মহাভারতের গল্প:: মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা (ষষ্ঠ পর্ব) - সুমনা সাহা



মহাভারতের এক তেজস্বিনী মেয়ের কথা
সুমনা সাহা
ষষ্ঠ পর্ব

যুদ্ধের সংবাদ ও পাণ্ডবপক্ষে যোগদানের আহ্বানসহ পত্র মহেন্দ্র পর্বতের কোলে মণিপুর গ্রামেও এসে পৌঁছাল। চিত্রাঙ্গদা তখন আনমনে বনপথে বিচরণরতা, বভ্রুবাহন রাজকার্যের অবকাশে বিশ্রাম কক্ষে সঙ্গীতের আনন্দ উপভোগে মগ্ন। পত্রবাহক পাণ্ডবপক্ষের সেই পত্র তুলে দিল রাজা চিত্রবাহনের হাতে। চিত্রবাহন পত্র খুলে পড়লেন। তারপর ছিঁড়ে ফেললেন। কাউকে কিচ্ছু জানালেন না তিনি। ঐ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণাধিক নাতি বভ্রুবাহনকে তিনি কখনও পাঠাবেন না, নাতিকে তিনি অর্জুনের কাছ থেকে আইনসম্মতভাবে পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেছেন, এই মণিপুর রাজ্যের ভাবী শাসক সে, তাঁর ও রানির অবর্তমানে কন্যা চিত্রাঙ্গদার জীবনসর্বস্ব। ঐ পুত্রের মুখ চেয়েই চিত্রা আজ বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেয়েছে। আর বভ্রু এখনও বয়সে কিশোর, জীবনের কত স্বপ্ন পূরণ তার বাকি। সে কেনই বা দূর দেশে যুদ্ধে যাবে? সুতরাং হস্তিনাপুরের যুদ্ধ নিয়ে মণিপুরে আলোচনা প্রায় উঠলই না।
ওদিকে ইরাবান পিতার সঙ্গে হস্তিনাপুরে প্রবেশ করল। এত বৃহৎ প্রাসাদ, এত জাঁকজমক, সাজসজ্জা সে আগে দেখেনি। তার পিতার দুই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও দুই কনিষ্ঠ ভ্রাতা তাঁদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে পৃথক পৃথক মহলে থাকেন। এছাড়াও রয়েছে মাতা কুন্তীর মহল। দাসদাসীদের জন্য পৃথক আবাসস্থল। বিরাট আস্তাবলে তেজি ঘোড়া, সুবৃহৎ গোশালা বিশালাকার দুগ্ধবতী গাভীতে পূর্ণ। সুদৃশ্য পুষ্প বাগিচা, অগণিত বিচিত্র স্বাদের ফলের বৃক্ষ, সুরম্য অট্টালিকা, রাজপথ ইত্যাদির শোভা দেখতে দেখতে আশ্চর্য হয়ে চেয়ে থাকে ইরাবান। তাঁদের নাগলোক তো এই ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের সমারোহের কাছে সমুদ্রের সম্মুখে গোষ্পদ তুল্য। পিতা তাঁর জন্য নিযুক্ত করেছেন দুজন বিশ্বস্ত, অনুগত ও আজ্ঞাবাহী সমর্থ দাস। তারা সর্বদাই ইরাবানের সুখসাচ্ছন্দ্য বিধানে অত্যন্ত তৎপর। ইরাবান তো কাউকেই চেনে না। পিতা বললেন, “এখন তোমার কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম করো। পথশ্রমে তুমি ক্লান্ত। সন্ধ্যায় প্রাসাদের অভ্যন্তরে পারিবারিক মিলনের সভাস্থলে এরা তোমাকে নিয়ে আসবে, তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হবে।” পিতার আদেশে ইরাবান দাস দুজনের সঙ্গে তার জন্য নির্দিষ্ট বিশ্রাম কক্ষের উদ্দেশে রওনা হল। যেতে যেতে একের পর এক মহল পার হয়ে চলল আর সঙ্গীরা তাকে চিনিয়ে দিতে দিতে অনুচ্চ স্বরে বলতে থাকল, “এ হল আপনার জ্যেষ্ঠ তাতশ্রীর মহল, আর ওইটি হল কনিষ্ঠ তাতশ্রীর মহল, আর এপাশে আপনার আরও অনুজ ভ্রাতারা থাকেন”তাদের কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে ইরাবান বলে ওঠে, “আর ওইদিকের মহলটিতে কে থাকেন? ওটি সবচেয়ে সুন্দর!” তার অনুচররা ফিসফিস করে বলে, “ওটি তো আমাদের প্রধান মহিষীর মহল, মহারানী দ্রৌপদী থাকেন ওখানে!” ইরাবান দ্রৌপদীর সম্বন্ধে কিছুই জানে না। তবুও কেন যে তাকে সেই মহল টানছে এক দুর্নিবার আকর্ষণে, সে জানে না। কিন্তু বর্তমানে তার প্রধান চিন্তা নিজের বেশভূষা নিয়ে। সেটা যেন এই প্রাসাদে বড়োই বেমানান। কক্ষের প্রবেশ দ্বারে দুই সুন্দরী রমনী দাঁড়িয়েছিল। ইরাবানকে দেখেই তারা আপ্যায়নের হাসি হেসে বলল, “আসুন কুমার! এবার আপনার দাসদের বিদায় দিন আর আমাদের সেবা গ্রহণ করুন!” ইরাবান নাগলোকের যুবরাজ। তার ব্যক্তিগত পরিচর্যার জন্যেও বহাল রয়েছে দাস ও দাসীরা। তবে তারা এখানকার মতো এত সুন্দরী নয়, আর এমন যুবতীও নয়। যুবতী রমনীদ্বয় দু-পাশ থেকে ইরাবানের দুটি হাত ধরে কক্ষে প্রবেশ করল, সেই স্পর্শে ইরাবান শিহরিত হল, তার মধ্যে এক লজ্জামিশ্রিত আবেশ জেগে উঠল, যেটি তার একেবারেই অপরিচিত অনুভূতি। সেই যুবতীরা সহাস্যে বলল, “লজ্জা করবেন না কুমার! আপনি আমাদের হাতে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। আমরা আপনাকে সুগন্ধি জলে স্নান করিয়ে, নববস্ত্রে সুসজ্জিত করে সান্ধ্য মিলনসভার জন্য প্রস্তুত করে দেব, দেখবেন, আপনাকে তখন এই প্রাসাদের কুমারদের একজন বলেই মনে হবে!” ইরাবান বিস্মিত হল, তার মধ্যে একাধারে রাজোচিত বীরত্ব, অন্যদিকে এক বালকতুল্য সারল্য। সে নিজেকে ওই দুই রমনীর পরিচর্যায় সঁপে দিল। স্নানের পর উত্তম আহার পরিবেশিত হল। এত বড়ো মহল তার জন্যই বরাদ্দ হয়েছে ভেবে সে অবাক হয়ে রইল। সেই রমনীরা বলল, “এ আর তেমন কী? পাণ্ডব রাজকুমারদের ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদ তো দেখেননি? সেই প্রাসাদ স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্রের প্রাসাদকেও হার মানায়। কিন্তু এখন মহারাজ দুর্যোধন তার দখল নিয়েছেন। এই মহলগুলি তো দ্বারকার মহারাজ কৃষ্ণের ব্যবস্থাপনায় রাজ্যের সীমান্তে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয়েছে!” তারপর তারা গলা নামিয়ে বলল, “যুদ্ধ তো এইসবের জন্যই!” আহার্য দ্রব্য সবই ইরাবানের অচেনা, তবে অত্যন্ত সুস্বাদু। তাই অধিক ভোজন করে ফেলেছে সে, উত্তম ভোজনের শেষে তার নিদ্রার আবেশ দেখে সহচরীরা তাকে শয্যায় শয়ন করিয়ে একজন পায়ের কাছে বসে পা টিপে দিতে লাগল, আরেকজন পাখা নিয়ে মাথার কাছে বাতাস করতে লাগল। ইরাবান তার মায়ের কথা, নাগলোকের কথা চিন্তা করতে করতে গভীর নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়ল। সন্ধ্যার মুখে তার নিদ্রা ভঙ্গ হল। প্রাসাদের বড়ো বড়ো গবাক্ষ পথে উদ্যানের ছায়া অস্তগামী সূর্যের আলোর সঙ্গে মিশে এক অপরূপ মায়া সৃষ্টি করেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে নানা দেবালয়ের সন্ধ্যা আরতির ঘণ্টাধ্বনি। সমস্তই একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। সে যা দেখে, যা শোনে, সবটুকু যেন নিজের অন্তরে শুষে নেয়। তার কৈশোর উত্তীর্ণ দেহ ও মন সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক, পবিত্র।
সান্ধ্য মিলনসভায় উপস্থিত হল ইরাবান। অন্দরমহলের বিশাল কক্ষের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সুসজ্জিত আসন, সবথেকে উঁচু আসনে মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন এক অনিন্দ্যকান্তি পুরুষ। কে ইনি? ইরাবান সেই পুরুষের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না। এমন রূপ জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে কোনো প্রাণীতে থাকা সম্ভব? সুদৃঢ় দেহের অপূর্ব সৌষ্ঠবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসামান্য পেলবতা। বিরাট দুটি নয়ন কী বাঙ্ময়! তিনি হেসে উঠলে গৃহের অভ্যন্তরের সহস্র দীপাধারের বাতি মলিন হয়ে যাচ্ছে। ইনিই কি সেই দেবকীনন্দন কৃষ্ণ? ইরাবানের সমগ্র সত্তা যেন এক তীব্র আকর্ষণে ধাবিত হয়ে চলেছে ঐ অনিন্দ্যকান্তি পুরুষের পানে। বিভিন্ন আসনে উপবিষ্ট আরও রাজা ও রাজকুমারদের সে এতক্ষণ লক্ষ করেনি। অর্জুন ইরাবানের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে তাকে কাছে ডাকলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল সে। আর নিজের অজান্তেই পিতার পাশে উপবিষ্ট সেই মোহন রূপবান পুরুষের চরণপ্রান্ত স্পর্শ করে জানু পেতে ভূমিতে বসে পড়ল। সেই পুরুষ তাকে দু-হাতে ধরে তুললেন, তাকালেন তার চোখের দিকে, যেন পড়ে ফেললেন তার জন্মজন্মান্তরের কথা। তারপর কোমল করস্পর্শে আশীর্বাদ করে বসালেন একেবারে নিজের পাশটিতে। একে একে সভায় উপস্থিত সকলের দিকে তিনি চেয়ে দেখলেন, দীপের কম্পিত আলোকশিখায় মুখগুলি কঠিন ও গম্ভীর। তিনি ধীরে ধীরে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমরা সকলেই অবগত আছ, আমার সখা, অর্জুনকে যখন দ্রৌপদীর সঙ্গে বৈবাহিক নিয়ম লঙ্ঘনের প্রায়শ্চিত্ত করতে তীর্থযাত্রায় রওনা হতে হয়েছিল, সেসময় তাকে নাগলোকের রাজকন্যা উলুপীর প্রণয় আহ্বান স্বীকার করতে হয়েছিল। এই সুদর্শন কুমার নাগলোকের রাজপুত্র, উলুপী ও অর্জুনের প্রণয়জাত প্রথম সন্তান, ইরাবান। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী এই তরুণ সুদূর নাগলোক থেকে আমাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসেছে। এঁকে তোমরা সকলে পরিবারের অন্যতম সদস্যরূপে অভিবাদন করবে, এটাই আমার কাম্য।” সূচীভেদ্য নীরবতা ভঙ্গ করে কথা বললেন এক সৌম্যদর্শন ব্যক্তি, তাঁর প্রতিটি বাক্য শুদ্ধ, ধীর ও মার্জিত। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “ইরাবান, আমি তোমার জ্যেষ্ঠ তাত, জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব, যুধিষ্ঠির, তোমাকে আমাদের পরিবারে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছি। তুমি যে আমাদের যুদ্ধে সহায়তা করতে সুদূর নাগলোক থেকে এসেছ, তার জন্য আমাদের পরিবারের প্রত্যেকে তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার বিনম্র শ্রদ্ধা তোমার পুণ্যবতী জননী উলুপীর উদ্দেশ্যে” এরপর একে একে উঠে দাঁড়িয়ে পরিচয় দিল আরও অনেকে। ইরাবান চিনল তার জেঠা ও কাকাদের এবং সেইসঙ্গে জানল, তার আরও ভাই-বোনদের কথা। অর্জুন ও দ্রৌপদীর পুত্র শ্রুতকর্মা এবং অর্জুন ও সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যুর সঙ্গে পরিচয় হল। তবে সব ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় ভীম-পুত্র ঘটোৎকচ প্রাসাদে থাকেন না। তিনি তার মায়ের সঙ্গে তাদের উপজাতি সম্প্রদায়ের গ্রামেই থাকেন। তবে যুদ্ধের আগে তিনি উপস্থিত হবেন। প্রাসাদে আছেন যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর পুত্র প্রতিবিন্ধ্য, নকুল কাকার পুত্র শতানীক, ভীম জেঠার পুত্র সুতসোম, এবং সহদেব কাকার পুত্র শ্রুতসেনা। দ্রৌপদী ছাড়াও, যুধিষ্ঠিরের বিয়ে হয়েছিল শৈব্য সম্প্রদায়ের কন্যা দেবিকার সঙ্গেতাদের একটি ছেলে আছে, নাম যৌধ্যেয়। নকুলের আরেক স্ত্রী হলেন চেদী রাজকন্যা করেনুমতী। এঁদের ছেলে নিরমিত্র। মদ্রদেশের রাজকন্যা বিজয়া সহদেবের অপর স্ত্রী। তাদের ছেলে সুহোত্র। এসব কথাও জানল ইরাবান। তবে এই ভাইরা বভ্রুবাহনের মতোই নিজেদের দেশেই থাকেন, পাণ্ডবদের সঙ্গে থাকেন না। প্রধানা মহিষী দ্রৌপদী ছাড়া আর একজন রানিই মহলে থাকেন, তিনি কৃষ্ণের ভগ্নী, সুভদ্রা। এরা প্রত্যেকেই বিবাহিত। শ্রুতকর্মা ইরাবানের থেকে বয়সে ছোটোকিন্তু সেও বিবাহিত। ইরাবান তার ভাইদের মধ্যে নিজেকে যেন ঠিক মেলাতে পারল না। সকলকেই পানীয় দেওয়া হল। পান করবার পর যে যার মহলে ফিরে গেল। কেবল সেই সুদর্শন পুরুষটি পিতার সঙ্গে বসে অনুচ্চ স্বরে কিছু আলোচনা করছিলেন। দীপের আলো অনুজ্জ্বল হয়ে এসেছে। দাসী এসে আবার দীপাধারে নতুন করে তেল ঢেলে দিয়ে গেল। সবকটা দীপ ঝলমলিয়ে উঠতেই ইরাবান সবিস্ময়ে লক্ষ করল, তার চিত্তচোরা সেই পুরুষের মাথার মুকুটে উজ্জ্বল নীলকান্ত মণির সঙ্গে গোঁজা আছে একটি ময়ূরপুচ্ছ। কৃষ্ণ! ইনিই তবে কৃষ্ণ! সে তার বৃদ্ধ পিতামহ কৌরব্যর মুখে শৈশব থেকে এই কৃষ্ণের কত গাথাই না শুনেছে। তার একপ্রকার ঘোরের মধ্যেই কৃষ্ণ তাকে আরও একবার স্পর্শ করলেন, বললেন, “পুত্র ইরাবান! তোমার শারীরিক লক্ষণ অত্যন্ত শুভ। তুমি এক বিশেষ প্রয়োজন সিদ্ধ করতে বিধাতার নির্দেশেই উপস্থিত হয়েছ। যুদ্ধে দৈহিক ক্ষতি অনিবার্য। বৎস, যুদ্ধে নিজেকে সর্বতোভাবে নিবেদন করতে তোমার মন প্রস্তুত তো?” ইরাবান দৃপ্ত স্বরে উত্তর দিল, “নাগলোকের যোদ্ধারা কখনও সমরে পিছপা হয় না। আমি পিতাকে সাহায্য করতেই এসেছি। যে কোনোভাবে নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করতে আমার কোনো বাধা নেই!” অর্জুন গর্বিত দৃষ্টিতে দেখছিলেন এই কিশোরকে, তার মনে পড়ে যাচ্ছিল অনেক বছর আগেকার সেই আশ্চর্য কিশোরী মেয়েটির কথা, যে নিঃশর্তে অর্জুনকে ভালোবেসে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল, নিঃশর্তে বিদায় দিতেও কুণ্ঠিত হয়নি। ইরাবানের দেহে তিনি খুঁজছিলেন সেই সাহসিনী কন্যার স্মৃতি। কৃষ্ণ ইরাবানের সংকল্পের দৃঢ়তায় প্রসন্ন হলেন, বললেন, “বাছা, আজ তুমি আপন কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম করো। কাল থেকে যুদ্ধের অনুশীলন আরম্ভ হবে। তোমার অনুচররা তোমাকে অনুশীলন প্রান্তরে নিয়ে আসবে।”
ইরাবান ফিরে গেল নিজের কক্ষে। সে বুঝতে পারল, এই পরিবারে সে কখনও আপন স্থান অধিকার করতে পারবে না। সে বাইরে থেকে আসা এক আগন্তুক মাত্র। পিতার কারণে ও যুদ্ধের খাতিরে তাকে মেনে নেওয়া হল, কিন্তু কুমারদের দেহের ভাষায় তার প্রতি ঔদাসীন্য স্পষ্টই প্রকাশ পেয়েছে। তাতে ইরাবান দুঃখিত হয়নি। কারণ সে কোনো দাবি নিয়ে হস্তিনাপুরে আসেনি। সে চেয়েছিল তার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, তাঁকে সাহায্য করতে। পিতা তাকে সাদরে গ্রহণ করেছেন, এতেই সে খুশি। তবে তার অন্তর আজ কানায় কানায় পূর্ণ কৃষ্ণের স্নেহে ও স্পর্শে। পিতামহ বলতেন, কৃষ্ণ এক জাদুকর। সে সম্মোহনী জানে। তাই বুঝি সত্যি হবে। তা না হলে মাত্র একটি সন্ধ্যার পরিচয়ে কেন তার মনে হচ্ছে, এই ব্যক্তির সঙ্গে তার জনমে জনমে অচ্ছেদ্য বন্ধন? রাত্রে শয্যায় শুয়ে ঘুমঘোরে সে শুনতে পেল একটি করুণ বাঁশির সুর। সমস্ত জগতের যত দুঃখ আছে, সব যেন সেই বাঁশির সুরে দুলছে, ভাসছে, আর আকাশ বাতাস প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে। নিদ্রিত ইরাবানের সুপ্ত চেতনা বলে, “অপূর্ণ! অপূর্ণ থেকে যাবে সব সাধ! আমাকে পূর্ণ করো নাথ!” তার চোখের প্রান্ত থেকে ঝরে পড়ল অশ্রুর একটি বিন্দু
(ক্রমশ)
----------
ছবি - এআই (নির্মাণ: তাপস মৌলিক)

No comments:

Post a Comment