গল্প:: গাছেদের মেয়ে - সৌমন্তী সিনহাবাবু


গাছেদের মেয়ে
সৌমন্তী সিনহাবাবু

ঘুমোতে যাওয়ার আগে গাছটাকে আরেকবার ভালো করে দেখে এল টুপুর। না, কোনো পরিবর্তন নেই। সবসময়ে তার সঙ্গেই কেন এমন হতে হয়!
শুধু আজ বলে নয়, ছোটো থেকেই এসব ঘটে চলেছে। সেকেন্ড স্ট্যান্ডার্ডে মিস একটা মাটির পশু কিংবা পাখি বানিয়ে আনতে বলেছিলেন টুপুরদের। সেই কথা মেনে দিব্যি একখানা ঘোড়া বানিয়েও ফেলে সে। বাবা অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ওটা কি গোরু, নাকি চিল?” একটু দুঃখ হয়েছিল বটে, কিন্তু গায়ে মাখেনি টুপুর। সকালে উঠে দেখে, সে কী কাণ্ড! ঘোড়ার একখানা পা নেই, লেজ গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে! আরেকবার সুন্দর করে দার্জিলিঙের পাহাড়গুলো আঁকার পর যেই না একটু কালো রং দিয়ে কোনাটা ঠিক করতে গেছে টুপুর, হাত থেকে তুলিটা দুম করে পড়ল ঠিক ছবির মাঝ-বরাবর। ক্লাসে কম হেসেছিল সবাই!
কিন্তু এবার? এবার তো সব তৈরি ছিল। যত দোষ ঠাকুমার। চোখে জল চলে আসে তার। কেমন বললেন টুপুরকে, “আমাদের বাগানে আম, জাম, কলা কম ফলিয়েছি, দিদি? কত ফুল চাই, তুমি শুধু বলো!” বিশ্বাস না করার কোনো কারণ ছিল না টুপুরের। ঠাকুমার কোনো কথাই সে ফেলে দেয় না। মাঝে মাঝে হলুদ আলোখানা জ্বেলে ঠাকুমা কত গল্প শোনান তাকে। বাবার ছোটোবেলার গল্প, গ্রামের পারুলপিসির গল্প, স্কুলের গল্প, ঝিলপরি, বিলপরি, গাছপরিদের গল্প। চন্দ্রা মিস বলেন, পরিরা ফেয়ারি টেল, মানে রূপকথা। বাস্তবে ওদের কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু টুপুর ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না। ঠাকুমা অবশ্য ভুরু কোঁচকান, “এ হল গিয়ে শহর-বাজার, পরিরা অত সহজে এখানে দেখা দেবে কেন?”
শহর-বাজারের ওপর ঠাকুমার ভরসা চিরকালই কম। টুপুর বলেছিল, একটা ওয়েবসাইট থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়ে নেবে বীজ। “ওসব বীজে ফুল হয় না গো, দিদি! ওই তোমাদের ওয়েবসাইটে কি প্রজাপতি আছে নাকি যে বীজ পোক্ত হবে?” বলেছিলেন ঠাকুমা। সত্যি বলতে, অর্ডার দিয়ে বীজ কেনার সময়ও ছিল না। মাত্র দেড়মাস দিয়েছে স্কুল গার্ডেনিং প্রোজেক্টের জন্য। এই একমাসের মধ্যে বীজ কিংবা বাল্ব থেকে ফুল ফুটিয়ে দেখাতে হবে। প্রতি বৃহস্পতিবার গাছটা নিয়ে যেতে হয় মন্দাকিনী মিসের রুমে। উঁচু ক্লাসে বোটানি পড়ান মিস। কী ঝকঝকে হাসি, ল্যাপটপের গায়ে সুন্দর সুন্দর স্টিকার, মাথা নীচু করে যখন খাতায় রিমার্ক দিতে দিতে হাতের দিকে তাকিয়ে মিস ঘড়ি দেখেন টুপুরের সামনে, টুপুরের ভীষণ ইচ্ছে করে ওরকম হতে বড়ো হয়ে। তাহলে মোনা, প্রিন্সেস, স্বাগতা কেউ আর মজা করতে পারবে না টুপুরকে নিয়ে। কেন হতে পারবে না সে, ঠিক পারবে! নিজেই নিজেকে রোজ বোঝাত টুপুর। তার গাছের ফুল দিয়েই দেখিয়ে দেবে সে সবাইকে।
কিন্তু ঠাকুমা হঠাৎ এমন করবেন, ভাবতে পারেনি সে। গত মাসে স্কুল থেকে ফিরে দেখে, বাবা ব্যাগপত্র তুলছেন গাড়িতে, ঠাকুমা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন নতুন একখানা শাড়ি পরে। “কোথায় যাচ্ছ তুমি?” চমকে উঠেছিল টুপুর।
ঠাকুমা একগাল হেসেছিলেন, “আর বোলো না, দিদি! পারুল খবর দিল, উঠোনের চন্দনগাছটায় সুগন্ধ উঠেছে। জানো তো, কত সাধের ওই চন্দনটি আমার। বড়োমাসি চারা এনে দিলেন, তখন তোমার বাবা এইটুকু।”
“আর আমার গাছের কী হবে?” ধরা গলায় প্রশ্ন করে টুপুর।
ঠাকুমা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন, “ওমা, মনখারাপ করতে নেই, দিদি। তোমার সঙ্গে রোজ কথা বলব আমি।”
রোজ কথা না ছাই! অর্ধেক সময়ে হয় নেটওয়ার্ক থাকে না, নয় চার্জ ফুরিয়ে যায়। বাবা বিড়বিড় করেন রোজ, “কী দরকার ছিল মায়ের এই বর্ষাকালে ওদিকে যাওয়ার? আমি বারবার করে বললাম, সেপ্টেম্বরের মাঝ-বরাবর পাঠিয়ে দেব।”
মা তখন বাবাকে বোঝান, “হাজার হোক, ওঁর মন কি আর এই ফ্ল্যাটে টেকে? সারাজীবন খেত, বাগান, পুকুর, গোয়াল করে কাটিয়েছেন। ক’টা দিন গ্রামে থেকে এলে মন ভালো থাকবে।” কিন্তু টুপুরের মনের কী হবে? চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরে সে, সেদিন কম খারাপ লেগেছিল তার!
আর লাগবে নাই বা কেন? সবার চারাগাছগুলো কী সুন্দর বেড়ে উঠছিল লকলক করে। অর্পিতার তো একটা হলুদ ফুলও ফুটেছে শিগ্‌গির। এদিকে টুপুরের গাছটার যেন বড়ো হওয়ার ইচ্ছেই নেই। তার কাঁদো-কাঁদো অবস্থা দেখে মা রোজ চায়ের পাতা, আরও কী সব দিচ্ছিলেন টবে। নিয়ম করে রোদ-বৃষ্টিতেও দিয়েছে টুপুর গাছখানাকে। তবু মাত্র পাঁচখানা পাতা বেরিয়েছে দেড় মাসে। অথচ ঠাকুমার বিশ্বাস ছিল, এ নাকি চমৎকার গাছ। তাঁর বয়ামে ছিল যে বাল্বটা।
ঠাকুমার অত্যন্ত যত্নের ওই বয়াম। বাদামি চিনেমাটির ওপর কেমন নকশা-কাটা। গ্রামের বাড়ি থেকে বীজ, শুকনো ফুলের পাপড়ি, বাল্ব এনে প্রতি বছর ওতে তুলে রাখেন ঠাকুমা। ওখানে নাকি কোন বান্ধবী আছে ঠাকুমার, ‘কুসুম’ বলে, তিনিই এনে দেন এসব ঠাকুমাকে প্রতিবছর। তাঁকে অবশ্য কখনও দেখেনি টুপুর। ঠাকুমা বলেছেন, তিনি নাকি ভারী ব্যস্ত থাকেন এমনিতে, চাইলেই তাঁর দেখা পাওয়া যায় না। কে জানে! ঠাকুমা বললেন, “কুসুম এবার একটা ভারি দামি জিনিস দিয়েছে, দিদি! এই কন্দখানা!” বাল্বটা থেকে একে তো চারা বেরোতেই চাইছিল না, বাবাকে বলে কোনো একটা নার্সারিতে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিল টুপুর। ঠাকুমা জেদ ধরে বললেন, “অমন বলতে নেই দিদি, গাছপরিরা দুঃখ পায়। ওকে একটু সময় দাও।”
ভাবতে ভাবতে কখন যে পার্কে বেরিয়ে এসেছে টুপুর, খেয়াল নেই। এমন সময়ে সচরাচর কেউ খেলতে আসে না, তাদের সোসাইটিতে এমনিতেই বাচ্চা খুব কম। মিমিদের ভালো; কত লোকজন, কত খেলা হয়। মিমি তার বেস্ট ফ্রেন্ড। দোলনায় চড়ে টুপুর, এমনিতে এটা তার ঘুমোনোর সময়। স্কুলবাস থেকে নামিয়ে সীমাদি তাকে রোজ তার ঘরে দিয়ে যায়। তারপর সে মা কিংবা বাবাকে ফোনে বলে দেয়, সে বাড়ি ফিরেছে। দুপুরবেলা বাইরে বেরোনো টুপুরের বারণ, বড়োজোর ওই পার্কটা পর্যন্ত। মা ফেরেন সাড়ে পাঁচটায়, বাবা সাতটা। তারপর হোমওয়ার্ক। রোজকার রুটিন বাঁধা। গ্রামে যেতে ভালোই লাগে টুপুরের। প্রতিবছর শীতের ছুটিতে তিন-চারদিন থেকে আসে সে। ঠাকুমা তখন পুরো বদলে যান। এই উনুনের পাড়ে বসে পিঠে বানাচ্ছেন, এই ভোররাতে টুপুরকে নিয়ে যাচ্ছেন সরষেখেতে, এই পারুলপিসির সঙ্গে মিলে উলের টুপি বুনে দিচ্ছেন তাদের সবাইকে। গ্রামে গিয়ে পরিদের গল্প শুনতে ভারি মজা। ভোররাতে বাড়ির পেছনের বিলের জলে ঝুপঝুপ শব্দ হয়, পারুলপিসি বলে, “চুপ চুপ, টুপুসোনা! মা লক্ষ্মী ডুব দিতে এয়েছেন, প্রণাম করো দিকি।” আবার কখনো-কখনো ঘুমের ঘোরে দেখেছে টুপুর, কে যেন মেঝেতে বসে সুপুরি কুচোচ্ছে। “গাছেদের মেয়েরা বোধহয় শীতে এসে ঘরদোরে থাকে, পাতা ঝরে গেছে কিনা সব,” অবিকল স্বরে উত্তর দেন ঠাকুমা। গাছেদের মেয়ে মানে গাছপরি।
আরেকজন তবে খেলতে এসেছে আজ। টুপুরেরই বয়সি হবে কিংবা একটু ছোটো। আগে কখনও দেখেনি একে টুপুর। হতে পারে, বেড়াতে এসেছে কারও বাড়ি। একটু ইতস্তত করে শেষমেশ তাকিয়ে থাকে সে মেয়েটির দিকে। মেয়েটিও দেখছে তাকে। ধীরে ধীরে আপনমনেই সে এগিয়ে এল টুপুরের দিকে। তারপর হঠাৎ বলে, “জল আছে তোমার কাছে?”
“জল? না তো!” মাথা নেড়ে জানায় সে।
মেয়েটি যেন বিরক্ত হল, “ভারি বিচ্ছিরি জায়গা তোমাদের, কোথাও একটু জল নেই।”
“তোমার বাড়ি কোথায়?” টুপুর প্রশ্ন করে।
“অনেক দূর, সেই পাহাড়ের ওপরে,” আঙুল দিয়ে দেখাল সে সোসাইটির ওইপাশে মাঠের দিকে। ওদিকে আবার পাহাড় কোথায়? এটা হল প্লেনল্যান্ড, মানে সমতল। অবাক হয় টুপুর।
মেয়েটি পাত্তা দেয় না, বলে, “তুমি কি কিছু চাও আমার কাছে?” টুপুর আবার কী চাইবে?
‘চ্যাঁ চ্যাঁ চ্যাঁ...’ একটানা শব্দ আসছে যেন কোথা থেকে। ধড়ফড় করে বিছানার ওপর উঠে বসে টুপুর। স্বপ্ন দেখছিল নাকি এতক্ষণ? মনে হচ্ছিল, যেন সব সত্যি! ‘চ্যাঁ চ্যাঁ চ্যাঁ’ শব্দটা যেন বেড়েই চলেছে। উঠে বোঝার চেষ্টা করে টুপুর। সম্ভবত ব্যালকনিতেই হবে। কাচের ওপার থেকে উঁকি দিল সে। এ আবার কী!
একটা কাকের ছানা বারান্দায়। লাল টুকটুকে মুখের ভেতরখানা। হয়তো সদ্য উড়তে শিখছিল, কোনোভাবে পড়ে গেছে। কাকেদের ভয় করে টুপুরের। তাড়াতাড়ি সরে এসে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল সে। থাক পাখিটা। একটু পরে নিজেই চলে যাবে।
ভিডিয়ো গেম খেলতে দেন না মা-বাবা তেমন। বেশি ফোন ব্যবহার করা নাকি ঠিক নয় এই বয়সে। তাই টুপুর এখনও টিভি দেখে। একটু পরেই পছন্দের কার্টুন শুরু হবে বলে। ইনডাকশন চালিয়ে দুধটা গরম করতে বসিয়ে দিল সে। বিকেলে বেশিরভাগ দিন দুধ-রুটি খায় টুপুর, সঙ্গে টুকরো-করা আপেল। রান্নাঘর থেকেই দেখা যায় গাছটাকে।
একই অবস্থা। রোজ সন্ধ্যার মুখে জল দেয় সে গাছে, রবিবার নিমতেল। তবু পাতা যেন গজাতেই চায় না, ফুল তো দূরের কথা। বাবা ঠিক বুঝতে পারলেন না, গাছটা কী। গুগল লেন্সও আলাদা আলাদা উত্তর দিচ্ছে বারে বারে। কালকে নির্ঘাত মোনা আবার বলবে, “টুপুর তো একটু স্পেশাল, তাই ওর প্রোজেক্ট সব সময়েই স্পেশাল!” আর বাকিরা হাসবে। টুপুর বড়ো চুপচাপ, এটাই ওর দোষ। মা বলেন ‘ইন্ট্রোভার্ট’, ঠাকুমা বলেন ‘চাপা স্বভাব’। একই ব্যাপার। বাটিতে দুধ ঢেলে, রুটি আর আপেল নিয়ে বসল সে।
টম আর জেরি কোথায় যেন একটা বেড়াতে গেছে। সেখানে সব খাবারের পাহাড়। মাঝখান দিয়ে জুসের নদী বয়ে যাচ্ছে। জেরি সাঁতার কেটে চলে গেল ওই পারে। টম একটা চামচ নিয়ে ছুটে আসতে আসতে পিছলে পড়ে গেছে। অন্যদিন হলে হেসে গড়িয়ে পড়ে টুপুর। আজ কেমন একটু চিন্তা হচ্ছে। প্রোজেক্টের জন্য হয়তো। বা হয়তো... কান খাড়া করে সে। কাকের ছানাটা আর ডাকছে না। চলে গেল নাকি? উঠে দেখে টুপুর। না, এখনও একই জায়গায় আছে। তবে মাথা নীচু। কী করা উচিত?
বেশ কয়েক বছর আগে বাসা ভেঙে একটা বাচ্চা ঘুঘু পড়েছিল চন্দনগাছ থেকে। ঠাকুমা ছবি পাঠিয়েছিলেন টুপুরকে। পরে গল্প শুনেছিল টুপুর, বাচ্চা পাখিদের নাকি পালকে করে খাওয়াতে হয়। চন্দ্রা মিস বলেছেন, ছোটো পাখিদের পাকস্থলি ছোটো, তাই অনেক বেশি খাবারের দরকার পড়ে না। আচ্ছা, যদি ওর মা ওকে খুঁজে না পায়? টুপুর যদি এমনি হারিয়ে যেত আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে না পারত? তারপর ওকে কেউ খেতে দেয়নি কতক্ষণ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, হয়তো স্টেশনে বসে আছে। গলাটা ব্যথা করে ওঠে তার।
কামড়ে দেবে? নাও তো কামড়াতে পারে। কিন্তু না খেলে যদি ওর কিছু হয়ে যায়? মনে জোর এনে রান্নাঘর থেকে ছোটো একটা বাটি বের করে টুপুর। দুধে রুটি গুলে মেশায় সে, আপেল চটকে দেয় তাতে। ঠাকুমার ড্রয়ারে পালক থাকবে এক-আধটা ঠিক। হ্যাঁ, যা ভাবা, তা-ই। ফল ঢেলে ঝুড়িটা হাতে করে সাবধানে দরজা খোলে টুপুর।
পাখিটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল কিংবা ঘোরের মধ্যে ছিল। টুপুরকে দেখেই চমকে উঠল সে, তারপর উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। কাঁপা-কাঁপা হাতে পাখিটাকে ঝুড়িতে বসায় টুপুর। পাখিটা চুপ করে গেছে এতক্ষণে, বোধহয় ভয় পেয়েছে। শান্ত হয়ে সে কয়েক মিনিট পাশে বসে থাকে। যারা ভয় পায়, তাদের সঙ্গে শান্ত হয়ে থাকতে হয়। ভয়ের চোটেই তো সেদিন তুলিটা ছিটকে কালো রং ছবিতে পড়েছিল। প্রোজেক্টে সবার থেকে কম নম্বর পাওয়ার বড্ড ভয় তার। অথচ, বারবার তা-ই হয়।
এতক্ষণে বোধহয় কাজ হয়েছে। ধীরে ধীরে পালকের গোড়ায় একটু খাবার লাগিয়ে কাকের ছানাটার সামনে ধরে সে। ছোটো পাখিদের খুব যত্ন করে খাওয়াতে হয়, নাহলে শ্বাসনালিতে খাবার আটকে যেতে পারে। ছানাটা প্রথমে মুখ খোলে না। তারপর একটু এগিয়ে আসে। তাড়াতাড়ি মুখের ভেতর চালান করে দিতে হয় পালকটা। আরেকবার, আরেকবার। খুব খিদে পেয়েছিল বোধহয় ওর। বেশ কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছে সে। গুটি গুটি পায়ে ফিরে আসে টুপুর।
টম একটা বেকারিতে কাজ করে। জেরি বারবার এসে কাজ বিগড়ে চলে যাচ্ছে। টম রেগে আগুন। ওদিকে জেরি একটা কেকের ভেতর ঢুকে পড়ল। কার্টুনে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে টুপুর, কিন্তু ভেতরের অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। চ্যানেল ঘোরায় সে, একটা গানের শো হচ্ছে একজায়গায়, শাড়ি বিক্রি করছেন একজন আন্টি, বৃষ্টির খবর দেখাচ্ছে কোথায়। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ। বাবা-মা দুজনেই এসেছেন একসঙ্গে। এত তাড়াতাড়ি? আজ কি তবে ছুটি হয়ে গেছে অফিস? বাবার মুখ-চোখ গম্ভীর।
একটু অবাক লাগে তার। বাবা এসে তাকাচ্ছেন টিভির দিকে। তারপর বললেন, “আজকে আমার একটা খেলা দেখার আছে, টুপুর। তুমি বরং গেম খেলো, কেমন?” খেলা দেখার থাকলে বাবা অবশ্য এরকম করেন, তবে আজকে যেন একটু অন্যরকম সবকিছু। মা একবাটি পপকর্ন ধরিয়ে দেন টুপুরের হাতে, তারপর পাশের ঘরে যায় টুপুর। অন্যদিন বারান্দায় বসেই মাকে সে সারাদিনের গল্প শোনায়—স্কুলের গল্প, খেলার গল্প, কার্টুনের গল্প, মন্দাকিনী মিসের গল্প। আজ তো পাখিটার গল্পও আছে।
“তুমি পাখিটাকে দেখতে যাবে, মা? চলো না!” মায়ের হাত ধরে টুপুর।
মা হালকা হাসেন, “তুমি এখন গেম খেলো, সোনা। আমার একটা কাজ আছে। আমি দেখে নেব।”
অন্যদিনের তুলনায় মাও যেন আজ একটু বেশি শান্ত। গেমটাতে মনোযোগ দেয় টুপুর। খুব নীচু আওয়াজে খবর চলছে বারান্দায়। বাবা বোধহয় ফোনে কথা বলছেন। এটা শহর গড়ার গেম, টুপুরের খুব প্রিয়। দশদিন ধরে একটা লাইটহাউস তৈরি হচ্ছে, আজকে খুলবে। তাড়াতাড়ি ট্রেনে পিচ আর টমেটো তুলে দেয় সে, এতে যা টাকা পাওয়া যাবে, তাই দিয়ে একখানা শপিং সেন্টার বানাতে পারবে সে। ঠাকুমা মাঝে মাঝে বলেন, “কী গো দিদি, আজকে কী রান্না হচ্ছে তোমাদের রেস্টুরেন্টে?”
খেলতে খেলতে কখন ছ-টা বেজে গেছে, খেয়াল নেই। গাছে জল দিতে হবে তো! আস্তে আস্তে জল ঢালে টুপুর, রোদের আঁচে একটা পাতা একটু নুয়ে পড়েছে বোধহয়, জল ছিটিয়েও দেয় সে তাই। আর কী করা যাবে? যা আছে, তা-ই নিয়েই যেতে হবে কাল। বারান্দায় কোথাও একটা বন্যা নিয়ে গল্প চলছে। অন্যদিন রান্না করতে করতেই আলোচনা হয়, আজ রান্নাঘরে আলো বন্ধ। চুপিসারে উঁকি দিয়ে দেখে টুপুর, দরজার এপারে রাখা আছে ঝুড়িখানা, পাখির ছানাটা ঘুমোচ্ছে দেদার। বাবার ফোন বেজে উঠল। বাবা বলছেন, “সে কী? বাঁশতলি পর্যন্ত? আর মুকুলপুরের ব্রিজটা?” বাঁশতলি, মুকুলপুর সব তাদের গ্রামের বাড়ির দিকেই। কী হয়েছে, কে জানে!
ট্রেন এবার দেড়শোটা ডিম আর একশো ক্যান দুধ চাইছে। গেমে মন বসছে না টুপুরের। ঠাকুমার সঙ্গে কথা হয়নি কাল থেকে। ওই মুকুলপুরের মোড়েই তো মাটির বেহালা বাজান শান্তিদাদু, আর তারপর পাথরঘাটা, জলেশ্বরী মন্দির, গ্রামের বিশাল অশ্বত্থগাছটা। তার ওই পাশে দেখা যায় ঘন তাল-হিজল-শ্যাওড়া বন, নীচে হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে শিলাবতী। শিলাবতী বর্ষার জলে পুষ্ট নদী, বারোমাস মুখচোরা থাকে, খালি বৃষ্টি পড়লেই ভারী ছটফটে হয়ে যায়। ঠাকুমা বলেন, আগে নদী আরও দূরে ছিল, হেঁটে যেতে হত কয়েক ক্রোশ। নদী কি ধীরে ধীরে মানুষের কাছে চলে আসে?
ফোনটা রেখে ঘর থেকে বেরোয় সে। গেম খেলায় মন বসছে না আর। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, পাখিটা রাতে ওখানেই থাকবে কিনা। কিন্তু বারান্দায় পা দিতেই অবাক হয়ে গেল টুপুর। বাবা-মা দুজনেই চুপ করে বসে আছেন। মায়ের চোখ ভেজা-ভেজা কেমন। অজানা আতঙ্কে শিউরে ওঠে সে, মায়ের হাত ধরে বলে, “কী হয়েছে, মা?”
মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বাবা বলেন, “তুমি পড়তে বোসো, টুপুর। চিন্তা কোরো না।”
টুপুর কান্না আটকাতে পারে না আর, কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করে, “ঠাকুমা কোথায়, বাবা? আমি ঠাকুমার কাছে যাব, ঠাকুমার সঙ্গে কথা বলব।”
“ওদিকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে তো টুপুর, তাই ঠাকুমার ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। বৃষ্টি থেমে গেলেই আমরা ঠাকুমার কাছে যাব, কেমন?” বলেন মা।
টুপুর মেঝেতে বসে পড়ে। সে আর ছোটো নেই, সে সব বোঝে। ঠাকুমার কিছু হয়েছে, গ্রামের বাড়িতে বন্যা এসেছে। এক্ষুনি ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে টুপুরের, ঠাকুমাকে হাত ধরে ফিরিয়ে নিয়ে সে চলে আসবে। বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে সে, “আমাদের গ্রামের বাড়িটা তো অনেক উঁচুতে, ঠাকুমা নিশ্চয়ই ছাদের ঘরে আছেন, বলো বাবা? ছাদের ঘরে জল ঢুকতে পারবে না। পারুলপিসির একটা নৌকো ছিল, যদি ঠাকুমা ওতে করে কোথাও চলে যান? হতেও তো পারে।”
বাবা চশমা খুলে বলেন, “তা-ই হবে। মা নিশ্চয়ই কোথাও চলে গেছে।”
কাঁদতে কাঁদতে সংবিত ফেরে টুপুরের, ঠাকুমা কি কুসুম ঠাকুমার বাড়ি যেতে পারেন না? বাবাকে বলে সে বারবার।
“কুসুম ঠাকুমা, মানে মায়ের বান্ধবী? কই, আমাদের তো কখনও বলেনি মা!” অবাক হয়ে যান বাবা।
দেখতে দেখতে দু-ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। ন-টার সময়ে মা উঠে বললেন, “তুমি এবার কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো, টুপুর। কাল তোমার প্রোজেক্ট জমা দেওয়া আছে।” প্রোজেক্ট? এই প্রোজেক্টের জন্যই তো ঠাকুমার উপর কত রাগ করেছিল সে। গাছটার দিকে তাকায় টুপুর, ঠাকুমার কত সাধের বয়াম থেকে এসেছে ও।
“আমি আর কক্ষনো প্রোজেক্ট নিয়ে ঠাকুমার সঙ্গে ঝগড়া করব না, আমার শুধু ঠাকুমাকে চাই।” চোখমুখ ঢেকে ফেলে সে। ঠাকুমা বাড়ি ফিরলে বয়ামের সব বীজ, সব বাল্ব পুঁতে ফেলবে সে। ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, ঠাকুমার বাগান আবার বেঁচে উঠবে এ-বাড়িতে, চন্দনগাছের জন্য ভরা বর্ষায় গ্রামের বাড়ি চলে যেতে হবে না ঠাকুমাকে। হাতজোড় করে প্রার্থনা করে সে বারবার।
বাবা ক্রমাগত চেষ্টা করলেন। ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে গেছে ওদিকে, জলেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত দুপুরবেলা ওপারে এসেছিলেন; তিনি বলেছেন, আজন্ম এমন বন্যা দেখেননি তিনি কখনও, যাতে মন্দিরের সিঁড়ি পর্যন্ত জল উঠে যায়। অথচ তৎকালীন জমিদার নাকি দেবীর আদেশ পেয়েছিলেন ওই মন্দিরখানা বানানোর, যাতে বর্ষায় ভক্তরা যখন ভয়ে নদীর কাছে যেতে পারে না, তখন তারা দেবীর কাছে এসে নিরাপদে থাকতে পারে। তখন জলেশ্বরীর পতাকা ধরে নাক-বরাবর তিন ক্রোশ হাঁটলে তবে নদী পড়ত। ‘বিপ্লব’ বলে গ্রামের একটি ছেলে পাশের শহরের কলেজে পড়ে, সে জানিয়েছে, ঠাকুমার সঙ্গে পরশু তার দেখা হয়েছিল, তবে ঠাকুমা নাকি খুব চিন্তায় ছিলেন।
মাঝরাতে স্বপ্ন দেখল টুপুর। ঠাকুমার সঙ্গে নৌকো করে বেড়াতে গেছে সে কোথায় যেন, জল বড়ো শান্ত। ঠাকুমা তাকে গল্প শোনাচ্ছেন, ভূতের গল্প, পরিদের গল্প। ঠাকুমার বাঁ হাতের উল্কিটা সবুজ হয়ে উঠেছে রোদ পড়ে। ঠাকুমা হেসে হেসে বলছেন, “এটা? এটা ধানশিস আর ওটা গমশিস। সেবার মেলায় আমি করালাম... তখন তুমি হওনি, দিদি।” পাশে আরেকটা নৌকো যাচ্ছে, তাতে বোঝাই লাল শাপলা ফুল। এমনিতে শরৎকালে শাপলাফুল বিক্রি হয় তাদের স্কুলের কাছে। ঠাকুমা বলেন, বাঁশতলির জেলেরা গোছায় গোছায় ফুল তুলে পাঠিয়ে দেয়, রাধাষ্টমীতে লাল শাপলা লাগে যে। ওই নৌকোয় ওটা কে? চেনা-চেনা লাগে, কিন্তু চিনতে পারে না টুপুর। দূরে একটা গাছে রাশি-রাশি সুতো বাঁধা। তারপর দেখে, কে যেন দাঁড়িয়ে আছে তাদের বারান্দায়, বলে, “তুমি চাইলে, তাই আমি ওদের বলে দিলাম।” ওর কাঁধে ওটা কী? তারপর সে দেখে, সে তাদের গ্রামের বাড়ির বিছানায় শুয়ে আছে, মেঝেতে সুপুরি কুচোচ্ছে কে যেন। ঠাকুমা বললেন, “গাছের মেয়ে, গাছের মেয়ে, গাছের মেয়েরা ভারি ভালো।” ঘরের বাইরে কে যেন নড়াচড়া করছে না? চমকে উঠে বসে সে। দরজা খুলে বারান্দায় আসে। কোথাও কেউ নেই, কাকের ছানাটি ঘুমোচ্ছে অকাতরে। গাছটাও একইরকম, নুয়ে-পড়া পাতাটি সোজা হয়েছে এতক্ষণে। টবটাকে আঁকড়ে ধরে পাখিটির পাশে বসে টুপুর। বসেই থাকে।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠেছে। বোঝার আগেই ছুটে যায় সে। অচেনা নম্বর একটা। কাঁপতে কাঁপতে “হ্যালো” বলল সে। তারপরেই হাউহাউ করে কাঁদে সে। ফোনের ওপারে ঠাকুমা। ঠাকুমা বলেন, “কী হয়েছে দিদি, কী হয়েছে? এতক্ষণে বৃষ্টি থামল বলে কথা, তারা উঠেছে, নেটওয়ার্ক এল।”
বাবা-মা ছুটে আসেন। বাবা বলেন, “আচ্ছা আচ্ছা... কোথায় ছিলে? কোথায়? ও মনে পড়েছে, ছোটোবেলায় কত গেছি। না না... বন্যা কমলেই তোমাকে আমরা নিয়ে আসব, মা।”
মাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে টুপুর, মা বলেন, “সব ভয় কেটে গেছে, তুমি আরেকটু রেস্ট নেবে, টুপুর? আমি কি মিসকে বলব, তুমি স্কুলে যেতে পারবে না? কাল থেকে তো খাওয়া-ঘুম বন্ধ ছিল।”
টুপুর মাথা নাড়ে, “না, ছ-টা বাজে, সাতটায় বাস আসবে। আমাকে রেডি হতে হবে। তুমি আমার চুল বেঁধে দেবে তো আজ, মা? আমি বাঁধতে গেলে উলটো হয়ে যায়।”
“কেন দেব না? ঠিক দেব,” চোখ মোছেন মা।
টবটাকে জড়িয়ে ধরে বাসে ওঠে সে। আজ বাসে রঙের বাহার বসেছে যেন। মোনার গাছে টুকটুকে লাল ফুল ফুটেছে, স্বাগতার সাদা। ঝিলিকের গাছখানা ভারী লম্বা, ঝিলিকের মতোই, কিন্তু ফুল ফোটেনি। তাই নিয়েই হাসাহাসি করছিল সবাই। টুপুরকে দেখেই চুপ করে সবাই। টুপুর নিজের সিটে বসে ডানদিকের বিনুনিটাকে সামনে এনে রাখল, তারপর মোনার দিকে তাকিয়ে বলল, “অল দ্য বেস্ট”। মোনাও ঠিক বুঝতে পারেনি, কী হয়েছে।
মন্দাকিনী মিস অবশ্য ভারী খুশি হয়েছেন এত গাছ দেখে। তবে টুপুরের গাছটা নিয়েছেন তিনি, কিন্তু কিছু বলেননি। টুপুর এতেই খুশি। আশ্চর্যের ব্যাপার, মোনা বা স্বাগতা নয়, ফার্স্ট হয়েছে বি সেকশনের বিতস্তা। খুব অল্প সময়ের মধ্যে খুব জটিল ধরনের একখানা অর্কিড নাকি ফোটাতে পেরেছে সে। নিজের হাতে পুরস্কার দিয়েছেন তাকে মন্দাকিনী ম্যাম। মিমির হলুদ জিনিয়ারও প্রশংসা হয়েছে অনেক।
চন্দ্রা মিস আজকে পড়াচ্ছেন ‘এল নিনো’ আর ‘লা নিনা’-র ব্যাপারে। একমনে লিখছিল টুপুর, এমন সময়ে একজন দিদি এসে বলল, মন্দাকিনী মিস রোল নম্বর নাইন, টুপুরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ধীরে ধীরে দরজায় নক করে টুপুর, “আসব মিস?”
মিস বলেন, “এসো, এসে এখানে বোসো।” চুপচাপ মিসের সামনে চেয়ারে বসে সে। টেবিলে তার গাছটা।
“তুমি এই গাছটা কোথায় পেলে, টুপুর?” টুপুর চুপ করে থাকে খানিকক্ষণ। তারপর বলে তার ঠাকুমার বয়ামের কথা, কুসুম ঠাকুমার কথা, তাদের গ্রামের কথা। মিস শোনেন একমনে। তারপর বলেন, “তুমি জানো, এটা কী গাছ?” মাথা নাড়ে সে, তার জানা নেই।
“মাই চাইল্ড, এটা একটা শিরুই লিলি! তুমি জানো শিরুই লিলি কী?” উত্তেজনায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান মিস। “এটা মণিপুরের রাজ্যফুল। পৃথিবীর খুব কম জায়গায় পাওয়া যায় এই দুর্লভ প্রজাতির লিলি, বিপন্ন গাছের তালিকাতেও রাখা হয়েছে একে। আমাদের আবহাওয়ায় শিরুই লিলিকে বাঁচিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। তোমার কোনো ধারণা আছে, তুমি কী করেছ! ফ্যান্টাস্টিক!”
অবাক চোখে গাছটার দিকে তাকায় টুপুর, জানলার কাচ গলে পড়া রোদে পাতাটি সোজা হয়ে গেছে পুরোপুরি এতক্ষণে। ভেতরে ওটা কী? ষষ্ঠ পাতা আসছে নাকি? মিস বলে চলেছেন, “তোমাকে আমি নিজে পুরস্কার দেব। ‘গ্রিন থাম্ব’ বলে কিছু যদি থেকে থাকে, তা তোমার। নো নো, মাই চাইল্ড, তুমি পুরোপুরি গ্রিন। সবুজ।”
বাড়ি ফিরে দেখে সে, আজ বাবা-মা ছুটি নিয়েছেন। সম্ভবত ভালোমন্দ রান্না হচ্ছে কিছু। ব্রিজ থেকে জল নাকি নেমে গেছে, একটু পরেই বাবা বেরোবেন ঠাকুমাকে আনতে। টুপুরকে দেখে একগাল হাসলেন তিনি, “দেখো টুপুর, আমাদের গ্রামের কথা লিখেছে।” খবরের কাগজে বন্যা নিয়ে বেশ কিছু হেডলাইন। তাদের গ্রামের কথাও। পড়তে পড়তে এক জায়গায় চোখ আটকে যায় তার, জলেশ্বরী মন্দিরের পাশে বনের কারণে নাকি অনেকটাই আটকে গেছে বন্যার স্রোত। এক পরিবেশবিদ জানিয়েছেন, আশেপাশে অনেক গাছপালা কাটার কারণে নদী এগিয়ে আসছে সামনে। কিন্তু জলেশ্বরী মন্দিরের ওইপারে বিস্তীর্ণ তাল-হিজল-শ্যাওড়া বন থাকার কারণে তাদের শিকড়ের টানে অনেকটাই আটকানো গেছে ভাঙন। এতদিন অবহেলায় পড়ে থাকা গাছগুলো যে এভাবে তাদের প্রাণ বাঁচাবে রাতারাতি, ভাবতেই পারেননি গ্রামবাসীরা।
“মা তো সেই বড়ো কুসুমতলায় ছিল। মনে নেই তোমার? সেই যে অনেক পুরোনো গাছটা? ছোটোবেলায় আমরা দেখতাম, লোকে ওখানে সুতো দিয়ে নুড়ি বেঁধে আসত। কুসুমগাছটা নাকি সবার কথা শুনতে পায়। মায়ের খুব প্রিয় জায়গা ওটা। কতবার দেখেছি, মা ওখানে বসে আছে একাই।” বাবা মায়ের সঙ্গে গল্প করেন।
“তুমি চাইলে, তাই আমি ওদের বলে দিলাম,” স্বপ্নের এপার থেকে টুপুরের কানে বাজে। ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসে সে। সকালেই ঝুড়িটা রেখে গিয়েছিল সে। কাকের ছানাটি নেই, হয়তো বাড়ি ফিরে গেছে। চোখ বন্ধ করে ঝুড়ির ভেতরে হাত রাখে সে। বাচ্চা পাখির নরম ঝুরো পালক ছড়িয়ে আছে চারদিকে। তার মাঝখানে ওটা কী যেন? একথোকা গোলাপি ফুল? এই ফুলটা চেনে টুপুর। মন্দাকিনী মিস দেখিয়েছেন একটু আগে। ফুলটা কোথা থেকে এল, প্রশ্ন করবে না সে কাউকে। করার কোনো দরকার নেই।
আজ বরং সে একটা ছবি আঁকবে। গোলাপি ফ্রক পরা একটি মেয়ের ছবি। তার কাঁধে একটি ছোট্ট কাকের ছানা। ছবির নাম দেবে ‘গাছপরি’। কিংবা গাছেদের মেয়ে। গাছেদের মেয়েরা ভারি ভালো।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment