গল্প:: অনুপস্থিতির রহস্য - সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


অনুপস্থিতির রহস্য
সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

সকাল দশটা পঞ্চাশ হিজলপুর হাইস্কুলের ক্লাস শুরু হচ্ছে বছরের প্রথম পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে সবে গতকাল আজ থেকে আবার স্বাভাবিক ক্লাস শুরু হবার কথা টিচার্স রুমের দরজার সামনে স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে একটি ছেলে এসে দাঁড়াল বর্ষীয়ান সহ-প্রধানশিক্ষক মনোজ ঘোষ নাম ডাকার খাতাগুলো ক্লাস টিচারদের হাতে একে একে তুলে দিচ্ছিলেন, তখনই তাকে দেখতে পেলেন
দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি, ছেলেটা ইতস্তত করছে লম্বা রোগা চেহারা, বড়ো বড়ো একমাথা শকোখুশকো চুল, সাদা জামা অনেকদিন কাচা হয় না লালচে হয়ে এসেছে গালে সদ্য গজানো অল্প অল্প দাড়ি ক্লাস টেনে পড়ে, মনোজবাবু চিনতে পারলেনকী ব্যাপার? কী নাম যেন তোর? কিছু বলবি?”
-        হ্যাঁ স্যর, আমি সৈকত, টেন বি বলব, মানে, একটা ভুল হয়ে গেছে
-        ভুল? কী হয়েছে?”
-        স্যর, আসলে গতকাল তো আমাদের শেষ পরীক্ষাটা ছিল…”
-        হ্যাঁ, ছিল তো!”
-        অঙ্ক পরীক্ষা ছিল একটু টেনশনে ছিলাম বলে, স্যর, আসলে কাল পরীক্ষার হলে রোল কলের সময় প্রেজেন্ট দিতে পারিনি
-        মানে অ্যাটেনডেন্স?”
-        হ্যাঁ স্যর, ওই যদি স্যর অ্যাবসেন্ট হয়ে যাই, রেজাল্টে সমস্যা হবে না তো? তাই আজ বলে গেলাম
-        আচ্ছা, আচ্ছা পরীক্ষার খাতা তো জমা দিয়েছিলি?”
-        হ্যাঁ, স্যর সেটা তো দিয়েছি
-        ঠিক আছে, তাহলে অত চিন্তার কিছু নেই অ্যাটেনডেন্সের ব্যাপার খাতা মিলিয়ে ঠিক করে নেওয়া হবে
-         আচ্ছা স্যর থ্যাঙ্ক ইউ স্যর আমি তাহলে ক্লাসে যাই এখন?”
-        ঠিক আছে যানা, দাঁড়া তো একবার!” অনুমতি দিয়েও আবার তাকে অপেক্ষা করতে বললেন মনোজবাবু কিছু একটা খটকা তাঁর মনে আনাগোনা করছিল
-        কী হল স্যর?”
-        বললাম তো দাঁড়া এই, অসিতবাবু, একবার এদিকে আসুন তো
অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অসিত স্যরকে ডাকলেন মনোজবাবু তিনি ক্লাস রুটিনে চোখ বুলিয়ে দেখছিলেন আজ কতজন শিক্ষক অনুপস্থিত আছেন, সেই অনুযায়ী ক্লাসগুলো চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে অন্যান্যদের দিয়ে রুটিনের কাগজটা হাতে নিয়েই তিনি দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন
-        বলুন মনোজবাবু, ডাকছিলেন?”
-        হ্যাঁ, গতকালের এক্সামের ডিটেইল্ড অ্যাটেনডেন্স রিপোর্টটা একবার নিয়ে আসুন তো একটা জিনিস চেক করব এই তোর রোল নম্বর কত রে?” শেষ কথাটা বললেন সৈকতের উদ্দেশে
-        স্যর, পঞ্চান্ন
-        বেশ অসিতবাবু, দেখুন তো ক্লাস টেন বি সেকশনের কে কে অ্যাবসেন্ট ছিল কাল?”
-        এই যে মনোজবাবু, রোল সাঁইত্রিশ, পঞ্চান্ন আর একাত্তর, পঁচাত্তর জনের মধ্যে মোট এই তিনজন আসেনি
-        আচ্ছা, পঞ্চান্ন রোল অ্যাবসেন্ট তবে বেশ এবার দেখুন তো, আগের পরীক্ষাগুলোতেও এরাই অনুপস্থিত ছিল কিনা!”
-        সাঁইত্রিশ আর একাত্তর আগের পরীক্ষাগুলোও দেয়নি, তবে পঞ্চান্ন দিয়েছিল রেকর্ড তাই বলছে
-        ওকে পর্যন্ত তো ঠিকই আছে, কিন্তু…”
-        স্যর, আমি আসি তাহলে? ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে…”
-        দাঁড়া! এত তাড়া কীসের তোর? আরেকটা জিনিস মেলাতে হবে অসিতবাবু, টেন বি- অঙ্ক পরীক্ষার খাতা কে দেখছেন এবার? জয়ন্ত স্যর?”
-        হ্যাঁ স্যর জয়ন্ত মল্লিকই দেখছেন খাতার বান্ডিল ওঁকে দেওয়া হয়েছে কালকেই
-        উনি কি ক্লাসে গেছেন কোনো? না হলে একটু খাতার বান্ডিলটা নিয়ে ওঁকে এখানে আসতে বলুন তো!”
-        ওঁর ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস নেই রুটিনে স্টাফ রুমেই আছেন আমি ডাকছি স্যর জয়ন্তদা, একবার এদিকে আসবেন? সঙ্গে কালকের টেন বি- খাতাগুলোও একটু নিয়ে আসবেন কাইন্ডলি
-        হ্যাঁ যাচ্ছি অসিতদাচেয়ারে বসে পরীক্ষার খাতাই দেখছিলেন জয়ন্ত মল্লিক তলব পেয়ে সেটাই গুছিয়ে নিয়ে এলেন
-        আমিই আপনাকে ডাকছিলাম জয়ন্তবাবু একটা প্রশ্ন ছিল
-        প্রশ্ন? বলুন মনোজবাবু
-        আচ্ছা আপনি টেন বি- মোট কতগুলো খাতা পেয়েছেন কাল?”
-        টোটাল বাহাত্তরটা স্যর বান্ডিলের সঙ্গে দেওয়া ইনফরমেশন নোটে তাই লেখা আছে
-        কী? বাহাত্তর? আপনি শিওর?”
-        হ্যাঁ স্যর কেন বলুন তো?”
-        ইনফরমেশন নোটে যাই থাক, আপনি গুনে দেখেছেন ভালো করে?”
-        হ্যাঁ স্যর, মিলিয়েই দেখেছি সেভেন্টি টু কেন স্যর? এনি প্রবলে?”
-        তাতেও বাহাত্তর! স্ট্রেঞ্জ!” স্বগতোক্তি করেন মনোজ ঘোষ চট করে একবার সৈকতের দিকেও তাকান তিনি তার মধ্যে একটা ছটফটে ভাব খুশ করছে হাতের আঙুল মটকাচ্ছে পা ঘষছে মেঝেতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আবার যেতেও পারছে না মনোজবাবুর কপালের মাঝখানে একটা ভাঁজ প্রকট হয়
-        তিনজন অ্যাবসেন্ট ছিল, তাই পঁচাত্তর জনের মধ্যে বাহাত্তরটা খাতা স্ট্রেঞ্জ কেন বলছেন মনোজবাবু?”  অসিতবাবু এবার মুখ খোলেন
-        উফ! একটু মাথাটা খাটান অসিতবাবু এই ছেলেটা বলছে কাল পরীক্ষা দিয়েছে, খাতাও জমা দিয়েছে শুধু রোল কলের সময় অ্যাটেনডেন্স দিতে পারেনি তাহলে রেকর্ডে অ্যাবসেন্ট থাকবে সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু খাতার সংখ্যা হিসেবের চেয়ে কমবে কেন? সেটা তো তিয়াত্তর হবে! বাহাত্তর কেন?”
-        ওহ এই ব্যাপার! কিন্তু স্যর, যে সত্যি বলছে তার প্রমাণ কী? তো বানিয়েও বলতে পারে!”
-        না স্যর, আমি এসেছিলাম কাল! আপনি বন্ধুদের যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখুন!” সৈকত এবার একটু জোর গলায় বলে
-        অ্যাই, তুই আমাদের মাঝখানে কথা বলিস না একদম, চুপচাপ দাঁড়া!” মনোজবাবু ধমক দেন সৈকতকে
-        কিন্তু স্যর, আমি তো কাল…”
-        আহ! স্যর বললেন না মুখ বুজে দাঁড়াতে? আচ্ছা বেয়াদ তো!” এবার অসিতবাবু গলা চড়ান
-        দেখুন, সত্যি বলছে কিনা সেটা তো সহজেই বের করা যাবে জয়ন্তবাবু, আপনি এখানেই চট করে একবার দেখুন তো আপনার বান্ডিলে থাকা বাহাত্তরটা খাতার মধ্যে পঞ্চান্ন নং রোলের খাতাটা আছে কিনা?”
-        আচ্ছা, দেখছি এখুনি স্যর
মাত্রই কিছুক্ষণ সময় গেল এতে কিন্তু মনোজবাবুর মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল জয়ন্ত মল্লিক পুরো বান্ডিলটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সেটা আবার বেঁধে ফেলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে মাথা নাড়লেন দু-দিকে উৎকণ্ঠিত মনোজবাবু তাও অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? পেলেন না জয়ন্তবাবু?”
-        নাহ, ওই তিনটেই নেই, যেগুলো বলেছিলাম বাকি সব রোল নম্বরের খাতাই আছে মানে সেই বাহাত্তর
-        এখন তাহলে উপায়, মনোজবাবু?” অসিতবাবু হতাশ হয়ে প্রশ্ন করেন
-        দাঁড়ান, এখনও একটা জিনিস দেখার আছে আচ্ছা অসিতবাবু, আমাদের প্রত্যেক ক্লাসরুমেই তো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো আছে?”
-        হ্যাঁ, মনোজবাবু, তা তো আছেই
-        তাহলে হেডস্যরের ঘরে চলুন সবাই আমার সঙ্গে টিভি মনিটরে কালকের সিসি ক্যামেরা ফুটেজটা চালাতে অনুরোধ করি ওঁকে সেখানেই দেখা যাবে এই ছোঁড়া সত্যি বলছে কিনা!” বলেই সৈকতের দিকে তাকান মনোজবাবু
আশ্চর্য হলেন, এতেও তার কোনো হেলদোল নেই বরং বুক চিতিয়ে সে- বলল, “চলুন স্যর আমি প্রস্তুত আমি সত্যি কথাই বলছি স্যর, বিশ্বাস করুন!”
ছাত্রের এতটা আত্মবিশ্বাস দেখে চিন্তায় পড়লেন মনোজ ঘোষ এমনিতে ছাত্রছাত্রীরা আত্মবিশ্বাসী হলে শিক্ষকদের আনন্দই পাওয়ার কথা কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা এখন যদি কোনোভাবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ছেলে কাল সত্যিই পরীক্ষার হলে উপস্থিত ছিল আর খাতাও জমা দিয়েছে, তখন তো স্কুল কর্তৃপক্ষই মুশকিলে পড়বে! যদি সত্যিই বাহাত্তরটা অঙ্ক খাতা থাকে, তাহলে তো হিসেবমতো একটা খাতা মিসিং! সেটা গেল কোথায়? মাথাটা ঘেঁটে গেছে মনোজবাবুর চুপচাপ তিনজন মাস্টারমশাই আর একজন ছাত্র করিডোর ধরে হেঁটে গেলেন প্রধান শিক্ষক বিপুল গাঙ্গুলির ঘরের দিকে
-        আসতে পারি স্যর?”
-        আরে মনোজবাবু, আসুন আসুন অসিতবাবু আর জয়ন্তবাবুও আছেন দেখছি কী ব্যাপার? সকাল-সকাল কোনো সমস্যা হল নাকি? এই ছেলেটা কিছু করেছে?”
-        সমস্যা তো একটা হয়েছেই স্যর আপনাকে সব খুলেই বলছি তবে
মনোজ ঘোষ নিজেই সবিস্তারে প্যাঁচালো ব্যাপারটা যথাসম্ভব গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলেন হেডমাস্টার বিপুলবাবুকে শুনতে শুনতে মুখ কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠল তাঁর একবার সৈকত নামে ছেলেটার দিকে, আরেকবার মনোজবাবুদের দিকে তাকিয়ে তিনি আস্তে আস্তে সিসিটিভির মনিটর অন করে রিমোট হাতে নিলেন সেটিংস থেকে প্রয়োজনীয় ধাপ পেরিয়ে গতকালের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ঘরের ক্যামেরা ফুটেজ চালু করলেন সবার সামনে কারও মুখে কোনো কথা নেই সৈকতের ভাবভঙ্গিতে শুধু কোনো হেলদোল নেই
রেকর্ডিং চালু হল বারো নম্বর ঘর গতকাল সকাল দশটা পঞ্চান্ন টেন বি- পঞ্চাশ থেকে সত্তর রোল নম্বরের ছেলেদের এই ঘরে সিট পড়েছিল তাহলে পঞ্চান্ন, মানে সৈকতের এখানেই থাকার কথা সবাই খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন চল্লিশ ইঞ্চির বড়ো স্ক্রিনটায় দশটা উনষাট ওই তো! সেই বড়ো বড়ো একমাথা চুল নিয়ে রোগা ছেলেটা ঘরে ঢুকল ক্যামেরায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মুখটা সৈকত! বেঞ্চে বসল নিজের সিটে খাতা পেল, প্রশ্নপত্র দিলেন ঘরের ইনভিজিলেটর দেবাশিস ধর স্যর হেডস্যর ভিডিওটা পজ করলেন মনোজবাবুর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন মনোজবাবুর ইশারায় ভিডিওটা আবার ফাস্ট ফরোয়ার্ড করা হল পরীক্ষা শেষের ঠিক আগের মুহূর্তটা আবার খতিয়ে দেখা হল নিয়ম মেনে সৈকতও তার খাতা দেবাশিস স্যরের হাতে জমা দিয়েই ঘর থেকে বেরোল, এটা দেখার পর হেডস্যর মনিটর বন্ধ করলেন তাকালেন সবার দিকে প্রত্যেকের মুখই থমথমে একটা শেষ আশা ছিল, সেটাও তো গেল! সৈকতকে এখন কী বলা হবে? তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন, রহস্যটা সমাধান করা যাচ্ছে না কেন?
মনোজবাবুর কপালের ভাঁজ আরও তীব্র হয় সবাই তবু তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে ফিজিক্সের শিক্ষক এই মানুষটার মগজের উপর স্কুলের সবারই ভরসা প্রবল স্কুল সংক্রান্ত যে কোনো জটিল সমস্যায় স্বয়ং হেডমাস্টারও তাঁর উপরেই আস্থা রাখেন, আজ কি তিনিও দিশাহারা কিছুটা? মনোজবাবু ধীরে ধীরে মুখ খোলেন, “আমরা যদি পুরো ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখি, তাহলে দেখা যাচ্ছে, সৈকত প্রাথমিকভাবে যা বলেছিল, সেটা মিলে যাচ্ছে কাল সত্যিই পরীক্ষা দিতে এসেছিল, খাতা জমাও দিয়েছে অ্যাটেনডেন্স দেওয়ার সময় অন্যমনস্ক হয়ে ভুলে গেছিল বলে তিনজন অনুপস্থিত দেখাচ্ছে রেকর্ডে, তাতে সমস্যা নেই কিন্তু আমাদের খাতার হিসেব মিলছে না বা ওর খাতাটাও পাওয়া যাচ্ছে না সেটা তিয়াত্তরের বদলে বাহাত্তর হচ্ছে! এটা কেন হল সেটাই ভাবাচ্ছে দেবাশিসবাবু যদি সব খাতা জমা নিয়েই থাকেন, যেমনটা ভিডিও ফুটেজে দেখছি, তাহলে তো তিয়াত্তরটা খাতাই থাকার কথা! সবচেয়ে বড়ো কথা, সৈকত খাতা জমা দিলে ওই পঞ্চান্ন রোল নম্বরের খাতাটা বান্ডিলে নেই কেন? আমি একবার দেবাশিসবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চাই উনি এখন যদিও ক্লাসে আছেন, দশ মিনিট বাকি আছে ফার্স্ট পিরিয়ড শেষ হতে, তবু আপনি যদি অনুমতি দেন…”
হেডস্যর ব্যাপারটা বুঝেই তৎক্ষণাৎ সম্মতি দেন, “শিওর! আপনারা দাঁড়ান, আমিই ওঁকে নিয়ে আসছি এখানে
মিনিটখানেকের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে ইংরেজির শিক্ষক দেবাশিস ধরকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন হেডমাস্টার বিপুলবাবু দেবাশিসবাবু ঘরে ঢুকতে গিয়েই সৈকতকে দেখে ভুরু কুঁচকে তাকালেন একটু থমকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে? তুই এখানে? কী হয়েছে?”
সৈকত কিছু বলার আগেই মনোজবাবু আর বিপুলবাবু তাঁকে বিষয়টা সংক্ষেপে বোঝাতে লাগলেন কিছুটা শোনার পরেই তাঁদের থামিয়ে দেবাশিসবাবু বললেন, “দাঁড়ান দাঁড়ান, একটা ণ্ডগোল হচ্ছে এই ছেলেটা কাল পরীক্ষা হলে ছিল, পরীক্ষা দিয়েছে, খাতাও জমা দিয়েছে আমি ব্যাপারে একশো শতাংশ নিশ্চিত কিন্তু আপনারা বলছেন ওর খাতা পাওয়া যায়নি? আর অ্যাটেনডেন্স দেয়নি বলছেন? অসম্ভব!”
মনোজবাবু একটু অসহিষ্ণু স্বরে বলে উঠলেন, “কোনটা অসম্ভব বলছেন আপনি দেবাশিসবাবু? আমরা তো সবটাই খতিয়ে দেখলাম এতক্ষণ ধরে
-        গোড়াতেই ণ্ডগোল হয়েছে মনোজবাবু আমার স্মৃতি এত সহজে বিশ্বাসঘাতকতা করে না আমার একটা স্বভাব আছে, অ্যাটেনডেন্স নেওয়ার সময় আমি স্টুডেন্টদের মুখের দিকে ভালো করে লক্ষ করি একভাবে মাথা নামিয়ে শুধুইয়েস স্যারশুনেই খাতায় লিখি না সেই কারণেই আরও স্পষ্টভাবে বলতে পারি, এই ছোকরা গতকাল অবশ্যই অ্যাটেনডেন্স দিয়েছে রোল কল করার সময় একটু আস্তে করে সাড়া দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দিয়েছে আমি ওকে প্রেজেন্টও করেছি
-        কিন্তু তাতে তো সমস্যাটা আরও ঘোরালো হয়ে গেল দেবাশিসবাবু! রেকর্ড তো বলছে আপনার করা অ্যাটেনডেন্স শীটে , মানে রোল নং পঞ্চান্ন অ্যাবসেন্ট, আর এদিকে খাতা আর টোটাল প্রেজেন্ট থাকা স্টুডেন্টের সংখ্যাও মিলে যাচ্ছে! তাহলে?”
-        দাঁড়ান, দাঁড়ান, আমাকে আরেকটু ভাবতে দিন ইয়েস, পেয়েছি!”
-        কী পেলেন? আমাদের জানান দয়া করে, এই রহস্যের কিনারা করতে হিমশিম খাচ্ছি যে!”
সরাসরি সে কথার উত্তর না দিয়ে দেবাশিসবাবু আচমকা সৈকতের দিকে ঘুরে খপ করে ওর মাথার আলুথালু চুলের মুঠিটা ধরে ঝাঁকাতে আরম্ভ করলেন, আর বললেন, “হতভাগা! আমাদের বোকা বানাচ্ছিলি? শিগগির বল কেন এটা করলি? স্বীকার কর যেটা করেছিস! ক্ষমা চা এক্ষুনি!”
ঘটনার অভিঘাতে সৈকত তো বটেই, বাকি মাস্টারমশাইরাও হতভম্ব হয়ে গেলেন মুহূর্তেই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মনোজবাবু দেবাশিস ধরকে নিরস্ত করতে উদ্যত হয়ে বললেন, “আহা-হা! করছেন কী! কী করেছে সেটা তো বলুন আগে! ছেড়ে দিন বেচারাকে
-        বেচারা? এই বয়সে এমন কাণ্ড করছে! বড়ো হয়ে না জানি কী কী করবে! উফ! জানেন কী করেছে?”
-        না, আমি তো এখনও বুঝতে পারছি না, একটু খুলে বলুন না!”
-        বলছি, তার আগে দেখি নিজেই কৃতকর্মটা কবুল করে কিনা! এই, সত্যি করে বল, তুই কাল অ্যাটেনডেন্স দেবার সময় রোল নম্বর পঁয়ষট্টিতে সাড়া দিয়েছিলি কিনা?”
-        পঁয়ষট্টি?” বিপুলবাবু, মনোজবাবুরা একযোগে আশ্চর্য হন
-        হ্যাঁ স্যর, বললাম না, আমার বদভ্যাস আছে, আমি ওদের মুখের দিকে তাকিয়েই উপস্থিতি বিচার করি যেহেতু গতকালের ঘটনা, তাই স্মৃতি এখনও টাটকা ওর রোল নম্বর আমার মনে ছিল না, তাই পঞ্চান্নর বদলে পঁয়ষট্টিতে সাড়া দিলেও কাল আমি সেটা ধরতে পারিনি কিন্তু স্মৃতিতে যে ছবি গেঁথে আছে সেটা তো একান্ত আমার নিজস্ব, সেটা তো মিথ্যে বলে না ইচ্ছে করেই পঁয়ষট্টি রোলে সাড়া দিয়েছে, আমার মনে হয় খাতা খুঁজলে দেখা যাবে নিজের খাতাতেও রোলের জায়গায় পঁয়ষট্টিই লিখেছে, যাতে বিভ্রান্তি বাড়ে এবার আপনারা তদন্ত করে দেখুন, সেই পঁয়ষট্টি রোলের আসল মালিক ছেলেটা কে আর কেন এটা করল!”
কিছুক্ষণ সবাই নির্বাক! মনোজবাবু একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “বাঁচালেন দেবাশিসবাবু এবার ধাঁধাটার সমাধান প্রায় হয়েই এসেছে হ্যাঁ রে, তুই ভালোয় ভালোয় সবটা বলবি, নাকি তোকে স্কুল থেকে সাসপেন্ড করার কথা ভাবব আমরা, বল?”
সৈকতের উদ্দেশে কথাগুলো বলা শেষ হতেই এই প্রথমবার সে ভেঙে পড়ল কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, “আমায় মাপ করে দিন স্যর উজ্জ্বল, মানে আমাদের ক্লাসের উজ্জ্বল পাল, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ওর রোল পঁয়ষট্টি ওর বাবা ভিনরাজ্যে কাজ করে গতমাস থেকে কোনো একটা ঝামেলার জন্য বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছে না বলে ওর আর ওর মায়ের বেশ দুরবস্থা তাই কয়েকদিন ধরে কাজ খুঁজছিল কলকাতায় এক ব্যবসায়ীর কাছে একটা কাজের বরাত পেয়ে গতকালই ওকে যেতে হয়েছে মাসখানেক পর ফিরে আবার স্কুলে আসত ক্লাস টেনের এই একটা পরীক্ষা না দিলে যদি মাধ্যমিকের আগে কোনো অসুবিধা হয় তাই আমাকে বলেছিল একটু ম্যানেজ করতে আমি তাই…”
-        তুমি তাই প্রাণের বন্ধুর প্রক্সি দিচ্ছিলে এভাবে! আবার নিজেরও যাতে অসুবিধা না হয় তাই আজকে এসে এইসব গল্প বানালে! তুমি তো ডেঞ্জারাস ছেলে হে!” হেডমাস্টার বিপুলবাবু রাগ আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি একটা অবস্থানে এখন
-         যাই হোক, ব্যাপারটার সমাধান যখন হয়েই গেছে, আমার মনে হয় স্যর এবার এই সৈকত আর উজ্জ্বল, এদের দুজনেরই একটা ব্যবস্থা করা উচিতমনোজবাবু বললেন
-        হ্যাঁ, আপাতত তোমাদের দুজনেরই অভিভাবকদের আসতে বলো সামনের সপ্তাহে আর তোমার বন্ধু উজ্জ্বলকে বলো, ওর ওই ব্যাবসার কাজ এখন করার দরকার নেই আমার কাছে আসতে বলবে, স্কুল থেকেই কিছু সাহায্য করা যাবে আর যদি একান্তই কাজের প্রয়োজন হয়, এই এলাকার মধ্যেই উপার্জন করার মতো কাজ আমি ওকে জোগাড় করে দিতে পারব কিন্তু পড়াশোনা যেন বন্ধ না করে, আর এরপর এমন ভুল যেন কোনোদিন না করে আর তোমারও যেন এটাই শেষ অপরাধ হয়, বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে এমন কাজ আর কোরো না বুঝেছ?”
হেডস্যরের কথায় মাথা নীচু করে ঘাড় নাড়ে সৈকত
-        যা এবার ক্লাসে সেকেন্ড পিরিয়ডে আমারই ক্লাস তোদের আসছি একটু পরেইমনোজবাবুর কথা শুনে সৈকত চুপচাপ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টেন বি- ঘরের দিকে এগিয়ে গেল
-        ওকে তেমন কোনো শাস্তি দিলেন না কেন মনোজবাবু?” অসিতবাবু জিজ্ঞেস করেন
-        ছেলেটা কাজটা অন্যায় করলেও ওর উদ্দেশ্যটা ততটা খারাপ নয় অসিতবাবু বিপদে পড়া বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য একটা গর্হিত কাজ করে ফেলেছে শুধরোবার একটা সুযোগ ওকে দিয়েই দেখা যাক তবে যাই বলুন, ছোকরা মাথাটা খাটিয়েছিল ভালোই আমাদের মতো এতগুলো লোককে রীতিমতো ঘোল খাইয়ে দিয়েছিল! ভাগ্যিস দেবাশিসবাবুর ফটোগ্রাফিক মেমরিটা ছিল!”
এতক্ষণ পর সবাই একটু প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন তখুনি সেকেন্ড পিরিয়ডের ঘণ্টা বেজে উঠল
----------
ছবি: এআই (নির্মাণ: সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী)

No comments:

Post a Comment