উপন্যাস:: ধূমমামা ও দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়াল - বুম বোস


ধূমমামা ও দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়াল
বুম বোস

()

কী রে, মুখটা এমন ব্যাজার করে রয়েছিস কেন?” আমি ধূমমামার চেতলার ঘুপচি ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতেই প্রশ্নটা করল ধূমমামা
জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে বললাম, “আর বোলো না, আমার বন্ধু মৌমিতকে নিয়ে বড্ড চিন্তায় আছি
স্কুলের বন্ধু নাকি?”
হুম!”
কী হয়েছে তার?”
গত দু-সপ্তাহ ধরে মৌমিত স্কুলে আসছিল না ফোন করছি, সেটাও ধরছে না, বেজে যাচ্ছে তাই শেষে একদিন ওর বাড়ি গিয়ে হাজির হলুম আমায় দেখে ওর বাবা-মা ঠিক যেন ভূত দেখার মতো চমকালেন
মৌমিত আছে বাড়িতে? অনেকদিন স্কুল আসছে না, তাই খোঁজ নিতে এলামআমি জিজ্ঞেস করলাম
“ওর বাবা বললেন, ‘মৌমিত তো এখানে নেই, ও আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে, দেওয়ানগড় সেখানে কিছু বৈষয়িক কাজকর্ম আছে, সেসব মিটিয়ে তবেই ফিরবেওর বাবার কথা শুনে তখনকার মতো মনটা খানিক শান্ত হল বাড়ি ফিরে এলাম কিন্তু কয়েকদিন পরেই আমার বাড়িতে একটা চিঠি আসে
কার চিঠি?” ধূমমামা তার আদ্যিকালের ল্যাপটপে কীসব খুটখাট করতে করতে খানিক অন্যমনস্ক ভাবেই জিজ্ঞেস করল কথাটি
মৌমিতেরআমি পকেট থেকে চিঠিটা বের করলাম
এইবার ধূমমামা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকাল ভুরু কুঁচকে বলল, “এই হোয়াটসঅ্যাপের জমানায় চিঠি? স্ট্রেঞ্জ!”
আমি ধপ করে মামার কাজের টেবিলের সামনে রাখা ফাঁকা চেয়ারটায় বসে বললাম, “আরে আমিও তো এটাই ভেবেছিলাম তারপর যখন চিঠিটা পড়লাম আমার মাথায় রীতিমতো বাজ পড়ল
কেন? কী এমন লেখা ছিল শুনি তাতে?”
নিজেই পড়ে দেখোবলেই চিঠিটা এগিয়ে দিলাম ধূমমামার দিকে চিঠির বক্তব্য নিম্নরূপ
 
প্রিয় দীপু,
আমার এখানে খুব বিপদ তুই পারলে ধূমমামাকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয় এখানে আর ভুলেও আমার বাবা-মাকে কিছু বলিস না এসব, তাহলে ওরা তোদের এখানে আসতে দেবে না চিঠিতে গ্রামের বাড়ির ঠিকানা পাঠালাম, প্লিজ চলে আয় তোদের অপেক্ষায় থাকব
ইতি,
তোর বন্ধু মৌমিত
 
চিঠিটা বার দুয়েক পড়ার পর, সেটি আবার আমায় ফিরিয়ে দিয়ে ধূমমামা বলল, “মৌমিত মজা করছে না তো?”
উঁহু ওকে যতদূর চিনি, এমন মজা করার ছেলে ও নয়
আমার কথা শুনে ধূমমামা বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে কী যেন একটা ভাবল, তারপর বলল, “দীপুস্কুলে কদ্দিন ছুটি পারবি রে?”
সে তো পারব কিন্তু মা?” আমার মুখটা নিমেষে ব্যাজার হয়ে গেল
তোর মাকে আমি সামলে নেব আজ রাতে তোর মাকে ফোনে সব বুঝিয়ে দেব কাল টিকিটপত্র সব কেটে নিই, পরশুই মামা ভাগনেতে মিলে সোজা রওনা দেব দেওয়ানগড়ের উদ্দেশে

()

বোলপুর স্টেশন থেকে ট্রেন বদলে, দেওয়ানগড় পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় ঘণ্টাখানেক দেওয়ানগড় স্টেশনে নামতেই মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে উঠল এমন সবুজে ঘেরা স্টেশনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছিলাম কয়েকবার, এই প্রথম চাক্ষুষ করলাম স্টেশনের চারিধারে নানান গাছগাছালির সমারোহ এমনকি রেল লাইনের ধারেও সবুজ ঘাসের ছোঁয়া রয়েছে
ট্রেন থেকে নেমেই ধূমমামা বলল, “ফ্যানটাস্টিক জায়গা তোর বন্ধু যদি আমাদের মজা করেও ডেকে থাকে, তবুও আমি একফোঁটা রাগ করব না
আমি বললাম, “সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু এবার কোনদিকে? খিদেয় যে পেট জ্বলে যাচ্ছে! সেই কোন সকালে অল্প একটু ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরিয়েছি…”
উফ, নেমেই খাই খাই করিস না তো চারিদিকে তাকিয়ে দেখ, কত সুন্দর, কত নির্মল এই জায়গাধূমমামা গলায় বিরক্তি এবং মুগ্ধতা উভয়ই মিশিয়ে বলল কথাটি
খিদে আমার পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু ধূমমামার কথা অস্বীকার করতে পারলাম না সত্যিই এই জায়গাটির চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য আকাশের নীল আর গাছগাছালির সবুজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে যেন কোনো বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ছবি
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব আকাশপাতাল ভাবছিলাম, আচমকাই বেয়াড়া খিদেটা পেটে আবার খোঁচা মারতেই সংবিৎ ফিরল আমার ততক্ষণে অবশ্য ধূমমামার মুগ্ধতাও কেটেছে একটু অতঃপর আমি আর ধূমমামা হাঁটা দিলুম টিকিট ঘরের দিকে স্টেশন থেকে বেরনোর রাস্তাটা ওদিকেই কয়েকজনকে আসতে যেতে দেখে ব্যাপারটা বোঝা গেল
স্টেশন থেকে বেরোতেই, কিছুটা দূরে, একটি বিরাট অশ্বত্থ গাছের নীচে কয়েকটা ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম ধূমমামা তড়িঘড়ি সেদিকেই এগোলো আমাদের সঙ্গে লাগেজ আহামরি কিছু নেই, দুজনে দুটো রুকস্যাকে তিন-চারদিন কাটানোর মতো জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়েছি ব্যস, ওইটুকুই
অশ্বত্থ গাছের নীচে, ভ্যানগুলির কাছাকাছি পৌঁছাতেই ধূমমামা বলল, “আমরা এখানকার জমিদার বাড়ি যাব কে যাবে?”
লাইনে সবার আগে যে ভ্যানটি দাঁড়িয়েছিল; তার চালক ভ্যানের উপর বেশ আয়েশ করে শুয়ে ফুকফুক করে বিড়ি টানছিল, ধূমমামার ডাক শুনে সে চটজলদি উঠে বসল আঙুলের ফাঁকে ধরা বিড়িটাকে ছুড়ে খানিকটা দূরে ফেলে দিয়ে সে বলল, “চলুন বাবু আমি নিয়ে যাচ্ছি
ভাড়া কত লাগবে?”
আজ্ঞে তিরিশ টাকা লাগবে
ঠিক আছে চলো
আমরা দুজনেই ভ্যানে চড়ে বসলাম বিকেলের মিঠে রোদ্দুর গায়ে মেখে আমরা হেলতে দুলতে এগিয়ে চললাম দেওয়ানগড়ের অন্দরে
তা বাবুরা বুঝি জমিদার বাড়ির অতিথি?”
অতিথিই বলতে পারো তবে অনাহুত
আজ্ঞে?”
ও কিছু না তুমি বলো, তোমার নাম কী?”
আজ্ঞে আমার নাম হারান
তোমার বয়স তো দেখছি বেশ অল্প কবে থেকে চালাচ্ছ ভ্যান?”
আমি কিন্তু ইস্কুল ফাইনাল পাস দিয়েছি বাবু আসলে আমার বাবার শরীরটা খুব খারাপ যাচ্ছে, তাই বাবার জায়গায় আমিই চালাচ্ছি ইদানীং এই ভ্যানটাই আমাদের রুজিরোজগার বাবু
কথাগুলি বলেই হারান কেমন যেন চুপ মেরে গেল হয়তো অচেনা অজানা মানুষদের সামনে একটু বেশিই বলে ফেলেছে ভেবে অনুশোচনা হল তার ধূমমামাও দেখি আর কথাবার্তা বলছে না মুগ্ধ চোখে দেওয়ানগড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিল রাস্তার দু-ধারে বিঘের পর বিঘে সোনালি ধানখেত; বিশাল বিশাল সব মাঠ; স্বচ্ছ, টলটলে জলে ভরা জলাশয়; প্রাচীন মন্দিরআর এসবের মাঝখান দিয়ে সরু পথটি এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়েছে গ্রামের ভেতরের দিকে মাঝেমাঝে পথের ঝোপঝাড়ের মধ্যে সাদা সাদা বুনোফুল ফুটে আছে যেতে যেতেই রাস্তার আশেপাশে গ্রামের কয়েকটি বাড়িঘরও চোখে পড়ল কলকাতার মতো গায়ে গায়ে লাগানো, ঘিঞ্জি বাড়িঘর নয়; পর পর দুটি বাড়ির মধ্যে অনেকটা করে জায়গা ছাড়া
প্রায় মিনিট কুড়ি পথ চলার পর, একটি জোড়া শিবমন্দিরের বাঁপাশ দিয়ে বাঁক নিয়ে আমাদের ভ্যানটা গিয়ে দাঁড়াল একটি প্রকাণ্ড, প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে এসে এক মানুষ সমান পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, সাদা রঙের বিশাল বাড়িটা দেখে কাকাবাবুররাজবাড়ির রহস্যউপন্যাসটির কথা মনে পড়ে গেল একইসঙ্গে গাটা কেমন যেন শিরশির করে উঠল এই শস্যশ্যামলা, নির্মল গ্রামে সত্যিই কি কোনো বিপদ লুকিয়ে আছে মৌমিতের জন্য? রাজবাড়ির রহস্যের মতো এই জমিদার বাড়িতেও কি কোনো রহস্য দানা বেঁধেছে?
প্রশ্ন অনেক, উত্তর আছে সামনের ওই বিশাল বাড়িটির ভিতরে তাই আর দেরি না করে আমরা এগিয়ে গেলাম বাড়ির সদর দরজার দিকে

()

    জমিদার বাড়ির প্রকাণ্ড গেট পেরিয়ে আমরা জমিদার বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলাম তিনমহলা বাড়িটির সামনে রঙবেরঙের ফুল দিয়ে সাজানো সুন্দর বাগান বাগানের মধ্যে দিয়ে মোরাম বিছানো পথ ধরে আমরা এগোলাম সদর দরজার দিকে
সদর দরজার সামনে একজন বেশ লম্বাচওড়া দারোয়ান, বন্দুক কাঁধে পায়চারি করছিল আমাদের দেখেই জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, কাকে চাই?”
ধূমমামা বলল, “আমরা মৌমিতের সঙ্গে দেখা করতে চাইতারপর আমার দিকে ইশারা করে বলল, “ও দৈপায়ন, আমার ভাগনে এবং মৌমিতের স্কুলের বন্ধু
ধূমমামার কথা শুনে দারোয়ানের মুখে হাসি ফুটল সে বলল, “ওহআপনারা ছোটোসাহেবের বন্ধু? দাঁড়ান খবর দিচ্ছিবলেই সে বাড়ির ভিতরে চলে গেল
মিনিট খানেকের মধ্যেই আবার ফিরে এসে বলল, “আপনারা ভিতরে যান, বড়োকর্তা আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন
আমরা বাড়ির ভিতরে পা বাড়ালাম বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল আমার সদর দরজা পার করে, চওড়া দালান পেরিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করতেই বুঝলাম যে রাজপ্রাসাদ আসলে কাকে বলে সামনের বসার ঘরটি দামি দামি সব আসবাব দিয়ে সাজানো দেয়ালে ঝুলছে শৌখিন সব পোরট্রেট এবং অয়েল পেইন্টিং ঘরের ঠিক মাঝামাঝি রাখা একটি বাহারি সোফাসেটের একপ্রান্তে বসে রয়েছেন একজন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক আমরা তাঁর সামনে গিয়ে, তাকে করজোড়ে অভিবাদন জানালাম
ধূমমামা বলল, “নমস্কার আমার নাম ধূমকেতু বসু এই আমার ভাগনে দৈপায়ন ও মৌমিতের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে মৌমিতের একটা চিঠি পেয়ে আমরা এখানে ছুটে এসেছি
ভদ্রলোক প্রথমেই আমাদের নমস্কার জানিয়ে বসতে বললেন আমি আর ধূমমামা পাশাপাশি বসলাম
আমরা বসতেই সামনে বসা ভদ্রলোক বললেন, “আমার অরুণ দত্ত চৌধুরী আমি মৌমিতের জ্যাঠামশাই মৌমিতের বাবা মানে বরুণ আমার মেজো ভাইঅরুণবাবু থামলেন
আমি এবার খুব মন দিয়ে দেখলাম ওঁকে বসে থাকলেও তিনি যে বেশ লম্বা মানুষ তা বেশ সহজেই বোঝা যায় লম্বাটে মুখ, মাথায় ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো কাঁচাপাকা চুল চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, পরনে বাদামি রঙের শৌখিন পাঞ্জাবি তাঁর চেহারায়, পোশাকে এবং গলার স্বরে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট
চিঠিতে মৌমিত ঠিক কী লিখেছে জানতে পারি?” অরুণবাবু বেশ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন
ধূমমামা মৃদু হেসে বলল, “তেমন কিছুই নয় তার এখানে একা একা লাগছে, বন্ধুকে মিস করছে, এইসবইতাছাড়া দেওয়ানগড় কত সুন্দর গ্রাম, সে কথাও লিখেছে তারপর থেকেই তো আমার এই ভাগনে দেওয়ানগড় যাবে বলে ঝুলোঝুলি করতে শুরু করল অগত্যা আসতেই হল
একটু জানিয়ে এলে ভালো হত, অতিথি আপ্যায়নের কোনো বন্দোবস্ত করারই যে সুযোগ পেলাম নাঅরুণবাবু পালটা হেসে বললেন
ধূমমামা বলল, “তাতে কোনো অসুবিধে নেই অরুণবাবু, আপনাদের গ্রামের সৌন্দর্য দেখে, শুদ্ধ হাওয়া খেয়েই মনে হচ্ছে বয়স বছর পাঁচেক কমে গেছে আর কী চাই বলুন তো!”
বেশ বেশ তা ক’দিন থাকছেন তো?”
নিঃসন্দেহে আচ্ছা এখানে কোনো হোটেল বা সরাইখানা কি পাওয়া যাবে?”
সে কী! আপনারা জমিদার বাড়ির অতিথি, আপনারা কিনা থাকবেন হোটেলে! তা কি হয় ধূমকেতুবাবু?”
ধূমমামা লাজুক হেসে ঘাড় নাড়ল বলল, “আপনাদের অসুবিধে না হলে আমার আপত্তি নেই
ধূমমামার সম্মতিসূচক কথাটি শুনেই অরুণবাবু হাঁক পাড়লেন, “বিশুএকবার এদিকে আয় দেখি
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একজন ভৃত্য গোছের লোক এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে লোকটির বয়স আন্দাজ পয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ হবে, রোগা চেহারা, মাথায় ছোটো ছোটো করে ছাঁটা চুল, পরনে একটি আধময়লা ফতুয়া আর খাটো করে পরা ধুতি কাঁধে ঝুলছে একটি গামছা
লোকটি এসেই সরাসরি অরুণবাবুর দিকে তাকিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, “আজ্ঞে বলুন বাবু
বিশু, এরা আমাদের অতিথি, ক’দিন থাকবেন এখানে ওদের গেস্টরুমটা খুলে দাওঅরুণবাবু আমাদের দিকে ইশারা করে বললেন
আচ্ছা মৌমিত কোথায়? ওর সঙ্গে দেখা হবে না?” আমি জিজ্ঞেস করলাম
অরুণবাবু বললেন, “সে কী! দেখা হবে না কেন? তুমি তার প্রিয় বন্ধু বলে কথা তোমার সঙ্গে দেখা না হলে চলে?” বলেই তিনি তাকালেন ওই বিশুকাকার দিকে বললেন, “ওদের ছোটোসাহেবের ঘরটা দেখিয়ে দাও ওঁরা কিছুক্ষণ গল্পগুজব করুক, ততক্ষণ তুমি গেস্টরুমটা ঝাড়পোঁছ করে নাও
বিশুকাকা অরুণবাবুর কথায় লম্বা করে ঘাড় নেড়ে আমাদেরকে তার পিছু পিছু আসতে বলল যাওয়ার আগে ধূমমামা অরুণবাবুকে ডেকে বলল, “আচ্ছা, বাড়ির বাকিদের সঙ্গে তো আলাপ হল না?”
রাতে ডিনার টেবিলে সকলের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেবঅরুণবাবু বললেন
ধূমমামা আলতো ঘাড় নেড়ে পা বাড়াল বিশুকাকার পিছু পিছু আমিও যথারীতি এগোলাম মামার সঙ্গেই

()

মৌমিত ওর ঘরের দরজা খুলে বাইরে এসে আমাদের দেখতে পেয়েই চমকে উঠল আমরা যে ওর চিঠি পেয়েছি, এবং সেই চিঠিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এতদূর ছুটে এসেছি, সে কথা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না ও সঙ্গে সঙ্গে আমায় জড়িয়ে ধরল সে তারপর ধূমমামাকে টুক করে একটা প্রণাম করে বলল, “তোমরা যে সত্যি সত্যি আসবে আমি ভাবতেই পারিনি এসো এসো, ভেতরে এসো তোমরা অনেক কথা আছে তোমাদের সঙ্গেবলেই সে বিশুকাকাকে বলল, “বিশুদা, দু-গ্লাস শরবত আর একটু খাবার পাঠিয়ে দাও না
খাবারের কথা শুনে ভুলে যাওয়া খিদেটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠল
মৌমিতের ঘরটা বেশ বড়ো দুটো বড়ো বড়ো জানালাও রয়েছে দক্ষিণ আর পূর্ব দিকে আসবাব বলতে রয়েছে একটি রাজকীয় পালঙ্ক, বিশাল একটা আলমারি, টেবিল-চেয়ার আর কিছু টুকটাক জিনিসপত্র এই ঘরেও বেশ কিছু শৌখিন মূর্তি এবং ছবি চোখে পড়ল সেসব দেখতে দেখতেই মৌমিতের নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম
ধূমমামাও বিছানার একপাশে বেশ আয়েশ করে বসল তারপর সটান মৌমিতের দিকে তাকিয়ে বলল, “তা চিঠিতে যে বিপদের কথা লিখেছিলে সেটা সত্যি, নাকি বন্ধুকে গ্রামের বাড়িতে ডেকে আনার কৌশল?” কথাটি বলেই ধূমমামা বেশ ইয়ারকির ছলে ভুরু নাচাল
মৌমিত একবার ঢোঁক গিলে বলল, “না মামা, আমার সত্যিই বিপদ ভয়ে ভয়েই চিঠিটা লিখেছি তোমাদের
তা হঠাৎ চিঠিই কেন? ফোন-টোনও তো করতে পারতে?”
আমার ফোনটা বাবা বাজেয়াপ্ত করেছে এখানে আসার আগেই বলেছে ওটাই নাকি আমার গোল্লায় যাওয়ার কারণ! আর এখান থেকে যে ফোন করব, দীপুর নাম্বারটাও তো মুখস্থ নেই ঠিকানাটা অদ্ভুতভাবেই মনে ছিল তাই চিঠিই লিখলাম
সে কী! তোমার বাবা-মা তোমায় এতদূর মোবাইল ছাড়া ছেড়ে দিলেন?”
না না, তা কেন! আমি তো একা আসিনি এখানে, বড়দা মানে আমার সেজো কাকার ছেলে গিয়ে নিয়ে এসেছে আমায়
বুঝলাম তা বিপদটা কী একটু শুনি?”
মৌমিত মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল, “দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়াল আবার ফিরে এসেছে…”

()

তখন মৌমিতের মুখে দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়ালের কথা শুনে শার্লক হোমসের দ্য হাউন্ড অফ বাস্কারভিল’-এর কথা মনে পড়ে গেছিল আমার কিন্তু ধূমমামা মৌমিতের কথায় তেমন পাত্তা দেয়নি তাছাড়া সেই মুহূর্তে বিশুকাকা খাবার আর সরবত নিয়ে এল, অতঃপর দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়ালের কথাটা তখনকার মতো চাপা পড়ে গেল
আপাতত আমরা সকলে বসে মৌমিতদের বিশাল জমিদার বাড়ির ডাইনিং হলে একটি বিশালাকৃতি ডাইনিং টেবিলের একপ্রান্তে বসেছি আমি এবং ধূমমামা আমার ঠিক পাশেই বসেছে মৌমিত এছাড়া ডাইনিং টেবিলে বসে রয়েছেন আরও অনেকে বিশুকাকা সহ আরও কয়েকজন ভৃত্য গোছের লোকজন খাবার বেড়ে দেওয়ার কাজ করছেন তাদের তদারকি করছেন একজন মাঝবয়সি মহিলা মৌমিত তাঁকে কাকিমা বলে সম্মোধন করতে বুঝলাম যে তিনি আসলে মৌমিতের সেজোকাকার স্ত্রী
খাওয়াদাওয়া শুরু করার আগে মৌমিতের জ্যাঠামশাই অরুণবাবু আমাদের উদ্দেশে বললেন, “আমার ভাইপোকে আপনারা চেনেনই, বাড়ির বাকিদের সঙ্গে আপনাদের একটু আলাপ করিয়ে দিইবলেই তিনি তাঁর ঠিক ডান পাশেই বসে থাকা একজন খুব সুন্দর দেখতে মেয়েকে দেখিয়ে বললেন, “আমার একমাত্র মেয়ে দেবাদৃতা কলকাতায় অরগানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে পিএইচডি করছে
দেবাদৃতা দিদি আমাদের দিকে তাকিয়েহ্যালো…” বলে সম্ভাষণ জানাল
এরপর অরুণবাবু তাঁর ঠিক বাঁদিকে বসা একজন মাঝবয়সি সুপুরুষ ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করে বললেন, “আমার সেজো ভাই তরুণ ও যোগ্যতায় ইঞ্জিনিয়ার হলেও, বিদেশ থেকে এমবিএ করে আসার পর আমাদের ব্যাবসাই সামলায় ওঁর মতো অ্যাসেটকে আর বাইরে ছাড়িনিবলেই হাসলেন তিনি তারপর তরুণবাবুর ঠিক পাশে থাকা বছর বাইশ বা তেইশের এক যুবককে দেখিয়ে বললেন, “আর ও হল আমার আরেক ভাইপো, তরুণের ছেলে সৌভিক ও বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে পড়াশোনা করছে
আমি তো ওঁকে দেখেই বুঝেছিলাম যে ওই মৌমিতের বড়দা সবশেষে তিনি আলাপ করালেন তাঁর স্ত্রী সুমিত্রা দেবীর সঙ্গে সবার সঙ্গে আলাপের পালা মিটতেই খাওয়াদাওয়া শুরু হল
ডিনারের মেনুটাও হয়েছে জব্বর ভাত এবং লুচি দুটোই রয়েছে সঙ্গে মাছের মাথা দিয়ে ডাল, নারকেল আর মুশুর ডালের বড়া দিয়ে মোচার ঘণ্ট, মটন কষা, চিকেন চাপ, মাছের কালিয়া, চাটনি, পাপড় আর রসগোল্লা সব মিলিয়ে যাকে বলে রাজকীয় আয়োজন
খেতেই খেতেই কথাবার্তা চলছিল ধূমমামা বেশ তৃপ্তি করে মোচার ঘণ্ট দিয়ে ভাত মেখে খাচ্ছিল খেতে খেতেই বলল, “আপনারা তাহলে তিন ভাই? বোন-টোন নেই আপনাদের?”
ধূমমামার এই প্রশ্ন শুনে খানিক থমকালেন অরুণবাবু তারপর একটু গম্ভীর মুখ করেই বললেন, “নাহ, আমাদের কোনো বোন নেই ঠিকই, তবে আমরা তিন ভাই নই, চার ভাই
চার ভাই?” ধূমমামা কৌতূহলী চোখে তাকাল
হ্যাঁ আমি, বরুণ মানে মিমোর বাবা, তারপর তরুণ এবং সবার ছোটো কিরণ কিন্তু কিরণ বহু বছর আগে এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে আমাদের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগও রাখেনি তাই সে কোথায় আছে, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা আমাদের জানা নেই
আচ্ছা, সোশ্যাল মিডিয়াতে একবার…”
ধূমমামাকে শেষ করতে না দিয়েই অরুণবাবু বললেন, “দেবু, সৌভিক, ওরা চেষ্টা করেছিল, পায়নি
এরপর কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না সবাই কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে খাবার খেতে লাগল
মিনিট দেড়েক পর ধূমমামাই আবার নীরবতা ভঙ্গ করল বলল, “মৌমিত কী একটা খুনে শেয়ালের কথা বলছিল…”
ধূমমামার মুখে খুনের শেয়ালের কথা শুনে মৌমিতের বড়দা অর্থাৎ সৌভিকদা হো হো হেসে উঠল বলল, “ওসব গ্রামবাসীদের মনগড়া গল্প ছাড়া আর কিছুই নয় ঠাকুরদার মুখে শুনেছি যে এককালে আমাদের এই দেওয়ানগড়ের জঙ্গলে নাকি অনেক হিংস্র পশু ছিল তবে সেসব এখন অতীত
অরুণবাবু বললেন, “একেবারেই তাই আসলে আমাদের মিমো মানে মৌমিত খুনে শেয়ালের চেয়েও বেশি ভয় পাচ্ছে রাজ্যাভিষেকের রিচুয়াল নিয়ে কী রে, তাই না?” অরুণবাবু মৌমিতের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালেন
রাজ্যাভিষেক! সেসব এখনও হয় নাকি এখানে?” ধূমমামা অবাক চোখে তাকাল
অরুণবাবু মৃদু হেসে বললেন, “আসলে এটি আমাদের বিগত চার পুরুষ ধরে চলে আসা একটি রিচুয়াল বাড়ির বড়ো ছেলের প্রথম পুত্রসন্তানের বয়স তেরো বছর পূর্ণ হলেই তার রাজ্যাভিষেক করা হয়, এমনটাই নিয়ম মুশকিল হচ্ছে আমার মেজো ভাইয়ের আগে সেজো বিয়ে করে নেয় তাই বয়সে বড়ো হওয়া সত্ত্বেও সৌভিকের জায়গায় মৌমিতেরই রাজ্যাভিষেক হচ্ছে
 “কিন্তু এটা খুব বাজে নিয়ম আমি ওদের সবার চেয়ে বড়ো, তাও আমার রাজ্যাভিষেক হল নাদেবাদৃতাদি ছদ্ম রাগ দিয়ে মুখ ভ্যাঙালো মৌমিতকে
সত্যি তো, ভারী অন্যায় হয়েছে দেবু মায়ের সঙ্গে এই ওকে আরও দু-পিস মাটন দাও, তাতে যদি একটু কমপেনসেশন দেওয়া হয়বলেই হো হো হেসে উঠলেন তরুণবাবু
কাকু, তুমি না…” দেবাদৃতাদি লাজুক হেসে বলল
ধূমমামা চিকেনের লেগপিসে একটা জব্বর কামড় দিয়ে বলল, “রাজ্যাভিষেকের রিচুয়ালটা ঠিক কী, সেটা কি জানা যায়?”
নিশ্চয়ই আমাদের দেওয়ানগড়ের জঙ্গলের ভিতর একটি বহু পুরোনো, জাগ্রত কালীমন্দির আছে রাজ্যাভিষেকের দিন হবু রাজাকে সেই মন্দিরেই দুধ দিয়ে অভিষিক্ত করা হয় এবং রাজ্যাভিষেকের পর একটা গোটা রাত, সম্পূর্ণ একা তাকে সেই মন্দিরে কাটাতে হয় আমার মনে হয় মিমো বোধহয় ওটাকেই বেশি ভয় পাচ্ছে
অরুণবাবুর কথা শুনে মৌমিত বলল, “মোটেই নয় কেন বিশুকাকাই তো সেদিন বলল যে গ্রামের লোকেরা নাকি খুনে শেয়ালের ডাক শুনেছে, জঙ্গলে শেয়ালের পায়ের ছাপ দেখেছে! ও বিশুকাকা, তুমিই বলো না
মৌমিতের ডাকে সাড়া দিয়ে বিশুকাকা বলল, “আজ্ঞে কথাটা সত্যি গ্রামের অনেকেই নাকি সেই ডাক শুনেছে, কেউ কেউ পায়ের ছাপও দেখেছে
বেশ ইন্টারেস্টিং তো!ধূমমামা বলল
সৌভিকদা বলল, “ধুস, ওসব গ্রামের লোকেদের গালগল্প, একদম বিশ্বাস করবেন না ঠাকুরদার কাছে শুনেছি এককালে আমাদের দেওয়ানগড়ের জঙ্গলে নাকি নেকড়ে ছিল, শেয়াল, জংলি কুকুরসহ আরও নানান হিংস্র জন্তু ছিল কিন্তু সে বহুযুগ আগের কথা তাই এই খুনে শেয়ালের গল্প একেবারেই বোগাস কথাবার্তাসৌভিক একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল তার কথা শুনে মনে হল, কেউ এই খুনে শেয়ালের কথা বিশ্বাস করুক, তা সে চায় না
ধূমমামা ভাত, ডাল, মাছ সাবাড় করে জাস্ট মাটনে হাত দিয়েছে এক টুকরো মাটন তৃপ্তিভরে মুখে পুরল সে, মনের সুখে চোখ বুজে গেল তার
অসাধারণ স্বাদ এত ভালো মাটন বহুদিন পর খেলামধূমমামা প্রশংসার সুরে বলল
এটা আমাদের বউঠানের ইস্পেশাল রেসিপি বউঠান ছাড়া এমন পাঁঠার মাংস আর কেউ রান্না করতে পারবে নাবিশুকাকা বুক ফুলিয়ে বেশ গর্ব করেই বলল কথাটি
ধূমমামাও সে কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল তারপর অরুণবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “এত সুন্দর জঙ্গল চারিপাশে, আমরা একটু বেরিয়ে আসতে পারি তো?”
অরুণবাবু বললেন, “নিশ্চয়ই তবে শুনলেনই তো, খুনে শেয়াল না থাকলেও, সাপখোপ বিস্তর রয়েছে তাই একটু সাবধানে
তুমি চিন্তা কোরো না জেঠু, আমি ওদের নিয়ে যাবসৌভিকদা আশ্বস্ত করল অরুণবাবুকে
মৌমিত মিছেই ভয় পাচ্ছে, আমার তো মনে হচ্ছে সকলেই বেশ ভালো মানুষ এখানে ক’টা দিন বেশ আনন্দেই কাটবে আমাদের ভাবতে ভাবতে আমিও তখনকার মতো মাটন কষাতেই মন দিলাম

()

আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে দোতলার পিছন দিকের একটি ঘরে ঘরটি বেশ বড়ো আর খোলামেলা একটি প্রকাণ্ড দক্ষিণ খোলা জানলাও রয়েছে ঘরে জানলার সামনে দাঁড়ালে বাড়ির পিছনে অবস্থিত বিস্তীর্ণ জঙ্গল চোখে পড়ে অত সবুজ একসঙ্গে দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় কিন্তু এখন রাত হয়েছে, তাই জানলা দিয়ে তাকালে জঙ্গলটাকে কেমন যেন অন্ধকারের তৈরি বলে মনে হচ্ছে
ঘরের মধ্যে আসবাব বলতে তেমন কিছু নেই, শুধু দুটো সিঙ্গল খাট, চেয়ার-টেবিল আর একটা বেশ পুরানো দিনের কিন্তু শক্তপোক্ত কাঠের আলনা ধূমমামা খাওয়াদাওয়ার পর বেশ জুত করে শুয়েছে বিছানায় ঘুমায়নি, মোবাইলে কীসব খুটখাট করছে
আমি তাকে ঠ্যালা দিয়ে বললাম, “চমৎকার জায়গা, বলো মামা?”
ধূমমামা মোবাইলটা স্ক্রিন-লক করে পাশে রেখে দিয়ে বলল, “অভূতপূর্ব! তবে আমায় টানছে দেওয়ানগড়ের এই ঘন জঙ্গলটা
আচ্ছা মামা, মৌমিত যে বিপদের কথা বলছিল তা নিছক ওর মনের ভুল, তাই না? এখানে তো সকলেই খুব ভালো!”
ভালোর মধ্যেই তো কালো থাকে রে দীপু…” ধূমমামা চোখ টিপল
আর সঙ্গে সঙ্গেই দরজায় টোকা পড়ল আমাদের আমি চট করে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি মৌমিত আর দেবাদৃতাদি দাঁড়িয়ে আছে
এই তো তোরা জেগে আছিস চল আমাদের সঙ্গেমৌমিত বলল
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায়?”
ছাদে আমাদের বাড়ির ছাদে গেলে তুই মুগ্ধ হয়ে যাবি দীপু ধূমমামা তুমিও চলো নামৌমিত ধূমমামার দিকে তাকাল
চলো, তবে দেখেই আসি তোমাদের ছাদটাবলেই মামাও নেমে এল বিছানা থেকে
ঘর থেকে বেরিয়ে, মৌমিতের পিছু পিছু বিশাল করিডোর পেরিয়ে আমরা সিঁড়ির দিকে এগোলাম লম্বা করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ধূমমামা আচমকাই থমকে দাঁড়াল আমি দেখলাম সে দেওয়ালে টাঙানো বিশাল একটা ছবির দিকে চেয়ে আছে ছবিটি যে বেশ অনেকদিন আগে তোলা তা তো দেখেই বোঝা গেল ছবিতে বিভিন্ন বয়সের চারজন পুরুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাদের প্রত্যেকের চোখে মুখে, পোশাকে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট যাই হোক, কম বয়সের ছবি হলেও প্রথম তিনজনকে অনায়াসেই চেনা গেল; অরুণবাবু, বরুণবাবু এবং তরুণবাবু চতুর্থ জনকে চিনতে না পারলেও সেই যে মৌমিতের ছোটো কাকা কিরণ দত্ত চৌধুরী, তা বুঝতে অসুবিধে হল না
এটাই ছোটকার এই বাড়িতে শেষ ছবি এই বয়সেই নাকি সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিলমৌমিত বলল
আমরা আর দাঁড়ালাম না, পা বাড়ালাম ছাদের দিকে

নাহ, মৌমিত যে মিথ্যে বলেনি, তা ছাদে উঠেই বুঝতে পারলাম প্রায় একটা ছোটোখাটো ফুটবল মাঠের মতো ছাদটাকে তিনদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে দেওয়ানগড়ের জঙ্গল, আর একদিকে রয়েছে গোটা দেওয়ানগড় গ্রাম আজকের রাতটা বেশ সুন্দর, নিটোল, মিষ্টি একটা চাঁদ উঠেছে আকাশে মিঠে জ্যোৎস্নায় গোটা ছাদটা যেন ধুয়ে যাচ্ছে
ছাদে গিয়ে দেখি সৌভিকদাও ছাদে পায়চারি করছে আমাদের দেখেই হেসে হাত নাড়ল মৌমিত আর দেবাদৃতাদির পিছু পিছু আমরা এগিয়ে গেলাম ওর দিকে
খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে আড্ডা মারতে আসাটা আমাদের ভাইবোনদের একটা রিচুয়াল বলতে পারেনসৌভিকদা একগাল হেসে বলল
ধূমমামাও পালটা হেসে বলল, “অনেকটা ওই রাজ্যাভিষেকের মতো ব্যাপার বলো?”
যা বলেছেন আসলে আমার এইসব আদ্যিকালের নিয়মকানুন জাস্ট বোগাস মনে হয় আমি তো দীপু আর দেবুদিকে রোজ বলি আজ এই টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে দাঁড়িয়ে এসব নিয়মকানুন বয়ে বেড়ানোর কোনো মানেই হয় না
আচ্ছা, যদি কিছু মনে না করো একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
আরে বলুন না, এত সংকোচ করবেন না
এই যে দীপুর রাজ্যাভিষেক হবে, ফলস্বরূপ সম্পত্তির ভাগ কি ও কিঞ্চিৎ বেশি পাবে?”
হ্যাঁ যার রাজ্যাভিষেক হয় তার নামে সম্পত্তির পঞ্চাশ শতাংশ লিখে দেওয়া হয় বাকি পঞ্চাশ বাকিদের মধ্যে ভাগ করা হয় আগে যদিও এই নিয়ম ছিল না আগে যার রাজ্যাভিষেক হত, সম্পত্তি পুরোটাই তার নামেই লিখে দেওয়া হত কিন্তু প্রায় দুই পুরুষ আগে থেকে ব্যাপারটাতে একটু ফেয়ার প্লে আনার জন্য এই নতুন নিয়ম আনা হয়
এই বড়দা, তুই রাগ করছিস আমি বেশি সম্পত্তি পাব বলে? চিন্তা করিস না, আমি তোকে আমার থেকেও অর্ধেক দিয়ে দেবমৌমিত বলল
দেবাদৃতাদি মৌমিতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তবে রে পাকা বুড়ো, আর তোর দেবুদিকে কিছু দিবি না? শুধু বড়দাকেই দিবি?”
আচ্ছা দেবুদি, তোকেও অর্ধেক দিয়ে দেব এমনিতেই যা চাই তোরা আমায় কিনে দিস, আমি আর সম্পত্তি নিয়ে কী করব
সৌভিকদা দেখি মৌমিতের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল
ধূমমামা এতক্ষণ চুপ করে ওদের কথা শুনছিল; এবার বলল, “আচ্ছা যে মন্দিরে রাজ্যাভিষেকের রিচুয়ালটি হবে, সেটা কি একবার দেখা যায়?”
নিশ্চয়ই কাল তো যাচ্ছিই জঙ্গল বেড়াতে, তখন নিয়ে যাব আপনাদের
তথাস্তু…” ধূমমামা ঘাড় নাড়ল আর ঠিক তক্ষুনি দূরে, জঙ্গলের মধ্যে একটা শেয়াল তারস্বরে ডেকে উঠল কেমন যেন অলক্ষুণে সেই ডাক মনটা তৎক্ষনাৎ অজানা এক আশঙ্কায় ভরে উঠল! তবে কি দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়াল সত্যিই ফিরে এসেছে? আমি কৌতূহলী চোখে তাকালাম সৌভিকদার দিকে
সৌভিকদা হেসে বলল, “খুনে নয়, সাধারণ শেয়াল এখনও কয়েকটা রয়েছে জঙ্গলে, কাল চোখেও পড়ে যেতে পারে
সৌভিকদা আশ্বস্ত করল বটে, কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারলাম কি! ধূমমামার দিকে তাকিয়ে দেখি সে নিবিড় ভাবে তাকিয়ে আছে দেওয়ানগড়ের ঘন জঙ্গলের দিকে মুখ দেখে বিন্দুমাত্র বোঝা গেল না কী ভাবছে

()

জঙ্গলটি দূর থেকে যতটা ঘন বলে মনে হয়, ভিতরে এলে ততটা ঘন মনে হয় না বেশ হেঁটেচলে বেড়ানো যায় যদিও জায়গা বিশেষে জঙ্গল বেশ গহিন হয়ে ওঠে, কিন্তু তাতেও বড়ো একটা অসুবিধা হয় না
সকাল থেকে দিনটা বেশ নিরামিষই কেটেছিল আমাদের ভোরবেলায় ঘুম ভেঙেছিল সৌভিকদার গানের রেওয়াজ শুনে তারপর ঘুম থেকে উঠে মুখ-টুখ ধুয়ে লুচি, আলুর-দম আর মিষ্টি সহযোগে জলখাবার সেরে নিলাম আমরা
জলখাবারের পালা মিটতেই বাড়ির বড়োরা সবাই কাজেকর্মে বেরিয়ে গেছিল দেবাদৃতাদি নিজের ঘরে বসে রিসার্চ রিলেটেড কিছু কাজ করছিল সৌভিকদাও বোলপুর গেল, বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাসে নাকি কিছু কাজ আছে ওর তারপর আমি, ধূমমামা মিলে মৌমিতের সঙ্গে বাড়ির চারিপাশটা ঘুরে দেখলাম বাড়ির পাশেই একটি বিশাল বড়ো পুকুর আছে, তার বাঁধানো ঘাটে বসে বেশ অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম আমরা
এখন সময় বিকেল সাড়ে তিনটে বেশ খটখটে রোদ রয়েছে আকাশে, কিন্তু জঙ্গলের ভিতর খুব একটা গরম লাগে না আমরা শুকনো লতাপাতা মড়মড় শব্দে মাড়িয়ে এগিয়ে চলেছিলাম সামনের দিকে আমরা বলতে আমি, ধূমমামা, মৌমিত, দেবাদৃতাদি আর সৌভিকদা সৌভিকদাই সবার আগে আগে হাঁটছে, আমরা সবাই ওকেই অনুসরণ করে হাঁটছি আমাদের প্রত্যেকের পায়েই গামবুট, সাপখোপ বা বিষাক্ত পোকামাকড়ের কবল থেকে বাঁচার জন্য
জঙ্গলের যত অন্দরে প্রবেশ করছি জঙ্গল আস্তে আস্তে কিঞ্চিৎ ঘন হচ্ছে চারিদিকে নানান প্রজাতির, নানান ধরনের গাছ আম, জাম, পেয়ারা, কাঁঠাল, জামরুল, সুপুরি, অর্জুন, শালপ্রভৃতি অনেক গাছই জঙ্গলে রয়েছে কিছু কিছু আমি নিজেই চিনেছি, বাকিগুলো ধূমমামা আর সৌভিকদা মিলে বুঝিয়ে দিয়েছে
আরও খানিকটা এগোতেই বিকেলের ফিকে হয়ে আসা আলোয়, গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে একটি বেশ পুরানো মন্দিরের চূড়া চোখে পড়ল সৌভিকদা বলল, “ওই হল আমাদের মন্দিরবলেই দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল মন্দিরের দিকে
মৌমিত আমার কাঁধে একটা টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ওই মন্দিরেই আমায় একটা গোটা রাত কাটাতে হবে আর তখন যদি ওই খুনে শেয়ালটা চলে আসে?”
আমি মৌমিতের কথা শুনে হেসে বললাম, “ধুস, তোর বড়দা তো বলল যে ওসব গুজব ছাড়া আর কিছুই নয় তাছাড়া মন্দিরের ভিতরে হয়তো তোকে একা থাকতে হবে, বাইরে মনে হয় পাহারার ব্যবস্থা থাকবে
আমি ওর আশঙ্কাটিকে তেমন পাত্তা দিলাম না দেখে সে কেমন যেন দমে গেল
ইতিমধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মন্দিরের সম্মুখে লাল রঙের মন্দিরটির দেয়ালে কয়েক জায়গায় চুন বালি খসে ইট-পাথরের দাঁতকপাটি বেরিয়ে এসেছে, ফাটলও ধরেছে এদিক-সেদিক মন্দিরটি যে প্রাচীন তা এর বাহ্যিক অবস্থা দেখেই বোঝা যায় কিন্তু এও বোঝা যায় যে মন্দিরটি পুরানো হলেও পরিত্যক্ত নয়
এটি আমাদের পারিবারিক কালীমন্দির প্রায় আড়াইশো বছরের পুরানোসৌভিকদা বলল
মন্দিরের দরজাটি বন্ধ কেন?” ধূমমামা জিজ্ঞেস করল
আসলে এই মন্দিরটি নিয়মিত পুজো-আচ্চা করার জন্য নয় এটি পঞ্জিকা অনুসারে কিছু বিশেষ তিথিতেই খোলা হয় এবং তখনই মায়ের পুজো করা হয় মিমোর রাজ্যাভিষেকের দিন মন্দির আবার খোলা হবেসৌভিকদা বলল
ভাই, চল এবার ফেরা যাক সন্ধে নামল বলে, অন্ধকারে জঙ্গলে না থাকাই ভালোদেবাদৃতাদি, সৌভিকদাকে উদ্দেশ্য করে বলল
সৌভিকদা উত্তরে কিছু একটা বলতে যাবে, তখনই শোনা গেল সেই ভয়ানক ডাক সেই অলক্ষুণে খুনে শেয়ালের ডাক গাটা ছমছম করে উঠল আমার মৌমিতও ভয় পেয়ে আমার হাতটা চেপে ধরল ধূমমামা দেখলাম কান খাড়া করে শুনল শব্দটা তারপর বলল, “শব্দটা খুব কাছ থেকেই এল বলে মনে হচ্ছে চলো তো দেখিবলেই সে ছুটল মন্দিরের পিছনদিকে আমরাও মামার পেছন পেছন এগোলাম দ্রুত পায়ে
মন্দিরের পিছনদিকে ঝোপঝাড়ের পরিমাণ বেশি জঙ্গলটাও কেমন যেন এলোমেলো সেখানে পৌঁছাতেইঠাঁইকরে একটা গুলির শব্দ হল শব্দটা এত কাছ থেকে শুনে আমার বুকটা কেমন যেন ধড়াস ধড়াস করে উঠল মন্দিরের আশেপাশের এই ঘন জঙ্গল, গাছপালার মধ্যে যদি কোনো আততায়ী লুকিয়েও থাকে, তাকে দেখতে পাওয়ার জো নেই তবুও দেখি ধূমমামার চোখজোড়া এদিক-সেদিক কী যেন একটা খুঁজছে আকাশের কমলা আভা এবার ধীরে ধীরে নিভে আসছে জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে যেন একটা আলোছায়ার কারসাজি চলছে
আর সেই আলোছায়া-আঁধারের মধ্যেই দেখলাম মন্দিরের ঠিক পাশে, জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের পাতা নড়ছে একজোড়া পায়ের শুকনো পাতার উপর দিয়ে হেঁটে আসার মড়মড় শব্দও আসছে কানে ধূমমামা আমাদের সকলকে আড়াল করে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল আর তখুনি ঝোপের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এলেন এক সুপুরুষ ব্যক্তি বয়স আন্দাজ পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ, প্রায় ছ-ফুট লম্বা, গায়ের রং ফরসাই, তবে এখন রোদে পুড়ে তামাটে লাগছে পরনে খাকি রঙের প্যান্ট এবং শার্ট, মাথায় গাঢ় সবুজ রঙের হ্যাট, কোমরে গোঁজা কালো অস্ত্রটাও চোখ এড়ালো না আমার তবে সবচেয়ে বেশি চোখ আটকাল লোকটার চোখ দুটোতেই অমন সবুজাভ চোখ আমি আগে কারোর দেখিনি
ধূমমামাকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটি এবার মুচকি হাসল তখনই সৌভিকদা এগিয়ে এসে বলল, “ধূমকেতুবাবু, আলাপ করিয়ে দিই, উনি হলে বিজয়নাথ তাম্বে বনদপ্তরের কর্মী গ্রামবাসীদের মুখে খুনে শেয়ালের গুজব শুনে খোঁজখবর করতে এসেছেন একটু দূরে, সার্কিট হাউসে উঠেছেন উনি আর বিজয়বাবু, উনি হলেন ধূমকেতু বসু, আমার জ্যাঠতুতো ভাইয়ের বন্ধুর মামা
হ্যালোমিস্টার বোস?” বিজয়নাথবাবু করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন
ধূমমামা করমর্দন সেরে বলল, “তাম্বে? মারাঠি?”
বর্ন ইন মুম্বাই, বাট বড়ো হয়েছি শ্রীরামপুরে তাই আমাকে বাঙালিও বলতে পারেনবিজয়নাথ তাম্বে বললেন
গুলিটা আশা করি আপনিই চালালেন এইমাত্র?”
হ্যাঁ আমিই আসলে জন্তুটার শব্দ শুনে মনে হল কাছাকাছিই কোথাও আছে তাই ওটাকে তাড়ানোর জন্যেই ফাঁকা গুলির আওয়াজ করলাম
তাহলে আপনি মানছেন যে খুনে শেয়াল নামক সেই জন্তু এই জঙ্গলে রয়েছে?”
এখনই সে কথা হলফ করে বলছি না, তবে খোঁজ চলছে
বিজয়নাথ তাম্বের মুখে স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণ শুনে বেশ অবাক হলাম যদিও এখন অনেক বিদেশিরাও স্পষ্ট বাংলা বলতে পারেন, কিন্তু তাদের উচ্চারণে একটা অন্য ভাষার টান থাকে, বিজয়নাথ তাম্বের সেসব কিছুই নেই বুঝলাম যে খুব ছোটো বয়স থেকেই তিনি বাংলায় আছেন
কী মনে হয়, খোঁজ পাবেন?” ধূমমামা শুধোলো
খুনে শেয়ালের কথা বলছেন? দেখিতবে মাঝেমধ্যে ডাক শুনেছি মানে খুনে শেয়ালেরই যে ডাক তা বলছি না; তবে ডাকটি যে অন্যান্য শেয়ালের চেয়ে একটু আলাদা, তাতে সন্দেহ নেই
বুঝলামধূমমামা ঘাড় নাড়ল
সন্ধে তো হয়েই এল, আপনি কি এখনও জঙ্গলে ঘুরবেন নাকি?” সৌভিকদা জিজ্ঞেস করল
বিজয়নাথ তাম্বে বললেন, “আমি সেই দুপুর থেকেই জঙ্গলে ঘুরছি, এখন সার্কিট হাউসে ফিরব আপনারা?”
আমরাও বাড়ির দিকেই এগোচ্ছি আপনিও চলুন না আমাদের সঙ্গে? চা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া যাবে
আজ একটু অন্য কাজ আছে আরেকদিন যাবো চলিবিজয়নাথ দ্রুত পায়ে আবারও জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হলেন

()

কী রে, আর তিনদিন পরে তোর রাজ্যাভিষেক! ভয় করছে?” দেবাদৃতাদি জিজ্ঞেস করল মৌমিতকে
মৌমিত আলতো চোখ টিপে বলল, “আগে করছিল, ধূমমামারা আসার পর এখন আর করছে না
মৌমিতের কথা শুনে ধূমমামা মুচকি হেসে মৌমিতের পিঠ চাপড়ে দিল জঙ্গল থেকে ফিরে আমরা সকলে ছাদে এসে বসেছি সঙ্গে রয়েছে কফি আর ফিশ ফিঙ্গার সন্ধের পর থেকেই গরমটা একটু কমেছে একটা সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া বইছে
কী ভালো ওয়েদার! এই ভাই, একটা গান ধর নাদেবাদৃতাদি সৌভিকদার কাছে আবদার করল
এখন আবার গানের কী দরকার!” সৌভিকদা লাজুক স্বরে বলল
তোমার গলা কিন্তু দারুণ সকালেই শুনেছি আমরাধূমমামা বলল
মৌমিতও সকলের তালে তাল মিলিয়ে বলল, “গা না বড়দা একটা গান
অগত্যা সকলের জোরাজুরিতে সৌভিকদা গান ধরল
‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
       বসন্তের এই মাতাল সমীরণে
যাব না গো যাব না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে -
      এই নিরালায় রব আপন কোণে
            যাব না এই মাতাল সমীরণে

সৌভিকদার গান শেষ হতেই আমরা সকলে হাততালি দিয়ে উঠলাম ধূমমামা আরও একপিস ফিশফিঙ্গার হাতে তুলে নিয়ে বলল, “চমৎকার! দারুণ তোমার গলায় তো স্বয়ং মা সরস্বতীর বাস বাড়িতে আর কেউ গানের চর্চা করে নাকি?”
সৌভিকদা বলল, “নাহ তবে জেঠুর কাছে শুনেছি, ছোটকা নাকি খুব ভালো গান গাইত
গান তার মানে তোমার জিনেই রয়েছে তা তোমার এই ছোটকা কেন বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিল তোমরা কেউ জানো?” ধূমমামা প্রশ্ন করল
আমি বাবার কাছে শুনেছি যে, ছোটকা নাকি এই বাড়ির রীতিনীতি মেনে নিতে চায়নি সে চেয়েছিল যাতে সম্পত্তি চার ভাইয়ের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়, কিন্তু বাবা শোনেনি বাবা বলেছিল যে পূর্বপুরুষদের তৈরি করে যাওয়া নিয়ম সকলকে মানতেই হবে তখনই রাগের মাথায় ছোটকা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়দেবাদৃতাদি একটানা বলে থামল
দেবাদৃতাদির কথা শুনে ধূমমামা কী যেন একটা ভাবল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “আচ্ছা এই দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়ালের যে কিংবদন্তি রয়েছে, সেটা একটু ডিটেইলে বলতে পারবে?”
ওটা ওদের চেয়ে ভালো আমি বলতে পারবএকটা ভারী কণ্ঠস্বর শুনে ছাদের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি, মৌমিতের সেজোকাকা অর্থাৎ সৌভিকদার বাবা, তরুণবাবু ছাদে এসে দাঁড়িয়েছেন আমরা তাকাতেই উনি একগাল হেসে এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে আমরা সকলে একটা বিশাল শতরঞ্চি পেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসেছিলাম, তরুণবাবু এসে ধূমমামার ঠিক মুখোমুখি বসলেনআজ থেকে প্রায় একশো বছর আগের ঘটনা তখন আমার ঊর্দ্ধতন পূর্বপুরুষ কালীকিঙ্কর দত্ত চৌধুরী দেওয়ানগড়ের জমিদার সেই সময় দেওয়ানগড়ের জঙ্গল ছিল আরও ঘন, হিংস্র পশুও ছিল অনেক কিন্তু অসুবিধে শুরু হল একটি শেয়ালের জঙ্গলে আবির্ভাবের পর থেকে জন্তুটা একবার একটি বাচ্চা তুলে নিয়ে গেল, তারপর থেকেই গ্রামে রটে গেল যে শেয়ালটা নাকি মানুষখেকো কেউ কেউ এও বলল যে সেই শেয়াল নাকি মায়াবী যারা নিজের চোখে দেখেছিল, তারা বলত, সেই শেয়াল নাকি সাধারণ শেয়ালের চেয়ে আকারে অনেক বড়ো এরপর জঙ্গলে মানুষের উপর শেয়ালটির আক্রমণ বাড়ল তখন গ্রামের লোকজন জমিদার কালীকিঙ্কর দত্ত চৌধুরীর কাছে সাহায্য চাইল কালীকিঙ্কর সাহসী ছিলেন, শিকারেও নাম করেছিলেন বেশ তাই খবর পেয়েই তিনি বন্দুক হাতে, দলবল নিয়ে জঙ্গলে ছুটলেন জঙ্গলে মাচা বাঁধা হল, টোপ ফেলা হল এবং ফলস্বরূপ মধ্যরাতে শেয়ালের দেখা মিলল নিখুঁত নিশানায় গুলিও ছুড়লেন কালীকিঙ্কর সবাই দেখল যে গুলিটা সোজা গিয়ে শেয়ালটির পেটে বিঁধল কিন্তু শেয়ালটা মোটেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল না, বরং একলাফে গহিন জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলএকটানা বলে থামলেন তরুণবাবু
তারপর কী হল?” আমি কৌতূহলী হয়ে তাকালাম ওঁর দিকে
তরুণবাবু বললেন, “তারপর জঙ্গলে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই খুনে শেয়ালের কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না সবাই ভাবল বোধহয় জঙ্গলের ভিতর, অনেক দূরে কোথাও গিয়ে মরেছে জন্তুটা কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই নাকি মাঝরাতে একটি বিশালাকৃতি শেয়ালের অবয়ব জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেতে লাগল সবাই বলল সেই শেয়াল নাকি মরে না, ওটার নাকি মৃত্যু নেই কিংবদন্তি আছে যে সেই খুনে শেয়াল নাকি শিকারের খোঁজে আজও জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় যদিও এই কিংবদন্তি এতদিন যাবত নিছক একটা গল্প হিসেবেই গ্রামে প্রচলিত ছিল, তবে ইদানীং নাকি জঙ্গলে আবার সেই শেয়াল ফিরে এসেছে গ্রামবাসীদের অনেকেই তাঁর আভাস অনুভব করেছে তাই তো বনদপ্তর থেকেই ওই বিজয়নাথ এসে ডেরা বেঁধেছে জঙ্গলেশেষ কথাটি বলার সময় তরুণবাবুর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল
উনি যে এমন অসাধারণ গল্প বলিয়ে জানা ছিল না গল্পটা গোগ্রাসে গিললাম আমি মিথ্যে বলব না, শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল আমার
ধূমমামা বলল, “ভীষণ ইন্টারেস্টিং কোনো রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কম কিছু নয় এই খুনে শেয়ালের একবার দেখা পেলে মন্দ হত নাকথাটি বলেই মামা চোখ টিপল
ধূমমামার দেখছি গল্পটি শুনে বেশ ফুর্তি হয়েছে, কিন্তু আমার একেবারেই হচ্ছে না আর দিন তিনেক পর মৌমিতের রাজ্যাভিষেক সত্যি সত্যি কোনো খুনে শেয়ালের কবলে পড়বে না তো ও? একটা অজানা আশঙ্কায় মনটা আচমকাই কেমন যেন ঢিপঢিপ করে উঠল আমার

()

ধূমমামার ডাকে ঘুম থেকে উঠে বসলাম ঘরের মধ্যে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার অনর্গল ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে বুঝলাম সময়টা মধ্যরাত্রি কিন্তু এই অসময়ে ধূমমামা আমায় ডেকে তুলল কেন! আমি বারদুয়েক চোখ কচলে ধূমমামার দিকে তাকালাম সে দেখি মোবাইলের টর্চ জ্বেলে বারবার জানলা দিয়ে কী যেন দেখছে
আমি জড়ানো গলায় বললাম, “কী ব্যাপার?”
একটু রাত্রি ভ্রমণে বেরোবি নাকি?” ধূমমামা ভুরু নাচিয়ে বলল
কোথায়?”
জঙ্গলে
এত রাতে জঙ্গলে? কোনো বিপদ হয় যদি?”
এই সাহস নিয়ে তুই গোয়েন্দার শাগরেদ হবি? ছো…”
আঁতে ঘা লাগল আমার এক লাফে খাট থেকে নেমে বললাম, “চলো কোথায় যেতে হবে আমি রেডি
মোবাইলের টর্চের আলোতেই দেখলাম ধূমমামার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটেছে আমরা খুব সন্তর্পণে সিঁড়ি বেয়ে একতলায় নেমে এলাম তারপর পা টিপে টিপে এগোলাম সদর দরজার দিকে দরজাটি ভেজানোই ছিল আলতো ঠেলে খানিক ফাঁক করে মামা-ভাগনেতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়লাম
সদর দরজাটা খোলা কেন? আমরা ছাড়াও কি অন্য কেউ বেরিয়েছে বাইরে?” আমি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
বাহ তোর ঘটে বুদ্ধি খুলেছে দেখছি
ধূমমামা আমার প্রশংসা করল না অপমান বুঝলাম না জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা কে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে?”
জানি না এই ভ্যাপসা গরমেও চাদর মুড়ি দিয়ে ছিল
কথা বলতে বলতেই ধূমমামা বাড়ির পিছন দিকে হাঁটতে লাগল মেইন গেটে দারোয়ান থাকে পিছনের ছোটো গেটটা ফাঁকাই থাকে আমরা যে সেদিকেই এগোচ্ছি তাতে সন্দেহ নেই
পিছনের গেট দিয়ে বাড়ির চত্বরের বাইরে বেরিয়ে সোজা জঙ্গলের দিকে হাঁটা দিলাম আমরা বেরোনোর আগে আমাদের যে গামবুট জোড়া দেওয়া হয়েছিল সেগুলো পরে নিয়েছি ধূমমামা টর্চের আলো ফেলে আমায় পথ দেখাচ্ছে
এই ধূমমামা, তুমি যে বড়ো আলো জ্বেলে রেখেছকেউ দেখে ফেললে?”
চেনা কেউ দেখে ফেললে বলবি আমরা লেকের ধারে যাচ্ছি সূর্যোদয় দেখতে
এখানে আবার লেক কোথায়?”
আছে আছে জঙ্গলের মধ্যেই আছে নইলে খুনে শেয়ালটা জল খাবে কোথা থেকে?”
তার মানে খুনে শেয়াল সত্যিই আছে?”
তা বলছি না তবে যদি থেকে থাকে তবে ওই জলাশয়ের ধারে নিশ্চয়ই আসে জল খেতে
আমরা কি এখন সেদিকেই যাচ্ছি?”
হুম
নীচু গলায় কথা বলতে বলতে আমরা ধীরে ধীরে জঙ্গলের অন্দরে প্রবেশ করলাম রাতের অন্ধকারে এই দেওয়ানগড়ের জঙ্গলটাকেও চাঁদের পাহাড়ের আফ্রিকার জঙ্গল বলে মনে হচ্ছে শুধু সেখানে ছিল বুনিপ আর এখানে খুনে শেয়াল আমরা পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছিলাম সামনের দিকে ঝিঁঝিঁ পোকাদের সম্মিলিত কোরাস রাতের নীরবতাকে যেন আরও বাড়িয়ে তুলছে
আচমকা কাছেই কোথাও একটা তক্ষক ডেকে উঠল বুকের ভিতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল আমার এ কি কোনো অশুভ কিছুর লক্ষণ!
সেদিন সৌভিকদার সঙ্গে মন্দির দেখতে জঙ্গলের যেদিকটায় গেছিলাম আজ যে সেদিকে যাচ্ছি না তা রাতের অন্ধকারেও বেশ বুঝতে পারলাম গাছগাছালি, ঝোপঝাড় ভেদ করে আরও কিছুদূর এগোতেই দেখলাম লেকটাকে
দিন দুয়েক পরেই অমাবস্যা, চাঁদের আলো কমে এসেছে তবুও নিভে যাওয়া চাঁদের স্বল্প আলোতেই জলাশয়টি কেমন যেন চকচক করছে জলাশয়ের কাছাকাছি পৌঁছোতেই ধূমমামা থমকে দাঁড়াল তারপর উবু হয়ে বসে ঝুঁকে মাটিতে কী যেন দেখতে লাগল
দীপু এদিকে দেখে যা…”
ধূমমামার ডাকে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম
এখানে দেখধূমমামা মাটিতে একটি বিশেষ জায়গায় টর্চের আলো ফেলে বলল
আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখি একটি পায়ের ছাপ মানুষের নয়, কোনো এক বিশালাকৃতি জন্তুর পায়ের ছাপ
মামা, খুনে শেয়াল…” ধূমমামা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আমায় চুপ করতে বলল তারপর কান পেতে কী যেন একটা শোনার চেষ্টা করল অনেক দূর থেকে একটা পশুর চাপা গর্জনের শব্দ ভেসে আসছে কানে পরক্ষণেই শোনা গেল সেই বিকট শেয়ালের ডাক
চল ফেরা যাক এখানে থাকা আর ঠিক হবে না
ধূমমামার কথামতোই আমরা ফেরার পথ ধরলাম

(১০)

মৌমিতের ডাকাডাকিতে ঘুমটা ভেঙে গেল ভোররাতে জঙ্গল থেকে ফেরার পর মামা ভাগনেতে আর কোনো কথা হয়নি দুজনেই চুপচাপ শুয়ে পড়েছিলাম ভেবেছিলাম আজ একটু দেরি করেই বিছানা ছাড়ব, কিন্তু সে গুড়ে বালি মৌমিত যা জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে তাতে আর শুয়ে থাকা যায় না একটা মস্ত আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলাম পাশের বিছানায় ধূমমামাও ততক্ষণে উঠে বসেছে ঘড়িতে সময় সকাল সাতটা আমি বিছানা থেকে নেমে টলমল পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললাম দরজা খুলতেই মৌমিত হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল
ধূমমামা, কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে
কেন? কী হল আবার?”
ওই যে বনদপ্তরের কর্মী বিজয়নাথ, তাকে খুনে শেয়াল টেনে নিয়ে গেছে
সে কী! কখন?”
রাতেই হবে হয়তো লোকটার ব্যাগ, জুতো জঙ্গলে পাওয়া গেছে ঝোপের মধ্যে জামার ছেঁড়া টুকরোও পেয়েছে কয়েকজন গ্রামবাসী
হুম ব্যাপারটা একটু ফিশি লাগছে থানায় খবর দেওয়া হয়েছে?”
হয়েছে বনদপ্তরেও
গুড ঠিক আছে তুমি নীচে যাও, আমরা দশ মিনিটে রেডি হয়ে আসছি
মৌমিত চলে যেতেই বললাম, “জানো মামা, একটা কথা তোমায় বলব বলব করেও বলা হয়নি তুমি বিজয়নাথবাবুর চোখের রং-টা দেখেছিলে? চোখের অমন রং আমি আর কারোর দেখিনি
আমি দেখেছি কোথায় দেখেছি তাও মনে আছে কিন্তু যা দেখেছি তা আদৌ ঠিক দেখেছি কিনা সেটা জানার কোনো উপায় আপাতত নেই
ধূমমামা যে মাঝেমধ্যে কী হেঁয়ালি করে কিছুই বুঝতে পারি না
আমরা ঝটপট রেডি হয়ে নীচে নেমে এলাম বাড়ির গেটের সামনে সৌভিকদা, মৌমিত আর অরুণবাবু দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের দেখেই হাত নেড়ে ডাকলেন আমরা এগিয়ে যেতেই সৌভিকদা বলল, “আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম পুলিশ ইতিমধ্যেই জঙ্গলে প্রবেশ করেছে তাছাড়া বনদপ্তর থেকে দুজন এসেছেন, পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে দেখার জন্য আমরা সেদিকেই যাচ্ছি আপনারাও আসছেন তো?”
নিশ্চয়ই চলুনধূমমামা বলল
আমরা সকলেই একটি হুড খোলা জিপে উঠে বসলাম ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করতেই আমরা হেলতে দুলতে এগিয়ে চললাম জঙ্গলের দিকে
জঙ্গলের কিছুটা অন্দরে প্রবেশ করতেই লোকজনের কোলাহলের শব্দ কানে এল আরেকটু এগোতেই দেখি গাঁয়ের লোকজন দলবেঁধে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তাদের প্রত্যেকের চোখেমুখেই আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট আমরা ক্রমশ এগিয়ে চলেছিলাম গত রাতের সেই বিশাল লেকটার দিকে
লেকের কাছাকাছি পৌঁছাতেই পুলিশের গাড়িও চোখে পড়ল পুলিশের গাড়িটির কাছাকাছি গিয়ে থামল আমাদের জিপটা আমরা জিপ থেকে নামতেই লেকের ধার থেকে দুজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে
হ্যালো অরুণবাবু ভালো আছেন?” দুজনের অফিসারের মধ্যে যিনি একটু বয়স্ক, তিনিই কথা শুরু করলেন
ভালো থাকার কি উপায় আছে দারোগাবাবু? আগামীকাল মন্দিরে আমাদের ফ্যামিলি রিচুয়াল, তার আগেই এসব কী ঘটে গেলঅরুণবাবু বললেন
আপনাদের ফ্যামিলি রিচুয়ালটা একটু পিছিয়ে দিন অরুণবাবু এখন জঙ্গলে ওসব করা যাবে না
সে কী করে হয়! এটা কি আজকের নিয়ম নাকি? আপনারা যা করার করুন, পাহারা-টাহারা বসানোর হলে বসান কিন্তু রিচুয়াল কালই হবেঅরুণবাবুর চোয়াল শক্ত করে বললেন
অরুণবাবুর কথা শুনে দারোগাবাবুর মুখটা কেমন যেন তেতো হয়ে গেল তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, আপনারা যা ইচ্ছে করুন তবে আপনি পাহারা বললেই তো আর আমি গোটা পুলিশ ফোর্স জঙ্গলে পাঠিয়ে দিতে পারি না বড়োজোর দুজন কনস্টেবল বসাতে পারি জঙ্গলের দু-দিকে
ধূমমামা এবার দারোগাবাবুর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “নমস্কার আমার নাম ধূমকেতু বসু আমি এবং আমার ভাগনে জমিদারবাড়ির অতিথি একটা রিকোয়েস্ট ছিল আপনার কাছে…”
বলুনদারোগা গম্ভীর স্বরে বললেন
ধূমমামা বলল, “পারলে দুজন কনস্টেবলের মধ্যে একজনকে এই লেকের ধারে আর অন্যজনকে মন্দিরের সামনে পাহারায় রাখবেন
হুম আমিও সেটাই ভাবছিলাম যাই হোক, থ্যাঙ্কিউ ফর ইওর সাজেশন
ধন্যবাদ যাই হোক, জলজ্যান্ত লোকটাকে জন্তুটা কোনদিকে নিয়ে গেছে কিছু কি ঠাওর করতে পারলেন?”
কাজটা যে কোনো জন্তুর এমনটা হলফ করে বলার মতো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি শুধু বিজয়নাথের রক্তমাখা জামার টুকরো আর তার জুতোজোড়া জঙ্গলে পাওয়া গেছে তাছাড়া যে জন্তুর গুজব রটেছে তার কয়েকটি পায়ের ছাপ এই লেকের ধারেই শুধু পাওয়া গেছে, জঙ্গলের অন্যত্র আর কোথাও পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি
সে তো গরমে মাটি খটখটে শুকনো হয়ে গেছে, সেখানে আর পায়ের ছাপ পড়বে কী করে?” অরুণবাবু বললেন
কিন্তু লেকের ধারের মাটি তুলনামূলক নরমতাই কী পায়ের ছাপ শুধু সেখানেই পড়েছে?” ধূমমামা স্বগতোক্তি করল তারপর আবার ফিসফিসিয়ে বলল, “আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল অফিসার তবে কথাটি একটু আড়ালে বলতে চাইবলেই ধূমমামা দারোগাবাবুর সঙ্গে কিছুটা তফাতে গিয়ে দাঁড়াল তারপর কীসব কথাবার্তা বলতে লাগল কিন্তু ঘোড়ার মাথা দূর থেকে সেসব কিছুই বোঝা গেল না
কিছুক্ষণ পর ধূমমামা ফিরে এল অরুণবাবু সম্ভবত টেনশনেই একটা সিগারেট ধরালেন ধূমমামা বলল, “আপনারা এখন বাড়ির দিকেই যাবেন তো?”
অরুণবাবু সিগেরেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ এখানে আর কীই বা করার আছে!”
ঠিক আছে আপনারা জিপে এগোন, আমি আর দীপু হেঁটে ফিরছি
সে কী! খামোখা হেঁটে ফিরবেন কেন?”
তেমন কিছু না আসলে আমি আবার একটু রহস্য-গোয়েন্দা উপন্যাসের ভক্ত এমন একটা রহস্যময় ঘটনা এখানে ঘটল, তাই ভাবলাম একটু হাঁটতে হাঁটতে, এদিকসেদিক দেখতে দেখতে ফিরি অকস্মাৎ যদি কোনো ক্লু চোখে পড়ে যায়…”
ধূমমামার কথা শুনে অরুণবাবু একরকম তাচ্ছিল্যের হাসিই হাসলেন তারপর, “অ্যাজ ইওর উইশ!” বলে জিপের দিকে এগোলেন
সৌভিকদা বলল, “বেশি ভিতরে না যাওয়াই ভালো ধূমকেতুবাবু সাবধানে থাকবেন
মৌমিত ফ্যাকাশে মুখে বলল, “তাড়াতাড়ি ফিরিস দীপু কাল যে কী হবে জানি না তুই থাকলে একটু কারেজ পাব বুকেবলে সেও সৌভিকদার পিছু পিছু জিপের দিকে হাঁটা দিল
ওরা জিপে চড়ে চলে যেতেই দেখি ধূমমামা গুটিগুটি পায়ে লেকের দিকে হাঁটতে লাগল তারপর গত রাতে যেখানে আমরা খুনে শেয়ালের পায়ের ছাপ দেখেছিলাম সেখানে গিয়ে দাঁড়াল পায়ের ছাপগুলো এখনও বেশ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে মামা অত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছে সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি, এমন সময় একটি ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলাম
কোনো জন্তুর পায়ের ছাপ অত প্রমিনেন্ট হয় না
পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, একজন বেঁটেখাটো, রোগামতন লোক খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে পোশাক দেখে বুঝলাম যে লোকটি বনদপ্তরের কর্মী কারণ আগের দিন বিজয়নাথ যেমন পোশাক পরেছিলেন ইনিও তেমনটাই পরে আছেন
ধূমমামা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “জন্তুর নয় বলছেন?”
উঁহু আমার অভিজ্ঞতা বলছে অন্য কিছু
কিন্তু গত রাতে আমিও সেই জন্তুর ডাক শুনেছি
চোখে দেখেছেন কী?”
তাহলে বলছেন শোনার ভুল?”
নাহ, তা বলছি না তবে এইসব জমিদার, রাজরাজড়াদের ব্যাপারস্যাপার বড্ড প্যাঁচালো সহজে ধরা যায় না এদের যে কোনটা আসল আর কোনটা নকল, বোঝা দায় বিজয়দাও এই একই কথা বলত
ধন্যবাদ এই ইনফরমেশনটা দরকারি হতে পারে আমি পুলিশকে ব্যাপারটা জানাব বাই দা ওয়ে, আপনার নামটা তো জানা হল না?”
আমার নাম সমীর আমার এক জুনিয়রও এসেছে সঙ্গে সে আপাতত মন্দিরের কাছে রয়েছে
বাহ আলাপ করে ভালো লাগল আমার নাম ধূমকেতু বসু আর এই আমার ভাগনে দীপুধূমমামা আমার কাঁধে হাত রেখে বলল
আপনারা কোনদিকে যাচ্ছেন এখন? আমি মন্দিরের দিকে যাব আমার জুনিয়র অয়নের থেকে রিপোর্ট নিয়ে আমরা ফিরব
আমরাও তো মন্দিরের দিকেই যাচ্ছি চলুন একসঙ্গেই যাওয়া যাক
ধূমমামার কথামতোই আমরা তিনজনে মন্দিরের দিকে মুখ করে হাঁটতে শুরু করলাম দিনের আলোয় গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে মন্দিরের চূড়াটা দেখা যায় তাই পথ হারানোর সম্ভাবনা নেই
আচ্ছা, আপনি তো বলছেন জন্তুর পায়ের ছাপ নাকি ওটা নয় তাহলে বিজয়বাবু গেলেন কোথায়?”
দেখুন এই জঙ্গলে জংলি কুকুরের দল আছে খুব ডেঞ্জারাস যদিও ওরা এতটা বাইরের দিকে আসে না শেয়াল আছে, আর সবচেয়ে বড়ো কথা ওই লেকে গোটা দুয়েক কুমিরও আছে
কুমিরে টেনেছে বলে মনে হয় না সেক্ষেত্রে তার চিহ্ন থাকত স্পটে তাছাড়া বিজয়বাবুকে দেখে আমার বেশ অভিজ্ঞ বলেই মনে হয়েছিল উনি এই পাতি জলাশয়ের কুমিরের কবলে পড়েছেন বলে মনে হয় না
বিজয়দা তো আমারও সিনিয়র এইসব ছোটোখাটো কাজে বিজয়দার মতো সিনিয়র পজিশনের লোককে জেনারেলি পাঠানো হয় না তবে এইবার বিজয়দা নিজে থেকেই এখানে আসতে চেয়েছিল তাই তো ওঁকে পাঠানো হল
স্ট্রেঞ্জ!” ধূমমামা বলল
কথা বলতে বলতেই আমরা মন্দিরের সামনে চলে এলাম মন্দিরের বন্ধ দরজার সামনেই বনদপ্তরের পোশাক পরিহিত আরেকজন দাঁড়িয়েছিলেন ইনি অবশ্য সমীরবাবুর চেয়ে বয়সে ছোটোই হবেন
ওই আমার জুনিয়র দাঁড়িয়ে রয়েছে ওঁর কাজ বোধহয় মিটেছে আমি আজ আসিবলেই সমীরবাবু চলে গেলেন
ওরা চলে যেতেই মামা খুব মনোযোগ দিয়ে মন্দিরের আশেপাশে কী যেন খুঁজতে লাগল কখনও পা দিয়ে শুকনো ঝরা পাতা সরিয়ে কীসব দেখছে, কখনও হাত দিয়ে ঝোপঝাড় সরিয়ে কী একটা খুঁজছে
আমি বললাম, “কী খুঁজছ বলো তো?”
জানি না রে তবে কিছু একটা খুঁজছি, যা অন্ধকারে এক চিলতে আলো দেখাবেধূমমামা বলল
আমি ধূমমামার পাশে পাশেই হাঁটতে হাঁটতে বললাম, “আচ্ছা মামা, কেউ যদি বিজয়নাথবাবুকে কোনোভাবে অজ্ঞান করে লেকের জলে ফেলে দিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পেরেছেন বলে তো মনে হয় না
হুম এই কথাটি যে আমার মাথাতেও আসেনি তা নয় কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন? কেন বিজয়নাথবাবুকে সরিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ল? তবে কি তিনি কোনো গোপন কথা জেনে ফেলেছিলেন?”
মামার কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি আচমকাই কীসে যেন পা আটকে দড়াম করে মাটিতে আছড়ে পড়লাম ধূমমামা ঘটনার আকস্মিকতায় কেমন যেন ভেবলে গেল তারপর তড়িঘড়ি এসে আমায় মাটি থেকে তুলে, জামা-টামা ঝেড়ে দিয়ে বলল, “কী রে, পড়ে গেলি কীভাবে?”
আমি বললাম, “কীসে যেন পা আটকে পড়লাম গো মামা
কই দেখি…” বলেই ধূমমামা যেই না মাটিতে পড়ে থাকা লতাপাতা হাত দিয়ে সরাল, অমনি একটা লম্বা বৈদ্যুতিক তার বেরিয়ে এল ভিতর থেকে ধূমমামা তারটা ধরে টান মারতেই চড়চড় করে তারের বাকি অংশও মাটিতে পড়ে থাকা লতাপাতা ভেদ করে বাইরে দৃশ্যমান হল ভালো করে লক্ষ করতেই দেখলাম যে তারের একটি প্রান্ত সোজা গিয়ে ঢুকেছে মন্দিরে অন্য প্রান্তটি এগিয়েছে জঙ্গলের ভিতর আমরা তারটির গতিপথ অনুসরণ করে কিছুদূর এগোতেই একটি ঝোপের মধ্যে খুঁজে পেলাম একটি বেশ দামি স্পিকার
এই হল গিয়ে খুনে শেয়ালের ওই বিকট এবং ভয়ানক ডাকের উৎস বুঝলি দীপু?” ধূমমামা মুচকি হেসে বলল
কিন্তু এইসব করে কার কী লাভ ধূমমামা? আর বিজয়নাথবাবুই বা গেলেন কোথায়?” আমি অবাক চোখে তাকালাম ধূমমামার দিকে
একটা সুতো পেয়েছি রে দীপু এবার সেটায় টান মেরে দেখতে হবে যে সেটি কতদূর গেছে তবেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে আপাতত এই তারগুলো যেভাবে লুকোনো ছিল, সেভাবেই লুকিয়ে ফেলতে হবে কালপ্রিটকে জানতে দেওয়া যাবে না যে আমরা তার কারচুপি ধরে ফেলেছি
ধূমমামার কথামতোই সমস্ত তার আবার যথাস্থানে লুকিয়ে দিয়ে আমরা ফেরার পথ ধরলাম জঙ্গলের পরিধির দিকে আসতেই গ্রামের লোকেদের একটা জটলা চোখে পড়ল গলার আওয়াজ শুনে মনে হল সেখানে কিছু একটা নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে ধূমমামা দেখি দ্রুত পায়ে সেই জটলার দিকে এগিয়ে গেল আমিও গেলাম তার পিছু পিছু
জটলার কাছাকাছি পৌঁছোতেই দেখি একজন বেশ বয়স্ক লোক, একটি কমবয়সি ছেলেকে বকাঝকা করছেন ছেলেটিকে দেখেই চিনতে পারলাম, এ তো সেই হারান যার ভ্যানে চড়ে আমরা স্টেশন থেকে মৌমিতদের বাড়ি এসেছিলাম
কী ব্যাপার? আপনারা ওকে বকাঝকা করছেন কেন?” ধূমমামা জিজ্ঞেস করল
ধূমমামার অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি তাদের একটু অস্বস্তিতেই ফেলেছেআরে তুমি হারান না? তোমার ভ্যানেই তো এলাম সেদিনধূমমামা হারানের দিকে তাকিয়ে বলল
আর বলবেন না বাবু্ জঙ্গলে খুনে শেয়ালের উপদ্রব বেড়েছে, এই ছেলে দিন নেই রাত নেই জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় আজ শেয়ালটি একটা গোটা মানুষ নিয়ে গেল এই ব্যাটাও তো কোনদিন শেয়ালের পেটে যাবে!” বয়স্ক লোকটি খ্যাড়খেড়ে গলায় বলল
হারান তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে বলল, “আমি মোটেই জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই না সব ফালতু কথাবলেই সে ছুট্টে সেখান থেকে পালিয়ে গেল
বয়স্ক ভদ্রলোক আবার বললেন, “ছেলেটা ভালো বাবু ইস্কুল পাস দিয়েছে শহরে গিয়ে হাতের কাজও শিখেছে
হাতের কাজ মানে?” ধূমমামা ভুরু কুঁচকে তাকাল
আজ্ঞে ইলেকট্রিকের কাজ ভালোই কামাচ্ছিল সেখানে, কিন্তু বাপটার অসুখ করায় ফিরে এসে বাপের ভ্যান টানছে
কথাটি শুনেই আমি বিদ্যুৎবেগে ধূমমামার দিকে তাকালাম দেখলাম মামার ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি ফুটেছে সুতোয় টান মেরে যে আমরা ঠিক দিকেই এগোচ্ছি তাতে কোনো সন্দেহ নেই

(১১)

জঙ্গল থেকে ফিরে ধূমমামা কেমন যেন চুপ মেরে গেল সারাদিন কী যেন একটা ভেবেই চলেছে জিজ্ঞেস করলে শুধু ঘাড় নাড়ে, কিছুই বলে না মাঝে একবার গিয়ে বিশুকাকার সঙ্গে কীসব কথা বলে এল তারপর আবার নিজেই সেই ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ফিরে গেল আমার বিরক্ত লাগছিল পৃথিবীর সব গোয়েন্দাদের এই এক স্বভাব, রহস্যের জট খুলতে শুরু করলেই তাঁরা মৌনব্রত পালনে ব্রতী হয়ে ওঠেন
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে শুয়ে এটা সেটা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, বুঝিনি ঘুমের ঘোরেই অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম দেখলাম, একটি বাদামি রঙের বিশালাকৃতি শেয়ালের পিঠে বসে আছেন বিজয়নাথ তাম্বে তার ঠোঁটে একটি হিন্দি সিনেমার ভিলেন মার্কা হাসি হাসতে হাসতে আচমকাই তিনি শেয়াল ছুটিয়ে তাড়া করতে লাগলেন মৌমিতকে মৌমিত প্রাণভয়ে, পড়ি কি মরি করে ছুটছিল, আর ধূমমামা মৌমিতের অবস্থা দেখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসছিল
স্বপ্নের মধ্যে মামার অমন অট্টহাসি দেখেই বোধহয় ঘুমটা আমার ভেঙে গেল জানলার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দিনের আলো ফুরিয়ে অন্ধকার নেমেছে আর ধূমমামাও দেখি প্যান্ট-শার্ট, বুট পরে একদম ফিটফাট রেডি
চোখজোড়া কচলাতে কচলাতে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
ধূমমামা হাতে ঘড়িটা গলাতে গলাতে বলল, “আমরা নয়, আমি আমার বাইরে কিছু কাজ আছে তুই বাড়িতেই থাকবি, বাড়ির সকলের উপর নজর রাখবি আর বেগতিক কিছু দেখলেই আমায় একটা মেসেজ করে দিবি বুঝলি?”
আমিও যাই না তোমার সঙ্গে?” আমি আকুতি করলাম
ধূমমামা বলল, “এখানে কারোর থাকাটাও দরকার রে দীপু নইলে তোকে সঙ্গে নিয়েই যেতাম যাই হোক, পাকামি করে বীরত্ব দেখাতে যাবি না তোর কাজ শুধু ওয়াচ করাবলেই ধূমমামা গটমট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল
ধূমমামা চলে যাওয়ার পর সময়ের গতি যেন আরও মন্থর হয়ে গেল কিছুক্ষণ শুয়ে বসে কাটানোর পর মৌমিতের ঘরে গিয়ে ওর সঙ্গে আড্ডা দিলাম অনেকক্ষণ বেচারা কালকের রিচুয়ালটা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল, আমার সঙ্গে গল্প করে মনটা কিঞ্চিৎ হালকা হল ওর তারপর দুজনে একসঙ্গেই খেতে গেলাম
খাবার টেবিলে আমায় একলা দেখে অরুণবাবু বললেন, “তোমার মামা কই? খেতে আসবেন না?”
মামা সন্ধেবেলায় কোথায় একটা বেরোল বলল কীসব কাজ আছে, রাতে ফিরবেআমি বললাম
এখানে তোমার মামার আবার কী কাজ!” অরুণবাবু অবাক চোখে তাকালেন একবার আমার দিকে তারপর আবার নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলেন
আমি আর মৌমিত পাশাপাশি খেতে বসে বড়োদের কথাবার্তা শুনছিলাম ধূমমামা বলে, ভালো গোয়েন্দা হতে গেলে নাকি সবসময় চোখ-কান খোলা রাখতে হয়, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তথ্যও যাতে মিস না হয় অতঃপর আমি মন দিয়ে সকলের কথা শুনছিলাম
অরুণবাবু বললেন, “পুলিশ তো বলছে কালকের রিচুয়ালটা পিছিয়ে দিতে তোমাদের এই নিয়ে কী মত?”
সৌভিকদা বলল, “এমন একটা ঘটনা যখন ঘটেই গেল জঙ্গলে তখন আয়োজনটা পিছিয়ে দেওয়াই ভালো বলে আমার মনে হয়
কিন্তু এমনটা আজ অবধি এই পরিবারে কখনও হয়নি মৃত্যু ছাড়া আর কোনো কিছুর জন্য এই রাজ্যাভিষেক আটকানো যায় না
কী বলছ দাদা? একটা রিচুয়াল কোনোদিন প্রাণের চেয়ে বড়ো হতে পারে নাতরুণবাবু বললেন
অরুণবাবু এবার চোয়াল শক্ত করে বললেন, “কাল সকালে, আমি কুলপুরোহিত মশাইকে ডেকে মন্দিরের তালা খুলব রাজ্যাভিষেকের আয়োজনও করা হবে দরকার হলে শহর থেকে লোক ভাড়া করে এনে গোটা জঙ্গল ঘিরে ফেলব, কিন্তু রাজ্যাভিষেক কাল হবেই
খাওয়াদাওয়ার পর মৌমিতকে ওর ঘর অবধি এগিয়ে দিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরলাম আমি তারপর থেকে কতক্ষণ যে কেটে গেছে জানি না কিছুক্ষণ গল্পের বই পড়ার পর আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম কিন্তু ঘুম এল না কী মনে হল, উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম সময় এখন প্রায় মধ্যরাত্রি, ধূমমামা এখনও ফেরেনি কোথায় গেছে সেটাও বলে যায়নি আমি মোবাইল ফোনে ধূমমামার নম্বরটা ডায়াল করতে যাচ্ছি, এমন সময়ঠককরে একটা শব্দ শুনে চমকে উঠলাম পর্দার আড়াল থেকে চেয়ে দেখি আগের দিনের সেই চাদর মোড়া ছায়ামূর্তি আবারও লুকিয়ে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে আমি চট করে মোবাইলেসাসপেক্ট ইজ গোইং টুয়ার্ডস দি ফরেস্টলিখে পাঠিয়ে দিলাম ধূমমামাকে আমি সঙ্গে সঙ্গে ধূমমামার তরফ থেকে রিপ্লাই আশা করেছিলাম, কিন্তু কোনো রিপ্লাই এল না
এদিকে আমার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত উচাটন শুরু হল আগের দিন লোকটা এভাবেই জঙ্গলে গেল আর বিজয়নাথবাবু জঙ্গলে হারিয়ে গেলেন তবে কি আজও? ধূমমামা কোথায়? সে কি এখন জঙ্গলে? সর্বনাশ কিছুতেই হাত-পা গুটিয়ে আর বসে থাকা যাবে না ঠিক এক মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আমি বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলাম গোটা বাড়িটা এখন থমথম করছে, সকলেই ঘুমে আচ্ছন্ন সেই রাতের মতোই পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম বড়ো টর্চটা ধূমমামা সঙ্গে নিয়ে গেছে, আমার ব্যাগে একটা ছোট্ট টর্চ ছিল, সেটাই সঙ্গে নিয়ে বেরোলাম
জঙ্গলের আনাচেকানাচে এখন নিকষ অন্ধকার গাছগাছালির লতায়পাতায় পোকামাকড়, সাপখোপেদের বেয়ে বেড়ানোর খসখসে শব্দ হচ্ছে আমি শুকনো পাতার উপর দিয়ে যথাসম্ভব কম শব্দ করে এগিয়ে চলেছিলাম জঙ্গলের অন্দরে
যাকে অনুসরণ করতে আমার এই রাত্রি অভিযান, তার উপস্থিতি কাছাকাছি কোথাও টের পাচ্ছি না সে বোধহয় জঙ্গলের ভিতর অনেকটাই এগিয়ে গেছে কিন্তু এখন আমার কোনদিকে যাওয়া উচিত? লেকের দিকে নাকি মন্দিরের দিকে
কী করব ভাবছি, এমন সময় পায়ের উপর ভীষণ ঠান্ডা কিছু একটা অনুভব করলাম কিছু একটা খুব ধীরে ধীরে আমার পায়ের উপর দিয়ে বেয়ে যাচ্ছে সর্বনাশ! তাড়াহুড়োয় গামবুটটা পরতে ভুলে গেছি শীতল সরীসৃপটির হিসহিসে শব্দ কানে আসছে আমার আমি নিশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত ধীরে ধীরে শীতল প্রাণীটা ক্রমশ স্পর্শচ্যুত হল ওটির বেয়ে চলার খসখসে শব্দটা আস্তে আস্তে অনেকটা দূরে মিলিয়ে গেল
আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে আবারও হাঁটতে শুরু করলাম ঝোপঝাড় কাটিয়ে গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে আমি এগিয়ে চললাম ক্রমশ রাতের অন্ধকারে মন্দিরের চুড়োটা দেখা যায় না তবুও আন্দাজেই এগোতে লাগলাম মন্দিরের দিকে ক্ষণে ক্ষণে মনের মধ্যে সংশয় দানা বাঁধল, ঠিক যাচ্ছি তো! এগোতে এগোতে একেবারে আততায়ীর মুখোমুখি পড়ে যাব না তো! ভাবতে ভাবতেই খুব কাছেই শোনা গেল সেই হাড় কাঁপানো গর্জন, তারপর আবার সেই ভয়ংকর খুনে শেয়ালের ডাক প্রথম প্রথম একটু বুক দুরুদুরু করলেও, পরমুহূর্তেই মনে পড়ল এ ডাক আসল নয়, যান্ত্রিক মন শক্ত করলাম আমি দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চললাম আবার
হাত দিয়ে ঝোপঝাড় সরিয়ে, গাছপালা কাটিয়ে, খুব সন্তর্পণে আরও কিছুদূর এগোতেই থমকে দাঁড়ালাম আমি সামনের দৃশ্যপট আমায় থেমে যেতে বাধ্য করল জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত মৌমিতদের পারিবারিক কালীমন্দিরের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছি আমি একটি বিশাল বড়ো আমগাছের আড়াল থেকে মন্দিরের দিকে তাকাতেই দেখি মন্দিরের দরজায় একটি সরু ফাঁক, আর ভিতর থেকে চুইয়ে আসছে একটি কম্পমান হলদে আলো
আমি ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম ওই দরজার দিকে মন বলল যে ওই দরজার ওপারেই রয়েছে সব রহস্যের সমাধান, সব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এ কী! আরও একজোড়া পায়ের শব্দ আসছে কেন পিছন থেকে? কে যেন আমার ঘাড়ের উপর ঘন নিশ্বাস ফেলছে আমি যেই না পিছন ফিরে তাকাতে যাব, তখনই ঠিক মাথার পিছন দিকে লাগল আঘাতটা সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র চরাচর দুলে উঠল যেন রাতের অন্ধকারেও চোখের সামনে নেমে এল এক নিকষ, কালো অন্ধকার

(১২)

জ্ঞান ফিরতেই মাথার পিছনে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম চোখ মেলে তাকাতেই হলদে আলোয় চোখজোড়া ধাঁধিয়ে গেল আমার উঠে বসার চেষ্টা করতেই বুঝলাম যে আমায় কোথাও একটা হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে এবার তাই একরকম জোর করেই চোখ খুলে চাইলাম আমি চোখে আলো সয়ে যেতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল
দৃষ্টি আবছা থেকে পরিষ্কার হতেই যাকে দেখলাম, তাকে দেখে খুব একটা অবাক হলাম না কারণ সে যে এই ষড়যন্ত্রের একটি অংশ তা আজ সকালেই বুঝেছিলাম কিন্তু কার হয়ে কাজ করছে হারান?
ছেলেটার জ্ঞান হয়েছে সাহেব…” হারান পিছন ফিরে কাকে যেন একটা বলল কথাটা
কে হারানের সাহেব? কে এই ষড়যন্ত্রের মূল কাণ্ডারী?
হারানের পিছন থেকে একজন লম্বা, সুপুরুষ ব্যক্তি আমার সামনে এসে দাঁড়াল আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসল সে
আমি একপ্রকার চিৎকার করে বলে উঠলাম, “তরুণ আঙ্কেল আপনি?”
তরুণবাবু এবার ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, “কীসের আঙ্কেল, হ্যাঁ? আমি তোর কেউ নই আর তোর মামা যে কলকাতার শিক্ষানবিশ গোয়েন্দা সে খবরও আমার কানে এসেছে রাতবিরেতে ঘুরঘুর করা? এবার তোকে আর তোর মামাকে এমন জায়গায় পাঠাব যে, কেউ কোনোদিন খুঁজে পাবে নাএকটানা বলে থামলেন তরুণ আঙ্কেল তারপর রীতিমতো গর্জন করে বললেন, “বল তোর সেই টিকটিকি মামা কোথায়?”
আহ দাদাএকটা বাচ্চার উপর এমন অত্যাচার কোরো না দাদা ওকে ছেড়ে দাওকণ্ঠস্বরটি ভেসে এল আমার ঠিক ডানপাশ থেকে এতক্ষণ সেদিকে তাকানোর সুযোগ হয়নি এখন তাকিয়ে দেখলাম বিজয়নাথ তাম্বে আমার মতো হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছেন কিন্তু তিনি তরুণ আঙ্কেলকে দাদা বলে ডাকছেন কেন!
আমি তৎক্ষনাৎ জায়গাটির আশেপাশে তাকিয়ে দেখি কাছেই মা কালীর মন্দিরের বেদি মায়ের প্রতিমাটা হলদে আলোয় কেমন যেন চকচক করছে বুঝলাম যে আমাদের ওই কালীমন্দিরের ভিতরেই বন্দি করে রাখা রয়েছে
তরুণবাবু বিজয়নাথ তাম্বের কথা শুনে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছাড়ব তো আমি তোকেও না কুলাঙ্গার…” বলেই পকেট থেকে সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকটা বের করলেন তিনি তারপর বন্দুকের নলটা এনে ঠেকালেন আমার কপালে একেই বলে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ
তরুণ আঙ্কেল ট্রিগারটা সবে টিপতে যাবেন, এমন সময় কোথা থেকে একটা ছায়ামূর্তি এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ল তরুণবাবুর উপর তাঁর হাতের বন্দুকটা নিমেষে ছিটকে পড়ল হাত থেকে
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “ধূমমামা…”
ঘটনার আকস্মিকতায় হারান কেমন যেন ভেবলে গেল সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ তারপর চমক ভাঙতেই ছুটে গেল ধূমমামার দিকে ধূমমামা ততক্ষণে তরুণবাবুর তলপেটে একটা মোক্ষম ঘুষি কষিয়ে দিয়েছে তিনি পেট চেপে বসে পড়েছেন মাটিতে হারান গিয়ে ধূমমামাকে জাপটে ধরল পিছন থেকে, ধূমমামা কনুই দিয়ে হারানের বুকে সজোরে একটা গুঁতো মারল হারান ব্যথায় ককিয়ে উঠল হাতের বাঁধন শিথিল হতেই ধূমমামা সটান হারানের দিকে ফিরে ওর ঘাড়ে একটা রদ্দা বসাল হারান সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে কিন্তু তখনই শোনা গেল তরুণবাবুর কণ্ঠস্বর
খবরদারআর কোনো চালাকি নয় ধূমবাবুনইলে এক নিমেষে আপনার খুলি উড়িয়ে দেবফাঁকতালে পিস্তলটা কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন তরুণবাবু
অনেক লম্ফঝম্প করেছেন গোয়েন্দামশাই, এবার একটু রসুন দেখি ফুটফুটে ভাগনেটার প্রাণ যদি প্রিয় হয়, হাতদুটো উপরে তুলে দাঁড়ান...
ধূমমামার মুখটা ছোটো হয়ে গেল অসহায়ভাবে দু-হাত তুলে দাঁড়াল সে
বড়দার চেয়ে আমি অনেক বেশি যোগ্য এবং শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও বড়দা শুধু বড়ো বলে বড়দার রাজ্যাভিষেক হয়েছিল আর এখন আমার ছেলের চেয়ে ওই বরুণের ছেলে বয়সে ছোটো হওয়া সত্ত্বেও ওর রাজ্যাভিষেক হবে! ও বাচ্চাছেলে সম্পত্তি কী বোঝে? রাজ্যাভিষেক যদি হতেই হয়, তাহলে তা হবে আমার ছেলে সৌভিকের
এবার কথা বললেন বিজয়নাথবাবু শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা সামলেও হেসে ফেললেন তিনিআমি যখন সমান ভাগের কথা তুলেছিলাম তখন তুমি বড়দার সঙ্গ নিয়ে আমায় বাড়িছাড়া করেছিলে আজ বুঝছি, তোমার আসলে গোটা সম্পত্তিটা আত্মসাৎ করার তাল ছিল
চমকে তাকালাম আমি বিজয়নাথবাবুর দিকে তাহলে কি বিজয়নাথবাবুই মৌমিতের হারিয়ে যাওয়া ছোটকা!
বিজয়নাথবাবুর কথাটা শেষ হতে না হতেই মন্দিরের ভিতরটা বিকট একটা শব্দে কেঁপে উঠল গুলি চলল শেষমেশ আমি চকিতে তাকালাম ধূমমামার দিকে নাহ, ওর কিছু হয়নি কিন্তু তরুণবাবুর হাত থেকে ছিটকে পড়েছে পিস্তলটা হাতের চেটো থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে মিনিট খানেকের মধ্যে এতকিছু ঘটে গেল যে সব কেমন গুলিয়ে গেল আমার
গুলি চলামাত্রই দারোগাবাবু রিভলবার হাতে তাঁর দলবল নিয়ে মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করলেন হারান আর তরুণ আঙ্কেলের হাতে হাতকড়া পড়ল ধূমমামা ছুটে এসে আমার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিল আমি আনন্দে জড়িয়ে ধরলাম ওকে সে সস্নেহে আমার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিল কানে কানে বলল, “এই যে বীরপুরুষ, এই বীরত্বটা কি না দেখালেই চলছিল না?
আমি হেসে উঠে দাঁড়ালাম ইতিমধ্যেই একজন কনস্টেবল গিয়ে বিজয়নাথবাবুকে বাঁধনমুক্ত করে ফেলেছে ধূমমামা উঠে বিজয়নাথবাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল তারপর আলতো হেসে বলল, “যাক! আপনাকে তাহলে খুনে শেয়ালে টানেনি এখনওতাই তো বিজয়নাথবাবু, নাকি আমার বলা উচিত মিস্টার কিরণ দত্ত চৌধুরী?”
বিজয়নাথবাবু ক্লান্ত স্বরে বললেন, “চিনতে পেরেছেন তাহলে?”
অনেক আগেই সন্দেহ হয়েছিল গোয়েন্দা তো, ওটা একপ্রকার বাতিকধূমমামা হেসে উঠল
আপনার এই ভাগনেটিও কিন্তু কম যায় না খুব সাহসী ছেলে ও
ধূমমামা ঘাড় নেড়ে বলল, “চলুন এবার বাড়ি ফেরা যাক আপনার আসল পরিচয় জানলে বাড়ির সকলে খুব খুশি হবেন
বিজয়নাথবাবুকে সঙ্গে নিয়ে আমরা মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলাম দারোগাবাবু তার একটি জিপে করে আমাদের জমিদার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিলেন ততক্ষণে পুবের আকাশে কমলা আভা ধরতে শুরু করেছে সেই মিষ্টি আলোর রেশ গায়ে মেখেই আমরা এগোলাম জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে

(১৩)

জমিদারবাড়ির ছাদে গরম গরম চা আর বিস্কুট নিয়ে বসা হয়েছে সবাই মিলে বাড়ির সকলের চোখেমুখে কেমন যেন একটা মিশ্র অনুভূতির ছাপ বাড়ির এক হারিয়ে যাওয়া সদস্য আজ ফিরে এসেছে, আর অন্য একজন সদস্য এখন রয়েছে পুলিশ হাজতে সৌভিকদার মুখটা শুকিয়ে গেছে একদম যতই হোক, বাবা বলে কথা
ধূমমামা সেসব দিকে নজর না দিয়ে আপনমনে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে
অরুণবাবু এবার বিলাপের সুরে বললেন, “সেজোটার এমন মতিভ্রম কেন হল কে জানে! কীসের অভাব ছিল ওর?”
ধূমমামা চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, “অভাবটা টাকার নয় অরুণবাবু, ক্ষমতার, লোভটা পজিশনের
কিন্তু আপনি বুঝলেন কীভাবে যে তরুণই এসবের পিছনে রয়েছে?”
প্রথমে বুঝিনি, তবে কিরণবাবুকে আমি চিনেছিলাম দোতলার করিডোরে আপনাদের চার ভাইয়ের একটি সাদাকালো ছবি রয়েছে বাঁধানো সেখানে আপনাদের চোখগুলো স্বাভাবিক কালো দেখালেও, কিরণবাবুর চোখজোড়া কেমন সেন ফ্যাকাশে লাগছিল, মনে হচ্ছিল চোখের রঙটা যেন ঘষে গিয়েছে পরে বুঝেছিলাম যে ওটা আসলে কিরণবাবুর চোখের রং-টা আলাদা হওয়ায় অমন উঠেছে বিশুদা পুরানো লোক, এই বাড়িতে অনেকদিন আছে আজ সকালে তাই বিশুদাকে জিজ্ঞেস করতে সেও বলল যে সত্যিই কিরনবাবুর কটা-চোখ ছিলএকটানা বলে থামল ধূমমামা, তারপর আরও বলল, “তরুণবাবু কিছুতেই চাননি যে তাঁর ছেলে সৌভিককে বাদ দিয়ে মৌমিতের মতো একটি বাচ্চা ছেলের রাজ্যাভিষেক হোক তখনই তার মাথায় এই খুনে শেয়ালের ছকটা আসে উনি তারপর হারানকে দলে টানেন হারান ভালো ইলেকট্রিকের কাজ জানত, তাছাড়া তার টাকাপয়সার দরকারও ছিল অতঃপর সে তরুণবাবুর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় হারানের সাহায্য নিয়েই তরুণবাবু জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় বেশ ভালো মানের স্পিকার ফিট করেছিলেন আর সেই স্পিকারের মাধ্যমেই গোটা জঙ্গলে খুনে শেয়ালের ডাক শোনা যেত সেই সাউন্ড কন্ট্রোল হত আপনাদেরই কালীমন্দিরের ভিতর থেকে খুব সম্ভবত এই বিষয়টি আপনাদের কুলপুরোহিতমশাইও জানেন তাকে হাত না করে মন্দির এভাবে ব্যবহার করা যেত নাধূমমামা থামল
আর লেকের ধারের সেই পায়ের ছাপ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম
ধূমমামা মুচকি হেসে বলল, “ওটা নকল আর্টিফিশিয়াল পদ্ধতিতে বানানো শেয়ালের দু-জোড়া পা মন্দিরের মধ্যেই ওগুলোও পাওয়া গেছে ওগুলো দিয়েই নকল পায়ের ছাপ তৈরি করা হয়েছিল লেকের ধারে, নরম মাটিতে যাই হোক, যেটা বলছিলাম, অন্যদিকে আপনার ছোটোভাই বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পর নতুন পরিচয় নিয়ে, পড়াশোনা করে বনদপ্তরে চাকরি পান এবং সেই সূত্রেই দেওয়ানগড়ের খুনে শেয়ালের গল্প তার কানে এসে পৌঁছায় তিনি একপ্রকার জোর করেই আপার ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে এখানে এসে খোঁজখবর করার অনুমতি আদায় করেছিলেন এখানে এসে কয়েকদিনের মধ্যেই কিরণবাবু বুঝতে পারেন যে এই খুনে শেয়ালের ব্যাপারটা পুরোটাই ভাঁওতা এবং এসবের পেছনে যে তরুণবাবুর হাত রয়েছে সেটাও তিনি ধরে ফেলেন ফলস্বরূপ সেদিন রাতে, জঙ্গলের মধ্যে তিনি তরুণবাবুর সঙ্গে দেখা করেন তাকে শাসান যে তার এই ষড়যন্ত্রের কথা তিনি সকলকে জানিয়ে দেবেন তখনই তরুণবাবু তাকে সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু যতই হোক, একই মায়ের পেটের ভাই বলে কথা, তাই প্রাণে ওঁকে মারতে পারেননি মন্দিরের মধ্যেই হাত-পা, মুখ বেঁধে ফেলে রেখেছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল মৌমিতকে ভয় দেখিয়ে এই গ্রাম থেকে তাড়ানো, আর তাতেও কাজ না হলে খুনে শেয়ালের নাম করে বাচ্চাটাকে জাস্ট ভ্যানিশ করে দেওয়া তিনি হয়তো নিজের উদ্দেশ্যে সফলও হয়ে যেতেন, যদি না আমরা এসে বিষয়টিতে নাক গলাতাম এছাড়া দারোগাবাবুও আমায় যথেষ্ট সাহায্য করেছেন আমি সকালেই ওঁর সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলাম উনি সঠিক সময় না এলে মুশকিলে পড়তাম
ধূমমামা এই অবধি বলে তাকাল কিরণবাবুর দিকে বলল, “এতক্ষণ যা বললাম, সবই আমার অনুমান আপনিই বলুন, ঠিক বলছি না ভুল?”
কিরণবাবু বললেন, “নাহ, আপনি সবটাই একদম ঠিক বলেছেন ধূমবাবু আসলে আমি যখন বলেছিলাম যে সম্পত্তি সবার মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া উচিত, তখন কেউ আমায় সাপোর্ট করেনি সবাই মধ্যযুগীয় রীতিনীতির দোহাই দিয়েছিল আর আজ সেজদা নিজেই নিজের ছেলের রাজ্যাভিষেকের জন্য এমন একটা ষড়যন্ত্র করল! তখনই আমি ভেবেছিলাম যে সেজদার ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস করব কিন্তু তার আগেই সে আমায়…” কিরণবাবু মাথা নীচু করে নিলেন
আমি এসব কিছুই চাইনি বিশ্বাস করো আমি এসব কিছুই জানতাম নাসৌভিকদা বলল
আমরা জানি রে তোকে সেকথা আলাদা করে বলতে হবে না ভাইদেবাদৃতাদি সৌভিকদার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল মৌমিতও ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল সৌভিকদাকে
তাহলে কাল আমাদের মৌমিতের রাজ্যাভিষেক হচ্ছে তো?” ধূমমামা অরুণবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল
অরুণবাবু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “নাহ তার আর দরকার নেই যে নিয়মকানুন নিজের ভাইকে অবধি শত্রু করে দেয়, সেই নিয়ম পালটে ফেলাই ভালো আমি কালই উকিল ডেকে সমস্ত সম্পত্তি সকলকে সমান ভাগে ভাগ করে দেব
তার কোনো দরকার হবে না জেঠু তুমি এখন যেমন সব সামলাচ্ছ, তেমনই সামলাও আমাদের কিছু দরকার হলে তোমার থেকেই চেয়ে নেবসৌভিকদা বলল
সেই ভালো দাদা জানি আমিই এককালে এই ভাগ বাঁটোয়ারার দাবি তুলেছিলাম, কিন্তু এখন আমিই বলছি, দরকার নেই এসবের সবাই মিলেমিশেই থাকব আমরাকিরণবাবুর কথায় সকলের মুখেই হাসি ফুটল
ধূমমামা বলল, “রিচুয়ালটা না হয় বাদ গেল, তা বলে কি খাওয়াদাওয়ার আয়োজনটাও বাদ চলে যাবে? কলকাতায় ফেরার আগে বউঠানের হাতের মাটন কষা খাব না আমরা? খাব না আমরা মাটন কষা?”
ধূমমামার কথায় হো হো করে হেসে উঠল সকলে
----------
ছবি - এআই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment