
হাসপাতালে
রাতবিরেতে
রাজর্ষি
গুপ্ত
পিসিঠাম্মা
নাক কুঁচকে বললেন, “আজকাল যে তোদের কী সব দাঁত-মুখ খিঁচোনো ভূতে পেয়েছে বুঝি না বাপু! ভূত মানে যেন সে ভালো হতে পারে না!”
“না না না, কিছুতেই পারে না,” সমস্বরে বলে উঠল টুবিন, সুলু আর রিভান।
রিভানের বয়স ওদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি—এগারো।
সে ঠোঁট উলটে বলল, “ভূতের গল্প শুনে যদি ভয়ই না হল, যদি রাত্তিরে খাট থেকে উঠে হেঁটে হেঁটে বাথরুমে যাওয়াই গেল তাহলে আর সে কেমন ভূত?”
রিভান
বলল, “ভূত মানে সে থাকবে শ্মশানে, গ্রেভইয়ার্ডে, হন্টেড হাউসে।
লম্বা জিভ বার করে ভয় দেখাবে।
তারপর রামনাম শুনলে কিংবা হোলি ক্রস দেখলেই ভয়ে পালিয়ে যাবে।”
সুলু
বলল, “ঠিক।
কেউ কখনও শুনেছে ওয়্যারউলফ, ভ্যাম্পায়ার, জোম্বি এরা ভালো হয়? আগেকার দিনে যে সব শাঁকচুন্নি, নিশি, স্কন্ধকাটারা ছিল তারা কি কখনও কারোর উপকার করত? না, তারা উলটে নিরীহ মানুষের ঘাড়ে চাপত।”
পিসিঠাম্মা
বললেন, “রাখ বাপু! কথা শোনো পুঁচকেদের, যেন কত একেবারে ভূতের গুষ্টির অন্নপ্রাশন খেয়ে এসেছে! বলি আমার চেয়ে বেশি তো তোরা আর ভূতেদের চিনিস না?”
পিসিঠাম্মার
ধপধপে সাদা চুল বড়ি খোঁপা করে মাথার পিছনে বাঁধা, সিঁথিতে এক ইঞ্চি লালচে দাগ।
গায়ে সবসময় লাল নয়তো মেরুন রঙের মোটা হাউসকোট।
থেকে থেকেই টেবিলে রাখা শিশি থেকে দু-আঙুলে অডিকোলোন নিয়ে ঘাড়ে ঘষছেন আর হজমোলা মুখে পুরে চুষছেন।
যার উপর খুশি হবেন তাকেই ডেকে হজমোলা দেবেন।
আর যার উপর রাগ করবেন তার উপর চেঁচিয়ে রাগমাগ করে একেবারে অস্থির কাণ্ড করবেন।
ওই খুরখুরে চেহারায় কী দাপট! পিসিঠাম্মাকে ভয় পায় না কে? পিসোদাদু বলেন, শেষ যে হাসপাতালে পিসিঠাম্মা চাকরি করতেন সেখানে তিনি ডিউটিতে ঢোকার সময় নাকি সব ডাক্তাররা একদিকে আর সব রোগীরা একদিকে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে তাঁকে সেলাম করত।
রিটায়ার করার দিন তাদেরই সবাইকে জড়িয়ে ধরে নাকি পিসিঠাম্মার কী কান্না! স্বয়ং হসপিটাল সুপার নাকি বলেছিলেন যে তিনি তাঁর চল্লিশ বছরের ডাক্তারি জীবনে প্রভাবতী দত্তের মতো জাঁদরেল মেট্রন আর একজনও দেখেননি।
অবশ্য পিসিঠাম্মাকে হাসপাতালে যেতে রিভান-সুলু-টুবিনেরা দেখেনি।
রিভানের জন্মের বছর দশেক আগেই পিসিঠাম্মা রিটায়ার করে গেছেন।
রিভান
চোখ পাকিয়ে বলল, “তুমি ভূত দেখেছ?”
পিসিঠাম্মা
বললেন, “আলবাত দেখেছি।
তোদের মিছে কথা বলব না কি?”
“ভালো ভূত?”
“হ্যাঁ।
সেই গল্পটা যদি শুনতে চাস তো এইখানে এসে বোস।
আর খবরদার, ওই অখাদ্য ফোনগুলোকে দূর করে দিয়ে আয় তোদের মায়েদের কাছে।
সুলু, আসার সময়ে হজমোলার কৌটোটা নিয়ে আসবি।”
আজ্ঞা
পালন করে তিন ভাই-বোন ধুপধুপ করে এসে বসে পড়ল পিসিঠাম্মার খাটে।
একটা হজমোলা মুখে পুরে পিসিঠাম্মা গল্প শুরু করলেন।
* * *
এ
আমার নার্সজীবনের একদম গোড়ার দিকের গল্প।
চীন-ভারত যুদ্ধ তখন সবে শেষ হয়েছে।
শিক্ষানবিশ নার্স হিসেবে সদ্য জয়েন করেছি এক খুব পুরোনো হাসপাতালে।
নাম বলব না, পরে কখনও সেখানে যেতে হলে তোরা ভয় পাবি।
পুরোনো একটা জমিদারবাড়িকে মেরামত করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাজ-চালানো গোছের হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল।
পরে দেশ স্বাধীন হলে সেটাকেই পাকাপাকিভাবে হাসপাতাল করে দেন বিধান রায়।
বিরাট তিনমহলা প্রাসাদের বাইরের দুটো মহল জুড়ে হাসপাতাল আর ভিতরের মহলটায় সব ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য
কর্মচারীদের কোয়ার্টার।
আমাদের ট্রেনি নার্সদের হস্টেলও ছিল ওইখানে।
খাসা আছি।
সমবয়সি আরও ট্রেনি নার্স যারা ছিল তাদের সঙ্গে দিব্যি বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলেছি।
ডিউটির সময় ডিউটি দিই, হস্টেলে এসে রাঁধি-বাড়ি-খাই।
ফাঁকা সময় বলতে গেলে পাইই না, তবু পেলে চুটিয়ে গল্পের বই পড়ি নয়তো উল বুনি।
হাসপাতালের সব কাজকর্মই শিখে নিচ্ছি।
কত রকম লোক দেখছি।
এক-এক সপ্তাহে এক-এক ওয়ার্ডে ডিউটি পড়ে।
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাইট ডিউটিও পড়ে।
সিনিয়র ডাক্তার আর মেট্রনরা আমাদের খুব খেয়াল রাখতেন।
রোগীর দেখভাল কী করে করতে হয়, পেশেন্ট পার্টিকে কীভাবে সামলাতে হয় সব তাঁরা হাতে ধরে শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
সে সব তো আর কেউ কলেজের বইতে পড়ে আসে না।
এক-একটি রোগীই হল এক-একটি আস্ত বই, এ কথা
আমি চিরকাল বলে এসেছি, সে কথা তাঁরাই শিখিয়েছিলেন।
তবে সব ডাক্তার আর মেট্রনই যে ভালো ছিলেন তা বলতে পারি না।
অনেকে আমাদের কমবয়সি পেয়ে পিছনেও লাগতেন।
তদ্দিনে
আমরা সবাই জেনে গিয়েছি যে সাত নম্বর ওয়ার্ডে নাকি ভূত আছে।
ঠিক ওয়ার্ডে বলা ভুল।
জেনারেল ওয়ার্ড মানে একটা বড়ো হলঘরে সাত-আটটা বেড আর তার এক প্রান্তে একটা আলাদা ঘর বা কেবিন।
কেবিনে দুটো খাট।
কোনো রোগীর রোগ বাড়াবাড়ি হলে বা বিশেষ দেখভালের দরকার হলে ওই কেবিনে রাখতে বলতেন ডাক্তারেরা।
ওয়ার্ডের ঠিক বাইরে ছিল ডিউটি নার্সদের বসার একটা খুপরি।
সেখান থেকে পুরো জেনারেল ওয়ার্ড আর উলটোদিকে কেবিনের দরজাটা দেখা যেত স্পষ্ট।
গুজব ছিল ওই কেবিনটাকে নিয়েই।
ওইখানে নাকি রাতবিরেতে অনেকে অনেক কিছু দেখে ভয় পেয়েছে।
অবশ্য এইখানে ভূত থাকা কিছু বিচিত্র নয়, কারণ এই একটা ওয়ার্ডই ছিল হাসপাতালের আসল বাড়ি থেকে একটু আলাদা।
কে না জানে যে এইসব পুরোনো বাড়িতে ভূত থাকেই? আর পুরোনো হলেও হাসপাতাল-বাড়িতে লোক গমগম করছে, কাজেই ভূত বেচারিরা একটু সরে গিয়ে একটু ফাঁকায় নির্জন জায়গা যদি খোঁজেই, তাহলে তাদের আমি অন্তত দোষ দিতে পারি না।
এই সাত নম্বর ওয়ার্ড ছিল পুরোনো জমিদারবাড়ির মাঝমহলের পাশে একটেরে একটা আলাদা ছোটো বাড়িই যেন।
হয়তো আউটহাউস গোছের কিছু ছিল এককালে, পরে একটা ঢাকা বারান্দা বানিয়ে মূল বাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
ওই বারান্দার মুখেই আমাদের ওয়ার্ড নার্সদের কমন রুম।
শিফট চলাকালীন ওইখানেই এসে বসে দু-দণ্ড জিরিয়ে নিতাম আমরা।
কিংবা একটু চা-মুড়ি খেতে খেতে আড্ডাও মেরে নিতাম।
জগদ্ধাত্রী
পুজো সদ্য
গিয়েছে।
বাতাস হিম-হিম হয়ে আসছে।
হাসপাতাল জুড়ে তখন সর্দিজ্বরের রোগী।
ফ্লুয়ের প্রাদুর্ভাব শুরু হল কিনা তখনও বোঝা যাচ্ছে না।
এমনকি ডাক্তার আর নার্সরাও অর্ধেকের উপর কাবু হয়ে পড়েছে।
ঠিক এই সময়—তখন চাকরির প্রায় মাসদেড়েক হয়ে গিয়েছে আমার—ডিউটি পড়ল সাত নম্বর ওয়ার্ডে।
আর পড়বি তো পড় নাইট ডিউটিই পড়ল।
রাত এগারোটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত ডিউটি।
সাড়ে দশটার সময় নার্স রুমে দাঁড়িয়ে ডিউটি বুঝে নিতে গিয়ে আমার এক গাল মাছি।
মেট্রন সুরভিদি ছলোছলো চোখে বললেন, “প্রভাবতী, আজ নাইটটা তোমাকে কিন্তু একাই করতে হবে।
তোমার সঙ্গে ছায়ার ডিউটি করার কথা ছিল, কিন্তু সে তো আজ বিকেল থেকে জ্বরে কোঁকাচ্ছে।
ফ্লু ধরল কিনা কে জানে।
একটু সামলে দাও ভাই।”
গোলগাল
নরমসরম মানুষ সুরভিদি মানুষ ভালো।
অন্যান্য মেট্রনদের মতো ট্রেনি নার্সদের সবসময় খ্যাঁকখ্যাঁক করেন না।
তাদের কথা মন দিয়ে শোনেন, মনে সাহস জোগান, একসঙ্গে বসে মুড়ি-চানাচুর খান।
কিন্তু আজ তাঁর এই কথা শুনে গলা শুকিয়ে গেল আমার।
দু-সপ্তাহ আগেই শুনেছি দুজন ট্রেনি নার্স মলিনা আর সুপ্রীতি ওই ওয়ার্ডে কীসব নাকি দেখেছিল।
ওই শেষের ঘরের জানলার বাইরে দিয়ে সাদা মতো কী একটা জিনিস বুঝি ভেসে গিয়েছিল ছায়ার মতো।
ঘরটায় তখন কোনো রোগী ছিল না—পুরো ফাঁকা ঘর।
সেখানে কে উড়ে বেড়াতে যাবে ভূত ছাড়া? দুজনে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঠকঠক করে কেঁপেছিল।
তারপর গোটা রাত্তির ওয়ার্ডের বাইরে খুপরিতে বসে রামনাম জপ করেই কাটিয়ে দিয়েছিল।
ঘণ্টায় ঘণ্টায় ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে বেরোনোর সময় নাকি এ ওকে
এমন জাপটে ধরে হাঁটছিল যে পায়ে পা জড়িয়ে কুমড়ো-গড়াগড়ি একেবারে।
সারা রাত নাকি ওই ঘরের ভিতর এক ছায়ামূর্তিকে উড়ে বেড়াতে দেখেছিল ওরা।
তবে এসব কথা আমাকে মলিনা বা সুপ্রীতি বলেনি।
এ সব আমি শুনেছিলাম ডাক্তার সেনগুপ্তর কাছ থেকে।
ডাক্তার সেনগুপ্ত বেশ ছেলেমানুষ, আমুদে লোক ছিলেন।
গান গেয়ে, গল্প বলে চারদিক মাতিয়ে রাখতেন।
যাই
হোক, ডিউটি তো আর অগ্রাহ্য করা চলে না।
আর শিক্ষানবীশ নার্স হয়ে মেট্রনের মুখের সামনে আঁই-আঁই করাও যায় না।
আমি তাই শুকনো মুখে ঘাড় নেড়ে ডিউটি বুঝে নিয়ে হস্টেলে চলে এলাম তৈরি হতে।
এক ফাঁকে পাশের ঘরে গিয়ে ছায়ার সঙ্গে দেখাও করে এলাম।
সেও আমারই মতো ট্রেনি নার্স।
বেচারি সত্যিই ওষুধ খেয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় পড়ে আছে, যন্ত্রণায় মাথা তুলতে পারছে না।
তাও বলল, “শোন, অত চিন্তা করিস না।
মনে হচ্ছে জ্বর শেষরাতের দিকে ছেড়ে যাবে।
তা যদি হয় তবে আমি তখন গিয়ে তোর সঙ্গে বসব।”
আমি
ঘাড় নাড়লাম, কিন্তু বুঝলাম যে এ যা
নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা ওর, অন্তত কাল সকালের আগে ও খাড়া
হতে পারবে না।
তবে মুখে কিছু বললাম না।
আমার মুখ দেখে বোধ হয় কিছু বোঝা যাচ্ছিল।
ছায়া ফিক করে হেসে জিজ্ঞাসা করল, “কী রে? ভয় করছে নাকি একা সাত নম্বর ওয়ার্ডে ডিউটি দিতে?”
আমি
সাহস পেয়ে তড়বড় করে বলে ফেললাম ডাক্তার সেনগুপ্ত কী বলেছেন আমাকে মলিনা আর সুপ্রীতির ভূত দেখা নিয়ে।
শুনে কোথায় ছায়া আমার দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে আমাকে সান্ত্বনা-টান্ত্বনা দেবে, তা নয় সে তো হেসেই খুন! মুখে হাত চাপা দিয়ে খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে বলে কী, “ওরে বুদ্ধু, এ গল্প
কি তোকে মলিনা বা সুপ্রীতি নিজের মুখে বলেছে? বলেনি তো? বলবেও না।
ওরে হাঁদা, ওরা ভয় পেয়েছিল বটে সেদিন, কিন্তু তারপর দুজনে মিলে ওই ঘরে ঢুকে দেখতেও গিয়েছিল কী ব্যাপার।
ঘরে ঢুকে আলো জ্বালানোর আগেই দেখে একটা জ্বলজ্বলে জামা পরা নরকঙ্কাল ওদের দিকে উড়ে আসছে।
দুজনে তাই দেখে দাঁত ছিরকুটে পড়ার অবস্থা।
এমন সময় খটাং করে সুইচ টেপার শব্দ, আর ঘর আলোয় আলো।
দুজনে দেখে কী, যে একটা সাদা অ্যাপ্রন জড়ানো কঙ্কাল উঁচু করে তুলে ধরে সুইচে হাত রেখে দাঁড়িয়ে দাঁত বার করে হাসছেন ডাক্তার সেনগুপ্ত নিজেই।
কঙ্কালটা অ্যানাটমি সেকশন থেকে নিয়ে এসেছিলেন, আর অ্যাপ্রনটার গায়ে ফসফরাস মাখানো ছিল তাই অন্ধকারের মধ্যেও ওরা ওটা দেখতে পেয়েছিল।
ভাব দেখি, কেমন বিটকেল রসিকতা! এমন করে ট্রেনি নার্স আর জুনিয়র ডাক্তারদের পিছনে লাগাই নাকি ওঁর স্বভাব।
ইচ্ছে করে ধরে দু-ঘা দিই।
যা যা, নির্ভয়ে ডিউটি কর।
ওই ঘরে ভূত-ফুত কিস্যু নেই।”
ছায়ার
কথায় ভয়টা পুরোপুরি ভাঙল না বটে, কিন্তু কমল কিছুটা।
যাই হোক, আমি হরেকৃষ্ণ-হরেকৃষ্ণ জপতে জপতে এগারোটার সময় ওয়ার্ডে চলে গেলাম।
আমার ছোড়দাদু বলে দিয়েছিলেন যে বিপদে পড়লেই শ্রীহরিকে স্মরণ করবে।
আসলে কী জানিস? ভূতের ভয়-টয় বড়ো কথা নয়।
কিন্তু ওই বয়সে রাত্তিরবেলা একা ডিউটি দিতে হলে বড়ো একা লাগত।
বিরক্ত লাগত।
মনে হত যেন দম আটকে আসছে।
শুনতে খারাপ লাগলেও বলি, ভূতের আবির্ভাব যেন না হয় এই প্রার্থনার সঙ্গে শ্রীহরির কাছে এটাও প্রার্থনা করছিলাম যে জ্বর-টর মাথায় থাকুক, ছায়া যেন রাত বাড়লে সত্যিই চলে আসে।
বিশেষ করে সারা রাত ধরে ছ-সাতজন রোগীর দেখাশোনা করতে হবে।
শ্রীহরিকে এটাও জানিয়ে রাখছিলাম যে রাত্তিরে কারোর যেন বাড়াবাড়ি না হয় ওয়ার্ডে।
সেটা হলে আমি একা হাতে সামলাতে পারব না।
যাই
হোক।
ওয়ার্ডের বাইরের খুপরিতে টেবিল-চেয়ার পেতে বসে আছি তো বসেই আছি।
দুপুরে যথেষ্ট ঘুমিয়ে নিয়েছি তাই ঘুম পাচ্ছে না, ফলে আরোই যেন সময় কাটতে চাইছে না।
অপেক্ষা করার সময় ঘড়ির কাঁটা যেন কচ্ছপ হয়ে যায়।
এর মধ্যে দু-ঘণ্টায় দু-বার রাউন্ড দিয়ে এসেছি।
রোগীরা সবাই ঠিক আছে।
নাইট ডিউটির ডাক্তার নিবারণ সুরও এসে ঘুরে গিয়েছেন।
বেরিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, “কী সিস্টার, কেবিনটা ভালো করে দেখে নিয়েছেন তো ডিউটি শুরু করার আগে? আবার কোনো কোট পরা কঙ্কাল-টঙ্কাল লুকিয়ে বসে নেই তো ওখানে?”
শুনে
গা জ্বলে গেলেও কিছু বলার নেই।
দেঁতো হাসি হাসলাম।
ডাক্তার মিচকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন।
আজ অবশ্য ওই ঘর আর অত ভয়ঙ্কর ছিল না, রোগী ছিল সেখানে।
ডাক্তারবাবু
বেরিয়ে যাওয়ার পরে সময় যেন আর এগোতেই চায় না।
বসে বসে ওয়ার্ড বুকে নোট লিখে রাখছি।
কিন্তু তাই বা আর কতক্ষণের ব্যাপার? চারদিক থমথম করছে।
শুধু দু-একজন পেশেন্টের মৃদু নাক ডাকা আর মাঝে মাঝে একটু গোঙানি কি কাতরে ওঠার আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।
এমন কী ঝিঁঝিঁপোকা কিংবা টিকটিকির ডাকও নয়।
চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে ভাবলাম উল-কাঁটা নিয়ে এলে ভালো হত, সময়টা কাটত।
তারপরেই মনে পড়ল গতকালই মেট্রন শৈলদি একজন নার্সকে ওয়ার্ডে বসে সেলাই করার জন্য কড়া ধমক দিয়েছেন।
ওঁর মতে ছুঁচ-সুতো-উলের মতো সাত রাজ্য ঘুরে আসা অস্বাস্থ্যকর জিনিস নাকি আর হয় না।
আর গল্পের বই তো নিয়ে ঢোকাই যাবে না।
ডিউটি শুরুর সময় নার্স রুম থেকে বেরোনোর সময়েই মেট্রন কড়া চোখে দেখে নেন বই আছে কিনা সঙ্গে, কারণ বইয়ের মধ্যে নাকি লোকে এমন মশগুল হয়ে যায় যে কানের পাশে রোগীর শ্বাস উঠে গেলেও নার্সেরা শুনতেই পাবে না।
কথাটার মধ্যে জল মেশানো থাকলেও, স্থলভাগও কিছু আছে।
গল্পের বই নিয়ে ওয়ার্ডে ঢুকলে পেশেন্টের দিকে আর মন থাকে না মেয়েদের।
আর আজকাল হয়েছে ওই মোবাইল ফোন, সবাই ওয়ার্ডে পেশেন্টের পাশে বসেই সিনেমায় বুঁদ হয়ে যায়।
যাক গে সে সব কথা… মোদ্দা কথা, কেবলই আমার মনে হচ্ছিল ছায়া এখন এখানে থাকলে বেশ হত।
দুজনে গল্প করতে পারতাম।
কিংবা অ্যানাটমির পড়াটা ঝালিয়ে নিতে পারতাম—কদিন পরেই তো আবার পরীক্ষা দিতে হবে।
আর কিছু করার না পেয়ে ওয়ার্ডের প্রত্যেক রোগীর নাম আর রোগ মুখস্থ করার চেষ্টা করতে লাগলাম।
আমি তো এই ওয়ার্ডে নতুন।
এই
করতে করতেই আরও এক ঘণ্টা কেটে গিয়ে আবার রাউন্ডের সময় হয়ে গেল।
আমি উঠে জুতোয় কোনো শব্দ না করে হলঘরের মাঝ দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম রোগীদের।
আর এতক্ষণ ধরে পড়া বিবরণের সঙ্গে রোগীদের মনে মনে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম।
ওই যে সতীকান্ত বেরা।
বুড়ো মানুষ, ব্রঙ্কাইটিস নিয়ে ভরতি হয়েছেন।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই খুক-খুক করে কাশছেন।
তাঁর পাশে অঘোরে ঘুমোচ্ছেন হার্নিয়ার রোগী অপরেশ মুখার্জী।
রক্তে চিনি বেশি আছে তাই অপারেশন করা যাচ্ছে না এখনও।
ডানদিকের খাটে রাধানাথ ভট্টাচার্য চিত হয়ে ঘুমোচ্ছেন, কাল ওঁর অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের সেলাই কাটা হবে।
আর ওই যে বারো বছর বয়সের ডানপিটে ছেলে নীলাঞ্জন চাকলাদার।
গাছে উঠতে গিয়েছিল, ডাল ভেঙে সোজা আট ফুট নীচের খোয়া-বিছানো রাস্তায় পড়েছে।
বাঁ কনুইয়ের উপরে হাড় ভেঙেছে আর কাঁধ থেকে কনুই পর্যন্ত একেবারে ছেঁচে গিয়েছে।
বেচারি ছটফট করছে ঘুমের মধ্যে।
যন্ত্রণায় ঘুম আসছে না নাকি ওর?
সবাইকে
দেখা শেষ করে পা বাড়ালাম কেবিনের দিকে।
শিরদাঁড়া দিয়ে যে একটু হিমস্রোত নেমে গেল না তা বলব না।
কিন্তু মনকে বোঝালাম যে কেবিনে ভূতের কথাটা নেহাৎই গুজব।
সবটাই যে ডাক্তার সেনগুপ্তর ফক্কিকারি তা হাসপাতালসুদ্ধু সবাই জানে, শুধু আমিই মাথামোটা তাই জানতাম না।
এই
ঘরে আছেন আদিত্যরঞ্জন মৌলিক।
পেটে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে ভরতি হয়েছিলেন।
এঁর মতো ভদ্রলোক আমি জীবনে কমই দেখেছি।
সবসময়েই তাঁর ভাবনা, এই বুঝি অন্য লোকের অসুবিধা করে ফেললাম।
শান্ত-সৌম্য চেহারার অল্পবয়সি মানুষ, কোনো নেশাভাং করেন না।
এহেন মানুষের প্যাংক্রিয়াসের প্রায় অর্ধেকটা যে কী করে বিষিয়ে উঠেছে সেটা ডাক্তাররাও ধরতে পারছেন না বলে এখনও পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে।
ওষুধবিষুধ দিয়ে এখন পেটের সেই বিকট যন্ত্রণাকে কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও মাঝেমাঝেই সেটা চাগাড় দিয়ে উঠছে।
ডাক্তারেরা তাই ওঁকে ওয়ার্ডের হট্টগোল থেকে দূরে এই একটেরে ঘরে শিফট করিয়ে দিয়েছেন।
সুরভিদি বলে দিয়েছেন, “বেচারি রাতে যন্ত্রণায় ঘুমোতে পারেন না।
তেমন বুঝলে ওকে একটু মরফিন দিয়ে দিস।
যন্ত্রণাও কমবে, আর একটু হলেও ঘুম হবে।”
ঘর
থেকে কীসের যেন ক্যাঁচকোঁচ শব্দ আসছিল।
বুক ঢিপঢিপ করছিল আমার।
পায়ে পায়ে ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
সবুজ নাইটল্যাম্পের আলোয় ঘরটা আবছা দেখা যাচ্ছে।
সেই আলোয় দেখলাম আদিত্যবাবু বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছেন।
ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজটা আসছে জংধরা লোহার খাটের কলকব্জা থেকেই।
ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল আমার।
আর তারই সঙ্গে মায়াও হল একটু।
সুরভিদি ঠিকই বলেছিলেন।
বেচারি সত্যিই যন্ত্রণায় ঘুমোতে পারছেন না।
কথাটা মনে ছিল বলে আমি বুদ্ধি করে মরফিনের শিশিটা নিয়েই ওয়ার্ডে ঢুকেছিলাম।
আদিত্যবাবু আমাকে ঢুকতে দেখে ক্লিষ্ট মুখে হাসলেন।
এই একটা দারুণ ব্যাপার ছিল ওঁর মধ্যে।
যতই কষ্ট হোক, উনি সবসময় হাসিমুখে থাকতেন।
এতে আমরাও বুকে বেশ বল পেতাম।
এমন রোগীর জন্যই তো আমরা লড়াই করি।
আমরা তাই আদিত্যবাবুকে খুব ভালোও বেসে ফেলেছিলাম।
ভদ্রলোক জেগে আছেন দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী ব্যাপার? ঘুম আসছে না বুঝি?”
উনি
চিঁ-চিঁ করে উত্তর দিলেন, “না সিস্টার।
মাঝেমাঝে তন্দ্রা মতো আসছে, কিন্তু তারপরেই ব্যথাটা এমন এক-একটা খোঁচা মারছে যে ঘুম উড়ে যাচ্ছে।”
বললাম, “ভয় নেই।
ওষুধ সঙ্গে নিয়েই এসেছি আমি।”
তখন
তো আর ঘুমের ওষুধের ট্যাবলেট হত না।
মরফিন সিরাপই খাওয়াতে হত গায়ে দাগ কাটা শিশি থেকে।
সেই দাগ মেপে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে বললাম, “আর চিন্তা নেই।
এইবার আস্তে আস্তে ঘুম এসে যাবে।
আর কিছু লাগবে আপনার?”
আদিত্যবাবু
আবার মিষ্টি করে হেসে বললেন, “হ্যাঁ, মানে, একটু জল যদি পাওয়া যেত…”
দেখলাম
খাটের পাশে ছোটো টেবিলের উপরে রাখা জলের জাগটা ফাঁকা।
উনি আবার কুণ্ঠিত মুখে বললেন, “আপনাকে আবার অতটা আসতে হবে কষ্ট করে… কিন্তু কী করব বলুন? রাত্তিরে জলতেষ্টা বেশি পায় যে।”
আমি
হেসে বললাম, “অত আপনাকে ভাবতে হবে না।
আমি এক্ষুনি জল এনে দিচ্ছি।”
জল
নিয়ে আসতে হবে বারান্দা পেরিয়ে সেই নার্সদের কমন রুমের সামনে থেকে।
ঘর থেকে বেরিয়ে ওয়ার্ডের মধ্যে দিয়ে দ্রুত পায়ে সেদিকে হাঁটছি, এমন সময় ডানদিক থেকে উঠল এক প্রচণ্ড কাশির দমক।
সতীকান্তবাবু।
ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালীর কফের কুচি ঢুকে গিয়েছে বোধ হয়।
বেচারি শ্বাস নিতে পারছেন না।
কাশতে কাশতে হাত-পা ছুড়ে উঠে বসার চেষ্টা করছেন প্রাণপণে।
আমি দৌড়ে গিয়ে বুড়ো মানুষটির হাত ধরে তুলে বসালাম।
পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে খানিক পরে কাশির দমক একটু কমল।
পাশের টেবিল থেকে জলের গেলাসটা তুলে নিয়ে একটু জল খাইয়ে দিলাম।
তখন ভদ্রলোক একটু সুস্থির হলেন।
আমার দিকে চেয়ে ম্লান হেসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “বাঁচালে মা লক্ষ্মী।
এইবার বেশ ঠিক লাগছে।
যাও, তুমি এখন যাও।”
ভদ্রলোক
পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন।
আর কী অবাক কাণ্ড, ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে শুনি তাঁর নাক ফুরফুর করে ডাকতে লেগেছে! আমি আবার আমার টেবিলের দিকে হাঁটা দেব, এমন সময় আবার থমকে গেলাম।
এবার কারণ একটা চাপা কান্নার আওয়াজ।
মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠলাম।
এ কী রে? ভূতে কাঁদে নাকি?
না, ভূত নয়।
ঘাড় ঘুরিয়ে কান্নার উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখি সেটা আসছে নীলাঞ্জন চাকলাদারের খাট থেকে।
বেচারি ঘুমের মধ্যেই গুঙিয়ে-গুঙিয়ে কাঁদছে।
মনে পড়ল এর আগে এই ওয়ার্ডে যে ছিল সেই সুপ্রীতি বলেছিল যে নীলু নাকি ঘুমের মধ্যে প্রায়ই কাঁদে।
দুঃস্বপ্ন দেখে না ঘুমের মধ্যেই ব্যথা পায় কে জানে।
আহা রে, না জানি কতই কষ্ট হচ্ছে বেচারির! গাছ থেকে পড়ে গিয়ে কচি হাড় ভেঙেছে, নরম গায়ে ব্যথা লেগেছে।
মা-বাপকে ছেড়ে একলা হাসপাতালে পড়ে আছে আজ দেড় সপ্তাহ।
পায়ে পায়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে নীলুর টুলটুলে মুখটিতে।
আমার মনে পড়ে গেল আমার সবচেয়ে ছোটো ভাইটি, তোদের ছোড়দাদুর কথা।
আজ তার পান খেয়ে খেয়ে দাঁতগুলো কালো হয়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু সেদিন সে ছিল ঠিক ওই নীলুর বয়সি।
মনে হল, আচ্ছা, মনু এখন বাড়িতে কী করছে? অঘোরে ঘুমোচ্ছে নিজের বিছানায় শুয়ে, তাই না? নাকি সেও ঘুমের মধ্যে এমনই দুঃস্বপ্ন দেখে ছিটকে ছিটকে উঠছে? আচ্ছা, মনুর কি তার দিদির জন্য মন কেমন করে?
পরম
মমতায় আমি নীলুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলাম।
সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই আমার আঙুল জড়িয়ে ধরল।
আমি গুনগুন করে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গানটার সুর ভাঁজতে লাগলাম তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে।
ওই গান গেয়ে পরে তোদের বাবা-কাকাদেরও কত ঘুম পাড়িয়েছি, আবার তোদেরও পাড়িয়েছি।
নীলুর ছটফটানি কমে গেল ধীরে ধীরে।
শ্বাসপ্রশ্বাস গভীর হয়ে এল।
তবু সে আমার হাত ছাড়ল না।
আমি কিচ্ছুটি না করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
জানি, এই অবস্থায় আমায় সিনিয়র কেউ দেখে ফেললে হয়তো বকুনি দিত।
রোগীর অতখানি গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ঠিক নয় কিনা, আমাদের জামাকাপড়ে কত জীবাণু থাকে।
কিন্তু তবু আমি সরলাম না যতক্ষণ না নীলুর হাত নিজে থেকেই ঘুমের ঘোরে অবশ হয়ে আমার আঙুল ছেড়ে দেয়।
আমি না সিস্টার? সিস্টার মানে তো দিদিই।
তারপর
অবশেষে যখন জল নিয়ে আদিত্যবাবুর কাছে ফিরলাম তখন প্রায় বিশ মিনিট পেরিয়ে গিয়েছে।
বেচারি সেই কখন জল চেয়েছিলেন! একরকম দৌড়াতে দৌড়াতেই ওঁর ঘরে ঢুকলাম।
ঢুকেই বললাম, “সরি আদিত্যবাবু, একটু দেরি হয়ে গেল, কিছু মনে করবেন না।
আসলে ওয়ার্ডে দু-একজনের হঠাৎ খুব শরীর খারাপ হয়ে পড়েছিল তো…”
আদিত্যবাবু
আবার তাঁর সেই মার্কামারা মিষ্টি হাসি হেসে ঘুম-ঘুম গলায় বললেন, “না না, সে ঠিক আছে।
খালি একজনকে নিয়ে পড়ে থাকলে আপনাদের চলবে কী করে? তাছাড়া কোনো ক্ষতি তো হয়নি।
ওই অন্য সিস্টারটি এসে আমায় জল দিয়ে গিয়েছেন তো।”
আদিত্যবাবু
আঙুল তুলে পাশে রাখা জলের জাগটা দেখালেন।
সেটা দেখলাম ভর্তি।
এক সেকেন্ড থমকালাম আমি।
তারপর একগাল হেসে বললাম, “ওহ্, তাহলে তো হয়েই গেল।
আর কিছু চাই আপনার?”
আদিত্যবাবু
দু-পাশে মাথা নাড়লেন।
আমি ওঁকে ঘুমোতে বলে চলে এলাম।
ওয়ার্ডের ভিতর এখন নাইটল্যাম্পের মৃদু আলো আর অখণ্ড নীরবতা।
কেবল রোগীদের মৃদু শ্বাস পড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
তার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার বেশ হালকা লাগছিল।
ভাবছিলাম যে, যাক, ছায়া তাহলে এল শেষ পর্যন্ত।
তার মানে ওর জ্বর নিশ্চয় কমে গিয়েছে।
কিন্তু… কিন্তু ছায়া যদি এলই তবে আমাকে আগে ডাকল না কেন? সোজা আদিত্যবাবুর ঘরেই চলে গেল কেন? ও কী
করে জানল আদিত্যবাবুর জলের দরকার? তাছাড়া ও এলই
বা কখন? আমি তো এই ঘরেই নীলুর হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলাম।
তখনই কি তবে ছায়া আমার পিছন দিয়ে চলে গিয়েছে আর আমি আলো-আঁধারিতে খেয়াল করিনি? এতটা তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম আমি নীলু আর মনুর কথা ভাবতে ভাবতে?
এই
সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ওয়ার্ডের বাইরে আমাদের খুপরিতে এসে ঢুকতেই আর একটা ধাক্কা খেলাম।
আমরা যখন নাইট ডিউটিতে যাই তখন রাতবিরেতে কাজে লাগার মতো টুকিটাকি জিনিস একটা হাতব্যাগে ভরে নিয়ে যাই।
আমি একা না, সব নার্সই তাই করে—অন্তত তখন করত।
আমি স্পষ্ট দেখলাম যে ওয়ার্ড রুমের খুপরির মধ্যে টেবিলের উপর পড়ে আছে কেবল আমারই হাতব্যাগটা।
ঠিক যেমন আমি ডিউটি শুরুর সময় এসে রেখেছিলাম একেবারে তেমনটিই।
আর কেউ এখানে ইতিমধ্যে পা দিয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
ধপ
করে চেয়ারে বসে পড়লাম।
কী রকম হল ব্যাপারটা? তবে কি ছায়া আসেনি? তবে কি সত্যিই ভূত? না না, তা কী করে হয়? ভূত বলে তো কিছু নেই।
ও ভূত তো ডাক্তার সেনগুপ্তর বানানো, নার্সদের মিছিমিছি ভয় দেখানোর জিনিস।
কিন্তু
তাহলে আদিত্যবাবুর কাছে গেল কে? কাকে দেখলেন উনি?
উত্তরটাও
আপনাআপনিই মাথায় চলে এল।
আদিত্যবাবু মরফিনের ঘোরে ভুল দেখেছেন।
উত্তরটা
ভেবে পেয়ে একটু হালকা হয়ে বসতে যাব, এমন সময় আবার মনে হল—কিন্তু তাহলে ওঁর জাগে জল ভরে দিয়ে এল কে? জাগটা যে ভর্তি তা তো আমি নিজের চোখে দেখেছি।
মাথা
গরম হয়ে উঠল ভাবতে ভাবতে।
অনেক ভেবে-টেবে নিজের মনকে বোঝালাম যে জল আমিই ভরে দিয়ে এসেছিলাম কোনো এক ফাঁকে।
হয়তো সতীকান্তবাবুর কাশির দমক ওঠার আগেই, কিংবা তার পরেও হতে পারে।
তারপর নীলুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে এমন ভাবনায় বুঁদ হয়ে গিয়েছি যে জল দিয়ে আসার ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে বেমালুম হাওয়া হয়ে গিয়েছে।
আর আদিত্যবাবু নির্ঘাত মরফিনের ঘোরে আমাকেই জল ভরতে দেখে অন্য কোনো নার্স বলে ভেবেছেন।
হ্যাঁ, এইটাই হবে।
এ ছাড়া পুরো ব্যাপারটার আর কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না।
কারণ ছায়া যে আসেনি এ ব্যাপারে
আমি সেন্ট পারসেন্ট নিশ্চিত।
আর ভূত বলে কিছু নেই, থাকতে পারে না।
আরও
খানিকক্ষণ কেটে গেল।
আবার রাউন্ড দেওয়ার সময় উপস্থিত।
যতই মনকে বোঝাই না কেন, এবার উঠে ওয়ার্ডের দিকে পা বাড়ানোর সময় বুকটা যেন একটু বেশিই দুরদুর করতে লাগল।
ওয়ার্ডের মধ্যে এখন রাধানাথবাবুর মৃদু নাসিকাগর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
এমন কী সতীকান্তবাবুর খুকখুকে কাশিও থেমে গিয়েছে।
গোটা ওয়ার্ড শেষ রাতের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
আমি ওয়ার্ডের শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে আদিত্যবাবুর ঘরের দরজা ঠেলে খুলে ফেললাম।
পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে খাটের দিকে তাকাতেই দেখি আদিত্যবাবুও আমার দিকে চেয়ে আছেন।
“কী? ঘুম আসছে না? এ তো
ভারি বিপদ হল দেখছি।”
কথাটা
আমি হাসিমুখে বললেও ভদ্রলোকের মুখ কাঁচুমাচু হয়ে গেল।
বললেন, “না না সিস্টার, আপনি ব্যস্ত হবেন না।
আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না।
আপনি জেনারেল ওয়ার্ডের দিকে খেয়াল রাখুন।
অন্য সিস্টারটি তো বারবার আমার কাছে আসছেনই, আমাকে তো বেল টিপে ডাকতেও হচ্ছে না।”
এইবার
সত্যি সত্যি আমার ঘাড় বেয়ে বরফের মতো ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল।
এ সব কী হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না যে।
“আদিত্যবাবু,” ভদ্রলোকের খাটের উপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই যে ‘অন্য নার্স-অন্য নার্স’ বলছেন, একে ঠিক কেমন দেখতে বলুন তো?”
কথাগুলো
বলতে গিয়ে আমার গলা কেঁপে গেল।
আদিত্যবাবু অবাক চোখে আমার দিকে চেয়ে বললেন, “কেন? ওই যে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নার্সটি।
নাম জানি না।
নীল চোখ, খাড়া নাক, মাথায় লালচে চুল।
ভাঙা-ভাঙা বাংলা আর ইংরিজি মিশিয়ে কথা বলেন।
সে কী সিস্টার? আপনি নিজের সহকর্মীকে চেনেন না?”
কী
উত্তর হয় এর? আমতা আমতা করে বললাম যে আসলে আমরা অনেকে একসঙ্গে নাইট ডিউটি করছি তো, তাই সবার সঙ্গে সবার দেখা হয় না।
যদিও এমন একটা জোড়াতালি দেওয়া যুক্তি যে মরফিন খাওয়া মনের সামনেও দাঁড়ায় না তা বেশ বুঝতে পারছিলাম।
দরজা
টেনে দিয়ে কোনোরকমে বেরিয়ে এলাম আদিত্যবাবুর ঘর থেকে।
ভদ্রলোক তখন মরফিনের ঘোর লাগা অবিশ্বাসী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
আমি একরকম দৌড়েই চলে এলাম নিজের খুপরিতে।
আমার বুক তখন ধড়াস-ধড়াস করছে।
দু-হাতে মাথা চেপে টেবিলে কনুই রেখে বসে পড়লাম আমি।
আমি
জানি যে গোটা হাসপাতালে কোনো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নার্স নেই।
তবে কে এসে আদিত্যবাবুর দেখাশোনা করে যাচ্ছে?
এবার
আমি সত্যিকারের ভয় পাচ্ছিলাম।
এতটাই ভয় যে ঠাকুরকে ডাকার কথা আমার মাথাতেও আসছিল না।
একটু ধাতস্থ হয়ে কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালাম।
একটু মুখে-চোখে জল দিয়ে আসতে হবে।
কমন রুমে গিয়ে দু-একজনের সঙ্গে দেখা হলে তবু একটু সাহস ফিরবে।
এ যে কী ফাঁপরে পড়লাম, কী রহস্য যে শুরু হল আমাকে আর ওই ঘরকে ঘিরে, ভাবতে ভাবতে টানা বারান্দা দিয়ে হেঁটে চললাম কমন রুমের দিকে।
আমার মনের একটা অংশ বলতে লাগল, আদিত্যবাবু মরফিনের ঘোরে আগাগোড়া চোখের ভুল দেখেছেন।
ভূত বলে কিছু হয় না, হতে পারে না।
তাছাড়া ভূতই যদি হবে তবে সে তো আমার বা আদিত্যবাবুর ক্ষতি করবে।
তা না করে সে আদিত্যবাবুর সেবা করবে কেন? আর মনের অপর একটা অংশ বলছে, ভূত জিনিসটা কোনো যুক্তির ধার ধারে না।
কাজেই এ সব
যুক্তিটুক্তি দেখিয়ে নিজেকে আরও বড়ো বিপদের মধ্যে জড়িও না।
মুখে-চোখে জল দিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি কমন রুমে একমাত্র হিরণ্ময়ীদি ছাড়া কেউ নেই।
হিরণ্ময়ীদি এই হাসপাতালে আছেন প্রায় বছর পনেরো হয়ে গেল।
জল খেয়ে ওঁর পাশেই গিয়ে বসলাম।
আমাকে দেখে বোধ হয় ওঁর কিছু সন্দেহ হল।
বললেন, “কী হয়েছে ভাই? তোমাকে এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন? তোমারও জ্বর এল নাকি?”
আমি
বললাম, “না না, তা নয়।
আসলে আমার ওয়ার্ডের ওই এক পেশেন্টকে নিয়ে একটু চিন্তায় আছি।
ভদ্রলোকের শরীরটা বেশ খারাপ।
তাই বোধ হয় চোখে একটু ভুলভাল দেখছেন।”
“ভুলভাল দেখছেন? কী দেখছেন শুনি?”
“তেমন কিছু নয়,” আমি বললাম, “ওঁর ধারণা হয়েছে কে একজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নার্স নাকি এসে ওঁর দেখাশোনা করছে।
অথচ ওয়ার্ডে এক আমি ছাড়া আর কোনো নার্সই নেই আজ।
তাছাড়া এই হাসপাতালে তো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কোনো নার্সই নেই, আপনিই বলুন?”
চোখের
পলকে হিরণ্ময়ীদি ফ্যাকাশে মেরে গেলেন।
আমি সেটা খেয়াল করে বললাম, “কী হল দিদি?”
উনি
একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন এবারে।
বললেন, “তুমি কি পেশেন্টটিকে ঘুমের ওষুধ কিছু দিয়েছ?”
এবার
আমার অবাক হওয়ার পালা।
বললাম, “হ্যাঁ।
মরফিন খাইয়েছি।”
উনি
একটু চুপ করে থেকে বললেন, “ভাই, শুনেছ তো নিশ্চয় যে ওই সাত নম্বর ওয়ার্ডে ভূত আছে?”
আমি
বললাম, “হ্যাঁ, কিন্তু সে তো ডাক্তার সেনগুপ্তর বানানো ভূত।
মিছিমিছি।”
হিরণ্ময়ীদি
মাথা নেড়ে বললেন, “পুরোটা বানানো নয়।
শোনো তবে।
এ আমারও জয়েন করার বছর ছয়-সাতেক আগেকার কথা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি।
তখন এই জমিদারবাড়ি সারিয়ে-সুরিয়ে সবে হাসপাতাল বানানো হয়েছে।
ইংরেজ আর আমেরিকান সৈন্যদের এখানে রেখে চিকিৎসা করা হত।
তখন তো ডাক্তার, রোগী, নার্স সবই সাহেব-মেমসাহেব।
তা ওই সাত নম্বর ওয়ার্ডের ওই শেষের ঘরটিতে তেমনই এক পেশেন্ট ছিল।
ফাইটার প্লেনের পাইলট, নাম জেরেমি প্রিন্সটন।
আর ওই ওয়ার্ডের ডিউটি নার্স ছিল ফ্লোরা বিংহ্যাম।
জাতে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান হলেও দেখে বোঝার উপায় নেই।
ভারি সুন্দর চেহারা ছিল নাকি তার।
নীল চোখ, লালচে চুল, খাড়া নাক।
আর মেজাজটিও খাসা।
প্রিন্সটনের সব দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল বিংহ্যাম।
আর সেটাই কাল হল।
প্রিন্সটনের পায়ে গুলি লেগেছিল।
তার যন্ত্রণা কমানোর জন্য আর ঘুম পাড়ানোর জন্য ডাক্তারেরা লডানাম লিখে দিয়েছিলেন।
লডানাম জানো তো কী সাংঘাতিক জিনিস? ব্যথা কমানো আর নার্ভ ঠান্ডা করার মহৌষধ ছিল তখনকার দিনে ওই লডানাম।
কিন্তু মাত্রার এতটুকু এদিক-ওদিক হয়ে গেলেই একেবারে প্রাণঘাতী বিষ।
আর ঠিক সেই ভুলটিই করে বসেছিল নার্স বিংহ্যাম।
তার দেওয়া লডানামের ডোজ বেশি হয়ে যাওয়ায় ঘুমের মধ্যেই প্রিন্সটনের প্রাণ চলে যায়।
অবশ্যই এই গাফিলতিটা বিংহ্যাম ইচ্ছা করে করেনি।
হাসপাতালের কর্তারা সেটা বুঝেওছিলেন।
কিন্তু তার চাকরি যায়, তাকে নিয়ে পুলিস টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে।
এত বড়ো ধাক্কাটা সে নিজেও নিতে পারেনি।
সে ছিল নরম স্বভাবের মেয়ে।
প্রিন্সটনের মৃত্যুর পাঁচ দিনের মাথায় ওই ছোটো ঘরটারই মেঝেতে তার মৃতদেহও পড়ে থাকতে দেখা যায়।
তার পাশে গড়াগড়ি যাচ্ছিল মরফিয়ার একটা ফাঁকা শিশি।
মরফিয়াও, জানোই তো, লডানামেরই জাতভাই।”
এত
কথা একসঙ্গে বলে হিরণ্ময়ীদি যেন দম নেওয়ার জন্যই থামলেন।
তারপর একটু চুপ করে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সেই থেকে ওই ঘরে যখনই কোনো রোগীকে ঘুমের ওষুধ—বিশেষ করে লডানাম কিংবা মরফিন—দেওয়া হয়, তখনই ফ্লোরা বিংহ্যাম আসে।
দেখতে আসে যে ও নিজে
যে মারাত্মক ভুল করেছিল সেই ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়।
ওর উপস্থিতি অনেকেই টের পেয়েছে।
তবে তোমার ভয় নেই।
ও কখনও কারোর ক্ষতিও করে না, কাউকে ভয় দেখায় না।
আর সবাইকে ও দেখাও
দেয় না।
যাও, ওয়ার্ডে ফিরে যাও।
মন দিয়ে নিজের কাজ করো।
আমিও আমার ওয়ার্ডে ফিরি।”
আমি
আবার ওয়ার্ডে ফিরে এলাম।
বাকি রাতে আরও দু-বার রাউন্ড দিয়েছিলাম।
দু-বারই দেখেছিলাম আদিত্যবাবু নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছেন।
সেটা আমার দেওয়া মরফিনের কৃপায় না নার্স বিংহ্যামের সেবাশুশ্রূষার কল্যাণে তা জানি না।
আমাদের হাসপাতালের ডাক্তারদের হাতযশে ওঁর যন্ত্রণা আস্তে আস্তে কমে গিয়েছিল।
দু-সপ্তাহ বাদে ওঁর ভাই ওঁকে নিয়ে বিলেত চলে যায়।
সেখানেই অপারেশন করিয়ে উনি একদম সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছিলেন।
আমি
আরও পাঁচ মাস ওই হাসপাতালে ছিলাম।
নাইট ডিউটিও বহু করেছি তারপর।
হ্যাঁ, সাত নম্বর ওয়ার্ডেও।
কিন্তু ভয় আর কখনও পাইনি।
বরং ওই ওয়ার্ডে ডিউটি পড়লে ভরসা পেতাম।
জানতাম যে আর একজোড়া হাত আছে আমাকে সাহায্য করার জন্য।
জানতাম যে ওই ঘরের রোগীকে সে কিছুতেই মরতে দেবে না।
তাকে ভয় করতে যাব কেন?
* * *
গল্প
শেষ করে পিসিঠাম্মা শিশি থেকে দু-আঙুলের ডগায় ওডিকোলোন ঢেলে কানের পিছনে ঘষতে লাগলেন।
আড়চোখে সামনে বসে থাকা তিন মূর্তির দিকে তাকিয়ে দেখেন তারা স্পিকটি নট।
গুল্লিগুল্লি চোখ করে তাঁরই দিকে চেয়ে বসে আছে।
টুবিন
বলল, “আর কখনও ওই ভূত নার্সকে দ্যাখোনি তুমি?”
“না,” একটা হজমোলা মুখে ফেলে বললেন পিসিঠাম্মা। “তার আমাকে দেখা দেওয়ার দরকারই পড়েনি কখনও।
তবে তার কথা আর কাউকে বলিনি আমি।
কী দরকার এ সব
কথা চাউর করে? লোকজনও তো তেমন সবাই! ভয় পেয়ে সব ওলঢোল করে রেখে দেবে।
ওই ওয়ার্ডটারই বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে হয়তো।
তখন রোগীগুলো যে এক্সট্রা কেয়ারটুকু পেত ভূতের হাতে সেটুকুও যাবে, আর হতভাগী ফ্লোরা বিংহ্যামের এতদিনের আস্তানাটিও হয়তো ঘুচবে।
তার চেয়ে কিছু না বলাই ভালো।”
সুলু
আস্তে আস্তে বলল, “ফ্লোরা বিংহ্যাম কি তোমার বন্ধু হয়ে গিয়েছিল তাহলে?”
পিসিঠাম্মা
হাসতে হাসতে বললেন, “তা তো বটেই।
আমি তো বলিই যে ওখান থেকে ফিরে আসার সময় আমার যে সাতজন বন্ধু হয়েছিল তাদের ছ’জন মানুষ আর একজন পেতনি।
তা এতে ভুলটা কী বল? আমার ভূতের ভয় চিরকালের জন্য ভেঙে গিয়েছিল ওই ফ্লোরা বিংহ্যামের জন্য।
যে আমার এত বড়ো উপকারটা করল সে আমার বন্ধু নয়? আর তোরা বলিস নাকি ভূত কোনো উপকার করে না, ভূত ভালো হতেই পারে না! হুঁহ্, যত্ত সব!”
এই
বলে পিসিঠাম্মা আবার ওডিকোলোনের শিশির দিকে হাত বাড়ালেন।
সেদিকে তাকিয়ে এতক্ষণ পরে রিভান গম্ভীর গলায় টিপ্পনী কাটল, “ভূত মানুষের চেয়ে ভালো।
আফটার অল, ভূতের ভয় কাটিয়ে দিতে পারে এমন ভূত কি আর সহজে মেলে?”
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment