
রবীন্দ্রনাথ
হালদার স্মরণে
তাপস
মৌলিক
চলে গেলেন
রবিনদা, পর্বতারোহী রবীন্দ্রনাথ হালদার। সারাজীবন হিমালয়ের সুউচ্চ দুর্গম পথে পথে
হেঁটে বেড়িয়েছেন তিনি, হাঁটতে হাঁটতেই মিলিয়ে গেলেন অনন্তে। গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
রাঁচির কাছে এক শৈলারোহণ শিবিরে প্রশিক্ষক হিসেবে গিয়েছিলেন, সকালে ক্যাম্প থেকে
বেরিয়ে হাঁটা শুরু করার খানিক পরেই হঠাৎ বসে পড়লেন মাটিতে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢলে
পড়লেন মৃত্যুর কোলে। দলের ডাক্তারের চেষ্টা, যথাশীঘ্র সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া,
সবই বিফলে গেল।
বাংলার
পর্বতারোহণ জগতের মানুষজনের কাছে রবিনদা যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন। কাগজে বা মিডিয়ায়
তাঁর নাম অবশ্য তেমন দেখা যায়নি, কারণ তাঁর প্রচারবিমুখতা। জন্ম ১৯৫২ সালের পয়লা
নভেম্বর পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলায়। তিন বছর বয়সে ভিটেমাটি ছেড়ে বাবা-মায়ের হাত
ধরে চলে আসতে হয় পশ্চিমবঙ্গে। ছেলেবেলা ও স্কুলজীবন কেটেছে রানাঘাট ও কাঁচরাপাড়ায়,
তারপর ভরতি হন নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজে। ১৯৮০ সালে রেলের চাকরিতে যোগদান,
এরপরে শুরু হয় তাঁর পর্বতারোহী জীবন।
শৈলারোহণ বা
পর্বতারোহণে এমন কোনো ট্রেনিং কোর্স নেই যা রবিনদা করেননি। ১৯৮৩ সালে পুরুলিয়ার
জয়চণ্ডী পাহাড়ে প্রথম শৈলারোহণ শিক্ষা, মানালির WHMI
থেকে যথাক্রমে ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে বেসিক এবং অ্যাডভান্স মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স, ১৯৮৯
সালে উত্তরকাশীর NIM থেকে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কোর্স এবং
সবশেষে ১৯৯৩ সালে দার্জিলিং HMI থেকে মেথড
অফ ইনস্ট্রাকশন কোর্স। তিলে তিলে নিজেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পর্বতারোহণের জন্য তৈরি
করে তুলেছিলেন রবিনদা। ব্যাপারটা এখনকার পর্বতারোহীদের কাছে শিক্ষণীয়, যাদের অনেকে
তেমন কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে পদযাত্রা বা অভিযানে বেরিয়ে পড়ে
এবং অনেকসময় বিপদে পড়ে।
১৯৮৫ সাল
থেকে শুরু হয় রবিনদার একের পর এক অভিযান, হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে। দীর্ঘ চল্লিশ
বছরের পর্বতারোহী জীবনে তিনি মধ্য হিমালয় অর্থাৎ উত্তরাখণ্ড এবং হিমাচল প্রায় চষে
ফেলেছেন, এছাড়াও অনেক অভিযান করেছেন পশ্চিম হিমালয়ের লাদাখ এবং পূর্ব হিমালয়ের
নেপাল-সিকিম অঞ্চলে। যে সমস্ত পর্বতশৃঙ্গে তিনি আরোহণ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য
গাংস্ট্যাং (১৯৮৫), গোয়েনালদা (১৯৮৬), থেলু ও কোটেশ্বর (১৯৮৭), রুবাল কাং (১৯৮৮ ও
১৯৯১), গোলাপ কাংরি (১৯৮৯), সেন্ট্রাল (১৯৯০), কে আর ৩ (১৯৯৩), ব্ল্যাক পিক
(২০০২), ভাগীরথী ২ ইত্যাদি। বহু অভিযানে তিনি সফলভাবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেরকম
কিছু অভিযানে সুযোগ থাকলেও নিজে শৃঙ্গারোহণ না করে দলের অন্য সদস্যদের সুযোগ করে
দিয়েছেন, যেমন কামেট ও আবিগামিন (১৯৯৪)। শৃঙ্গাভিযান ছাড়া রবিনদা অংশ নিয়েছেন বেশ
কিছু দুরূহ সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশনে, নিজের জীবন বিপন্ন করে ছুটে গিয়েছেন
হিমালয়ের দুর্গমে নিখোঁজ কিংবা বিপদগ্রস্ত পর্বতারোহীদের উদ্ধারকার্যে। এছাড়া তাঁর
অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যোগ হয়েছে হিমালয়ের নানা অঞ্চলে বেশ কিছু হাই অলটিচিউড ট্রেকিং
বা পর্বত পদযাত্রা।
নিজেকে যেমন
নিঃশর্তে হিমালয়ের কাছে সঁপে দিয়েছিলেন রবিনদা, হিমালয়ও তেমনি তাঁকে গড়ে তুলেছিল
এক সৎ, উদার, মুক্তমনা, নিরহংকার, পরোপকারী মানুষ হিসেবে। তাঁর মতো খাঁটি মানুষ এখনকার দিনে
দুর্লভ। বন্ধু এবং কাছের মানুষদের যে কোনো বিপদেআপদে যেমন সবসময় পাশে থেকেছেন
তেমনি বহু সমাজসেবামূলক কাজে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন
অকৃতদার এই মানুষটি। অথচ নিজেকে কখনও জাহির করতে দেখিনি তাঁকে, নিজের সম্পর্কে
কাউকে কিছুই বলতেন না কখনও। দেবতাত্মা হিমালয় যে বিশুদ্ধ পবিত্র অগ্নিশিখা রবিনদার
অন্তরে জাগিয়ে তুলেছিল তার স্পর্শ পেয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছে তাঁর বহু সহযাত্রী, বন্ধু
এবং শিষ্য। সেই প্রদীপকে আগলে রেখে বিশ্বমানবতার পথে এগিয়ে চলার দায়িত্ব এখন
তাঁদের।

হিমালয় ও
তার মানুষজন সম্পর্কে রবিনদার বিপুল ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু লেখার জন্য
মাঝেমাঝেই তাঁর বন্ধুবান্ধবেরা তাঁকে তাগাদা দিত। কয়েক বছর হল লিখতে শুরু করেছিলেন
তিনি - হিমালয় অভিযান নিয়ে, সেসব অভিযানে রবিনদার সহযাত্রী কুলি, গাইড, শেরপা,
রাঁধুনি প্রমুখ স্থানীয় প্রান্তিক মানুষজনকে নিয়ে, যাঁদের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ
আত্মীয়ের মতো অত্যন্ত সহজভাবে মিশেছিলেন। সেসব লেখা প্রথম প্রকাশিত হতে শুরু করে
এই ম্যাজিক ল্যাম্প পত্রিকাতেই। এই পত্রিকায় তিনি মোট ছ’টি হিমালয় কাহিনি লিখেছেন,
এ লেখার নীচে সেগুলির তালিকা এবং লিংক দেওয়া হল।
মূল্যবান
লেখাগুলি যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য সেগুলি একটি বইয়ে সংকলিত করার উদ্যোগ শুরু হল।
সুচেতনা প্রকাশন দায়িত্ব নিল বইটি নির্মাণের। গত কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এ প্রকাশিত হল
রবিনদার লেখা ‘পাহাড়পথের ফেরেশতারা’ বইটি, রবিনদার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় হিমালয়
অভিযানে অংশগ্রহণকারী দশজন স্থানীয় মানুষকে নিয়ে দশটি লেখার সংকলন। এর মধ্যে
পাঁচটি লেখা ম্যাজিক ল্যাম্পে প্রকাশিত হয়েছিল, বইয়ে সেগুলি পরিমার্জিত রূপে স্থান
পেয়েছে। আক্ষেপ এই যে রবিনদা বইটি হাতে নিয়ে দেখে যেতে পারলেন না। ছাপাখানায়
যাওয়ার আগে অবধি বইটির নির্মাণ সংক্রান্ত যাবতীয় খুঁটিনাটি তত্ত্বাবধান করে গেলেও
ছাপা হয়ে বইটি যখন এল ততদিনে রবিনদা পাড়ি দিয়েছেন মহাপ্রস্থানের পথে।

----------
ম্যাজিক ল্যাম্প পত্রিকায়
প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ হালদার-এর লেখা:
No comments:
Post a Comment