Showing posts with label রাজকাহিনী. Show all posts
Showing posts with label রাজকাহিনী. Show all posts

ইতিহাস:: রাজকাহিনী:: সমুদ্রগুপ্তের খাতা: রাজা সমুদ্রগুপ্ত - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

সমুদ্রগুপ্তের খাতা
রাজা সমুদ্রগুপ্ত
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

ভালো আছ তো বন্ধুরা? আমি সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত চলে এসেছি নিজের খাতা নিয়ে আরও একবার শুধুমাত্র তোমাদেরই জন্য। এতদিন তোমাদের অন্যান্য রাজাদের গল্প শুনিয়েছি। আজ আমার নিজের কথা বলতে খুব ইচ্ছা করছেগুপ্তবংশের একজন শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলাম আমি মহারাজ সমুদ্রগুপ্ত।
গুপ্তবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্রীগুপ্ত (২৪০ - ২৮০ খ্রিস্টাব্দ)। গুপ্তবংশের প্রথম সার্বভৌম রাজা ছিলেন প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০ - ৩৪০ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ছিলেন ঘটোৎকচগুপ্তের পুত্র। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন সর্বপ্রথম।
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত অর্থাৎ, আমার পিতা আমাকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। তিনি প্রকাশ্যভাবে এই ঘোষণা করলে আত্মীয়-স্বজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। আমার আগের নাম ছিল কচ। আমার মা ছিলেন লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবী। আমাকে লিচ্ছবি দৌহিত্রও বলা হয়। রাজ্যজয়ের পর আমি সমুদ্রগুপ্ত নাম নিই। এলাহবাদ স্তম্ভলিপি থেকে আমার সম্পর্কে বহু মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। লিখেছিলেন আমার সভাকবি হরিষেণ। আমার দিগ্বিজয়ের পর সংস্কৃত ভাষায় তা রচিত হয়। প্রশস্তির পংক্তি-সংখ্যা ৩৩।
আমার শাসনকাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে অনেক বিতর্ক আছে। ৩২০ থেকে ৩৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমি ক্ষমতায় ছিলাম। ৩৮০-তেই আমার মৃত্যু হয়। পরবর্তী সম্রাট হন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। যাকে তোমরা বিক্রমাদিত্য নামেই চেন। তাঁর নামে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। সিংহাসনে বসে আমি দিগ্বিজয়ের নীতি গ্রহণ করেছি। চেয়েছিলাম সমগ্র ভারতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে। আর্যাবর্তের নয়জন রাজাকে পরাজিত করি। এই নয়জন রাজা ছিলেন রুদ্রদেব, মতিল, নাগদত্ত, চন্দ্রবর্মণ, গণপতিনাগ, অচ্যুত, নাগসেন, নন্দীন, বলবর্মণ। এই সমস্ত রাজাদের পরাজিত করে কিছুদিন পুষ্পনগরে বিশ্রাম নিই। অচ্যুত ছিলেন অহিচ্ছত্রের রাজা, নাগসেন ছিলেন গোয়ালিয়রের পদ্মাবতীর নাগবংশের রাজা। গণপতি ছিলেন মথুরার রাজা। রুদ্রদেব ছিলেন বাকাটক বংশের রাজা। চন্দ্রবর্মণ ছিলেন বাংলার সুশুনিয়া রাজ্যের অধিপতি।
গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের ওপর অধিকার সুদৃঢ় করার পর এবার আটবিক রাজ্যগুলো জয় করিজব্বলপুর, গাজীপুর অঞ্চলে এই রাজ্যগুলো অবস্থিত ছিল।
এরপর দক্ষিণ ভারতের দিকে অগ্রসর হই। দক্ষিণ ভারতের বারোজন রাজাকে পরাজিত করি। এরা হলেন কোশলের মহেন্দ্র, মহাকান্তারের ব্যাঘ্ররাজা, কৌরলের মন্তরাজ, কোট্টরের স্বামীদত্ত, এরণ্ডের দমন, কাঞ্চীর বিষ্ণুগোপ, অভমুক্তার নীলরাজ, কুস্থলাপুরের ধনঞ্জয়, পিষ্টপুরের মহেন্দ্রগিরি, বেঙ্গি-রাজ হস্তীবর্মণ, পলঙ্করাজ উগ্রসেন প্রমুখ। বিজিত রাজ্যগুলো নিজ রাজ্যভুক্ত না করে বিজিত রাজ্যের রাজাদের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ নিয়েই খুশি ছিলাম আমি। কারণ, বুঝেছিলাম যে সুদূর পাটলিপুত্র থেকে দক্ষিণ ভারতের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব নয়।
পূর্ব ও পশ্চিম ভারতের সীমান্ত অঞ্চলের যথা, সমতাত, কামরূপ, নেপাল, মালব, অর্জুনয়ন, আভীর ইত্যাদি রাজ্যের রাজারাও আনুগত্য স্বীকার করে নেয়।


দিগ্বিজয় সম্পন্ন হবার পর অশ্বমেধ যজ্ঞ করি। যজ্ঞের স্মৃতি রক্ষার্থে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করি। নিজে ব্রাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী ছিলাম, কিন্তু অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিলাম।
বৌদ্ধ গ্রন্থকার বসুবন্ধু ছিলেন আমার মন্ত্রী। আমার খ্যাতি ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। সিংহলরাজ মেঘবর্মণ বুদ্ধগয়ায় একটি বৌদ্ধসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করার অনুমতি চেয়ে আমার কাছে প্রচুর উপহার সমেত দূত পাঠিয়েছিলেন। আমি অনুমতি দিই। প্রায় এক হাজার মহাযান মতাবলম্বী এই সঙ্ঘে বাস করতেন।
মালয়, জাভা, সুমাত্রা প্রভৃতি হিন্দু উপনিবেশগুলির ওপরও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপন করেছিলাম আমিমৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর আমি সমুদ্রগুপ্তই ভারতে এক সার্বভৌম রাজশক্তি স্থাপন করেছিলাম। সমুদ্রগুপ্ত এই অভিধার অর্থ হল সমুদ্র দ্বারা আমি সুরক্ষিত ছিলাম। আমার রাজ্য জয়ের খ্যাতি চার সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এলাহবাদ প্রশস্তি’-তে আমাকে বলা হয়েছে ‘সর্বরাজোচ্ছেত্তা’ অর্থাৎ, সকল রাজার উচ্ছেদকারী। ‘বিক্রমাঙ্ক’, ‘পরমাঙ্ক’ প্রভৃতি উপাধি ধারণ করেছি আমি
শুধু যোদ্ধা নই, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ ছিলাম। আমার বীণাবাদনরত মূর্তি আমার সঙ্গীত প্রীতির পরিচয় দেয়। এলাহবাদ প্রশস্তি’-তে আমাকে কবিরাজ বলা হয়েছে।
আমিই সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ ভারতীয় মুদ্রার প্রচলন করেছিলাম। আমার মুদ্রায় বিদেশি কোনও দেবদেবীর প্রতিচ্ছবি নেই। দুর্গা, লক্ষ্মী,  সরস্বতী, গঙ্গা ইত্যাদি দেবীর মূর্তি ছিল। শাসক হিসেবেও সফল হয়েছিলাম।

আমার কথা অনেকক্ষণ বললাম। পরেরবার তোমাদের বিক্রমাদিত্য’র গল্প শোনাবসমুদ্রগুপ্তের খাতা তোমাদের কেমন লাগছে অবশ্যই জানিও। আজ এই পর্যন্তই। ভালো থেকো সবাই।

_____

ইতিহাস:: রাজকাহিনী:: সমুদ্রগুপ্তের খাতা (গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী এবং কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক) - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

সমুদ্রগুপ্তের খাতা
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী এবং কুষা সম্রাট কনিষ্ক
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

আমি সমুদ্রগুপ্ত আর একবার হাজির হয়েছি তোমাদের সামনে। এক টুকরো অতীত নিজের খাতার পাতা উল্টে নিয়ে এসেছি শুধু তোমাদেরই জন্য। তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ তাই তোমাদের ওপর আমাদের অনেক আশা। থাক আর কথা বাড়াব না, সরাসরি গল্পে চলে আসি। আজ বলব দুজন মহান রাজার কথা। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী এবং কুষা সম্রাট কনিষ্কের কথা। তার আগে আমাদের মৌর্য পরবর্তী যুগের ভারতের কথা একটু জেনে নিতে হবে।

অশোক কোনও যোগ্য উত্তরাধিকারী তৈরি করে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হয়। শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে বসেন তাঁরই সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ (খ্রিঃ পূঃ ১৮৫-৭৩ পর্যন্ত মগধে এদের শাসন চলেছিল) কালিদাসের ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম’ নাটকে রাজা অগ্নিমিত্র’র সময়ের কিছু ঘটনা জানা যায়। এরা ব্রাহ্মণ ছিলেন। এদিকে উত্তর ভারতে চরম রাজনৈতিক অরাজকতা চলছে। মগধের অধীনে যেসব রাজ্য ছিল, তারা আস্তে আস্তে স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। দাক্ষিণাত্যে সাতবাহনরা মগধ থেকে স্বাধীন হয়ে আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। চেতবংশের নেতৃত্বে কলিঙ্গ আবার স্বাধীন হয়ে যায়। দেশের ভেতরে এই অরাজকতার সুযোগে ব্যাকট্রিয় গ্রিকরা পাঞ্জাব ও সিন্ধুপ্রদেশের এক বিশাল জায়গা দখল করে নেয়। শক, পহ্লব, কুষাণ ইত্যাদি বিদেশী জাতি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজ্য স্থাপন করে।

সাতবাহনদের সম্পর্কে বেশ কম অনুশাসনলিপি পাওয়া গেছে। পুরাণে সাতবাহনদের অন্ধ্র বলা হয়েছে এবং এদের বসবাস ছিল গোদাবরী ও কৃষ্ণা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে
দক্ষিণ ভারতে সাতবাহন বা অন্ধ্ররা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। পুরাণ অনুসারে সিমুক কাণ্ববংশের অবসান ঘটিয়ে সাতবাহন বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। সিমুকের ভাই কৃষ্ণ ছিলেন পরবর্তী রাজা। তৃতীয় রাজা ছিলেন সাতকর্ণী। তাঁর রানি নায়নিকার অনুশাসনলিপি, নাসিক প্রশস্তি এবং গুণাঢ্য রচিত বৃহৎকথা থেকে এই রাজবংশ সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়। সাতবাহন রাজারা নিজেদের মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হতেন। অর্থাৎ নিজেদের নামের আগে নিজেদের মায়েদের নাম বসাতেন। সাতবাহন সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। যেমন গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী, বশিষ্ঠীপুত্র পুলমায়ী, যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী।
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী ছিলেন এই বংশের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজা (১০৬ - ১৩১ খ্রিস্টাব্দ)তাঁর মৃত্যুর ঠিক উনিশ বছর পর তাঁর মা গৌতমী বলশ্রী নাসিক প্রশস্তি রচনা করেন। এই লেখাটি থেকে তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়। তিনি নিজে ছিলেন একজন যোদ্ধা, একজন সংস্কারক, একজন সুশাসক। বহু রাজ্য জয় করে তিনি সাতবাহন সাম্রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি করেন। ‘ক্ষহরত’ গোষ্ঠীর শক রাজা নহপাণকে তিনি পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু ‘করদমক’ শাখার শাসক রুদ্রদমনের কাছে পরাজিত হন। শেষ পর্যন্ত সাতবাহন রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী নিজের পুত্র বশিষ্ঠীপুত্র পুলমায়ীর সঙ্গে রুদ্রদমনের কন্যার বিয়ে দেন। শকদের সাথে কিছুদিন সম্পর্ক ভালো থাকলেও আবার শক-সাতবাহনদের মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয়। তবে রুদ্রদমন তাঁকে দুবার যুদ্ধে হারালেও তাঁর রাজ্য গ্রাস করেননি। সাতবাহনদের রাজধানী ছিল পৈথান বা প্রতিষ্ঠান নগর।
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর পর তাঁর পুত্র বশিষ্ঠীপুত্র পুলমায়ী পরবর্তী রাজা হলেন। যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী ছিলেন এই বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়।

নহপাণ কে পরাজিত করার পর সম্রাটের দরবারে উৎসব
সাতকর্ণীর রৌপ্যমুদ্রা

সাতবাহন রাজ্যে হিন্দু ও বৌদ্ধ এই দুই ধর্মের লোকই বাস করত। এঁরা প্রকাণ্ড সব পাহাড় কেটে গুহা বানিয়ে তার মধ্যে সুন্দর সুন্দর মন্দির নির্মাণ করান। সাতবাহন রাজাদের আমলেই বিখ্যাত অজন্তা গুহা তৈরির কাজ শুরু হয়। পরে অন্য রাজারাও এই গুহার মধ্যে আর অনেক ছবি ও মূর্তি তৈরি করেছিলেন। উত্তর ভারতের আর্য এবং দক্ষিণের দ্রাবিড় সংস্কৃতির মধ্যে এক সমন্বয় ঘটিয়ে সাতবাহনরা ভারতের সংস্কৃতিকে সযত্নে লালন করে গেছেন।
এই হল সাতবাহনদের গল্প। এবার কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক সম্পর্কে কিছু কথা বলে আজকের খাতা বন্ধ করব।

ভারতীয় কুষাণরা ছিল ইয়ো-চি নামক মধ্য এশিয়ার একটি যাযাবর জাতির শাখা। এরা যখন উত্তর পশ্চিম চিনে বসবাস করছিল তখন হূণদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে এরা পশ্চিম দিকে সিরদরিয়া নদীর তীরে এসে উপস্থিত হয়। এখানে তখন শকরা বসবাস করছিল। শকরা এই ইয়ো-চিদের কাছে পরাজিত হয়ে এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়। ইয়ো-চিরা এবার দক্ষিণ দিকে অক্ষু নদীর উপত্যকায় এসে পৌঁছায়। এই সময় ইয়ো-চিরা পাঁচটি আলাদা শাখায় ভাগ হয়ে যায়। কুষাণরা হল এদেরই একটি শাখা। এরা ভারতে প্রবেশ করেছিল। এই বংশের প্রথম রাজা হলেন কুজুল কদফিসেস। তিনি কাবুল, গান্ধার ও দক্ষিণ আফগানিস্তান জয় করেন।  তবে ভারতে এই বংশের প্রতিষ্ঠা করেন বিম কদফিসেস। অনুমান করা হয় যে তিনি শৈব ছিলেন

কণিষ্কের স্বর্ণমুদ্রা

কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন কণিষ্ক। সম্রাট অশোকের মতো তিনিও বৌদ্ধধর্মানুরাগী ছিলেন। আর সেই কারণেই তাঁকে দ্বিতীয় অশোক আখ্যা দেওয়া হয়। ৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহাসনে বসেন। এই বছরই তিনি শকাব্দ নামে এক নতুন বর্ষ গণনার প্রচলন করেন। সাম্রাজ্য বিজেতাই শুধু নয়, ছিলেন সুশাসক এবং শিল্প-সাহিত্যের অনুরাগীও।
হিউয়েন সাং-এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। শুধু ভারতেই নয় ভারতের বাইরে চিনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাশগড়, খোটান, ইয়ারখন্দ অধিকার করেন। তবে চিন সেনাপতি প্যান চাও-এর কাছে তিনি একবার পরাজিত হন। এই অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য তিনি চিন আক্রমণ করেন। এবং সন্ধির জামিন হিসেবে সম্রাটের (হো-তি) এক পুত্রকে নিজের দরবারে এনে রেখেছিলেন। ভারতের গান্ধার ও কাশ্মীর থেকে কোঙ্কণ ও বারাণসী পর্যন্ত এক বিশাল অঞ্চলের তিনি অধীশ্বর ছিলেন।
বিহার ও বাংলাও তাঁর অধীনে ছিল। এই সমস্ত অঞ্চলে তাঁর নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া গেছে।পুরুষপুর বর্তমান পেশোয়ার তাঁর রাজধানী ছিল। কাশ্মীরে তিনি কণিষ্কপুর নামে একটি শহরের প্রবর্তন করেন। (কুষাণ সম্রাট বিম কদফিসেস ভারতে প্রথম স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন।)

কণিষ্ক বহু মঠ ও চৈত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। তাঁরই চেষ্টায় চিন, জাপান, কোরিয়ায় বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটে। হীনযান ও মহাযান এই  দুই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে মতভেদ দূর করার জন্য তিনি চতুর্থ বৌদ্ধসঙ্গীতির আহ্বান করেন। বসুমিত্র, অশ্বঘোষ, নাগার্জুন এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রায় তিনমাস চলেছিল এই অধিবেশনএই দীর্ঘ সম্মেলনে সঙ্কলিত ত্রিপিটকের ব্যাখ্যা করেন বসুমিত্র। এই ব্যাখ্যা মহাবিভাষা নামে পরিচিত। কাশ্মীর, জলন্ধর অথবা কান্দাহারে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই ছিল শেষ বৌদ্ধ সম্মেলন। এটি কণিষ্কের রাজত্বকালে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
তিনি শিল্প ও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। কুষাণদের অন্যতম অবদান হল গান্ধার শিল্প।  গ্রিক, রোমক এবং ভারতীয় শিল্পরীতির সংমিশ্রণের ফলে এই শিল্পকলার উদ্ভব ঘটে। কণিষ্কের সময়েই এই রীতির উদ্ভব ঘটে। এই যুগের বুদ্ধমূর্তিগুলো দেখলে গান্ধার শিল্প সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা করা যায়। রাজধানী পুরুষপুরে তিনি বুদ্ধদেবের দেহাবশেষের ওপর এক বিশাল চৈত্য নির্মাণ করান যার শিল্প সুষমা ছিল অপূর্ব। এক গ্রিক স্থপতি এজিসিলাওস-এর পর্যবেক্ষণে এই চৈত্য নির্মিত হয়েছিল। মথুরা নগরীর শোভাও তাঁর শিল্পরুচির পরিচয় দেয়। তিনি অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
তাঁর সাহিত্যের প্রতিও গভীর অনুরাগ ছিল। তাঁর রাজসভায় বহু গুণীজনের সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। দার্শনিক বসুমিত্র, শাস্ত্রকার নাগার্জুন, দার্শনিক বসুবন্ধু, অশ্বঘোষ তাঁর সভা অলঙ্কৃত করেছিলেন। ‘বুদ্ধচরিত’ অশ্বঘোষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন তিনি। ভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্রে রচয়িতা মহাঋষি চরক তাঁর চিকিৎসক ছিলেন। ‘চরক-সংহিতা’ এবং ‘সুশ্রুত-সংহিতা’ এই যুগেই সংকলিত হয়। অস্ত্রোপচারে পথিকৃৎ ছিলেন সুশ্রুত। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি বৃদ্ধি পেয়েছিল এই যুগে।

কণিষ্কের মৃত্যুর পর কুষাণদের ক্ষমতা আস্তে আস্তে লোপ পেতে থাকে।  ২৩ বছর রাজত্ব করেছিলেন।  তাঁর নিজেরই কিছু সৈনিক তাঁকে হত্যা করেছিল। পরবর্তী সম্রাটরা হলেন বাসিষ্ক, হুবিষ্ক এবং বাসুদেব। বাসুদেবই এই বংশের শেষ স্মরণীয় শাসক। উত্তর ভারতে নাগ বংশের আবির্ভাবের পর কুষাণদের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।
আজ তোমাদের পর পর দুজন রাজার গল্প শোনালাম। সেই সঙ্গে তাঁদের বংশেরও একটু পরিচয় দিলাম। আজ এই পর্যন্তই থাক। দেখা হবে আবার আগামী সংখ্যায়। নিজের খাতার পাতা উল্টে হাজির করব কোনও একজন রাজাকে। আমাদের রাজকাহিনী চলতেই থাকবে। তোমরা ভালো থেকো সবাই।

কণিষ্কের মস্তকবিহীন মূর্তি
_____
ছবি - আন্তর্জাল

ইতিহাস:: রাজকাহিনী:: সমুদ্রগুপ্তের খাতা (সম্রাট অশোক) - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

সমুদ্রগুপ্তের খাতা (সম্রাট অশোক)
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

আমি সমুদ্রগুপ্ত আর একবার হাজির হয়েছি তোমাদের জন্য। নিজের পুরানো খাতার পাতা উল্টে বার করছি কিছু হারিয়ে যাওয়া চরিত্র। আগের বার তোমাদের বলেছি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-র কথা। আজ বলব ওঁর নাতি মহামতি অশোককে নিয়ে কিছু জানা অজানা কথা। তোমরা নিশ্চয় জান অশোক হলেন পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। গোটা বিশ্বের ইতিহাস খুঁজলেও তাঁর মত উজ্জ্বল চরিত্র আর একটাও পাওয়া যাবে না। আমাদের দেশে আকবর-কেও মহান রাজা বলা হয়। আকবরের আগেও অনেক মহান রাজা এদেশে জন্মেছেনতবু অশোকের আগে কাউকেই রাখা যাবে না। প্রজাকল্যাণকামী রাজাদের কাছে তিনি ছিলেন উদাহরণস্বরূপ। নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন প্রজাদের সুখের জন্য। শুধু তাই নয় তাদের নৈতিক চরিত্রের উন্নতি বিধানের জন্য তিনি নানা রকম চেষ্টা করে গেছেন আজীবন।
আশ্চর্যের কথা হল ছোটবেলায় তিনি ছিলেন খুব নিষ্ঠুর স্বভাবের। বাবা ছিলেন বিন্দুসার। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে বিন্দুসার মগধের রাজা হয়েছিলেন। তিনিও বাবার মত গ্রিকদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তাঁর রাজসভায় ডেইমেকস এবং ডায়োনিসাস নামে দুজন গ্রিক রাজদূত এসেছিলেন। তিনি ছিলেন শান্তিকামী, শিক্ষা-সংস্কৃতির অনুরাগী।
অশোকের মায়ের নাম ছিল ধম্মা (মতান্তরে সুভদ্রাঙ্গী) তিনি ছিলেন চম্পাদেশীয় এক ব্রাহ্মণ কন্যা। শোনা যায় যে সুভদ্রাঙ্গী অসুখী ছিলেন। কারণ বিন্দুসারের সঙ্গে তাঁর তেমন ভাল সম্পর্ক ছিল না। অশোক জন্মাবার পর তাঁর সেই দুঃখ বা শোক দূর হয়েছিল, তাই ছেলের নাম রেখেছিলেন অশোক। অশোক তাঁর মাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু খুব রাগী ছিলেন তাই অনেকে তাকে বলত চণ্ডাশোক। তাঁরা একশ জন ভাই ছিলেন। বড় দাদা সুশিমের সঙ্গে তাঁর বিরোধ লেগেই থাকত। তিনি ছিলেন মেজো, তাঁর পরের ভাই ছিলেন তিস্য।
বলা হয়ে থাকে যে তিনি নিরানব্বই জন ভাইকে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে বসেন। খ্রীস্টপূর্ব ২৭৩ অব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজ্যাভিষেক হয়েছিল আরও চার বছর পর (২৬৯ অব্দে)। অনেকেই মনে করেন যে এই চার বছর তিনি ব্যস্ত ছিলেন নিজের ভাইদের পরাস্ত করতে। তবে সত্যিই যে তিনি নিজের ভাইদের হত্যা করে রাজা হয়েছিলেন তার কোনও প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এই উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব-এর কথা আছে বৌদ্ধ কিংবদন্তীগুলোতে।
মাত্র আঠারো বছর বয়সে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। বিন্দুসার তাঁকে প্রথমে উজ্জ্বয়িনী ও পরে তক্ষশীলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তক্ষশীলায় প্রজা বিদ্রোহ দমন করায় বিন্দুসার তাঁর ওপর বেশ খুশিও হয়েছিলেন। উজ্জয়িনীতে থাকার সময় তিনি মহাদেবী নামে এক শ্রেষ্ঠী কন্যাকে বিয়ে করেন। তাঁর আরেক রানি ছিলেন কারুবাকি। পরবর্তী কালে তিনি এই জায়গাতেই বিশ্ব বিখ্যাত সাঁচি স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। এই উজ্জ্বয়িনীতে তাঁর আসা যাওয়া ছিল।
সিংহাসনে বসে তিনি ‘দেবানাম-পিয়-পিয়দাসী’ অর্থাৎ দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী এই উপাধি ধারণ করেন। প্রথম জীবনে তিনি শিবের উপাসক ছিলেন। যুদ্ধ, বিগ্রহ, আমোদ-প্রমোদ, মৃগয়া (শিকার) খুব পছন্দ করতেন। বিদেশীদের সঙ্গে দাদু ও বাবার মতই তিনিও ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতেন। তুসাস্পা নামে তাঁর এক পারসিক কর্মচারী ছিল।
খ্রীস্টপূর্ব ২৬০ অব্দে নিজ রাজত্বের নবম বছরে তিনি কলিঙ্গের (ওরিষ্যার) বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। কলিঙ্গ ছিল বেশ শক্তিশালী একটা রাজ্য। দক্ষিণ ভারতের জলপথগুলি ছিল কলিঙ্গের দখলে। তাই কলিঙ্গ দখল করার প্রয়োজন ছিল অশোকের কাছে। অশোক জয়লাভ করেন। দেড় লক্ষ কলিঙ্গবাসী বন্দি ও প্রায় এক লক্ষ মানুষ মারা যায় এই যুদ্ধে।
কলিঙ্গের মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে অশোকের মনে যুদ্ধের প্রতি বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হল। এক একটা খারাপ ঘটনা থেকেও অনেক সময় অনেক ভাল কিছু ঘটতে পারে। যুদ্ধের এই বীভৎস হত্যালীলার জন্য অশোক নিজেকেই দায়ী করতে থাকেন। হাতের তরোয়াল টান মেরে ফেলে দিলেন অনেকটা নিচে। সেটা যেয়ে পড়ল দয়া নদীর বুকে। দয়া নদী সেদিন কলিঙ্গের মানুষের রক্তে লাল হয়ে গেছে। তাঁর তরোয়ালটা ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল দয়া নদী। তোমরা ধবলগিরিতে গেলে দেখতে পাবে ছোট একটা টিলার ওপর খুব সুন্দর একটা বৌদ্ধ স্তূপ। আর নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে দয়া নদী। পুরী থেকেই সবাই যায় বেড়াতে।
অনুতপ্ত মনে অশোক বৌদ্ধ ভিক্ষু উপগুপ্তের কাছ থেকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিলেন। ঠিক করলেন জীবনে আর কখনই যুদ্ধ করবেন না। উপগুপ্তের সঙ্গে তিনি সারনাথ, কপিলাবস্তু, লুম্বিনি, কুশিনগর, বুদ্ধগয়া ইত্যাদি জায়গাগুলো ঘুরে দেখলেন ভাল করে। তাঁর পিতামহ বা দাদুর সময় থেকে যে দিগ্বিজয়ের রীতি (যুদ্ধ করে পর পর রাজ্য গ্রাস) চলে আসছিল তিনি তার পরিবর্তন করে ধর্মবিজয়ের রীতি গ্রহণ করেন।
বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি রাজ্যের নানা জায়গায় স্তূপ, স্তম্ভ ও পাহাড়ের গায়ে বুদ্ধের বাণী সহজ ভাষায় লিখে রাখার ব্যবস্থা করেন। দেশের ভেতরে তো বটেই এমন কী বিদেশেও ধর্ম প্রচারক পাঠান। সিরিয়া, মিশর, এপিরাস, সিংহলে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয় তাঁরই একান্ত চেষ্টায়। সিংহলে নিজের মেয়ে সংঘমিত্রা আর ছেলে মহেন্দ্রকে পাঠিয়েছিলেন ধর্ম প্রচারের জন্য। আর তাঁর এই প্রচেষ্টার জন্যই এখনও বিশ্বের বহু মানুষ এই ধর্মে বিশ্বাসী। তিনি না থাকলে বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বের দরবারে কখনই পোঁছতে পারত না।
তিনি কিন্তু অন্য ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাতেন না।  ‘আজিবক’ নামে এক ধর্মীয় সম্প্রদায়কে তিনি প্রচুর উপহার দিয়েছিলেন। শুধু মানুষ বা পশু পাখি নয়, গাছপালাকেও যত্ন করতেন। বিশ্বের প্রথম পশু চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করেন তিনিই। তিনি অনেকগুলো চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ করেছিলেন। আর তার ঠিক পাশেই বিশাল এলাকা জুড়ে ভেষজ উদ্ভিদের উদ্যানও তৈরি করান যাতে তাড়াতাড়ি ওষুধ তৈরি করে মানুষ বা পশু-পাখির চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়। দেশের বাইরে সুদূর গ্রিসেও তিনি মানুষ ও পশুদের জন্য চিকিৎসালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
অহিংসা নীতি গ্রহণ করলেও প্রয়োজন বোধে তিনি অহিংস নীতি থেকে সরে আসতেন। নিজ রাজ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য তিনি কখনও অহিংস নীতি গ্রহণ করেননি। সেনা বাহিনী সর্বদা সুগঠিত ছিল। উপজাতি বিদ্রোহ দমন করার ব্যাপারে তিনি অহিংস নীতি থেকে সরে আসেন।
পেশোয়ার থেকে বাংলাদেশ এবং কাশ্মীর থেকে মহীশুর পর্যন্ত বিশাল এক অঞ্চলকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। এই বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র একই ভাষা ও এক শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তাঁর  বানানো স্তূপ এবং স্তম্ভগুলো দেখার জন্য প্রচুর মানুষ বিদেশ থেকে ভারতে আসেন। তাঁর শিলালেখ নিয়ে এখনও ঐতিহাসিকরা কাজ করে চলেছেন। আরও বহু যুগ পরেও তাঁকে নিয়ে প্রচুর গবেষণা হবে। কালের নিয়মে মানুষ এক সময় হারিয়ে যায়, সে অমরত্ব লাভ করে নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে। 
বৌদ্ধধর্মের শুদ্ধতা রক্ষার জন্য রাজধানী পাটলিপুত্রে তিনি এক বৌদ্ধ ধর্ম সম্মেলনের আহ্বান করেন। আফ্রিকা মহাদেশেও তিনি ধর্ম প্রচারক পাঠিয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত অশোকস্তম্ভ ভারতের জাতীয় স্তম্ভ। তাঁর বলে যাওয়া অনেক কথাই ভারতের সংবিধানে স্থান পেয়েছে।

এবার আমরা তাঁর শিলালিপিগুলো সম্বন্ধে কিছু জানব। ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপিতে সে গুলো লেখা হত।
১) গৌণ প্রস্তর-লেখ --- জয়পুর, মহীশুর, বিহার, জব্বলপুর, হায়দ্রাবাদ
২) ভাবরু লিপি ---
৩) চতুর্দশ প্রস্তর লিপি --- প্রাপ্তিস্থান হল সীমান্ত প্রদেশ
৪) কলিঙ্গ লিপি --- ধৌলি ও জৌগড়
৫) বরাবর গুহালিপি --- গয়ার কাছে পাওয়া গেছে
৬) রুমিনদেই স্তম্ভলিপি --- প্রাপ্তিস্থান নেপাল
৭) সপ্তম স্তম্ভলিপি --- মিরাট, পাঞ্জাবের আম্বালা ইত্যাদি জায়গায়।
৮) ক্ষুদ্র স্তম্ভলিপি --- সাঁচি, সারনাথ, কৌশাম্বী
শিলালিপিগুলির পাঠোদ্ধার করেন জেমস প্রিন্সেপ।

সম্রাট অশোকের গল্প একবার শুরু হলে তা একদিনে থামবে না। বহু কিছু এখনও অজানা রয়ে গেছে। অনেক কথা আজ বলা হল না। তোমরা সবাই ইতিহাসকে ভালবেসো, চেষ্টা করো নতুন কিছু জানানোর, হয়ত তোমরাও একদিন রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত সমস্ত পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেবে। ভাল থেকো বন্ধুরা।
-------------------
ছবি- অভিনব সাহা

ইতিহাস:: রাজকাহিনী:: সমুদ্রগুপ্তের খাতা - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

সমুদ্রগুপ্তের খাতা 

-আজকে জানবো চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কে নিয়ে কিছু কথা -

সমুদ্রগুপ্ত


আমি গুপ্ত বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট, সমুদ্রগুপ্ত। এক সময় শাসন করেছি সমগ্র উত্তর ভারত। দক্ষিণ ভারত জয় করলেও সেখানকার রাজাদের আনুগত্য লাভ করেই সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। শাসন জারি করিনি। একজন যোদ্ধা, একজন কবি, একজন সঙ্গীতজ্ঞ।


একজন মানুষ যে নিজে হাতে অনেক যুদ্ধ করেছে, অনেক মানুষ মেরেছে সে কেমন করে কবিতা লিখতে পারে, আর কেমন করেই বা বীণা বাজাতে পারে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনার ঝড় বইয়ে দাও তোমরা। আমারও যে অস্বাভাবিক লাগে না তা নয়। আসলে একটা মানুষের দুটো সত্ত্বা থাকতেই পারে। ইচ্ছা করলেও আজ আর ফিরে আসতে পারব না, ঘোড়ার পিঠে চড়ে সমগ্র ভারত দাপিয়ে বেড়াতে পারব না। এক টুকরো অতীত হয়ে বেঁচে আছি তোমাদের ইতিহাস বইয়ের পাতায়।


আজ নিজের খাতার পাতা উল্টে আনতে চলেছি কিছু ঘটনা যা ঘটে গেছে বহুকাল আগে। কিছু জীবন যারা আমার মতই ইতিহাসে পাতায় এখনও বেঁচে রয়েছে। যতদিন ভারতভূমি থাকবে ততদিন তারাও এমনি করেই বেঁচে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। আজ বলছি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কে নিয়ে কিছু কথা। কিছু জানা কিছু অজানা। সব কিছু কী জেনে ফেলা যায়? তাহলে তো অনুসন্ধান করার ইচ্ছাটুকুও থাকবে না, তাই থাকুক না, কিছুটা জানা কিছুটা অজানা!


সমস্ত ভারত কে সর্ব প্রথম ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। এর আগে কোনও ভারতীয় রাজা তা করে দেখাতে পারেননি। কী করেই বা পারবেন? সমগ্র উত্তর ভারত তখন ছোটো ছোটো রাজ্যে বিভক্ত। এদের মধ্যে ষোলোটি রাজ্য বা মহাজনপদ সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ষোলোটির মধ্যে একটি রাজ্য ছিল দক্ষিন ভারতে। এদের নিজেদের মধ্যে সব সময় বিবাদ লেগেই থাকত। এক সময় মগধ অনান্য সব রাজ্য গুলোকে হারিয়ে সব চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে।


চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর উত্থানের আগে মগধে ছিল নন্দ রাজাদের শাসন। শেষ নন্দ রাজা ধন নন্দের অত্যাচারে প্রজারা তখন অসহায়। ধননন্দের বিশাল এক সেনা বাহিনী ছিল। বিশাল এই বাহিনীর খরচ চালানোর জন্য খাজনার হার বাড়িয়ে দেওয়া হয়; যা মেটানো দরিদ্র প্রজাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। খাজনা আদায়ের জন্য রাজা কর্মচারীরা অত্যাচার চালাত মানুষের ওপর। সেই সব নিপীড়িত নিরন্ন মানুষের জীবনে পরিত্রাতা হয়ে এসেছিলেন চন্দ্রগুপ্ত।


তাঁর নামের পেছনে ‘মৌর্য’ কেন বসানো হয়েছিল তা নিয়ে আছে বহু মতভেদ, অনেক বিতর্ক। কেউ কেউ বলেন তাঁর মা অথবা মাতামহীর নাম ছিল মুরা। তিনি কোনও এক নন্দ রাজার দাসী ছিলেন। মুরা থেকেই মৌর্য কথাটি এসেছে।


কেউ আবার মনে করেন, মৌর্যরা ছিল আসলে ব্যাধ বা নিষাদ জাতীয় নীচু শ্রেণীর মানুষ। শিকারের সাথে সাথে নানা রকম পশু পাখিও তারা পুষত। বিশেষ করে ময়ূর তারা খুব ভালোবাসত। ময়ূর থেকেও মৌর্য কথাটি আসতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। আর একটি মত বলছে, নেপালের পাদদেশে পীপ্পলিবন নামক এলাকার মোরীয় ক্ষত্রিয়কূলের সন্তান ছিলেন তিনি। মোরীয় থেকে মৌর্য কথার উৎপত্তি। তাঁর বাল্য জীবন সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। সবটাই জনশ্রুতি বা কিংবদন্তী। তিনি না ক্ষত্রিয় না শুদ্র তা নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক।


কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, বিশাখদত্তের মুদ্রারাক্ষস, এবং সোমদেবের কথাসরিৎসাগর, পুরাণ ইত্যাদি গ্রন্থ থেকে তাঁর জীবনী ও শাসন কাল সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা, স্ট্রাবো, ডিওডোরাস, প্লুটার্ক, জাস্টিন প্রমুখের রচনা থেকেও মৌর্য রাজবংশ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। ল্যাটিন ও গ্রীক ঐতিহাসিকদের রচনায় রচনায় তিনি সন্দ্রকোত্তাস এবং অ্যান্ড্রকোত্তাস নামে পরিচিত (Sandrokottos and Androcottus) ।


চন্দ্রগুপ্ত নাকি প্রথম জীবনে রাজা ধননন্দের সৈন্য বিভাগে এক গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। কোনও কারণে তিনি সম্রাটের বিরাগ-ভাজন হন। ধননন্দ তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছেন জানতে পেরে তিনি মগধ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন এক রাতের আঁধারে।


গ্রীকবীর আলেকজান্ডার তখন ভারতে। ভারত জয়ের স্বপ্ন নিয়ে তিনি সুদূর গ্রীস থেকে চলে এসেছেন। হিদাস্পিসের যুদ্ধে তিনি পুরু কে পরাজিত করেছেন। চন্দ্রগুপ্ত তাঁর কাছে সাহায্য লাভের আশায় গ্রীক শিবিরে এসে উপস্থিত হলেন। কিন্তু আলেকজান্ডার তাঁকে বন্দি করে হত্যা করার নির্দেশ দিলে তিনি সুকৌশলে শিবির ছেড়ে পালিয়ে যান।


ভাগ্য তাঁর সহায় ছিল তাই অনেক বার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন। এর পর তাঁর সাথে দেখা হয় চাণক্য বা কৌটিল্যের সাথে।


এই প্রসঙ্গে আরও একটি গল্প শোনা যায়। পিতার মৃত্যুর পর তিনি মায়ের সাথে পাটলিপুত্রে (মগধের রাজধানী) আসেন। তখন তিনি নিতান্তই শিশু। শিশুর দেখা শোনা করার জন্য মা তাঁকে এক রাখালের কাছে রাখেন। তিনি নিজে নন্দ রাজপরিবারে কাজ করতেন।


পরে সেই রাখাল; বালক চন্দ্রগুপ্ত কে এক শিকারীর কাছে বিক্রি করে দেয়। সেই শিকারী তাঁকে রাখালের কাজ দেয়। এক সময় চাণক্য”র সাথে চন্দ্রগুপ্তর দেখা হয়। চাণক্য তাঁর মধ্যে দেখেছিলেন রাজচক্রবর্তী লক্ষণ। এক দুপুরে গাছের তলায় বালক চন্দ্রগুপ্ত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঠিক তাঁর মাথার কাছে ফণা ধরে ছিল একটি সাপ। এটাই হল রাজ চক্রবর্তী লক্ষণ। চাণক্য ঠিক সেই সময় ঐ রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। সাপটি কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে চলে যায়। বালকের সাথে আলাপ করেন চাণক্য। বুঝতে পারলেন যে এই বালকের মধ্যে লুকিয়ে আছে অসামান্য শক্তি আর বিরল প্রতিভা। তবে এই কাহিনীর কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।


ছোট্ট চন্দ্রগুপ্ত কে সেই শিকারীর কাছ থেকে কিনে নিলেন কৌটিল্য। তক্ষশিলায় তাঁকে নিয়ে আসেন এবং লেখাপড়ার পাশাপাশি যুদ্ধ বিদ্যায় শিক্ষিত করে তোলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য চন্দ্রগুপ্তকে পাটলীপুত্রে পাঠান।


চন্দ্রগুপ্তকে গড়ে তোলার পেছনে চাণক্যেরও কিছু উদ্দেশ্য ছিল। তিনি ছিলেন ক্ষুরধার বুদ্ধি সম্পন্ন এক তেজ্বসী মানুষ। সন্ন্যাসী চাণকের পরিবারে জন্মেছিলেন বলে তাঁর নাম রাখা হয় চাণক্য। তাঁর অপর নাম ছিল কৌটিল্য। বিষ্ণুগুপ্ত নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন।


এক সময় তিনি অপমানিত হয়েছিলেন ধননন্দের কাছে। তাঁর শিখা কেটে দেওয়া হয়েছিল যা ছিল ব্রাহ্মণদের কাছে অত্যান্ত অপমানজনক। তাঁরঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল নন্দরাজার সেনারা। এই স্পষ্টবাদী মানুষটিকে অনেক যন্ত্রণা দিয়েছিলেন ধননন্দ। চাণক্য তখন থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি এই অত্যাচারী রাজাকে মগধ থেকে তাড়াবেন। এই অপমানের যোগ্য জবাব দেবেন। মগধের প্রজাদের রক্ষা করবেন। তাই চন্দ্রগুপ্তের পেছনে ছিল মগধ এর প্রজাদের অকুণ্ঠ সমর্থন। নিজেদের একটা সৈন্য বাহিনী গড়ে তুলতেও বিশেষ অসুবিধা হয় নি। নিপীড়িত কৃষকরাও চন্দ্রগুপ্তের সেনাবাহিনী তে যোগ দিয়েছিল। তাঁদের প্রথম দুটি চেষ্টা সফল হয়নি, তবে তৃতীয় বার তাঁরা সফল হলেন। ‘মিলিন্দ-পঞ্চহো’ নামক গ্রন্থে এই যুদ্ধের বিবরণ আছে। জানা যায় যে, এই যুদ্ধে ১০ হাজার হাতি, ১ লক্ষ অশ্বারোহী ও ৫ হাজার রথ চালক নিহত হয়েছিল। চন্দ্রগুপ্ত পাটলিপুত্র নগর অবরোধ করলে ধননন্দ আত্মসমর্পণ করেন। চন্দ্রগুপ্ত ধননন্দকে প্রাণে মারেননি, শুধু তাঁর রাজত্ব কেড়ে নেন। ধননন্দকে তাঁর দুই রাণি ও সামান্য কিছু আসবাবপত্র সহ রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে দিয়েছিলেন। তবে ‘মহাবংশটীকা’ গ্রন্থে আছে যে এই যুদ্ধে ধননন্দ নিহত হন।


মগধের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হল মৌর্য বংশ। মগধের সাধারণ মানুষ ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। চাণক্য হলেন প্রধানমন্ত্রী। চাণক্যর পরামর্শ মেনেই চন্দ্রগুপ্ত রাজকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি ৩২৪ থেকে ৩২৩ খ্রীস্ট পূর্বাব্দের মধ্যে সিংহাসনে বসেন। ৩০০ খ্রীস্ট পূর্বাব্দে সিংহাসন ত্যাগ করেন।


তাঁর দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল বিদেশী গ্রীক দের আক্রমণ থেকে স্বদেশকে রক্ষা করা। আলেকজান্ডারের সেনাপতি ও সিরিয়ার অধীশ্বর সেলুকাস ভারতে গ্রীক সাম্রাজ্য স্থাপনের আশায় ভারত আক্রমণ করেন। এর আগে আলেকজান্ডার ও একই কারণে ভারত আক্রমণ করেছিলেন। পশ্চিম ভারতে কিছু গ্রীক উপনিবেশ তৈরি হয়ে গেছিল। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর বিজিত রাজ্য গুলি ভাগ হয়ে যায় তাঁর সেনাপতিদের মধ্যে। ভারতে গ্রীকদের জয় করা অঞ্চলগুলির ওপর পুনরায় আধিপত্য স্থাপন করতে চেয়েছিলেন সেলুকাস। চন্দ্রগুপ্ত’র সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন সেলুকাস।


তবে এই যুদ্ধ আদৌ হয়েছিল কি না তা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে। সন্ধির শর্তানুযায়ী চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাস কে দিলেন ৫০০ হাতি প্রদান করেন। বিনিময়ে কাবুল, কান্দাহার, বেলুচিস্থান ও হীরাট প্রদেশ লাভ করেন সেলুকাসের থেকে। এখানেই শেষ নয়, সেলুকাসের কন্যা হেলেন কে বিবাহ করেন চন্দ্রগুপ্ত। অনেকে অবশ্য মনে করেন বিয়েটা হয়েছিল তাঁর পুত্র বিন্দুসারের সঙ্গে। এই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় যে তিনি ব্রাম্ভন ছিলেন না। গ্রীকদের সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করে ভারত থেকে গ্রীক আক্রমণের সম্ভাবনা দূর করেন চিরদিনের জন্য।


সেলুকাস পরে মেগাস্থিনিস নামে এক রাজদূতকে তাঁর সভায় পাঠিয়েছিলেন। মেগাস্থিনিস ভারতে কিছুদিন ছিলেন , ভারত সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা লিখে গেছেন ‘ইন্ডিকা’ নামক বইটিতে।


চন্দ্রগুপ্ত সম্বন্ধে কিছু ঘটনার কথা বলা যাক। যার সত্যতা নিয়েও অনেক মতভেদ রয়ে গেছে। একবার ধননন্দের এক বিশ্বস্ত মন্ত্রী রাক্ষস পরিকল্পনা করেন তাঁকে হত্যা করার। এটা তাঁর রাজত্বের প্রথমদিককার ঘটনা। সম্রাট তখন অসুস্থ ছিলেন। রাক্ষস চন্দ্রগুপ্তের রাজবৈদ্যকে হাত করেন। সম্রাটকে ওষুধের পরিবর্তে বিষ দিতে যাচ্ছিল সেই বৈদ্য। চাণক্য সেই সময় উপস্থিত হয়ে বলেন, “রাজা কারোর দেওয়া পানীয় বা খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন না। আপনি যে ওষুধ মহারাজকে দিতে চলেছেন তার কিছু অংশ আগে আপনি নিজে গ্রহণ করুন”। সেই বৈদ্য বাধ্য হয়ে ওষুধের একটু অংশ জিভে ঠেকাল। সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হল। রাক্ষস চন্দ্রগুপ্তকে হত্যা করার বেশ কিছু পরিকল্পনা করলেও তা সফল হয়নি। বিশাখদত্তের লেখা ‘মুদ্রারাক্ষস’ নাটক থেকে এই বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।


চাণক্য আরও একবার চন্দ্রগুপ্তের জীবন রক্ষা করেছিলেন। প্রথমবার নন্দ রাজাদের প্রাসাদে যখন যান তখন তিনি বিপদের সন্মুখীন হন। প্রাসাদের মেঝেয় ছোট্ট একটা ফাটল। ভেতর থেকে আসছে লাল পিঁপড়ের সারি। তাদের মুখে খাদ্যের কণা। চাণক্য বুঝে গেলেন যে প্রাসাদের মেঝের তলায় পাতালে একটি গুপ্ত কক্ষ আছে বাইরে থেকে যা দেখা যায় না। চাণক্যর অনুমান সঠিক ছিল। সেই ঘরটিতে অপেক্ষা করছিল ধন নন্দের কিছু পোষা সৈন্য। চন্দ্রগুপ্ত কে নিয়ে চাণক্য প্রাসাদের বাইরে চলে আসেন, আর নির্দেশ দিলেন প্রাসাদটি কে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে।


চন্দ্রগুপ্ত চাণক্যকে গুরুর মতো শ্রদ্ধা করতেন। একবার ভুল বোঝাবুঝি হয় দুজনের মধ্যে। চাণক্য চলে যান চন্দ্রগুপ্তকে ছেড়ে। চন্দ্রগুপ্ত ক্ষমা চেয়ে পুনরায় চাণক্য কে ফিরিয়ে আনেন নিজের সভায়।


চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শুধু সাম্রাজ্য বিজেতাই ছিলেন না। ছিলেন একজন দক্ষ শাসক। বিশাল এক সৈন্য বাহিনী গড়ে তোলেন। ছদ্মবেশে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়াতেন। প্রজারা ভালো আছে কি না জানার জন্য। তিনি কাউকে বিশ্বাস করতেন না। প্রত্যেক দিন আলাদা ঘরে ঘুমাতেন। নির্দিষ্ট কোনও ঘর রাখেননি নিরাপত্তার জন্য। তাঁর সিংহাসন ত্যাগের পর পুত্র বিন্দুসার ‘অমিত্রাঘাত’ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। অশোকের পিতা ছিলেন বিন্দুসার। শেষ জীবনে চন্দ্রগুপ্ত জৈন ধর্ম গ্রহণ করেন। মহীশুরের শ্রাবণবেলগোলা নামক স্থানে প্রায়োপবেশনে (মৃত্যু কামনায় যে উপবাস করা হয়) দেহ ত্যাগ করেন।

৩২৪ থেকে ৩২৩ খ্রীস্ট পূর্বাব্দের মধ্যে চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। ২৯৮ থেকে ২৯৫ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। উত্তরে পারস্যের সীমানা থেকে দক্ষিণে মহীশুর এবং পূর্বে বাংলা থেকে পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করে ভারতবাসী কে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। তিনিই রাজচক্রবর্তী সম্রাটের উপাধি লাভ করেছিলেন (চক্রবর্তী অর্থাৎ অনেকখানি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত রাজ্যের অধিপতি)।


পরবর্তী অনেক রাজাই তাঁর শাসন ব্যবস্থার কিছু দিক অনুসরণ করেছিলেন। তাঁর ই নাতি সম্রাট অশোক পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। তাঁর কথাতেও আসব আমরা।


আমি সমুদ্রগুপ্ত খাতার পাতা এখানেই বন্ধ করছি; আবার ফিরে আসব আরও এক দিন আরও একজন কে নিয়ে। অতীত এর সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে তুলে আনবো কিছু মণি-মুক্তো। থাকবে কিছু নিজের কথাও। ততদিন তোমরা ভালো থেকো আর ইতিহাস কে ভালোবেসো।


সহেলী চট্টোপাধ্যায়

_________
ছবি – ১। তন্ময় বিশ্বাস (অলঙ্করণ) ২। গুগলের সৌজন্যে
[তথ্যসূত্রঃ অধ্যাপক ভট্টাচার্য এবং অধ্যাপক চক্রবর্তী (ভারতের ইতিহাস) অধ্যাপক অতুল চন্দ্র রায় এবং প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায় (ভারতের ইতিহাস ১ খন্ড) এবং প্রচলিত কিছু জনশ্রুতি]

ইতিহাস:: রাজকাহিনী:: শিলাদিত্য - কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়


স্থানটি বড়ো মনোরমতিনদিক থেকে তিনটি নদী এসে এখানে মিলিত হয়েছে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী।
এই তিন নদীর বারিধারা তিন বর্ণের। অথচ এই মহাসঙ্গমে এসে তারা একসঙ্গে মিলে গিয়ে সৃষ্টি করেছে একটিই বর্ণ। যেন তিনটি বাদ্যযন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন শব্দতরঙ্গ মিলিয়ে মিশিয়ে সৃষ্টি করে চলেছে একই ঐকতান, একই সুরমূর্চ্ছনা।
এই স্থানের নাম প্রয়াগ। আর এই প্রয়াগের সঙ্গমস্থলেই আজ চলছে সাজো সাজো রব। হস্তীর বৃংহিত, অশ্বের হ্রেষা আর মানুষের কলরবে চারিদিক মুখরিত। ক্ষণে ক্ষণে বেজে উঠছে তূরী ও ভেরী। দামামার শব্দে চারিদিক সচকিত। জনাকীর্ণ প্রান্তরের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র রক্ষীপ্রহরা। পদস্থ রাজকর্মচারীদের দ্রুত পদচারণা। আর তারই মধ্যে অতি সাধারণ দুঃস্থ জনগণের বিস্মিত জমায়েত। সব মিলিয়ে এ এক মহামেলা। দানধ্যানের এক পুণ্য উৎসব। এক ঐতিহাসিক মহাসঙ্গম।
গত পঁচাত্তর দিন ধরে এ মেলা চলছে। ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ তাঁদের আকাঙ্ক্ষার পাত্র পূর্ণ করে ফিরে গেছেন যে যার দেশে। আজ এই অন্তিম দিবসে শুধু অবশিষ্ট আছেন আরো কিছু মানুষ, যাঁরা ঐ দারুনির্মিত দানমঞ্চের অদূরে রজ্জুর সীমানার বাইরে প্রতীক্ষারত। এই মাত্র কয়েকশত মানুষের দানপ্রাপ্তির মধ্য দিয়েই এবারের মতো শেষ হবে এই দানের উৎসব। সমাপ্তি ঘটবে দীর্ঘ আড়াই মাস ব্যাপী এই পঞ্চবার্ষিকী মেলার।
হ্যাঁ। এরকমই হয়ে আসছে বিগত বেশ কিছুকাল। গোটা আর্যাবর্তের মানুষ এখন জেনে গেছেন যে, প্রয়াগের তীরে এই পুণ্যভূমিতে তিনি আসবেন প্রতি পাঁচ বৎসরে একবার, আয়োজন হবে এই বিশাল উৎসবের, আর সেই পাঁচ বৎসরে অর্জিত তাঁর যাবতীয় নিজস্ব সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে তিনি ফিরে যাবেন তাঁর রাজধানী কনৌজে, শুরু করবেন আবার তাঁর রাজার ভূমিকা, একেবারে শূন্য থেকে।
সেই আয়োজনই চলছে এখনসঙ্গমের তীরে সাময়িকভাবে তৈরী করা বিশাল গৃহগুলির অভ্যন্তরে স্তূপীকৃত ছিল যে রাশি রাশি স্বর্ণ, রৌপ্য, মহার্ঘ পোশাক-পরিচ্ছদ আর খাদ্যসামগ্রী, তা এখন প্রায় নিঃশেষসামান্য কিছু যা অবশিষ্ট আছে, সেগুলি এই মুহূর্তে জমায়েত করা চলছে ঐ দানমঞ্চের উপর। আজ স্বহস্তে সেগুলি বিতরণ করে নিঃস্ব, রিক্ত, কপর্দকশূন্য হয়ে ফিরে যাবেন সেই রাজা, পুষ্যভূতি বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট, রাজা প্রভাকরবর্ধনের সুযোগ্য পুত্র সম্রাট হর্ষবর্ধন।
সহসা উচ্চনাদে বেজে উঠলো ভেরী। রক্ষীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল দুইভাগে বিভক্ত হয়ে। অদূরে স্কন্ধাবারের সামনে যেন সহসা জেগে উঠলো চাঞ্চল্য। সম্রাট হর্ষবর্ধন অবিচলিত পদক্ষেপে স্কন্ধাবার থেকে বেরিয়ে এলেন। হর্ষধ্বনি জেগে উঠলো জনতার মধ্যে। সম্রাট এগিয়ে চললেন মঞ্চের দিকে। সঙ্গে রয়েছেন রাজমহিষী এবং রাজভগ্নী। আর তাঁদের অনুগমন করছেন সম্রাটের অনুগত বিভিন্ন প্রদেশের রাজারা।
দানসামগ্রী প্রস্তুত। মঞ্চে আরোহণ করে সম্রাট তাকালেন পার্শ্ববর্তী ময়দানের দিকে। সেখানে পাশাপাশি তিনটি স্বর্ণমূর্তি রক্ষিত। বুদ্ধমূর্তি, সূর্যমূর্তি ও মহাদেবের মূর্তি। সম্রাটের আরাধ্য তিন দেবতামেলার প্রথম তিন দিন পর্যায়ক্রমে ঐ তিন মূর্তিপূজার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল উৎসবের প্রস্তুতি। প্রতিদিনের মতো আজও তাই নতমস্তকে সেই দেবতাদের চরণে প্রণতি জানালেন সম্রাট। বেজে উঠলো শঙ্খধ্বনি। শুরু হল ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী মেলার সমাপ্তি উৎসব।

#                 #                 #                 #                 #

বেলা দ্বিপ্রহর। শ্রান্ত, ক্লান্ত সম্রাটের ভান্ডার অবশেষে শূন্য হল। শেষ প্রার্থীর হাতে সম্রাট তুলে দিলেন তাঁর শেষ দান – একটি স্বর্ণদন্ড। এটি হাতে নিয়েই সম্রাট বিচারসভা পরিচালনা করতেন। শুধু দন্ড নয়, এটি তাঁর মনোবল ও বীরত্বের পরিচায়কও বটে। অথচ কি আশ্চর্য, তাঁর প্রতিনিধিস্বরূপ সেই রাজদন্ড এক সম্পূর্ণ অপরিচিতের হাতে তুলে দিয়েও তাঁর চিত্ত অকুন্ঠ, হাসি অমলিন! তাকালেন পার্শ্বে দন্ডায়মান রাণী দুর্গাবতীর দিকে। তাঁর মুখেও খেলে গেল  এক রহস্যময় হাসি। উজ্জ্বল দুটি চোখের ভাষা যেন কথা বলে উঠলতিনি যে বহুদিন ধরে মহারাজকে  চেনেন! সম্রাটের এই সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হবার আনন্দের তিনিও যে এক অংশীদার!
সহসা সম্মুখে রক্ষীপ্রহরার মধ্যে একটা কোলাহল। রাজা দৃষ্টি প্রসারিত করলেন
প্রার্থী জনতার দল এখন আর নেই। শুধু রজ্জুসীমানা পেরিয়ে এগিয়ে আসতে চায় এক অশীতিপর বৃদ্ধা, কিন্তু রক্ষীদের বাধা পেরিয়ে একবিন্দুও অগ্রসর হতে পারে না। রক্ষীরা জানে, দানধ্যানের পালা সমাপ্ত, তাই সেনাধ্যক্ষের নির্দেশে তারা আর কাউকে রজ্জুসীমানায় প্রবেশ করতে দেবে না।
রাজার ইঙ্গিতে সরিয়ে নেওয়া হল বাধা। অতিকষ্টে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন বৃদ্ধা। কিন্তু লোলচর্ম সেই বৃদ্ধার আকুতি শুনে সম্রাট বিব্রত, বিপর্যস্ত। দীর্ঘপথ অতিক্রম করে এসেছে এই দীনদরিদ্র, অসহায় নারী, সার্বভৌম সম্রাটের কাছ থেকে সামান্য কিছু পাবার আশায়।
করবেন এখন সম্রাট? কুন্ঠিত নতমুখে চিন্তা করেন কিছু সময়। তারপর সহসা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর চোখভগ্নী রাজ্যশ্রীর দিকে ফিরে অনুচ্চস্বরে কিছু বলেন। আর এরপরেই দেখা যায় এক আশ্চর্য দৃশ্য। ভগ্নীর হাত থেকে নিয়ে অতি সাধারণ এক বস্ত্র পরিধান ক’রে সম্রাট তাঁর নিজের রাজবেশ ও উত্তরীয় সযত্নে তুলে দেন বৃদ্ধার হাতে। মুহূর্তে তূরী-ভেরী-দামামার জয়নাদে চারিদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। আকাশ বাতাস মুখরিত হয় সমবেত প্রজাদের জয়ধ্বনিতে – ‘জয়তু সম্রাট! চিরং জীবতু সম্রাট!! জয় সম্রাট হর্ষবর্ধনের জয়!!’

#                 #                 #                 #                 #

এই হলেন হর্ষবর্ধন। দানবীর, প্রজাপালক, সুশাসক সম্রাট হর্ষবর্ধন। ৫৯০ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর জন্ম। ৬০৬ থেকে ৬৪৭ খ্রীষ্টাব্দ, এই সুদীর্ঘ ৪১ বৎসর তিনি সুনামের সঙ্গে রাজত্ব করেছেন গোটা উত্তর ভারত জুড়ে। শাসক হিসেবে, রাজা হিসেবে তিনি যে অনন্য, তার পরিচয় তাঁর ১,০০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য আর ৬০,০০০ হস্তীবাহিনীর বিশালত্বেএমনকি জীবদ্দশায় তাঁর রাজধানী কনৌজ হয়ে উঠেছিল উত্তর ভারতের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।
আবার এরই পাশাপাশি যখন জানা যায়, এই রাজাধিরাজ সম্রাটের হাতেই সৃষ্টি হয়েছে সংস্কৃত নাটক ‘নাগানন্দ’, ‘রত্নাবলী’ আর ‘প্রিয়দর্শিকা’, তখন এক বিমূঢ় বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় মনএকজন মাত্র মানুষের পক্ষে এ কি করে সম্ভব?
তাই তো তাঁরই সভাকবি বাণভট্ট রচিত ‘হর্ষচরিত’ কিংবা চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-য়ের ভ্রমণকাহিনী তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ভারত ইতিহাসের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হিসেবে – রাজ্যশাসনে, প্রজাপালনে, দানধ্যানে ও বীরত্বে যাঁর তুলনা একমাত্র তিনি স্বয়ং – মহামহিম সম্রাট, শিলাদিত্য হর্ষবর্ধন।
                                       

_____

ছবি - পুষ্পেন মণ্ডল


লেখক পরিচিতিঃ   কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়  পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার । আকৈশোর সঙ্গী সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেই তাঁর বেঁচে থাকা । তাই একাধারে অসংখ্য পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকা ছড়া, কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি বিভিন্ন  মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়ে চলা নাটক ও নৃত্যনাট্য রচনা, সুরারোপ ও সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে বিচ্ছুরিত তাঁর প্রতিভা । বেশ কিছু পুরস্কারপ্রাপ্ত এই লেখকের নানা বিষয়ের গ্রন্থরাজির মধ্যেআরশিনগর’, ‘আলাদিন’, ‘ছড়াডুম সাজে’, ‘নির্বাচিত শ্রুতিনাট্য’, ‘ভূতের বৃন্দাবনপ্রভৃতি বইগুলি ইতিমধ্যেই পাঠকসমাজের কাছে সমাদৃত হয়েছে ।