
ইঙ্গিত
রাজর্ষি গুপ্ত
[মূল কাহিনি: “The Angel of the Lord”; লেখক: Melville Davisson Post]
বাবা যে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলছেন তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। পশ্চিম ভার্জিনিয়ার এই ব্যাকউড্সে এখানে শুধু পাহাড়, নদী, জঙ্গল আর গোচারণভূমি। এই ১৮৫৯ সালেও এ বড়ো জংলি দেশ। এখানে ফসল আর গরুই টাকা, ঘোড়াই যাতায়াতের একমাত্র ভরসা, পশুপালক আর চাষিরাই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। এখানে আইনকানুন বলে কিছু নেই, রাস্তাঘাটে কেউ কাউকে মেরে ফেলে রেখে গেলেও কাকপক্ষী জানতে পারবে না। পুলিসটুলিস ওসব নিউ ইয়র্কের মতো অনেক দূরের বড়ো বড়ো শহরের ব্যাপার। এখানে ব্যাঙ্কও নেই। অথচ পাল-পাল গরুর দাম হিসেবে টাকা তো দিতেই হবে, আর সেই টাকা কাউকে না কাউকে বয়ে নিয়েও যেতে হবে। আমাদের জমিজমা আর গবাদিপশুর পরিমাণ বেশ ভালোই, ফলে অনেকেরই চোখ টাটায়। কাজেই বাবা আর কাকার উপরেও কম লোকে নজর দিয়ে বসে নেই। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বাবার কথাগুলো একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বাবা কাকাকে বলছিলেন, ‘অ্যাবনার, তুমি বা আমি নয়, আমি ঠিক করেছি মার্টিনই টাকা নিয়ে যাবে। ওর মতো একটা বাচ্চা ছেলের কাছে যে এত টাকা থাকতে পারে তা কেউ সন্দেহ করবে না।’
অ্যাবনার কাকার ভুরু কুঁচকে গেল। আঙুলগুলো টেবিলের উপর অধৈর্য টরেটক্কা তাল তুলল, গোড়ালির নাচে মেঝেতে খটখটানি আওয়াজ উঠল। কাকা দরকারের চেয়ে বেশি কথা বলে না। কিন্তু যখন বলে তখন শুরুর কথা শুরুতে বলে, শেষের কথা শেষে—আর কাকার কথাই হয় শেষ কথা। আর কাকা হল এই পোড়া দেশে সেই দুর্লভ পুরুষদের একজন যার মন, মুখ আর হাত ঠিক একই কথা বলে।
বাবা বলে চললেন, ‘টাকা দিয়ে তোমাকেও পাঠাতে পারতাম। কিন্তু মার্টিনই ভালো। ওকে থামিয়ে টাকা লুঠ করতে গেলে বড়োজোর আমার টাকাটা যাবে। কিন্তু ওর জায়গায় তুমি থাকলে একটা না একটা মানুষের প্রাণ যাবেই যাবে।’
কথাটা বাবা কেন বললেন আমি জানি। কাকাকে যারা চেনে তারা জানে যে তার সঙ্গে কেউ লাগতে এলে গুলিতে তার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়ার আগে কাকা থামবে না।
এখানে আমার কাকা অ্যাবনারের ব্যাপারে দু-একটা কথা বলে নেওয়া উচিত। কাকা লম্বাচওড়া মানুষ। রোদে-জলে পোড়খাওয়া তামাটে শরীর, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মুখে চাপদাড়ি। বিয়ে-থা করেনি, কড়া মেজাজের মানুষ। মধ্যযুগের শেষে আর রেনেসাঁসের শুরুতে চার্চ রিফর্মেশনের ফসল হিসেবে জন্ম হয়েছিল একদল পিউরিটান ক্রিশ্চানের। তাদের ধ্যানেজ্ঞানে ঈশ্বর, বাইবেল, নিয়ম, আইনকানুন ছাড়া আর কিছু ছিল না। কোনোরকম নরমসরম ব্যাপার তাদের ধাতে ছিল না। অ্যাবনার কাকা হচ্ছে সেই জাতের ক্রিশ্চান যোদ্ধা। তার পকেটেও সবসময় থাকে ছোটো একটা বাইবেল। সময়-অসময়ে সেটা খুলে পড়তে বসে যায় সে। একবার রয়ের সরাইখানায় কাকা এমনই আগুনের ধারে পা ছড়িয়ে বাইবেল খুলে বসেছে, এমন সময় সরাইতে উপস্থিত কয়েকটা মাতালের শখ হল কাকাকে নিয়ে মশকরা করার। তারা ভেবেছিল যে লোক ভরসন্ধ্যাবেলা মৌজমস্তি না করে বাইবেল পড়তে বসে সে নিশ্চয় নিরীহ মুরগিই হবে। অ্যাবনারকে তারা চিনত না আসলে। মারামারি শেষ হলে পরে রয়কে ভাঙা চেয়ারটেবিল বাবদ আঠারো ডলার দিয়ে কাকা তার ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়েছিল। শুধু কাকাই বেরিয়েছিল—সরাইয়ের আর কারোর ঘোড়ায় চড়ার মতো অবস্থা ছিল না। অ্যাবনার ধর্মপ্রাণ ছিল বটে, কিন্তু তার দেবতা ছিল যাকে বলে পুরোদস্তুর রণদেবতা।
* * *
গোছা-গোছা ডলারের নোট ছোটো-ছোটো প্যাকেট করে বেঁধে পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছেন বাবা। সেই সব মোড়কগুলো দুটো মাঝারি মাপের চটের থলেতে পুরে ঘোড়ার জিনের দু-দিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। সেই ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম। আমার বয়স তখন আন্দাজ নয় বছর। নয় বছর শুনে হাসার কিছু নেই। ওই বয়সেই আমি সবরকমের ঘোড়ায় চড়তেও পারতাম, আর সেই ঘোড়া দাবড়ে সারা এলাকা চষেও বেড়াতে পারতাম। রোদে-জলে ঘুরে ঘুরে শরীর বেশ পোক্ত হয়ে উঠেছিল আমার। আর যে পথে যাচ্ছিলাম সে পথও বেশ চেনা। কাজেই নয় বছর বয়সে আমি হেলাফেলার পাত্র ছিলাম না।
বেরোলাম যখন তখন শরতের সূর্য মাঝগগন থেকে সবে দু-এক পা সামনে বাড়িয়েছে। সারা রাত বরফ পড়ে কাঁচা মাটির রাস্তা জমে গিয়েছিল। সকালে রোদ পেয়ে বরফ গলে কাদা হয়ে রয়েছে। বাবা বলে দিয়েছিলেন, ‘নদী পেরিয়ে দক্ষিণে গিয়ে রয়ের সরাইতে রাত কাটাবি। খুব সকালে উঠে আবার চলবি।’ রাস্তায় চলতে চলতে অনেক জনকে পেরিয়ে এলাম। সবাই রাখাল, প্রকাণ্ড সব গরুর পাল নিয়ে চলেছে চারণভূমির দিকে। কিন্তু আমার পিছন থেকে এসে কেউ আমাকে পেরিয়ে গেল না। সূর্য যখন ডুবুডুবু তখন পিছন থেকে একটা ঘোড়ার পায়ের শব্দ পেলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে যে লোকটাকে দেখলাম তাকে চিনি। সে-ও গবাদিপশুর ব্যাবসাই করত এককালে। লোকটার নাম ডিক্স। এককালে সে দূরে দূরে মালপত্র সাপ্লাই দেওয়ার কাজ করত। তারপর তার ব্যাবসার অংশীদার—তার নাম ছিল অ্যালকায়ার—গোচারণের রাখালদের কাছে বকেয়া প্রচুর টাকা মেরে সরে পড়ে, আর তাতেই ডিক্সের ভরাডুবি হয়। রাখালরা ক্ষতিপূরণ বাবদ ডিক্সের জমিজমা সব কেড়ে নিয়েছিল। তারপর ডিক্স পাহাড় পেরিয়ে ওর আত্মীয়স্বজনদের কাছে গিয়ে কিছুদিন ছিল। তাদের কাছ থেকে টাকাপয়সা জোগাড় করে বেশ কিছুটা জমিজমাও কিনেছিল। কিন্তু বেচারার কপাল এমনই খারাপ যে মামলায় ফেঁসে গিয়ে তার সেই সব টাকা আর জমিজমাও বেহাত হয়ে গেল। তখন সে আবার এখানে ফিরে এল। আমাদেরই অনেক দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়াকে বিয়ে করেছিল ডিক্স। থাকতও তারই জমিতে। সে জমিটা আবার অ্যাবনার কাকার জমিরই লাগোয়া।
ডিক্স আমাকে দেখে খুব অবাক হল। বলল, ‘আরে মার্টিন! একা একা কোথায় চলেছ? তোমার কাকা অ্যাবনার শুনছিলাম নাকি রাখালদের কাছে যাবে—সে কই?’
আমার বয়স কম হলে কী হবে, আমি নেহাৎ বোকা নই। একলা পথ চলতে গেলে যে কাউকে নিজের পেটের খবর জানতে দিতে নেই সে জ্ঞান আমার টনটনে। আমি বুদ্ধি করে বললাম, ‘বাবা বললেন, নদীর ওপারে গিয়ে আরও মাসখানেক গরুগুলোকে চরাতে হবে। রাখালদের এইটুকু খবর দেওয়ার জন্য আর অ্যাবনারের গিয়ে কাজ নেই, ও মার্টিনই পারবে।’
ডিক্স আমার আপাদমস্তক চোখ দিয়ে মাপল। তারপর জিনের দু-দিকে ঝোলানো থলেগুলোর উপর আঙুল বোলাতে বোলাতে মৃদুস্বরে বলল, ‘বাবা, বেশ ভারী বস্তা তো!’
আমি হেসে বললাম, ‘ঘোড়ার দানাপানি নিয়ে যাচ্ছি। বাবাকে তো জানোই। মানুষ না খেয়ে মরে যাক তাও ভালো, কিন্তু গরুঘোড়ার ঠিকঠাক সময়ে খাওয়াদাওয়া করা চাইই চাই।’
পথ কিছুদূর গিয়ে দক্ষিণে বেঁকেছে। এই পথ ধরে চললেই পড়বে সরাইখানা। টুকটাক কথা বলতে বলতে আমরা এগিয়ে চললাম। ডিক্সকে আমার কোনোদিনই ভালো লাগে না তেমন। কেমন যেন একটা তেলতেলে, বিগলিত হাবভাব। এদিকে মুখে একটা ধূর্ততার ছাপ মুখোশের মতো সেঁটেই আছে সবসময়।
খানিকক্ষণ পর উলটোদিক থেকে একজন ঘোড়সওয়ার এসে আমাদের পেরিয়ে গেল। একেও চিনি। এর নাম মার্কস। অ্যাবনারের জমি পেরিয়ে বেশ খানিকটা গেলে এর জমিজমা পড়ে। মার্কসের তাড়া আছে বোঝাই যাচ্ছিল, কারণ সে পুরোদমে ঘোড়া চালাচ্ছিল। আমাদের দিকে হাত নেড়ে যাওয়ার সময় প্রায় উড়ে চলা তার ঘোড়ার পায়ের চাঁটে কাদা ছিটকে এল আমাদের দিকে। ডিক্স একটা অশ্রাব্য গালাগালি দিয়ে উঠল। ততক্ষণে মার্কস অনেক দূরে চলে গিয়েছে। আমি অবাক হয়ে ডিক্সের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। গনগনে, ব্যর্থ রাগে তার মুখ কালো হয়ে বেঁকে গিয়েছে। যেন মানুষের খোলস খুলে ফেলে তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে কোনো হিংস্র পশু।
এই ঘটনার পর ডিক্স কেমন যেন থম মেরে গেল। আমরা চুপচাপ পথ চলতে থাকলাম। আড়চোখে চেয়ে দেখলাম ডিক্সের মুখ বুকের উপর ঝুলে পড়েছে। ভুরু কুঁচকে চিন্তান্বিত মুখে সে চিবুকে-গালে হাত বোলাচ্ছে, যেন খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছে—যেন কোনো একটা বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে হবে অথচ নিতে পারছে না। খানিক পর সামনে একটা চৌমাথা পড়ল। এখান থেকে আমার সোজা এগিয়ে যাওয়ার কথা, ডিক্সের ডানদিকে। ডিক্স কিন্তু ঘোড়া থামিয়ে সামনের দিকে চেয়েই রইল। আমি তাকে অত পাত্তা না দিয়ে সোজা ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেলাম।
খানিক পরে নদীর সাঁকো পেরোনোর সময় শুনি পিছন থেকে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। ডিক্স এসে উপস্থিত। আমি তো অবাক! ডিক্স তার সেই মার্কামারা তেলতেলে হাসি হেসে বলল, ‘ও পথে থাকা-খাওয়ার ভালো জায়গা নেই। রয়ের ওখানে রাতের খাওয়াটা সেরে যাই।’
* * *
রয়ের সরাইখানাটা আসলে একটাই প্রকাণ্ড লম্বাটে ঘর। ঘরের ছাদের নিচে কাঠের তক্তা দিয়ে একই রকম লম্বা একটা লফ্ট। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় এখানে। সরাইতে রাত্রিবাস করলে এখানেই শোয়ার ব্যবস্থা। বিছানা বলতে খড়ের উপর বিছানো বাছুরের নরম চামড়া আর গায়ের ঢাকা বলতে হাতে-বোনা কাঁথা। এই সরাইবাড়ির পাশেই রয় আর তার বউয়ের থাকার ঘর। দুটো বাড়িকে জুড়েছে একটা লম্বা করিডর। করিডরের দেয়ালে বড়ো বড়ো কাঠ আর লোহার গজাল পোঁতা। ঘোড়সওয়ারেরা এই গজালগুলোতেই তাদের ঘোড়ার জিনগুলো ঝুলিয়ে রাখে। অন্যান্য দিন এই গজালগুলো জিন-মালপত্র-বোঁচকাবুঁচকিতে ভর্তি হয়ে থাকে। কিন্তু সেদিন সরাইতে পথিক বলতে শুধু আমি আর ডিক্স। তাও আমি আমার সঙ্গের থলেদুটো ফাঁকা করিডরে ঝুলিয়ে না রেখে তাদের বগলদাবা করে ভিতরে নিয়ে চললাম দেখে ডিক্স আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর যখন শোয়ার সময়েও সেগুলো কাছছাড়া না করে উপরে নিয়ে যাচ্ছি তখন দেখি সে ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কিছু বলল না সে। সত্যি বলতে কি, সরাইতে আসার সময় থেকেই সে যেন কেমন গুম মেরে গিয়েছে। রয় কাঠকুটো দিয়ে প্রকাণ্ড এক আগুন জ্বেলেছিল ফায়ারপ্লেসে। তার সামনেই ডিক্সকে ছেড়ে আমি শোয়ার জন্য উঠে গেলাম লফ্টে। ঠাণ্ডায় হাত-পা একেবারে জমে যাচ্ছিল। মাথার নীচে থলেদুটোকে রেখে চাদরের মুখ চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আর শোয়া মাত্রই চোখে নেমে এল ঘুম।
ঘুম কিন্তু আচমকাই ভেঙে গেল। চোখে যেন কীসের আলো এসে পড়েছে। না, লফ্টে তো যেমনকার তেমনই অন্ধকার, কোনো মোমবাতি তো জ্বলছে না। খেয়াল হল, আলোর আভা উঁকি দিচ্ছে নীচ থেকে, লফটের দুটো তক্তার মাঝের সরু একচিলতে ফাঁক দিয়ে। ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে! আশ্চর্য, এতক্ষণ আগুন জ্বলছে কেন? ডিক্সের তো এতক্ষণে শুয়ে পড়ার কথা। আর সবার শেষে ঘর থেকে যে বেরোবে সে-ই আগুন নিভিয়ে দিয়ে যাবে, এমনটাই সব সরাইয়ের অলিখিত নিয়ম। তবে এখনও আগুন জ্বলে কেন নীচে? কাঁথা সমেত একপাক গড়িয়ে গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে তক্তার ফাঁকে চোখ লাগালাম আমি। যা দেখলাম তাতে আমার আশপাশের পৃথিবীর সমস্ত বোধ উবে গেল।
কাঠকুটো নিভে এসে প্রকাণ্ড আগুন এখন ধিকধিক করে জ্বলছে। তার উপর নিজের দু-হাত টানটান করে বাড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ডিক্স। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন তার হাড়-মজ্জা পর্যন্ত কেঁপে উঠছে ঠাণ্ডায়। এ পর্যন্ত দৃশ্যটার মধ্যে কোনো অদ্ভুত ব্যাপার নেই। কিন্তু তারপরই আমার চোখ পড়ল ওর মুখে। আমি জীবনে কোনোদিন ভুলব না সেই মুখ।
পশ্চিম ভার্জিনিয়ার হেমন্তরাতের হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া ঠাণ্ডার মধ্যেও ডিক্সের কপাল বেয়ে নামছে ঘামের স্রোত। তার মুখ বেঁকে গিয়েছে, চোয়াল কঠিন হয়ে দাঁতে-দাঁতে চেপে বসেছে, চোখ যেন ফেটে বেরিয়ে আসবে। বিষ খেয়ে মরতে বসা কুকুর দেখেছ কখনও? দেখে থাকলে ডিক্সের চোখমুখের অবস্থা তখন ঠিক কেমন ছিল তা হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারবে। কী যেন এক প্রচণ্ড লড়াই চলেছে তার ভিতরে, আর সেই লড়াইয়ের যন্ত্রণায় যেন তার আত্মা পর্যন্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠছে। তার অন্তরে যেন প্রবল পরাক্রমী এক অশুভ শক্তি কুণ্ডলী পাকিয়ে ফুলে ফুলে উঠছে, এখনই বুঝি তার মুখ দিয়ে প্রকাণ্ড এক অজগর সাপের মতো বেরিয়ে আসবে সেই মূর্তিমান অশুভ। লোকটা গলগল করে ঘামছে, অথচ তাও বুঝতে পারছি যে তার প্রবল ঠাণ্ডা লাগছে। কারণ সে তার হাতদুটোকে ক্রমাগত আগুনের কাছে নিয়ে যাচ্ছে—আর একটু এগোলেই ছ্যাঁকা লেগে যাবে। কিন্তু এই আগুনের কোনো ক্ষমতাই নেই ওর ভিতরে উথালপাথাল করতে থাকা ওই অশুভ শক্তির হিমশীতল নিষ্ঠুরতাকে দমন করার। লফ্টে উপুড় হয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমারও হাড় হিম হয়ে এল। লোকটা আগুনের এত কাছে এগিয়ে গেছে, এবার যে পুড়ে যাবে! কিন্তু ওর কোনো হুঁশপর্বই নেই। ভূতে ভর করেছে নাকি লোকটার উপর?
হঠাৎই যেন খুব শান্ত হয়ে গিয়ে ধীর পায়ে ঘরের মধ্যে পিছিয়ে এল ডিক্স। বুঝতে পারলাম ওর মনের মধ্যে চলতে থাকা উথালপাথাল শেষ হয়েছে। ভূতগ্রস্তের মতো নিজের চামড়ার বুটজোড়া খুলে সে রেখে দিল আগুনের পাশে। কী করতে চায় সে? নিভু-নিভু আগুনের আভায় আবার তার মুখ দেখতে পেলাম। চমকে উঠলাম। এ তো সেই আমাদের চির-পরিচিত ডিক্স নয়। কোথায় গেল সেই তেলতেলে ভাব? সেই আড়চোখে চোরা-চাহনি? সেই বিনয়ে গলে পড়া মুখ? এই মুখ প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়সংবদ্ধ, অবিচল। এক শয়তানি সাহসের আগুনে গনগন করছে এই মুখ। এই মুখ যেন বলতে চাইছে যে তার মালিক একবার যা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তাকে যেনতেন প্রকারে কাজে পরিণত না করে সে ছাড়বে না। এই ডিক্সকে আমরা কেউ চিনি না। আমার প্রবল ভয় করতে লাগল ডিক্সের এই মুখ দেখে।
ডিক্স ঘরের মধ্যে দু-বার দ্রুত পায়ে পায়চারি করল। জানলার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে কী যেন দেখল। বাইরের দরজায় কান পেতে শুনল কেউ আসছে কিনা। তারপর সতর্ক পায়ে লম্বা করিডরটার দিকে চলে গেল। আমি ভাবলাম লোকটা করে কী? জুতো না পরেই ঘোড়ার জিন আনতে চলে গেল নাকি? না, আমার চিন্তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ডিক্স ফিরে এল। তার হাতে আলুথালু হয়ে ঝুলছে ঘোড়ার জিনের তলায় পাতার একটা কম্বল। ধীর পায়ে ডিক্স এগিয়ে আসতে লাগল লফ্টের মইয়ের দিকে।
মুহূর্তের মধ্যে আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে তক্তার ফাঁকে চোখ রেখে শুধু দেখেই যাচ্ছি, আমার নড়াচড়া করার আর কোনো ক্ষমতা নেই। ডিক্স মইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। এবার আমার গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। আমি পরিষ্কার অনুভব করলাম আমার মুখের উপর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ওই কম্বলটা, আমার গলা টিপে ধরেছে ডিক্সের আঙুলগুলো। আমি আর দম নিতে পারছি না। ডিক্স মইয়ের প্রথম ধাপে পা রেখেছে। আমি মরে যাব।
আর ঠিক এই সময়ই বাইরে থেকে ভেসে এল একটা শব্দ। বহু দূরে রাস্তার উপর দিয়ে কে যেন ভীষণ বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। প্রচণ্ড তাড়া যেন তার, এক মুহূর্ত থামার সময় নেই।
ডিক্সও আওয়াজটা শুনেছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মই ছেড়ে সে ঘুরে দাঁড়াল। ঘোড়া আরও কাছে এসে পড়েছে। তার খুরের আওয়াজ যেন এত দূর থেকেও আমার কানে বাজ পড়ার মতো শোনাচ্ছে। হাওয়ার বেগে ছুটে আসছে ঘোড়াটা। এত তাড়া কেন এই ঘোড়সওয়ারের? খোদ শয়তান তাড়া করেছে নাকি তাকে? নাকি ঘোড়া আর সওয়ার দুজনেই পাগল হয়ে গেছে? ডিক্স ফ্যালফ্যাল করে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার দু-হাত কাঁধের দু-পাশে ঝুলে পড়েছে। এবার স্পষ্ট শুনলাম ঘোড়ার পায়ের তলায় থরথরিয়ে কেঁপে উঠল নদীর পুরোনো কাঠের সাঁকো। এই আওয়াজেই যেন ডিক্সের চটকা ভাঙল। সে লাফিয়ে উঠে তড়িঘড়ি করে তার ছেড়ে রাখা বুটজোড়া পায়ে গলাতে লাগল। তার চোখমুখ থেকে তখনও সেই অশুভ ঘোরের আগুন পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
ঘোড়াটা থামল সরাইয়ের সামনে এসে। পরমুহূর্তেই এক ধাক্কায় সরাইয়ের বন্ধ দরজা হাট করে খুলে ঝড়ের মতো ভিতরে ঢুকে এসে দাঁড়াল—আমার কাকা অ্যাবনার।
* * *
আমার কান্না পেয়ে গেল। চোখ ঝাপসা হয়ে এল, গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল। কাকাকে মনে হচ্ছিল যেন দেবদূত। কিন্তু আমি টুঁ শব্দটিও না করে যেমন ছিলাম তেমনই পড়ে রইলাম। কাকা দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল গোটা ঘরটার উপরে। ডিক্সের উপরেও তার দৃষ্টি পড়ল। মুখের উপর দিয়ে হাত চালিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে কাকা বলল, ‘যাক, ঠিক সময়ে এসে পড়েছি তাহলে!’
‘ঠিক সময় মানে?’ আগুনের সামনে থেকে ডিক্স বলে উঠল।
কাকা তার কথার সোজাসুজি জবাব দিল না। দেখলাম তার কাঁধের পেশী ফুলে কঠিন হয়ে উঠেছে। অদ্ভুত দৃঢ় গলায় সে বলল, ‘ডিক্স, তোমার মুখের এই অবস্থা হল কী করে বলো তো? আয়না থাকলে দেখাতাম। তোমার মুখ না শয়তানের মুখ বোঝা যাচ্ছে না।’
‘আমার মুখ যেমনই দেখাক, তাতে তোমার কী?’ রুক্ষস্বরে বলল ডিক্স।
কাকা নীচু, গম্ভীর গলায় বলল, ‘বাঃ! নতুন মুখের সঙ্গে মানানসই নতুন গলাও বেরিয়েছে দেখছি।’
ডিক্স দাঁত খিঁচিয়ে উঠে বলল, ‘কী ভেবেছটা কী তুমি? রাতবিরেতে যেমন খুশি ঘোড়া দাবড়ে এসে আমাকে শাসাবে? ইয়ারকি পেয়েছ? গোল্লায় যাও তুমি! শয়তানে টেনে নিক তোমায়।’
কাকার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। যখন সে কথা বলে উঠল তখন তার গলা আরও খাদে নেমে গিয়েছে।
‘বড্ড লম্বাচওড়া কথা বলে ফেললে ডিক্স। যাক গে, সে কথা এখন ধরছিই না। আমার এমনিও অনেক কথা বলার আছে।’
‘থাকুক!’ ডিক্স তেরিয়া মেজাজে বলল, ‘রাতভ’র এখানে বসে বসে প্রাণ ভরে কথা বলো তুমি। আমাকে যেতে হবে, দরজা থেকে সরো।’
এই বলে ডিক্স দরজার দিকে পা বাড়াল, কিন্তু কাকা এক চুলও নড়ল না। পাথরের মতো কঠিন, শীতল, গম্ভীর গলায় সে বলল, ‘কথা যে অনেক ডিক্স। তুমি চলে গেলে তো চলবে না, তোমার সঙ্গেই কথা কিনা। রাতও অনেক বাকি। চলো, দিনের আলো ফোটা পর্যন্ত একটু গল্পগুজব করা যাক।’
ডিক্সের চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে রাগে। রাগের চোটে কথা বলতে গিয়ে তুতলেই গেল সে।
‘ত্-তার মানে? তুমি আমাকে জোর করে ধরে রাখবে নাকি?’
‘সাধারণত কারোর উপর জোর আমি খাটাই না। তবে দরকার পড়লে খাটাতে হয় বই-কি। আমার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি এই ঘর ছেড়ে এক পা-ও এগোবে না।’
কাকার গলায় যেন নাভাজো ইন্ডিয়ানদের দামামা বেজে উঠেছে। নিষ্ফল আক্রোশে রাগি বেড়ালের মতো ফুঁসতে লাগল ডিক্স। দশাসই চেহারার অ্যাবনারের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো ক্ষমতা তার নেই। সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল। আমি জানি ও কী খুঁজছে। একটা অস্ত্র—যে কোনো অস্ত্র—যা নিয়ে ও কাকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে। ডিক্স মনে মনে আক্ষেপ করছে নিজের খ্যাংরাকাঠির মতো শরীরটা নিয়ে, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। হাতের কাছে কিছুই না পেয়ে জ্বলন্ত চোখে কাকার দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করে গালাগালি দিতে লাগল। কাকা স্থির দৃষ্টিতে ওকে দেখতে দেখতে আঙুল তুলে আগুনের ধারের চেয়ারটা দেখিয়ে শুধু বলল, ‘বোসো চুপটি করে।’
ঘোড়ার কম্বলটা হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে থমথমে মুখে চেয়ারটায় গিয়ে বসল ডিক্স। কাকাও এবার দরজা ছেড়ে এগিয়ে এল। ফায়ারপ্লেসে সে একটা বড়ো কাঠ ফেলে দিতেই আবার নতুন করে প্রাণ পেয়ে লাফিয়ে উঠল অগ্নিশিখা। গা থেকে জবরজং গ্রেটকোটটা খুলে কাকা বসল আগুনের সামনে ডিক্সের মুখোমুখি আর একটা চেয়ারে। খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর কাকা বলল, ‘ডিক্স, তুমি ঈশ্বরের বিচারে বিশ্বাস করো?’
‘তোমার বুকনি শুনব বলে এখানে এসে বসিনি আমি, মোদ্দা কথা কিছু থাকে তো বলো,’ ডিক্স অধৈর্য গলায় বলল।
আরও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কাকা বলল, ‘কী আর বলি বলো? তোমার কপালটাই বড়ো মন্দ, তাই না?’
‘কপাল তো না, নরক!’ দাঁতে দাঁত চেপে ডিক্স বলল।
‘ঠিক! নরকই বটে! ভালো বলেছ। আজ তোমার পকেটে একটা ডলারও নেই। সব টাকা তুমি খুইয়েছ। তোমার অংশীদার অ্যালকায়ার রাখালদের সব টাকা নিয়ে সটকে পড়ল নদীর ওপারে, আর তুমি সর্বস্বান্ত হলে। তারপর অত বড়ো জমি তোমার—তাও শেষে তোমার হাতছাড়া হল মামলায়। তোমার হাতে তো অনেক টাকাই এসেছিল শুনেছি। কী করে পেলে বলো তো তুমি অত টাকা?’
ডিক্স তেতো গলায় বলল, ‘আর কতবার বলব? বলেছি তো আমার আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ধার করেছিলাম। নদীর ওপারে থাকে যারা।’
কাকা মুচকি হেসে বলল, ‘তা বটে! এ তো জানা কথাই। তবে আমি আরও একটা কথা জানি, জানো? বলছি… কিন্তু তার আগে তোমাকে এই জিনিসটা দেখাই।’
নিজের পকেট থেকে একটা ছোটো কলম-কাটা ছুরি বার করে ডিক্সের চোখের সামনে তুলে ধরে কাকা বলল, ‘আমি কিন্তু ঈশ্বরের বিচারে একশোভাগ বিশ্বাস করি।’
‘তা জেনে আমি কী করব?’
‘কারণ তার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে। আমি অন্য যে কথাটা জানি সেটা শুনবে না?’
‘কী জানো তুমি?’
‘তোমার অংশীদার কোথায় আছে তা জানি।’
ডিক্স ভাবলেশহীন মুখে অ্যাবনারের দিকে তাকিয়ে রইল পাঁচ সেকেন্ড। তারপর শ্লেষভরা গলায় বলল, ‘বাঃ! বাঃ! যা কেউ জানে না তা তুমি জানো? তুমি কি জাদুকর নাকি?’
‘তা বলতে পারো,’ কাকা স্থির চোখে পাথুরে গলায় উত্তর দিল, ‘আমি একাই নই, আরও একজন জানে সে কোথায় আছে।’
‘তাই নাকি? কে?’
‘তুমি।’
ডিক্স কাকার দিকে ঝুঁকে বসল। সরু চোখে খানিকক্ষণ তাকে মেপে নিয়ে বলল, ‘তুমি পাগল হয়ে গেছ অ্যাবনার। অ্যালকায়ার কোথায় তা যদি আমি জানতাম তাহলে আমিই সবার আগে তাকে খুঁজতে যেতাম।’
‘না ডিক্স, তা তুমি পারতে না। বরং আমিই যদি আর পাঁচ মিনিট পর এই ঘরে এসে পৌঁছোতাম তাহলেই বরং তোমাকে অ্যালকায়ারকে খুঁজতে যেতে হত।’
কথাগুলো বলার সময় কাকার চোখ এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল। ডিক্সকে কিছু বলতে না দিয়েই সে কথা বলে চলল।
‘আমি যখন শুনি যে তুমি গবাদি পশুর ব্যাবসার জন্য অংশীদার খুঁজছ তখন আমি অনেক দূরে। আমি তোমার কাছেই সে প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাগ্য ছাড়া আর কী বলব? পথে বিগ রানের কাছে আমার ঘোড়ার জিনের চামড়ার স্ট্র্যাপটা গেল ছিঁড়ে। সেটা ঠিক করার জন্য একটা ছুরির দরকার ছিল, তাই ওখানকার দোকান থেকে এই ছুরিটা আমি কিনি। সেখানেই শুনলাম যে অ্যালকায়ারও নাকি তোমার সন্ধানে গেছে। সেই শুনে আমি আর তোমার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম না… সেই জন্যই বোধ হয় আমি আজ উধাও না হয়ে গিয়ে এখানে বসে আছি… ওই ছেঁড়া জিনের স্ট্র্যাপটা না এই ছুরিটা, কাকে যে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারি না। জানো ডিক্স, ঈশ্বর আমাদের প্রত্যেকের ভার দিয়ে রেখেছেন একজন না একজন দেবদূতের উপর। কিন্তু আমরা সেই দেবদূতকে দেখতে পাই না। তাই ঈশ্বরকে মাঝে মাঝে নিজের হাতে আমাদের চোখ খুলে দিতে হয়। মানুষের এতটা অন্ধ হওয়াও ভালো কথা নয়।… যেদিন অ্যালকায়ার উধাও হয়ে যায় সেদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। সে তোমার বাড়িই যাচ্ছিল। পথে ব্রিজের কাছে তার ঘোড়ার জিনের চামড়ার স্ট্র্যাপটাও ছিঁড়ে যায়। আমি যখন তাকে দেখি তখন সে সেটা মেরামত করার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমার কাছে সে একটা ছুরি চাইল। এই—এই ছুরিটাই তাকে দিয়ে আমি এগিয়ে যাই। তখন সবে ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।… আবার সেই দেবদূত আমাকে কৃপা করেছিলেন বোধ হয়। তার পর আমি আর অ্যালকায়ারকে কখনও দেখিনি।’
‘কেউই আর তাকে দেখেনি। সেই রাতেই সে পাহাড় ডিঙিয়ে সটকে পড়েছিল,’ ডিক্স বলল।
‘না,’ অ্যাবনার বলল, ‘সেই রাতে না। দিনের বেলাতেই রওনা দিয়েছিল অ্যালকায়ার।’
‘দিনের বেলা? তাহলে তো যে কেউই তাকে দেখতে পেত।’
‘সে পথে আর কেউ ছিল না যে দেখতে পাওয়ার মতো। তবে তাকে রওনা করিয়ে দিয়েছিলে তো তুমিই। আর সে একাও যায়নি।’
‘কী বাজে বকছ? অ্যালকায়ার আমার টাকা মেরে একাই পালিয়ে গিয়েছিল।’
‘না ডিক্স,’ অ্যাবনারের গলায় আবার গুরুগুরু দামামা বেজে উঠল যেন, ‘তার সঙ্গী যে হয়েছিল তাকে কেউই দেখতে পায় না। বলা ভালো কেউই দেখতে চায় না। কিন্তু তারই হাতে তুমি অ্যালকায়ারকে তুলে দিয়েছিলে। বুঝতে পারছ না আমি কী বলছি? নিশ্চয় পারছ, কিন্তু স্বীকার করবে না।’
রাগে কি ভয়ে বুঝতে পারলাম না, ডিক্স হঠাৎ থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। তার ভ্রূ কুঁচকে উঠেছে, সারা শরীর টান-টান। কিন্তু সে কিছু বলল না। আবার কথা বলতে শুরু করল আমার কাকা অ্যাবনার।
‘এর দু-দিন পর আমি টেন মাইল এলাকায় যাচ্ছিলাম তোমার জমির ভিতর দিয়েই। তোমার বাড়ির পশ্চিমে যে সরু উপত্যকাটা আছে তার মধ্যে দিয়ে গেলে রাস্তা একটু কম পড়ে, জানোই তো। ওই রাস্তার মধ্যে এক জায়গায় একটা আপেলগাছ আছে, মনে পড়ছে? সেইখানে হঠাৎ একটা জিনিস আমার চোখে পড়ল। ঠিক পাঁচ মিনিট লাগল আমার বুঝতে, যে সেখানে ঠিক কী হয়েছিল।… ওখান দিয়ে আমার আগে একজন ঘোড়সওয়ার গিয়েছিল। তারপর আপেলগাছের তলা দিয়ে যাওয়ার সময় এমন কিছু হয় যাতে ঘোড়াটা ভয় পেয়ে দৌড় মারে। আমি বুঝলাম যে ঘোড়সওয়ার গাছের তলায় থেমেছিল, কারণ দেখলাম আপেলগাছের মাঝামাঝি উচ্চতায় একটা বড়ো ডাল কেটে নেওয়া হয়েছে। সেই ডাল থেকে বেরোনো ছোটখাটো শাখাপ্রশাখাগুলো রাস্তার একপাশে ডাঁই হয়ে পড়ে থাকতেও দেখলাম। হয়তো ঘোড়াও পাতা খাচ্ছিল, আর তার সওয়ার খাচ্ছিল আপেল। তার মানে ঘোড়াটা বেশ খানিকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়েও ছিল। আর দেখলাম ঘোড়াটা হঠাৎ ভয় পেয়ে লাফ মেরে দৌড়ে পালিয়েছে—লাফিয়ে ঘোড়াটা যেখানে পা দিয়েছিল সেখানে তার খুরের চাঁটে মাটি উপড়ে এসেছে। মিনিট দশেক পর আমার কাছে এও পরিষ্কার হয়ে গেল যে ঘোড়াটা যখন লাফ মারে তখন তার সওয়ার আর তার পিঠে ছিল না। কেন, কীসের ভয়ে ঘোড়াটা লাফ মেরেছিল তাও বুঝতে পেরে গেলাম আমি।
‘কী করে বুঝলাম জানতে চাও ডিক্স? শোনো তবে। আমি আমার ঘোড়াটায় চেপে ওই আগের ঘোড়ার পায়ের ছাপ ধরে ধরে চললাম। আপেলগাছের তলার মাটি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম। দেখলাম পথের ঠিক পাশে এক জায়গায় জমির আগাছা একদম দলেমুচড়ে মাটিতে মিশে গেছে। ঠিক যেমনটা হয় যদি অনেকক্ষণ ধরে বড়োসড়ো শরীরের কোনো প্রাণী জমির উপর শুয়ে থাকে—বা পড়ে থাকে। আর ওই জায়গাটার ঠিক মাঝখানে—বড়ো আশ্চর্য!—দেখলাম বেশ খানিকটা আলগা মাটি। এ মাটি এসেছে ওই প্রাণীটা ওখান থেকে সরে যাওয়ার পরে, কারণ তা না হলে ওই মাটিও আগাছার মতোই একেবারে মাটিতে মিশে যেত, আলাদা করে তাকে চেনাই যেত না। তবে আগাছার ঝোপের উপর এই আলগা মাটি কোথা থেকে এল?
‘আমি আরও খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। আপেলগাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরে খুঁজে পেলাম একটা উইঢিবি। মজার কথা হল, ঢিবিটার মাথার দিকের অনেকটা নেই। কেউ যেন হাতে করে সেখান থেকে বেশ খানিকটা মাটি তুলে নিয়ে গেছে। আমার আন্দাজ মিলে গেল। উইঢিবির মাটি আর আগাছার উপর পড়ে থাকা ওই মাটি—এক! তখন আমার সন্দেহ হল। আগাছার উপর পড়ে থাকা মাটি সরিয়ে ফেললাম আমি। কী দেখলাম জানো? তার নিচের আগাছাগুলো কে যেন লাল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। লাল! টকটকে লাল! ওখানে অত লাল রঙ কী করে এল বলো তো ডিক্স?’
ডিক্স মন্ত্রমুগ্ধের মতো অ্যাবনারের কথা শুনছিল। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি কী করে জানব? আমি কি সেখানে ছিলাম?’
ডিক্সের গলা কি একটু কেঁপে গেল? কাকা মুচকি হেসে আপন মনে বলল, ‘তা তো বটেই। তুমি আর কী করে জানবে? তুমি তো সেখানে ছিলেই না।… যাই হোক, গল্পে ফিরি। ওই আপেলগাছ থেকে প্রায় বিশ গজ দূরে একটা লম্বা বাঁশের বেড়া আছে, মনে পড়ছে নিশ্চয়? তোমার মনে পড়বেই—তোমারই জমি আর তোমারই লাগানো বেড়া যখন। ওই বেড়ার পিছনে আমি আর একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। এক জায়গায় দেখি জমির ঘাসপাতা আর আগাছার ঝোপ একই রকমভাবে মাটিতে মিশে গিয়েছে। ওইখানেও যেন কেউ অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে ছিল। না, সেখানে কোথাও লাল রঙের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। খালি চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে ওই জায়গাটা থেকে সোজাসুজি—মাটি থেকে একটু উপর দিকে মুখ করে—একটা অদৃশ্য লাইন টানলে সেটা গিয়ে ঠেকবে ঠিক আপেলগাছের ওই কাটা ডালটার একটু নিচে। আমার চোখের আন্দাজ ভুল হয় না, তুমি জানো। তাও সাবধানের মার নেই, তাই আমি নিজেই এবার ঘোড়ায় চড়ে গাছের কাটা ডালের নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম। কী বুঝলাম বলো তো? বুঝলাম যে বেড়ার ধার থেকে টানা অদৃশ্য লাইনটা যাচ্ছে আমার ঠিক নাভির মধ্যে দিয়ে।… অ্যালকায়ারের চেয়ে আমি চার ইঞ্চি লম্বা, জানো তো?’
ছিলাছেঁড়া ধনুকের মতো লাফিয়ে উঠল ডিক্স। তার মুখে গালাগালির বন্যা বয়ে যেতে আরম্ভ করল। এদিকে তার মুখ আবার ঘামে ভেসে যেতে শুরু করেছে।
‘বাঃ! বাঃ! চমৎকার! আমি নাকি অ্যালকায়ারকে গুলি করে খুন করেছি! অ্যাবনার, এবার তুমি চাষবাস ছেড়ে ওকালতি শুরু করো হে, তোমায় ওটাই মানাবে ভালো। কেন, আমার জমির কোনো ভাগচাষি আপেলগাছের তলায় একটা বাছুর বা ছাগল মারতে পারে না? সেই রক্ত দেখে ভয় পেয়ে তাদেরই একটা ঘোড়া লাফিয়ে পালিয়ে যেতে পারে না? ওই রক্তের দাগ মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলা যেতে পারে না, যাতে আর কোনো ঘোড়া ভয় না পায়? আর তুমি কিনা আমাকে খুনি বলে সন্দেহ করো? আমাকে? আমারই টাকা চোট করে অ্যালকায়ার পালাল, আর আমিই কিনা হলাম খুনি? বাঃ বাঃ বাঃ!!! কী বুদ্ধি তোমার অ্যাবনার! তা বাপু, এত বড়ো বড়ো কথা তো বলছ—এই প্রশ্নটার জবাব দাও তো দেখি। আমিই যদি অ্যালকায়ারকে খুন করে থাকি তবে তার মৃতদেহটা কোথায় গেল? আমি তো আর জাদুকর নই, তাই না? তাহলে মৃতদেহটা কি পাতালপ্রবেশ করল, নাকি মিলিয়ে গেল হাওয়ায়?’
অ্যাবনার বলল, ‘অনেকটা সেই রকমই। তবে অ্যালকায়ারের দেহ কবরেও যায়নি, আগুনেও পোড়েনি, বাতাসে মিলিয়েও যায়নি।’
দাঁত খিঁচিয়ে ডিক্স বলল, ‘হেঁয়ালি না করে সোজাসুজি উত্তর দাও। কোথায় গেল অ্যালকায়ারের দেহ?’
‘সেটা তুমি তোমার নিজের ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়ে গিয়ে রেখে এসেছিলে অন্য জায়গায়।’
ডিক্স চেঁচিয়ে বলল, ‘ব্যস্! যথেষ্ট হয়েছে, আর একদম মিথ্যে কথা বলবে না তুমি! শোনো অ্যাবনার, অ্যালকায়ার যদি খুনই হয়ে থাকবে আর ওর ঘোড়াটা যদি পালিয়েই গিয়ে থাকবে তাহলে তো কেউ না কেউ সেটাকে দেখতে পাবে—তাই না? কিন্তু সেটাকে কেউ দেখেনি। কেন জানো? কারণ অ্যালকায়ার ওই ঘোড়ায় চড়েই পাহাড় ডিঙিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ হ্যাঁ, রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গিয়েছিল!!! আর তুমি এখন তাই নিয়ে এই সব বস্তাপচা গল্প ফেঁদে বসেছ! যত্তসব পাগলের কারবার!’
শান্ত গম্ভীর গলায় কাকা বলে চলল, ‘এত চেঁচামেচি করলে শুনবেটা কখন? সব প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছি। সত্যি কথা বলতে কী, তুমি এত বড়ো একটা কাজ আগাগোড়া একেবারে একা হাতে কী করে এমন নিপুণভাবে করলে সেটা ভেবে অবাকই হচ্ছি আমি।’
ডিক্স হো হো করে হেসে বলল, ‘তার মানে তুমি বলতে চাও যে আমি একা হাতে অ্যালকায়ারকে শুধু খুনই করিনি, তার এবং আস্ত একটা ঘোড়ার মৃতদেহও বয়ে নিয়ে গিয়ে কোথাও লুকিয়ে ফেলেছি? আর এই গোটা ঘটনাটা কাকপক্ষীতেও টের পায়নি? অ্যাবনার, তুমি ঠিক কতটা বোকার মতো কথা বলছ বুঝতে পারছ? মরা ঘোড়ার কথা বলতে পারব না, তবে এসব শুনলে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তোমার জ্যান্ত ঘোড়াটা পর্যন্ত হেসে ফেলবে!’
কাকা যেন ডিক্সকে পাত্তা না দিয়েই বলে চলল, ‘অবশ্য একেবারে একা তুমি ছিলে না। খুনের প্রমাণ লোপাট করতে তোমাকে অনেকে সাহায্য করেছিল। তারা পঞ্চাশ বছর আগে মরে গেছে।’
ডিক্স খানিকক্ষণ কাকার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার অট্টহাসি হেসে বলল, ‘নাহ্, তুমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছ অ্যাবনার। শুধু আমাকে খুনি অপবাদ দিয়েই তোমার শান্তি হচ্ছে না, তুমি আবার ভূতপ্রেতকে সেই খুনের সাক্ষী মানছ? আচ্ছা, এ সব ফালতু কথা বলে কোনো লাভ আছে? যাও—তুমি যাও, শেরিফের কাছে গিয়ে এই কথা বলে আমার নামে খুনের নালিশ করো—দ্যাখো শেরিফ তোমার এই ‘পঞ্চাশ বছর আগে মরে যাওয়া’ সাক্ষীদের কথায় আমল দেয় কিনা।’
কাকা খুব অদ্ভুত চোখে ডিক্সের দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার সে বলল, ‘আচ্ছা ডিক্স, তুমি তো একবারও জানতে চাইলে না, আমি কেন সন্দেহ করলাম যে ওখানে অন্য কেউ নয় অ্যালকায়ারই খুন হয়েছে?’
ডিক্স একটু থতোমতো খেয়ে গেল যেন। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘কেন?’
‘কারণ,’ অ্যাবনার ধীর গলায় বলল, ‘রাস্তার ধারে পড়ে থাকা আপেলপাতার স্তূপের মধ্যে আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম এই ছুরিটা, যেটা আমিই অ্যালকায়ারকে দিয়েছিলাম।’
ডিক্স হঠাৎ কিছু না বলে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের টুপি পরে নিল। তার মুখে আর হাসির লেশমাত্রও নেই। চেয়ারের পিঠ থেকে তার গ্রেটকোটটা টেনে নিয়ে নিজের গায়ে চড়াতে যাবে, এমন সময় বাজের মতো আছড়ে পড়ল কাকার গলা।
‘দাঁড়াও ডিক্স! আমার কথা এখনও শেষ হয়নি। রাতও অনেক বাকি। পুরো গল্পটা শুনে তারপর এ ঘর থেকে বেরোবে তুমি।’
থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে খড়ের পুতুলের মতো ডিক্স ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল আবার। কাকা বলে চলল।
‘অ্যালকায়ারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এই ঘটনার আগের আগের দিন বিকেলে। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল, আগেই বলেছি। তার পরের দিন, মানে আমার আপেলগাছের কাছে উপস্থিত হওয়ার আগের দিন বৃষ্টি হয়নি। আমি জানতাম যে এই ঘোড়সওয়ার ওখান দিয়ে গেছে বৃষ্টির পরের দিনই, নইলে ঘোড়ার খুরের গর্তে বৃষ্টির জল জমে থাকত। আর আগের রাতের বৃষ্টিতে উইঢিবিও নরম হয়ে ছিল, কাজেই সেখান থেকে সহজে মাটিও তুলে নেওয়া গিয়েছিল। আর তারপর যখন এই ছুরিটাও পেলাম তখন তো পরিষ্কার বুঝে গেলাম যে এইখানে যে খুন হয়েছে সে অ্যালকায়ার ছাড়া আর কেউ নয়। এইটুকু বুঝতে আমার মাত্র পনেরো মিনিট সময় লেগেছিল।
‘সে যাই হোক, আমি তারপর ঘোড়ার পিঠে উঠে পালিয়ে যাওয়া ঘোড়াটার পায়ের ছাপ ধরে চলতে শুরু করলাম। ঘোড়াটা বেশ খানিকক্ষণ দৌড়েছে। তারপর ক্রমে তার গতি কমে এসেছে। অবশেষে সে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছে গেছে পশ্চিমে যেখানে ছোট্ট একটা ঝরনা বয়ে যাচ্ছে সেইখানে। এইখানে এসে আমি কী দেখলাম বলো তো? দেখলাম ঘোড়ার খুরের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মানুষের পায়ের ছাপ। সেই মানুষের পায়ের ছাপ—এখন আমি জানি যে সেগুলো তোমারই পায়ের ছাপ—ঘোড়ার খুরের সামনে সামনে চলেছে। তুমি ঘোড়াটাকে নিয়ে ঝরনা পেরিয়েছিলে। ঝরনার ওপারে জমি ঢালু হয়ে একটা টিলার মতো তৈরি করেছে। সেই টিলার মাথা-জুড়ে আছে ঘন ফলবাগিচা। ওখানে খুব একটা কেউ যায় না। আজ এটা ফলবাগিচা হলেও প্রায় একশো বছর আগে এখানে এক পরিবার বাড়ি বানিয়েছিল। গাছগাছালির মধ্যে সেই বাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও টিকে আছে। এই জায়গাটাও তোমারই জমির মধ্যে পড়ে, কাজেই এ সব কথা তোমার না জানার কোনো কারণ নেই। এই জায়গাটায় তোমার পা নিশ্চয় পড়েছে আগে, নইলে তুমি ঘোড়াটাকে ঠিক এইখানেই নিয়ে আসতে না। অ্যালকায়ারের মৃতদেহও তোমার সঙ্গে ছিল।
‘আমি ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়লাম বাড়ির পিছন দিকে। এককালে এখানে প্রশস্ত উঠোন ছিল, কিন্তু এখন এর চারপাশে ঘন জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে। গাছগাছালি এখনও মাঝখানের জায়গাটাকে পুরো গ্রাস করতে পারেনি। এইখানেই দু-দুটো বেখাপ্পা জিনিস আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এক, এক জায়গায় বেশ অনেকখানি জুড়ে ঘাসমাটি ফেলা হয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কাজটা হয়েছে ইদানীংকালের মধ্যেই। কৌতূহলের বশে সেই ঘাসমাটি অল্প সরালাম। না ডিক্স, নিচে কোনো গর্ত দেখতে পাইনি আমি। অত কাঁচা কাজ তুমি করবে না, আর তার দরকারও পড়েনি তোমার। দেখলাম ঘাসমাটির চাপড়ার নীচের মাটির রং সেই একইরকম টকটকে লাল। এবারে পার্থক্য শুধু এই যে আপেলগাছের তলার চেয়ে এখানে লালের পরিমাণ অনেক, অনেকটা বেশি।
‘দ্বিতীয় যে জিনিসটা আমার চোখ টানল তা এই ঘাসের চাপড়ার বিছানো অংশের ঠিক পাশেই পড়ে থাকা একটা প্রকাণ্ড পাথরের স্ল্যাব। বহু পুরোনো পাথর, গায়ে শ্যাওলা জমে গেছে। তা এর মধ্যে বেখাপ্পার কী আছে? বেখাপ্পা হল এই যে পাথরটা পুরোনো, তার গা ভর্তি শ্যাওলা, তার আশপাশে উঠোন জুড়ে শ্যাওলা—অথচ পাথরটা যেখানে মাটির সঙ্গে লেগে আছে সেইখানে কোথাও—কোথাও—শ্যাওলার দল মাটি থেকে পাথরের গায়ে উঠে যায়নি। গোটা পাথরের গা জুড়েই তাই—পাথরে শ্যাওলা আছে, মাটিতে শ্যাওলা আছে, কিন্তু পাথর আর মাটির মাঝখানের চুলের মতো ফাঁকটুকু এই মহাশক্তিধর শ্যাওলা দখল করতে পারেনি। কেন জানো ডিক্স? কারণ ওই পাথরটা ওখানে আগে ছিল না। ওই পাথরটা আসলে ছিল যেখানে এখন নতুন ঘাসের চাপড়া পড়ে আছে সেইখানে। পাথরটা এইখানে এনে বসানো হয়েছে। বসিয়েছ তুমি—হয়তো ওই ঘোড়াটাকে দিয়েই টানিয়ে—কারণ ওটা দিয়ে এইখানে একটা কিছু লুকোনোর দরকার ছিল তোমার।’
ডিক্সের মুখ ছাইবর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। এতক্ষণ ধরে তাকে চাগিয়ে তুলে রেখেছিল যে সাহস এখন তাতে ভাটা পড়তে শুরু করেছে বুঝতে পারলাম। ভাঙা ভাঙা গলায় সে বলল, ‘অ্যাবনার, তুমি কি পাথরটা সরিয়ে দেখেছিলে?’
কাকা বলল, ‘না, তার দরকার পড়েনি। আমি জানি ওটার তলায় কী আছে। একশো বছর আগে বাড়ির পিছনের উঠোনে আর কিছু থাকুক বা না থাকুক একটা কুয়ো থাকতই। আর একশো বছর পরে সে কুয়োর পাড় ভেঙে গিয়ে সেই কুয়োর গর্তটা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। এই পরিত্যক্ত কুয়োটার জন্যই তো তোমার এত জায়গা থাকতে ঘোড়াটাকে নিয়ে এইখানে যাওয়া, তাই না ডিক্স? তুমি প্রথমে অ্যালকায়ারের মৃতদেহ ফেললে কুয়োর ভিতরে। তারপর অল্প ঠেলাঠেলি করে পাথরটা নিয়ে গেলে কুয়োর একেবারে ধারে। হয়তো ঘোড়াটাকেও কাজে লাগিয়েছিলে। পাথরের ফাঁকা জায়গাটা ন্যাড়া হয়ে পড়ে রইল। কেউ যাতে সন্দেহ না করে তাই এই জায়গাটা তোমাকে যে করেই হোক ঢেকে ফেলতেই হত। তুমি ততক্ষণে ঠিক করে ফেলেছ যে রটিয়ে দেবে অ্যালকায়ার রাখালদের টাকা মেরে, তোমার সঙ্গে চিটিংবাজি করে, রাতের অন্ধকারে ঘোড়ায় চেপেই পালিয়ে গেছে। কাজেই তার ঘোড়াটাকেও হাপিস করে দিতেই হবে। তাই তুমি ঠিক করলে এক ঢিলে দুই পাখি মারবে। তুমি ঘোড়াটার গলার নলি কেটে ফেললে ঠিক ওই ন্যাড়া জায়গাটার উপর। তারপর অনেকটা জায়গা জুড়ে নতুন ঘাসের চাপড়া ফেলে দিলে। ব্যস্, রক্তের দাগ, ঘোড়ার খুরের ছাপ আর পাথরের ঘষটানির চিহ্ন—সব লোপাট। ঘোড়ার শরীরটারও গতি হল তার মালিকেরই সঙ্গে—ওই কুয়োর মধ্যে। তারপর তুমি আর একটু ঘাম ঝরিয়ে পাথরটা কুয়োর গর্তের মুখে বসিয়ে দিলে—একেবারে খাপে খাপ! শুধু একটা কথা তোমার মাথায় আসেনি, যে পাথর আর মাটির ফাঁকে রাতারাতি শ্যাওলা গজিয়ে উঠতে পারে না। ওইটুকু ফাঁক না থাকলে আমি বুঝতেও পারতাম না যে অ্যালকায়ার খুন হয়ে ওইখানে শুয়ে আছে।’
‘অ্যাবনার, থামো! চুপ করো! চুপ!’
প্রায় ককিয়ে কেঁদে উঠল ডিক্স। আমি এত দূর থেকেও দেখতে পাচ্ছিলাম যে তার মুখে খেলা করছে এক অব্যক্ত ভয়। ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো ইতিউতি দৌড়াচ্ছিল তার দু-চোখ। ফিসফিস করে সে বলল, ‘তুমি যদি এত কিছুই জানো তবে আমার নামে শেরিফের কাছে নালিশ করোনি কেন?’
‘কারণ,’ কাকা বলল, ‘তখনও আমি বুঝিনি যে এই মহাপাপ তুমিই করেছ। আমার তোমার উপর সন্দেহই হয়নি আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় স্বয়ং ঈশ্বর আমার চোখ খুলে দিলেন। এর আগে দু-দুবার তিনি আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন, আমাকে বাঁচিয়েছেন, আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু আমি অপদার্থ, তাই সেই ইঙ্গিত পাওয়া সত্ত্বেও আমি অ্যালকায়ারকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু আজ… আজ সন্ধ্যায় আমার বাড়ির সামনে ঘটল আবার সেই ঘটনা। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে মার্কসের ঘোড়ার জিনের চামড়ার স্ট্র্যাপটা ছিঁড়ে গেল, আর সে আমারই বাড়িতে এসে আমারই কাছ থেকে চাইল একটা ছুরি। তার মুখেই শুনলাম পথে আমার ভাইপো মার্টিনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, আর তুমি নাকি মার্টিনের সঙ্গী হয়েছ। মার্কসের কথাটা শুনে আমার মাথায় টনক নড়ে উঠল। আবার জিনের চামড়ার স্ট্র্যাপ! আবার ছুরি! এ কি নিতান্ত কাকতালীয় ঘটনা? নাকি ঈশ্বরের পাঠানো ইঙ্গিত? ঈশ্বর তো আর শুধু জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে বিরাজ করেন না, তাঁর অধিষ্ঠান হল তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এই মানুষের বুদ্ধিতে। সব ঘটনাগুলো লাইন ধরে একটা ছকে পড়ে যেতে লাগল আমার মনের মধ্যে। অ্যালকায়ার তোমার অংশীদার ছিল। সে খুন হয়েছে তোমারই জমিতে, আর আজও তার দেহ গুম হয়ে পড়ে আছে তোমারই এলাকার মধ্যে। তাকে মারার মোটিভ আর সুযোগ তোমার চেয়ে ভালো আর কারোর ছিল না। লোকে জানে রাখালদের টাকা মেরে অ্যালকায়ারও উধাও হয়েছে, তুমিও তোমার আত্মীয়দের থেকে অনেক টাকা পেয়েছ, আর এখন আবার ফিরেফিত্তি সর্বস্বান্ত হয়েছ। আসলে তুমিই রাখালদের ঠকিয়েছিলে ডিক্স। তারপর সেই দোষ অ্যালকায়ারের ঘাড়ে চাপিয়ে, তাকে খুন করে, সেই টাকা আত্মসাৎ করেছিলে। তারপর নিজের দোষেই তুমি আবার সব হারিয়েছ—ঈশ্বর তোমাকে শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু তোমার চোখ এখনও খোলেনি ডিক্স। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে তুমি আজও সুযোগ পেলেই শয়তানের চামচাগিরি করবে, আর সে সুযোগও তোমার আসবে আজই রাতে। মার্কস আমাকে তোমার কথা বলামাত্র আমি বুঝে গেছিলাম যে এবার তুমি নিশানা করবে ওই দুধের শিশু আমার ভাইপোকে, কারণ মার্টিনের সঙ্গের থলেগুলো তোমার শকুনের চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না।’
ডিক্সের শরীরটা চেয়ারে অবশভাবে এলিয়ে পড়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে যন্ত্রণায় কুঁচকে গেছে, সে অস্থিরভাবে ঘন ঘন হাত কচলাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে তার শরীরে আর এতটুকু প্রাণশক্তি অবশিষ্ট নেই। কাকা এইবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ফায়ারপ্লেসের অগ্নিশিখা এতক্ষণে আবার থিতিয়ে এসেছে। কাকার মুখে সেই নিভু-নিভু আগুনের আভা যেন এক দৈব ক্রোধের ঢেউয়ের মতো খেলে যাচ্ছিল। ডিক্সের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেওয়া মেঘমন্দ্র কণ্ঠে সে বলে উঠল, ‘কিন্তু তা তো আমি হতে দেব না ডিক্স। আমি বেঁচে থাকতে শয়তান তোমার হাত দিয়ে ঈশ্বরের তৈরি এই পৃথিবীর আর এক কণা ধুলোও ওলটপালট করতে পারবে না।’
ডিক্স চেয়ারে বসে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। তার মুখ নীচু, দু-হাতের পাতায় ঢাকা। কাকার মুখ কঠিন। তার কপাল ভ্রূকুটিকুটিল হয়ে উঠেছে, চোখে বিদ্যুৎ খেলছে। তার কাঁধ আর ঘাড়ের পেশীগুলো ফুলে কঠিন হয়ে উঠেছে। তার ডানহাতটা সামান্য নড়ে উঠে ঢুকে গেল কোটের পকেটে। ঠিক তখনই কাঁপতে কাঁপতে ডিক্স আছাড় খেয়ে পড়ল তার পায়ের সামনে। কেঁদে উঠে কাকার বুটের উপর মুখ ঘষতে লাগল। হাহাকার করে বলে উঠল—
‘অ্যাবনার! অ্যাবনার, আমাকে বাঁচাও! আমি বিরাট বড়ো ভুল করেছি! আমি মহাপাপ করেছি! আর কখনও এমন পাপ করব না আমি। আমাকে বাঁচাও! আমাকে—আমাকে মেরে ফেলো না! আমাকে ধরিয়ে দিও না! দয়া করো, দয়া করো! আমাকে বাঁচতে দাও—বাঁচতে দাও!’
কাকার পায়ে মাথা কুটতে কুটতে হাউহাউ করে কাঁদতে থাকল ডিক্স। আমি চিত্রার্পিতের মতো লফ্ট থেকে এই অদ্ভুত নাটকের অভিনয় দেখে যাচ্ছি। কাকা পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিশ্চল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি সামনে ফায়ারপ্লেসের আগুনের মধ্যে নিবদ্ধ। অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে তার পায়ের কাছে ওলটপালট খেতে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘ওঠো ডিক্স। অ্যালকায়ার একজন ভালো, সৎ মানুষ ছিল। প্রার্থনা করি তার নিজের সৎ কর্মের পুণ্যবলেই ঈশ্বর তাকে নিজের কোলে ঠাঁই দিয়েছেন। তুমি যে পাপ করেছ তার সাজা তুমি পাবেই, কিন্তু সে সাজাও দেবেন ঈশ্বরই। আমার তাঁর হয়ে বিচার করার কোনো অধিকার নেই—আমি তাঁর দাস মাত্র। যাও, তোমাকে ছেড়ে দিলাম।’
ডিক্স জলভরা চোখে এই প্রথম মুখ তুলে তাকাল কাকার দিকে। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না অ্যাবনার বলে এই মানুষটাকে। তারপর যেন কথাগুলোর মানে তার মগজে আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে থাকল। দেখলাম আবার তার মুখে ফিরে আসছে সেই পুরোনো তেলতেলে ভাব আর সেই ভীতু-ভীতু দৃষ্টি। চিঁ-চিঁ করে সে বলল, ‘যাব…? কোথায় যাব? আমার সঙ্গে তো টাকাপয়সা কিছু নেই।’
কাকার ডানহাত এবার কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এল। তাতে ধরা আছে তার মানিব্যাগ। সেটা ডিক্সের হাতের উপর ফেলে দিয়ে কাকা বলল, ‘এটা ধরো। এই টাকা নিয়ে যেদিকে দু-চোখ যায়—ভাগো! শুধু একটা কথা মনে রেখো। আর কোনোদিন যদি তোমাকে আমার চোখের সামনে দেখতে পাই, তবে সেই দিনই হবে ধরাধামে তোমার শেষ দিন। প্রাণে বাঁচতে চাইলে আর কোনোদিন এ তল্লাটের ত্রিসীমানায় আসবে না। যাও! দূর হও!’
টাকার থলিটা নিয়ে কোনোরকমে পড়িমরি করে দরজা খুলে মার খাওয়া জন্তুর মতো ছুটে পালাল ডিক্স। একটু পরেই শুনতে পেলাম একটা ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ। আওয়াজটা ক্রমেই দূরে মিলিয়ে গেল। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি কাকা আর একটা বড়ো কাঠের টুকরো এনে ফায়ারপ্লেসে রেখে আগুন উসকে দিচ্ছে। আগুন বেশ গন্গনে হয়ে উঠলে সে আগুনের পাশে দুটো চেয়ার মুখোমুখি এনে রাখল। তারপর তার একটায় বসে অন্যটায় পা তুলে দিয়ে কোটের পকেট থেকে ছোটো বাইবেলটা বার করে সে আরাম করে পড়তে লাগল।
আমি আবার কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। এবার আমি নিশ্চিন্ত, কারণ আমি জানি যে আমার মাথার কাছে অতন্দ্র প্রহরায় আছে আমার কাকা অ্যাবনার, আমার রক্ষক দেবদূত স্বয়ং। এও জানি যে কাল সকালে আমি যখন ঘুম ভেঙে নীচে নামব তখনও দেখব যে সে একইরকমভাবে চেয়ারে পা তুলে বাইবেল পড়ছে। আর এও জানি যে আমাকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে দেখে সে হাসিমুখে বলবে, ‘আয়! তোর জন্য চিন্তা হচ্ছিল, তাই সকাল সকাল চলে এলাম। চল, দুজনে একসঙ্গেই যাই। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়েছিল তো তোর?’
----------
ছবি - এআই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment