
ইমেজ
প্রতীক কুমার মুখার্জি
প্রবল জনস্রোতে হাবুডুবু খেতে থাকা করুণাময়ী মেট্রোর ক্রসিংটা খোশমেজাজে
টপকায় রঙ্গন। আকাঙ্খিত উত্তেজনা চেপে, ভিড় কাটিয়ে অবিকল পাঁকাল মাছের সাবলীলতায় এগোচ্ছে সে।
অগণিত মানুষ এবং সিগনালে আটকানো যানবাহনকৃত জগঝম্পের
ফাঁকফোকর গলে, ভেসে আসছে ‘যেন ডাকছে বই…’-এর রুটিন গিটকিরি। বাস টার্মিনাস সংলগ্ন কয়েক
ফার্লং জমি পেরোতে পারলেই, নয়
নম্বর গেটে পৌঁছে যাবে রঙ্গন। গতকালই উদ্বোধন
হয়েছে ৪৫তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার। এবছরের মতো
প্রথমবার আজ সে পা দিতে চলেছে বইমেলার পূণ্যভূমিতে।
রঙ্গনের দুর্বারগতিতে হঠাৎই ভাঁটার টান পড়ে। বইমেলা প্রাঙ্গণে পা গলাবার আগে, একটা আত্মসমীক্ষা করে নেওয়া একান্তই জরুরি।
হুঁ হুঁ বাবা, সে তো আর বাবার হাত ধরে বইমেলায় ঘুরতে আসা
সেই ছোট্ট খোকাটি নয় - বর্তমানে এক সম্ভাবনাময়
লেখক হিসেবে রঙ্গন চৌধুরীর স্বতন্ত্র পরিচিতি গজিয়েছে! বিগত কয়েকবছর ধরে বিভিন্ন ওজনদার পত্রপত্রিকায় লেখার সুবাদে, এই মুহূর্তে
পাঠককূলে সে এক দানাদার সাহিত্যসেবী। কিছু
সংকলন ও বিদেশি বেস্টসেলারের অনুবাদক হবার বলে বলীয়ান হয়ে, সাহিত্যজগতে সে নিজের
প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ। কাজেই,
সেই সুনামের সাযুজ্য বজায় রাখতে তার বহিরাবরণ এবং চালচলনের আমূল ভোলবদল ঘটেছে -
ভাবতেই বরেণ্য সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের বইয়ের একটি টাইটেল মনে পড়ে রঙ্গনের
– ‘মাপা হাসি চাপা কান্না!’ মাথায় ভেসে ওঠে বিশেষ কিছু শব্দবন্ধনী – ‘ওল্ড ওয়াইন ইন নিউ বটল’, ‘ইমেজ ইজ হোয়াট দ্যাট সেলস’, ‘শোবিজ!’ মাথা নাড়িয়ে মুচকি হেসে, চুলে চিরুনি বুলিয়ে পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যমণি ‘ডিএফএমডি’-র দিকে পা বাড়ায় ভবিষ্যতের
তারকা সাহিত্যিক, রঙ্গন চৌধুরী।
বৈদ্যুতিন গেট গলে অন্যদিকে যাওয়ামাত্র, শশব্যস্ত পুলিশকর্মীরা যখন তার
কাঁধের ঝোলাটি পরীক্ষা করছেন, তখনও রঙ্গন ভাবলেশহীন।
কিন্তু দু-হাত তুলে
দাঁড় করিয়ে যখন শরীর হাতড়ে তল্লাশির ঘনঘটা শুরু হল, নিষ্ফল আক্রোশে তার ফেটে পড়ার
দাখিল! তবে, অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ চলবে
না - ইমেজ যে বড়োই বিষম বস্তু! রাগটা গিলতে বাধ্য হয় সে; তেতোমুখে লোকটাকে ‘ধন্যবাদ’ বলে এগোতে যাবে রঙ্গন, ঠিক তখনই ডানপায়ের পিছনে ভোঁতা একটা ওজন এসে তাকে সজোরে আঘাত করে! সেই
প্রবল অভিঘাতে পা মুড়ে মাটিতে বসে পড়তে গিয়েও সামলে নেয় সে। এই মুহূর্তে তার শারীরিক বিভঙ্গ যে কোনো সুপারহিরোর ‘ল্যান্ডিং পশ্চার’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ! প্রতি-আক্রমণের
জন্য সর্বতোভাবে প্রস্তুত রঙ্গন!
ভূপতিত হবার কারণটিকে চাক্ষুষ করে, যাবতীয় জিঘাংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে যখন কোনোক্রমে রঙ্গন উঠে দাঁড়াতে
পারল, তখন তার চোখমুখে আগুন ছুটছে, মগজে
বিপজ্জনকভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে দুনিয়ার অশ্লীল শব্দব্রহ্ম! ঘুরে দাঁড়াতেই যাঁর উপরে চোখ পড়ল, সেই মানুষটি তখন লজ্জায় এবং কুণ্ঠায় রীতিমতো অধোবদন! কয়েক মিলিসেকেন্ডের
মধ্যে রঙ্গনের উথলে ওঠা বদমেজাজ, চায়ে
ডোবানো বিস্কুটের মতো নেতিয়ে পড়ে ছত্রখান হয়ে গেল। কুমুদস্যার না? হ্যাঁ, কোনো ভুল
নেই! স্বয়ং কুমুদিনাথ চট্টোপাধ্যায়!
দু-হাতে নিজের সম্পাদিত লিটল
ম্যাগাজিন ‘কেতকী’-র পাহাড়প্রমাণ দুই বান্ডিলের ওজনে জেরবার, ভিজে সপসপে সবজেটে বাটিকের
ফতুয়ায় গলদঘর্ম মানুষটির চোখে তখন নিখাদ অনুশোচনা ও ক্ষমাভিক্ষার আর্তি! মুহূর্তের
মধ্যে রঙ্গনের মাথায় বিশেষ কিছু শব্দের সমাহার - বরেণ্য সাহিত্যিক, কলকাতার
ইতিহাসের অগ্রগণ্য গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, নাট্যব্যক্তিত্ব, সঞ্চালক, পরিচালক এবং সর্বোপরি সাহিত্যসম্রাট
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বংশধর - এহেন কুমুদস্যারের হাতের বোঝাটাই তার
পদস্খলনের কারণ!
এরপর কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়, সেই বর্ণনায় না যাওয়াই ভালো। কুমুদস্যার, ‘যেন কিছুই হয়নি’ অভিব্যক্তিতে মুখ ভরিয়ে হেসে, নিজের অত্যন্ত স্নেহের
প্রিয়পাত্র রঙ্গনকে বলেন, “বুড়ো
হচ্ছি তো, আর সামলাতে পারি না রে বাবা! তোর লাগেনি তো? তোদেরই এবার হাল ধরতে হবে তো, বল? ধর দেখি একটা বান্ডিল, চল স্টলে গিয়ে দাদা ভাই মিলে চা খাব! ও হ্যাঁ, তার আগে হাতেমুখে জল দিতে হবে। দ্যাখ দেখি, এই জানুয়ারিতেও গলগলিয়ে ঘামছি। তুই কবে লেখা দিচ্ছিস....!!!”
যন্ত্রমানবের মতো মানুষটাকে অনুসরণ করে রঙ্গন। স্যারের কথাগুলো বইমেলামুখী মানূ্ষের কোলাহলে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। চোখদুটো জ্বালা করে ওঠে রঙ্গনের। বইমেলার
আস্ত মাঠটা রঙ্গনের চোখের সামনে আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যায়, মনের পর্দায় ফুটে উঠতে থাকে কিছু শব্দ – ‘ফেক পিপল হ্যাভ অ্যান ইমেজ টু মেনটেইন!’
----------
গল্পে বর্ণিত ঘটনা কোনোভাবেই
কাল্পনিক নয়, এবং এর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের মিল থেকে থাকলে তা
একান্তভাবেই ইচ্ছাকৃত, এবং লেখক এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী। গোপনীয়তা রক্ষার্থে চরিত্রের নামগুলি শুধুমাত্র বদলে দেওয়া হয়েছে।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment