গল্প:: ভূত-ভুলাইয়া - বুমা ব্যানার্জী দাস


ভূত-ভুলাইয়া
বুমা ব্যানার্জী দাস

চুপিচুপি ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুরে বেরিয়ে এল ঝিমলি। মা পইপই করে বলে দিয়েছে দুপুর-রোদে বাড়ির বাইরে পা না রাখতে, কিন্তু ঝিমলির মন-মেজাজ আজ একটুও ভালো নেই। অমন যে ঠাম্মি, সেও মায়ের সুরে সুর মেলাল! ঠাম্মি অন্তত তার দলে, এটাই চিরকাল ভেবে এসেছে ঝিমলি, সেই ঠাম্মি কিনা! যাক, বড়োদের কাণ্ডকারখানার কোনো মাথা-মুন্ডু নেই। ঝিমলি এমনিতে বেশ বাধ্য, গোলমালে না গিয়ে এসব রোদে না বেরোনো-টেরোনোগুলো মেনেই চলে। কিন্তু, আজ কারও কথা শুনবে না সে। অমন সুন্দর তুলোর বলের মতো বিড়ালছানাটা, কী এমন হত ওকে পুষলে! মা আর ঠাম্মি এমন করে উঠল, যেন ঝিমলি ডাইনোসর পুষতে চাইছে। মনখারাপ করে কোথায় যে চলে গেল ছোট্ট বিড়ালটা, ঝিমলি আর খুঁজেই পাচ্ছে না ওকে।
ওদের বাড়িটা বেশ পুরোনো, দোতলা। ওর প্রায় সব বন্ধুরাই উঁচু ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকে, সেখানে নাকি কুকুর-বিড়াল সব পোষা মানা। কিন্তু ঝিমলিদের বাড়িতে কত জায়গা, তাছাড়া পেছনের বাগানটাও মস্ত বড়ো। এত বড়ো বাগান থাকতে কেউ ঘরের ভেতর নোংরা করে নাকি? ঝিমলি এই সহজ কথাটাই বড়োদের কাউকে বোঝাতে পারল না, নাকি ঘর-বারান্দা সব নোংরা করে রাখবে। এমনকি ছোটকা, যাকে ঝিমলি প্রাণের বন্ধু বলে ভাবে, সে পর্যন্ত চোখ-মুখ গোল করে বলল, “ও বাবা, যতই পোষ মানুক, বিড়াল ঠিক আঁচড়াবে।” মনের দুঃখে চোখে জল এসে গিয়েছিল ঝিমলির। তখনই ঠিক করে নিয়েছিল, আজ আর কারও কথা শুনবে না সে। বড়োরা যা বলবে, ও ঠিক তার উলটোটা করবে।
পেছনের বাগানটা একসময়ে নাকি ভালো ভালো ফল-ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো ছিল, সেসব ফলের গাছে আজকাল আর ফল ধরে না, ফুলের গাছের চারপাশে ঝোপঝাড়। দেখাশোনা করার লোক নেই, তাই এমন অবস্থা। বিড়ালছানাটা মনে হয়, এদিকেই কোথাও লুকিয়ে আছে। ধপধপে সাদা রঙের ওপর কেমন বাদামি-হলুদ মেশানো ছোপ, দেখলেই কোলে তুলে নিতে ইচ্ছা করে। লম্বা ডাঁটিসমেত একটা ঘাসফুল ছিঁড়ে নিয়ে ঝিমলি নীচু গলায় ডাকল, “আয় আয়, পুষি আয়!” নাহ্, মনের দুঃখে ও কোথায় চলে গেছে, কে জানে।
এ ঝোপ সে ঝোপ করতে করতে বুড়ো আমগাছটার দিকে এগিয়ে যায় ঝিমলি। এই আমগাছটায় ফল ধরে না বহুদিন, কিন্তু দাদুরও যিনি বাবা ছিলেন, এই গাছ নাকি তিনি নিজের হাতে পুঁতেছিলেন - তাই কেটে ফেলা হয়নি এখনও। ঝিমলি মনে মনে ভাবে, সেই বুড়োদাদু নিশ্চয়ই খুব ভালো লোক ছিলেন। আচ্ছা, তিনি থাকলে কি বিড়ালটাকে পুষতে দিতেন?
অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল ঝিমলি, হঠাৎ আমগাছটার দিকে তাকিয়ে সে ভীষণ চমকে ওঠে। গাছটার তলায় কে যেন বসে আছে! না বিড়ালটা নয়, এ তো পুরো একটা মানুষ! পা ভাঁজ করে, হাত গুটিয়ে, মাথা নীচু করে ঘুমোচ্ছে লোকটা। অচেনা লোকের সঙ্গে যে কথা বলতে নেই, তা ঝিমলি খুব ভালো করেই জানে; কিন্তু, আজ তো সে বড়োদের কোনো কথা শুনবে না। তাই পায়ে পায়ে ও এগিয়ে যায় লোকটার দিকে। ইশ্‌, বেশ ঘুমোচ্ছে তো! ঝিমলি যে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়ালই নেই। আচ্ছা, চোর নয় তো? কিন্তু, চোর কি অন্য কারও বাড়িতে ঢুকে এমন নিশ্চিন্তে ঘুমোবে? ঝিমলি ছোটো হতে পারে, কিন্তু মোটেও বোকা নয়। তাছাড়া, ক্লাস থ্রিতে পড়লে অত ছোটোও থাকে না কেউ।
কিন্তু চোর না হোক, লোকটা কে তা জানা দরকার। হাতের ঘাসফুলটা দিয়ে নাকে সুড়সুড়ি দিতেই লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসল। ঝিমলি গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, “এই যে, আপনি কে? আমাদের বাগানে ঘুমোচ্ছেন কেন?” অচেনা বড়োদের ‘আপনি’ করে বলতে হয়, গুরুজনদের এই কথাটা অবশ্য মেনে চলতেই হল, তা না হলে ঝিমলিকে অসভ্য ভাববে যে!
লোকটা পিটপিট করে তাকাল, তারপর মস্ত এক হাই তুলে বলল, “আমি কে, সেটা জানলে কি আর এখানে বসে থাকি? আমগাছটার বেশ ছায়া, তাই বসে বসে চিন্তা করছিলাম, আমি কে। কখন যেন চোখটা লেগে গিয়েছিল।”
ঝিমলি বেজায় অবাক হয়, এ কেমন লোক? ও কে তা নিজেই জানে না! নাকি অ্যাক্সিডেন্ট-ট্যাক্সিডেন্ট হয়ে ফটিকচাঁদের যেমন হয়েছিল, তেমন ওরও হয়েছে?
আমগাছটার সামনেই অন্য একটা গাছের গুঁড়ি, তার ওপর বসে ঝিমলি মন দিয়ে লোকটাকে দেখে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “তোমার মাথায় কোথাও লেগেছে?” অচেনা লোক হলেও ‘আপনি’, ‘আজ্ঞে’ করে বেশিক্ষণ কথা চালানো মুশকিল।
লোকটা এবার নিজের মাথা দুই হাতে চেপে ধরে, তারপর আঙুল দিয়ে টিপে টিপে দেখে বলে, “কই না, ব্যথা-ট্যথা তো নেই।”
“কিচ্ছু মনে পড়ছে না? নাম, কোথায় থাকো, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?” ঝিমলি একবার ভাবল ছোটকাকে ডাকবে, কিন্তু ছোটকার সঙ্গে জন্মের মতো আড়ি।
“কিচ্ছু না,” লোকটার চোখদুটো কেমন একটু ছলছল করে ওঠে।
“তুমি চোর-ডাকাত নও তো?” কেউ হারিয়ে গেলে পুলিশে খবর দিতে হয়, কিন্তু লোকটা যদি সত্যিই চোর-ডাকাত হয়, তাহলে তো পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। ওর ওপর ভারি মায়া হয় ঝিমলির।
“কে জানে! হতেও পারি, আবার নাও হতে পারি। এটা কি তোমাদের বাড়ি?” লোকটা উদাস গলায় বলে।
“আমি ঝিমলি। এটা আমাদের বাড়ি, কিন্তু আমি এখন বাড়ির ভেতর যাব না। ওরা আমার পুষিকে রাখতে দেবে না বলেছে,” এবার ঝিমলির নিজের চোখদুটোও ছলছল করে ওঠে।
“আচ্ছা, তুমি এখানে এলে কী করে, সেটা নিশ্চয়ই মনে আছে?” চোখের জল বেরিয়ে এলে সে ভারি লজ্জার ব্যাপার হবে, তাই তাড়াতাড়ি কথা ঘোরায় ও।
করুণ হয়ে ওঠে লোকটার মুখ, ঢোঁক গিলে বলে, “হঠাৎ দেখি, এখানে চলে এসেছি। কেমন করে যে এলাম, মনে পড়ছে না কিছু; তবে এই গাছটা খুব পছন্দ হল, তাই বসলাম এসে।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। ঝিমলি মন দিয়ে দেখে লোকটাকে, ওর জামাকাপড়ও কেমন যেন অদ্ভুত। এমন পোশাক আজকাল কেউ পরে না। কাপড়ের মতো যেটা পরে আছে, তাকে বোধহয় ‘ধুতি’ বলে। ওপরে পকেটওয়ালা ঢিলে জামা, কিন্তু বাবা বা ছোটকা ওরকম শার্ট পরে না। লোকটা আবার একটা হাই তুলে বলে, “ঝাপসা ঝাপসা কীসব যেন মনে পড়ছে; কখনও আলো, কখনও অন্ধকার।”
“তুমি কি তবে জাদুকর?” ঝিমলির চোখ চকচক করে ওঠে।
লোকটা চোখ বুজে হাত মুঠো করে এক মনে কী একটা করার চেষ্টা করে। তারপর হতাশ হয়ে বলে, “নাহ্, সামনের ওই ভাঙা ডালটা জাদু দিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। কিছুই হল না।”
“তবে কি তুমি ভ্যাম্পায়ার? হাজার বছর পর ঘুম ভেঙে উঠে বসে কিছু মনে করতে পারছ না?” ঝিমলি সেদিন টেলিভিশনে এরকমই একটা সিনেমা দেখেছিল, সেটার কথাই মনে পড়ল হঠাৎ। সিনেমার ভ্যাম্পায়ারকে দেখে অবশ্য খুব ভয় করছিল, এই লোকটাকে দেখে একেবারেই তা করছে না।
লোকটা হাঁ করে নিজের ওপরের পাটির ধারের দাঁতগুলো পরীক্ষা করে দেখল। তারপর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “তেনাদের তো এই ধারের দাঁতগুলো লম্বা হয়, আমার তো কই হয়নি। তাহলে আমি নিশ্চয়ই ভ্যাম্পায়ার নই। ভাগ্যিস নই! আমি ওসব বড্ড ভয় পাই গো, দিদিমণি।”
“না গো! আমি সিনেমায় দেখেছি, এমনি সময়ে দাঁত লম্বা থাকে না; কেবল কারও রক্ত খাওয়ার সময়ে…,” ঝিমলি হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে থেমে যায়। তারপর ফিশফিশ করে বলে, “তোমার কি কারও রক্ত খেতে ইচ্ছা করছে এখন?”
লোকটা শিউরে উঠে বলে, “আরে, ছি ছি! কী যে বলো, দিদিমণি! দেখছ না, গলায় তুলসীবীজের মালা পরে আছি। মনে হয় আমি পরম বৈষ্ণব, ওসব আমিষ খাবার ছোঁব কেন?”
ঝিমলি উঁকি মেরে দেখে, সত্যিই তাই। লোকটার গলায় একটা গোল গোল খয়েরি পুঁতির মতো দেখতে কীসের যেন মালা। ওদের বাড়িতে করতাল বাজিয়ে একজন গান গাইতে আসেন, তাঁর গলাতেও এমন মালা আছে। গান শোনার পর ঠাম্মি তাঁকে চাল আর সবজি দেয়। কী যেন বলে ওঁকে, ও হ্যাঁ, বাউল। ঝিমলি এবার বিজ্ঞের মতো বলে, “তুমি কি গান গাইতে পারো? তাহলে হয়তো তুমি বাউল।”
লোকটা খানিকক্ষণ ভাবে। তারপর বাঁদিকের কানটা এক হাতে চেপে বিকট বেসুরো গলায় গেয়ে ওঠে, “ভোলা মওওওওন…”
গাছে যে ক’টা পাখি বসে ছিল, আচমকা ভয় পেয়ে ঝটপট করে উড়ে পালায়।
ঝিমলি চেঁচিয়ে ওঠে, “আরে, থামো থামো! তোমার নাম মনে হয় ভীষ্মলোচন শর্মা।”
লোকটা গান থামিয়ে প্রবল বেগে মাথা নাড়তে থাকে, “মোটেও না, অত বিচ্ছিরি নাম আমার হতেই পারে না। যতদূর মনে পড়ছে, আমার প্রপিতামহের নাম প্রাণতোষ হালুই। শর্মা আমরা কস্মিনকালেও নই।”
“বাহ্, এই তো সব মনে পড়ে গেছে তাহলে!” ঝিমলি খুশি হয়ে লাফিয়ে ওঠে।
“না গো দিদিমণি, অত সহজ নয়। ওই নামটা মনে আসছে বটে, কিন্তু সে যে আসলে কে, সেইটা ধরতে পারছি না। আমার প্রপিতামহও হতে পারে, আবার আমার খুড়তুতো ভাই হওয়াও বিচিত্র নয়। কিন্তু আমার খুড়তুতো ভাই আছে কিনা, সেটাও তো ছাই মনে পড়ছে না। কে যেন একবার টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেয়নি, সেও প্রাণতোষ হালুই হতে পারে।”
“আচ্ছা, তুমি শেপ-শিফটার নও তো?” ঝিমলির চোখ এবার গোল গোল হয়ে ওঠে।
“কী যে বলো দিদিমণি, আমার চোদ্দোপুরুষে কেউ বিলেতি সাহেব নয়। গায়ের রং দেখছ না?” লোকটা লজ্জা-লজ্জা মুখে বলে।
“সাহেব না, সাহেব না,” দুই হাত নেড়ে ঝিমলি ব্যাখ্যা করে, “শেপ-শিফটাররা ইচ্ছেমতো চেহারা পালটাতে পারে। মানে তোমার ইচ্ছা হল, বেড়াল হয়ে গেলে, অথবা ঘোড়া। আবার যখন ভালো লাগল না, তখন আবার মানুষের চেহারায় ফিরে এলে।”
লোকটা চিন্তিত মুখে বলে, “ও বাবা! সে আমাদের পাড়ায় ছিল বটে একজন। এইয়া জটা, এইয়া দাড়ি। লম্বায় ছ’ফুট, চওড়াতেও তেমন। নিশুতি রাতে কাদের সঙ্গে যেন কথা বলত। সে নাকি নেকড়ে হয়ে যেতে পারত ইচ্ছা করলে।”
ঝিমলি খুশি হয়ে বলে, “বাহ্, বেশ মনে পড়ছে তো!”
লোকটা ভ্রূ কুঁচকে অন্যমনস্কভাবে বলে, “তা পড়বে না! সে যা ভয়ানক লোক। সবাই বলত, ‘ভূতনাথ ওঝা…’” হঠাৎ লোকটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “ভূ… ভূ… আরে, আমি তো ভূত। কিছুতেই মনে পড়ছিল না। আমার নাম গঙ্গাধর সামন্ত। প্রাণতোষ হালুই তো আমার মালি, সে-ই মুর্শিদাবাদ থেকে আমের চারা এনে দিয়েছিল। আমরা দুজনে কবে মরে ভূত হয়ে গেছি! থ্যাঙ্কু, দিদিমণি। তোমার বেড়াল তুমি ঠিক পেয়ে যাবে।”
ঝিমলির বিস্ফারিত চোখের সামনে জলজ্যান্ত লোকটা বেমালুম গায়েব হয়ে গেল। বিলকুল অদৃশ্য।
ঝিমলি “ছোটকা গো…” বলে পেল্লায় চিৎকার ছেড়ে দৌড় দেয় বাড়ির দিকে। মা আরামকেদারায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল, ঝিমলি এক লাফে মায়ের কাছে গিয়ে পিঠে মুখ গুঁজে দেয়। মনটা শান্ত হয়ে আসে ধীরে ধীরে। কী আজব ভূত রে বাবা! কী যেন নাম বলল, গঙ্গাধর সামন্ত। আচ্ছা, তারাও তো সামন্ত। ঝিমলির স্কুলের নাম প্রত্যুষা সামন্ত, ঠাম্মির নাম বিভারানি সামন্ত।
হঠাৎ মায়ের চেয়ারের পাশে রাখা ঝুড়ি থেকে ক্ষীণ একটা শব্দ আসে, “ম্যাঁও।”
“মা?” ঝিমলি কি ভুল শুনল?
“চুরি আর নোংরা যেন না করে,” মায়ের মুখেও ঝিকঝিকে হাসি।
ঝুড়ি থেকে মুখটা বের করে ঝিমলির দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে পুষি।
মাকে জড়িয়ে ধরে কোলে মুখ লুকোয় ঝিমলি। আহা রে, বুড়োদাদুর ভুলোমনা ভূত, আমগাছটার মায়া আজও ছাড়তে পারেনি। ভূত হলেই কি আর খারাপ হয়!
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment