
সংকল্প
অঙ্কন মুখোপাধ্যায়
“আপনার নামেই সংকল্প তো মা?”
মহাষ্টমীর পুজো চলছে। কাঁসর, ঘণ্টা, ঢাক বাজছে। ধুনোর ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে
চাটুজ্যে বাড়ির ঠাকুরদালান। শত বছরের পুরোনো দুর্গা প্রতিমার মুখে এসে পড়েছে
সকালের রোদ। ব্রাহ্মণ ঠাকুর হরিহর ভট্টাচার্য পৈতে সামলে, হাতে ফুল-বেলপাতা নিয়ে
জগদম্বাদেবীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন পূর্বের কথাগুলো।
“না, এবার আর আমার
নামে নয়।”
ঠাকুর মশাই থমকে গেলেন। আড়াইশো বছর ধরে এই বাড়ির সংকল্প একটাই নামে হয়ে
আসছে - কর্তা-গিন্নির নামে।
“তাহলে?”
জগদম্বাদেবীর দু-চোখ
দুর্গতিনাশিনীর দিকে আবদ্ধ হয়ে আছে। সত্তর ছুঁই ছুঁই শরীর, সাদা থান। কণ্ঠ
দৃঢ়, একটুও কাঁপল না, “তুহিনা খাতুন... মকবুল মিঞার
কন্যা তুহিনা খাতুনের নামে সংকল্প হবে।”
“কী বলছেন মা...!” কেঁপে উঠল ঠাকুর মশাইয়ের কণ্ঠ। হাতের কোশা থেকে গঙ্গাজল চলকে পড়ল। ঢাকের আওয়াজের মধ্যেও যেন একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল।
দালানে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা ফিসফিস করে উঠল।
জগদম্বাদেবী নির্বিকার। নিঃসন্তান জগদম্বাদেবীই প্রাচীন বটের মতো আঁকড়ে
রেখেছেন জমিদারবাড়িটাকে। এককালে যে শ্বশুরবাড়ি ছিল স্বপ্নরাজ্য, তা আজ ভগ্নপুরী!
স্বামী মারা গেছেন দশ বছর হল। ছেলেপুলে
হয়নি। জমিজমা মামলায়, ভাগ-বাটোয়ারায় প্রায় সবই
গেছে। চাটুজ্যেবাড়ির আড়াইশো বছরের দুর্গাপুজোটাও লোকবল, অর্থবলের অভাবে বন্ধ
হয়ে যাচ্ছিল এইবার। প্রতিমা গড়ার টাকা নেই, পুরোহিতের দক্ষিণা নেই। জগদম্বাদেবী
ঠিক করেছিলেন, এবার ঘটে পুজো করেই নমঃ নমঃ ভাবে সারবেন।
ঠিক শেষ মুহূর্তে এককালের প্রজা মকবুল মিঞা এসে বসেছিলেন গিন্নি মায়ের
পায়ের কাছে। পরনে লুঙ্গি, মাথায় টুপি, হাতে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া দলিল।
“শুনলাম দুগ্গা পুজো বন্ধ করে দিচ্ছেন গিন্নি মা?”
“উপায় কী আছে আর, মকবুল? আমার হাত যে শূন্য।” চাটুজ্যেগিন্নির কণ্ঠ বুজে এসেছিল সে সময়।
“তোমার কর্তাবাবু থাকলে...”
“আমরা কি কেউ না গিন্নি মা?” হাতে ধরা কাগজটা এগিয়ে ধরেছিলেন হাসি মুখে।
“বাপ, চাচাদের থেকে শুনেছি, কর্তাবাবুদের
গল্প। কম করেননি আমাদের জন্য।
খরার সময় ধান দিয়েছেন, বন্যায় ঘর বেঁধে দিয়েছেন। আজ আমরা দেখব না?”
কাগজটা ছিল মকবুলের দু-বিঘা
ধানের জমির দলিল। সে বন্ধক রাখতে চায়। জগদম্বাদেবী চমকে উঠেছিলেন, “না না, তোমার জমি...”
“জমি তো মাটি মা, ধর্ম তার চেয়ে বড়ো। এই পুজো না হলে যে আমাদেরও পুজো হয় না।
আমাদের ছেলেমেয়েরা যে সারা বছর এই তিনটে দিনের অপেক্ষায়
থাকে। আপনার দালানে ঢাক না বাজলে
আমাদের ঈদও যে ফিকে লাগে।”
সেই টাকাতেই প্রতিমা এসেছে, আলো জ্বলেছে। আজ মহাষ্টমীর পুজো। কাঁসর, ঘণ্টা,
ঢাক বাজছে থেকে থেকে। পুরোনো জমিদার বাড়ি জুড়ে ধূপ ধুনার আবেশ। আর মকবুলের নয়
বছরের মেয়ে তুহিনা এক কোণে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে দেখছে। পরনে নতুন জামা নয়, তার
মায়ের শাড়ি কেটে বানানো ফ্রক। চোখ দুটো কাজল কালো, মুখে এক অদ্ভুত মায়া।
জগদম্বাদেবী হাত বাড়িয়ে তাকে কাছে ডাকলেন, “আয়, তুহিনা।”
তুহিনা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এল। জগদম্বাদেবী
তার মাথায় হাত রাখলেন। তারপর ঠাকুর মশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শাস্ত্রে কী আছে ঠাকুরমশাই? কুমারী তো মা দুর্গারই রূপ।
তার আবার জাত হয়? তার আবার ধর্ম হয়? যে বাড়ির
পুজোকে বাঁচাতে তার বাপ নিজের ভিটে বন্ধক রাখতে পারে, তার মেয়ের চেয়ে পবিত্র কুমারী আর কে আছে?”
ঠাকুরদালান নিস্তব্ধ। হরিহর ভট্টাচার্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তুহিনার
মুখের দিকে। সেই মুখে ভয়, বিস্ময়, আর এক চিলতে হাসি। তিনি দেখলেন, প্রতিমার
মুখের সঙ্গে কী আশ্চর্য মিল! তিনি আস্তে আস্তে উচ্চারণ করলেন, “ওঁ কুমারী দেব্যৈ নমঃ... সংকল্প... তুহিনা খাতুন...”
ঢাক বেজে উঠল আরও জোরে। জগদম্বাদেবীর দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে জল আনন্দের, সে জল সংকল্পের। এই পুজো আর
চাটুজ্যেবাড়ির রইল না। এই পুজো সবার হয়ে গেল। হয়ে গেল ক্ষুদ্র থেকে মহৎ...
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment