
ল্যাবরেটরির ভূত
রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস
রাত বারোটা। স্কুলের বন্ধ ল্যাবরেটরির আলোটা জ্বলে উঠল। বন্ধ জানলাটা খুলে গেল হঠাৎ। জানলা দিয়ে বেরিয়ে এল কখনও লাল, কখনও হলুদ আবার কখনও বেগুনি আলো। কিন্তু আলোর রং এমন বদলে গেল কীভাবে?
অনিল-স্যারের মৃত্যুর পর হঠাৎ এমন শুরু হয়েছে গিনিদের স্কুলের ল্যাবে। ল্যাবটার নামই
হয়ে গেছে ভূতুড়ে ল্যাব। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা ল্যাবে দিনের বেলাও ঢুকতে ভয় পায় এখন। সবাই বলে, “ওই ভূতুড়ে ল্যাবে কে ঢুকবে?”
কেউ আবার বলে, “আসলে অনিল-স্যার এত সায়েন্স ভালোবাসতেন পড়াতে... সবসময় ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝাতেন, তাই মৃত্যুর পরেও তাঁর আত্মা ল্যাব ছেড়ে বেরোতে পারেনি...”
বন্ধই পড়ে আছে ল্যাবটা। স্কুলের আশেপাশের বাড়ির সবার মনেও এখন আতঙ্ক। কেউ বলে এমন ভূতুড়ে স্কুলে ছেলে-মেয়েদের আর পড়াবেই না। গিনি কিন্তু তার এই স্কুলকে খুব ভালোবাসে। ভালোবাসে গিনির খুড়তুতো ভাই গুটিও। তাই স্কুলের এমন বদনামে তাদের ভারী মন খারাপ। এখন ক্লাস নাইনে পড়ে গিনি। কানাঘুষো বাবা-মায়ের মুখে সে এখন থেকেই শুনতে পায়, “আর একটা বছর কোনোরকমে কাটলে হয়। হায়ার সেকেন্ডারিতে গিনিকে অন্য স্কুলে দিয়ে দেব...”
গিনির কাকা-কাম্মারও একই সুর। তারা তো ঠিকই করে ফেলেছে ক্লাস এইট থেকে গুটিকে তারা অন্য স্কুলে দেবেই দেবে। স্কুলকে গুটি ভালোবাসলেও সে কিন্তু গিনির মতো নয়। ভূতে তার ভালোই ভয়। সবাই ভূতের কথা বললেও গিনি কিন্তু সেকথা বলে না। ভূতেও বিশ্বাস করে না। গিনির বন্ধু ঋজু আর তাথৈকেও তাই গিনি বুঝিয়ে বলেছিল, “দ্যাখ, আমার মনে হয় এর পিছনে কোনো মানুষ আছে। ভূত নয়।”
- “কিন্তু এমন রাত দুপুরে কোনো মানুষ কেনই বা যাবে স্কুলের ল্যাবে?”
ঋজুর কথা শুনে তাথৈ বলেছিল, “ঋজু তো ঠিকই বলছে গিনি। রাতে না ঘুমিয়ে কেনই বা কেউ ল্যাবে গিয়ে বসে থাকবে? খেয়েদেয়ে কাজ নেই কারুর! সবাই ঠিকই বলে, অনিল-স্যারের আত্মাই। নাহলে ওঁর মৃত্যুর পরেই বা কেন এমন শুরু হল? ঘরের মধ্যে বিভিন্ন রকম আলোই বা হয় কী করে? আমি তো নিজের চোখে দেখেছি সবটা...।”
আসলে তাথৈদের বাড়ি ঠিক স্কুলের সামনে। ওর ঘরের জানলা থেকে ল্যাবটা স্পষ্ট দেখা যায়। গিনি বলল, “আচ্ছা তাথৈ। ঠিক রাত বারোটাতেই কি ল্যাবের আলো জ্বলে ওঠে রে?”
- “হ্যাঁ রে গিনি। আলোর রংও আবার বদলে যায়। আমি নিজে দেখেছি লম্বা ছায়া যেন ল্যাবের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। এরপর গরম কাল আসছে। কতদিন যে এমন জানলা বন্ধ করে ঘুমাতে পারব জানি না। ভাবছি বাবা-মায়ের সঙ্গে একসঙ্গে শোব। কিন্তু সেটাও পারছি না, জানিস!”
ঋজু বলল, “ভয় করলে বাবা-মায়ের সঙ্গে শুবি। তাতে কী আছে!”
তাথৈ মুখ শুকনো করে বলল, “না রে। সেটা বলা যাবে না। তাহলে মা-বাবা এখনি আমায় এই স্কুল ছাড়িয়ে অন্য স্কুলে ভরতি করে দেবে। তোদের ছেড়ে, এই স্কুল ছেড়ে থাকব কী করে বল তো?”
গিনি বলল, “সবই বুঝলাম। কিন্তু সত্যি যদি ভূতই হবে তবে সে আলো জ্বালাবে কেন? ভূত তো আলো নিভিয়ে অন্ধকারে ভয় দেখায় বলে শুনেছি...”
গিনি লক্ষ করল আজকাল স্কুলে তাথৈ প্রায়ই হাই তোলে। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে রাতে ভালো ঘুম হয়নি, তাই ক্লান্ত লাগছে। বলে, ল্যাবের ভূতের ভয়ে ঘরের জানলা বন্ধ রাখে বলে গরমে ওর ঘুম হয় না ঠিকমতো। সেদিন ইতিহাস ক্লাসে তো পড়া শুনতে শুনতে তাথৈ ক্লাসে ঘুমিয়েই পড়েছিল। ভাগ্যিস স্যারের নজর পড়ার আগে গিনি দেখেছিল ও ঘুমাচ্ছে! তারপর ওকে ঘুম থেকে ডেকে দিয়েছিল গিনি। খুব কষ্ট করে জেগে ছিল তাথৈ। ক্লাসের পর গিনি জিজ্ঞেস করলে তাথৈ বলেছিল গতকাল রাতে তার ঘুম হয়নি। তাই খুব ঘুম পাচ্ছে। তখনই গিনির মনে হল, তাহলে এমন কেউ ল্যাবে রাত কাটায় যে দিনের বেলা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুমিয়ে পড়ে। কারণ রাত জাগলে দিনে তো ঘুম পাবেই! কিন্তু সে কে? নিশ্চয়ই স্কুলের আশেপাশেই তাকে পাওয়া যাবে! সেই থেকে গিনি খুঁজে চলল দিনের বেলা কে কে ঘুমায় তার আশেপাশে। তার মধ্যে প্রথম একজন হল - তাথৈ। কিন্তু তাথৈয়ের সঙ্গে গিনির সেই নার্সারি থেকে বন্ধুত্ব। ও এমনিতেই খুব ভীতু আর ভালো। আর ও কেনই বা এমন করবে? নিজের বাড়ি ছেড়ে কেনই বা স্কুলের ল্যাবে গিয়ে রাত কাটাবে? তাই তাথৈকে গিনি ঠিক যেন সন্দেহ করতে পারছে না। কিন্তু সন্দেহের বাইরেও রাখছে না। কারণ, ডিটেকটিভ গল্পগুলো পড়ে গিনি বুঝেছে, গোয়েন্দাদের কাজই হল সন্দেহ করা আর তার কারণ খোঁজা। অনেক ভেবেও তাথৈকে সন্দেহের কারণ গিনি কিছুতেই খুঁজে পেল না। স্কুলের আশেপাশে গিনি খুঁজে দেখল এমন কে আছে যে দিনের বেলা ঘুমাচ্ছে। দেখল স্কুলের রাস্তার পাশের ফুটপাথে বসে থাকা বুড়ো-দাদু ঘুমে ঢুলছে। কিন্তু সে তো ল্যাবে ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটার আগেও এমনই ঢুলত। আর এমন বুড়ো-মানুষ স্কুলের ল্যাবে গিয়েই বা কী করবে? তবুও দিনের বেলা যে-ই এখন ঘুমে ঢুলবে সে-ই গিনির সন্দেহের বেড়াজালে বন্দি হবে। ক্লাসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে গিনি দেখল, ঘটিগরম-কাকু সামনের বটগাছ তলায় বসে ঢুলছে আর মাঝে মাঝে ঝাঁকুনি খেয়ে উঠে বসে মোবাইলটা টিপে সময় দেখছে। তারপর আবার ঘুমে ঢুলে পড়ছে। বেচারা যে টিফিন পিরিয়ডের অপেক্ষায় আছে সেটা গিনি কেন যে কেউ দেখলে বুঝবে। ঘটিগরম-কাকুকে গিনি টিফিন পিরিয়ডে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “আচ্ছা কাকু, তুমি বুঝি রাতে ঘুমাও না?”
ঘটিগরম-কাকু হেসে বলল, “হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?”
গিনি বলল, “দিনের বেলা ঘুমাও তো, তাই...”
- “হে হে... সারাদিনের পরিশ্রমে চোখটা বুজে আসে আসলে...”
শুনল ঠিকই। কিন্তু কাকুর কথা ঠিকমতো কিন্তু বিশ্বাস করল না গিনি। বরং ভাবতে লাগল কাকু কতদিন ধরে এমন ঘুমে ঢুলছে! কাকে করবে সন্দেহ সে? কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না! স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে স্কুল বাসে বসে গিনি দেখল চায়ের দোকানে বসে বিকাশদা ঢুলছে। বিকাশদা আগে গিনিদের স্কুলেই পড়ত। ক্লাস ইলেভেনের পর পড়া ছেড়ে চায়ের দোকানে কাজ করে এখন। ব্যস, গিনির সন্দেহের তালিকায় চলে এল বিকাশদাও। কিন্তু গিনি জানবে কী করে বিকাশদা ঘুমে ঢুলছে কেন? স্কুল থেকে বেরিয়ে চায়ের দোকান বেশ কিছুটা পথ। সেখানে যাওয়া গিনির পক্ষে সম্ভব নয়। একদিন গিনিদের স্কুলবাস চায়ের দোকানের সামনে সিগন্যালে আটকে দাঁড়িয়ে থাকলে গিনি বাসের জানলা দিয়ে দেখল চায়ের দোকানে খুব হইহই। গিনি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দোকানের দিকে। কানাঘুষো কিছু কথা গিনির কানে এল। গিনি বুঝল, বিকাশদাকে চায়ের দোকানের মালিক খুব বকছে। কিন্তু বিকাশদা তো খারাপ নয়, যে ওকে ওভাবে বকবে কেউ। স্কুলের স্যার-ম্যামেরা তো ওকে খুব স্নেহ করতেন। বিশেষ করে অনিল-স্যার বিকাশদাকে খুব ভালোবাসতেন। তাহলে এমন কী হল! কিন্তু জানবে কেমন করে গিনি! সিগন্যাল হয়ে গেল। বাসও ছেড়ে দিল। গিনি শুধু দেখল ওদের স্কুলের দারোয়ান-কাকু বিকাশদাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। পরদিন স্কুলে গিয়ে গিনি দারোয়ান-কাকুকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, বিকাশদা নাকি প্রায়ই দোকানে কাজ ফেলে ঘুমিয়ে পড়ে। তাই দোকানদার রেগে গিয়ে ওকে বকছিল।
তাথৈকে একদিন টিফিন পিরিয়ডে গিনি বলল, “আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে তাথৈ।”
তাথৈ আর ঋজু তো একদৃষ্টিতে গিনির দিকে তাকিয়ে আছে ওর বুদ্ধি শোনার জন্য। গিনি এক চামচ চাউমিন মুখে দিয়ে বলল, “শোন তাথৈ। সামনেই তো তোর বার্থডে। এবারের বার্থডে পার্টিটা তুই দুপুরে না করে রাতে কর।”
ঋজু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “এর সঙ্গে আমাদের স্কুলের ল্যাবের ভূতের কী সম্পর্ক? আর তাছাড়া আমার বাড়ি বেশ দূরে। তাড়াতাড়ি খেয়ে ফিরে যেতে হবে। ঠিক মতো মজাই তো হবে না। আর তোর বাড়িও তো বেশ দূরে গিনি। তুইও তো বেশিক্ষণ এনজয় করতে পারবি না...”
ঋজুকে থামিয়ে দিয়ে তাথৈ বলল, “শুধু তোরা কেন, অনেকেই অনেক দূর থেকে আসবে। রাতে হলে সারাদিনের এনজয়টা কেমন যেন মিস হয়ে যায়!”
গিনি বলল, “একবার না হয় একটু অন্যরকমই হল বার্থডে পার্টি! এতে লাভ ছাড়া তো ক্ষতি হবে না আমাদের!”
ঋজু বলল, “কী লাভটাই বা হবে শুনি?”
গিনি ঠোঁট কামড়ে বলল, “শোন তাথৈ, আমি আর ঋজু ওইদিন তোর বাড়িতে থেকে যাব রাতে। বুঝলি তো! তারপর...”
ঋজু বলল, “তারপর?”
গিনি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “তারপর আমরা রাত্তিরে স্কুলের পিছনের ছোটো গেট দিয়ে ল্যাবে যাব।”
ঋজু বলল, “সে তো পাঁচিল টপকাতে হবে। তুই আর আমি নাহয় পারব। তাথৈ পারবে না কি এসব?”
গিনি বলল, “তাথৈ গেটের সামনে থাকবে। কারণ ল্যাবে যে থাকবে সে আমাদের হাত ফসকে গেলেও তাথৈ তাকে ধরবে।”
তাথৈ ভয়ার্ত চোখে বলল, “দিনের বেলাতেই এখন আমি স্কুলে আসতে ভয় পাই! আর আমি নাকি একা একা রাতের বেলা...”
গিনি বলল, “ভাবিস না। তোর সঙ্গে গুটিও থাকবে।”
প্ল্যানটা যেন পছন্দ হল না তাথৈয়ের। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, “তোদের বাড়ি থেকে অ্যালাউ করবে রাতে আমাদের বাড়িতে থাকতে?”
গিনি বলল, “একদিন আমরা ম্যানেজ করে নেব। কী রে ঋজু, পারবি না? একদিন ম্যানেজ করতে?”
ঋজুর কিছু বলার আগে তাথৈ চিন্তিত মুখে বলল, “কিন্তু অত রাতে আমরা বাড়ি থেকে বেরোবো কেমন করে?”
- “রাতের বেলা কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করছ তোমরা?”
পিছন থেকে হঠাৎ ক্যারাটে-স্যারের গলায় চমকে উঠল তিনজনেই।
দুই
অনেক কষ্টে গিনি আর ঋজু তাথৈকে রাজি করিয়েছিল জন্মদিনের অনুষ্ঠানটা রাতে করতে। অনেক কষ্টে নিজেদের বাড়িতেও রাজি করিয়েছিল তাথৈদের বাড়িতে রাত কাটাতে। রাতে ওদের শোয়ার ঘর আলাদা হলেও এখন ওরা সবাই একসঙ্গে তাথৈয়ের ঘরের জানলা দিয়ে ল্যাবের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। কিন্তু বারোটা বেজে গেল। তবুও ল্যাবের আলো তো জ্বলছে না! মন না চাইলেও প্রথম সন্দেহটা গিনির তাথৈয়ের ওপরই পড়ল আবার। তাহলে কি তাথৈ রাতে ল্যাবে যায়? আজ যেতে পারেনি বলেই কি এখনও আলো জ্বলল না ল্যাবের? সেই জন্যই কি তাথৈ কিছুতেই তার বার্থডে সেলিব্রেশন রাতে করতে চাইছিল না? রাতে যে গিনিরা থেকে গেল তাতেও যেন তাথৈ খুব একটা খুশি নয়! গিনিদের সঙ্গে স্কুলে ল্যাবের সামনে আসতেও যেন কিছুতেই তাকে রাজি করানো যাচ্ছে না কি সেই জন্যই? সন্দেহের চোখে তাথৈয়ের দিকে গিনি তাকালে তাথৈ বলল, “চল না শুয়ে পড়ি। মা-বাবা সেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার কেমন যেন ভয়-ভয় করছে রে। জানলাটা বন্ধ করে দিই?”
গুটি বলল, “এসব কী বলছ তাথৈদিদি? ভূত দেখতে এলাম আর ভূত না দেখেই ঘুমিয়ে পড়ব?”
ঋজু সশব্দে হেসে বলল, “ও বাবা, গুটি তো দেখছি খুব সাহসী হয়ে গেছে এখন!”
গুটির কিছু বলার আগেই গিনি বলল, “আই গেস তাথৈ জানে মাঝরাতে ল্যাবে কে আলো জ্বালিয়ে ভূতের ভয় দেখায়... আর সেটা যদি তাথৈ এখনই...”
গিনির কথা শেষ হবার আগেই গুটি বলল, “দিভাই, দ্যাখ ল্যাবের আলো জ্বলে উঠল।”
সবাই অবাক হয়ে জানলা দিয়ে তাকাল ল্যাবের দিকে। আলো জ্বলতে দেখে স্বস্তির শ্বাস পড়ল গিনির এই ভেবে যে তার এতদিনের বন্ধু তাথৈ তাহলে নির্দোষ। তাথৈকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, “ভয় পাস না তাথৈ। আমরা সবাই একসঙ্গে স্কুলে যাব। তাছাড়া, ভুলে গেলি! ক্যারাটে-স্যার তো আছেন আমাদের সঙ্গে।”
কিন্তু বড়োদের চোখের আড়ালে দরজা খুলে এত রাতে বাইরে বেরোনো তো আর সহজ কথা নয়! তাথৈয়ের কাছে ওদের বাড়ির একটা ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। আসলে তাথৈয়ের মা-বাবা দুজনেই চাকরি করে। তাই তাথৈ যখন স্কুল থেকে ফেরে তখন ওরা কেউই বাড়িতে ফেরে না। ছোটোবেলায় রত্নামাসি বলে একজন তাথৈকে দেখাশোনার জন্য থাকত। তাথৈ বড়ো হয়ে যাওয়ায় রত্নামাসি এখন আর থাকে না। সে যাই হোক, ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ওরা খুব সাবধানে বাড়ি থেকে বেরোল। একটু আগে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তায় জল-কাদা ভেঙে স্কুলের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা চারজন। অল্প অল্প ভয় করতে লাগল চারজনেরই। এমন রাতের বেলা এর আগে কখনও তো ওরা এমন বেরোয়নি কেউ। ভূতের ভয়ের সঙ্গে মা-বাবার বকুনির ভয়ও চেপে ধরল ওদের। শক্ত করে হাতে মোবাইলটা ধরে থাকল গিনি। ক্যারাটে-স্যারের সেভ করা নম্বরটা আরও একবার দেখে নিল। সেদিন টিফিন পিরিয়ডে ক্যারাটে-স্যার ওদের কথা শুনতে পেয়ে গেছিলেন। প্রথমটা গিনিরা ভেবেছিল, স্যার বুঝি খুব রেগে যাবেন। খুব বকবেন। কিন্তু ঘটেছিল তার ঠিক উলটো। স্যার বলেছিলেন, “তোদের ক্যারাটে শেখা সার্থক। তোদের সাহস প্রশংসনীয়। আমিও যে এই স্কুলকে বড্ড ভালোবাসি। তাই আমিও তোদের সঙ্গে আছি। আমার ফোন নম্বরটা রাখ...”
গিনির অনুরোধে ক্যারাটে-স্যার কাউকেই বলেননি ওদের প্ল্যানের কথা। ক্যারাটে-স্যারের কথা ভেবে মনে বল পেল গিনি। শুধু মনে হল, ল্যাবে যে কোনো ভূত নেই সেটা প্রমাণ করতে পারলে তাদের এত বছরের এত বড়ো স্কুলটার বদনাম তো মুছে যাবে! ওর বিশ্বাস তখন ওদের এত রাতে এভাবে লুকিয়ে বেরোনোর জন্য বড়োরা আর বকবে না। প্ল্যানমতো স্কুলের পিছনের গেটের ছোটো পাঁচিল টপকাল গিনি আর ঋজু। তাথৈ আর গুটি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। দেখল স্কুলের সামনের ছোটো মাঠটায় কাদায় জুতো বসে যাবার ছাপ। পায়ের ছাপ দেখে গিনি বলল, “ভূতের পায়ের কি ছাপ পড়ে? বল তো? আর পায়ের ছাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা যার পায়ের ছাপ সে খুব লম্বা।”
ঋজু বলল, “আমার কিন্তু খুব ভয় করছে গিনি। চল ফিরে যাই।”
- “তুই কি ভূতের ভয় পাচ্ছিস?”
- “ভালো করে দ্যাখ গিনি, ল্যাবের ঘরের আলোর রঙের কেমন পরিবর্তন হল হঠাৎ! ভূত ছাড়া মানুষের পক্ষে...”
- “সম্ভব। মানুষের পক্ষেও সম্ভব। ভুলে যাস না। সায়েন্স অনেক কিছু পারে। যার সবটা হয়তো আমরা এখনও না জানলেও অনেকেই জানে।”
ভয়ে ঘামতে শুরু করল ঋজু। বলল, “ওই দ্যাখ, কেমন খট-খট করে আওয়াজ আসছে ল্যাব থেকে! আমি বাইরে বরং গুটি আর তাথৈয়ের সঙ্গে থাকছি রে। প্লিজ কিছু মনে করিস না গিনি।”
- “তুই চলে যাবি?”
গিনির শুকনো মুখটা দেখে ঋজু বলল, “আমি বলি কি গিনি, তুইও চল আমার সঙ্গে। আমরা ছোটো ছোটোর মতো থাকি। বাড়ি যাই চল। বরং ক্যারাটে-স্যারকে বলে...”
ল্যাব থেকে ভেসে এল আবার খুট করে একটা শব্দ। ল্যাবের ঘরের জানলা দিয়ে একটা লম্বা ছায়া পড়ল বারান্দায়। অসম্পূর্ণ কথাটা বলে ঋজু বেশ কিছুক্ষণ ছায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে গিনিকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে স্কুলের গেটের দিকে পা বাড়াল, কিন্তু দু-পা গিয়ে থেমে গেল ভয়ে। একা গেটের বাইরে যেতেও যেন বড্ড ভয় করল ওর। এদিকে গিনি এক-পা এক-পা করে একাই এগিয়ে গেল ল্যাবের ঘরের সামনে। গা-ছমছম যে গিনির একেবারেই করছে না তেমনটা নয়। গলাটাও শুকিয়ে কাঠ। তবুও মনে সাহস আনল সে। একবার ভাবল, ক্যারাটে-স্যারকে ফোন করবে। স্যারের তো স্কুলের পাশেই বাড়ি। কিন্তু না। তেমন বিশেষ সমস্যা না হলে স্যারকে বিরক্ত করার ইচ্ছে তার নেই। শুধু ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরে এগিয়ে গেল ল্যাবের দিকে। এবার ল্যাব থেকে ভেসে এল বেশ জোরে একটা শব্দ। ভয়ে হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠল ঋজু। ঋজুর চিৎকার শুনে ল্যাবের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল রোগা লম্বা কালো... কে? ভূত? চমকে গেল গিনিও। গিনি মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট মুখে ফেলল তার। শুধু গিনি নয়। সেই ভূতও যেন চমকে উঠল সেই আলোয়। কোন দিক থেকে কোথায় পালাবে ভেবে পেল না সে। পালাবার আগেই গিনি খপ করে চেপে ধরল তার হাত। নিজের হৃদপিণ্ডের আওয়াজ যেন নিজেই শুনতে পেল এবার গিনি। অস্ফুটে কাঁপা গলায় সে বলে উঠল, “তুমি! বিকাশদা! তুমি এখানে কী করছ? কেন তুমি এভাবে ভয় দেখিয়ে আমাদের স্কুলের বদনাম করছ? কালকেই আমি হেডস্যারের কাছে নালিশ করব...”
তিন
না। কোত্থাও পালায়নি বিকাশ। পালাবার মতো ছেলে সে নয়। গিনির কথামতো হেডস্যারের সামনে এখন সে। কারো কিছু বলার আগেই সে ক্ষমা চেয়ে বলল, “অনিল-স্যার আমায় খুব ভালোবাসতেন। বলতেন, তোর ওপর অনেক আশা। খুব ভালো করে পড়। কিন্তু বাবা আচমকা মারা যাবার পর আমি স্কুল ছাড়তে বাধ্য হই...”
বিকাশকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে একজন ম্যাম বললেন, “তার সঙ্গে ল্যাবে গিয়ে আলো জ্বালাবার কারণ?”
আরও একজন ম্যাম বললেন, “তোমার বাবা কী করতেন? তুমি তো খুব ভালো ছাত্র ছিলে। এমন কী হল যে পড়াশোনা একেবারে ছেড়ে দিলে?”
ক্যারাটে-স্যার বললেন, “ও তো স্কুল ছেড়ে ওই চায়ের দোকানে কাজ করত...”
হেডস্যার সকলকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আপনারা চুপ করুন প্লিজ। বিকাশ তুমি যেটা বলছিলে, বলো। সবার আগে বলো তুমি ল্যাবের চাবি পেলে কোথায়?”
বিকাশ হাতজোড় করে বলল, “দারোয়ান-কাকুর কাছ থেকে। স্যার, আপনি প্লিজ দারোয়ান-কাকুকে বকবেন না। আসলে কাকুকে আমিই রাজি করিয়েছিলাম। কাকুর কোনো দোষ নেই...”
হেডস্যার বললেন, “হুম, বুঝলাম। কিন্তু দারোয়ান এটা ঠিক করেনি। স্কুলের যে কোনো ক্ষতি হলে তার দায় কে নিত?”
ক্যারাটে-স্যার হেডস্যারকে বললেন, “স্যার, বিকাশের আর কিছু বলার থাকলে ওকে একটু বলতে দিন। তারপর না হয় দারোয়ানকে যা বলার বলবেন।”
হেডস্যার বললেন, “বিকাশ, তোমার আর কিছু বলবার থাকলে বলো।”
বিকাশ বলতে শুরু করল, “বাবা একটা ছোটো প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরি করত। বাবা হঠাৎ মারা যাবার পর... আমি বাড়ির বড়ো ছেলে... তাই বাধ্য হয়ে চায়ের দোকানে কাজ নিই। স্কুল ছাড়ি। কিন্তু পড়াশোনা ছাড়িনি। অনিল-স্যারের কথা খুব মনে পড়ে। উনি বলতেন, ‘বিজ্ঞান মুখস্থের বিষয় নয়। বোঝার। পরীক্ষার।’ দিনে পড়ার সময় পাই না। তাই রাতে পড়ি। ল্যাবে এসে হাতে-নাতে পরীক্ষা করি। ল্যাবে ঢুকলে এখনও মনে হয় অনিল-স্যার যেন আজও আমার সঙ্গে আছেন। আমায় পড়াচ্ছেন...”
স্তব্ধ হয়ে গেল সবাই। হাতজোড় করে কাঁদতে কাঁদতে হেডস্যারের পা জড়িয়ে ধরল বিকাশ। ঝাপসা হয়ে এল গিনির চোখ। হেডস্যার বিকাশকে দু-হাত দিয়ে তুলে ধরলেন। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “তুই পড়বি। এই স্কুলেই পড়বি। আমরা সবাই তোর পাশে আছি।”
মাঝখান থেকে তাথৈ হঠাৎ বলে উঠল, “তাহলে ল্যাবের ঘরের আলোর রং বদলে যেত কেন?”
বিকাশ চোখের জল মুছে মুচকি হেসে বলল, “আসলে লাল বাঁধাকপির রস দিয়ে অ্যাসিড–বেস পরীক্ষা করছিলাম। লণ্ঠনের আলো টেস্টটিউবের রঙিন দ্রবণের ভেতর দিয়ে বাইরে বেরোলে আলোটা লাল বা বেগুনি দেখায়। আবার ধোঁয়া আর ভাঙা কাচে প্রতিফলন হয়ে বাইরে থেকে অদ্ভুত লাগে।”
হেডস্যার বললেন, “ভাগ্যিস গিনি ছিল। গিনির জন্যেই
তো সত্যিটা
সামনে এল।”
ক্যারাটে-স্যার বললেন, “ভয়কে জিততে হলে সত্যিটা সামনে আনতে হয়। আজ তোমরা সেটাই করেছ। আসলে, ভূতকে নয় - অজ্ঞানতাকে ভয় পাওয়া উচিত।”
একজন ম্যাম বললেন, “ঠিকই তো। আমাদের এত বড়ো স্কুল। কী বদনামটাই না হয়ে যাচ্ছিল! গিনিকে আমাদের পুরস্কৃত করা উচিত।”
গিনি বলল, “আমি একা কিছুই করতে পারতাম না। যদি আমার বন্ধুরা আর ক্যারাটে-স্যার আমার সঙ্গে না থাকত।”
গোমড়া মুখে গুটি বলল, “শুধু বন্ধুদেরকেই মনে পড়ল দিভাই? এই ভাইটার কথা ভুলে গেলি?”
সবাই সশব্দে হেসে উঠল। গিনি গুটির মাথার চুল হাত দিয়ে নেড়ে মুচকি হেসে বলল, “তুইও তো আমার বন্ধুই। ভাই কাম বন্ধু...”
------------
ছবি - এআই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:
Post a Comment