
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জি
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে পলাশপুর নামের এই ছোট্ট মফস্বলে। একদল ছেলে একটা নেড়ি কুকুরের লেজে পটকা বাঁধার চেষ্টা করছে। কুকুরটা ভয়ে কুঁকড়ে আছে, পালাবার পথ পাচ্ছে না। দুটো ছেলে ওর পা চেপে ধরে আছে, বাকি দুজন লেজ নিয়ে ব্যস্ত। এবার অগ্নিসংযোগের পালা।
“এই! ছাড় ওটাকে!”
একটা সরু অথচ তীব্র গলার চিৎকার ভেসে এল হঠাৎ। কোনো বাচ্চা ছেলের গলা, কিন্তু তাতে এমন একটা কিছু আছে যে সবাই থমকে গিয়ে ঘুরে তাকাল। দেখা গেল, অদূরেই বিপুল দাঁড়িয়ে আছে। বিপুলের বয়স বারো বছর। এই পাড়ারই ছেলে, সবাই চেনে ওকে। রোগাটে ছোটোখাটো চেহারা, গায়ে একটা মামুলি চেক কাটা জামা, গাঢ় নীল রঙের হাফ প্যান্ট। তার চোখে এখন একটা অদ্ভুত চাহনি।
ছেলেদের দলের মধ্যে যে একটু সর্দার গোছের, তার নাম রকি। সে ওর সামনে এগিয়ে এল। “ছাড়ব? কেন রে? তোর কেউ হয় বুঝি কুকুরটা?”
বাকিরা বিশ্রি হেসে সে কথায় তাল দিল, “জাতভাই হতে পারে কিন্তু রকিদা!”
আরেকজন বলল, “ওর নিজেরও লেজ-টেজ থাকতে পারে। আছে কিনা দেখব নাকি? প্যান্টে লুকিয়ে রেখেছে হয়তো। বলো তো ওর লেজেও কয়েকটা...”
সে বিপুলের দিকে এগোতে যাচ্ছিল, অমনি বলা নেই কওয়া নেই, কোথা থেকে একঝাঁক মৌমাছি বোঁ করে তেড়ে এল রকিদের লক্ষ্য করে। এদিকে আবার মৌমাছির চাক হল কোথায়? এসব ভাবার অবকাশ দিল না মধুমক্ষী বাহিনী। সব ক’টা ছেলের দিকে আলাদা করে ধেয়ে গেল তারা। স্বভাবতই ওরা মৌমাছি তাড়াতে আর নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। সেই ফাঁকে অসহায় কুকুরটা তাদের হাত ফসকে তিরবেগে ছুট লাগাল অন্যদিকে। তাজ্জব ব্যাপার! মৌমাছিগুলোও যেমন এসেছিল তেমনই আবার উধাও হল নিমেষে। এলই বা কোথা থেকে, গেলই বা কোনদিকে?
মজাটা মাটি হয়ে যাচ্ছে দেখে রকিরা আবার কুকুরটাকে ধরার তোড়জোড় করল, “ধর, ধর, ব্যাটাকে। পালাচ্ছে যে!” কিন্তু সেটাও যে কোন চুলোয় ভেগেছে, কেউই ঠিক ঠাহর করতে পারল না।
বিপুলও এই সুযোগে সুট করে অন্ধকার হয়ে আসা গলির মধ্যে সরে পড়ল। রকি একবার সেদিকে দেখল বটে, কিন্তু কুকুরটাকে খোঁজা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে। তাই বিপুলের চলে যাওয়া পথের দিকে একবার জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে, দাঁত কিড়মিড় করে, ফের দলের বাকিদের সঙ্গে কুকুরটাকে খুঁজতে লেগে গেল।
ওই অন্ধকার গলির মধ্যে তখন সেই কুকুরটা বিপুলের পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পায়ে নাক ঘষে কুঁই কুঁই করে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে সে আপন ভাষায়। বিপুল সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে লেজ থেকে আলগোছে খুলে নিল বেঁধে রাখা কালিপটকার গোছাটা।
“একদম ওদের কাছাকাছি যাবি না আর, বুঝলি? সব সময় কি আর আমি থাকব তোকে বাঁচাতে?” এই বলে পকেট থেকে দুটো মেরি বিস্কুট বের করে ওকে খাইয়ে দিল। তারপর ওর পিঠে দুটো আলতো চাপড় মেরে বলল, “যা এবার। আমিও বাড়ি ফিরি।” লেজ নেড়ে একবার ‘ভৌ’ বলে ছুট লাগাল কুকুরটা। বিপুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। মৌমাছিদের ব্যাপারটা নিয়ে যদিও তার মনে একটু কৌতূহল জমছিল, তবে বিপুল আর সেটা নিয়ে এখুনি খুব বেশি কিছু ভাবল না।
বিপুলের নিজস্ব পৃথিবীটা আসলে ঠিক বাকিদের মতো নয়। ছোটোবেলা থেকেই কেউ অযথা গাছের ডাল ভাঙলে, ফুল-পাতা ছিঁড়লে বিপুলের মনে হয় কেউ যেন ওরই হাত-পা ভেঙে দিচ্ছে। সে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ওঠে, সবাই ভাবে, এ আবার কেমন পাগল! বিপুল নিজের কষ্ট নিজের মনের মধ্যেই চেপে রাখে, কেউ তাকে ঠিক বুঝতে পারে না, শুধু ওর বৃদ্ধা ঠাকুমা ছাড়া। বিপুল যখন একদম ছোট্টটি, ওর বাবা কোথায় যেন চলে গেছিল বাড়ি ছেড়ে। আর ফেরেনি। ওর মা-ও তার বছর দুয়েক বাদেই কী একটা কঠিন অসুখে ভুগে ‘আকাশে’ চলে গেছে। তার পর থেকে ঠাকুমাই ওর সবকিছু।
সেদিন দুপুরে বাড়ির উঠোনের এক কোণে বসে বিপুল দুটো কাঠবেড়ালিকে মুড়ি আর বাদাম খাওয়াচ্ছিল। ওরা বিপুলের হাতের তালু থেকে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে, হঠাৎ বিপুলের কানে এল একটা করুণ স্বর। অন্য যে কোনো লোকে প্রথমে সেই শব্দ শুনে ভাববে পাখির কিচিরমিচির। কিন্তু বিপুলের মনে হল, এটা শুধু পাখির ডাক নয়, যেন কারও গভীর কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। শব্দটা আসছে পাশের বাড়ি থেকে। ওটা শ্যামাদাস কাকুর বাড়ি।
বিপুল তখুনি একদৌড়ে সেখানে চলে গেল। শ্যামাদাস কাকুকে দেখতে পেল না সে। কিন্তু বারান্দায় একটা ছোট্ট খাঁচায় একটা মুনিয়া পাখি রয়েছে, দেখল। আওয়াজটা ওর গলা থেকেই আসছে, এটা পরিষ্কার। বিপুলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ও কালবিলম্ব না করে সটান গিয়ে খাঁচার দরজাটা খুলে দিল। পাখিটা আনন্দে চিড়িক করে একটা আওয়াজ ছেড়েই ফুড়ুৎ! উড়ে গেল সোজা উপরে। উঠোনের জামরুল গাছটায় একবার বসেই আবার ডানা ঝাপটে আরও দূরে উড়াল দিল। বিপুল মুগ্ধ হয়ে সেদিকে চেয়ে আছে, অমনি ঘরের ভিতর থেকে শ্যামাদাসকাকু এসে হাজির! এসেই ব্যাপারখানা ঠাহর করে একেবারে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে চিৎকার করে উঠল, “হায় হায় হায়! এই, এই হতভাগা ছেলে! আমার সাধের মুনিয়াটাকে উড়িয়ে দিলি? দাঁড়া আজ তোর ব্যবস্থা করছি! ব্যাটা পাগল, বদমাইশ!”
কাজ যা করার সারা হয়ে গেছে। এবার চলে গেলেই হয়। বিপুল অবস্থা বেগতিক দেখে ছুটে পালাতে পালাতে বলল, “পাখিটা কাঁদছিল কাকু! ওকে এত ছোটো খাঁচায় রেখেছিলে বলে ওর কষ্ট হচ্ছিল যে! আমি ওর ডাক শুনেই এখানে এসেছিলাম। তুমি রাগ কোরো না, দোহাই!”
বিপুলের ঠাকুমা চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে বেরিয়ে এসেছেন ততক্ষণে। বিপুল তাঁর দিকেই দৌড়ে আসছে। ওকে কোলের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন ঠাকুমা। বিপুলের ঠাকুমা বিন্দুবাসিনী দেবীকে পাড়ার সবাই সমীহ করে চলে, শোনা যায়, পরাধীন ভারতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অহিংস স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তিনি। গান্ধিজি আর মাতঙ্গিনী হাজরার অনুগামিনী ছিলেন। জেলও খেটেছেন। মারমুখী শ্যামাদাস অগত্যা পিছু হটলেন। বিপুলের প্রতি তাঁর রাগটা যদিও জমে রইল।
পরদিন সকাল। বিপুল ওর ঠাকুমার সঙ্গে বাজার যাচ্ছিল। বড়ো রাস্তার মোড়টা পেরোনোর সময় আচমকা একটা কালো গাড়ি তীব্রবেগে ওদের দিকে ধেয়ে এল। বিপুল সেটা লক্ষ করে চকিতে এক মুহূর্তের মধ্যে ছিটকে একপাশে সরে গেলেও ঠাকুমা আর পারলেন না। হোঁচট খেয়ে রাস্তাতেই পড়ে গেলেন। বিপুল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু তখনই গাড়িটার চাকায় ব্রেক কষার তীব্র শব্দ হল। ক্রি-ই-ই-ই-চ! দমাস! গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ সামলাতে না পেরে ঘুরে গিয়ে উলটোদিকের ফুটপাথে উঠে পড়েছে। সেখানে একটা ময়লা ফেলার ড্রাম রাখা ছিল, গাড়ির ধাক্কায় সেটা উলটে সব আবর্জনা চারদিকে ছত্রখান। কিন্তু এই সবকিছু ছাপিয়ে গাড়ির ড্রাইভারের মুখ থেকে একটা চিলচিৎকার বেরিয়ে এল। আতঙ্কের স্বর সেটা। শ্যামাদাসবাবু তার হাতে কিছু পয়সা গুঁজে দিয়ে গাড়ি নিয়ে পাঠিয়েছিলেন বিপুলকে একটু ভয় দেখাতে, উলটে নিজেই ভয় পেয়ে এই অবস্থায় পড়তে হবে, সে বেচারা আর জানবে কীভাবে?
বিপুল ড্রাইভারের বিস্ফারিত চোখের দৃষ্টিপথ অনুসরণ করে চেয়ে যা দেখল, সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারল না। একটা মিশকালো চিতাবাঘ, যাকে বলে ব্ল্যাক প্যান্থার, রাস্তা পেরোচ্ছে ধীর লয়ে, রাজকীয় চালে। গাড়িটা তাকে দেখেই থমকে গেছে। কালোচিতাটা গাড়ির দিকে ভ্রুক্ষেপও করল না। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বিপুলকে দেখল, ওর ঠাকুমাকে দেখল, তারপর অবিকল বিড়ালের মতো, আরেকটু জোরালো একটা আদুরে স্বর বের করে দুই লাফে কোথায় উধাও হয়ে গেল! বিপুল ওর ঠাকুমাকে দু-হাত ধরে তুলে দাঁড় করাল। গাড়িটার কী হল ভেবে সেদিকে একবার তাকাতেই দেখল, ওটা ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়ে সোজা অন্যদিকে চলে গেছে।
বিপুলকে ঘিরে এইসব কাণ্ড নিয়ে ক্রমশ একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হল এলাকায়। প্রথমে ওই মৌমাছির ঝাঁক, তারপর এই কালোচিতা। পলাশপুরের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই আছে একটা মস্ত বন। বনদপ্তরের অফিস আছে সেখানে। কিন্তু সেখানে কালো চিতা আছে, আগে কখনও শোনা যায়নি। খরগোশ, হরিণ-টরিণ, সাপ-বেজি-গোসাপ আর কিছু পাখপাখালি বড়োজোর। স্থানীয় কাঠ মাফিয়া বিজু তরফদারের কানেও গেল বিপুলের কথাটা। বিজু লোকটা সুবিধার নয়। বনের দামি
দামি সব কাঠ পাচার ছাড়াও গোসাপের চামড়া পাচার, তক্ষক পাচার, বনের রকমারি রঙিন পাখি ধরে বিক্রি করা হল তার অন্যতম ব্যাবসা। বলা বাহুল্য স্থানীয় প্রশাসন আর বনদপ্তরের কিছু অসাধু লোকজনের মদতেই তার এই রমরমার বহর। বিপুলের ‘প্রকৃতি প্রেম’ আর পশুপাখিদের প্রতি দরদ তার ব্যাবসার পক্ষে অশনি সংকেত। বিশেষ করে এই পশুপাখিদের ওর আশেপাশে চলে আসাটা বেশ উদ্বেগের। পরপর এমন ঘটছে যখন, নেহাত কাকতালীয় বলা যায় কি একে?
বিজু তার শাগরেদদের ডেকে বিপুলের একটা ছবি দেখিয়ে বলল, “এই ছেলেটার বড্ড বাড় বেড়েছে। জংলি জন্তু-জানোয়ারগুলোও সব ওর পাশে এসে জুটছে। তাই ওকে আগে শায়েস্তা করতে হবে। শ্যামাদাস বলে একজন ওকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ভয় দেখাতে গেছিল শুনলাম, তাতে কাজ হয়নি কিছুই। তাই এবার আর ভয় দেখানো বা মারধোর নয়, ওকে রীতিমতো আইনি প্যাঁচে ফেলব।”
যা ভাবা সেই কাজ। একটা মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হল বিপুলের নামে। বনদপ্তরে জানানো হল, বিপুল নামের ছেলেটা নিজের বাড়িতে অবৈধভাবে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী আটকে রাখে, সম্ভবত ও তাদের পাচারের সঙ্গেও যুক্ত। বনদপ্তরের রেঞ্জার অফিসার নতুন এসেছেন। তিনি কড়া ধাতের মানুষ। অভিযোগের খবরটা পেয়েই তিনি বনকর্মীদের নিয়ে রওনা দিলেন বিপুলের বাড়ির দিকে। বিপুলের বাড়ির সামনে এসে তাঁদের জিপ থামল।
বিকেল তখন ফুরিয়ে আসছে। বাড়ির পেছনের বাগানে বসেছিল বিপুল। দুটো বেজি ওর সঙ্গে খেলা করছে। আর একটা কেউটে সাপ ওর পায়ের কাছে একটু দূরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শান্ত হয়ে শুয়ে ওদের খেলা দেখছে। সাপ-বেজি একসঙ্গে! যে কেউ দেখলে চমকে যাবে, কিন্তু বিপুলের বাড়িতে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
হঠাৎ গেটের কাছে জিপের ইঞ্জিনের শব্দে ওরা সচকিত হল।
“তুমিই বিপুল রায়? অভিযোগটা তো সত্যি দেখছি! এখুনি গাড়িতে উঠে এসো!” রেঞ্জার অফিসারের কড়া নির্দেশ।
বিপুল উঠে দাঁড়াল। সাপটাও কুণ্ডলী ছাড়িয়ে মাথা তুলল। বেজিদুটো তার কাঁধের ওপর তড়াক করে উঠে বসল। বনদপ্তরের লোকেরা ততক্ষণে গেট খুলে ভেতরে ঢুকেছে। বিপুল আড়চোখে দেখল, সঙ্গে বিজু তরফদারও আছে। সেই কুখ্যাত কাঠ মাফিয়াটা!
বিজু চেঁচিয়ে বলল, “দেখুন স্যার! দেখুন! বেজি আর সাপ পুষছে! কী সাংঘাতিক! নিশ্চয়ই সাপের বিষ-টিষ পাচার করে। ওকে অ্যারেস্ট করুন স্যার।”
রেঞ্জার অফিসার এগিয়ে এলেন। “তোমার নামে তো বিস্তর অভিযোগ। আমি নিজেও দেখতে পাচ্ছি তোমার কাণ্ডটা। এত সাহস তোমার? বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে তোমাকে গ্রেপ্তার করা হল, বিপুল।”
একজন বনকর্মী এগিয়ে এল হাতকড়া পরাতে। বিপুল কিন্তু ভয় পেল না। ওর মনে হল, ও যেন একা নয়। সে মনে মনে আহ্বান জানাল তার বন্ধুদের, “তোমরা এসো, বন্ধুরা। এবার সময় হয়েছে।”
মুহূর্তের মধ্যে একটা দমকা বাতাস বয়ে এল, তাতে প্রবল বুনো গন্ধ। বিপুল উঠে দাঁড়াল। তার চুলগুলো হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে উড়ছে। ঝড়ের মতো ধুলো উড়তে শুরু করেছে। কিন্তু আকাশে তো কোনো মেঘ নেই!
রেঞ্জার সাহেব আর বিজু থমকে দাঁড়াল হতভম্ব হয়ে। ওটা কীসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে দূরে? হাতির ডাক! নিমেষে মাটি কেঁপে উঠল। ধুলোর চাদর ভেদ করে বেরিয়ে এল একপাল পাহাড়প্রমাণ হাতি। শুঁড় উঁচিয়ে তারা গেটের সামনে এসে প্রাচীরের মতো সার দিয়ে দাঁড়াল।
বনদপ্তরের লোকেরা সভয়ে পিছিয়ে গেল। “এ কী! এখানে হাতি কোত্থেকে এল?” বিজু অস্ফুটে বলে।
শুধু হাতিই নয়। আশেপাশের গাছগুলো থেকে কিচমিচ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। সবাই চেয়ে দেখল বাঁদর আর হনুমানের দুটো দল সেখানে জড়ো হয়ে দাঁত খিঁচোচ্ছে। তাদের উদ্দিষ্ট লক্ষ্য বিজু আর বনকর্মীরা। ওরা এক পা-এক পা করে পিছোতে লাগল। তখনই বাগানের ঝোপঝাড় আর মাটির আনাচ-কানাচের গর্ত থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে এল অজস্র বিছে, কেন্নো, শুঁয়োপোকা আরও নানা জাতের পোকামাকড়। আর আকাশ কালো করে চক্কর দিতে লাগল কাক-চিলের ঝাঁক।
বিজু তরফদার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “স্যা-স্যার! এ ছেলে মানুষ নয়, সাক্ষাৎ শয়তান!”
রেঞ্জার অফিসার নিজেও জীবনে এমন দৃশ্য দেখেননি। হাতিগুলো আক্রমণ করতে উদ্যত হচ্ছে না, বরং তারা বিপুলকে ঘিরে ধীরে ধীরে একটা নিশ্ছিদ্র সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। কেউটে সাপটা এবার বিজুদের দিকে ঘুরে ফণা তুলল, মাটি থেকে হাত খানেক উপরে উঠে সে দুলছে অল্প অল্প।
বিপুল শান্ত স্বরে বলল, “ওরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করবে না। আপনারা ফিরে যান। আমি কোনো অন্যায় করিনি, আর করবও না।”
বিজু আর রেঞ্জার সাহেব বনকর্মীদের দলবল নিয়ে পালাতে বাধ্য হল। জিপটা চলে যাওয়ার পর হাতিগুলো এগিয়ে এসে শুঁড় দিয়ে বিপুলের মাথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিল, যেন আশীর্বাদ করছে। তারপর ধীরে ধীরে জঙ্গলের দিকে ফিরে গেল। বাঁদর, পাখিরা, পোকামাকড়ের দলও যে যেখানে ছিল সেখানে চলে গেল।
রাত নেমে এল। ঘন অন্ধকার চারদিকে। কিন্তু বিপুলের চারপাশে এখন আলোর মেলা। শত শত জোনাকি বিপুলের চারপাশে ঝাঁক বেঁধে উড়ছে। মনে হচ্ছে যেন লক্ষ প্রদীপ জ্বলে উঠেছে তাকে বরণ করার জন্য। বিপুলের মুখ সেই মায়াবি আলোয় উদ্ভাসিত। সে আকাশের দিকে তাকাল। অনন্ত নক্ষত্রবীথি তার দিকে তাকিয়ে আছে।
বিপুল বুঝেছে, সে কোনো সাধারণ কিশোর নয়। সে এই প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ আর মনুষ্যেতর প্রকৃতির মধ্যে একটা সেতু সে। সে প্রকৃতির ভাষা বোঝে, প্রকৃতিও তার ভাষা বোঝে। বিপুল হাত বাড়াতেই একটা জোনাকি এসে ওর আঙুলের ডগায় বসল। সেই আলোকবিন্দুর দিকে তাকিয়ে বিপুল মৃদুস্বরে স্বগতোক্তির ঢঙে বলল, “আমার উপর অনেক দায়িত্ব। এই অরণ্য, এই অবলা জীব, সবাই আমাকে ভরসা করে। আমি ওদের রক্ষক, আর ওরা আমার। আমরা সবাই মিলে একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলব। তাহলেই সবাই ভাল থাকব।”
গাছের পাতারা কেঁপে উঠল। এই প্রকৃতি যেন তার নতুন রাজপুত্রকে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ জানাচ্ছে। বিপুল, প্রকৃতির সেই ছোট্ট রাজপুত্র, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল এক অমোঘ শক্তির প্রতিরূপ হয়ে।
----------
ছবি - লেখক
No comments:
Post a Comment