
গুপুতাইয়ের গুপ্ত কথা
চুমকি চট্টোপাধ্যায়
অনেক বছর বাদে চক্রবর্তী বাড়িতে বাচ্চা এসেছে। এক
হাত লম্বা, লালচে রঙের, খাড়া চুলের ছেলে, পুতুল
যেন একটা! চক্রবর্তী বাড়ির সবাই উল্লসিত। কত কত দিন পরে বাড়িটা আবার বাচ্চার হাসি
কান্না, নানা রকম শব্দ, আধো আধো বুলিতে
সরগরম হয়ে উঠবে।
নার্সিং হোমের ফর্মে বাচ্চার একটা নাম দিতে হবে। কী নাম, কী নাম দেওয়া যায়। বাচ্চার মা দিতি বলল, “সহজ নাম দিতে
হবে যাতে বানান লিখতে ভুল না হয়।” বাবা আর্য বলল, “ইংরেজি ‘এ’ দিয়ে নাম দিলে
স্কুলে রোল নম্বর প্রথমের দিকে থাকবে।” পিসি চন্দ্রা বলল,
“নামটা মডার্ন হওয়া চাই।” ঠামিন বললেন,
“যে যা ইচ্ছে নাম দিক, আমি নাম দিলাম ‘গুপুতাই’।”
‘এ আবার কেমন নাম, এ
আবার কেমন নাম!’ বলে সবাই চেল্লামিল্লি শুরু করে দিল। দিতি
আর আর্য তো হেসেই পাগল। চন্দ্রা বলল, “মা, তোমার মাথাটা গেছে না কি? ও কি চিনেম্যান যে এরকম নাম হবে?”
“চিনেম্যান হলে নাম দিতাম ‘গুপুচান’,” চন্দ্রার মা হেসে বললেন। হাসাহাসিতে মুখর
হয়ে উঠল চক্রবর্তী বাড়ি। কেবল চন্দ্রার বাবা কিছু না বলে মুচকি মুচকি হাসতে
থাকলেন।
গুপুতাইয়ের ভালো নাম ঠিক হল অরিন, অরিন চক্রবর্তী।
ভালো নাম ঠিক হলে কী হবে, সবাই ওকে গুপুতাই বলেই ডাকতে শুরু
করেছে। কেউ কেউ আবার ‘গুপু’-ও বলে।
গুপুতাই এখন ১৮-১৯ ঘণ্টা ঘুমোয়। খিদে পেলে কাঁদে,
খাইয়ে দিলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। বাড়ির লোকজন খোঁজখবর নিতে থাকে,
সে জেগেছে কিনা, তাহলে এসে একটু কোলে নেবে,
আদর করবে। বাড়ির লোকের কাছে খবর পৌঁছোনোর আগেই
সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
একটা একটা করে দিন পার হতে লাগল, ঠামিনের গুপুতাই
বিন্দু বিন্দু করে বড়ো হতে লাগল। এখন ওর দশ মাস বয়েস। দিব্বি বসতে পারে সে। গাল ভরে হাসে। আর নানারকম শব্দ করে মুখে।
ঠামিন তো ঘুম থেকে উঠে ঠাকুর প্রণাম করেই চলে যান গুপুতাই কী
করছে দেখতে। যদি দেখেন ঘুমোচ্ছে, তাহলে
তিনি রান্নাঘরে যান আর জেগে থাকলে তো কথাই নেই, ঠামিন তার
সঙ্গে গল্প জোড়েন আর সেও ‘উ উ, অ অ’
করে গল্পে অংশ নেয়। ওদিকে যে টিফিনের দেরি হয়ে যাচ্ছে, অফিসযাত্রীরা ছটফট করছে, সে খেয়াল আর থাকে না
ঠামিনের।
গুপুতাইয়ের পিসিও অফিস থেকে ফিরেই সোজা চলে আসে
ভাইপোর ঘরে। দিতি চেঁচায়,
“বাইরে থেকে এসেছিস, যা যা হাত ধুয়ে আয়।”
তাই তো, বাইরে কাজ করে এলে কত নোংরা, অসুখবিসুখের জার্মস চলে আসে হাত, জামাকাপড়ের
মাধ্যমে। তখন চন্দ্রা ছোটে জামাকাপড় বদলে, হাত মুখ ভালো করে
পরিষ্কার করে আসতে।
তারপর এসে বেশ করে চটকে চাটকে আদর করে তার ছোট্ট
সোনা গুপুকে।
একদিন হঠাৎ দিতির বাবা মানে, গুপুর দাদান
বললেন, “আমি ওই বিদঘুটে নামে ডাকব না। আমি ওকে ঘুটুম বলে
ডাকব।” সবাই খুব মজা পেল। ঘুটুম নামটা ভালো।
দাদানের ঘুটুম আর ঠামিনের গুপুতাইয়ের এখন এক বছর
সাত মাস বয়েস। সে এখন বিস্তর দৌড়াদৌড়ি করে, লাফায় ঝাঁপায়, নরম
ভাত আর সবরকম সবজি দেওয়া চিকেন বা মাছের ঝোল খায়। ডিম খেতে ভালোবাসে। বড়োরা কেউ কিছু খেলেই সেখানে গিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যে খাচ্ছে, সে তখন তার খাবার যদি বাচ্চার উপযুক্ত হয়, একটু
দিচ্ছে। একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে, বড়োদের খাবার গুপুর খুবই
পছন্দ।
গুপুতাইয়ের প্রায় সব দাঁত উঠে গেছে। তাই চিবোতে
অসুবিধে নেই। কিন্তু তাও গলায় আটকাতে পারে, এমন খাবার দেওয়া হয় না। যেমন আঙুর,
বাদাম, ছোলা, পপ কর্ন
ইত্যাদি। তবে বাদাম খেতে গুপু দারুণ ভালোবাসে। ঠামিন তাই হাতে বাদাম নিয়ে ছোটো
ছোটো করে ভেঙে তবে ওর মুখে দেন।
দাদান যখন চা খান, তখন তার ঘুটুম একেবারে কোলে গিয়ে
বসে পড়ে। চায়ে ডোবানো বিস্কুট তার অন্যতম প্রিয় হয়ে উঠেছে। ঠামিন বলেন, “দেখো, অল্প দিও, এই বয়েসে চা
খাওয়া মোটেই ভালো নয়।” দাদান বলেন, “তুমি
থামো দেখি। ও কি চা খাচ্ছে? সামান্য বিস্কুট চায়ে ঠেকিয়ে
দিচ্ছি।”
আরও তিন মাস কেটে গেছে, গুপুতাই
এখন এক বছর দশ মাসের। মুখে আধো আধো কিছু বুলি ফুটেছে। বাবাকে পাপা, মাকে মাম্মা, ঠামিনকে তিতি, দাদানকে
তাতা, পিসিকে কিকি, ফুলকে ফুই এসব বলে।
সব থেকে পরিষ্কার বলে ‘কাক’, ‘যাহ’,
‘আবার’ আর ‘না না’। কথা এরকম টুকরো টাকরা
বললে কী হবে, সমস্ত কথা সে বোঝে। সেদিন কী হয়েছে শোনো।
গুপুর ঠামিন একটা দোকান থেকে কাপড় কাচার গুঁড়ো
সাবানের পাঁচ কেজির প্যাকেট কিনেছিলেন। সেই প্যাকেটের সঙ্গে একটা প্লাস্টিকের বড়ো বালতি ফ্রি
ছিল। দোকানদার বলল, “বালতিটা স্টকে নেই, আপনি ক্যাশমেমোটা রেখে দেবেন, দিন পনেরো পরে এসে
ক্যাশমেমো দেখিয়ে বালতি নিয়ে যাবেন।”
এবার ঠামিন যে ক্যাশমেমোটি কোথায় রেখেছেন, মনেই করতে পারছেন
না। এদিকে বালতির লোভও ছাড়তে পারছেন না। ওটা ওনার পাওনার মধ্যে পড়ে। ভারী মনখারাপ
ঠামিনের। কিছুতেই দোকানের নামটা মনে আসছে না। ওনার একমাত্র সুখের
চাবিকাঠি হচ্ছে তার গুপুতাই। তিনি ডাক দিলেন, “গুপুতাই, এসো তো
সোনাবাবা আমার।”
গুপুতাই তখন মন দিয়ে একটা খেলনা গাড়ির চাকা খুলছিল।
ওর যত গাড়ি আছে সব ক’টার চাকা গুপু খুলে ফেলেছে। একেকটা চাকা নিয়ে লাট্টুর মতো ঘোরায় সে।
ঠামিনের ডাক পেয়ে দৌড়ে পাশের ঘর থেকে চলে এল।
ঠামিন দোলন চেয়ারে বসে ছিলেন। গুপুতাইকে কোলে নিয়ে
আদর করে বললেন, “দেখ না সোনা, একটা বড়ো বালতি
পেতাম, ক্যাশমেমোটা খুঁজে পাচ্ছি না, এদিকে
দোকানের নামটাও মনে করতে পারছি না যে গিয়ে বলব। দুঃখ হচ্ছে।”
গুপুতাইকে ঠামিন অনেক রকম গল্প বলেন। খরগোশ আর
কচ্ছপের গল্প, মেঘাসুর আর সূয্যিমামার গল্প, কাক আর কোকিলের গল্প,
আরও অন্যান্য গল্প। গুপুর এখন কাক আর কোকিলের গল্প শোনার ইচ্ছে হল, তাই বলতে লাগল, ‘কাক, কুকু,
কাক, কুকু...।’
“এইত্তো এইত্তো মনে পড়েছে...,” চেঁচিয়ে ওঠেন ঠামিন। পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন দাদান,
আরেক ঘর থেকে দিতি।
“কী হয়েছে, কী হয়েছে?”
“মনে পড়ে গেছে...,” গুপুতাইকে
জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বললেন ঠামিন।
“কী মনে পড়ে গেছে? উফ,
তুমি এমন চেঁচালে, ভয় পেয়ে গেছি,” দিতি বলে।
“ওই দোকানের নামটা আর ক্যাশমেমো কোথায়
রেখেছি, সেটাও। কুহেলী স্টোর্স। আমার কেবল পিয়ালি পিয়ালি মনে
হচ্ছিল। আর ক্যাশমেমোটা আমি কালো তাকে রেখেছি। আমার গুপুতাই আমাকে মনে করিয়ে
দিয়েছে। আমার সোনাটা, আমার বাবাটা।”
দিতি আর তার বাবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হেসে ফেলে।
কাক কুকু শুনেই মা’র মনে পড়ে গেল সব... বেশ মজার তাই না!
ঠামিন বলে চলেছেন, “আমি যদি কিছু ভুলে যাই, তুমি আমাকে মনে করিয়ে দেবে গুপুতাই, বুঝেছ?”
গুপুতাই তখন ‘আদা বাদা আদা বাদা আ আ আ...’ করে নিজের ভাষায় গান গেয়ে চলেছে। ওর গুপ্তকথা কেবল ওর ঠামিনই বোঝেন।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment