গোলটেবিল:: বই: কাকাবাবু ও শিশুচোরের দল - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় :: আলোচনা: সুলগ্না ব্যানার্জ্জী


বই: কাকাবাবু ও শিশুচোরের দল - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স, মূল্য: ২২৫ টাকা
আলোচনা: সুলগ্না ব্যানার্জ্জী

সাতসকালে খবরের কাগজে ভাংলু আর ছোটগিরি নামক দুজন কয়েদির হাসপাতাল থেকে পালানোর খবর পড়ামাত্রই রাজা রায়চৌধুরীতথা আমাদের সকলের প্রিয় কাকাবাবু'-র মেজাজ সপ্তমে। সন্তুর দিকে কগজটা বাড়িয়ে দিলে সেও খবরটা পড়ে, কিন্তু বুঝতে পারে না কাকাবাবুর এতটা মেজাজ খারাপের কারণ। তাকে দিয়ে কাকাবাবু ডিআইজি রফিকুল আলম’-কে ফোন করান। কাকাবাবু যে কেন রেগে রয়েছেন তা বুঝতে না পেরে বাড়িতে আসার কথা বলেন রফিকুল। কিন্তু তাঁর আসার আগেই কাকাবাবু ন্যাশনাল লাইব্রেরির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। বেরোনোর সময়েই তাঁর দেখা হয় সন্তুর বান্ধবী দেবলীনা ও বন্ধু জোজোর সঙ্গে, তবে রাগের বশেই তিনি কাউকে গুরুত্ব দেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলের জন্য লুচি বেগুনভাজা চলে আসে এবং তৎক্ষণাৎ ডিআইজি রফিকুলও চলে আসেন। গল্পে গল্পে আলম জানা তিনি অন্য কেসে ব্যস্ত, পলাতক কয়েদিদের কথা তিনি জানেন বটে তবে বিশেষ কিছু না। সন্ধেবেলা সব খবর নিয়ে এসে কথা বলবেন। ওদিকে দেবলীনা, জোজোও কাকাবাবুর পথ চেয়ে বসে থাকে। তিনি না এলে ওরা ফিরবে না, বিশেষত দেবলীনা।
সন্ধেবেলা কাকাবাবু বাড়ি ফেরেন রফিকুল আলমের সঙ্গেই। ছুটে আসে সন্তু, জোজো ও দেবলীনা। একটু পরে সবাইকে নিয়ে বসেন কাকাবাবু। পলাতক কয়েদিদের বিষয়ে যতটা খবর পাওয়া গেছে সবটাই জানান রফিকুল, কিন্তু কাকাবাবু জানান রফিকুলের কাছে খবরই নেই ওরা সমাজের কত বড়ো শত্রু। কাকাবাবুর থেকে সব জেনে স্তম্ভিত হয়ে যা রফিকুলসহ বাকিরাও। রফিকুল জানান হাসপাতালে যে কনস্টেবল ওদের পাহারায় ছিল তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে গাফিলতির জন্য। এটুকু জানতে পেরেই কাকাবাবু আর অপেক্ষা না করে সেই কনস্টেবলটির বাড়ি যাবার আগ্রহ দেখান এবং সন্তু জোজো আর দেবলীনাও কাকাবাবুর সঙ্গে যাবার বায়না ধরে। সাসপেন্ডেড কনস্টেবল বিমল দুবের বাড়িতে তাকে পাওয়া না গেলেও তার ভগ্নীপতি মাখনলালকে পাওয়া যায়। কাকাবাবু তার সঙ্গে একটু কথা বলেই বোঝেন বিমল দুবে গাফিলতি দেখায়নি, কয়েদি দুজন তার সাহায্যেই পালাতে পেরেছে। শুধু এটুকুই নয়, কাকাবাবুর হাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও চলে আসে। ধরাও পড়ে বিমল দুবে। ছলে বলে কৌশলে বিমল দুবে তাকে অপরাধীদের আস্তানার কথা জানিয়েও দেয়।
জোজো আর দেবলীনাকে খানিকটা জোর করে বাড়ি ফিরিয়ে সন্তু এবং রফিকুলকে নিয়ে সে রাতেই কাকাবাবু বেরিয়ে পড়েন বারাসতের উদ্দেশে। বিমলের বলা নির্দিষ্ট ভাতের হোটেলে পৌঁছে খুব একটা কিছু চোখে না পড়লেও দোকানের কাউন্টারে থাকা ময়নার প্রতি কাকাবাবুর সন্দেহ জাগে। পরের দিনই সন্তু আর জোজোকে তিনি আবারও সেখানে পাঠান ময়নার খবরাখবর নিতে। এসব ব্যাপারে সর্বদাই সন্তুকে টেক্কা দেয় জোজো। ময়নার সম্পর্কে বেশ বিস্তারিত তথ্য নিয়েই ফিরে আসে ওরা। খেলা শুরু এখান থেকেই। কাকাবাবু তার একজন বিশ্বাসী লোকের সাহায্যে সর্বাগ্রে কিডন্যাপ করান ময়নার একমাত্র শিশুপুত্র কার্তিককে। এরপর তিনি সেই লোকটির মাধ্যমেই ময়নার বাড়িতে পাঠান একটি চিঠি এবং অপেক্ষা করেন তাদের উত্তরের। পরদিন সকালেই রফিকুল জানান বিমল দুবেকে কারা খুন করে রেললাইনে ফেলে দিয়ে গেছে এবং মৃতদেহের ওপর দিয়ে ট্রেন যাওয়ার ফলে তা আর চেনার উপায় নেই। কাকাবাবুর খারাপ লাগল লোকটার লোভের পরিতি দেখে, কিন্তু সারা দেশ জুড়ে সাংঘাতিক সেই অসামাজিক কাজের কোনো খবরাখবর কাগজে নেই। নানা কথা ভাবতে ভাবতে চোখে তন্দ্রা আসে তাঁর। কিন্তু দেবলীনা এসে তন্দ্রা কাটায়, জানতে চায় কাকাবাবু কতদূর এগোলেন। ঠিক এই সময়েই কাকাবাবুর সঙ্গে দেখা করতে সুদূর তুরস্ক থেকে দুজন বিদ্বান ব্যক্তি আসেন। কাকাবাবু তাঁদের কাছেও জানান তাঁর দেশে অপরাধীদের কত বড়ো একটা চক্র নির্দ্বিধায় কাজ করছে। তাঁরা চলে যেতেই একটা ফোন আসে বাড়ির ফোনে। কানে ফোন দিয়েই সত্যিই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন কাকাবাবু। কেউ বা কারা কিডন্যাপ করেছে দেবলীনাকে এবং মুক্তিপণ হিসেবে ফেরত চাইছে ময়নার ছেলে কার্তিককে। দেবলীনার জায়গায় সন্তু হলে এতটা চিন্তা তাঁর হত না। রিভলবারটা সঙ্গে নিয়ে সেই রাতে একাই সন্তুকে ছাড়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান কাকাবাবু।
আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতোই সঠিক জায়গায় পৌঁছে যান রাজা রায়চৌধুরী তথা কাকাবাবু, কিন্তু সেই সাংঘাতিক অপরাধীদের ডেরায় পৌঁছে যেতে পারলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেন না কাকাবাবু।
অতঃপর কী হবে? কাকাবাবু কী পারবেন দেবলীনাকে উদ্ধার করতে? কারা কেন মারল বিমল দুবেকে? কাকাবাবুই বা ঠিক কোন উদ্দেশ্যে কিডন্যাপ করেছিলেন ময়নার ছেলেকে? কোন অপরাধেই বা কাকাবাবু ভাংলু আর ছোটগিরিসহ তাদের দলবলকে খুঁজে বের করে সাজা দিতে উদ্যত হয়েছিলেন? সন্তুই বা কীভাবে জানবে কাকাবাবু কোথায়? শেষ পর্যন্ত কি ময়না ফিরে পাবে তার ছেলেকে? সব কিছুর উত্তর রয়েছে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা পরতে পরতে টানটান রহস্যময় কিশোর অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস কাকাবাবু ও শিশুচোরের দলগ্রন্থে যা আজও জয় করে চলেছে সকল পাঠকদের মন। আজ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু কচিকাঁচার দলে তাঁর সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র রাজা রায়চৌধুরীতথা কাকাবাবু’-র হাত ধরে আজও রয়ে গেছেন তিনি।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment