গল্প:: গ্রেট ব্যারিয়ার রহস্য - সুমন মিশ্র


গ্রেট ব্যারিয়ার রহস্য
সুমন মিশ্র


এক

আমাদের রিসার্চ বোটটা গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের যে এলাকায় এখন অবস্থান করছে সেইখানে দূর দূরান্ত পর্যন্ত আর একটিও নৌকা চোখে পড়ছে না। সেটাই স্বাভাবিক পোর্ট ডগলাস থেকে যাত্রা শুরু করে, উত্তরপূর্বে প্রায় ঘণ্টাখানেক আসার পর এই অঞ্চলে পৌঁছানো যায়। সাধারণ পর্যটকদের এখানে আসার অনুমতি নেই, জেলেদের এখানে মাছ ধরার অনুমতি নেই। শুধুমাত্র গবেষণার জন্যে সরকারি অনুমতি নিয়ে এখানে প্রবেশ করা যায়।
যতদূর চোখ যায়, মনে হয় যেন কোনো অভিজ্ঞ শিল্পী প্রকৃতির ক্যানভাসে নীল রং নিয়ে আপনমনে খেলা করেছেনমাথার উপর সুনীল আকাশের চাঁদোয়া নেমে গিয়েছে দিগন্তরেখা পর্যন্ত। আকাশের বুকে ইতিউতি দু-এক জায়গায় সাদা নিরীহ, বাউন্ডুলে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। সুযোগসন্ধানী সিগালের দল আকাশে পাক খাচ্ছে খাবারের আশায়। তাদের কর্কশ আওয়াজ চাপা পড়ে যাচ্ছে শোঁশোঁ করে বয়ে চলা এলোমেলো হাওয়ায়। বাতাসে একটা জোলো গন্ধ। চারপাশে দৃষ্টিসীমার মধ্যে শুধুই কোরাল সাগরের ঘন নীল জল। অবাধ্য নোনা ঢেউ এসে বোটের গায়ে ছলাত ছলাত শব্দে ধাক্কা খাচ্ছে
সমুদ্রের জল সর্বত্র ঘন নীল নয় কোথাও কোথাও সমুদ্রতলের গভীরতা ভেদে কখনও নীলকান্তমণি, আবার কখনও অপরূপ পান্না রঙের হয়ে উঠেছে সেই অপেক্ষাকৃত কম গভীর অংশে রয়েছে এক আশ্চর্য জগৎ নানা রঙের, নানান আকৃতির প্রবালের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক বিচিত্র প্রাকৃতিক সাম্রাজ্য, অস্ট্রেলিয়ার গর্ব, গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ
অস্ট্রেলিয়ার উত্তরপূর্বে পুরো কুইনসল্যান্ডের উপকূলব্যাপী এলাকায় এর ব্যাপ্তিহাজার হাজার বছর ধরে, প্রকৃতির আপন খেয়ালে, ধীরে ধীরে, এখানে প্রবাল প্রাচীর গড়ে উঠেছে চলেছে ভাঙাগড়ার খেলা প্রবাল স্তরের জন্ম ঘটেছে, প্রকৃতির নিয়মে একসময় মৃত্যুও ঘটেছে, তার উপর নতুন প্রবাল স্তর জন্ম নিয়েছে শুধু প্রবাল নয়, এই প্রবাল সাম্রাজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিচিত্র প্রাণীজগৎঅসংখ্য প্রজাতির, রংবেরঙের সামুদ্রিক মাছ, নানান প্রজাতির কচ্ছপ, হাঙর, ডলফিন, এমনকি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে তিমির আনাগোনা এখানে লেগেই থাকে। জলের নীচে ডুব দিলে মনে হয় যেন এক আনন্দযজ্ঞ চলছে। এখন সকাল সবে দশটা, নীল সাগরের জলে সকালের আলো চিকমিক করছে রিসার্চ বোটের উপরে পাশাপাশি উড়ছে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পাতাকা এবং কুইনসল্যান্ডের পতাকা ডেকের উপর চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল সোফিয়া। চোখে সানগ্লাস, খামখেয়ালি হাওয়ায় তার স্টেপকাট করে কাটা চুল এলোমেলো উড়ছে। আমাদের দলটিকে সেই নেতৃত্ব দিচ্ছে
সোফিয়া ব্যানার্জির পরিচয় হয়তো আলাদা করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না দক্ষ মেরিন বায়োলজিস্ট, কুইনসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এছাড়াও ‘সিডনি হোয়েল কনজার্ভেশন সোসাইটি’-র বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান। তবে ইদানীং ন্যাশানাল জিওগ্রাফিকের বিভিন্ন ডকুমেন্টারিতে তাকে দেখা যাওয়ায় বিশেষজ্ঞ মহলের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাশেই একটা চেয়ারে বসেছিল জেনেট মিলার। গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ মেরিন পার্কের চিফ সায়েন্টিস্ট। মূলত তার আমন্ত্রণেই আমাদের এখানে আসা। গত বছর আমাদের দল ক্যানজ শহরের পূর্বে একটা গবেষণার কাজ চালাচ্ছিল। সেই সময়েই জেনেটের সঙ্গে সোফিয়ার প্রথম আলাপ। তখনই সে সোফিয়ার সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল
তারপর গত ছয় মাস আগে জেনেটের চেষ্টায় গ্রেট ব্যারিয়ার মেরিন পার্ক কর্তৃপক্ষ ও কুইনসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে বর্তমান গবেষণার প্রস্তাব পেশ হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বর্তমানে সমুদ্রের জলের ক্রমশ উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতির সম্ভবনা দিন দিন বেড়েই চলেছে এই মুহূর্তে সেই প্রভাব কতটা মারাত্মক এবং প্রবাল প্রাচীরকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত কী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব সেটাই আমাদের গবেষণার মূল বিষয়
এখন প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলছে মূলত তথ্য সংগ্রহের কাজ গত তিন দিন ধরে পোর্ট ডগলাস থেকে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা রওনা দিচ্ছি কিছুক্ষণের মধ্যেই কুইনসল্যান্ডের তটরেখা ক্রমশ ধূসর হয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গিয়ে, আমাদের সঙ্গী হচ্ছে সীমাহীন জলরাশি তারপর দফায় দফায় সমুদ্রে নেমে তথ্য সংগ্রহ চলছে দিনভর শেষে পশ্চিম আকাশে গোলাপি রং ছড়িয়ে পড়লে আমরা আবার রওনা দিচ্ছি পোর্ট ডগলাসের উদ্দেশে

সোফিয়া এবং জেনেট ছাড়াও আমাদের দলের বাকি সদস্যরা হল ডেটা সায়েন্টিস্ট এরিক, অভিজ্ঞ ডুবুরি এবং ফিল্ড রিসার্চ টেকনিশিয়ান টম কুপার, জুনিয়ার রিসার্চ সায়েন্টিস্ট মোহনপ্রিয়া এবং আমি, রিসার্চ সায়েন্টিস্ট অভয় সান্যাল।

সোফিয়া হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। জেনেট পাশ থেকে চিন্তিত গলায় বলল, “টমের একটু বেশি দেরি হচ্ছে না?”
সোফিয়া মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, “সময় হয়ে এসেছে, হয়তো এখুনি ফিরে আসবে।”
মোহনপ্রিয়া কেবিন থেকে বেরিয়ে ডেকের দিকে আসছিল, কিন্তু সোফিয়াকে দেখে থমকে দাঁড়াল। মেয়েটার মধ্যে সোফিয়াকে নিয়ে একটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা কাজ করে। সোফিয়া আশেপাশে না থাকলে আমাদের কাছে সোফিয়ার নানান অভিযানের গল্প শুনতে চায়অথচ সোফিয়ার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে গেলে ঘাবড়ে গিয়ে গণ্ডগোল করে বসে তার মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে সোফিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই সে ধমক খাবে অথচ সোফিয়া মোহনপ্রিয়াকে যথেষ্ট স্নেহ করে যদিও তা সচরাচর প্রকাশ করে না আমাদের কাছে হেসে বলেও যে মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতী, তবে শিশুসুলভ খামখেয়ালিপনা এখনও যায়নি।

আমি দেখলাম মোহনপ্রিয়া গুটিগুটি পায়ে আবার কেবিনের দিকে ফিরে যাচ্ছে, তাই কৌতুক করার সুযোগটা ছাড়লাম না
“আরে মোহনপ্রিয়া যে, সোফিয়াকে কিছু বলতে এসেছ?”
মোহনপ্রিয়া একবার আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়েই মুখটা ব্যাজার করে বলল, “না, কই না তো।”
সোফিয়াও ঘুরে তাকালমোহনপ্রিয়া যে তাকে ভয় পায় সেটা সে নিজেও জানে। আমি স্পষ্ট দেখলাম সোফিয়ার ঠোঁটের কোনায় একটা রসিকতার হাসি মুহূর্তের জন্যে ফুটে উঠল। পরমুহূর্তেই সে আবার গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, “ও ভালোই হয়েছে মোহনপ্রিয়াও এসে গিয়েছে। আমার শরীরটা আজ তেমন ভালো নেই। তাই পরেরবার আমার পরিবর্তে মোহনপ্রিয়া সমুদ্রে নামবে।”
আমি দেখলাম মোহনপ্রিয়ার মুখে বর্ষার মেঘ জমা হচ্ছে। সে ল্যাবরেটরির কাজেই বেশি স্বচ্ছন্দএর আগে রিসার্চের কাজে কোনোদিন সে সমুদ্রের গভীরে নামেনি, নামতে হবে সেটাও বোধ হয় ভাবেনি।
সোফিয়া গম্ভীরভাবে বলল, “কী ব্যাপার? উত্তর দিলে না যে? ভয় পাচ্ছ নাকি?”
মোহনপ্রিয়া আমতা আমতা করতে থাকল।
সোফিয়া জেনেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আর কী, কাল দেখি যদি অন্য কাউকে নিয়ে আসা যায়। এত ভয় নিয়ে কি গবেষণা চালানো যায়?”
জেনেটও রসিকতাটা আন্দাজ করতে পেরেছিল, সেও গম্ভীর হয়ে বলল, “আমার চেনা কয়েকজন আছে। তুমি বললে কাল থেকে তাদের কাউকে নিয়ে আসা যায়
মোহনপ্রিয়া প্রায় আঁতকে উঠল, “না, না। আমায় বাদ দিও না, আমি এখুনি সমুদ্রে নামব।” বলেই সে এক ছুটে কেবিনে ঢুকে গেল।
আমরা সবাই হেসে ফেললাম। সোফিয়া কোমল গলায় বলল, “পাগলি একটা।”
ঠিক তখনই জলের নীচ থেকে ডুবুরির পোশাকে উঠে এল টম। সে হাত ছুঁড়ে তাড়াতাড়ি তাকে নৌকায় তোলার ইঙ্গিত করতে লাগল। আমরা তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ডেকের উপর তুললাম। মাস্ক খোলার পর সে হাঁপাতে লাগল, অনেক কিছু বলার চেষ্টা করল কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারল না। সোফিয়া তার কাছে এসে কাঁধে হাত রাখল, তারপর শান্ত স্বরে বলল, “আগে শান্ত হও, তারপর আস্তে আস্তে বলো
টমের চোখে গভীর চিন্তার মেঘ, সে কাঁপা গলায় বলল, “আবার কোরাল ব্লিচিং শুরু হয়েছে, কিন্তু ব্লিচিং-এর প্যাটার্নটা অদ্ভুত, সোফিয়া তোমার একবার দেখা উচিত আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা বড়ো গণ্ডগোল হতে চলেছে।”
আমরা সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সোফিয়াকে দেখে বুঝলাম সে কোনো গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়েছে


দুই


মিনিট দশেক হয়েছে আমরা আবার সমুদ্রের নীচে ডুব দিয়েছি। আমরা বলতে আমি, সোফিয়া আর টম। টমই আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে স্বচ্ছ নীলাভ সবুজ জল। মাথার উপরে সূর্যরশ্মি সমুদ্রপৃষ্ঠে বাধা পেয়ে নমনীয় আলোর বৃত্ত রচনা করেছে প্রবাল রাজ্যের যতদূর চোখ যায় শুধুই রঙের খেলা। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, গোলাপি, বাদামি সব নানান উজ্জ্বল বর্ণের, নানান আকৃতির প্রবাল চোখে পড়ছে। মনে হয় যেন সমুদ্রে নিমজ্জিত কোনো প্রাচীন নগরীতে প্রবেশ করা হয়েছে
যত রকমের প্রবাল দেখা যাচ্ছে তাদের মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায় এক শ্রেণির প্রবালের গঠন বেশ শক্তপোক্ত চুনাপাথরের আস্তরণের ফলে এদের কাঠামো মজবুত হয় তাদের আকৃতি বড়োই বিচিত্র। কোনোটা হরিণের শিঙের মতো শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে, কোনোটা গোলাকার, কোনোটা মানুষের মস্তিষ্কের মতো খাঁজকাটা আবার কোনোটা চ্যাপটা গোলাকৃতি, খানিক পদ্মপাতার মতো দেখতে, কিন্তু ধাপে ধাপে ছড়িয়ে পড়েছে।
আবার আরেকরকম প্রবাল বেশ নমনীয়। স্রোতের সঙ্গে ছন্দময়ভাবে দুলতে থাকে। দেখলে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে মনের মধ্যে।
চারপাশে নানান রঙের অসংখ্য মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও সেগুলো ঝাঁক বেঁধে ঘুরছে, কোথাও বা ছোটো দলে। মাছের ঝাঁকের গায়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে ঝলমলিয়ে উঠছে। নীল রঙের মোজেস স্ন্যাপার, হলুদ রঙের ছোটো ছোটো লেমন ড্যামসেল, রয়্যাল এঞ্জেল মাছ, সাদাকালো অসাধারণ সুন্দর মরিস আইডল, আরও কত মাছ যে খেলা করছে চারপাশে তা সঠিকভাবে বলা অসম্ভব।
আর আছে ‘ফাইন্ডিং নিমো’-খ্যাত উজ্জ্বল নীল কালো ‘ডোরি’ সার্জন মাছ এবং অবশ্যই কমলার উপর সাদা ডোরা ‘নিমো’ ক্লাউন মাছ।

কিছুটা দূরে একটা সামুদ্রিক কচ্ছপ শান্তভাবে সাঁতার কাটছে। সেই সাঁতার কাটার মধ্যেও এক অদ্ভুত ছন্দ রয়েছে, যেন এক পাখি আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। তার কিছু দূরে দুটো হোয়াইট টিপ রীফ হাঙর পাক খাচ্ছে
হঠাৎ দেখলাম টম সাঁতার কাটতে কাটতে থেমে গেল তারপর সে তর্জনী তুলে একটু দূরে একটা জায়গার দিকে ইশারা করল। তারপর হাত নেড়ে ওর পিছন পিছন আসার জন্যে সঙ্কেত দিল
টমের দেখানো জায়গাটায় পৌঁছে আমরা যা দেখলাম তা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে কোনো শখের ডুবুরির চোখে অস্বাভাবিক নাও লাগতে পারে। কিন্তু মেরিন বায়োলজিস্ট মাত্রেই বুঝতে পারবে এটা ভবিষ্যতের জন্যে অশনি সঙ্কেত।
চারপাশে রঙের খেলা, অথচ তার ঠিক মাঝখানে প্রায় পনেরো ফুট ব্যাসের একটা নিখুঁত বৃত্তাকার অংশে কোরালগুলো সব ধূসর সাদা হয়ে গিয়েছে। সেখানে মাছেদের আনাগোনা নেই, প্রাণের খেলা নেই।
কোরাল ব্লিচিং। প্রবালের মারণ রোগ। সাধারণত প্রবালের মধ্যে একধরনের সিম্বায়োটিক এ্যালগি বসবাস করে, যা প্রবালকে খাদ্য সংগ্রহে সাহায্য করে। এই এ্যালগির জন্যেই প্রবালের রং এত উজ্বল হয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি জলের উষ্ণতা বেড়ে যায় তাহলে সেই এ্যালগি আর প্রবালের মধ্যে থাকতে পারে না। ফলে প্রবালের পক্ষে খাদ্য সংগ্রহ মুশকিল হয়ে পড়ে এবং প্রবালের মৃত্যু ঘটে। তখন শুধুমাত্র পড়ে থাকে প্রবালের ক্যালসিয়াম কার্বনেটে তৈরি কাঠামো। সমস্যা হল একবার কোরাল ব্লিচিং শুরু হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দিকে, মৃত্যু ঘটতে থাকে একের পর এক প্রবাল প্রাচীরের।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল আশেপাশের কোথাও কোরাল ব্লিচিঙের চিহ্ন নেই। শুধু গোলাকার জায়গাটুকুতে কে যেন মন্ত্রবলে প্রাণের লেশটুকু শুষে নিয়েছে। আমরা বেশ কিছুক্ষণ চারপাশটা ভালো করে দেখলাম। সোফিয়া দেখলাম তার হাতের উষ্ণতা পরিমাপক যন্ত্রটা নিয়ে সব দিক খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
টম আর আমি কিছু নমুনা সংগ্রহ করছিলাম এমন সময় সোফিয়া ইশারা করে জলের উপরে উঠে যেতে বলল। আমরা যেখানে ভেসে উঠলাম সেখান থেকে আমাদের বোটটা প্রায় তিনশো মিটার দূরে ভাসছে
জলের উপরে উঠে মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক সরিয়ে সোফিয়া চিন্তিত গলায় বলল, “কোরাল ব্লিচিং তো এইভাবে হয় না। একটা এলাকা জুড়ে হতে পারে, কিন্তু তার তো এমন নির্দিষ্ট গঠন থাকবে না এমন জ্যামিতিক গঠন মেনে কোরাল ব্লিচিং হওয়া কি আদৌ সম্ভব?”
টম চিন্তিত গলায় বলল, “আমিও সেটাই ভাবছিলাম, চারপাশে কোথাও কোনো চিহ্ন নেই হঠাৎ মাঝখানে ঠিক বৃত্তাকার অংশে কেউ যেন…”
কৃত্রিমভাবে ব্লিচিং ঘটিয়েছে?” টমকে থামিয়ে আমি বললাম।
সোফিয়া সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
আমি সন্দেহমাখা গলায় বললাম, “তা কী করে সম্ভব? সমুদ্রের মাঝে এমন ছোটো একটু জায়গার ক্ষতি করে কার কী লাভ হবে? আর সেটা করবেই বা কী করে?”
সোফিয়া দৃঢ় কন্ঠে বলল, “লাভ ক্ষতির কথা তো এখনই বলতে পারব না। তবে গণ্ডগোল কিছু তো আছেই।”
“এমনও হতে পারে, হয়তো এটা ‘মাস ব্লিচিং’ বা বিশাল এলাকার ক্লোরাল ব্লিচিং-এর সূত্রপাত। এর আগেও ক্লোরাল ব্লিচিং গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের অনেক ক্ষতি করেছে। গত এক দশকে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে ‘মাস ব্লিচিং’ ব্যাপক বেড়েছে ২০১৬, ২০১৭-তে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছিল ২০২০, ২০২৪, এমনকি ২০২৫-এও একই ঘটনা ঘটেছে বিশাল বিশাল এলাকার প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়ে গিয়েছে কিছু বোঝার আগেইটম বলল
সোফিয়া দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, “আমার মনে হয় এটা প্রাকৃতিকভাবে হয়নি ‘মাস ব্লিচিং’ তো নয়ই সেইরকম হলে একটা বড়ো এলাকা ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হত কৃত্রিমভাবে এটা হয়েছে বলেই মনে হয় কৃত্রিম কোরাল ব্লিচিং নানানভাবেই ঘটানো যেতে পারে। প্রধানত সমুদ্রের জলের উষ্ণতা যদি  হঠাৎ বেড়ে যায় সেই ক্ষেত্রে কোরাল ব্লিচিং ঘটতে পারে, অথবা যদি কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়।”
“যেমন অক্সিবেঞ্জোন, অক্টিনোক্সেট ইত্যাদি,” টম বলল।
সোফিয়া চিন্তিত গলায় বলল, “তবে এক্ষেত্রে হয়তো প্রথম পদ্ধতিই ব্যবহার হয়েছে।”
“তুমি কীভাবে এতটা নিশ্চিত হচ্ছ?” আমি প্রশ্ন করলাম
সোফিয়া দূরমনস্ক গলায় বলল, “নিশ্চিত নই, তবে রাসায়নিক প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট জ্যামিতিক সীমার মধ্যে ক্ষতিটা আটকে রাখা সম্ভব নয় আর আমি যখন জায়গাটা পরীক্ষা করছিলাম তখন আমার কাছে থাকা ‘হিট মনিটরিং’ যন্ত্রে কিছু সময় অন্তর উষ্ণতা সূচক বেড়ে যাচ্ছিল। প্রতিবার সেটা একও থাকছিল না।”
“সেটা কীরকম?” আমি বিস্মিত স্বরে বললাম।
“কিছু সময় অন্তর মনিটরিং সিস্টেমে উষ্ণতা তরঙ্গ ধরা পড়ছিলসময়ের ব্যাবধান প্রতিবার আলাদা ছিল এবং প্রতিবার সূচকের মান ছিল আগের বারের দ্বিগুণ। এভাবে পরপর পাঁচটা ক্রমবর্ধমান উষ্ণ তরঙ্গ ছড়িয়ে দেওয়ার পর আবার যে তরঙ্গ আসছিল তার সূচক প্রথম বারের সমান।”
“তার মানে কোনো যন্ত্রের মাধ্যমে এটা করা হচ্ছে?” টম উত্তেজিত কণ্ঠে বলল।
“সেই রকমই মনে হয়আর সেই উষ্ণ তরঙ্গে যখন গোলাকার জায়গায় কোরাল ব্লিচিং হয়েছে তার মানে…”
ওই জায়গাটার ঠিক মাঝখানে যন্ত্রটা আছে?” আমি উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলাম
সোফিয়া সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক ধরেছ আমাদের আবার জলের নীচে যেতে হবে
জলের নীচে ডুব দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরও যন্ত্রের মতো কিছু চোখে পড়ল না। সবাই যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে সেই সময় সোফিয়ার চোখে দুটো ছোটো সাদা রঙের আংটার মতো জিনিস চোখে পড়ল। আমি আর টম এক একটা আংটা ধরে টান দিতেই জলের মধ্যে খানিক বালি উড়িয়ে যেটা উঠে এল সেটা একটা এক ফুট লম্বা কালো সিলিন্ড্রিকাল যন্ত্র। তার মাথায় সাদা প্রবাল দিয়ে ইচ্ছাকৃত ঢেকে রাখা হয়েছিল, ফলে দুর্দান্ত ক্যামুফ্লাজ হয়ে এতক্ষণ দেখাই যাচ্ছিল না। যন্ত্রটার গায়ে একটা ছোটো প্যানেল। তাতে পাঁচটা চৌকো আলো উপর থেকে নীচে সাজানো। নীচ থেকে উপরে নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা আর লাল।
সোফিয়া আমাদের ‘হিট মনিটরিং’ যন্ত্রটা দেখাল নীল আলো কয়েকবার দপ দপ করার সঙ্গে সঙ্গেই সবথেকে কম উষ্ণতার তরঙ্গ এল। তারপর সবুজ আলোটা দপ দপ করল কয়েকবার এবং অপেক্ষাকৃত বেশি উষ্ণতার তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল। এভাবেই লাল আলো অবধি উষ্ণতার পরিমাণ বাড়তেই থাকল।
সোফিয়া আমাদের ইশারা করল, যন্ত্রটাকে আমাদের বোটে নিয়ে গিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করতে হবে। কতটা তথ্য পাওয়া যাবে তার উপর হয়তো গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

তিন

বোটে ফিরে এসেই সোফিয়া যন্ত্রটা এরিকের হাতে তুলে দিয়েছিল, আর মোহনপ্রিয়াকে বলেছিল এরিককে সহযোগিতা করতে। যত দ্রুত সম্ভব যন্ত্রটার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেই হবে।
ঘণ্টাখানেক সময় পেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু এখনও কোনো তথ্যই উদ্ধার হয়নি। সোফিয়া ডেকের উপর বসে জেনেটের সঙ্গে গবেষণার নানান খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল। আমি টমের সঙ্গে বসে সকালে সংগ্রহ করা কিছু প্রবালের নমুনা পরীক্ষা করছিলাম। এমন সময় দূরে একটা বোট চোখে পড়ল। বোটটা আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। গত কয়েকদিনের মধ্যে এই প্রথম অন্য কোনো বোট চোখে পড়ল। বোটটা কাছাকাছি আসতেই দেখলাম, ডেকের উপর দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রলোক হাত নাড়ছেন।
সোফিয়া আর জেনেট দুইজনেই ভালো করে দেখার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছিল বোটটা কাছে আসতেই ভদ্রলোককে দেখে জেনেটের মুখেও হাসি ফুটে উঠলবোটটা ততক্ষণে আমাদের বোটের একদম পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
জেনেট উৎসাহমাখা কণ্ঠে বলল, “আরে মিঃ স্যামুয়েল ফ্রেজার যে, এইভাবে মাঝসমুদ্রে দেখা হবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি।”
ভদ্রলোক ততক্ষণে আমাদের বোটের ডেকে উঠে এসেছেন। এগিয়ে এসে তিনি জেনেটের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন, “ভাগ্যিস, আপনাদের বোটটা দূর থেকে চোখে পড়েছিল, সেই জন্যে তো আজ প্রায় বছর তিনেক বাদে দেখা হয়ে গেল। আমি তাই ভাবি, গত তিন-চারদিন ধরে আমরা এখানে কাজ করছি, অন্য কোনো বোট তো নজরে আসেনি, আজ হঠাৎ কোত্থেকে ট্যুরিস্ট এসে হাজির হল। তা এখানে কোন কাজে আসা হল?”
“আমরাও গত কয়েকদিন ধরে এই এলাকায় ঘুরছি, আপনাদের বোটটাও আমাদের চোখে পড়েনি।” সোফিয়া শান্ত গলায় বলল।
ভদ্রলোক সোফিয়ার দিকে তাকিয়েই যেন চমকে উঠলেন। জেনেট সোফিয়ার পরিচয় দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু স্যামুয়েল তাকে থামিয়ে দিয়ে একগাল হেসে বলল, “কী সৌভাগ্য, স্বয়ং সোফিয়া ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আজকে যে কার মুখ দেখে উঠেছিলাম।”
দেখা গেল স্যামুয়েল সোফিয়ার একজন গুণমুগ্ধ এবং সোফিয়ার নানান কর্মকাণ্ডের হদিস তিনি রাখেন। সোফিয়াও দেখলাম স্যামুয়েলের সঙ্গে আলাপ হয়ে বেশ খুশি হয়েছে।
ভদ্রলোক এমনিতে বেশ হাসিখুশি এবং মিশুকে। গল্প করে আসর জমাতে পারেনমার্জিত কথাবার্তার মধ্যে অভিজ্ঞতার ঝলক স্পষ্ট। বয়েস আন্দাজ পঞ্চাশের কাছাকাছি, মাথা ভর্তি সাদা চুল। বেশভূষায় চাকচিক্য একেবারেই নেই, চোখের দৃষ্টি একেবারেই নিরীহ।
জেনেটের থেকেই স্যামুয়েল ফ্রেজারের পরিচয় পাওয়া গেল। জেমস কুক ইউনিভার্সিটির মেরিন বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক। জেনেটের সঙ্গে একটা সমীক্ষার কাজে আজ থেকে সাত বছর আগে প্রথম আলাপ।
নানান কথার মাঝে সোফিয়া স্যামুয়েলকে জিজ্ঞাসা করল এই এলাকায় তিনি ঠিক কী কাজে এসেছেন স্যামুয়েল তখন সবে কফির কাপটা নিয়ে আয়েশ করে বসেছে। প্রশ্নটা শুনে তার দুই চোখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল, সে কফির কাপটা পাশে রেখে উৎসাহমাখা গলায় বলল, “কোটিপতি ব্যবসায়ী জন ব্র্যান্ডনের নাম শুনেছেন?”
সোফিয়া ভুরু কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, “পরিবেশপ্রেমী, ব্যবসায়ী জন ব্র্যান্ডন?”
“একদম ঠিক, ওই পরিচয়টাই আসল সারা অস্ট্রেলিয়া জুড়ে জনের প্রতিষ্ঠান ‘রাইজিং অস্ট্রেলিয়া’ পরিবেশ সংরক্ষণের জন্যে নানান কাজ করে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণের জন্যে নানান প্রকল্পের কাজ হোক, অথবা দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমির প্রাণীদের পুনর্বাসন, সবেতেই জন ব্র্যান্ডনের ‘রাইজিং অস্ট্রেলিয়া’ সবসময় এগিয়ে আসে।”
সোফিয়া কৌতূহলী গলায় বলল, “বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পেও তো শুনেছি তিনি বিনিয়োগ করে থাকেন।”
স্যামুয়েল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“এখানেও কি কোনো প্রোজেক্ট চলছে?” জেনেট জিজ্ঞাসা করল।
স্যামুয়েল অবাক গলায় বলল, “সে কি, তোমরা জানো না? প্রোজেক্ট ‘নিউ স্টারের’ নাম শুনেছ?”
সোফিয়া দূরমনস্ক গলায় বলল, “নিউ স্টার নামটা শোনা শোনা লাগছে
আলবাত শুনে থাকবে,স্যামুয়েল শিশুর মতো উচ্ছল গলায় বলল, “সারা অস্ট্রেলিয়া জুড়ে তো একে নিয়েই আলোচনা চলছে বলতে পারো এটা জনের স্বপ্নের প্রকল্প রাইজিং অস্ট্রেলিয়া’ এই প্রকল্পে গত দশ বছর ধরে কাজ চালাচ্ছে এখন মোটামুটি শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে আমরা কুইনসল্যান্ডের উপকূল বরাবর গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের গা ঘেঁষে বিস্তীর্ণ এলাকায় আমাদের যন্ত্র বসানোর কাজ চালাচ্ছি বলতে পারো বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো মনিটরিং নেটওয়ার্ক তৈরি হতে চলেছে সেই যন্ত্রের কাজ হবে জলের তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তন, ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি টের পেলেই আমাদের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্কেত পাঠানো, যাতে আমরা বুঝতে পারি এত বড়ো এলাকার ঠিক কোন জায়গায় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে
মূলত রিয়েল টাইম মনিটরিং করাই আসল কাজ?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম
শুধু নজরদারি নয়, যত তাড়াতাড়ি আমরা সমস্যাটা জানতে পারব, তত তাড়াতাড়ি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারব প্রতিবছর কোরাল ব্লিচিং-এর জন্য মাইলের পর মাইল প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হচ্ছে বেশিরভাগ সময়ই আমরা যখন জানতে পারি ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায় অথচ ঠিক সময়ে জানতে পারলে অনেক ক্ষতিই এড়িয়ে চলা যেতে পারে
আপনি এই প্রোজেক্টের সঙ্গে কবে থেকে জড়িত?”
আমি?” স্যামুয়েল হেসে ফেলল, “প্রোজেক্টটা জনের স্বপ্নের প্রোজেক্ট হতে পারে, কিন্তু সেটাকে জীবন দিয়েছি আমিই গত সাত বছর ধরে এই প্রোজেক্টের সঙ্গে যুক্ত পুরোনো প্রোটোটাইপগুলো সেইভাবে কার্যকর ছিল না তারপর আমিই নতুন করে নকশা তৈরি করি শুরু থেকে শেষ অবধি আমি আর আমার নিজের হাতে বেছে নেওয়া টিম অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছে এই প্রোজেক্টের সাফল্যের জন্যে আমার জীবনের সবথেকে বড়ো প্রাপ্তি এই প্রোজেক্টটিবলতে বলতে স্যামুয়েলের গলা আবেগরুদ্ধ হয়ে এল
এখান থেকে কতদূরে আপনারা যন্ত্র বসিয়েছেন?” সোফিয়া জিজ্ঞাসা করল
সরি, ব্যাপারটা কনফিডেন্সিয়াল বুঝতেই পারছেন সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্যাপারটা হচ্ছে তো, তাই অনেক নিয়ম মেনে চলতে হচ্ছে
এত বড়ো এলাকার তথ্যসংগ্রহের জন্যে যখন ব্যাবহার হবে তখন যন্ত্রগুলো নিশ্চয় আকারে বেশ বড়ো হবে?” জেনেট জিজ্ঞাসা করল
তা তো হবেই, পুরো উপকূল জুড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার যন্ত্র বসানো হয়েছে কিন্তু এর বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করবেন নাস্যামুয়েল হাসল
কবে থেকে ব্যাপারটা কার্যকর হবে?” সোফিয়া জিজ্ঞাসা করল
এই তো আগামী পরশু উদ্বোধন এখানেই আমাদের বোট থেকে উদ্বোধন হবে জন কাল সকালেই এসে যাবে একটা ভার্চুয়াল মিটিং-এ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরাও থাকবেন সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার মানুষ দেখবে প্রোজেক্টনিউ স্টারকী অসাধ্য সাধন করেছে
এইটুকু বলেই স্যামুয়েল উঠে দাঁড়ালেন, “এবার আমায় যেতে হবে শেষ মুহূর্তের অনেক কাজ বাকিতারপর কয়েক পা এগিয়ে আবার থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনারাও চলে আসুন ওইদিন, এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে চলেছে আপনাদের মতো স্বনামধন্য মানুষরা উপস্থিত থাকলে অনুষ্ঠানের ঔজ্জল্য আরও বেড়ে যাবে আমি আপনাদের নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করে দেববলেই জেনেটের হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নাম্বারে সন্ধের পরে আমায় একটা ফোন করে নেবেন, পোর্ট ডগলাস থেকে আপনাদের ওইদিন নিয়ে আসার ব্যাবস্থা করে দেব
স্যামুয়েলের বোট দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতেই, মোহনপ্রিয়া প্রায় ছুটতে ছুটতে কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে, হাঁপাতে হাঁপাতে সোফিয়াকে বলল, “একবার ভিতরে আসতে হবে, যন্ত্রটা পরীক্ষা করে এরিক কিছু খুঁজে পেয়েছে, সবাইকে একবার দেখাতে চায়

কেবিনে ঢুকেই দেখলাম এরিক চিন্তিত মুখে বসে আছে সামনের টেবিলে সমুদ্রের নীচ থেকে উদ্ধার করা সেই যন্ত্রটা রাখা আছে যদিও সেটিকে খুলে ফেলা হয়েছে
সোফিয়া জিজ্ঞাসা করল, “কিছু পাওয়া গেল এরিক?”
এরিক চিন্তান্বিত গলায় বলল, “যা পেয়েছি সেটার উদ্দেশ্য এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না এই যন্ত্রটা শুধু যে উষ্ণতা তরঙ্গ সৃষ্টি করে তাই নয়, উষ্ণতা পরিমাপের কাজও করছে
মানে?” জেনেটের গলায় সংশয়
এরিক সামনে রাখা একটা বড়ো জলের পাত্রে যন্ত্রটাকে ডুবিয়ে দিল, সঙ্গে সঙ্গেই যন্ত্রটা আগের মতো উষ্ণ তরঙ্গ উৎপাদন শুরু করল হিট মনিটরিং সিস্টেমে ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা ধরা পড়তে লাগল
এটা তো আমরাও জানি,টম বলল
যেটা জানো না সেটা এইবার দেখো,বলেই এরিক যন্ত্রটাকে জলের বাইরে এনে, পাশের একটা ছোটো ঢাকনা খুলল আমরা সবাই দেখলাম সেই ঢাকনার নীচে একটা ছোট্টনব সেটা ঘুরিয়ে দিয়ে এরিক এবার যন্ত্রটাকে জলের মধ্যে রাখতেই অবাক কাণ্ড ঘটল যন্ত্রটা থেকে আর কোনো উষ্ণ তরঙ্গ উৎপাদন হচ্ছে না, যন্ত্রটার গায়ের প্যানেলে নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা আর লাল কোনো রঙও ফুটে উঠছে না। তার জায়গায় ভেসে উঠছে কয়েকটা তথ্য, জলের উষ্ণতা, আর জলে উপস্থিত বেশ কিছু রাসায়নিকের পরিমাপ।
“অর্থাৎ যন্ত্রটাকে দুইভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে,” বলতে বলতে জেনেট থেমে গিয়ে চকিতে সোফিয়ার দিকে তাকাল।
সোফিয়ার মুখে ততক্ষণে চিন্তার মেঘ জমা হয়েছে, সে বিড়বিড় করে বলল, “একটা যন্ত্র সকলের সামনে পরীক্ষার সময় একরকমভাবে চালানো যাবে, আবার আসলে যখন চালানো হবে তখন অন্যরকম কাজ করবে। শুধু একটা সুইচের এদিক ওদিক। জিনিয়াস।” বলেই সে জেনেটের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, “তোমার তো কুইনসল্যান্ড পুলিশের সঙ্গে ভালোই যোগাযোগ আছে, তাড়াতাড়ি জন ব্র্যান্ডন এবং তাঁর ‘রাইজিং অস্ট্রেলিয়া’ কম্পানির ব্যাপারে খোঁজখবর নাও তো, কোনো পুলিশ রেকর্ড আছে নাকি জানতে হবে।”
আমি চমকে উঠলাম, “তুমি জন ব্র্যান্ডনকে সন্দেহ করছ? কিন্তু কেন?”
“কারণ স্যামুয়েলের কথা অনুযায়ী জনের প্রোজেক্টের কাজও প্রায় একইরকম। হতে পারে সেই যন্ত্রগুলিরই একটা প্রোটোটাইপ এটা, তাহলে তো বলতেই হয় কোনো বিশেষ ষড়যন্ত্র চলছে।”
“কিন্তু তাতে জনের কী লাভ হবে, এত বড়ো প্রোজেক্ট সে শুধু দেশের ক্ষতির জন্যে তৈরি করবে? তাতে তো সে নিজেই দেউলিয়া হয়ে যাবে।”
সোফিয়া কিছু বলার আগেই জেনেট বলে উঠল, “রাইজিং অস্ট্রেলিয়ার প্রোজেক্ট যদি আদতে ব্যারিয়ার রীফের ক্ষতি করে সেটা জনের অজানা থাকতে পারে না। হতে পারে কোনো বিদেশি শক্তি এর পিছনে আছে। হয়তো জন এটার জন্যে প্রচুর পরিমাণে অর্থ পেয়েছে ব্যারিয়ার রীফের বিশাল অংশ নষ্ট হলে অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন শিল্প ধাক্কা খাবে, দেশের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হবে। জনের কম্পানি সেটার দায় এড়াতে না পারলেও, শাস্তি কমানোর রাস্তা হয়তো আগেই ভাবা আছে। হয়তো পুরো দোষটাই স্যামুয়েলের কাঁধে চাপিয়ে জন পার পেয়ে যাবে। তা নাহলে জন হয়তো দেশ ছেড়ে পালানোর ব্যবস্থা আগেই করে ফেলেছে।”
“আবার সরকারি উদ্যোগে চলা একটি প্রকল্প দেশের পরিবেশের ক্ষতি করলে তার জন্যে সরকারকেও দায় নিতে হবে। হয়তো এর সুদূরপ্রসারী ফলাফলে সরকার পরিবর্তনও হয়ে যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে বৈদেশিক শক্তির ষড়যন্ত্রের বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে।” টম বলল।
সোফিয়া শান্ত গলায় বলল, “পুরোটাই আমাদের আন্দাজ, এর ভিত্তিতে আমরা পুলিশে অভিযোগ জানাতে পারি না, বিশেষত যেখানে সরকারি উদ্যোগে এই প্রোজেক্ট চলছে আগে তথ্য জোগাড় করতে হবে
এরপর সোফিয়া ফিসফিস করে জেনেটকে কী যেন বলল, জেনেট চমকে তাকাল একবার, তারপর দ্বিধান্বিত গলায় বলল, “কিন্তু কেন?”
সোফিয়া উত্তর দিল না, আরও গম্ভীর হয়ে গেল
আমার খারাপ লাগছিল স্যামুয়েলের কথা ভেবে মানুষটার কথাবার্তায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল এই প্রোজেক্টটা নিয়ে তাঁর কত স্বপ্ন, কিন্তু সত্যিই যদি জনের অন্য মতলব থাকে তাহলে সেই স্বপ্ন অচিরেই চুরমার হয়ে যাবে স্যামুয়েলের নিরীহ মুখটা আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল


চার


সাধারণত পোর্ট ডগলাসে আমাদের হোটেলে ফেরার পর প্রতিদিনই রাজ্যের ক্লান্তি আমাদের গ্রাস করে, কিন্তু আজ বিশ্রাম নেওয়ার সময় নেই তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিয়ে হাজির হলাম সোফিয়ার ঘরে জেনেট দেখলাম আমার আগেই সেখানে এসে হাজির হয়েছে কিছুক্ষণের মধ্যেই মোহনপ্রিয়াও গুটিগুটি পায়ে হাজির হল সেখানে বাকিদের বাড়ি পোর্ট ডগলাস থেকে বেশি দূরে নয়, তাই তারা প্রতিদিনই বাড়ি ফিরে যায়
ঘরে ঢুকেই দেখলাম সোফিয়া ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছে, আর জেনেট কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে
ফোনটা রেখেই জেনেট বলল, “জনের কম্পানির সম্পর্কে যতটুকু জানা সম্ভব সব তথ্যই আমি জোগাড় করেছি
সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল?” সোফিয়া ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে জিজ্ঞাসা করল
একদমই নয় পেশার সূত্রেই আমার কুইনসল্যান্ড পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের সঙ্গে পরিচয় আছে, তাই বুঝতেই পারছ খবর যেটুকু পাওয়া গিয়েছে সবটাই নির্ভেজাল সত্য জন ব্র্যান্ডনের ‘রাইজিং অস্ট্রেলিয়া’ কম্পানির ট্র্যাক রেকর্ড অত্যন্ত ভালো। বলা চলে, যে সমস্ত সংস্থা অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করে চলেছে সেই তালিকায় সবার উপরে আছে জনের সংস্থা। গত কুড়ি বছরের রেকর্ড যদি দেখা যায়, তাহলে কোনো বেনিয়মের অভিযোগ নেই। যে সমস্ত প্রকল্পে ‘রাইজিং অস্ট্রেলিয়া’ কাজ করেছে সেগুলো প্রত্যাশার থেকেও বেশি সফল। কয়েক বছর আগে যেবার সারা অস্ট্রেলিয়া দাবানলে জেরবার হয়ে যাচ্ছিল, জনের কম্পানি দিনরাত কাজ করে গিয়েছিল মানুষ এবং নিরীহ প্রাণীদের সুরক্ষিত রাখতে।”
সোফিয়া চুপ করে শুনে চলল জেনেট বলল, “সেই বছরই সরকার থেকে ‘রাইজিং অস্ট্রেলিয়া’-কে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল
“তাহলে তো জনের কম্পানির উপর সন্দেহ করার অবকাশই নেই,” আমি বললাম।
জেনেট উৎসাহ নিয়ে বলল, “শুধু তাই নয়, সেই বছর দাবানলের মোকাবিলা করতে জন নিজেই ক্যাঙ্গারু দ্বীপে গিয়েছিল। সামনের বছর সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মানের জন্যেও সে মনোনীত হয়েছে
এরকম একজন মানুষ শুধু শুধু দেশের এমন ক্ষতি কেন করবে যাতে তাঁর নিজের এত বছরের অর্জিত মান সম্মান ধুলোয় মিশে যায়?” আমি বললাম
সোফিয়া এতক্ষণ শুনছিল, এইবার বলল, “ব্র্যান্ডনদের এই দেশের জন্যে, পরিবেশের জন্যে কাজ করার ইতিহাস আজকের নয় ইন্টারনেটে যে তথ্য পাচ্ছি, জনের ঠাকুরদা জোসেফ ব্র্যান্ডনের উত্থানই ঘটে পরিবেশের জন্যে আন্দোলন করে
সেটা কীরকম?” আমি প্রশ্ন করলাম
গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষের দিকে এই ব্যারিয়ার রীফে তেল ও গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল এবং অনেক কম্পানি সেখানে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্যে এগিয়ে এসেছিল...”
“কিন্তু সেইরকম হলে তো পরিবেশের ক্ষতি হত!” আমি সোফিয়াকে মাঝপথেই থামিয়ে বললাম।
“অবশ্যই, যদি একবার তেল ও গ্যাস উত্তোলন শুরু হত তাহলে পরিবেশ দূষণের ফলে পুরো ব্যারিয়ার রীফই হয়তো শেষ হয়ে যেত। সব থেকে অবাক কাণ্ড হল কুইনসল্যান্ড সরকার এই ব্যাপারে রাজি হয়ে গিয়েছিল এবং পুরো কুইনসল্যান্ড উপকূল তেল আহরণের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে বিভিন্ন পরিবেশপ্রেমী সংস্থা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তারা জনমত সংগঠিত করে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বাধ্য করে পিছু হঠতে। সেই আন্দোলনে ‘গ্রিন আর্থ’ নামের একটি ছোটো সংস্থা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। সেই সময় ‘ফিউচার রীফ’ বলে একটি সংস্থা তেল উত্তোলনের জন্যে বহু কোটি ডলারের লগ্নি করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করে সেই কাজটিকে ‘গ্রিন আর্থ’ বন্ধ করতে সক্ষম হয়।”
আমি চুপ করে আছি দেখে সোফিয়া আবার বলল, “‘গ্রিন আর্থ’–এর মালিক ছিলেন জোসেফ ব্র্যান্ডন।”
“তার মানে...”
সোফিয়া জোর গলায় বলল, “তার মানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যারা অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ রক্ষায় লড়ছে, হঠাৎ করে পরিবেশের ক্ষতি হোক এমন কোনো প্রোজেক্ট তারা করবে না। বিশেষত সেই গ্রেট ব্যারিয়ার রীফেতে যেটিকে রক্ষা করার জন্যে জনের ঠাকুরদাও আন্দোলন করেছেন।”
“তার মানে জনকে আমরা সন্দেহের বাইরে রাখতেই পারি,” জেনেট বলল।
সোফিয়া চিন্তিত গলায় বলল, “আমার কিন্তু এখনও মনে হচ্ছে জনের প্রোজেক্টের সঙ্গে কোথাও আজ খুঁজে পাওয়া যন্ত্রটার যোগসূত্র আছে। আর সেটা যদি জনের অগোচরে হয়ে থাকে তাহলে কোনো না কোনো ষড়যন্ত্র তো অবশ্যই চলছে।”
“সেটা জানার তো উপায় নেই...” জেনেট বলল।
“একটা উপায় আছে। জেনেট, রীফে প্রোজেক্ট যখন চলছে তখন ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ মেরিন পার্ক’ কর্তৃপক্ষর থেকে অনুমোদন নিতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে তাদের গতিবিধি মেরিন পার্ক কর্তৃপক্ষ ও কুইনসল্যান্ড কোস্টাল গার্ড কর্তৃপক্ষ জানবে। তুমি সেই তথ্য সংগ্রহ কর। আগামীকাল তুমি আর অভয় যাবে জনের সঙ্গে দেখা করতে। তখনই ভালো করে ওদের প্রোজেক্টের যন্ত্রপাতির নকশাটা দেখে এসো। যদি চিন্তার কোনো ব্যাপার থাকে তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই জনকে সতর্ক করে দিও, আর কুইনসল্যান্ড কোস্টাল পুলিশকে জানিয়ে দিও।”
“আমি এখনই খবর নিচ্ছি।”
আমরা বেরিয়ে আসছিলাম, হঠাৎ সোফিয়া পিছন থেকে জেনেটকে ডাকল, “আর একটা বিষয়ে যে খবর নিতে বলেছিলাম, সেটা কতদূর এগোল?
কালকের মধ্যেই জানা যাবে তবে আমার মনে হয় না সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যাবে
হাতে সময়টা বড্ড কম,সোফিয়ার গলায় উদ্বেগ ভেসে উঠল

পাঁচ

পরের সারাটা দিন ছোটাছুটির মধ্যে কাটল সোফিয়া আজ গবেষণার দিকটা সামলে নিয়েছে আমি আর জেনেট গিয়েছিলাম জনের সঙ্গে দেখা করতে সেখানে কী হল সেই কথা সোফিয়াকে জানানো সম্ভব হয়নি কারণ আমাদের বোটে মাঝপথে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল সেইসব সারিয়ে, জনের সঙ্গে দেখা করে, আবার পোর্ট ডগলাসে ফিরে আসতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে এল
হোটেলে পৌঁছে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে সোফিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম সেখানে পৌঁছে দেখলাম সোফিয়া ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে কিছুক্ষণের মধ্যে জেনেটও এসে পৌঁছোল
সোফিয়া ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে হাসিমুখে প্রশ্ন করল, “জনের সঙ্গে আলাপ পরিচয় কেমন হল?”
জেনেট তেতো গলায় বলল, “কাজের কাজ কিছুই হল না এমনিতে জন বেশ ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা বলল, কফি খাওয়াল নিজের ঠাকুরদার কথা, প্রোজেক্টনিউ স্টারেরগল্প অনেক কিছুই বলল কিন্তু…”
কিন্তু, ওদের যন্ত্রের ব্যাপারে কিছুই জানাল না, তাই তো?” সোফিয়া কৌতুকমাখা গলায় বলল
তুমি কী করে জানলে?” আমি অবাক হয়ে বললাম
সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? একটা এত বড়ো প্রোজেক্টের যন্ত্রের নকশা কি এমনি এমনি তোমাদের দেখিয়ে দেবে?”
তাহলে আমাদের পাঠালে কেন?”
কারণ কথায় কথায় অনেক ছোটো তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে যা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তোমরা আমাদের খুঁজে পাওয়া যন্ত্রটার কথা বলেছিলে?
আমি বললাম, “হ্যাঁ, কিন্তু সেটা নিয়ে জন তেমন কিছু আগ্রহ দেখাল না আমরা ছবিও দেখিয়েছিলাম, কয়েকবার বলেছিলাম অন্তত আপনাদের তৈরি যন্ত্রটা না দেখালেও, প্রোটোটাইপ যন্ত্রগুলো দেখতে দিন জন অত্যন্ত ভদ্রভাবে আমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে শুনেও ব্যাপারটায় তেমন আমল দিল না
জেনেট বলল, “আমি আমার ফোন নম্বরটা দিয়ে এসেছি, বলেছি যদি মনে হয় আমাদের কিছু জানাবেন তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন
সোফিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “জেনেট, স্যামুয়েলের ব্যাপারে খোঁজখবর কতদূর এগোল?
জেনেট উত্তেজিত গলায় বলল, “একটু আগে খবর এসেছে আমি তোমায় মেইলটা ফরোয়ার্ড করলাম
সোফিয়া ল্যাপটপে ই-মেইল খুলে বসল, মেলটা পড়তে পড়তে তার ঠোঁটের কোনায় হাসির রেখা ফুটে উঠল
সে বিড়বিড় করে বলল, “ইন্টারেস্টিং
এ কি, তুমি স্যামুয়েলকে সন্দেহ করছ নাকি?আমি বিস্মিত গলায় বললাম
কেন, স্যামুয়েলকে দেখে তোমার কেমন মনে হয়?” সোফিয়া রহস্যমাখা গলায় বলল
পড়াশোনা নিয়ে মেতে থাকা মানুষরা যেমন হয় আর-কি! আর যাই হোক মানুষটার মধ্যে প্যাঁচপয়জার আছে বলে তো মনে হয় না
সোফিয়া হেসে ফেলল, “তাহলে শোনো জেমস কুক ইউনিভার্সিটির প্রোফেসর স্যামুয়েল ফ্রেজারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত মাসে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মারাত্মক, বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা তছরুপ, যন্ত্রপাতি পাচার, হুমকি শাসানি দিয়ে লোকেদের মুখ বন্ধ রাখা
সে কী!” জেনেট প্রায় লাফিয়ে উঠল
তিনি আর যাই হোন সোজাসাপটা মানুষ একেবারেই নন,সোফিয়া কৌতুক মেশানো গলায় বলল
কিন্তু এতে কী প্রমাণ হয়?” আমি বললাম
কিছুই নয়, তবে পরের তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ স্যামুয়েল ফ্রেজারের আসল নাম ছিল স্যামুয়েল হোয়াইটফিল্ড ঠিক আট বছর আগে আইনি পদ্ধতিতে সেটা পালটানো হয়, আর…”
সাত বছর আগে স্যামুয়েল জনেরনিউ স্টারপ্রোজেক্টে যুক্ত হয়,জেনেট উদ্বেগ মেশানো গলায় বলল
সোফিয়া আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ জেনেটের ফোন বেজে উঠল স্যামুয়েল ফোন করেছে আগামীকাল প্রোজেক্টের উদ্বোধনে যাওয়ার জন্য বোটের ব্যবস্থা সে করে রেখেছে দুই একটা কথার পর সোফিয়া ফোনটা জেনেটের থেকে নিল তারপর সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেল
মিঃ স্যামুয়েল, যখন আপনাদের প্রোটোটাইপগুলি পরীক্ষা হয়েছিল তখন কি আপনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন?”
স্যামুয়েল শান্ত বলায় বললেন, “হ্যাঁ, আমি সেই সময় উপস্থিত ছিলাম সরকারি আধিকারিকদের সামনে বেশ কয়েক দফা পরীক্ষার পর আমরা প্রোজেক্ট এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমোদন পাই
আর যখন আসল যন্ত্রটি পরীক্ষা হয়?”
তখনও আমি উপস্থিত ছিলাম সে ক্ষেত্রেও কয়েক পর্বে ভালোভাবে পরীক্ষার পর সরকারি অনুমোদন পাওয়া যায়
সোফিয়া কঠিন স্বরে বলল, “তার মানে প্রোজেক্টের আগাগোড়াই আপনি উপস্থিত ছিলেন আপনার তত্ত্বাবধানেই সবকিছু হয়েছে
স্যামুয়েল কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, “হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
সোফিয়া রহস্যময় কণ্ঠে বলল, “না, কাল উদ্বোধনের পরে যদি এত বড়ো প্রোজেক্টে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয় তাহলে তো সেই দায়ভার আপনার উপরেই বর্তাবে
স্যামুয়েল আমতা আমতা করে বলল, “এমন কথা বলবেন না, গণ্ডগোল হলে কত মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হবে আপনি ভাবতেও পারবেন না তবে একটা কথা ভুল বললেন, প্রোজেক্টের পুরো সময়টা আমি উপস্থিত ছিলাম না
তাহলে?”
দশ মাস আগে যখন আমাদের প্রোজেক্টের গো লাইভেরঅনুমোদন চলে এল তারপরেই জন আমাকে অন্য আরেকটা প্রোজেক্টের দায়িত্ব দিয়েছিল
তাহলে সেই সময়ে কে প্রোজেক্টের দেখভাল করছিল?”
আমার ডেপুটি, হ্যামিলটন গত দশ মাস প্রোজেক্টের সবকিছুই সেই দেখাশোনা করেছে, যন্ত্রগুলি সমুদ্রতলে বসানোর সময়ও সেই উপস্থিত ছিল
আর হ্যামিলটন এখন কোথায়?”
স্যামুয়েলের গলায় আক্ষেপ ঝরে পড়ল কী আর বলব বলুন দুই মাস আগে একটা হাইকিং ট্যুরে গিয়ে হঠাৎ করেই ছেলেটা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল এখনও অবধি তার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না
সে কী! পুলিশ কী বলছে?”
এখনও সন্ধান চালাচ্ছে, হ্যামিলটন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল বলেই তো আমাকে আবার ফেরত আসতে হল প্রোজেক্টে ততদিনে অবশ্য বেশিরভাগ যন্ত্রই বসানো হয়ে গেছে, এই শেষ কয়েকটা এলাকায় যন্ত্র বসানোর কাজের তদারকি আমাকে করতে হল

সোফিয়া আর কিছু বলল না কালকে দেখা হচ্ছে বলে ফোনটা রেখে দিল
ফোনটা রাখার কয়েক মুহূর্ত পরেই আবার জেনেটের ফোনটা বেজে উঠল এবার জন ফোন করেছে
কুশল বিনিময়ের পর জন উদ্বেগ মেশানো কণ্ঠে জেনেটকে বলল, “সকালে আপনারা যে ছবিটা এনেছিলেন সেটার সম্পর্কে ভেবেছিলাম উদ্বোধনের আগে আর কথা বলব না কিন্তু সকাল থেকেই মনটা কেমন কু ডাকছে ছবিতে দেখা যন্ত্রটা এবং আমাদের প্রোটোটাইপ যন্ত্রগুলো হুবহু একইরকম দেখতে আপনাদের কথা যদি সত্যি হয়, যদি সত্যিই কোনো ষড়যন্ত্র থেকে থাকে এবং আমাদের প্রোজেক্টটার ক্ষতি করার জন্য কেউ এই ধরনের যন্ত্র বানিয়ে থাকে তাহলে সেটা সত্যিই চিন্তার ব্যাপার
সোফিয়া জেনেটের থেকে ফোনটা নিল এবং একটু দূরে গিয়ে জনের সঙ্গে কিছু কথা বলল
ফিরে এসে সোফিয়া গম্ভীর মুখে আমাদের বলল, জনের থেকে আমার যা যা জানার সব জেনে নিয়েছি অনেকটাই পরিস্কার হয়ে গিয়েছে, কিন্তু মেঘ পুরোপুরি কাটেনি এখনও মনের মধ্যে কিছু খটকা আছে
আমি বললাম, “এখনও কীসের খটকা?
সোফিয়া বিড়বিড় করে বলল, স্যামুয়েলের আগের নামটা ছিল হোয়াইটফিল্ড এই হোয়াইটফিল্ড নামটা যে কোথায় শুনেছি ঠিক মনে পড়ছে না কিছুক্ষণ সে ভ্রূকুঞ্চিত করে ঘরের মধ্যে পায়চারি করল, তারপর হঠাৎ কী যেন একটা মনে পড়েছে ভাব করে তাড়াতাড়ি গিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসল বেশ কিছুক্ষণ ল্যাপটপে মুখ গুঁজে থাকার পর, তার মুখে হাসি ফুটে উঠল সে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, এতক্ষণে সব জট ছাড়ানো গেল

ছয়

স্যামুয়েলের পাঠানো বোটে করে আমরা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছি সঙ্গী শুধুই কোরাল সাগরের উত্তাল ঢেউ আর এলোমেলো ঝোড়ো হাওয়া তবে আমরা একা নই, আমাদের থেকে মিনিট পাঁচেকের দূরত্বে আরও দুটো বোট এগিয়ে আসছে একটা কুইনসল্যান্ড পুলিশের, অন্যটি কোস্টাল পুলিশের
ঘণ্টা দেড়েক চলার পর আমরা জনদের বোটের কাছে পৌঁছোলাম। আমাদের বোট জনের বোটের পাশে আসতেই জন কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। তাঁর চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।
সোফিয়া বোটে উঠেই প্রথম প্রশ্ন করল, “উদ্বোধনের কতক্ষণ সময় বাকি আছে?”
জন ঘড়ি দেখে বলল, “এখন বাজে সকাল নটা, ঠিক দশটায় উদ্বোধন
“কীভাবে উদ্বোধন হবে?”
“আমাদের ওয়েবসাইটে একটা টাইমার চালু হয়ে গিয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা আগে। সেটা কমতে কমতে যখনই শূন্যে পৌঁছোবে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এই এলাকায় লাগানো প্রথম যন্ত্রটি সচল হবে। তার থেকে বেরোনো সিগন্যাল পরের যন্ত্রটিকে চালু করে দেবে। এইভাবে মিনিট পনেরোর মধ্যে আমাদের পুরো মনিটরিং নেটওয়ার্ক সচল হয়ে উঠবে। সঙ্গে সঙ্গেই পুরো গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের সমস্ত এলাকার তথ্য আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।”
“সারা দেশে এটা প্রচারিত হবে?” সোফিয়া জিজ্ঞাসা করল।
“হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত থাকবেন ভার্চুয়াল কলে।”
সোফিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যদি বড়ো সর্বনাশ এড়িয়ে যেতে চান, তাহলে এই মুহূর্তে উদ্বোধন পিছিয়ে দিন। আপনাদের যন্ত্রগুলি এমনভাবে ক্যালিব্রেট করা হয়েছে যে আপনাদের বসানো যন্ত্র দিয়ে রীফের কোনো নজরদারি তো হবেই না, উলটে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে
এরপর সোফিয়া সবার সামনে আমাদের খুঁজে পাওয়া যন্ত্রটা এবং তার কার্যপ্রণালী বর্ণনা করল সঙ্গে তার আশঙ্কার কথাও সবাইকে জানাল, যে খুঁজে পাওয়া যন্ত্রটা হয়তো জনের কম্পানির বসানো যন্ত্রগুলিরই একটা প্রোটোটাইপ
সুতরাং জনের কম্পানির বসানো যন্ত্রগুলিরও একইরকমভাবে কাজ করার কথা এবং সোফিয়ার ধারণা যন্ত্রগুলিকে এমনভাবে ক্যালিব্রেট করা হয়েছে যে যন্ত্রগুলি থেকে উচ্চমাত্রার তাপ তরঙ্গ সৃষ্টি হবে, ফলে প্রবাল প্রাচীরের মাস ব্লিচিং শুরু হতে পারে
জন অবাক হয়ে বলল, “যন্ত্রগুলো তো বারবার পরীক্ষা হয়েছে, তারপর সরকারি অনুমোদন পেয়েছে
আর যদি সরকারি পরীক্ষার সময় ব্যবহার করা যন্ত্রগুলো পরে পরিবর্তন করে দেয়া হয়ে থাকে? যে নকশা সরকারি অনুমোদনের জন্য ব্যবহার হয়েছে সেই অনুযায়ী যন্ত্র তৈরি না হয়? তখন কী হবে?”
জনের গলায় তখন উদ্বেগ ঝরে পড়ছে, “কে করবে এমন কাজ?”
এখনও বুঝতে পারছেন না কে করতে পারে? স্যামুয়েল ফ্রেজার!”
“স্যামুয়েল! না, না, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে স্যামুয়েলকে আমি চিনি আজ প্রায় সাত বছর হতে চলল সে নিজের কাজে অত্যন্ত দক্ষ, আমার অত্যন্ত বিশ্বস্ত
সোফিয়া হেসে বলল, “আপনি স্যামুয়েলকে সাত বছর ধরে চিনতে পারেন, কিন্তু স্যামুয়েল আপনাকে চেনে তার বহু বছর আগে থেকেই
মানে?” জন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে
সে কথায় আসছি, কিন্তু তার আগে একটা কথা বলুন স্যামুয়েল কি পুরো প্রোজেক্টটা নিজেই সামলেছে? নাকি তার অনুপস্থিতিতে হ্যামিলটন কাজগুলো করেছে?”
হ্যামিলটনের কথা আপনি কী করে জানলেন?” জনের গলায় সন্দেহ ঝরে পড়ছে
আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন, স্যামুয়েলের অনুপস্থিতিতে প্রোজেক্ট কি তার ডেপুটি হ্যামিলটন সামলেছে?”
জন অবাক গলায় বলল, “হ্যামিলটন স্যামুয়েলের ডেপুটি হবে কেন? হ্যামিলটন তো এই প্রোজেক্ট-এর প্রধান ছিল স্যামুয়েল যখন আমাদের দলে যোগ দিয়েছিল, সেই বরং হ্যামিলটনের সহযোগী ছিল তারপর দুই বছরের মাথায় হঠাৎ করে হ্যামিলটন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, তার কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না তখন থেকেই তো স্যামুয়েল এই প্রোজেক্টের দায়িত্বে
সোফিয়া উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, “আমি জানতাম এরকমই কিছু একটা হবে স্যামুয়েল কি পুরো সময়টাই প্রোজেক্টের তদারকি করেছে?”
অবশ্যই, তাঁর থেকে দক্ষ আর কে আছে এখানে? সরকারি অনুমোদন এসে যাওয়ার পর তো আমি তাঁর হাতেই সবটা ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ছিলাম
সোফিয়া মাথা নেড়ে আক্ষেপের গলায় বলল, “শুনুন মিস্টার ব্র্যান্ডন, স্যামুয়েলের আগের নাম ছিল স্যামুয়েল হোয়াইটফিল্ড হোয়াইটফিল্ড নামটা কি আপনার চেনা চেনা লাগছে?”
জন বলল, “শোনা শোনা লাগছে, কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছি না
আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি, আপনার ঠাকুরদার ‘গ্রিন আর্থ’ কম্পানি যে আন্দোলন করেছিল তাতে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলফিউচার রীফকম্পানি তাদের বিশাল অঙ্কের লগ্নি হয়ে গিয়েছিল সেই সময়ে এবং সেই বিশাল ক্ষতির হাত থেকে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ওই কম্পানিতে বেশ কয়েকজন শেয়ার হোল্ডার ছিলেন তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন থমাস হোয়াইটফিল্ড প্রতিষ্ঠানের এত বড়ো ক্ষতির কারণে তিনি রাতারাতি দেউলিয়া হয়ে যান আর্থিক দুর্গতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে থমাস আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন
থমাস হোয়াইটফিল্ড! হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়েছে নামটা
তারই নাতি স্যামুয়েল হোয়াইটফিল্ড,সোফিয়া শান্ত গলায় কথাটা বলতেই চমকে তাকাল জন
সোফিয়া বলে চলল, “স্যামুয়েল যেভাবেই হোক আপনার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে এগিয়েছে এবং যে মুহূর্তে সে আপনার প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পেরেছে তখন থেকেই ষড়যন্ত্রের জাল বোনা শুরু করেছে যখন সে দেখল আপনার জীবনের সব থেকে বড়ো প্রোজেক্ট হতে চলেছে এই নিউ স্টার’, সে তখনই ঠিক করে নিল আপনাকে সারা বিশ্বের সামনে অপদস্থ করবে আপনার কম্পানিকে ঠিক সেইভাবে দেউলিয়া করে দেবে যেভাবে একসময় তার ঠাকুরদাকে দেউলিয়া হয়ে পথে নামতে হয়েছিল
জন আর কথা বলতে পারছে না, তার ঠোঁট কাঁপছে সে কোনোমতে গুছিয়ে নিয়ে বলল, “শুধু প্রতিশোধের জন্যে মানুষ এত দূর যেতে পারে! কিন্তু কেন?”
সোফিয়া শান্ত গলায় বলল, “যখন কারোর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন সে তো বেপরোয়া হয়ে উঠবেই স্যামুয়েল এখন কোথায়?”

তাকে ঘণ্টাখানেক হল কেউ দেখতে পাইনি আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো কাছেপিঠেই আছে
সোফিয়া হাসল, “আমি জানতাম যে সে সময় বুঝে ঠিক পালিয়ে যাবে সেই জন্যে আগে থেকেই কোস্টাল পুলিশের দল আপনাদের এলাকার চারপাশে পাহারা দিচ্ছিল
বলতে বলতেই একটা বোটকে দূর থেকে আসতে দেখা গেল কাছে আসতেই দেখা গেল সেটা কোস্টাল পুলিশেরই নৌকা
বোটটা কাছে এসে জনের বোটের পাশে দাঁড়াতেই সেখান থেকে দুজন পুলিশ হাতকড়া পরানো অবস্থায় স্যামুয়েলকে নিয়ে এল
স্যামুয়েল সবাইকে দেখেই কাতর স্বরে বলে উঠল, “আপনারা এদের বোঝান কোথাও একটা ভুল হচ্ছে আমি সাতে পাঁচে থাকি না, আমায় এরা কেন বন্দি করছে?”
সোফিয়া হাসল, তারপর তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “আপনি সাতেও থাকেন, পাঁচেও থাকেন মিঃ ফ্রেজার আপনি ঘুঁটি ভালোই সাজিয়েছিলেন, কিন্তু সেইদিন আমাদের বোটে আপনার আসাটাই সবচেয়ে বড়ো ভুল হয়েছিল যদিও সেটা আপনি ইচ্ছে করে করেননি আপনি হয়তো প্রোটোটাইপের সন্ধানেই এসেছিলেন, আমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটা নেহাতই কাকতালীয় ছিল
হঠাৎ করে স্যামুয়েলের আমূল পরিবর্তন ঘটল এতক্ষণ যে লোকটা আমাদের চোখের সামনে কুঁকড়ে ছিল, কাতর গলায় সাহায্য চাইছিল, সে হঠাৎ সোজা টানটান হয়ে দাঁড়াল তার মুখে ছড়িয়ে পড়ল এক ধূর্ত হাসি চোখের মধ্যে যেন এক বিদ্যুৎলতা খেলা করে গেল স্যামুয়েলের চাহনি তখন আর নিরীহ এক প্রোফেসরের নয় বরং শিকার হাতছাড়া হওয়া এক নিষ্ঠুর শিকারির সে শীতল গলায় বলল, “আপনি ওখানে আছেন জানলে আমি ওই ঝুঁকিটা নিতাম না
সঙ্গে সঙ্গে দুইজন পুলিশ স্যামুয়েলকে শক্ত করে চেপে ধরল
স্যামুয়েল খুব শান্তভাবে হেসে হিমশীতল গলায় বলল, “আহ, আমি কোথাও পালাচ্ছি না।” তারপর সোফিয়ার চোখে চোখ রেখে বলল, “কালই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তাও ভাবলাম দেখি আমার আই কিউকে ম্যাডাম সোফিয়া ব্যানার্জি টপকে যেতে পারেন নাকি। আমায় ধরে কী হবে? আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তো প্রথম যন্ত্রটা চালু হয়ে যাবে। সেইখান থেকে ক্রমবর্ধমান তাপ তরঙ্গ ছুঁয়ে যাবে পরবর্তী যন্ত্রের সেন্সরকে। সঙ্গে সঙ্গেই সেটিও চালু হয়ে যাবে। এইভাবে এক এক করে সবকটি যন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠবে। পুরো ব্যারিয়ার রীফ জুড়ে বয়ে যাবে তাপতরঙ্গ যে ব্যারিয়ার রীফ বাঁচানোর জন্যে আমাদের সর্বস্বান্ত করা হয়েছিল, যারা সেই চক্রান্ত করেছিল সবাই শেষ হয়ে যাবে বলেই সে উন্মাদের মত খিলখিলিয়ে হেসে উঠল
তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, “আর মোটে দশ মিনিট বাকি
জন চমকে উঠে হাত ঘড়ির দিকে তাকাল তারপর হন্তদন্ত হয়ে কেবিনের দিকে ছুটে গেল
সোফিয়াও ছুটে গেল একটা প্যানেলের উপর বড়ো স্ক্রিনে টাইমার চলছে জন তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে সেই প্যানেলের পাশে কয়েকটা বোতাম টিপল টাইমার থামল না জন আবার বোতাম টিপল কিছুই হল না সে আবার চেষ্টা করল বারবার বিফলতার ফলে সে দরদর করে ঘামতে লাগল
সোফিয়া জিজ্ঞাসা করল, “কী হল?”
এই টাইমারটা শূন্যে পৌঁছোলেই প্রথম যন্ত্র সক্রিয় হবে তারপর চেইন রিয়্যাকশনের মতো বাকি যন্ত্রগুলো সক্রিয় হবে এই টাইমারটা বন্ধ করার একমাত্র পথ একটা সংকেত আমার ঠাকুরদার জন্ম সাল, জন্ম তারিখ ও নাম আমি নিজে এটা ব্যবহার করেছিলাম কিন্তু এখন আর সেটা কাজ করছে না
স্যামুয়েল জানত?”
জন সম্মতি জানাল বোঝা গেল সংকেত পরিবর্তন করা হয়েছে সোফিয়া সংকেতের রহস্য ভেদ করতে নেমে পড়ল জন এবং স্যামুয়েলের জন্ম সাল, জন্ম তারিখ ও নাম দিয়েও কাজ হল না সোফিয়া বেশ গভীরভাবে চিন্তা করল যেইদিন জনের ঠাকুরদাফিউচার রীফ’-এর প্রোজেক্ট বন্ধ করেছিলেন সেটাও ব্যবহার করা হল যেইদিন স্যামুয়েলদের দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছিল সেই তারিখও ব্যবহার করা হল কোনো ফল পাওয়া গেল না সোফিয়া ভুরু কুঁচকে চুপ করে বসে চিন্তা করতে লাগল টাইমারে দেখাচ্ছে আর মাত্র এক মিনিট বাকি
পুলিশরা স্যামুয়েলকে নিয়ে কেবিনে এসেছিল তার মুখে তখন যুদ্ধ জয়ের হাসি জন সেটা দেখতে পেয়ে ছুটে গিয়ে তার জামার কলার চেপে বলল, “শয়তান, বল কী কোড দিয়েছিস
স্যামুয়েল হিসহিসিয়ে বলল, “কলার ধরলে তো বলবই না, পায়ে পড়লেনা তাও বলব নাবলেই হো হো করে হেসে উঠল
সোফিয়া নিজের ফোন বের করে দেখছিল তাতে কালকের পাওয়া তথ্যগুলোর ছবি তুলে রাখা আছে
স্যামুয়েল সোফিয়ার দিকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দিয়ে উন্মাদের মতো এলোমেলো গলায় বলল, “কোনো লাভ নেই আজ ব্র্যান্ডনদের পতন কেউ আটকাতে পারবে না আমার জীবনের, আমার পরিবারের সমস্ত আভিশাপ আজ কেটে যাবে আমার ঠাকুরদার আত্মা অবশেষে আজ শান্তি পাবে
সোফিয়া চমকে তাকাল স্যামুয়েলের দিকে ভুরু কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল দেখতে দেখতে হঠাৎ সোফিয়ার মুখে আশার আলো ছড়িয়ে পড়ল সে দ্রুত ছুটে গিয়ে প্যানেলে কিছু বোতাম টিপতেই টাইমার বন্ধ হয়ে গেল
স্যামুয়েল হঠাৎ এটা দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, জনও চোখে একগাদা প্রশ্ন নিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল
সোফিয়া ঠোঁটের কোনায় যুদ্ধজয়ের হাসি ফুটিয়ে বলল, “‘১৯৭০-১০ই সেপ্টেম্বর-থমাসএটাই ছিল সংকেত আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল
স্যামুয়েলের মুখ দিয়ে যেন গোঙানি বেরিয়ে এল সে হাঁটু মুড়ে কেবিনের মাটিতে বসে পড়ল জন তখনও হাঁ করে তাকিয়ে আছে
সোফিয়া বলল, “স্যামুয়েলের ঠাকুরদা অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করেছিলেন ১০ই সেপ্টেম্বর ১৯৭০- যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে এত কিছু, তার মৃত্যুদিনকেই স্যামুয়েল কোড হিসাবে ব্যবহার করেছিল
তারপর স্যামুয়েলের কাছে গিয়ে বলল, “তাহলে সোফিয়া ব্যানার্জি আপনার আই কিউকে টপকাতে পারল তো?
স্যামুয়েল তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে কিন্তু সে কিছু বলার আগেই পুলিশ তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল যাওয়ার আগে সে শুধু কর্কশ স্বরে বলল, “আমি আবার ফিরে আসব সেইদিন আবার মুখোমুখি হব আমরা
সোফিয়া বিড়বিড় করে বলল, “আমিও অপেক্ষায় থাকব
----------
ছবি - এআই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment