গল্প:: ডর্টমুণ্ডের কর্তা - তন্ময় ধর


ডর্টমুণ্ডের কর্তা
তন্ময় ধর

তুষার পড়ছিল বলে ওরা ভেতরে ঢুকেছিল, নইলে এই দুর্গে কেউ পা রাখত না। রাস্তা তখন প্রায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল সাদা চাদরে, আর বাতাস এমনভাবে কাটছিল মুখের ওপর দিয়ে যে কথা বলাও কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। গ্রামের লোকেরা বলত, এখানে থাকতে হলে সাহস লাগে না, লাগে বোকামি। কিন্তু সেই রাতে পাঁচজনের কারো কাছেই আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
হের্মান দরজাটা ঠেলে খুলল। কাঠের পাল্লাটা এমন শব্দ করল যেন বহু বছরের অভিমান জমে ছিল তার কব্জায়। ভেতরে ধুলো, ভাঙা চেয়ার, একটা বিশাল ফায়ারপ্লেস, আর দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ছবির ফ্রেম, যাদের রং প্রায় মুছে গেছে সময়ের চাপে। বাতাসে একটা গন্ধ ছিল — পোড়া কাঠ আর ভেজা পাথরের মিশ্রণ, যা শুধু বহুকাল-বন্ধ ঘরেই পাওয়া যায়।
গ্রেটা প্রথমে জিজ্ঞেস করল, “এখানে কেউ থাকে না?”
“বহু বছর না,” হের্মান বলল, কণ্ঠে কোনো দ্বিধা না রেখে।
টমাস কাঠ খুঁজে নিয়ে এল কোণের একটা স্তূপ থেকে, আগুন ধরাল। আগুন জ্বলতে বেশি সময় লাগল না, কারণ কাঠ শুকনো ছিল, আর ঠান্ডায় সবাই তাড়াতাড়ি করছিল, হাত কাঁপছিল দেশলাই ধরাতেও। আগুনের প্রথম শিখাটা যখন উঠল, সবার মুখেই একটা স্বস্তি ফুটে উঠল, যেন প্রাণ ফিরে পেল কেউ কেউ।

এক

দেয়ালে একটা ছবি ছিল, অন্যগুলোর চেয়ে বড়ো, আর তুলনামূলক কম মলিন। লোকটার হাতে তলোয়ার, পোশাকে পুরোনো যুদ্ধকালের ছাপ, আর পাশে একটা বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে, হাসিমুখে, যেন ছবি আঁকার সময় তাকে হাসতে বলা হয়েছিল আর সে সত্যিই হেসেছিল। লীনা ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “এই লোকটাকে চেনো, হের্মান?”
হের্মান মাথা নাড়ল না, না বলল না। শুধু আগুনের দিকে তাকিয়ে বলল, “শুনেছি এই দুর্গে একজন ব্যারন থাকতেন। তার ছেলে মারা গিয়েছিল, কোনো এক যুদ্ধে। তারপর ব্যারনও মারা যান। মানুষ বলে, তিনি এখনও এখানেই আছেন।”
গ্রেটা লণ্ঠনটা শক্ত করে ধরল, যেন সেটাই একমাত্র জিনিস যা তাকে মাটির সঙ্গে বেঁধে রাখছে। “মানে ভূত?”
“মানে যা কিছু,” হের্মান বলল, একটু হেসে, কিন্তু সেই হাসিতে আশ্বাসের চেয়ে ক্লান্তি বেশি ছিল। “গল্প তো গল্পই। মানুষ পুরোনো দুর্গ দেখলেই ভূতের গল্প বানায়।”

দুই

আগুনটা হঠাৎ কমে এল, যেন কেউ তার ওপর ফুঁ দিয়েছে অদৃশ্য কোনো দিক থেকে। শিখাগুলো নীল হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য, তারপর আবার স্বাভাবিক রঙে ফিরল। কেউ কথা বলল না কিছুক্ষণ। বাতাস যেন থেমে গিয়েছিল ঘরের ভেতর, যদিও বাইরে ঝড় তখনও বইছিল সমান তালে।
তারপর ঘরের কোণে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকল, আগে যেখানে কেউ ছিল না। তার শরীরের চারপাশে একটা অস্পষ্টতা ছিল, যেন সে আলোর সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যেতে পারেনি, আবার ছায়ার সঙ্গেও না।
“কে তোমরা,” লোকটা বলল। গলা ভারী, কিন্তু চেঁচাচ্ছে না — যেন বহুকাল কথা না বলার পর প্রথম শব্দগুলো বের করছে সে।
টমাস দাঁড়িয়ে গেল, তারপর বসেই পড়ল আবার, পা কাঁপছিল বলে। গ্রেটা হের্মানের হাত চেপে ধরল, এত জোরে যে হের্মানের আঙুলগুলো সাদা হয়ে গেল।
“আমরা পথ হারিয়েছি,” অভিক বলল। কণ্ঠটা নিজের কাছেই ছোটো শোনাল, যেন ঘরের বিশালতা তার গলার আওয়াজ গিলে নিয়েছে। “রাতটা কাটাতে চাই এখানে, তারপর চলে যাব সকালে।”
লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, চোখজোড়া যেন প্রত্যেকের মুখ আলাদা করে মেপে দেখছে। তারপর বলল, “এই দুর্গে যারা রাত কাটায়, তারা সবাই চলে যেতে পারে না।”

তিন

“কেন?” লীনা জিজ্ঞেস করল। ভয় পাওয়ার বদলে সে যেন রেগে গেল, একটু, যেন এই ধরনের অস্পষ্ট হুমকি তার সহ্য হচ্ছিল না।
লোকটা — এখন সবাই বুঝেছে সে জীবিত নয়, কারণ ফায়ারপ্লেসের আলো তার শরীরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, তার ছায়া মেঝেতে পড়ছিল না — জানালার দিকে তাকাল, যেখানে তুষার তখনও পড়ছিল অবিরাম।
“একটা রাতে আমার ছেলে এই সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়েছিল,” সে বলতে শুরু করল, ধীরে, যেন প্রতিটা শব্দ তাকে কষ্ট করে টেনে বের করতে হচ্ছে স্মৃতির গভীর থেকে। “শত্রু ঢুকেছিল দুর্গে, রাতের অন্ধকারে, আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। আমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম বাকিদের বাঁচাতে পারব যদি একটা দিক আটকে রাখি। যুদ্ধে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে হয়, দ্রুত, চিন্তা না করে। ছেলে ছিল সেই দিকে। আমি জানতাম না।”
কেউ কিছু বলল না। ফায়ারপ্লেসের কাঠ একটু নড়ে উঠল, আগুনে, একটা ফাটা শব্দ করে, যেন সে-ও এই গল্পের ভার অনুভব করছে।
“আপনি জানতেন সে ওখানে?” গ্রেটা জিজ্ঞেস করল, প্রায় নিঃশব্দে, ভয়ে যেন তার নিজের কণ্ঠস্বরও।
“না,” লোকটা বলল, মাথা নীচু করে। “জানলে বন্ধ করতাম না, কোনো বাবাই করত না। কিন্তু এটা বলে কী লাভ, এখন? সে মারা গেছে, আর আমি জানতাম না, আর এই দুটো কথাই সত্যি, একসঙ্গে, একই সময়ে। এই সত্যটা নিয়েই আমি বেঁচে ছিলাম বাকি জীবন — যদি সেটাকে বেঁচে থাকা বলা যায়।”

চার

হের্মান এতক্ষণ চুপ ছিল, আগুনের দিকে তাকিয়ে, যেন নিজের ভেতরে কিছু একটা মেলাচ্ছিল। এবার বলল, “এটা আপনার দোষ না।”
“তুমি এটা জানো কীভাবে?” লোকটা ফিরে তাকাল তার দিকে, প্রথমবার সরাসরি চোখে চোখ রেখে।
হের্মান একটু থামল, যেন শব্দগুলো খুঁজে নিতে সময় লাগছে তার। “কারণ আমিও একবার একটা দরজা বন্ধ করেছিলাম। অন্য একটা জায়গায়, অন্য একটা কারণে, কিন্তু একইরকম একটা মুহূর্তে — যখন সময় ছিল না ভাবার, শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আর বহু বছর ভেবেছি সেটা আমার দোষ কিনা। উত্তর পাইনি এখনও, আজও না। কিন্তু জানি একটা জিনিস — ভাবতে ভাবতে জীবনটা কেটে যায়, আর তাতে কারও লাভ হয় না, না নিজের, না অন্য কারও।”
লোকটা কিছু বলল না প্রথমে। তার চোখ — যদি চোখ বলা যায় সেটাকে, কারণ সেখানে আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল না — অন্যদিকে ফিরে গেল, জানালার বাইরের তুষারের দিকে।
“তুমি কী বন্ধ করেছিলে?” অভিক জিজ্ঞেস করল হের্মানকে, কৌতূহলের চেয়ে বেশি সহানুভূতি নিয়ে।
“আমি বলতে চাই না,” হের্মান বলল, চোয়াল শক্ত করে। “কিন্তু বলছি এইজন্য যে বুঝি, একা এই ভার বইতে বইতে মানুষ পাথর হয়ে যায়। এই লোকটা পাথর হয়ে গেছে। আক্ষরিক অর্থেই, মনে হয়।”

পাঁচ

এই কথায় লোকটা হাসল, একটু, অদ্ভুতভাবে, যেন বহুকাল পর তার মুখের পেশি এই ভঙ্গি মনে করতে পারল। “পাথর হয়ে যাওয়া,” সে বলল, শব্দগুলো মুখে ঘুরিয়ে যেন স্বাদ নিচ্ছে। “হ্যাঁ, এটাই ঠিক কথা। আমি নিজেকে এই দুর্গের দেয়ালের সঙ্গেই বেঁধে ফেলেছিলাম, আশা করে যে যদি যথেষ্ট দীর্ঘ সময় ধরে অনুশোচনা করি, হয়তো কিছু একটা বদলাবে।”
“আপনার ছেলের নাম কী ছিল?” গ্রেটা জিজ্ঞেস করল, নরম গলায়।
“কনরাড।”
“সে কেমন ছিল?”
লোকটা একটু অবাক হল প্রশ্নে, যেন এই প্রশ্ন এতদিন কেউ করেনি তাকে — সবাই তার দুঃখ নিয়ে জানতে চেয়েছে, কেউ তার ছেলের জীবন নিয়ে নয়। “চঞ্চল। কথা শুনত না ভালো, সবসময় নিজের মতো করে সব কিছু করতে চাইত। একবার আমার ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল, হাঁটু ছিলে গিয়েছিল রক্তে, তারপরও হাসছিল, যেন ব্যথাটাই একটা মজার আবিষ্কার। আমি রেগে গিয়েছিলাম, সে হাসছিল বলে, আর ভয় পেয়েছিলাম বলেও।”
“সে হাসছিল কেন?”
“বলেছিল, পড়ে যাওয়াটাও তো একটা মজার ব্যাপার, বাবা, কারণ এখন আমি জানি ঘোড়া থেকে কীভাবে পড়তে হয় না। আমি বুঝতাম না তখন সে কী বলতে চাইছে, ভেবেছিলাম নিছক বাচ্চার কথা।”

ছয়

“এখন বোঝেন?” টমাস জিজ্ঞেস করল, প্রথমবার মুখ খুলল সে, গলা একটু কাঁপা।
“বুঝি হয়তো,” লোকটা বলল, একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ করে, যদিও তার শরীরে নিঃশ্বাসের কোনো প্রয়োজন ছিল না আর। “যে জিনিস খারাপ মনে হয়, সেটাও কখনও কখনও শুধু একটা মুহূর্ত। পড়ে যাওয়া, তারপর ওঠা। কিন্তু আমার বেলায় সে ওঠেনি। আমি সেই না-ওঠাটাই মনে রেখেছি এতদিন, বাকি সব ভুলে — তার হাসি, তার চঞ্চলতা, তার প্রশ্নগুলো, সব চাপা পড়ে গিয়েছিল একটা রাতের নীচে।”
লীনা বলল, নরম কিন্তু দৃঢ় গলায়, “তাহলে বাকিটা মনে রাখুন এখন। তাকে শুধু তার মৃত্যু দিয়ে চিনবেন না।”
লোকটা তাকাল তার দিকে অনেকক্ষণ, কিছু বলল না। কিন্তু ঘরের ঠান্ডাটা একটু কমে এল, ধীরে, যেন কেউ জানালা বন্ধ করে দিয়েছে অনেকক্ষণ পর, বা যেন ঘরটাই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছে।

সাত

রাতটা কাটল, ধীরে, প্রতিটা মুহূর্ত টেনে টেনে। কেউ ঘুমাল না ভালো করে, কিন্তু কেউ মরল না, কেউ হারাল না — এবং এইটুকুই সেই রাতের সবচেয়ে বড়ো আশ্বাস হয়ে রইল সবার কাছে। সকালে যখন তারা উঠল, শরীর ব্যথায় আড়ষ্ট, চোখ ঘুম-না-হওয়ার ভারে ভারী, লোকটা আর ছিল না ঘরে। শুধু ছবিটা ছিল দেয়ালে, আর অভিকের মনে হল — নিশ্চিত না, কিন্তু মনে হল — ছবির লোকটার মুখে আগে যেটুকু কঠোরতা ছিল, সেটা এখন একটু কম, যেন রাতভর কোনো অদৃশ্য হাত সেই পাথরকে একটু নরম করে দিয়েছে।
হের্মান বাইরে বেরিয়ে অনেকক্ষণ কিছু বলল না, শুধু তুষারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন ঠান্ডা বাতাস তার ভেতরের কিছু একটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে। তারপর বলল, “আমি একটা চিঠি লিখব। পুরোনো একটা ব্যাপারে। বহুদিন হল লিখব ভাবছি, কিন্তু সাহস হয়নি।”
কেউ জিজ্ঞেস করল না কী চিঠি। প্রয়োজন ছিল না — সবাই বুঝেছিল, এই দুর্গের রাতটা শুধু একজন ব্যারনের ভূতের জন্য ছিল না।

আট

অভিক ঘুম থেকে উঠল নিজের ঘরে, অনেক দিন পর, বইটা কোলের ওপর, পাতাগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে ছিল যেখানে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। জানালার বাইরে তুষার তখনও পড়ছিল, সাধারণভাবে, যেমন সব রাতে পড়ে, নিঃশব্দে, ধারাবাহিকভাবে, কোনো নাটক ছাড়াই।
সে বইটা বন্ধ করল, রাখল পাশে টেবিলে। ভাবল না কিছু নতুন করে, বরং পুরোনো একটা কথা মনে পড়ল — তার বাবা একবার বলেছিলেন, দুঃখ জিনিসটা এমন, যা লুকিয়ে রাখলে বেড়ে যায়, বললে ছোটো হয়। তখন কথাটা বোঝেনি সে, শুনেছিল শুধু, মাথায় রেখেছিল একটা তথ্যের মতো। এখন মনে হল, একটু বুঝল, ভেতর থেকে, যেভাবে গল্পের ব্যারন বুঝেছিল তার ছেলের হাসির অর্থ, বহু বছর পর।
সে আলো নিভিয়ে দিল। জানালার বাইরে তুষার পড়ছিল, একইরকম, একটুও বদলায়নি — শুধু দেখতে এখন আর অত ভয়ের লাগছিল না। বরং তাতে একটা শান্তি ছিল, যেন প্রতিটা তুষারকণা তার নিজের জায়গায় পড়ছে, ঠিক যেমন তার পড়া উচিত।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment