
বানান ভুল
কৃষ্ণেন্দু সরকার
বয়স: ষোলো
শ্রাবণের বিকেল। আকাশটা সকাল থেকেই মুখ ভার করে ছিল। বিকেলের দিকে শুরু হয়েছে টিপটিপ বৃষ্টি। ভেজা মাটির গন্ধে চারদিক যেন কেমন একটা বিষণ্ন অথচ শান্ত হয়ে উঠেছে।
ক্লাবঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই বিরক্ত গলায় বলে উঠলাম, “ধুর! আর ভালো লাগে না। বাড়ি থেকে বেরোতেই মাঝরাস্তায় এমন বৃষ্টি নামল যে পুরো ভিজে গেলাম!”
ঘরে তখন লোডশেডিং। অন্ধকার ঘরের মাঝখানে একটা মোমবাতি জ্বলছে। তার কাঁপতে থাকা আলোয় দেয়ালে ছায়াগুলোও যেন বৃষ্টির তালে তালে নড়ছে।
উত্তরের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেষ্টদা। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মনে হচ্ছে আজ আর বৃষ্টি থামবে না।”
ঘরের এক কোণে কাঠের চেয়ারে বসে থাকা অমৃত হঠাৎ বলল, “কেষ্টদা, জানো? আমাদের পাড়ার বুবাই নাকি মাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম হয়েছে!”
“তাতে তোর মুখ এমন শুকিয়ে গেল কেন?” হেসে জিজ্ঞেস করলেন কেষ্টদা।
অমৃত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বাড়িতে সবাই এখন শুধু বুবাইয়ের কথাই বলে। বলে, ওকে দেখে শিখতে। কিন্তু আমি কি বুবাই? আমার তো গান ভালো লাগে। পড়াশোনা করি, কিন্তু সবাই শুধু নম্বর দেখে।”
কেষ্টদা কিছু বললেন না। শুধু মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হল। দেখি হারু, বগলে ছাতা, হাতে চার কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গেঞ্জিটা বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে চুপচুপে।
আমি হেসে বললাম, “আয়, আয়। আগে গামছা দিয়ে গা মোছ।”
হারু চা এগিয়ে দিয়ে বলল, “আজ বৃষ্টির দিনে গল্প না হলে জমবে না কিন্তু!”
চায়ে চুমুক দিতে দিতে কেষ্টদা বললেন, “গল্প শোনাব? আচ্ছা, শোনো। তবে এটা শুধু গল্প নয়। এটা এমন একজনের কথা, যে একসময় নিজের নামের থেকেও বেশি পরিচিত ছিল একটা নামে—”
তিনি একটু থামলেন। বাইরে বজ্রপাত হল।
কেষ্টদা ধীরে ধীরে বললেন, “বানান ভুল।”
আমরা সবাই চমকে উঠলাম।
কেষ্টদা জানলার বাইরে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন…
“উত্তর কলকাতার এক পুরোনো
বাড়িতে
থাকত একটা ছেলে। নাম তার কালাচাঁদ। নামটা শুনে স্কুলের বন্ধুরা হাসত। কেউ বলত ‘কালী’, কেউ বলত ‘চাঁদু’। কিন্তু কালাচাঁদ এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাত না। সে ছোটোবেলা
থেকেই অন্যরকম ছিল।
পড়াশোনায় খারাপ ছিল না, কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল আঁকা। খাতা খুললেই অঙ্কের বদলে গাছ, নদী, মেঘ, মানুষের মুখ আঁকতে শুরু করত।
তার মা মাঝে মাঝে বকতেন, ‘খাতায় এত ছবি আঁকিস কেন?’
কালাচাঁদ হেসে বলত, ‘ছবিগুলো নিজে থেকেই চলে আসে মা।’
মা রাগ দেখালেও মনে মনে ছেলের এই প্রতিভা দেখে খুশিই হতেন, কিন্তু তার বাবা ছিলেন অন্য ধরনের মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন জীবনে সফল হতে গেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বড়ো অফিসার হওয়াই একমাত্র পথ। একদিন পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার পর বাবা ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘দেখিস কালা, তোকে বড়ো হয়ে ডাক্তার হতেই হবে।’
কথাটা সাধারণ আশীর্বাদের মতো শোনালেও ছোট্ট কালাচাঁদের মনে সেটা অদ্ভুত এক ভয়ের বীজ বুনে দিয়েছিল...”
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। মোমবাতির আলোয় কেষ্টদার মুখটা যেন আরও গম্ভীর
দেখাচ্ছিল।
হারু অধৈর্য হয়ে বলল, “তারপর?”
কেষ্টদা চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলেন। বাইরে
বৃষ্টি তখন অনেকটাই কমে এসেছে। দূরে কোথাও বিদ্যুতের আলো জ্বলে উঠছে,
নিভেও যাচ্ছে আবার। আমরা সবাই কেষ্টদার দিকে তাকিয়ে।
হারু
আর অপেক্ষা করতে না পেরে বলে উঠল, “কেষ্টদা, তারপর কী হল?”
কেষ্টদা
মোমবাতিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন...
“গল্প দিয়েই মেটাতে হয় বাস্তবতার দাম, লেখক হয়ে পালটাই তাই চরিত্রদের নাম –
সময়
কারও জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে কালাচাঁদ ক্লাস টেনে উঠল। বয়স তখন ষোলো।
চারদিকে
একটাই শব্দ—‘বোর্ড পরীক্ষা।’ সকাল
থেকে রাত। বাড়িতে, স্কুলে, পাড়ায় – সব জায়গায়
শুধু পরীক্ষার কথা। মনে হত যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পৃথিবীতে আর
কিছু নেই।
এক
রবিবারের সকাল। সপ্তাহের একমাত্র ছুটির দিন। কালাচাঁদ একটু বেশি ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ
বাবার চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল, ‘তোর কি কোনো লজ্জা নেই? সামনে পরীক্ষা, আর তুই ঘুমোচ্ছিস!’
কালাচাঁদ
বিছানা থেকে উঠে বসল। কিছু বলল না। আজকাল সে খুব কম কথা বলে। কারণ সে বুঝে গেছে, কিছু
কিছু কথা বললেও কেউ শোনে না।
কয়েকদিন
পরে স্কুলে ইতিহাস ক্লাস চলছিল। ইতিহাস শিক্ষিকা হঠাৎ বললেন, ‘বলো তো, তোমরা বড়ো হয়ে কী হতে চাও?’
একজন
বলল ডাক্তার। আরেকজন বলল ইঞ্জিনিয়ার। কেউ বলল বিজ্ঞানী। কেউ বলল আইএএস অফিসার। সবাই
উৎসাহ নিয়ে উত্তর দিচ্ছে। তারপর শিক্ষিকার চোখ এসে থামল কালাচাঁদের উপর। ‘তুমি বলো।’
কালাচাঁদের
বুক ধুকপুক করতে লাগল। তবু সে দাঁড়াল। মুখে একটা ছোট্ট হাসি ফুটল। ‘আমি একজন শিল্পী হতে চাই।’
মুহূর্তের
মধ্যে পুরো ক্লাস নীরব হয়ে গেল।
তারপর
– হাসির শব্দ। প্রথমে কয়েকজন। তারপর
পুরো ক্লাস।
ইতিহাস
শিক্ষিকাও হেসে ফেললেন। ‘তুমি? আর্টিস্ট? নিজের
খাতায় এত বানান ভুল করো আর তুমি হবে শিল্পী? আর্টিস্ট
হওয়া কি এত সহজ?’
ক্লাসরুম
আবার হাসিতে ভরে উঠল।
সেদিন
কালাচাঁদ আর কোনো কথা বলেনি। চুপচাপ নিজের বেঞ্চে বসে ছিল। কিন্তু তার ভেতরে যেন
কিছু একটা ভেঙে গিয়েছিল। একটা স্বপ্নকে যখন সবাই মিলে অপমান করে তখন শব্দের চেয়েও বেশি ব্যথা লাগে।
তার
কিছুদিন পর ছিল কালাচাঁদের জন্মদিন। সে স্কুলে লজেন্স নিয়ে গিয়েছিল। সবাইকে
দিয়েছিল। হাসিমুখে। কারণ সে চেয়েছিল সবাই তাকে বন্ধু ভাবুক। শেষে একটা লজেন্স
নিয়ে গেল ক্লাসের প্রথম হওয়া এক ছাত্রীর কাছে।
মেয়েটি
তার দিকে তাকাল। তারপর লজেন্সটা নিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। ‘দরকার নেই।’
কালাচাঁদ
কিছু বলল না। শুধু মাটিতে পড়ে থাকা লজেন্সটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল, সে যেন লজেন্স নয়, নিজের সম্মানটাই মাটিতে পড়ে থাকতে দেখছে।
তারপর
এল বোর্ড পরীক্ষা। জীবনের প্রথম বড়ো পরীক্ষা। সবাই
ভেবেছিল কালাচাঁদ ভেঙে পড়বে, কিন্তু সে
ভাঙল না। বরং সমস্ত অপমান, কষ্ট আর রাগকে শক্তিতে পরিণত করল। দিনরাত
পড়াশোনা করল। পরীক্ষা দিল। আর ফল বেরোলে দেখা গেল, সে খুব ভালো
নম্বর পেয়ে পাশ করেছে।
কিন্তু
তার আসল লড়াই তখনও বাকি। উচ্চশিক্ষার জন্য সে কলকাতা ছেড়ে
অন্য শহরে চলে গেল। সঙ্গে ছিল কয়েকটা বই। একটা ব্যাগ। আর রংতুলির বাক্স।
বছর
কেটে গেল। এক বছর। পাঁচ বছর। দশ বছর।
ধীরে
ধীরে কালাচাঁদের নাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। তার ছবি প্রদর্শনীতে জায়গা পেল। পত্রিকায়
তার সাক্ষাৎকার বেরোল। দেশের নানা জায়গায় তার আঁকা নিয়ে আলোচনা শুরু হল।
একদিন
সে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিল। সেদিন রাতে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে
অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। মনে হচ্ছিল, শৈশবের সেই
অপমানগুলো যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
বহু
বছর পরে এক বর্ষার দিনে কালাচাঁদ ফিরে এল নিজের শহরে। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। কাঁধে
ঝোলা। মুখে দাড়ি। চোখে আত্মবিশ্বাস। হাতে এক হাঁড়ি মিষ্টি।
মা
তাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। কালাচাঁদও কাঁদল, কারণ
সাফল্যের আনন্দের চেয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ বড়ো।
দু-দিন পরে সে গেল নিজের পুরোনো স্কুলে। সব কিছু বদলে গেছে। নতুন
ভবন। নতুন রং। নতুন মানুষ। শুধু স্মৃতিগুলো একই রয়ে গেছে।
সে
এসেছিল একজনের সঙ্গে দেখা করতে। ইতিহাস শিক্ষিকার সঙ্গে। যিনি একদিন তাকে বলেছিলেন, ‘বানান ভুল করা ছেলে কখনও শিল্পী হতে পারে না।’
কিন্তু
স্কুলে গিয়ে সে জানতে পারল, শিক্ষিকা বহু বছর আগেই অবসর
নিয়েছেন। এখন আর এখানে পড়ান না।
কালাচাঁদ
কিছুক্ষণ স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। দূরে ছাত্রছাত্রীদের
হাসির শব্দ।
হঠাৎ
তার মনে হল, আসলে মানুষের কাছে নিজেকে প্রমাণ
করার চেয়ে নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সে
হাসল। মৃদু। শান্ত। অনেক বছরের একটা বোঝা যেন নেমে গেল।”
কেষ্টদা
গল্প থামালেন। ঘরের মধ্যে তখন আলো জ্বলে উঠেছে। লোডশেডিং শেষ।
আমি
লক্ষ করলাম, কেষ্টদার
চোখের কোণে জল। তিনি তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে জানলার দিকে তাকালেন।
বৃষ্টি
প্রায় থেমে গেছে। দূরে কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে একটুকরো চাঁদের আলো বেরিয়েছে।
কেষ্টদা
আস্তে করে বললেন, “মনে রাখিস, জীবনের সবচেয়ে বড়ো বানান ভুল খাতায় হয় না। হয় তখন, যখন আমরা অন্যের স্বপ্নকে ছোটো
করে দেখি।”
ঘরের
মধ্যে আর কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু জানলার বাইরে শ্রাবণের শেষ বৃষ্টির ফোঁটাগুলো
টুপটাপ শব্দ করে পড়তে লাগল আর মেঘের গর্জন এখনও থামেনি।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: তাপস মৌলিক)
No comments:
Post a Comment