ম্যাজিক পেনসিল: গল্প:: বরফের মাঝে অলৌকিক - অদ্রিজা মণ্ডল


বরফের মাঝে অলৌকিক
অদ্রিজা মণ্ডল
দশম শ্রেণী, সেণ্ট মেরিজ কনভেণ্ট স্কুল, সাঁতরাগাছি

দিল্লি অভিযানের পর প্রায় দু-মাস কেটে গেছে আজ আমার জন্মদিন সত্যি বলতে গেলে, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছি এই ভাবনা মাথায় নিয়ে - তিতাসের থেকে কী উপহার আদায় করা যায়? কিন্তু ও যা উপহার আমার জন্য ঠিক করে রেখেছিল, এমন উপহার বোধহয় সাত জন্মেও আমার ভাগ্যে জোটেনি
কলেজে ঢুকতেই তিতাসের সঙ্গে দেখা হল সে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, “সকালের খবরের কাগজটা দেখেছিস?”
আমার সকাল-সকাল আর কাগজ পড়ার সময় হয়নি তাই মাথা নাড়লাম ও খপ্‍ করে আমার হাত ধরে বলল, “আগে ক্লাসে চল তারপর দেখতে পাবি কী দুর্দান্ত খবর দিয়েছে!”
আমি মুখ ব্যাজার করে বললাম, “জন্মদিন তো দূরস্থান, তুই তো সুপ্রভাত বলতেই ভুলে গেছিস!”
তিতাস থমকে দাঁড়িয়ে গেল “ও, তোর জন্মদিন না আজকে? দুঃখ করিস না, ছুটির পর তোকে ফুচকা খাইয়ে দেব, চলবে?”
ফুচকার নাম শুনলে যে আমার সব রাগ চলে যায়, তা তিতাস জানে আমি তাই বললাম, “কুড়ি টাকার কমে কিন্তু চলবে না, ম্যাডাম
“আচ্ছা, আচ্ছা, তাই হবে,” বলে ও আমাকে নিয়ে ক্লাসের দিকে চলল
তিতাসের কাছে অনলাইন খবরের কাগজে আমি খবরটা পড়লাম “কংকা লা পাস?” আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম
“খবরটা পড়ার পর থেকে আমি জায়গাটাকে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গবেষণা করলাম,” তিতাস বলল, “জায়গাটা বেশ... রহস্যময়
“পাস তো একটা রহস্যজনক কী আছে সেখানে?”
“লোকে বলে ওটা নাকি ভারতের ‘এরিয়া ৫১’ ওখানে নাকি লোকে ইউ.এফ.ও দেখতে পেয়েছে সব নাকি হয় মাটির নীচ থেকে উঠে আসে, নয়তো আকাশ থেকে নেমে আসে
“ওরে বাবা, ভিনগ্রহীদের বাসা নাকি?”
“ধুস, ওসব আবার হয় নাকি? এর পিছনে অন্যরকম কোনো রহস্য আছে
আমি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম রহস্যের দিকে তিতাসের একটু বাড়াবাড়ি রকমের ঝোঁক আছে
“তুই কী করবি এ ব্যাপারে?” আমাকে প্রশ্নটা করতেই হল
তিতাস দু-মিনিট কী যেন ভাবল তারপর হাসিমুখে বলল, “যাব ওখানে
“তুই পাগল হলি নাকি?” আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, “ওখানে তো কারোর যাওয়ার অনুমতি নেই!”
তিতাস শুধু হাসল, “সে নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না আমি ব্যবস্থা করে নেব
সেদিন রাতে খেয়ে ওঠার পর আমি সবে পড়তে বসেছি, হঠাৎ আমার ফোনে সাহানা বাজপেয়ী গেয়ে উঠলেন স্ক্রিনে তিতাসের নামটা জ্বলজ্বল করছে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে তিতাসের উত্তেজিত গলা শোনা গেল, “ব্যবস্থা হয়ে গেছে রে মহিমা!”
শুনে তো আমি থ, “কী বলছিস কী?”
“ওরে, আমার মামা যে আর্মির অফিসার, তা কি তুই ভুলে গেলি?”
তাই তো! আমার তো মনেই ছিল না যে তিতাসের মামা আর্মির লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর সেরকম পদের কারোর অনুমতি থাকলে আমাদের আটকাচ্ছে কে?
“কবে যাওয়া?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম
তিতাস বলল. “মামা আপাতত ছুটিতে আছেন আমাদের পরের মাসে যখন ছুটি পড়বে, তখন তিনি আবার লাদাখে ফিরে যাবেন তখন আমরা তাঁর সঙ্গে চলে যাব দু-দিনের মধ্যে সমস্ত কাগজপত্রের ব্যবস্থা করে নেব, তোকে যা যা পাঠাতে বলব, তাই দিবি
আমার তো আর আনন্দ ধরে না আবার বিশ্বাসও হতে চায় না তাই পরের প্রশ্নটা তাকে করতেই হল, “ধোঁকা দিচ্ছিস না তো?”
“এত করে তোর জন্য সব করলাম, শেষপর্যন্ত তুই এমন করে আমায় বলবি?” তিতাসের গলাটা ভারি করুণ শোনাল
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “আরে না না, ওরকম কিছু নয় মানে... আসলে বিশ্বাস হচ্ছিল না যে অমন অসম্ভব কাজটা তুই ম্যানেজ করে নিয়েছিস
“যাই হোক,” তিতাস বলল, “পরের মাসে আমাদের যাওয়া তৈরি হয়ে থাকিস!”
“ঠিক আছে,” বলে আমি ফোন কেটে দিলাম

এরপরের দিনগুলো যেন কেমন দৌড়ে দৌড়ে চলে গেল আমার যেন আর তর সয় না তাই নিজের উত্তেজনা কমাতে আমি কংকা লা পাস নিয়ে যতটা সম্ভব পড়াশোনা করে নিয়েছিলাম আমার মধ্যে কী রোগ ধরে গেছে জানি না, (বোধহয় তিতাসের সঙ্গে থেকে থেকে), সবেতেই যেন রহস্যের গন্ধ খুঁজে পাই কিন্তু পড়তে পড়তে আমারও কেমন যেন মনে হয়েছিল যে এই স্থানটার পিছনে কোনো অলৌকিক কাণ্ড নাও থাকতে পারে কী জানি, মানুষ ইচ্ছা করলে সবই করতে পারে
যাই হোক, শেষপর্যন্ত সেই শুভদিন উপস্থিত হল হাতে বড়োসড়ো একখানা সুটকেস আর কাঁধে ছোটো একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে নীচে নেমে দেখি, তিতাস হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, পিছনে একটা বড়ো কালো গাড়ি ও বলল, “আমার বাবা বললেন যে তিনিই আমাদেরকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন তুই তৈরি তো?”
আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, “সে আর বলতে?”
দমদম এয়ারপোর্ট বেশি দূর নয় আধঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম সিকিউরিটি চেকিং-এর পর আমরা যখন আমাদের ফ্লাইটের অপেক্ষায় বসে আছি, তখন আমি বললাম, “তুই তো বলেছিলি ঐ পাসটাতে যে নানারকম অলৌকিক ঘটনা ঘটে, তার পিছনে কিছু একটা রহস্য আছে তোর কী মনে হয়, কী রহস্য আছে ওখানে?”
তিতাস বোধহয় নিজের ভাবনায় মগ্ন ছিল, অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল, “কী জানি? দেখা যাবে
বোঝাই গেল, তিতাসের থেকে এখন উত্তর বার করা যাবে না ও একবার চিন্তায় ডুবে গেলে সেখান থেকে টেনে তোলাটা দুষ্কর
যাই হোক, প্লেন তো ঠিক সময়ে এল, আর ঘণ্টাতিনেকের মধ্যে আমরা শ্রীনগরে নামলাম নামতেই সে কী অসম্ভব ঠান্ডা! এক রাশ ঠান্ডা হাওয়া আমাদের হাড় কাঁপিয়ে দিয়ে চলে গেল তাড়াতাড়ি কান চাপা দিয়ে আমরা এয়ারপোর্টে ঢুকে পড়লাম আমাদের লেহ্‍ যাবার ফ্লাইট আসতে তখনও একঘণ্টা বাকি, তাই আমরা চট করে কিছু খেয়ে নিলাম ফ্লাইটের অপেক্ষা করতে করতে আমি তিতাসকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোর মামার সঙ্গে কোথায় দেখা হবে?”
“এয়ারপোর্ট থেকে আমাদেরকে নিয়ে যাবেন,” তিতাস উত্তর দিল ও তখনও অন্যমনস্ক হয়ে আছে দেখে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তুই কি এখনও ওটা নিয়ে ভাবছিস?”
“আমার এখনও মনে হচ্ছে এসব ‘অলৌকিক’ কাণ্ডকারখানা কোনো মানুষই ঘটাচ্ছে,” তিতাস বিড়বিড় করে বলল, “কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, কেন? এসব করে তার কী লাভ হচ্ছে?”
“কোনো জিনিসের খোঁজ করতে চায়, তাই সন্দেহ এড়াবার জন্য এসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে নিশ্চয়ই,” আমি বললাম তিতাস মাথা নেড়ে বলল, “হতেও পারে
ততক্ষণে প্লেন এসে গেছে তারপর আর বলে কী করব? ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা লেহ্‍ পৌঁছে গেলাম সেখানে তো আরেক গল্প!
“ওরে বাবা রে, এত ঠান্ডা তো আশাই করিনি!” তিতাসের গলাটাও কাঁপছে
আমি গলার মাফলারটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বললাম, “লাদাখে এসেছিস, আবার কী আশা করছিলি রে? আর তোর মামা কই?”
তিতাস বলল, “আগে চল, মালপত্রগুলো নিয়ে নিই তারপর দেখা যাবে
মালপত্র নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এসে দেখি, একটা মিলিটারি জিপ দাঁড়িয়ে আছে, ও তার পাশে এক অতি চেনা মুখ! “মামা!” তিতাস ডাকল মামাবাবু হেসে বললেন, “এই তো গোয়েন্দা তিতাস এসে গেছেন!” তিতাস অমনি গিয়ে তাঁকে প্রণাম করল মামাবাবু বললেন, “ঠিকঠাক এসেছিস তো? পথে কোনো বিপদ-আপদ…”
“না না, আমরা পুরো সময়টাই সুরক্ষিত ছিলাম,” তিতাস আশ্বাস দিল মামাবাবু আমার দিকে তাকাতেই আমি তাঁকে প্রণাম করে বললাম, “আমি আসলে ওর সহপাঠিনী আমার নাম মহিমা” মামাবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “তুমিই তো ওর সঙ্গে দিল্লির রহস্যটা উদ্ধার করার সময়ে ছিলে ব্রিলিয়ান্ট! অত্যন্ত ভালোভাবে কাজ সম্পন্ন করেছ তোমরা
তিতাস বলল, “তাহলে মামা, কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“পাসটার সামনে আমাদের যে ক্যাম্প আছে, সেখানে যাব
আমি আর তিতাস তাড়াতাড়ি জিপে উঠে পড়লাম মামাবাবু সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলেন জিপ এয়ারপোর্ট ছেড়ে সাঁ সাঁ করে চলতে লাগল
ক্যাম্পে পৌঁছোতে পাঁচ মিনিট লাগল ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে ক্যাম্পে একটা ছোটো তাঁবুতে মামাবাবু আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন আমরা গুছিয়ে তাঁবুর ভিতরে বসার পর তিতাস বলল, “এখন একটু শুয়ে নিই রাতে কাজ আছে
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, “মানে?”
“রাতে খাওয়া হয়ে গেলে আমরা হাওয়া বুঝে পাসটার দিকে যাব
“তুই না সত্যিই পাগল আছিস,” আমি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “কাল দিনের আলোয় তদন্ত করতে কী হচ্ছিল?”
“আরে, রাতে না গেলে যে কিছুই বুঝব না! যদি কোনো মানুষের কীর্তিকলাপ হয়ে থাকে এটা, তাহলে এরা রাতেই বেরোয় রে!”
ইস্, তিতাসটা এত যুক্তি দিয়ে কথা বলে কেন?! আমার যতই মনে হোক যে ওর মাথা খারাপ, কথাটা কিন্তু ও ঠিকই বলেছে তাই আমি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুয়ে পড়ে বললাম, “যা মনে হয় কর
রাতে খাওয়ার পর যখন সকলে তাঁবুর দিকে চলে গেল, তখন আমি তিতাসকে ফিসফিস করে বললাম, “কোথায় যাবি বল আর কাছাকাছি থাকব, এই কথা দে
“পাসটা তো এখান থেকে বেশিদূর নয় কিছু হবে না,” তিতাস আশ্বাস দিল
বাইরে অসম্ভব ঠান্ডা, তাই আমরা সোয়েটারের ওপর মোটা জ্যাকেট চাপিয়ে হাতে টর্চ নিয়ে ক্যাম্পের বাইরে বেরিয়ে গেলাম ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কিছুদূর গিয়েই সামনে একটা বেড়াজাল পড়ল
“এই রে, ঢুকি কী করে?” আমাকে প্রশ্নটা করতেই হল
তিতাস কপাল চাপড়ে বলল, “একটু ভালো করে নিজের চারিদিকে দেখ না!”
ওর টর্চের আলোয় দেখি, একটা ছোট্ট গেট লাগানো রয়েছে গেটটায় তালা লাগানো নেই
“সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করাটা উচিত হবে না,” বলে তিতাস সাবধানে গেটটা খুলল
আমরা ঢুকে পড়লাম জায়গাটা একদম শুনশান দূরে বরফ-ঢাকা পাহাড়, আর চারদিকে ছোটো ছোটো টিলায় ভর্তি আর মাইলের পর মাইল শুধুই বরফ আর বরফ
আমি বললাম, “এখানে তো কিছুই নেই রে!”
“ধীরে, বন্ধু, ধীরে আগে একটু দেখি!”
তিতাস কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কী যেন দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেল “মহিমা, একবার এদিকে আয় তো
আমি এগিয়ে গেলাম দেখি, তিতাসের সামনে পায়ের ছাপ এটা আমাদের কারোরই হতে পারে না
“দেখলি তো?” তিতাস নীচু গলায় আমাকে বলল, “এটা মানুষের পায়ের ছাপ দেখেই বোঝা যায় এখানে কেউ একটা তো আছেই
আমার তখন কিছুই বলার ছিল না আমি শুধু বললাম, “এবার কী করবি?”
“এগিয়ে দেখব
পায়ের ছাপগুলো কিছুদূরে গিয়ে ঢালু হয়ে নেমে গেছে সেখান অবধি গিয়ে দেখি, ছাপগুলো একটা ছোটো গুহায় ঢুকে গেছে
“ঢুকবি নাকি?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম
তিতাস বলল, “অবশ্যই!”
“তুই তো সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস রে! কেউ যদি থাকে?”
তিতাস একটু ভাবল “ঠিকই বলেছিস কাল রাতে দেখব গে এখন ক্যাম্পে ফিরে যাই
আমরা সবে পিছনে ঘুরেছি, হঠাৎ পিছন থেকে আমার কানের পাশ দিয়ে সাঁ করে একটা গুলি ছুটে গেল গুলিটা গিয়ে একটা পাথরের গায়ে লেগে গেল এরপর কি আর দাঁড়ানো চলে?
আমরা আর কোনোদিকে না তাকিয়ে বরফের মধ্যে দিয়েই উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগালাম গেটের কাছে পৌঁছে যেতে তিতাস তাড়াতাড়ি গেটটা খুলে আমার হাতটা ধরে সাঁ সাঁ করে দৌড়োল; ক্যাম্পের আগে আমরা আর একমুহূর্ত দাঁড়াইনি আমাদের তাঁবু সামনের দিকেই ছিল, চুপচাপ সেখানে ঢুকে পড়লাম
পরদিন সকাল থেকে তিতাস একদম গম্ভীর হয়ে রইল আমি ওঠার অনেক আগেই সে উঠে পড়েছিল, কারণ আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি যে ও নেই খাওয়াদাওয়ার সময়েও ও কেমন যেন চুপচাপ মামাবাবুও কিছু বললেন না দেখে মনে হল, তিনি কী যেন একটা চিন্তায় মগ্ন আমিও আর কথা বাড়ালাম না
খাওয়ার পর আমরা মামাবাবুর থেকে অনুমতি চেয়ে নিয়ে একটু হাঁটতে বেরোলাম তিতাসের মুখের দিকে চেয়ে আমাকে এই প্রশ্নটা করতেই হল
“কী করবি, তিতাস? বাড়ি চলে যাবি?”
তিতাস আমার দিকে অদ্ভুত এক চাহনি দিল
“না
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “আমি প্রায় গুলি খেয়ে মরতে যাচ্ছিলাম আর তুই এখনও জেদ ছাড়বি না?”
“সেটাই তো কথা আজ আমি আবার যাব আর হ্যাঁ,” তার গলাটা অদ্ভুতভাবে কঠিন হয়ে গেল, “তুই আমার সঙ্গে যাবি অত সহজে ভয় পাবার মতো মানুষ হয়ে আমাকে লজ্জা দিস না
কথাটা আমার আঁতে লাগল আমি ঠিক করে নিলাম, আমাকে যেতেই হবে
সেইদিন রাতে যখন বেরোলাম আমাদের নৈশ অভিযানের উদ্দেশ্যে, তখন তিতাস নিজের সঙ্গে একটা রিভলভার নিয়ে নিল তার মুখ দেখে তার মনের অবস্থা বোঝা কঠিন তাই আমি আর ওসবে না গিয়ে প্রশ্ন করলাম, “রিভলভারটা কোত্থেকে পেলি?”
“মামার কাছ থেকে নিয়েছি
“বাবা রে, দিয়েও দিলেন?”
“হ্যাঁ আমার বয়স একুশ, না দেবার কিছু নেই
ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে ও কথা বলবার অবস্থায় নেই তাই আমিও আর বেশি কিছু না বলে বললাম, “চল
সেদিন রাতে পাসটা যেন আরও নিস্তব্ধ মনে হচ্ছিল যেন সকলে নিশ্বাস চেপে বসে আছে, এক বড়ো ঘটনার অপেক্ষায় তিতাস ধীরে ধীরে গেটটা খুলে ঢুকল আমি তার পিছন পিছন গেলাম
বরফ আমাদের পায়ের ছাপগুলো মুছে দিয়েছে বটে, কিন্তু তিতাস আর আমার খুব ভালোভাবেই মনে ছিল সেই গহ্বরটার স্থান আমরা আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম পাথরটার কাছে এসে তিতাস ফিসফিস করে বলল, “একবার পিছনে দেখ তো, কেউ আসছে কিনা?”
আমি পিছনদিকে তাকিয়ে দেখলাম কোথাও কেউ নেই আমি বলতে পারি যে এটা ভালো খবর, কিন্তু এরকম অদ্ভুত নীরবতায় যেন আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম তিতাসকে ফিসফিস করে বললাম, “কেউ নেই কিন্তু যা করবার তাড়াতাড়ি কর, কারণ যে কোনো সময় কেউ চলে আসতে পারে
তিতাস মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে চল, ভিতরে যাই
গুহাটা ছোটো; রাস্তাটা ঢালু হয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে আমরা হাঁটু গেড়ে বসে হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম
কিছুদূর যাবার পর রাস্তাটা শেষ হয়ে গেল; দেখি যে সামনেই অনেকগুলো সিঁড়ি নেমে গেছে তিতাস উঠে দাঁড়াল, তারপর মাথাটা নীচু করে আস্তে আস্তে নামতে লাগল আমি তাকে অনুসরণ করলাম
বেশ কিছুদূর যেতে একটা জায়গায় এসে পৌঁছোলাম আমাদের সামনে একটা বড়ো ফাঁকা জায়গা; সেখানে তিনটে দরজা
“ঢুকবি?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম তিতাস মাথা নাড়ল তারপর ও এগিয়ে গিয়ে মাঝের দরজাটাতে ঠেলা মারল
“তুই যে আসবি, আমি সেটা জানতাম
পিছন থেকে যে গলাটা ভেসে এল, সেটার মালিককে দেখতে পেলাম না বটে, কিন্তু গলাটা অত্যন্ত চেনা; অন্তত তিতাসের জন্য তো বটেই
“শ্-শুভ্র?” তিতাসের গলাটা কাঁপছে
আমরা দুজনেই পিছনে ঘুরে তাকালাম যাকে দেখলাম, তাকে দেখে আমার হাত থেকে টর্চটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল
সত্যি সত্যিই সেই লম্বা, ফরসা ছেলেটি, যে একসময় হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিল, সেই ছেলেটা আজ আবার আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিতাসের প্রাণের বন্ধু, শুভ্রনীল ঠোঁটে ক্রুর হাসি
“তুই এখানে কী করছিস?” আমিই প্রথম প্রশ্নটা করলাম
“আঃ, সেসব কথা পরে আগে বল, তোরা কেমন আছিস? প্রায় দশ বছর পরে আবার দেখা,” শুভ্রনীল হাসিমুখে বলল গলাটা যেন বিষ মেশানো মিছরির ছুরির মতো আমার বুকে এসে বিঁধল মনে পড়ে গেল সেই দশ বছর আগেকার কথা
তিতাস আর আমি একই স্কুলে পড়তাম তখন আমাদেরই সঙ্গে পড়ত আরও একটি ছেলে, নাম শুভ্রনীল স্কুলে ভর্তি হবার কিছুদিনের মধ্যেই তিতাস আর শুভ্রনীল একদম গলায় গলায় বন্ধু হয়ে গেল এ ওকে যেন ছাড়তেই পারে না কিন্তু বিধাতার লিপি যে কী ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা বোধহয় আমি ভাবতেই পারিনি
তখন আমরা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি সেদিন কী যেন একটা ব্যাপারে তিতাস আর শুভ্রনীলের মধ্যে মন কষাকষি হয়েছিল কে জানে, কিন্তু পুরো দিনটা তারা আর পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেনি আর তার পরদিনই শুভ্রনীল অদ্ভুতভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিল তার বাবার কাছ থেকে পরে জানা গেছিল যে রাত্রিবেলা যে সে শুতে গেছিল. তারপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি
তারপর দশ বছর পেরিয়ে গেছে
আজ আবার সে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এতদিন পর সে আবার দেখা দিয়েছে
তিতাস নীচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, “গুলিটা তুই ছুড়েছিলি, না?”
“একদমই তাই,” শুভ্রনীল এমন করে কথাগুলো বলল, যেন সেটা এমন কিছু ব্যাপার নয়, “তোর দিকে লক্ষ্য করেছিলাম, কিন্তু... একটুর জন্যে ফসকে গেছে তোর আমি কোনো ক্ষতি করতে চাইনি, মহিমা,” ও আমাকে আশ্বাস দিল
“কিন্তু তা বলে তুই ওকে গুলি করতে যাবি কেন?” রাগে আমার গলা কাঁপছে, “ও তোর কী ক্ষতি করেছে?”
শুভ্রনীলের অট্টহাসি দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল “তুই ওকে বলিসনি, তিতাস? ও জানতে পারলে তুই লজ্জায় আর মুখ লুকোতে পারবি না রে! বলব ওকে?”
তিতাসের সুন্দর মুখখানা সম্পূর্ণভাবে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার চোখ টলটল করছে জলে আমি বললাম, “সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, শুভ্র আগে বল, তুই এখানে কী করছিস? আর এই জায়গাটাতে যে এতকিছু ঘটছে, তার কারণ জানিস?”
শুভ্রনীল বলল, “ওরে, যারা এসব করছে, তাদের সংস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আমি! আপাতত গত দশ বছর ধরে যা যা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, তার ক্রেডিট আমাকে দিতে পারিস কিন্তু আমি আসার আগে অনেকে অনেক কিছু করে গেছে আমি শুধু তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি
“কিন্তু কেন? এসব করে তোর কী লাভ?”
“সেটা বলবার অধিকার আমার নেই, মহিমা কিন্তু যা পাব, তা ধন-ঐশ্বর্যেরও অনেক উপরে তাই দিয়ে আমার প্রতি যারা দুর্ব্যবহার করেছে, তাদের উপর প্রতিশোধ নেব সবার আগে তিতাস আমার লক্ষ্য
তিতাস মুখ তুলে তাকাল তার মুখে রাগটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল “দোষটা তোর ছিল; তোর ওভাবে বলাটা উচিত হয়নি! তুই জানতিস যে অমন করে বললে আমার মাথা গরম হয়ে যায়
“তো, তুই কী বলতে চাস? আমাকে তোর মেজাজ সামলে রাখতে হবে? তুই যে ভুল কাজ করেছিলি, তা কি আমি কখনই বলব না?”
তিতাস দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “এর মানে এই নয় যে তুই অতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণহানির কারণ হবি! তোর বোধহয় এটা জানা নেই যে কতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে তোর এই কাণ্ডকারখানার জন্য!”
শুভ্রনীলের গলায় এতটুকুও অনুতাপ নেই, “আমি যা পেতে চলেছি, এসব ব্যাপারে আর আমার কোনো মাথাব্যথা নেই
আমি লক্ষ করলাম যে তিতাসের হাতটা ধীরে ধীরে তার পকেটের দিকে যাচ্ছে “তুই এরকম ছিলি না, শুভ্র আর যাই হোক, তুই এর জন্য পার পাবি না
তার হাতে রিভলভার চলে এসেছে সেটা সে শুভ্রনীলের দিকে তুলল শুভ্রনীল হো হো করে হেসে উঠল
“ও বাবা, অতই কি সহজ? মনে হচ্ছে আজ আরও একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটতে চলেছে কংকা লা পাসে!”
হঠাৎ দেখি, ও নেই!
“ক-কী হল?” আমার গলা থেকে বেরিয়ে এল প্রশ্নটা
ঘরটা বেশ বড়োসড়ো, ঠিক যেন একটা গবেষণাগার চারদিকে নানারকমের যন্ত্রপাতি ছড়ানো, তাদের অর্ধেকের নাম আমি জানি না যে জায়গাটায় শুভ্রনীল দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে তিতাস টর্চ ফেলল
“প্রোজেক্টার জানতাম তো,” বলে তিতাস দরজাটার দিকে দৌড়ে গেল আমিও ছুটে গেলাম দরজার গায়ে সজোরে একটা ধাক্কা মারতে গিয়ে দেখি... দরজা বাইরে থেকে বন্ধ
“যাঃ, এবার?”
কিন্তু তিতাস দমে যাবার মতো মানুষ নয় গায়ের সমস্ত জোর প্রয়োগ করে ও দরজার গায়ে ঠেলা মারল সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা ভেঙে গেল
“তাড়াতাড়ি চল,” বলে তিতাস সামনের দিকে দৌড় লাগাল আমি ছুটতে ছুটতে বললাম, “বাকিরা কোথায়?”
“জানি না,” তিতাস সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, “কিন্তু ওদের প্ল্যান আমাদেরকে বানচাল করতেই হবে!”
খুব শিগগির আমরা গুহার বাইরে এসে বরফের মধ্যে দিয়ে ছুটলাম “ঐ তো!” তিতাস চিত্‍কার করে বলল
সত্যি সত্যিই কিছুদূরে একদল ছায়ামূর্তি জটলা পাকিয়ে কী যেন করছে আমরা আরও একটু এগোলাম
তিতাস আমাকে ফিসফিস করে বলল, “মহিমা, তুই ঐ পাথরটার পিছনে যা আর যেভাবে পারিস, মামাবাবুকে বল এখানে আসতে
আমি মাথা নেড়ে স্যুট করে পাথরের পিছনে গা-ঢাকা দিলাম কিন্তু তারপর যা কাণ্ড তিতাস বাঁধাল, তা দেখে আমার মনে হচ্ছিল, ওকে একা ছাড়াটা উচিত হয়নি
আমি পকেট থেকে ফোনটা বার করতেই শুনতে পেলাম, তিতাস রিভলভারটা আকাশের দিকে তুলে দুম করে একটা গুলি করল সঙ্গে সঙ্গে আরও দুটো গুলি ছুটে এল ওর দিকে ও সামনের দিকে নিজেকে ফেলে দিল তারপর আবার উঠে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে এগোতেই একটা ছায়ামূর্তি ওর উপর লাফিয়ে পড়ল ততক্ষণে আমি কাঁপা কাঁপা হাতে একটা মেসেজের দ্বারা মামাবাবুকে সব জানিয়ে দিয়েছি
তিতাস যার সঙ্গে লড়ছিল তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে মুখে সজোরে একটা ঘুসি মারল অমনি আরও একজন ছুটে এল তিতাস বাঁই করে পিছনে ঘুরে গিয়ে তার পায়ে গুলি করল লোকটা যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে মাটিতে পড়ে গেল
তিতাসের তীক্ষ্ণ গলা সেই ভয়ঙ্কর ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে দিয়ে শোনা গেল, “আর কেউ আসবে নাকি?”
ততক্ষণে মামাবাবু মিলিটারি নিয়ে চলে এসেছেন দেখে বাকি সমস্ত ছায়ামূর্তি সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল তিতাস বলল, “বাকিদেরকে আর ধরতে পারলাম না কিন্তু আশা করছি এই দুজনকে একটু চাপ দিলেই গোটা ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে যাবে
আমি পাথরের পিছন থেকে বেরিয়ে এলাম
মামাবাবুর মুখে হাসি তিনি বললেন, “আবার তোমরা প্রমাণ করে দিয়েছ যে তোমরা কতটা ব্রিলিয়ান্ট! অত্যন্ত ভালো কাজ করেছ আমরা বাকিদেরকে খুঁজে পেলে আবার কংকা লা পাসে অভিযাত্রীদের আসতে দেব
তিতাস আর আমি এ ওর দিকে চেয়ে হাসলাম পিছনে আকাশ ধীরে ধীরে ফরসা হয়ে এল
----------
ছবি - এআই (নির্মাণ: তাপস মৌলিক)

No comments:

Post a Comment