ম্যাজিক ল্যাম্প:: শারদীয় ২০২৬

দ্বাদশ বর্ষ।। প্রথম সংখ্যা।। অক্টোবর ২০২৬
শারদ সংখ্যা ১৪৩৩
-------------------

প্রচ্ছদ: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
----------

সম্পাদকীয়:: শারদ সংখ্যা ২০২৬


ম্যাজিক ল্যাম্পের প্রিয় বন্ধুরা,

কেমন আছ সবাই? পুজো তো চলে এল। কী মজা, তাই না? আমার ছোটোবেলায় আমি পুজোর আগে ডায়েরিতে লিখতাম কোন দিন কী পরব, কীভাবে সাজব, কেমনভাবে কাটাব আর কী কী খাব।
এখন সেই ডায়েরিগুলো পড়তে ভারী মজা লাগে। তোমরাও কি আমার মতো ডায়েরি লেখ? যদি অভ্যেস থাকে তবে তো খুব ভালো। দেখবে তোমার বড়োবেলায় ছোটোবেলার সেই ডায়েরিগুলো অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। এখন যখন সেই লেখাগুলো পড়ি, বুঝতে পারি তখন কত অল্প জিনিসেই কী ভীষণ খুশি হতাম। অবশ্য সেই সময়টা অনেকটাই অন্যরকম ছিল। আমার কাছে অনেক পুরোনো শারদ সংখ্যা ছিল। সেগুলোই ছুটির দুপুরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তাম।
কী যে মজার দিনগুলো ছিল। তখন যে আনন্দ পেয়েছি, ইচ্ছে করে তোমাদের হাতেও সেই আনন্দ তুলে দিই। তাই তো চলে এসেছি নতুন নতুন লেখায় ম্যাজিক ল্যাম্প পুজো সংখ্যা সাজিয়ে। তোমাদের প্রিয় সাহিত্যিকদের গল্প তো থাকছেই, সঙ্গে থাকছে ছড়া, কবিতা, কমিকস, বিজ্ঞানের প্রবন্ধ, ছোট্ট বন্ধুদের লেখা, আঁকা, আরও অনেক কিছু।
এই সংখ্যাটি সাজিয়ে গুছিয়ে তোমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন শ্রী তাপস মৌলিক।
তাহলে আর দেরি নয়, পড়তে শুরু করো ম্যাজিক ল্যাম্প। আর আমাদের জানাও কেমন লাগছে তোমাদের ম্যাজিক ল্যাম্প। পুজো খুব ভালো কাটুক তোমাদের।
ভালোবাসা নিও।

ইতি, জিনি
----------
ছবি - আন্তর্জাল

গল্প:: হেশোরামের চীন অভিযান - সৈকত মুখোপাধ্যায়


হেশোরামের চীন অভিযান
সৈকত মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়মাসের সন্ধেবেলা। টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গড়পাড় রোড ধরে বাড়ি ফিরছিলাম। গিয়েছিলাম বিখ্যাত লালনের দোকান থেকে তেলেভাজা কিনতে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে গিয়েছিলাম, একটা আলুর চপ আর একটা মোচার চপের বেশি আর কিচ্ছুটি খাব না, কিন্তু দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তেলেভাজার প্রাণকাড়া গন্ধের চোটে প্রতিজ্ঞা ভুলে গেলাম। বড়োসড়ো একটা ঠোঙা ভর্তি করে পাঁচ-ছ’রকমের চপ কিনে খেতে খেতে যখন বাড়ির দিকে রওনা হলাম, তখন মনে হচ্ছিল স্বর্গসুখ বোধহয় একেই বলে।
একে রোববার, তায় লাগাতার বৃষ্টি। ফলে সন্ধে সাতটাতেই গড়পাড় রোড একেবারে নির্জন। দু-পাশের পুরোনো বাড়িগুলোর বন্ধ জানলার ফাঁক দিয়ে কখনও কখনও একটা দুটো আলোর রেখা রাস্তায় এসে পড়েছে। তাতে অন্ধকারই যেন আরও ঘন হচ্ছিল। সে যাই হোক, এ আমার ছোটোবেলার পাড়া, এখানে চলতে গেলে অত আলো-টালো লাগে না।
হঠাৎ একেবারে কানের কাছে মিহি গলায় কে যেন বলে উঠল, “এক্সকিউজ মি। তাতাবাবুর বাড়িটা কোনদিকে বলতে পারবেন?”
চমকে উঠে দেখি, ভারি অদ্ভুত চেহারার এক ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি যে কোথা থেকে উদয় হলেন বুঝতে পারলাম না। বয়স মনে হল বছর চল্লিশ হবে। লম্বাটে মুখের বারো আনাই ঘন কালো গোঁফদাড়িতে ঢাকা। সে গোঁফদাড়ির না আছে কোনো ছিরি, না আছে ছাঁদ। নাকটা টিয়েপাখির মতো। চোখে অদ্ভুত গোল ফ্রেমের চশমা। হাফপ্যান্টের সঙ্গে একটা ছোটো সাইজের পাঞ্জাবি পরেছেন। পায়ে গামবুট।
পাগল বলে সন্দেহ করতে গিয়েও করতে পারলাম না, কারণ কথাবার্তা বেশ স্বাভাবিক আর ভদ্র। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবার বললেন, “তাতাবাবু। চেনেন নাকি তাঁর বাড়িটা?”
অনেকক্ষণ ভেবেও ওই নামে কারুর কথা মনে পড়ল না। বললাম, “ভালো নামটা বলতে পারবেন? অন্তত পদবিটা?”
উনি মাথা চুলকে বললেন, “সেইটাই তো হয়েছে মুশকিল। অনেক বছর আগে একবার কিছুক্ষণের জন্যে এসেছিলাম। ডাকনামটা ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ছে না।”
ভদ্রলোকের পাশেই একটি কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। আমি যতক্ষণ তাতাবাবুর হদিশ খুঁজছি ততক্ষণে সে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এবার আমাকে ভীষণ চমকে দিয়ে একেবারে আমার পিঠের কাছ থেকে কথা বলে উঠল। দেখলাম, শুধু যে পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে তাই নয়, হাত বাড়িয়ে আমার তেলেভাজার ঠোঙাটাও ফাঁকা করে দিয়েছে। আমার অবাক চোখের সামনে শেষ টমেটোর চপটা মুখে পুরে দিয়ে বলল, “মামা, উনি যে পত্রিকাটা বের করতেন সেটার নামটা বলো না… ওই যেখানে আমাদের অভিযানের কাহিনিগুলো বেরিয়েছিল।”
দাড়িওলা ভদ্রলোক বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সন্দেশ। সন্দেশের অফিসটা চেনেন ভাই?”
এতই অবাক হলাম যে খালি ঠোঙাটা হাত থেকে ফেলবার কথাও ভুলে গেলাম। এনারা কি সুকুমার রায়কে খুঁজছেন? তাঁরই তো ডাকনাম ছিল তাতা। কী যেন সন্দেহ হতে বললাম, “আপনার নামটা কী স্যার?”
তিনি উত্তর দিলেন, “প্রফেসর হেশোরাম হুঁশিয়ার। আর এ আমার ভাগনে, চন্দ্রখাই।”
বুঝলাম, ঠিকই সন্দেহ করেছিলাম। সেই বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হেশোরাম হুঁশিয়ার, সন্দেশের পাতায় যাঁর বন্দাকুশ পর্বতে অভিযানের কাহিনি লিখে গিয়েছিলেন সুকুমার রায়। যে অভিযানে বেরিয়ে তাঁরা গোমড়াথেরিয়াম, ল্যাগব্যাগার্নিস, চিল্লানোসেরাস প্রভৃতি প্রাণীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন এবং শেষমেষ প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে কোনোরকমে প্রাণটা নিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন।
হাতজোড় করে বললাম, “স্যার! তাতাবাবু মানে সুকুমার রায় মশায়কে তো আর পাবেন না। তাঁর সুযোগ্য পুত্র মানিকবাবু অবধি অনেকদিন হল গত হয়েছেন। পেছনদিকে তাকিয়ে দেখুন, ওই যে লালরঙের স্কুলবাড়িটা দেখছেন, ওটাই এককালে ছিল ওনাদের বসতবাড়ি এবং সন্দেশের দপ্তর। আপনারা বোধহয় আগেরবার ওখানেই এসেছিলেন।”
প্রফেসর হুঁশিয়ার ভারি বিষণ্ণ মুখে বললেন, “যাঃ। তাহলে আমার নতুন অভিযানের গল্পগুলো কোথায় ছাপাব?”
প্রবল উৎসাহের সঙ্গে বললাম, “এবারেও ডায়েরি লিখেছিলেন নাকি? আপত্তি না থাকলে চলুন, সেটি ওই হৃষিকেশ পার্কের বেঞ্চিতে বসে পড়া যাক। যদি পছন্দ হয় আমি ম্যাজিক ল্যাম্পে ছাপানোর বন্দোবস্ত করে দেব।”
হৃষিকেশ পার্কে ভ্রমণার্থীদের বসার জন্যে বেশ ক’টা ছাউনি আর বেঞ্চ আছে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে সেরকমই একটা ছাউনির নীচে আমরা তিনজনে বসলাম। ছাউনির অন্য কোনায় একটা ঝালমুড়িওলা ব্যাজার মুখে বসেছিল। বৃষ্টিতে আর বিক্রিবাটার আশা ছিল না। চন্দ্রখাই তাকে ডেকে কেজিখানেক মুড়ি, বাদাম, নারকেলকুচি এইসব তো খেলই, কুড়িটা কাঁচালঙ্কা অবধি কচমচ করে খেয়ে নিল। মুড়িওলাকে একশো টাকা আমিই দিলাম, কারণ চন্দ্রখাই পকেট হাতড়ে যা বার করল সবই বৃটিশ আমলের বাতিল নয়া পয়সা। মুড়িওলা সেগুলো নিতে রাজি হল না।
ইতিমধ্যে প্রফেসর হুঁশিয়ার তাঁর পিঠের নোংরা ঝোলা থেকে একটা মোটা ডায়েরি বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। তারিখ দেখে মনে হল ওনারা একটা সময়ের গ্যাপে পড়ে আজকের কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন। নাহলে অবশ্য এতদিন বেঁচে থাকারও কথা নয়।
ডায়েরির প্রথমদিকের ক’টা পাতায় যা লেখা ছিল পড়ছি—

#             #             #            #            #

২১ জুন ১৯২৫ - উত্তর চীনের আনখাই পর্বতের পাদদেশে শিষপালং অরণ্য
এবারেও সেই ১৯২২-এর দলটাকে নিয়েই বেরিয়েছি। আমি, চন্দ্রখাই, ছক্কড় সিং, লক্কড় সিং আর আমার পোষা কুকুর। শুধু এ-যাত্রায় আমরা কোনো কুলি পাইনি। কারণ এই ড্রাগনের অরণ্যে লোকাল কুলিরা প্রাণ থাকতে ঢুকবে না। মালপত্র নিজেদেরই বইতে হচ্ছে। খাবারের বস্তাগুলোকে চন্দ্রখাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করাটাই একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।
কাল গভীর রাতে বিস্কুট চিবোনোর কড়মড় শব্দে ঘুম ভেঙে যেতে ভাবলাম, চন্দ্রখাই নিশ্চয় হ্যাংলামি শুরু করেছে। কিন্তু টর্চের আলো ঘুরিয়ে খাবারের বস্তার ওপরে ফেলতেই দেখলাম, চন্দ্র নয়, ড্রাগনে বিস্কুট চুরি করে খাচ্ছে। প্রথমে অবশ্য ড্রাগন বলে বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম কুমীর। তারপর দেখলাম কুমীরের মাথায় শিং আছে, পিঠের ওপরে ভাঁজ করা বাদুড়ের মতো পাখনাও আছে। আমার চোখে চোখ পড়তে ক্যান্টনিজ ভাষায় বলল, “প্রাণের সংকুলান সটান সটকান।” এই বলে সবুজ পাখনা মেলে হুস করে উড়ে গেল।
ব্যাটা ড্রাগন জানে না, প্রফেসর হুঁশিয়ার এইসব সামান্য হুমকির কাছে মাথা নোয়াবার পাত্র নয়।

২৩ জুন ১৯২৫, ছিন্দাবাম নদীর অববাহিকা
গতকাল দুপুরের দিকে একটা পাথরের খাঁজে বড়োসড়ো চারটে ডিম দেখতে পেয়ে চন্দ্রখাই সেগুলোকে তুলে নিয়ে এসেছিল। ভেবেছিল বুনো পায়রার ডিম— ওমলেট ভেজে খাবে। কিন্তু তাঁবুতে আনামাত্রই ডিম ফুটে চারটে বেগুনি খরগোশের মতন ছানা বের হল। সেগুলো এতই দুরন্ত যে সামলে রাখাই মুশকিল হচ্ছিল। ছক্কড় সিং একটা ছানাকে ঘাড় ধরে খাঁচায় পুরতে গিয়েছিল। ছানাটা মুখ দিয়ে হুস করে আগুনের শিখা বের করে ছক্কড়ের হাত পুড়িয়ে দিয়েছে। ফায়ার ড্রাগনের কথা বইতেই পড়েছিলাম; এই প্রথম চোখে দেখলাম। ভাগ্য ভালো, একটু বাদে ওদের বাবা-মা এসে ঠোঁটে করে ছানাগুলোকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ার দিকে উড়ে গেছে। তবে যাবার আগে মুখের আগুনে আমার শখের ছাতাটা পুড়িয়ে দিয়ে গেছে। তাই মন খারাপ।

২৫ জুলাই, লেপটং লেকের তীরবর্তী তৃণভূমি
গত একমাসে নানা ধরনের ড্রাগনের অত্যাচারে আমাদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ড্রাগনদের মনে বিজ্ঞান-শিক্ষার ইচ্ছা অত্যন্ত প্রবল, তাই তারা আমার দূরবিন, কম্পাস, সেক্সট্যান্ট এমনকি আমার চশমাজোড়া অবধি চুরি করে নিয়ে গেছে। তাছাড়া ক’টি ড্রাগনের ছানা সূর্যের আলোর সামনে ম্যাগনিফাইং-গ্লাস ধরে ছক্কড় আর লক্কড়ের দাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তাঁবুতেও আগুন ধরিয়ে দিত, যদি না ধিনিকেষ্ট থাকত।
ধিনিকেষ্টর পরিচয়টা একটু আলাদা করে দেওয়া উচিত। এখনও অবধি চীনদেশে এসে যত প্রকারের ড্রাগন দেখলাম, তাদের মধ্যে ধিনিকেষ্টই আকারে সবচেয়ে বড়ো এবং প্রকারে সবচেয়ে নিরীহ। তার শরীরটা হাতির মতো, মুখটা কেষ্টনগরের দাড়িওলা বুড়ো পুতুলের মতো আর হাতের জায়গায় ডানা আছে। আমার কুকুর কেলেকেষ্টর সঙ্গে তার এমনই সখ্য গড়ে উঠেছে যে, সে আমাদের ক্যাম্প ছেড়ে যেতেই চায় না। কেলেকেষ্টর সঙ্গে নাম মিলিয়েই তার নাম ধিনিকেষ্ট রাখা হয়েছে।
ধিনি আর কেলো মিলে যদি দিনরাত আমাদের ক্যাম্প পাহারা না দিত তাহলে আমাদের আজ জ্যান্ত থাকার কথা ছিল না।

৩০ জুলাই, নানফড়িং গ্লেসিয়ারের নীচের উপত্যকা
সর্বনাশ হয়ে গেছে। গতকাল সকাল থেকেই জমাট গ্লেসিয়ারের পেট থেকে হুড়মুড় দুড়দুড় নানারকমের আওয়াজ বেরোচ্ছিল। আমি অনেকবার করে বলেছিলাম, লক্ষণ ভালো ঠেকছে না, চলো পালাই। কিন্তু ছক্কড় আর লক্কড় জেদ ধরে বসে রইল গ্লেসিয়ারের গায়ে যে সুস্বাদু ছত্রাক জন্মায় তা অন্তত বিশ কেজি সংগ্রহ না করে তারা দেশে ফিরবে না। তারপর যেই না সেই ছত্রাকের চাঙড়ে প্রথম কোদালের কোপটা বসিয়েছে, অমনি পুরো গ্লেসিয়ারটাই হুড়মুড় করে ধসে পড়ল।
বরফগলা জলের রাশি বেরিয়ে এসে লেপটং লেক, ছিন্দাবাম নদী সব প্লাবিত করে, যাবতীয় পশুপাখি ড্রাগন-টাগন ভাসিয়ে নিয়ে কোথায় চলে গেল আর হদিশই পেলাম না। আমিও তলিয়েই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ ধিনিকেষ্ট তার জোরালো থাবায় আমাকে আঁকড়ে ধরে উড়ে চলল। দেখলাম ওর পিঠের ওপরে ইতিমধ্যেই চন্দ্রখাই আর কেলেকেষ্ট বসে রয়েছে। লক্কড় আর ছক্কড়কে কোথাও দেখতে পেলাম না।

#             #             #            #            #


এই অবধি পড়ার পরে প্রফেসর হুঁশিয়ারকে জিজ্ঞেস করলাম, “লক্কড় সিং আর ছক্কড় সিং-এর কী হল?” উনি বললেন, “একমাস বাদে লুধিয়ানা থেকে লক্কড়ের তার পেয়েছিলাম, ওরা দু-ভাই এ-নদী ও-নদীর স্রোত ধরে ভাসতে ভাসতে একেবারে শতদ্রু নদীতে এসে উঠেছিল। সেটা বলতে গেলে ওদের গ্রামের পাশেই।”
“আর ধিনিকেষ্ট? সেই ভালো ড্রাগন?”
“ধিনিকেষ্ট কুকুর রূপ ধারণ করেছে। আমার কোন্নগরের বাড়ির রাস্তায় ও আর কেলেকেষ্ট সুখেই দিন কাটাচ্ছে। তবে ও ভাত খেতে পারে না, চাউমিন খায়।”
“এই অভিযানের আর কিছু প্রমাণ-টমাণ নেই আপনাদের কাছে? কোনো ফোটোগ্রাফ বা স্যাম্পেল?”
চন্দ্রখাই একমনে ঘাস চিবোচ্ছিল। হঠাৎ পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা আধহাত লম্বা সবুজ রঙের গিরগিটির মতন প্রাণী বার করে আমার কোলে ছেড়ে দিল। বলল, “এই ড্রাগনটা কখন যেন আমার ব্যাকপ্যাকের মধ্যে ঢুকে বসেছিল। এটাকে আপনি রাখতে পারেন। এর মুখ দিয়ে হু হু করে গরম নিশ্বাস বয়— আপনার ভিজে চুল শুকোতে খুব কাজে দেবে।”
আমি চমকে ওটাকে কোলের ওপর থেকে ছুড়ে ফেলে দিতেই হেশোরাম হুঁশিয়ার, চন্দ্রখাই, তাদের ব্যাগপত্তর এমনকি সেই ডায়েরিটা অবধি মুহূর্তের মধ্যে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ড্রাগনটাকে খুঁজতে গিয়ে ঝোপের মধ্যে থেকে একটা সবুজ রঙের চাইনিজ হেয়ার-ড্রায়ার খুঁজে পেলাম। এখন সেটা নিয়েই বাড়ি ফিরছি।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)