
উইন্ডসার ১৮৬৭
সুমন মিশ্র
এক
।। সিডনি
১৮৬৮।।
সিডনি অবজারভেটরির গেট
থেকে বেরিয়ে এসে বাইরের বাগানে দাঁড়ালেন জন টেবাট। তাঁর মাথায় সাদা লম্বাটে টুপি, পরনে কালো কোট। বয়স তাঁর চৌত্রিশের কোঠায়। সুদর্শন,
চোখে সর্বদা এক অদ্ভুত দূরমনস্ক দৃষ্টি। বয়স কম হলেও নিউ সাউথ ওয়েলসের
বিজ্ঞানীমহলে তিনি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট পরিচিত নাম। তাঁর ১৮৬১ সালের সেই বিখ্যাত
ধূমকেতুর আবিষ্কার তো সাগর পেরিয়ে লন্ডনেও শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। তিনি চারপাশটা একবার দেখলেন। কিছুটা দূরেই একটা ম্যাগপাই পাখি কিচিরমিচির করে লাফিয়ে
বেড়াচ্ছে। বহুদূরে বন্দরের জলের উপর সিগালের দল উড়ছে।
এই জায়গায় তিনি যতবার আসেন, ততবারই তাঁর মনে
এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। সিডনির মহাকাশ পর্যবেক্ষণ
কেন্দ্রটি যেখানে অবস্থিত,
সেই জায়গাটির নাম ‘অবজারভেটরি হিল’। সিডনি বন্দরের লাগোয়া এই জায়গাটি এই
এলাকার সবচেয়ে উঁচু স্থান। এখানকার আকার অনেকটা কচ্ছপের পিঠের
মতন, ফলে
এখান থেকে পুরো সিডনি বন্দরকে খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়।
আজ এমনিতেই দিনটা খুব
সুন্দর, নীল আকাশে গুটিকয় সাদা মেঘের টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে। চরাচর স্নিগ্ধ রোদে ঝলমল করছে। বাতাসে এক অদ্ভুত শৈত্য, বন্দরের দিক থেকে
নোনা হাওয়া ভেসে আসছে।
সামনে যতদূর চোখ যায়, সিডনির বন্দর সংলগ্ন বসতি
এলাকা। বেলেপাথরের
তৈরি ছোটো-বড়ো অসংখ্য কুঁড়েঘর ও বাড়ি কোথাও একে অন্যের সঙ্গে গায়ে
গা এলিয়ে, আবার কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে
আছে। বাড়িঘরগুলি যেন ধাপে ধাপে বন্দরের দিকে নেমে গিয়েছে।
সকালের উজ্জ্বল রোদে স্নান
করে সেগুলি যেন আরও মায়াময় হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, কোনো নিপুণ শিল্পী
ক্যানভাসে তুলি দিয়ে হলদে রং ছড়িয়ে দিয়েছে। এখানে বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন শ্রেণির অসংখ্য
মানুষ বসবাস করেন। এঁদের মধ্যে যেমন সরকারি আধিকারিকেরা আছেন, তেমনই আছে বন্দরে
কাজ করা শ্রমিকের দল, খালাসি, সাধারণ দোকানি,
জাহাজি, ডাক্তার, নার্স,
এমনকি পুলিশও। আর আছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট তৈরিতে
নিযুক্ত অসংখ্য বন্দি শ্রমিক। সারাদিন তাই পুরো এলাকা জুড়ে হইহল্লা, ব্যস্ততা লেগেই থাকে।
দূরে বন্দরের নীল জলে রোদ
চিকমিক করছে। হাওয়ার
খেলায় জলে অসংখ্য ছোটো-বড়ো ঢেউয়ের আলপনা জেগে উঠছে। অসংখ্য জাহাজ ভিড় করেছে বন্দর জুড়ে। কিছু কিছু আবার পাল তুলে, ঢেউয়ের তালে তালে
বন্দর ছেড়ে মন্দ্রগতিতে এগিয়ে চলেছে, দূরে ‘সিডনি হেড’ ছাড়িয়ে গভীর সমুদ্রের উদ্দেশে।
বন্দরের অপর তীরে দেখা যাচ্ছে
অসমতল ঢেউ-খেলানো সিডনির বেলেপাথরের তটভূমি। সেখানেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বসতির
চিহ্ন।
জন টেবাট সেদিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে
তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর
নিজের শহর উইন্ডসার হৃদয়ের অনেক কাছে থাকতে পারে, কিন্তু সিডনির একটা আলাদা প্রাণোচ্ছল
সৌন্দর্য রয়েছে—একথা তিনি বরাবরই স্বীকার করেন। ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের
প্রধান জর্জ রবার্টস স্ম্যালে তাঁর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। সঙ্গে রয়েছেন
জর্জের সহকারী হেনরি চেম্বারলেন রাসেল।
জর্জ হেসে বললেন, “কী
ভাবছ,
জন?”
জন টেবাট জর্জের দিকে
তাকিয়ে হাসলেন, “ভাবছি আপনাদের সৌভাগ্যের কথা, রোজ এমন সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করতে
পারেন।”
জর্জ কৌতুক-মেশানো গলায় বললেন,
“এই দৃশ্য তো তুমিও রোজ দেখতে পেতে, যদি পর্যবেক্ষণ
কেন্দ্রের প্রধানের দায়িত্বটা তুমিই নিতে; কিন্তু, তুমি তো রাজিই ছিলে না।”
জন বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “আমি
আমার নিজের হাতে তৈরি উইন্ডসারের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে কাজ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য
বোধ করি। এই পদটি গ্রহণ করলে আমার অবস্থা খাঁচায় বন্দি পাখির মতো হয়ে যেত। তার চেয়ে এই বরং ভালো
আছি...”
জর্জ এবার রসিকতার সুরে
বললেন, “যেহেতু তুমি মুক্ত থাকবে বলেই আমি এই পদটা পেয়েছি, তাই আমি আজীবন তোমার
কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।”
কথাটা শুনে সবাই হেসে
উঠল।
রাসেল এবার বললেন, “তবে
একথা মানতেই হবে, সিডনিতে সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকতে পারে; কিন্তু মিঃ টেবাট উইন্ডসারে নিজের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে কাজ চালিয়ে যে-সমস্ত কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তা সত্যিই তুলনাহীন।”
জর্জ বললেন, “গত বছরে
উইন্ডসারে বিধ্বংসী বন্যার সময়ে জন যেভাবে জলস্তর পরিমাপ এবং আবহাওয়ার খুঁটিনাটি
তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছিলেন, তা এককথায় অনবদ্য।”
জন মৃদু হেসে বললেন, “আমি
আমার কর্তব্যটুকু করেছিলাম। আমার নিজস্ব পদ্ধতিতে
পর্যবেক্ষণের কাজ চালিয়ে আমি যখন বুঝেছিলাম দুর্যোগ পরিস্থিতির অবনতির সম্ভাবনা
আছে, তখন আমি প্রথমেই আমার পরিবার ও যন্ত্রপাতিকে সুরক্ষিত জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাই।
তারপর বন্যার জলস্তর বৃদ্ধি থামতেই নৌকা নিয়ে আমার ‘পেনিনসুলা এস্টেটে’ ফিরে
প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করি। ঝুঁকি ছিল, কিন্তু কর্তব্য পালন তো করতেই হবে।”
“শুনেছি, অনেক মানুষের
প্রাণহানি ঘটেছিল সেই বন্যায়।” রাসেল বললেন।
জন দুঃখ-মেশানো কণ্ঠে
বললেন, “এত বিধ্বংসী বন্যা উইন্ডসার আগে দেখেনি। আমারই পরিচিত একজন ছিল, যে
সপরিবারে নিখোঁজ হয়েছিল সেই ভয়াবহ বন্যায়।”
“কী নাম ছিল তাঁর?” রাসেল
সহমর্মিতার গলায় বললেন।
“আমার বহু পুরোনো
বন্ধু... গ্যারি শেফার্ড।”
রাসেল আরও কিছু বলতে
যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ জনের চোখ আটকে
গিয়েছে নীচে ‘গ্যারিসন চার্চ’-এর সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি লোকের দিকে। তিনি চোখ
কুঁচকে ভালো করে লোকটাকে দেখার চেষ্টা করলেন। তারপরে অবিশ্বাসের গলায়
বললেন, “অসম্ভব! এ কী করে হতে পারে! অবিকল সেই হাঁটার ভঙ্গি! শেষ যেদিন দেখেছিলাম, তার পরনেও এই একই পোশাক ছিল...!”
“কার কথা বলছেন?” রাসেলও
উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলেন।
“গ্যারি!”
“অ্যাঁ!” রাসেল
অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালেন, “কোন গ্যারি? যাঁর কথা জন
এইমাত্র বলছিলেন?”
জন যেন ততক্ষণে আর কারও কথা শুনতে পাচ্ছেন না। তিনি “গ্যারি,
গ্যারি” বলে চেঁচিয়েই চলেছেন। জনের চিৎকার চার্চ অবধি যেতে যেতে
ফিকে হয়ে যাওয়ার কথা। তাও লোকটা যেন একবার থমকে দাঁড়াল, তারপর দ্রুত ‘লোয়ার ফোর্ট রোড’ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
জনও সঙ্গে সঙ্গেই অবজারভেটরি
হিলের ঢালু রাস্তা ধরে দৌড়োতে শুরু করলেন।
জর্জ চিৎকার করে বললেন, “জন, দাঁড়াও! আমি তোমার ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ানকে খবর পাঠাই।”
অবজারভেটরি হিল থেকে একটি
রাস্তা পাক খেয়ে নীচে গ্যারিসন চার্চের কাছে লোয়ার ফোর্ট রোড আর আর্গাইল স্ট্রিটের
সংযোগস্থলের দিকে নেমে গিয়েছে। সেই রাস্তা ধরে ছুটতে ছুটতে জন চিৎকার
করে বললেন, “হ্যাঁ, তাকে ডেকে রাখুন। আমি একটু পরেই ফিরে আসছি।”
রাসেল বিস্মিত গলায় বললেন, “অদ্ভুত খামখেয়ালি
মানুষ তো!”
জর্জ হেসে বললেন, “জন আসলে জিনিয়াস। না হলে এত কম বয়সে এত খ্যাতি
জুটত না। আর
তুমি তো জানোই, জিনিয়াসরা একটু…”
জন ততক্ষণে অবজারভেটরি হিলের
পাদদেশে পৌঁছে গিয়ে পাথুরে দেয়ালে ভর দিয়ে হাঁফাচ্ছেন। পাশেই অসংখ্য ছোটো-বড়ো বেলেপাথরের চাঁই
পড়ে আছে। বেশ
কিছু বন্দি এখনও পাথর কাটার কাজ করছে। রাস্তার পাশে তাদের কুঁড়েঘরগুলি সার
দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে
পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকা বেলেপাথরের উঁচু দেয়াল কেটে রাস্তা তৈরি হয়েছে, এখন তার উপর সেতু
তৈরির কাজ চলছে।
জন দ্রুত লোকটিকে অনুসরণ করে
এগিয়ে চললেন। লোকটি
জনের থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে ছিল। একবার সে পিছন ফিরে জনকে আসতে
দেখেই আরও দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
তাকে ধরার জন্য জন এবার
দৌড়োতে শুরু করলেন।
পাথুরে রাস্তা যতই
বন্দরের দিকে এগিয়ে চলল,
ততই ক্রমশ সরু ও ঘিঞ্জি হয়ে উঠল। ক্রমশ লোকজনের ভিড়
বাড়তে শুরু করল। গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ার, ঘোড়ায়-টানা
গাড়ির জন্য বারে বারে জনের গতি রুদ্ধ হতে শুরু করল। এত ভিড়ের মাঝে দ্রুত পথ চলা
সত্যিই মুশকিল।
কিন্তু লোকটা তার মধ্যেই
সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে দিব্যি এগিয়ে চলেছিল। জন লোকজনকে ঠেলে যতটা সম্ভব দ্রুত তার
কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তারপর হঠাৎই লোকটা মূল রাস্তা
ছেড়ে বন্দরে যাওয়ার একটা সরু রাস্তায় ঢুকে গেল। জনও তার পিছু নিয়ে সেই
রাস্তায় ঢুকে পড়লেন।
সেখানে একটা পাথরের
সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নীচের রাস্তার দিকে। লোকটা সেই সিঁড়ি দিয়েই দ্রুত নেমে
যাচ্ছিল। কিন্তু তাড়াহুড়োয় আচমকা তার পা পিছলে গেল এবং সে সিঁড়ির উপর থেকে
গড়িয়ে নীচে পড়ে গেল।
লোকটার ভালোই চোট
লেগেছিল। কারণ জন যতক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন, তখনও লোকটা
মাটিতে বসে কাতরাচ্ছে। জন লোকটার কলার চেপে ধরে তাকে টেনে দাঁড় করালেন। তারপর ক্রুদ্ধ স্বরে
বললেন, “এতদিন কোথায় ছিলে, গ্যারি? আমরা সবাই ধরে নিয়েছিলাম, তুমি মৃত। বন্যার
পর থেকে চির-নিখোঁজের তালিকায় তোমার আর তোমার পরিবারের নাম ঢুকে গিয়েছে, আর তুমি
এখানে সিডনিতে ঘুরে বেড়াচ্ছ? এক বছর ধরে তোমার কোনো খবর
নেই। কী করছিলে এতদিন?”
লোকটা অগোছালো দৃষ্টিতে
একবার তাকাল, তারপর অপ্রস্তুত স্বরে বলল, “আমায় ছেড়ে দিন। আপনি ভুল করছেন, আমি গ্যারি নই।”
লোকটার গালভর্তি কয়েকদিনের
না-কামানো দাড়ি, গালগুলোও ভেঙে
গিয়েছে, চোখটাও কোটরে বসে গিয়েছে। হঠাৎ দেখলে সেই পূর্বপরিচিত
মুখের সঙ্গে মেলাতে অসুবিধা হতেই পারে, কিন্তু জনের কোনো ভুল
হচ্ছে না; তিনি তাঁর পুরোনো বন্ধুকে কখনোই অন্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারেন না। আর এই
কণ্ঠস্বর তো তাঁর বহুদিনের চেনা।
তিনি প্রায় গর্জে উঠলেন, “চুপ! আর একটাও কথা নয়। গত বছরের বন্যার সময়ে তোমার ঠিক কী হয়েছিল? কেন এভাবে সিডনিতে লুকিয়ে রয়েছ? উইন্ডসারে ফেরোনি
কেন?”
পরপর প্রশ্নের দাপটে লোকটা
সম্ভবত বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল। সে জনকে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর এলোমেলো গলায় বলল, “উইন্ডসারে ফিরিনি,
কারণ উইন্ডসারে ফিরতে চাইনি।”
তার চোখদুটো তখন যেন রাগে
ফেটে পড়ছে।
জন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই গ্যারি
অসহায়ের মতো মাটিতে বসে পড়ল। তারপর হা-হুতাশের ভঙ্গিতে চিৎকার
করে বলতে শুরু করল, “আমি ফিরতে চাইনি, আমি
ওই অভিশপ্ত উইন্ডসারের মাটিতে ফিরতে চাইনি। ওখানে শয়তানের অনুচরের
বাস।”
গ্যারির চোখে তখন আর কয়েক
মুহূর্ত আগের সেই রাগের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই। তার বদলে তখন তার দুই চোখ
বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুধারা।
গ্যারিকে দেখে জনের এবার খারাপই
লাগল। দেখেই
মনে হচ্ছে, বেশ কয়েকদিন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া হয়নি। চোখের দৃষ্টিটা কেমন এলোমেলো। আচ্ছা, মানসিক বিকার হয়নি
তো?
বন্যার সময়ে কী হয়েছিল গ্যারির
সঙ্গে! জনকে যে করেই হোক, তা জানতেই হবে।
তিনি তাঁর বন্ধুকে ধরে টেনে
তুললেন, তারপর পাশেই একটা সরাইখানায় নিয়ে গেলেন। আগে কিছু খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত
করা প্রয়োজন।
সরাইখানায় তখন তেমন একটা
ভিড় ছিল না। বন্দরে
নতুন আসা জাহাজের কিছু কর্মীরা দলবেঁধে খাওয়া-দাওয়া, হই-হট্টগোল করছিল। চারপাশটায় একটা আলো-আঁধারির পরিবেশ।
জন গ্যারিকে নিয়ে এককোনায়
গিয়ে বসলেন। গ্যারি আপনমনে চারপাশটা দেখতে দেখতে বিড়বিড় করতে লাগল।
খাবার পরিবেশন হতেই গ্যারি
কোনোরকম ভদ্রতার তোয়াক্কা না করেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল খাবারের উপর।
গোগ্রাসে কিছুক্ষণ খাওয়ার
পর যখন পেটের আগুন কিছুটা শান্ত হল, তখন সে শান্ত দৃষ্টিতে জনের দিকে একবার তাকাল। তারপর দূরমনস্ক গলায় বলল, “গত বছর বন্যার সময়ে
উইন্ডসারে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগই নেমে আসেনি, নেমে এসেছিল এক
ভয়ংকরর অভিশাপ।”
জন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। গ্যারি বাইরে বন্দরের সবজে-নীল জলের দিকে তাকিয়ে
নিজের গল্প শুরু করল।
দুই
।। উইন্ডসার ১৮৬৭।।
দুপুরের মিঠে রোদ ছড়িয়ে
পড়েছে পেনিনসুলা এস্টেটের বিস্তৃত বাগানের উপর।
ঠান্ডাটা এই বছর বেশ জাঁকিয়ে
পড়েছে। তার
সঙ্গে দোসর হয়েছে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ে আকাশের গায়ে
হলদে আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। জন টেবাট তাঁর বাড়ির দোতলার লম্বা বারান্দায় আরামকেদারায়
বসে পড়ন্ত বিকেলের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। তাঁর স্ত্রী জেন পাশেই রেলিংয়ে হেলান
দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
সামনে বিস্তৃত মাঠ। পাশে বড়ো বড়ো গাছগুলোতে পাখিদের নিরন্তর
কলকাকলি শোনা যাচ্ছে। সামনের রাস্তা দিয়ে সারাদিনের কাজের পর কয়েকজন কৃষক অলস গতিতে
বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে।
কয়েকটি দামাল ছেলে বাগানের
বেড়ার পাশ থেকে উঁকি-ঝুঁকি মেরে জনের পর্যবেক্ষণাগারটিকে দেখার চেষ্টা করছিল। তাদের চোখে অসীম কৌতূহল। জন কিছু বলছিলেন না, বরং তিনি এই ঘটনাগুলো
চিরকালই বেশ উপভোগ করেন।
দূরে পালমার
স্ট্রিটের দিক থেকে একজনকে খুব হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখা গেল।
দূরত্ব অনেকটা হলেও জনের তাকে
চিনতে অসুবিধা হল না,
তাঁর ছোটোবেলার বন্ধু গ্যারি।
গ্যারিকে সিডনির পর্যবেক্ষণ
কেন্দ্রে কিছু জরুরি কাগজ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন জন, সঙ্গে সিডনির থেকে
কিছু জরুরি যন্ত্রপাতিও আনতে পাঠিয়েছিলেন। এসব ব্যাপারে গ্যারিকে তিনি চোখ বন্ধ
করে ভরসা করতে পারেন। দরকার পড়লে গ্যারি নিজের কাজ ফেলে রেখে প্রথমে জনের কাজ সম্পন্ন
করবে।
বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতেই
গ্যারি চিৎকার করে রসিকতার সুরে বলল, “আমি এদিকে সিডনি আর উইন্ডসার ঘুরে মরছি,
আর এখানে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বারান্দায় বসে শীত উপভোগ করছেন।”
জন সঙ্গে সঙ্গে দোতলা থেকে
চেঁচিয়ে বললেন, “তোমাকেই বা কে আটকেছে? চলে এসো দোতলায়, একসঙ্গে চা খাওয়া যাবে।”
গ্যারির কোনোদিনই চা এবং আড্ডায়
আপত্তি থাকে না। সে দ্রুত পায়ে উঠে এল দোতলার বারান্দায়।
জেন হাসিমুখে কুশল বিনিময়
করে চলে গেল চা বানাতে।
গ্যারি প্রথমেই কাগজপত্র-যন্ত্রপাতি,
যা সিডনি থেকে বয়ে এনেছিল, সব বুঝিয়ে দিল জনকে। তারপর শুরু হল দুই বন্ধুর আড্ডা। সিডনি বন্দরের কী অবস্থা, যাতায়াত-ব্যবস্থার কী দুরবস্থা, সেখানকার প্রশাসন কতটা অদক্ষ,
এই নিয়ে গ্যারি অনর্গল বলেই চলল। এমনকি এও বলল যে, তাকে ধরেবেঁধে নিয়ে
গেলেও সে সিডনিতে থাকবে না, তার জন্য এই উইন্ডসারই সবচেয়ে ভালো।
আড্ডা চলতে চলতে বিকেল গড়িয়ে
গেল। দু-বার চা-ও এসে গেল। তখনও যেন কথা শেষ হয় না।
গ্যারি একবার বলল, “পূর্ব উপকূলে ঝড়-ঝঞ্ঝার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সিডনির আকাশ তো গতকাল থেকে
ফ্যাকাশে হয়ে রয়েছে। এখানেও সম্ভবত বৃষ্টি শুরু হল বলে।”
জন মাথা নাড়লেন। তাঁর বিশ্লেষণ করা আবহাওয়ার তথ্যও
একই কথা বলছে। তিনি
একবার ইঙ্গিতে গ্যারিকে আকাশের কোনার দিকে দেখতে বললেন। সেদিকে ইতিমধ্যেই কালো মেঘ জমতে শুরু
করেছে।
জন গম্ভীর গলায় বললেন, “আমারও মনে হয়,
কাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হবে। তিন বছর আগের বন্যার কথা তো তোমার
মনেই আছে। যদি
দেখো বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েই চলেছে, তাহলে সময় থাকতে নিরাপদ জায়গায় সরে যেয়ো। কোনোরকম ঝুঁকি নিয়ো না।”
গ্যারি তার মাফলারটা ভালো
করে জড়িয়ে নিতে নিতে হেসে বলল, “আরে, আমার বাড়ি তো অপেক্ষাকৃত উঁচু
জায়গায়, গতবারও বন্যার জল অতটা উঠেনি। বরং এই ‘পেনিনসুলা এস্টেট’
অপেক্ষাকৃত নীচু জমিতে রয়েছে। আমার তো চিন্তা হচ্ছে, এখানে জল না ঢুকে
যায়!
তোমার এত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি-নথিপত্র এখানে
রয়েছে, সাবধানে রেখো।”
জন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ থমকে
গেলেন। একটা শোঁ-শোঁ করে তীক্ষ্ণ শব্দ কানে এল দুজনেরই।
জন চোখ কুঁচকে কিছু একটা দেখার
চেষ্টা করলেন, তারপর চেয়ার থেকে উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
গ্যারি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা
করল, “হঠাৎ কী হল?”
জন উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “তুমি দেখতে পেলে
না?”
“কী দেখব!” গ্যারির গলায় বিস্ময়।
“একটা আলোর রেখা,
যেন একটা আগুনের টুকরো, আকাশ বেয়ে নীচে নেমে গেল সোজা
তোমাদের খামারবাড়ির দিকটায়।”
“কই, আমি দেখলাম না তো!”
জন সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, “খেয়াল করোনি হয়তো। কিন্তু আমি নিশ্চিত, একটা আগুনের গোলা খুব দ্রুত
নেমে গেল তোমাদের খামারবাড়ির দিকটায়। কিছুটা ধূমকেতুর মতোই দেখতে, কিন্তু ধূমকেতু এত
দ্রুত যায় না। হয়তো, উল্কাপাত হতে পারে। তবে আমি নিশ্চিত, নদীর ওই পাড়ে তোমাদের
জমির দিকেই ওটা পড়েছে। তুমি বরং কাল সকালে একবার দেখো ওদিকটায়। তেমন হলে আমাকে খবর দিয়ো, আমিও যাব।”
“আমার তো মনে হয়,
পুরোটাই তোমার চোখের ভুল। তেমন হলে আমিও নিশ্চয় দেখতে পেতাম। মাটিতে পড়লে অন্তত একটা শব্দ তো হত!”
“জানি না, তবে চোখের ভুল নয়।” জন জোর দিয়ে বললেন।
গ্যারি রসিকতা করে বলল, “তা বটে! ওসব আর আমার চোখে পড়বে কী করে! ১৮৬১-র পর থেকে সমস্ত ধূমকেতু, গ্রহাণু, উল্কাপাত শুধু জন টেবাটের জন্যই বরাদ্দ হয়েছে।”
জন এমনি সময় হলে এই রসিকতার
প্রত্যুত্তর অবশ্যই দিতেন,
কিন্তু আজ তিনি একটুও হাসলেন না। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, “অন্ধকার নেমে আসছে। তোমার আর দেরি করা উচিত হবে না। আজ রাতে আর কিছু খোঁজার দরকার নেই। প্রয়োজন হলে কাল সকাল সকাল গিয়ে
আমি তোমার সঙ্গে খোঁজ চালাব।”
অগত্যা গ্যারি আর কথা বাড়াল
না। বাইরে
দিনের আলো প্রায় নিঃশেষিত হয়ে এসেছে। আকাশের কোনায় মেঘটা ক্রমশ ছড়িয়ে
পড়ছে। মাঝে
মাঝে বিদ্যুতের চমকও দেখা যাচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়ার বেগটাও বেড়ে গিয়েছে
আগের থেকে।
গ্যারি ‘শুভরাত্রি’
জানিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এল জনের বাড়ি থেকে, তারপর হাঁটা লাগাল জর্জ স্ট্রিট লাগোয়া হক্সবেরি নদীর সেতুর দিকে।
নদীর এই পারটায় উইন্ডসার শহরে
তাও লোকজন কিছু রয়েছে। কিন্তু নদীর ওপারে গ্যারির খামারবাড়ির
আশপাশটা জনবিরল। পায়ে চলার পথের দু-পাশে দিগন্তবিস্তৃত ঢেউ-খেলানো শস্যখেত। বহু দূরে ছোটো ছোটো বিচ্ছিন্ন খামারবাড়ি
চোখে পড়ে। সন্ধের পর একা পথ চলতে গেলে কেমন গা ছমছম করে। শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে
থাকা প্রাচীন গাছের সারি, ঝোপঝাড়, কীটপতঙ্গের
ডাক মনের মধ্যে ভয় জাগায়।
গ্যারি দ্রুত পথ চলতে শুরু
করল। সেতু
পেরিয়ে কিছুটা এগোতেই সন্ধ্যার অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এল। সে সঙ্গে থাকা একটি কেরোসিন বাতি জ্বালিয়ে, সতর্ক দৃষ্টিতে আশপাশটা
দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল। ঠান্ডা ক্রমশ বাড়ছে। আকাশের তারাগুলো মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। হওয়ার বেগও বেড়ে গিয়েছে আগের থেকে।
ইথারদের খামারবাড়িকে পাশ
কাটিয়ে, নিজের খামারবাড়ি অবধি পৌঁছোতে গ্যারির আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগল।
রাতের আঁধার ততক্ষণে গভীর
হয়েছে। দূর
থেকে সে দেখতে পেল, তাদের বাড়ির জানলায় অপেক্ষারত এক রমণীর ছায়ামূর্তি।
গ্যারির দেরি দেখে তার স্ত্রী
এলিজাবেথ এতক্ষণ উৎকণ্ঠায় ছটফট করছিল। গ্যারিকে জমির প্রান্তের কাঠের দরজা
সরিয়ে ঢুকতে দেখে সে একটু আশ্বস্ত হল। সে দ্রুত দরজা খুলে লন্ঠন হাতে বেরিয়ে
এল।
গ্যারি সামনে আসতেই সে অনুযোগের
সুরে বলল, “তোমার এত রাত হল! আমি তো চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে
যাচ্ছিলাম।”
গ্যারি আমতা-আমতা করে বলল,
“সিডনি থেকে ফিরতে এত দেরি হয়ে গেল…”
এলিজাবেথ রেগে গিয়ে বলল, “আমি সব জানি। নির্ঘাত মিঃ টেবাটের বাড়িতে আড্ডা
দিতে গিয়ে তোমার দেরি হয়ে গিয়েছে। কেউ যে নিজের কাজ ফেলে বন্ধুর কাজ
নিয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারে, তোমাকে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।”
গ্যারি এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “আহ্! জন ব্যস্ত মানুষ, কত নামডাক তার। একটু সাহায্য চেয়েছে, সেটা করব না?”
“সে করো, তা বলে সংসারটাও তো দেখতে হবে। আমি একা-একা সারাদিন ধরে এখানে
রয়েছি। আশেপাশে
একটা লোক পর্যন্ত নেই। আমার ভয় করে না!”
“আহ্! তোমায় বলেছি তো, তেমন প্রয়োজন পড়লে উইলিয়ামের স্ত্রীর
সঙ্গে যোগাযোগ করবে। ওরা তো আমাদের প্রতিবেশীই, নাকি!”
“ইথারদের খামারবাড়ি
যেতেও তো বেশ কিছুটা রাস্তা একা হাঁটতে হবে। এত নির্জন চারিদিক, আমার দিনের বেলাতেই
গা ছমছম করে।” তারপর এলিজাবেথ একটু থেমে আবার রহস্যঘেরা গলায়
বলল, “এই যে সন্ধের মুখে খামারের দিক থেকে একটা প্রচণ্ড আওয়াজ
ভেসে এল, মাটিও একটু কেঁপে উঠল। মনে হল, কিছু যেন আকাশ থেকে
ভেঙে পড়েছে। গোরু, ভেড়া, মুরগিগুলো চিৎকার করছিল। কী যে হল, কিছুই বুঝতে পারলাম
না। এদিকে
তুমিও বাড়িতে নেই। অন্ধকার নেমে আসছে, একটু যে এগিয়ে দেখব, সেই উপায়ও নেই। কীভাবে যে এতক্ষণ কাটালাম, তুমি কী করে বুঝবে!”
এলিজাবেথের কথা শুনে গ্যারি
চমকে উঠল। আকাশ
থেকে কিছু ভেঙে পড়েছে!
তার মাথায় বিদ্যুৎশিখার
মতো খেলে গেল জনের কথাগুলো। জন বলেছিল, যেন একটা আগুনের গোলা
নেমে এসেছিল গ্যারির খামারবাড়ির দিকে। সে তখনই হাতের লন্ঠনটা তুলে ধরে একবার
খামারবাড়ির দিকে তাকাল। ওদিকটায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। সে খামারবাড়ির দিকে পা বাড়াতে যাবে, এমন সময়ে এলিজাবেথ
তার হাত চেপে ধরল।
তারপর করুণ স্বরে বলল, “এই রাত্রিবেলায় ওদিকে
গিয়ে আর কাজ নেই। কাল সকালে গিয়ে দেখো। আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম গিয়েছে। ভিতরে এসে হাত-মুখ ধুয়ে নাও। রাতের খাবারের ব্যবস্থা করছি।”
গ্যারি আর কথা বাড়াল না। সত্যিই সে আজ বড্ড ক্লান্ত।
কিন্তু, কিছুক্ষণ পরেই এক
অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটিয়ে গ্যারি সবে শুতে যাওয়ার আয়োজন করছে,
তখনই খামারবাড়ির মধ্যে থেকে একটা মুরগির আর্তনাদ ভেসে এল। সঙ্গে ভেসে এল বাকি
পশুপাখিদের ছটফটানির আওয়াজ।
এলিজাবেথ বিস্মিত গলায় বলল, “খামারের ভিতর কি
কোনো হিংস্র প্রাণী ঢুকল!”
গ্যারির চোখে তখন ঘুম নেমে
এসেছে, অনিচ্ছা-মেশানো স্বরে সে বলল, “রাতবিরেতে যত সব উৎপাত! দেখি, বন্দুকটা
নিয়ে একবার ওদিক থেকে ঘুরেই আসি।”
এলিজাবেথ বাধা দিল, “থাক, এত রাত্রে ওদিকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কাল সকালে দেখলেই হবে।”
“হ্যাঁ, আর যেটা ঢুকেছে খামারে, সেটা আমার সব মুরগি খেয়ে শেষ
করুক আর কী!”
গ্যারি বন্দুক হাতে বেরিয়ে
গেল। আকাশ
ততক্ষণে মেঘে ঢেকে গিয়েছে। জোলো হাওয়া বইছে হু-হু করে। চারপাশে মসিকৃষ্ণ অন্ধকার। দূরে নদীর ওই পারে উইন্ডসার শহরের
বাড়িগুলিতে টিমটিম করে লন্ঠনের আলো জ্বলছে।
খামারের দিকে যেতে গ্যারির
গা ছমছম করছিল, কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। খামারে পশুপাখিগুলোকে আগে বাঁচানো
প্রয়োজন। সে
লন্ঠনটা উঁচিয়ে ধরল,
তাতে তার সামনে খুব স্বল্প পরিসর জায়গায় একটি ফিকে হলদে আলোর বলয়
ছড়িয়ে পড়ল।
সে সমস্ত মনোবল একত্রিত করে
সন্তর্পণে এগিয়ে চলল খামারের দিকে।
খামারবাড়ির দরজা খুলে ঢুকে
সে প্রথমেই একটা লন্ঠন জ্বালাল। সঙ্গে সঙ্গেই একটা ফিকে হলদে আলো চারপাশে
ছড়িয়ে পড়ল। চোখটা একটু সয়ে যেতেই সে লন্ঠন হাতে চারপাশটা ভালো করে খুঁটিয়ে
দেখল। অস্বাভাবিক
কিছু তো নজরে পড়ছে না। শুধুমাত্র জড়ো করা খড়ের গাদার সামনে একটি মুরগির নিষ্প্রাণ
দেহ পড়ে আছে।
গ্যারি সেটির সামনে গিয়ে
ভালো করে পরীক্ষা করল। মৃত মুরগিটির চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে।
গ্যারি চারপাশটা আবার ভালো
করে পরীক্ষা করল। হঠাৎ
ছাদের দিকে তার নজর পড়ল। সেখানে একটা বড়ো গর্ত হয়েছে। কোনো ভারী জিনিস যেন ছাদ ভেঙে ভিতরে
ঢুকে এসেছে। কী
জিনিস হতে পারে, যা কাঠের মোটা তক্তা দিয়ে তৈরি ছাদ ভেঙে দিয়েছে?
গ্যারির চোখ থেকে ততক্ষণে
সমস্ত ঘুম উধাও হয়ে গিয়েছে। তার মাথায় জনের কথাগুলোই খালি ঘুরছে। একটা আগুনের গোলা তার খামারবাড়ির
দিকে নেমে এসেছে।
সে তাড়াতাড়ি খড়ের গাদার
আশপাশের অংশটা খুঁজে দেখল। সামান্য খুঁজতেই জিনিসটা পাওয়া গেল। মাটির উপর অনেকটা জায়গা জুড়ে পোড়া
দাগ, জোরে
সংঘর্ষের ফলে সেখানে অগভীর গর্ত হয়ে গিয়েছে। আর ঠিক তার মাঝখানে পড়ে আছে একটা
বড়ো পাথরের টুকরো। কালচে
রং, গায়ে
অসংখ্য ছিদ্র।
গ্যারি কয়েক পা পিছিয়ে এল। পাথরটা ছুঁয়ে দেখার সাহস সে পেল না। এটা যদি জনের দেখা সেই
আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের রেখার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়,
তাহলে বস্তুটি অবশ্যই মহাজাগতিক। সেক্ষেত্রে এটিকে না ছোঁয়াই মঙ্গল। কাল সকাল হলেই
গ্যারি জনকে একবার খবর পাঠাবে। সে-ই একমাত্র পারে এই পাথরের রহস্য ভেদ
করতে।
তার পাশাপাশি এটাও জানা প্রয়োজন—গ্যারির খামারে মুরগির
মৃত্যুর জন্যও কি এই পাথরটাই কোনোভাবে দায়ী? কারণ, খামারে কোনো হিংস্র প্রাণী ঢুকেছিল বলে তো মনে হচ্ছে না। গ্যারি আর বেশি কিছু ভাবতে পারল
না। সে তাড়াতাড়ি খামারের লন্ঠনটা নিভিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। পিছনে পড়ে রইল চাকবাঁধা
অন্ধকার।
তিন
গ্যারি সারাটা রাত প্রবল উৎকন্ঠার
মধ্যে কাটাল, কিন্তু পরের দিন সকালে সে জনকে খবর পাঠাতে পারল না।
সকাল থেকেই আকাশ কালো করে
বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কখনও-কখনও বৃষ্টির বেগ বেড়ে যাচ্ছে। চরাচর যেন ঝাপসা পর্দার পিছনে ঢাকা
পড়ে গিয়েছে। এমন
আবহাওয়ায় অতটা দূরে গিয়ে জনকে খবর দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই জনকে এতটা দূরে
নিয়ে আসাও উচিত নয়।
গ্যারি চিন্তিতভাবে জানলা
দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসেছিল। আকাশে যা মেঘ জমে আছে, মনে হয় না আজ সারাদিনে
বৃষ্টি কমবে। কিন্তু পাথরটার যে কী ব্যবস্থা করা যায়, তা সে কিছুতেই ভেবে
কূলকিনারা করতে পারছে না।
এলিজাবেথের কাছে আপাতত সে
পাথরটার কথা গোপন করে গিয়েছে। কিন্তু খামারের ছাদটা অনেকটাই ভেঙে
গিয়েছে, সেটার মেরামতিরও প্রয়োজন। এমন অঝোরধারায় সারাদিন ধরে যদি বৃষ্টি
চলতে থাকে, তাহলে খামারের ভিতরে জল থইথই অবস্থা হয়ে যাবে।
সকালের প্রাতরাশ সেরে সে আবার
খামারবাড়ির দিকে হাঁটা লাগাল। বেশ কিছুটা দূরে নীচু জমিতে দেখা যাচ্ছে
ইথারদের খামারবাড়ি,
দূরে হক্সবেরি নদীতে জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। জল সেতুর কিছুটা নীচ দিয়েই বয়ে চলেছে। এদিকে বৃষ্টি থামার কোনো নামগন্ধই
নেই।
অঝোরধারায় বৃষ্টির মধ্যে
মই দিয়ে উঠে খামারের ছাদ মেরামত করা বেশ কঠিন কাজ। কিন্তু উপায় নেই, মেরামত না করলে পশুপাখিদের
জন্য রাখা খাদ্যশস্য জলে ভিজে যাচ্ছে। ছাদের ভাঙা জায়গাটা কোনোমতে
কাঠের তক্তা দিয়ে কাজ চালানোর মতো মেরামতি করে গ্যারি তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এল।
নেমে আসার সময়ে হঠাৎই তার
চোখ পড়ল পাথরটার দিকে। একমুহূর্তের জন্য তার মনে হল, কিছু একটা কেন্নোর
মতো প্রাণী যেন পাথরের মধ্যে থেকে উঁকি দিচ্ছে।
সে ভালো করে পাথরটার কাছে গিয়ে লন্ঠনের
আলোয় পরীক্ষা করল। না, সব তো ঠিকই আছে। হয়তো, সবটাই তার মনের ভুল। হয়তো, পাথরটা নিয়ে সে একটু
বেশিই চিন্তা করছে। গবাদি পশুগুলির সামনে গিয়ে সে ভালো
করে চারপাশটা দেখল। গোরু-ভেড়াগুলোকে খেতে দিল, গায়ে আদর করে
হাত বুলিয়ে দিল। তারপর আবার খামারের দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল।
ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ যেন আগের
থেকেও বেড়ে গিয়েছে। ইথারদের খামারবাড়িটা এখন অস্পষ্ট ধূসরভাবে দেখা যাচ্ছে। গ্যারি সময় নষ্ট না করে সোজা গিয়ে
বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল।
সেইদিন আর তেমন উল্লেখযোগ্য
কিছু ঘটল না। এত
বৃষ্টি গ্যারি তার জীবনে কোনোদিন দেখেনি। সে সারাদিন বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করল। যদি একবার অন্তত জনকে খবর দেওয়া যায়!
কিন্তু, বৃষ্টি থামল না। একসময়ে দিনের আলো ফুরিয়ে রাত্রি নামল। কনকনে শীত, তার মধ্যে বাইরে শুধুই
অঝোরধারায় বৃষ্টির শব্দ। দোতলার ছাদে একটানা জল পড়ার যে ঝমঝম
শব্দ হয়ে চলেছে, তাতে বাইরের অন্য কোনো শব্দ আর কানে আসার উপায় নেই।
পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙে জানলা
দিয়ে তাকাতেই গ্যারির মনে একটু আশার আলো ছড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টির বেগ আগের থেকে কিছুটা কমেছে।
সে চটপট প্রাতরাশ সেরে নিয়ে
হাঁটা লাগাল খামারবাড়ির দিকে। দূরে নদীর জল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি
পেয়েছে। সেতুটা
আর দেখা যাচ্ছে না। দু-কূল ছাপিয়ে জল চলে
এসেছে অনেকটাই।
খামারবাড়িতে ঢুকে চমকে উঠল
গ্যারি। মাটিতে
দুটো মুরগি মরে পড়ে আছে। কিন্তু দ্বিতীয় মুরগিটার গায়ে কালো কালো ওগুলো কী!
গ্যারি সামান্য এগিয়ে সতর্কভাবে
দেখল, মুরগিটার গায়ে অন্তত সাতটা জোঁক আটকে আছে। তার
মধ্যে একটা আবার মুরগিটার গলায় শক্ত করে পেঁচিয়ে আছে। সেই ফাঁসেই মুরগিটার চোখ ঠিকরে
বেরিয়ে এসেছে।
কিন্তু ওগুলোর আকৃতি ঠিক জোঁকের
মতো নয়। যেন
বড়ো বড়ো কেঁচো। কিলবিল
করছে। তাদের
নড়াচড়া দেখে মনে হচ্ছে,
সেগুলো যেন মুরগির শরীর থেকে কিছু শুষে নিচ্ছে। কী শুষে নিচ্ছে? রক্ত?
গ্যারির খামারে কোনোদিনই জোঁকের
উৎপাত ছিল না। এই
নতুন উপদ্রব দুর্যোগের সময়েই হতে হল!
কিন্তু জোঁকেরা কি একটা মুরগি
মারতে পারে? না, একটা তো নয়, দুটো মুরগি মারা
গিয়েছে।
গ্যারি আর ভাবতে পারল না। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে এই নতুন
উপদ্রব তার স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতায় জট ফেলে দিয়েছে।
সে দ্রুত পায়ে ফিরে গেল বাড়ির
দিকে। তারপর
অনেকটা নুন সঙ্গে করে নিয়ে আবার খামারের দিকে ফিরে চলল। কিন্তু, একটু এগিয়ে এসেই
সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কী যেন চিন্তা করে নিজের বন্দুকটাও
সঙ্গে নিয়ে চলল।
খামারে ঢুকে প্রথমেই সে মৃত
মুরগিটার কাছে গেল। কিন্তু, জোঁকগুলো কোথায়!
এত দ্রুত সেগুলো কোথায় চলে গেল?
গ্যারি তন্নতন্ন করে চারদিকে
খুঁজতে খুঁজতে পাথরটার সামনে হাজির হল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিস্ময়ে ও আতঙ্কে
তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত নেমে গেল।
সেই জোঁকের মতো, অথবা কেঁচোর মতো প্রাণীগুলো
পাথরের গায়ে আটকে আছে। না, ঠিক আটকে নেই; সেগুলো আসলে পাথরের ছিদ্রগুলোর মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। রক্ত খেয়ে সেগুলো মোটা হয়ে গিয়েছে। তাদের আকৃতি গর্তগুলোতে আত্মগোপন করার
পক্ষে এখন যথেষ্টই বড়ো।
সে দ্রুত পাত্র থেকে নুন নিয়ে
পাথরের উপর ছিটিয়ে দিল।
জোঁক হলে গায়ে নুন পড়লেই
সেগুলো ছটফট করতে করতে মরে যেত। কিন্তু, এই প্রাণীগুলোর মধ্যে
কোনো বিকার দেখা গেল না।
শীতের মধ্যেও গ্যারির কপালে
বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। সে সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে, পাশে পড়ে থাকা একটা
ছোট্ট ডালের সাহায্যে পাথরের উপর থেকে প্রাণীগুলির একটিকে খুঁচিয়ে মাটিতে ফেলল।
অদ্ভুত দেখতে প্রাণীগুলো। একেকটা ইঞ্চি পাঁচেক লম্বা হবে, কালচে রং,
লম্বাটে গড়ন, মুখের কাছে বৃত্তাকারে দুই-তিন সারিতে সাজানো তীক্ষ্ণ দাঁত। দেখলেই কেমন গা শিরশির করে।
গ্যারির মাথায় একটা বুদ্ধি
এল। সে
ডালটার মাথায় কিছুটা শুকনো খড় বেঁধে তাতে আগুন জ্বালাল। তারপর সেই আগুন দিয়ে প্রাণীটার
গায়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার, আগুনের তাপেও প্রাণীটার
কোনো বিকারই দেখা গেল না। সেটি একবারের জন্যও ছটফট করে উঠল না। আগুনের জ্বালায় কুঁকড়েও গেল না। মনে হল, প্রাণীটা যেন আগুনের
প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াহীন।
পৃথিবীর কোনো প্রাণী কি আগুন
সহ্য করে থাকতে পারে?
গ্যারির অন্তত জানা নেই।
অদ্ভুত একটা শিরশিরে ভয় ছড়িয়ে
পড়ছে তার সারা শরীরে। একটা অজানা আতঙ্ক যেন তার মস্তিষ্ককে গ্রাস করছে। সে দিশেহারা হয়ে প্রাণীটাকে পা দিয়ে
পিষে ফেলতে চাইল। কিন্তু
এতক্ষণ যে প্রাণীটা নিশ্চল হয়ে পড়েছিল, সেটি হঠাৎই অত্যন্ত দ্রুতবেগে সরে গিয়ে পাথরটার
পিছনে লুকিয়ে পড়ল।
গ্যারি দেখল, পাথরটার গায়ে লেগে
থাকা বাকি প্রাণীগুলোও তার দিকে একসঙ্গে মুখ ঘুরিয়েছে। তাদের তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি যেন গ্যারির
দিকেই তাক করে আছে। প্রাণীগুলির
মুখ থেকে এক অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে আসছে। যেন অসংখ্য ঝিঁঝিঁপোকা একটানা করুণ
স্বরে ডেকে চলেছে। তীক্ষ্ণ
সেই আওয়াজ। যেন
সরাসরি গ্যারির মস্তিষ্কের মধ্যে সুচের মতো গেঁথে যাচ্ছে।
গ্যারি ভয় পেয়ে দৌড়ে খামার
থেকে বেরিয়ে এল। জল-জমা মাঠের উপর দিয়ে
পড়িমড়ি দৌড়ে বাড়িতে ঢুকেই দরজা আটকে দিল।
চার

পরের দুইদিনে অবস্থার আরও
অবনতি ঘটল। বৃষ্টি থামার নামগন্ধ নেই। বৃষ্টি শুরু হয়েছিল সোমবার সকালে। বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে
চারপাশটা সমুদ্রের চেহারা নিল।
হক্সবেরি নদী উপচে গিয়ে দু-কূল ভাসিয়ে দিয়েছে। উইন্ডসারের বেশিরভাগ জায়গাই জলমগ্ন।
নদীর তীরবর্তী নীচু অংশে যে-সমস্ত বাড়িগুলি ছিল,
সেগুলির শুধু চাল দেখা যাচ্ছে। নদীর এপারের অবস্থাও গুরুতর। চাষের জমি, মাঠ, খামারবাড়ি সব ডুবে গিয়েছে।
ইথারদের জমির পুরোটাই জলের
তলায়। তাদের
বাড়ির একতলা ইতিমধ্যেই জলের নীচে। যেভাবে জল বাড়ছে, আজই হয়তো দোতলাতেও
জল ঢুকে যাবে। এলোমেলো ঝোড়ো হাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জল ঢুকছে হু-হু করে। প্রবল স্রোতের সামনে বাড়িগুলোর টিকে
থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বড়ো বড়ো ঢেউ উঠছে।
উদ্ধারকার্য চালানোও ক্রমশ
ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দূরে উদ্ধারকারী দলের অনেক নৌকা দেখা যাচ্ছে। তারা আপাতত উইন্ডসারের কাছাকাছি উদ্ধারকাজ
চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এত স্রোতের সামনে তারাও টালমাটাল হয়ে পড়ছে।
এই বিপদের সময়ে প্রতিবেশী
হিসাবে গ্যারি যে ইথারদের কিছু সাহায্য করবে, তারও উপায় নেই। এই প্রবল বন্যার জল অতিক্রম
করে ওদের খামারবাড়িতে যাওয়া মৃত্যুকে যেচে আলিঙ্গন করার সমতুল্য। সে শুধুই নিরুপায় হয়ে দেখছে, ইথারদের কী পরিণতি
ঘটতে চলেছে।
গ্যারিদের জমির অবস্থাও খুব
একটা ভালো নয়। আপাতত যেটুকু জল ঢুকেছে, তাতে গোড়ালি ডুবে যাচ্ছে। জলস্তর যেভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে হয়তো দুপুরের
মধ্যেই তা হাঁটু ছাড়িয়ে যাবে।
গ্যারিদের খামারবাড়ির দরজার
একটু আগে অবধি জল পৌঁছে গিয়েছে। জন গ্যারিকে বলেছিল যে সময় থাকতে
অন্যত্র চলে যেতে। কিন্তু কোথায় যাবে সে! আজ সকালে সে আশপাশটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে
এসেছে। যাওয়ার কোনো জায়গাই নেই।
বন্যার জলে সাগরের মতো ঢেউ
উঠছে। চারপাশে
শুধুই জল আর জল। পিটটাউন, ম্যাক গ্রাথ্স হিল, উইন্ডসার, রিচমন্ড—প্রতিটি এলাকা এক-একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ভয়াবহ
বিপুল জলরাশির মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার
কোনো উপায়ই অবশিষ্ট নেই। এখন শুধুমাত্র উদ্ধারকারী দলের সময়মতো পৌঁছোনোর আশায় বসে
থাকা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
গ্যারি আজ সকালেই নদীর ধারে
দুটো দোতলা বাড়িকে স্রোতের টানে ভেসে যেতে দেখেছে। উদ্ধারকারী দল কি সেখানকার লোকেদের
সময়ের মধ্যে সরিয়ে নিতে পেরেছিল? উইন্ডসারের আশেপাশে বিভিন্ন বাড়ি থেকে গুলির
আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। হতভাগ্য মানুষগুলো গুলি চালিয়ে উদ্ধারকারীদের
সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু, কতজনকে উদ্ধার করা
সম্ভব হবে এই প্রবল দুর্যোগের মধ্যে?
বৃষ্টির কোনো বিরামই নেই। এমন চলতে থাকলে হয়তো গ্যারিরাও রক্ষা
পাবে না। কিন্তু গ্যারির সমস্যা বাকি সকলের থেকেও আরও বেশি উদ্বেগজনক।
বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি
আরেকটি অজানা বিপদ গ্যারির খামারের মধ্যেই ওঁত পেতে বসে আছে। সেটি কতটা বিপজ্জনক, তা গ্যারি এখনও পুরোপুরি
বুঝে উঠতে পারেনি। কিন্তু গ্যারি জানে, এভাবে চললে তার খামারে আর একটাও পোষ্য বেঁচে
থাকবে না। প্রাণীগুলোর
তীক্ষ্ণ শিসের কথা ভাবলেই গ্যারির হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। ভয়ে গ্যারি যতটা কম সম্ভব, খামারের দিকে যাচ্ছে। তবে দিনে একবার তো যেতেই হবে। পোষ্যগুলিকে খাবার না দিলে
চলবে কীভাবে!
গত পরশুর সেই দৃশ্য দেখার
পর গতকাল গ্যারি কিছুতেই সেখানে যেতে চাইছিল না। অবশেষে বেলার দিকে কিছুটা সাহস সঞ্চয়
করে গুটিগুটি পায়ে খামারে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে যা দেখেছিল, তাতে তার সমস্ত বোধবুদ্ধি
লোপ পাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। খামারে ঢুকে প্রথমেই তার চোখে পড়েছিল—একটি ভেড়া মাটিতে
রক্তশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। আর তার গায়ে আটকে আছে সেই ভয়ংকর
প্রাণীগুলি। তবে এবার সেগুলি শুধুই রক্ত খেয়ে শান্ত হয়নি, বরং ভেড়ার দেহ থেকে
মাংসের টুকরোও ছিঁড়ে নিয়েছে।
না, প্রাণীগুলির আয়তন
আর আগের মতো ছোটো নেই। এখন প্রত্যেকটাই প্রায় দেড় হাত লম্বা, চওড়া প্রায় দশ ইঞ্চি। সেগুলো ভেড়াটার গায়ে আটকে কিলবিল
করছিল। গ্যারির
সঙ্গে একটা বন্দুক ছিল। সে সেটাকে তাক করল সেই প্রাণীগুলোর
মধ্যে একটির দিকে। তারপর
অব্যর্থ নিশানায় গুলি চালিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই একটি প্রাণী টুকরো টুকরো
হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। চতুর্দিকে চাপ-চাপ রক্ত ছড়িয়ে গেল।
গ্যারি পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে
নিশানা করতে যাবে, এমন সময়ে সবক’টা প্রাণী ভেড়ার গা থেকে কিলবিলিয়ে নেমে
এল ছড়িয়ে-পড়া টুকরোগুলোর দিকে। তারপর তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য
দেখা গেল। সেগুলি
প্রায় বৃত্তাকারে এক জায়গায় জড়ো হল। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো কাঁপতে শুরু করল প্রচণ্ডভাবে। গ্যারির মনে হল, সেগুলো যেন ধীরে ধীরে
জোড়া লেগে যাচ্ছে একসঙ্গে। গ্যারি আবার গুলি চালাল। আবার একটা প্রাণী টুকরো টুকরো হয়ে
গেল। কিন্তু
সেই টুকরোগুলোও যেন কাঁপতে শুরু করেছে। সেগুলো একে অন্যের কাছাকাছি আসতে শুরু
করেছে। এরপরে
কী হতে পারে, সেটা ভেবে গ্যারি আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। সে আতঙ্কিত, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়ে পালিয়ে এসেছিল সেখান থেকে।
আজ সকালে গ্যারি আর
হয়তো খামারে যেত না। কিন্তু তার এই পরিবর্তন এলিজাবেথের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি।
এমনিতেই এই বিধ্বংসী বন্যা-পরিস্থিতি এলিজাবেথের
মনের উপরে খুব চাপ সৃষ্টি করেছে। সে ঘুরেফিরে বারবার বলছে, “ইথারদের বাড়িতে
ছোটো ছোটো বাচ্চারা রয়েছে, একটি তো আবার কোলের শিশু। কী হবে ওদের? ওরা তো জল থেকে বের
হতেও পারছে না। এত স্রোত! সাঁতরে যে এখানে চলে আসবে, তারও উপায়
নেই। বাচ্চাগুলোর
কী হবে? আমরা কি কিছুই করতে পারব না?”
এর উত্তর গ্যারির কাছে ছিল
না। সে
এটাও জানে না যে সে নিজেদের বাঁচাতে পারবে কিনা।
তার মধ্যে এই অজানা প্রাণীর
আগমনে সে নিজে যেভাবে কুঁকড়ে গিয়েছে, আতঙ্ক যেভাবে তার মনোবলকে গ্রাস করেছে,
তারপরে সে আর এলিজাবেথকে সান্ত্বনা দেওয়ার অবস্থাতে নেই।
আজ সকালে এলিজাবেথ তাকে জিজ্ঞাসা
করেছিল, তারা বাঁচবে তো?
গ্যারি কোনো আশার কথা শোনাতে
পারেনি। আজ
সন্ধের মধ্যেই হয়তো তাদের বাড়িতে জল ঢুকতে শুরু করবে। তাই সে এলিজাবেথের কাছে কোনো কিছুই
আর গোপন করল না।
খামারবাড়িতে যে অভিশপ্ত প্রাণীর
আগমন ঘটেছে এবং গ্যারি ঠিক কী কী দেখেছে এই ক-দিনে, সব খুলে বলল।
এলিজাবেথ প্রথমে বিশ্বাসই
করতে পারল না। এমন
কিছু যে হতে পারে, তা তার ভাবনার অতীত; কিন্তু, গ্যারির
প্রায় কোটরে ঢুকে যাওয়া আতঙ্কিত চোখদুটো দেখে সে আর অবিশ্বাস করতে পারল না। ঘটনার গভীরতা অনুভব করতে তার কয়েক
মুহূর্ত সময় লাগল। সে
জানলার পাশে, খামারের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, তারপর ডুকরে কেঁদে উঠল।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই
সে নিজেকে সামলে নিয়ে গ্যারির সঙ্গে খামারবাড়ির পরিস্থিতি দেখার জন্য যাবে বলে ঠিক
করল।
জল এখন হাঁটুর কাছাকাছি। তবে এখানে স্রোতটা একটু কম। বন্যার জল ইতিমধ্যেই ইথারদের দোতলার
বারান্দা ছুঁয়ে ফেলেছে।
এতদূর থেকে বৃষ্টির অস্পষ্টতার
মধ্যেও গ্যারি স্পষ্ট দেখতে পারল, ইথাররা দুই ভাই এবং তাদের পরিবার বারান্দায় জড়ো হয়েছে। পরপর তিনটি গুলি চালানোর আওয়াজ এল
ওদিক থেকে। এরকম
অজস্র গুলি চলছে চারপাশে। উদ্ধারকারীরা কতজনকে বাঁচাবে!
গ্যারিদের খামারের দোরগোড়া
পর্যন্ত জল পৌঁছে গেছে। গ্যারি ও তার স্ত্রী সন্তর্পণে প্রবেশ করল খামারের মধ্যে। যা ভেবেছিল, তার থেকেও ভয়াবহ
পরিস্থিতি। প্রাণীগুলো
জোড়া লেগে এক বিশাল আকার ধারণ করেছে। দেখে মনে হচ্ছে, যেন চাকবাঁধা অন্ধকার
একজায়গায় জড়ো হয়ে রয়েছে। যেন এক তমসাচ্ছন্ন নিয়তি ওঁত পেতে
আছে গ্যারি ও তার স্ত্রীয়ের জন্য। সেই চাকবাঁধা অন্ধকারের পাশেই পড়ে আছে গ্যারিদের একটি পোষ্য গোরু। বাকি পোষ্যদের মতো তার চোখটিও যেন
ঠিকরে বেরিয়ে আসছে,
দেহ রক্তশূন্য, দেহের অনেকটা মাংস উধাও। হঠাৎ সেই অজানা প্রাণীটির মধ্যে একটি
চাঞ্চল্য দেখা গেল। সেটি
নড়াচড়া করতে শুরু করল। ধীরে ধীরে গোরুটির গা থেকে নেমে এসে সেটি মাথা তুলল। প্রাণীটির চোখ নেই, হাত-পা নেই। আছে শুধু মুখ। আর আছে অসংখ্য তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি। কয়েক মুহূর্ত সেটি স্থির হয়ে রইল। যেন গ্যারি ও এলিজাবেথকে মন দিয়ে
পর্যবেক্ষণ করছে। তারপর
ধীরে ধীরে হাঁ করল। আর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল সেই তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ। যেন হাজার হাজার ঝিঁঝিঁপোকা একসঙ্গে ডাকতে শুরু করেছে। এলিজাবেথ দু-হাতে নিজের কান চেপে
ধরল। গ্যারির
মাথা ঝিমঝিম করে উঠছিল। সে টাল খেয়ে মাটিতে বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে এলিজাবেথ
তাকে কোনোমতে টেনে তুলল।
আবার কিছুক্ষণ অসহ্য নীরবতা, তারপর হঠাৎ প্রাণীটা
দ্রুত গ্যারিদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল।
গ্যারি গুলি চালাল সেই মসিকৃষ্ণ
অন্ধকারকে লক্ষ্য করে। একবার, দু-বার, বেশ
কয়েকবার। সে
জানত, এতে কোনো ফল হবে না। হলও না। প্রাণীটা দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকল তাদের
দিকে। এলিজাবেথ
গ্যারির হাত ধরে টান মারল,
তারপর ত্রস্ত কণ্ঠে বলল, “আর সময় নেই,
পালাও এখান থেকে!”
গ্যারি জানে, সময় নেই। গ্যারি এটাও জানে, পালানোর পথও নেই। চারদিকে শুধুই উত্তাল জলরাশি। তাও পালাতে হবে। যতক্ষণ বেঁচে থাকা যায়!
মুরগি, ভেড়া, গোরুর পরবর্তী শিকার কী হতে চলেছে, তা তাদের আর বুঝতে
বাকি নেই।
তারা দ্রুত খামারের বাইরে
বেরিয়ে এল। খামারের
দরজা থেকে কয়েক ফুট দূরেই জল শুরু হয়ে গিয়েছে। দুজনে সেই জলের মধ্যে নেমে পড়ল। একটু দূরে এগোতেই জল প্রায় হাঁটুর
কাছাকাছি পৌঁছে গেল। তাড়াতাড়ি এগোনো যাচ্ছে না।
প্রাণীটা কি তাহলে তাদের ধরে
ফেলবে?
দুজনেই একবার পিছনে ফিরে তাকাল
এবং সঙ্গে সঙ্গেই বিস্মিত হল। প্রাণীটা খামারের দরজার সামনে নিশ্চল
হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে জল, কিন্তু সেই জলে কিছুতেই সেটি নামছে না। এদিক-ওদিক শরীরটা বেঁকিয়ে
রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু চারপাশে জল থাকায় সে কিছুতেই
গ্যারিদের দিকে আসতে পারছে না। গ্যারি একবার এলিজাবেথের দিকে তাকাল। এলিজাবেথের দুই চোখে তখন আশার ক্ষীণ
আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সে
ফিশফিশ করে বলল, “প্রাণীটা কি সাঁতরাতে জানে না?”
গ্যারি কাঁপা গলায় বলল, “আমি জানি না।”
“কিন্তু এই সাংঘাতিক
প্রাণীটা কি ওই পাথরের সঙ্গে এসেছে? এগুলো কি বাইরের জগতের প্রাণী?”
গ্যারি দৃশ্যতই ভেঙে পড়েছে, সে করুণ কণ্ঠে বলল,
“আমি কিছুই জানি না। শুধু এইটুকু জানি, আমাদের সামনে এখন
দুটো বিপদ। এক, জল বাড়লে বিপদ। আর দুই, জল কমলে প্রাণীটার
আক্রমণের বিপদ।”
এলিজাবেথ গ্যারিকে সান্ত্বনা
দিয়ে বলল, “কোনো একটা পথ অবশ্যই বের হবে।”
সে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ আবার
গুলির শব্দ ভেসে এল ইথারদের বাড়ির দিক থেকে।
প্রবল স্রোতে ইথারদের খামারবাড়ি
ভেসে গিয়েছে। বাড়ির
দোতলায়ও জল উঠে গিয়েছে। ইথাররা এক-এক করে বাড়ির ঢালু ছাদে ওঠার চেষ্টা করছে।
এলিজাবেথ ভীত কণ্ঠে বলল, “হায় ঈশ্বর!
ইথাররা বাঁচবে কী করে? কী স্রোত চারপাশে!”
গ্যারি দেখল, ভেঙে-যাওয়া খামারবাড়ি থেকে গোরু, ভেড়া জলে ভেসে যাচ্ছে। সঙ্গে অজস্র কাঠের টুকরো,
ভাঙা বাড়ির টুকরো, আসবাসপত্র ভেসে চলেছে।
কত মানুষের ইতিমধ্যেই প্রাণ
গিয়েছে, কত মানুষের করাল নিয়তি এখনও অপেক্ষায় রয়েছে, কে জানে! কত ঘর ইতিমধ্যেই ভাঙা
পড়েছে, কত বাড়ি জলের তলায় চলে গিয়েছে, তার হিসেবই বা কে রেখেছে! এত আসবাসপত্র, এত পশু কোথা থেকে সব ভেসে আসছে, কত দূরেই বা ভেসে যাবে,
কেউ জানে না।
শুধু বৃষ্টিরই বিরাম নেই। সঙ্গে বেড়ে চলেছে জলস্তর। দূর-দূরান্তে কোনো নৌকা
চোখে পড়ছে না। সব গেল কোথায়? এখনও এদিক-ওদিক থেকে
বন্দুকের গুলির শব্দ ভেসে আসছে।
গ্যারি ইথারদের একমাত্র যেভাবে
সাহায্য করতে পারত, সেটাই করল। পরপর তিন-চারবার শূন্যে গুলি
চালাল। এই
শব্দ শুনে যদি কোনো উদ্ধারকারী দলের নৌকা এদিকে আসে। তাহলে হয়তো ইথাররা বেঁচে যেতে পারে।
গ্যারিদের খামারের মাঠে এখন
হাঁটু জল। কিন্তু
তাতেই স্রোতের টান তারা অনুভব করতে পারছে। মাঝে মাঝে পা ফেলে এগিয়ে যাওয়া দুরূহ
হয়ে উঠছে। তারা
কোনোমতে এসে ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
পাঁচ
সারাটা দিন কাটল প্রবল উত্তেজনার
মধ্যে। গ্যারি
দেখেছে, প্রাণীটা বারবার খামারের দরজার সামনে আসছে, তারপর কিছুক্ষণ
এদিক-ওদিক করে আবার খামারের মধ্যেই ঢুকে যাচ্ছে। তারপর বিকেলের দিকে যখন জল বাড়তে
বাড়তে খামারের মধ্যে ঢুকে পড়ল, তারপর থেকে আর সেটিকে দেখা গেল না।
একদিকে স্বস্তি, প্রাণীটা আর এগোতে
পারছে না; কিন্তু অপরদিকে মুশকিল হল, জল
এখন গ্যারিদের বাড়ির মধ্যে ঢুকতে শুরু করেছে।
এলিজাবেথ আর গ্যারি প্রয়োজনীয়
জিনিসপত্র নিয়ে দোতলায় চলে গেল। তারপর শুরু হল এক অনন্ত প্রতীক্ষা। অন্ধকার ঘন হয়ে আশপাশের সবকিছুকে
ঢেকে দেওয়ার আগে অবধি তারা জানলা দিয়ে দেখল, ইথারদের পুরো পরিবার সাহায্যের আশায় বাড়ির
ঢালু ছাদে অপেক্ষা করছে। আর প্রবল স্রোত তাদের দোতলার দরজাকেও
ঢেকে দিয়েছে।
গ্যারির রাতটা কাটল প্রবল
উৎকণ্ঠার মধ্যে। জানলা
দিয়ে সে অসহায়ের মতো দেখতে থাকল, তার খামারবাড়ির দরজা ক্রমশ জলের তলায় চলে
যাচ্ছে। একতলার
সিঁড়ি অর্ধেকটা জলের নীচে চলে গিয়েছে। জল বাড়ছে হু-হু করে। ইথাররা এখনও বাড়ির ছাদে। হ্যাঁ, ওই তো দূরে দেখা যাচ্ছে
লন্ঠনের আলো!
এলিজাবেথ বিষণ্ণ গলায় বলল, “খামারের কোনো পোষ্যকেই বোধহয়
বাঁচানো যাবে না, তাই না?”
গ্যারি একবার শূন্য দৃষ্টিতে
তার স্ত্রীয়ের দিকে তাকাল,
তারপর শুষ্ক কণ্ঠে বলল, “কী করে বাঁচাব?
প্রাণীটা তো ওঁত পেতে রয়েছে।”
“আচ্ছা, ইথাররা কি বাঁচতে পারবে?”
“প্রশ্নটা হল,
আমরা কি বাঁচব?”
তারপর আবার কয়েক মুহূর্তের
নীরবতা। বাইরে
তখন শুধুই বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ। আর আছে বাড়ির
গায়ে স্রোতের ধাক্কা লাগার শব্দ।
রাতটা কাটল প্রায় দুঃস্বপ্নের
মতো। পালা করে গ্যারি আর এলিজাবেথ নজর রাখল জলস্তর বৃদ্ধির দিকে।
ভোরের আলো যখন সবে ফুটতে শুরু
করেছে, সেই সময়ে গ্যারির সামান্য তন্দ্রা এসে গিয়েছিল।
এলিজাবেথ তখন সদ্য
ঘুম থেকে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে চারপাশের দৃশ্য দেখে
তার সারা শরীরে আতঙ্কের শিহরণ খেলে গেল।
সারারাত ধরে জল বেড়েছে আরও
কয়েক ফুট। ইথারদের
পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ঢালু ছাদের ঠিক মাঝখানে জড়ো হয়ে বসে আছে। তাদের দুই পাশ দিয়ে বন্যার জল প্রবল
স্রোতে বয়ে চলেছে। একটু
দূরেই জলের মধ্যে একটি গাছের মাথা বেরিয়ে আছে। ইথাররা সেই গাছে দড়ি ছুড়ে বাধার
চেষ্টা করছে। এবং
প্রতিবারই তা ফসকে যাচ্ছে।
এই দৃশ্য দেখে এলিজাবেথ সবে
গ্যারিকে ডাকতে যাচ্ছিল,
এমন সময়ে তার চোখ পড়ল খামারবাড়ির দিকে। গ্যারিদের খামারবাড়ির দরজাও
জলের নীচে চলে গিয়েছে। কিন্তু উপরের দিকে একটা ছোট্ট জানলা তখনও জলের বাইরে। আর সেই জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সেই
ভয়ানক জীবটা। বারবার
সেটা হাঁ করছে গ্যারিদের বাড়ির দিকে মুখ করে।
এই দৃশ্য দেখে আপনা-আপনি এলিজাবেথের মুখ
দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে এল।
গ্যারির ঘুমের ঘোর কেটে গেল
সেই চিৎকারে।
সে তাড়াতাড়ি উঠে এসে এলিজাবেথকে
সান্ত্বনা দিল। অন্তত
যতক্ষণ জল না কমছে, ততক্ষণ ওই প্রাণীটা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
সারাটা দিন গ্যারির প্রচণ্ড উৎকণ্ঠার মধ্যে
কাটল। বারবার
মনে হচ্ছে, এই বুঝি জলের তোড়ে বাড়ি ভেঙে পড়বে। সন্ধের দিকে বৃষ্টির বেগটা কমে এল। কিন্তু ততক্ষণে দোতলায় ওঠার সিঁড়িটার
বেশিরভাগটাই জলের তলায় চলে গিয়েছে। ইথারদের বাড়ির দিক থেকে মাঝেমধ্যেই
চিৎকার ভেসে আসছিল, অনেকক্ষণ বাদে-বাদে গুলি চালানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল।
একসময়ে সেইসব শব্দ বন্ধ হয়ে
গেল। চারপাশে
শুধুই জলের স্রোতের আওয়াজ। প্রাণীটা কি এখনও ওঁত পেতে রয়েছে? ও কি কোনোভাবে জল
পেরিয়ে গ্যারিদের বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে? এই চিন্তায় এলিজাবেথ
বারবার জানলার কাছে এসে দাঁড়াচ্ছিল। বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। খামারবাড়ির সামান্য অংশও আর দেখা
যাচ্ছে না। হঠাৎ
অনেক রাতের দিকে খুব চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করল ইথারদের বাড়ির দিক থেকে। সাহায্যের জন্য আর্তনাদ, সঙ্গে হাহাকার-মেশানো কান্নার রোল। এলিজাবেথ বারবার জানলা দিয়ে দেখছিল। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তারপর হঠাৎ সমস্ত শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। কোনো চিৎকার নেই, হাহাকার নেই। নেই প্রাণ বাঁচানোর জন্য কাতর প্রার্থনা।
সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে
প্রথম যে-দৃশ্য চোখে পড়ল, তাতে এলিজাবেথ ও গ্যারির হৃদয় যেন
দুমড়ে-মুচড়ে গেল।
ইথারদের বাড়ির আর কোনো চিহ্নই
অবশিষ্ট নেই। এখন
গ্যারিদের বাড়ি ও উইন্ডসারের উঁচু জমির মধ্যে রয়েছে শুধুই উত্তাল জলরাশি।
এলিজাবেথ ডুকরে কেঁদে উঠল, “একটা পরিবার শেষ
হয়ে গেল! আর আমরা অসহায়ের মতো দেখলাম?”
“আমাদের কি আর কিছু
করার ছিল? এমনও তো হতে পারে, রাত্রে উদ্ধারকারীদের
নৌকা এসে ওদের উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছে।”
এলিজাবেথ কিছু বলল না, শুধু অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে
মাথা নাড়ল। জল
তখন গ্যারিদের দোতলাতেও উঠে এসেছে, পায়ের পাতা ডুবে যাচ্ছে।
গ্যারিদের খামারবাড়িটা এখন
প্রায় জলের নীচে। শুধুমাত্র
ছাদটুকু জলের উপরে মাথা উঁচিয়ে টিকে আছে।
আর ওইটুকু অংশেই ঘুরেফিরে
বেড়াচ্ছে সেই ভয়ংকর প্রাণীটা। মাঝে মাঝেই সেটা গ্যারিদের বাড়ির
দিকে মুখ করে সেই অসংখ্য ঝিঁঝিঁপোকার মতো তীব্র, তীক্ষ্ণ শব্দ ছুড়ে দিচ্ছে। তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি যেন গ্যারিদের
নাগালে পাওয়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রাণীটাকে দেখলেই গ্যারির
মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। এই অসহায় অবস্থার মধ্যেও যতবার সে প্রাণীটাকে দেখছে, তার মনে হচ্ছে,
প্রাণীটা দাঁত বের করে, হাঁ করে তাদের যেন ক্রমাগত
বিদ্রুপ করে চলেছে। যেন বোঝাতে চাইছে, গ্যারিদের বাঁচার
কোনো পথ নেই। হয় তারা জলে মরবে, না হলে প্রাণীটার হাতে।
গ্যারি আর সহ্য করতে পারল
না। সে
বন্দুকটা তুলে নিয়ে দু-বার গুলি চালাল প্রাণীটাকে লক্ষ্য করে।
গুলি যদিও সেই পর্যন্ত পৌঁছোল
না। এলিজাবেথ
ছুটে এসে বাধা দিল। শুধু শুধু কার্তুজ নষ্ট করে লাভ নেই। তার চেয়ে বরং যদি উদ্ধারকারী দলের
নৌকা দেখা যায়, তাহলে সংকেত পাঠানোর জন্য গুলির ব্যবহার করা যাবে।
সারাটা দিন এই ভাবেই কাটল। যখন মনে হচ্ছিল আজ আর কোনো নতুন বিপদ
ঘটবে না, তখনই গ্যারিদের খামারবাড়ির দিক থেকে এক তীব্র শব্দ ভেসে এল। জলের তোড়ে খামারবাড়ি ভেঙে পড়েছে। তার ছাদের একটা বিশাল পাটাতন জলের
উপর ভাসছে। তার
উপরেই সেই ভয়ংকর প্রাণীটা অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে পথ খোঁজার চেষ্টা করছে।
সন্ধের অন্ধকার নামতে শুরু
করেছে। গ্যারি
ভালো করে ঠাহর করতে পারছে না, ওইদিকটায় কী হচ্ছে।
যদি পাটাতনটা জলের স্রোতে
ভাসতে ভাসতে গ্যারিদের বাড়ির দিকে চলে আসে? যদি সেটা থেকে প্রাণীটা গ্যারিদের বাড়িতে
ঢুকে পড়ে? ভাবতেই গ্যারির শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি বন্দুক এবং গুলিগুলোকে
একত্রিত করল। খুব
তাড়াহুড়োর মধ্যে উদ্বেগ-মেশানো কণ্ঠে এলিজাবেথকে বলল, “দুটো লন্ঠন সঙ্গে নিয়ো, আর একটা
পাত্রে বেশি করে কেরোসিন নিয়ে নাও।”
“কেন, কেরোসিন দিয়ে কী হবে?” এলিজাবেথ সন্দেহ মেশানো গলায়
জিজ্ঞাসা করল।
“আমাদের বাড়ির ছাদে
উঠতে হবে। এখনই।”
এলিজাবেথ অবাক চোখে একবার
তাকাল, কিন্তু কোনো প্রশ্ন করতে পারল না।
তারা আর সময় নষ্ট না করে, যেটুকু জিনিস প্রয়োজন,
সঙ্গে নিয়ে ছাদে ওঠার ব্যবস্থা করতে শুরু করল। ছাদে উঠতে দুজনকেই বেশ কসরত করতে হল।
ছাদে উঠে গ্যারি চোখ কুঁচকে
ভালো করে ঠাহর করার চেষ্টা করল, খামারবাড়ির দিক থেকে কোনো কাঠের টুকরো এদিকে ভেসে আসছে
কিনা।
সে যা ভয় পেয়েছিল, সেটাই হয়েছে। অনেক ছোটো-বড়ো কাঠের টুকরো স্রোতের
টানে এদিকে ভেসে আসছে। তার মধ্যে একটি বড়ো কাঠের পাটাতন আছে, যার মধ্যে প্রাণীটি
বসে আছে। সেটি স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে এসে বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে
একটা গাছের সঙ্গে আটকে গেছে। কোনো কারণে যদি সেটি গাছের আগল থেকে
বেরিয়ে আসে, তাহলে সোজাসুজি গ্যারিদের বাড়ির দিকেই আসবে।
গ্যারি প্রাণীটার দিকে বন্দুক
তাক করে গুলি ছুড়তে যাবে,
এমন সময়ে এলিজাবেথ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, “নৌকা,
ওই যে দূরে নৌকা আসছে।”
গ্যারি দেখল, অনেক দূরে একটি নৌকা
ভেসে আসছে। তার মধ্যে জ্বলছে লন্ঠনের ক্ষীণ আলো। তবে দূরত্ব এতটাই যে, উদ্ধারকারীরা হয়তো
গ্যারি ও এলিজাবেথকে এই সন্ধের আলো-আঁধারির মধ্যে খুঁজেই পাবে
না।
গ্যারি সঙ্গে সঙ্গেই তার বন্দুক
আকাশের দিকে তাক করে দু-বার গুলি ছুড়ল। এলিজাবেথও হাতের লন্ঠনটা আকাশের দিকে
উঁচিয়ে ধরে বারবার নাড়তে শুরু করল।
হ্যাঁ, ওই উদ্ধারকারীদল তাদের
দেখতে পেয়েছে। নৌকার মধ্যে থেকে আলো নেড়ে সংকেত দিচ্ছে।
এলিজাবেথ এতক্ষণে একটা স্বস্তির
শ্বাস ফেলল। অবশেষে
তারা এই ভয়ংকর পরিস্থিতির হাত থেকে রক্ষা পাবে।
গ্যারির সেই দিকে ভ্রূক্ষেপ
নেই। সে
সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই বিশাল কাঠের পাটাতনটির দিকে। জলস্রোতে সেটি বারবার দুলে উঠছে। আর প্রাণীটি পাটাতনের একটা কোনায়, গ্যারিদের বাড়ির
দিকে মুখ করে বারবার হাঁ করছে আর তীক্ষ্ণ শব্দ বের করছে।
নৌকা এসে পৌঁছোনোর আগেই পাটাতনটা
ভেসে আসবে না তো এদিকে?
এই ভাবেই আরও ঘণ্টাখানেক সময়
কেটে গেল। রাত্রির
অন্ধকার ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। প্রচণ্ড শীতে দুজনেই থরথর করে কাঁপছে। রাতের এই ঠান্ডার মধ্যে ইথাররা ছাদের
উপর রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছিল। কীভাবে পেরেছিল তারা?
নৌকাটা আরও অনেকটাই এগিয়ে
এসেছে। বাড়ির
দু-দিকে
জলের প্রবল স্রোত। নৌকার এগিয়ে আসতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তার মধ্যেই উদ্ধারকারীরা সর্বশক্তি
দিয়ে নৌকা এগিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
গ্যারির বাড়ি থেকে নৌকাটা
যখন আর বেশি দূরে নেই,
এমন সময়ে হঠাৎ জলের প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় পাটাতনটি আবার গ্যারিদের
বাড়ির দিকে ভেসে আসতে শুরু করল।
সেটি ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে
আর তার উপর বসে থাকা প্রাণীটি তীক্ষ্ণ শব্দ বের করছে। সেই শব্দের মধ্যে এক অদ্ভুত আতঙ্ক
মিশে রয়েছে। প্রাণীটা
কি উল্লাস প্রকাশ করছে?
শিকারকে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাগে পাবে, সেই জন্য
আনন্দে চিৎকার করছে? গ্যারি জানে না। সে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঈশ্বরের
কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করল। উদ্ধারকারীদের নৌকা তখন বাড়ি থেকে
সামান্য দূরে। এমন
সময়ে একটা কাণ্ড হল।
প্রাণীটা তখনও শব্দ করছিল, কিন্তু খুব মৃদু স্বরে। উদ্ধারকারীরা সংখ্যায় দুইজন ছিল। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, “মনে হচ্ছে,
ওখানে কাঠের পাটাতনের উপর কেউ আশ্রয় নিয়েছে। স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে। আগে তাকে নৌকায় তুলি। তারপর ওই বাড়িটার দিকে যাব।”
দ্বিতীয়জনও সম্মতি দিল, “হ্যাঁ। মনে হচ্ছে, কেউ একটা বসে আছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। চলো, ওইদিকেই প্রথমে যাই।”
সবে তারা নৌকাটা ঘোরাতে শুরু
করেছে, গ্যারি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চিৎকার করে উঠল, “ওদিকে
যেয়ো না। ওখানে
বিপদ আছে!”
স্রোতের ছলছল শব্দে হয়তো
গ্যারির কথাগুলো চাপা পড়ে গেল। গ্যারি আবার চিৎকার করল। আকাশে গুলি ছুড়ল। কিন্তু কোনো লাভ হল না। উদ্ধারকারীরা গ্যারির কথা ঠিকভাবে
বুঝতে পারল না। তারা
সংকেত দিল যে তারা আসছে। কিন্তু প্রথমেই তারা নৌকাটা পাটাতনের দিকে ঘুরিয়ে দিল।
গ্যারি আর এলিজাবেথের প্রায়
দম বন্ধ হয়ে এল। এক
ভীষণ আতঙ্ক তাদের যেন গ্রাস করল। তাদের মনে হল, চারপাশের সমস্ত শব্দ
যেন বন্ধ হয়ে গেছে। তারা যেন নিজেদের হৃৎপিণ্ডের শব্দ
স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। পরে কী হতে চলেছে, তারা জানে না। তারা বারবার চিৎকার করে নৌকার যাত্রীদের
ফিরে আসার জন্য অনুরোধ জানাল।
কোনো ফল হল না। তারা আতঙ্কিত দৃষ্টিতে দেখল, নৌকাটা স্রোতের সঙ্গে
পাল্লা দিয়ে সেই পাটাতনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
নৌকার মধ্যে থেকে একজন বলল, “ভয় পাবেন না,
সাবধানে নৌকায় উঠে আসুন।” তারপরে লন্ঠনটা তুলে
ধরল। হলদে
আলো অন্ধকারকে কেটে কিছুদূর ছড়িয়ে পড়তেই লোকটা চিৎকার করে উঠল, “এ কী! এটা তো মানুষ নয়! এটা কী জিনিস?”
ততক্ষণে প্রাণীটা নৌকার দিকে
মুখ ঘুরিয়েছে। তার
হাঁ-করা
মুখে হাজার হাজার তীক্ষ্ণ দাঁত চকচক করছে। সেটি আবার তীক্ষ্ণ শব্দ বের করল মুখ
দিয়ে। নৌকার
দুজন আরোহীই মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই প্রাণীটা লাফ দিয়ে নৌকায়
উঠে পড়ল। নৌকা কেঁপে ওঠায় লন্ঠনটা জলে পড়ে নিভে গেল। নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে
কয়েক মুহূর্ত গ্যারি কিছুই দেখতে পেল না। তারপর রাত্রির অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে
চারপাশ মানুষের আর্তনাদে মুখরিত হয়ে উঠল। নৌকার সওয়ারিরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য
আর্তনাদ করছে। যে
ভয়ানক ঘটনা সেখানে ঘটছে,
তা গ্যারিরা দেখতে পাচ্ছে না; কিন্তু, অনুধাবন করতে পারছে।
নৌকার মানুষ দুটি আর্তনাদ
করছে। গুলির
আওয়াজ ভেসে এল সেদিক থেকে। তারপর হঠাৎ সব চুপ হয়ে গেল। গ্যারি লন্ঠন উঁচিয়ে ভালো করে দেখার
চেষ্টা করল, আলো-আঁধারির মধ্যে সে দেখতে পেল নৌকাটা তাদের বাড়ির
দিকে এগিয়ে আসছে। কেউ যেন প্রাণপণ চেষ্টায় দাঁড় টানছে।
কাছাকাছি আসতে দেখা গেল, উদ্ধারকারীদের মধ্যে
একজন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে দাঁড় টানছে। গ্যারি লন্ঠনের আলোয় দেখল, আতঙ্কে লোকটার চোখদুটো
যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। তার সারা গায়ে রক্ত মাখা। কার রক্ত? দ্বিতীয় উদ্ধারকারীর?
নাকি ওই প্রাণীটার?
পরমুহূর্তেই গ্যারি সেই প্রশ্নের
উত্তর পেয়ে গেল। লোকটা
তখনও চিৎকার করছিল, “পাতাল থেকে সাক্ষাৎ শয়তান উঠে এসেছে! আমায় বাঁচান! প্লিজ বাঁচান!”
কিন্তু তার কথা শেষ হতে পারল
না। পরমুহূর্তেই
তার পিছনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসে-থাকা প্রাণীটি লোকটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার শত শত তীক্ষ্ণ দাঁত লোকটির মাংসের
মধ্যে গেঁথে গেল। তারপর
এক ঝটকায় লোকটির শরীর থেকে মাংসের টুকরো সে ছিঁড়ে নিল। লোকটির শরীর থেকে গলগল করে রক্ত বেরোতে
শুরু করল।
গ্যারি ও এলিজাবেথ আতঙ্কে
কয়েক পা পিছিয়ে এল। এলিজাবেথ চিৎকার করতে করতে চোখ ঢেকে বসে পড়ল। গ্যারি প্রাণীটিকে লক্ষ্য করে পরপর
গুলি চালাল। প্রাণীটির
কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে পরপর কামড় দিয়ে লোকটার শরীর থেকে মাংস ছিঁড়ে নিতে লাগল।
লোকটির আর্তনাদ স্রোতের প্রবল
শব্দকে ছাপিয়ে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর আবার অসহনীয় নিস্তব্ধতা। নৌকাটা খুব ধীর গতিতে স্রোতের ঢেউয়ের
তালে তালে এগিয়ে আসতে লাগল গ্যারিদের বাড়ির দিকে।
গ্যারি এলিজাবেথকে বলল, “তাড়াতাড়ি কেরোসিনের
পাত্রটা দাও।”
“কী করবে তুমি?”
গ্যারি উত্তর দিল না, সে সতর্ক দৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছে নৌকাটার দিকে।
নৌকাটা ধীরে ধীরে ঢেউয়ের
দোলায় এসে ঠেকল গ্যারিদের বাড়ির গায়ে। তারপর কয়েক মুহূর্ত কোনো সাড়াশব্দ
নেই। গ্যারির
মনে হল, সময় যেন অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। ঝড় আসার আগে যেমন এক গুমোট নিস্তব্ধতা
ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে,
এখন ঠিক সেরকমই অবস্থা। যেন কোনো ভয়ানক ঘটনা ঘটতে চলেছে কয়েক
মুহূর্তের মধ্যেই। গ্যারি যেন নিজের হৃৎস্পন্দন অনুভব করতে পারছিল। ভয়ে এলিজাবেথ গ্যারির হাতটা চেপে ধরল।
গ্যারি এলিজাবেথের হাতে তার
বন্দুকটা দিল। তারপর
কঠিন গলায় বলল, “বন্দুক চালাতে দেরি করবে না। সময় বেশি পাওয়া যাবে না।”
তারপর কেরোসিনের পাত্র থেকে
সে তেল ছিটিয়ে দিল নৌকাটার মধ্যে। তখনও নৌকাটার মধ্যে প্রাণীটার কোনো
নড়াচড়া চোখে পড়ছে না। গ্যারি আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে লন্ঠনটা ছুড়ে দিল নৌকার
মধ্যে। লন্ঠন
ভেঙে গিয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের শিখা
যখন পুরো নৌকাটাকে গ্রাস করে ফেলেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তীব্র শিসের শব্দ বের করে
প্রাণীটা মাথা তুলে দাঁড়াল। আগুনের লেলিহান শিখা ততক্ষণে সেটির
সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আগের মতোই এখনও সেই আগুনে প্রাণীটা
তেমন বিচলিত হচ্ছে না। সারা গায়ে আগুন নিয়েই প্রাণীটা হঠাৎ নৌকা থেকে লাফ দিয়ে
গ্যারিদের ছাদে উঠে এল। সঙ্গে
সঙ্গে এলিজাবেথ পরপর দু-বার গুলি ছুড়ল। কিন্তু, প্রাণীটার তাতেও কোনো
সমস্যা হল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে গ্যারির
মনে হল, স্রোতের টানে তাদের বাড়িটা যেন একটু কেঁপে উঠল। একবার নয়। পরপর বেশ কয়েকবার।
প্রাণীটা ততক্ষণে হাঁ করে
গ্যারির দিকে এগোতে শুরু করেছে। গ্যারি জানে, এর পরিণতি একমাত্র
মৃত্যু। এই মহাজাগতিক রহস্যাবৃত জীবের যেন কোনো দুর্বলতাই নেই। না, ভুল বলা হল। এর একমাত্র দুর্বলতা—জীবটি সাঁতরাতে জানে
না। কিন্তু
তাতে কী? গ্যারি
আর সেই মহাজাগতিক প্রাণীটির মাঝে কোনোরকম জলের বাধা এই মুহূর্তে নেই।
জীবটি কিলবিল করে তার দিকে
এগিয়ে আসতে লাগল। গ্যারি প্রাণীটির রক্তমাখা তীক্ষ্ণ দাঁতের সারিকে এখন স্পষ্ট
দেখতে পাচ্ছে। আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা; তারপরেই সে হারিয়ে
যাবে করাল নিয়তির ঘূর্ণাবর্তে। কেউ জানবে না, তাদের কী হল। সবাই ভাববে, ভয়ংকর বন্যার কবলে
পরে ইথার পরিবারের মতো শেফার্ডরাও হারিয়ে গিয়েছে।
একবার যদি জনকে সে জানাতে
পারত!
এমন সময়ে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা
ঘটে গেল। হঠাৎ
এলিজাবেথ গ্যারি ও সেই প্রাণীটির মাঝখানে এসে দাঁড়াল। গুলিতে কাজ না হওয়ায় এখন সে বন্দুকটা
দিয়ে সরাসরি প্রাণীটির গায়ে আঘাত করতে শুরু করল। প্রাণীটা একমুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। একটু পিছিয়ে গেল। তারপর তার বিশাল হাঁ নিয়ে এলিজাবেথের
উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সেই হৃদয়-বিদারক দৃশ্য দেখে
গ্যারি হাহাকার করতে করতে ছাদের উপরেই বসে পড়ল। ততক্ষণে প্রাণীটির তীক্ষ্ণ দাঁতের
সারি বসে গিয়েছে এলিজাবেথের শরীরে। রক্তাক্ত এলিজাবেথের চোখগুলো যেন মৃত্যুর
আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ গ্যারিদের বাড়িটা
জলের স্রোতে কেঁপে উঠল। সঙ্গে
সঙ্গেই সবসুদ্ধ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল তীব্র জলস্রোতের মধ্যে। গ্যারি হঠাৎ করে তীব্র স্রোতের
মধ্যে একবার ডুবে গিয়ে পরক্ষণেই আবার ভেসে উঠল। প্রবল স্রোতের মধ্যে ঠিকমতো সাঁতরাতে
না পেরে সে হাবুডুবু খেতে শুরু করল। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সে
এলিজাবেথকে খোঁজার চেষ্টা করল। হাবুডুবু খেতে খেতেই সে চারপাশটা দেখল। চারদিকে শুধুই অন্ধকার। হঠাৎ একটু দূরে তার চোখে পড়ল, প্রাণীটা জলের মধ্যে
হাবুডুবু খাচ্ছে। তার মুখে তখনও ধরা এলিজাবেথের নিথর দেহ।
পরমুহূর্তেই এক উত্তাল জলরাশি
গ্যারিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল অনির্দিষ্টের উদ্দেশে।
ছয়
।। সিডনি ১৮৬৮।।
গ্যারির স্মৃতিচারণা সবে শেষ
হয়েছে। এক
অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে দুজনকে। জন কী বলবেন, বুঝে উঠতে পারছেন
না।
উইন্ডসারের গত বছরের বন্যা
স্মরণকালের মধ্যে সবথেকে ভয়াবহ ছিল। বহু ক্ষয়ক্ষতি, বহু প্রাণহানির মধ্যে
দিয়ে প্রকৃতির রোষের মূল্য শোধ করতে হয়েছে। সময়মতো জন তাঁর পরিবারকে সরিয়ে নিয়ে
যেতে পেরেছিলেন বলে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। কিন্তু তাঁর পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে যে
এমন কল্পনাতীত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। আজ এতদিন পর ভাগ্যক্রমে যদি গ্যারির
সঙ্গে তাঁর দেখা না হত, তাহলে সেই অদ্ভুত ঘটনার ব্যাপারে হয়তো
কেউই জানতে পারত না কোনোদিনও।
গ্যারি চুপ করে মাথা নীচু
করে বসে আছে। জন
তার কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর সহমর্মিতার সঙ্গে বললেন, “গ্যারি,
আমি ভাবতেও পারছি না তোমার পরিবারকে এত কিছু সহ্য করতে হয়েছে! সত্যিই, তোমায় সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই।”
গ্যারি খুব ধীর গতিতে মাথাটা
তুলল, তারপর জনের চোখে চোখ রেখে বিষণ্ণ গলায় বলল, “তুমি কি
আমাকে পাগল ভাবছ? তুমি কি প্রাণীটার ব্যাপারটা বিশ্বাস করেছ?”
জন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে
থাকলেন।
গ্যারি বিষণ্ণ হেসে বলল, “ওহ্! তার মানে, তুমি পুরোটা বিশ্বাস করতে পারোনি।”
“তা নয়,” জন কুণ্ঠিত স্বরে
বললেন।
“আলবাত তা-ই। কী
ভেবেছ? আমি বিকারগ্রস্ত? আমি প্রলাপ বকছি?”
“তুমি শান্ত হও।”
গ্যারি কয়েক মুহূর্ত চুপ
করে রইল, তারপর দূরমনস্ক গলায় বলল, “শান্ত হব? আমি সব হারিয়েছি, জন। সেদিন যদি প্রাণীটা এলিজাবেথের
বদলে আমাকে শেষ করে ফেলত,
তাহলেই হয়তো ভালো হত। অথবা আমার বাড়িটা যদি একমুহূর্ত আগে
ভেঙে পড়ত, তাহলে শয়তানটা আমাদের নাগাল পেত না।”
“গ্যারি, তুমি শান্ত হও। কী হলে কী হত, ভেবে কোনো লাভ নেই। আমাকে একটা কথা বলো, তুমি কি উইন্ডসারে
আর ফিরেছিলে?”
গ্যারির কানে যেন আর কোনো
কথাই ঢুকল না। সে বিড়বিড় করে বলতে থাকল, “স্রোতের টানে আমি তখন ভেসে চলেছি। বড়ো বড়ো ঢেউ কখনও আমাকে জলের নীচে
টেনে নিচ্ছে, আবার কখনও ভাসিয়ে তুলছে। হঠাৎ একটা কাঠের বড়ো টুকরো পেয়ে সেটাকেই
আঁকড়ে ধরলাম। ভাসতে
ভাসতে কতদূর চলে এসেছিলাম,
মনে নেই। হঠাৎ হাতের সামনে আরেকটা গাছ দেখতে
পেয়ে তার ডালটাকে আঁকড়ে ধরলাম। তখন প্রবল জলরাশি আমাকে প্রতিনিয়ত
টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তি এবং প্রবল
ঠান্ডায় জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান যখন ফিরল, ততক্ষণে বহুদূর ভেসে এসেছি। আমি যে সর্বহারা হয়েছি, সেটা অনুভব করতেই
প্রথম কয়েকদিন কেটে গেল। এলিজাবেথকে হারানোর শোক আমাকে জীবনের
প্রতি উদাসীন করে তুলেছিল। তাও কয়েক মাস পর একবার ফিরেছিলাম। আমার জমিটা তখন ফাঁকা পড়ে আছে। বাড়ি, খামার কোনোকিছুরই
আর চিহ্ন নেই।”
“তুমি পাথরটার খোঁজ
করেছিলে? প্রাণীটার কোনো অবশেষ তোমার চোখে পড়েছিল?” জন উৎসাহ-ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।
সঙ্গে সঙ্গেই গ্যারির
চোখদুটো আবার জ্বলে উঠল। তীব্র কণ্ঠে সে বলল, “প্রমাণ না পেলে কিছুই
তোমাদের বিশ্বাস হয় না, তাই না? কী করব
ওই অভিশপ্ত পাথরটা খুঁজে? কী হবে প্রাণীটার অবশেষ খুঁজে?
বেশ হয়েছে, ওটা ডুবে মরেছে। নরকের কীট। কেন যে আগেই মরল না!” বলতে বলতে সে হঠাৎ
থেমে গেল, তারপর জনের কলার চেপে ধরে বলল, “পাথরটা না পেলে বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?”
জন আমতা-আমতা করে বললেন,
“তুমি আমায় ভুল বুঝছ।”
“ভুল বুঝছি?
আমি যে-ঘটনাটার কথা বললাম, তুমি তোমার বিজ্ঞানী বন্ধুদের সেকথা বলতে পারবে? পারবে
উইন্ডসারের লোকেদের একথা জানাতে?”
জন সসংকোচে বললেন, “মহাজাগতিক প্রাণীর
ব্যাপারে কিছু বলতে গেলে আমার হাতে তো উপযুক্ত কোনো প্রমাণ থাকতে হবে। অন্তত পাথরটা যদি পাওয়া যেত…”
গ্যারির চোখ দিয়ে তখন যেন
আগুন ঝরছে। সে পকেটে হাত দিল এবং একটা ছোট্ট পাথরের টুকরো জনের সামনে টেবিলের
উপর ছুড়ে ফেলল। তারপর
আর একটা কথাও না বলে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
জন একবার গ্যারির চলে যাওয়ার
পথের দিকে দেখলেন। তার
পুরোনো বন্ধু আবার হারিয়ে যাচ্ছে সিডনি বন্দরের ভিড়ে। ক্রমশ দূরে, ধূসর থেকে ধূসরতম
হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশের পথে। আর জনের সামনে তখন পড়ে আছে একটা ছোট্ট
পাথরের টুকরো। কালচে
রং, গায়ে
অসংখ্য ছিদ্র। দেখে বোঝা যাচ্ছে, কোনো একটা বড়ো পাথর থেকে ছেনির সাহায্যে ভেঙে
নেওয়া হয়েছে সেটিকে।
জন অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন
পাথরটার দিকে। এটিই
কি তাহলে সেই মহাজাগতিক পাথর?
জন তাড়াতাড়ি পাথরটা হাতে
নিয়ে সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এলেন। গ্যারি তখন বহুদূর চলে গিয়েছে। জন চিৎকার করে গ্যারির নাম ধরে ডাকলেন, কিন্তু সে আর ফিরেও
তাকাল না। হারিয়ে
গেল সিডনি বন্দরের ভিড়ে।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment