প্রচণ্ড অবস্থা। পোটেনশিয়াল বম্ব।”
সবাই যে যেখানে পারল ছিটকে গেল ভয়ে।
“মানে বারো পিস্ ইলিশ, বারোটা কাঁটা টিক টক, টিক টক।”
আমি ভয়ে আমতা আমতা করে বললাম, “টাইম বোমা?”
মেজকা হেসে বলল, “আরে না না। মজা করছিলাম। এ তো আমাদের মশা মারা রোবট মমারো খুলে দিতে পারবে।”
মমারো একটা ঘুসি বাগিয়ে এগিয়ে আসতেই জেঠিমা বাধা দিল, “দরকার নেই। ও ইলিশের পিণ্ডি চটকে দেবে।”
ছোড়দা বলল, “হ্যাঁ, তারপর থেকে আমরা ওকে ইমারো - ইলিশ মারা রোবট বলে ডাকব।”
নিমকি পিসি দেখি কোথা থেকে হঠাৎ একটা সাপুড়েকে ডেকে এনেছে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল।
মানদা-দি বলল, “সবাই সরে যাও, সাপুড়েরা সব পারে।”
হাড়জ্বালানো ছোড়দা হেসে গড়াগড়ি দিয়ে বলল, “হো হো, বিন বাজালে বুঝি ইলিশগুলো নাচতে নাচতে বেরিয়ে আসবে?”
এদিকে সাপুড়ে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রান্নাঘর পার করে চলে গেছে উঠোনের মধ্যে। পেঁপে গাছের তলে কনুই অবধি হাত ভরে তার এগাল থেকে ওগাল চওড়া হাসি।
“পেয়ে গেছি এই যে। হেলে সাপ, হেলে সাপ।”
নিমকি পিসি এবারে পা নাচিয়ে বলে উঠল, “নো, নট দ্যাট। আই টোল্ড হিম হিলসা, হিলসা।”
নিমকি পিসি কানাডায় তো ভালো ইলিশ মাছ পায় না। অনেক আশা করে বসেছিল সকাল থেকে।
হিলহিলে হেলে সাপ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে লোকটা নিমকি পিসিকে “থ্যাংকু ভেরি মাচ, গুড মর্নিং” বলে গেল।
এদিকে বেলা গড়িয়ে তিনটে।
আমার ভারী রাগ হল, বাড়ির লোকজন যাকে বলে অপদার্থ। কোনো কাজের না। এই পাড়ায় কি একটা লোকেরও হাত ভালো নয়?
সবাই অমনি হাঁ হাঁ করে উঠল, “দাঁতের ডাক্তারের হাত ভালো। খুব নামডাক।”
“দাঁতের ডাক্তারের হাত ভালো দাঁতের পাটি খোলায়, আর এটা ইলিশের বাটি।”
কারোর কোনো সেন্স কাজ করছে না খিদের ঠেলায়। আর তাছাড়া এ হল সাধের ইলিশের খিদে। ওদিকে বাড়িতে প্রায় জনা চব্বিশেক লোক জমে গেছে।
এখন কোনোরকমে বাটি খুলে গেলে বারো পিস ইলিশের কিছুই থাকবে না। শুধু মুখে আর লোকজনকে ফেরানো যাবে না। আর মুখ চোখ দেখে মনেও হচ্ছে না আজ ইলিশ না চেখে কেউ যাবে।
দাদু ভাগ্যিস ঘড়ি দেখে বলে দিল, “যাও যাও সবাই বাড়ি যাও। বিকেল হতে চলল, ইলিশ এখন ডিনারে।”
কী আর করা, সেই মুখ বন্ধ রহস্যময় বাটির দিকে তাকিয়ে আমরা সবাই শাক ভাজা দিয়ে ভাত খেতে শুরু করলাম।
সন্ধেবেলা আবার ম্যাজিক শো আছে। আজই এখানে ওদের শেষ শো। নিমকি পিসি নিয়ে যাবে। পাঁচশো টাকা টিকিট নাকি।
হাড়জ্বালানো ছোড়দা বলল, “এই সুযোগ, কত বড়ো ম্যাজিশিয়ান, এবার দেখা যাবে। এই ইলিশের বাটি যদি খুলতে না পারে, কীসের আর ম্যাজিশিয়ান?”
আমি অবাক। ছোড়দার কি মাথাখারাপ! বগলদাবা করে এনেছে সেই ইলিশের বাটিটা যার মধ্যে বারো পিস ইলিশ বন্দি।
কিন্তু ম্যাজিশিয়ানের ম্যাজিক দেখে আমার মনে খুব একটা আশা জাগল না। ভয়ানক বোর হলাম বলা চলে। সেই এক রুমালের ম্যাজিক, তাসের ম্যাজিক, বগল দিয়ে খরগোশ, নাক দিয়ে দুধ, মুখ দিয়ে ব্লেড।
যাই হোক, শেষটাতে ছোড়দা একদম ইলিশের বাক্স হাতে স্টেজে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেশ চ্যালেঞ্জের সুরে ম্যাজিশিয়ানকে বলতেই সে প্রথমে গোলাপি ভুরু নাচিয়ে ছোড়দার হাত থেকে বাক্সটা কেড়ে নিল। ছোড়দা দেখি হতভম্ব হয়ে স্টেজের একপাশে দাঁড়িয়ে গেল।
তারপর ওপর থেকে নেমে এল এক ঝলমলে সোনালি পর্দা।
পর্দা উঠতে দেখি জাদুকরও নেই, বাটিও নেই।
এদিকে হাততালির ঝড় বয়ে গেল। নিমকি পিসি বলল, “ব্রিলিয়ান্ট, দিস ওয়াজ হিস বেস্ট।”
তারপর ঝপ করে স্টেজের পর্দা পড়ে গেল। শো শেষ।
আমরা বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে দেখি ছোট্ট এক জোকার-এর মুখোশ পড়া ছেলে এসে ছোড়দার জামা টেনে, দিয়ে গেল বাটিটা। ঢাকনা খোলা, এবং ঝকঝকে করে মাজা।
ছোড়দা চোখ কপালে তুলে বলল, “আমাদের ইলিশ?”
“ওই যেটা বারো পিস ছিল?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ!”
ছেলেটা পালাতে পালাতে হাত নেড়ে বলল, “ম্যাজিক!”
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment