Showing posts with label অপরাজিত. Show all posts
Showing posts with label অপরাজিত. Show all posts

অপরাজিত:: ফুটবলের ফিনিক্স - সপ্তর্ষি সেনগুপ্ত


ফুটবলের ফিনিক্স
সপ্তর্ষি সেনগুপ্ত

রূপকথায় বর্ণিত অপূর্ব সুন্দর ফিনিক্স পাখির কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। মৃত ফিনিক্সের ছাইভস্ম থেকে জন্ম নেয় সুন্দরতর নতুন ফিনিক্স। বাস্তবে এমন কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব না থাকলেও, ফুটবল বিশ্বে এমন একজন ফুটবলার ছিলেন , যার জীবনের গল্প কোনো অংশে ফিনিক্স পাখির রূপকথার থেকে কম নয়। প্রায় শেষ হয়ে আসা ফুটবল জীবন থেকে অভাবনীয়ভাবে ফিরে এসেছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। নির্বাসিত, কলঙ্কিত খলনায়ক থেকে হয়ে উঠেছিলেন এক রূপকথার মহানায়ক
১৯৫৬ সালে ইতালির প্রাতো শহরে জন্ম এই রূপকথার নায়কের। কিশোর বয়সেই ফুটবল প্রতিভায় তিনি নজর কাড়েন। প্রথম জীবনে খেলতেন রাইট উইঙ্গার হিসাবে। ১৯৭৩ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সেই ইতালির প্রথম সারির ক্লাব জুভেন্টাসের সিনিয়র দলে খেলার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু বার বার চোট আঘাতে জর্জরিত হয়ে, ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫, তিন বছরে জুভেন্টাসের হয়ে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। এরপর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাঁকে জুভেন্টাস থেকে তুলনামূলক ছোটো ক্লাব কোমোতে পাঠানো হয়। কোমো ক্লাবের হয়েই ইতালিয়ান প্রথম ডিভিশন লীগ ‘সিরি এ’-তে অভিষেক হয় তাঁর। কোমোর হয়ে ছয়টি ম্যাচ খেললেও, গোল করতে পারেননি একটিও। তাঁর খেলা মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারেনি কোমো কর্তাদের। তাই পরের মরসুমেই তাঁকে পাঠানো হয় দ্বিতীয় ডিভিশনের (‘সিরি বি’) ক্লাব ভিনসেঞ্জা-র হয়ে খেলার জন্য। এই ক্লাবের হয়ে ‘সিরি বি’-এর একটি খেলার আগে, দলের প্রধান সেন্টার ফরওয়ার্ড চোট পেলে, কোচ প্রথমবার তাঁর নিজস্ব পজিশন রাইট উইং-এর পরিবর্তে, সেন্টার ফরওয়ার্ড পজিশনে খেলান। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় এই একটি সিদ্ধান্তে। গোল করার যে সহজাত প্রবণতা এতদিন সুপ্ত ছিল তাঁর ভিতরে, সেটি যেন এতদিনে সুযোগ পায় নিজেকে মেলে ধরার। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সে বছরই ২১ গোল করে ‘সিরি বি’-এর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি, সঙ্গে সঙ্গে নিজের ক্লাবকে ‘সিরি বি’ চ্যাম্পিয়ন করে ‘সিরি এ’-তে উন্নীত করেন। পরের মরসুমেই, অর্থাৎ ১৯৭৭-৭৮ সালে, তিনি ২৪ গোল করে ‘সিরি এ’-র সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং নিজের ক্লাব ভিনসেঞ্জা-কে ‘সিরি এ’-তে দ্বিতীয় স্থানে তুলে আনেন। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যের কারণেই ১৯৭৮ বিশ্বকাপ দলে তাঁকে সুযোগ দেন ইতালীয় কোচ এনজো বিয়েরজোত।
জীবনের প্রথম বিশ্বকাপে দেশবাসীকে হতাশ করেননি তিনি। প্রথম রাউন্ডের খেলায় ফ্রান্স ও হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে গোল করেন এবং তিনটি গোল করে সেই বিশ্বকাপে ইতালির হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি সেই বিশ্বকাপের ফিফা ঘোষিত ‘অল ষ্টার’ দলেও সুযোগ পান এবং বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেরা ফুটবলারের পুরস্কার ‘সিলভার বল’ জেতেন। ইতালি সেই বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান পেলেও, তিনি নিজের দেশে ফিরে পান বীরের সম্মান। ইতালির নানা ক্লাব তাঁকে দলে পাবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েকিন্তু ভিনসেঞ্জা মালিক সেই সময়ের রেকর্ড মূল্যে তাঁকে নিজেদের দলেই রেখে দেন। তিনি সে সময়ে বিশ্বের সবথেকে মূল্যবান ফুটবলার হিসাবে ভিনসেঞ্জা ক্লাবেই থেকে যান আরও একটি বছর। কিন্তু ১৯৭৮-৭৯ মরসুমে দুর্ভাগ্যবশত চোটের কবলে পড়েন তিনি, ভিনসেঞ্জাও ‘সিরি এ’-তে অবনমনের আওতায় পড়ে যায়। তিনি বাধ্য হয়ে আরেক ‘সিরি এ’ ক্লাব পেরুজিয়া-তে খেলার জন্য সই করেন
পেরুজিয়া-তে ১৯৭৯-৮০ মরসুমে ১৩ গোল করেন তিনি। কিন্তু এরপরেই তাঁর ফুটবলার জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। ১৯৮০ সালে ইতালি ফুটবলের কালো অধ্যায় হিসাবে উঠে আসে নানা গড়াপেটার অভিযোগ। এ সি মিলানের মতো ক্লাবকে চরম শাস্তি দেওয়া হয়। শাস্তির কবলে পড়েন অনেক ফুটবলারও। দুর্ভাগ্যবশত তিনিও দু’বছরের জন্য নির্বাসিত হন সবরকম ফুটবল থেকে। রাতারাতি মহানায়ক থেকে খলনায়ক হয়ে যান তিনি। দু’বছরের জন্য হারিয়ে যান ফুটবলপ্রেমীদের মন থেকে।
এই দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে দিন কাটিয়েছেন, ফুটবল বিশ্ব সেই খবর রাখেনি। তিনি আবার খবরে এলেন, যখন ১৯৮২ সালে, তাঁর নির্বাসন শেষ হবার পর পরই জুভেন্টাস ক্লাব তাঁকে তাদের দলে সামিল করে। দুই বছর প্রায় অজ্ঞাতবাসে থাকা এক কলঙ্কিত ফুটবলারকে দলে সামিল করার জন্য জুভেন্টাস ক্লাবকে সেই সময় সম্মুখীন হতে হয়েছে বিশেষজ্ঞ ও সমর্থকদের অনেক সমালোচনার। শোনা যায়, জুভেন্টাসের এই সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল তৎকালীন ইতালি জাতীয় দলের কোচ বিয়েরজোতের অঙ্গুলিনির্দেশ। সেই সমালোচনার চোরা স্রোত আগ্নেয়গিরি হয়ে ফেটে পড়ে, যখন জুভেন্টাসে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলার পরেই বিয়েরজোত সাহেব তাঁকে ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপের ইতালি দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত মুণ্ডপাত হতে থাকল বিয়েরজোত সাহেবের। ফুটবলার হিসাবে তিনি যে খুব ভালো অবস্থায় নেই এবং তিনি বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা রাখেন না, সেটা প্রমাণ করার জন্য প্রায় সারা ইতালিবাসী সোচ্চার হয়ে উঠে। কিন্তু বিয়েরজোত ছিলেন অবিচল, তাই একদা মহানায়ক, সে সময় খলনায়ক হয়ে যাওয়া সেই ফুটবলারটিও ইতালি দলের সঙ্গে স্পেনগামী বিমানে নিজের জায়গা পেয়ে গেলেন।
সে বিশ্বকাপে ইতালির প্রথম খেলা ছিল পোল্যান্ড-এর বিরুদ্ধে। বিয়েরজোত সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তাঁকে প্রথম একাদশে খেলালেন। বিগত আড়াই বছরে, যিনি ম্যাচ খেলেছেন সাকুল্যে তিনটি, তাঁকে ইতালির মতো দলের প্রথম একাদশে দেখে আবার সমালোচনার ঝড় উঠল সারা দেশ জুড়ে। খেলাটি গোলশূন্যভাবে শেষ হয়, আর তিনি সারা ম্যাচে ছিলেন চূড়ান্ত নিষ্প্রভ।
পরের ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল পেরু। এই ম্যাচটিও জিততে সক্ষম হল না ইতালি। খেলা শেষ হয় ১-১ গোলে অমমাংসিতভাবে। তিনি যথারীতি চূড়ান্ত নিষ্প্রভ। ৪৬ মিনিটে তাঁকে বদল করতে বাধ্য হন কোচ। দেশে সমালোচনার ঢেউ যেন সুনামি হয়ে আছড়ে পড়তে লাগল।
প্রথম রাউন্ডের শেষ ম্যাচ তুলনামূলক অনভিজ্ঞ ক্যামেরুনের বিরুদ্ধেও জয় অধরা থাকল। ১-১ গোলে খেলা শেষ হল। তিনি আবারও হতাশ করলেন চূড়ান্তভাবে। তিনি দলের প্রধান সেন্টার ফরওয়ার্ড হিসাবে খেলেও তিন ম্যাচে একটিও গোল করতে না পারায় এবং দল একটি ম্যাচেও না জিততে পারায় কোচ বিয়েরজোত ও তাঁর একান্ত আস্থাভাজন ফুটবলারটির বিরুদ্ধে তখন সমালোচনা রীতিমতো বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে।
একটি ম্যাচ না জিতলেও, তুলনামূলক ভালো গোল পার্থক্যের কারণে গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট পেল ইতালি। ইতালির সংবাদ মাধ্যমে তখন মুণ্ডপাত চলছে তাঁর। তিনি তখন জাতীয় খলনায়ক। ইতালির সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি তখন ‘ghost aimlessly wandering over the fieldকেন তরুণ প্রতিভা আলেক্সান্দ্র আলতোবেলি সুযোগ পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্ন বার বার উঠে আসতে লাগলএমন পরিস্থিতিতেও নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল ইতালীয় কোচ দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রথম ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আবারও সেন্টার ফরওয়ার্ড পজিশনে মাঠে নামালেন সেই বিতর্কিত খলনায়ককে যথারীতি আবারও ব্যর্থ তিনি। কিন্তু ২-১ গোলে ইতালি আর্জেন্টিনাকে হারালে এবং আর্জেন্টিনার উঠতি প্রতিভা দিয়াগো ম্যারাডোনাকে বোতলবন্দি করে ইতালীয় ডিফেন্ডার ক্লাওদিও জেন্টিল নায়কের সম্মান পেলে, তাঁর ব্যর্থতা কিছুটা হলেও চাপা পড়ে যায়।
এর পরের খেলা ছিল বিশ্বকাপের ‘হট ফেভারিট’ ব্রাজিলের বিরুদ্ধে। ব্রাজিল দলে তখন দাপিয়ে খেলছেন জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাও, জুনিয়র-রা। জিকো ইতিমধ্যেই চারটি গোল করে তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সোনার বুটের অন্যতম দাবিদার। সাম্বার তালে তালে হলুদ ঝড় তুলে বিপক্ষকে বিধ্বস্ত করে ব্রাজিল তখন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর। অন্যদিকে চার ম্যাচে মাত্র একটিতে জিতে ইতালির রীতিমতো কোণঠাসা অবস্থা। এই ম্যাচে ড্র করলেই ব্রাজিল পৌঁছে যাবে সেমিফাইনালে, সেখানে ইতালির চাই অবশ্যই জয়। ইতালির অতি বড়ো সমর্থকও সেদিন ইতালির জয় আশা করেননি, যেখানে দলের মূল সেন্টার ফরওয়ার্ড তখনও একটিও গোল করতে ব্যর্থ।
কিন্তু খেলা শুরু হতেই সমানে সমানে লড়াই শুরু হলখেলার তিন মিনিটে ইতালিয়ান মিডিও মার্কো তারদেলির মাইনাস পেনাল্টি বক্সে পেয়েও হাস্যকরভাবে সুযোগ নষ্ট করেন সেই খলনায়ক। দেশ জুড়ে মুণ্ডপাত হতে লাগল তাঁর। এমন গুরুত্বপূর্ণ খেলায় আলতোবেলি কেন তাঁর পরিবর্তে মাঠে নেই, এই প্রশ্ন তুলে দিলেন ধারাভাষ্যকাররাও। দুই মিনিট পরই, সেন্টার লাইনের ধারে রাইট উইং বরাবর বল পেলেন ইতালিয়ান মিডিও ব্রুনো কন্তি। হালকা ড্রিবল করে কিছুটা এগিয়ে তিনি প্রান্ত বদল করিয়ে ক্রস পাঠান লেফট উইঙ্গে আন্তোনিও ক্যাবরিনির উদ্দেশ্যে। ক্যাবরিনি সেই বল ভাসিয়ে দেন ব্রাজিল গোলমুখে। বল ব্রাজিল ডিফেন্ডার অস্কার ও লুইজিনহো এবং ইতালি স্ট্রাইকার গ্রাজিয়ানির মাথা টপকে যখন ভেসে যাচ্ছে মাঠের বাইরে, সেই মুহূর্তে হঠাৎই যেন মাটি ফুঁড়ে ওঠে এলেন তিনি। আর বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে দেখল, তাঁর দুরন্ত হেডে বল জড়িয়ে যাচ্ছে ব্রাজিলের গোলেসেই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ল দুরন্ত ব্রাজিল। আর সমালোচিত খলনায়ক থেকে সেই মুহূর্তেই যেন তাঁর ফুটবল জীবন ইউ টার্ন নিয়ে আবার ফিরে এল নায়কের কক্ষপথে। কিন্তু খেলার ১২ মিনিটেই সক্রেটিসের গোলে সমতা ফেরায় ব্রাজিল। খেলার ২৫ মিনিটে নিজেদের পেনাল্টি বক্সের সামনে ব্রাজিল ডিফেন্ডার সেরেজো একটি দায়সারা পাস দেন সতীর্থ জুনিয়রের উদ্দেশে, আর জুনিয়রকে ততোধিক দায়সারাভাবে বলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মাঝপথেই সেই পাস ‘ইন্টারসেপ্ট’ করে, দলের ও নিজের দ্বিতীয় গোল করে যান আবারও সেই তিনিই। এর পর মরিয়া ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণ আছড়ে পড়তে থাকে ইতালি রক্ষণে। ইতালি অধিনায়ক গোলকিপার দিনো জফ অতিমানব হয়ে দলের পতন রক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তারপরেও খেলার ৬৮ মিনিটে ফ্যালকাও-এর গোলে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। ড্র হলেই যেহেতু ব্রাজিল সেমিফাইনালের টিকিট পেয়ে যাবে, তাই সারা বিশ্ব আশা করেছিল এই পরিস্থিতিতে ব্রাজিল রক্ষণে মনোযোগ দেবে। কিন্তু বিশ্ববাসীকে ভুল প্রমাণ করে ব্রাজিল ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। খেলার ৭৪ মিনিটে একটি কর্নার পায় ইতালি আর ব্রুনো কন্তির নেওয়া সেই কর্নার থেকে ব্রাজিল গোলের দিকে নেওয়া তারদেলির গোলার মতো শট সামান্য ছোঁয়ায় দিক পরিবর্তন করে, নিজের হ্যাট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। সারা ইতালি যখন উল্লাসে ফেটে পড়ছে, ডাগ আউটে কোচ বিয়েরজোত সাহেবের মুখে তখন পরিতৃপ্তির হাসি। ৩-২ গোলে অপরাজেয় ব্রাজিলকে হারিয়ে, সোনার বুটের দৌড় থেকে ব্রাজিলিয়ান জিকোকে ছিটকে দিয়ে, ইতালি সেই নায়কের কাঁধে ভর করে পৌঁছে গেল সেমিফাইনালে। এদিনই শুরু হল তাঁর স্বপ্নের দৌড়।
সেমিফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ পোল্যান্ড। পোলিশ স্ট্রাইকার বোনিয়েক চার গোল করে সোনার বুটের দৌড়ে শীর্ষে। প্রথম রাউন্ডে এই দু’দলের খেলা গোলশূন্য ড্র হলেও, সেমিফাইনালে ২২ ও ৭৩ মিনিটে পর পর দুটি গোল করে ইতালিকে ফাইনালে তুললেন আমাদের সেই নায়ক। সোনার বুটের দৌড় থেকে ছিটকে গেলেন বোনিয়েক, আর ৫ গোল করে প্রবলভাবে দাবিদার হয়ে উঠলেন তিনি।
ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। সোনার বুটের দৌড়ে আমাদের নায়কের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন ৫ গোল করা জার্মান স্ট্রাইকার কার্ল হেইঞ্জ রুমানিগে। প্রথমার্ধ তুল্যমূল্য লড়াই হল দুই দলের মধ্যে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের ১২ মিনিটে ইতালি ডিফেন্ডার জেন্টিলের ভাসানো ক্রস জার্মান গোলমুখে ক্যাবরিনির নাগাল এড়িয়ে আমাদের নায়কের পায়ে পড়তেই, গোলমুখ খুলে গেল প্রথমবারের মতো। এরপর তারদেলি, আলতোবেলি আরও দুটি গোল করে ইতালির জয় সুনিশ্চিত করেন। খেলাশেষের কিছু আগে সান্ত্বনা গোল করেন জার্মান ব্রাইটনার। ৩-১ গোলে জিতে বিশ্বজয়ী হল আমাদের নায়কের দেশ আর তিনি হয়ে উঠলেন এক রূপকথার নায়ক। প্রায় শেষ হতে চলা ফুটবল জীবন থেকে যেন সেই ফিনিক্স পাখির মতো আরও উজ্জ্বল, আরও বর্ণময় হয়ে পুনর্জীবন পান তিনি। তিনি সেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসাবে সোনার বুট তো জিতেছিলেন, জিতেছিলেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের সোনার বল পুরস্কারও। তাঁর সেই স্বপ্নের পুনরুত্থান রূপকথার কাহিনির মতো আজও আলোচিত হয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে।
দেশের হয়ে মোট ৪৮টি ম্যাচ খেলে ২০টি গোল করেছিলেন তিনি। ছিলেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ইতালি দলেও, কিন্তু চোটের কারণে শুরুতেই ছিটকে যান তিনি। ১৯৮৭ সালে অবসর নেন সবরকম ফুটবল থেকে।
২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর দুরারোগ্য ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে, মাত্র ৬৪ বছর বয়সেই প্রয়াত হন ‘ফুটবলের ফিনিক্স পাখি’ সেই স্বপ্নের নায়ক, আমরা যাকে চিনি পাওলো রোসি নামে। আজও ফুটবলপ্রেমী মানুষ আলোচনা করেন তাঁর সেই স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন আর বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে এখনও বলে থাকেন ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়!!!’
----------
ছবি - আন্তর্জাল

অপরাজিত:: অলিম্পিক মশাল - সায়ন তালুকদার


অলিম্পিক মশাল
সায়ন তালুকদার

পেকহ্যামের বেলেনডেন রোড দিয়ে ছুটছেন সুপারস্টার। গায়ে সাদা ট্র্যাক স্যুট। বুকের উপর লেখা রিলে নম্বর ০৬৩। কখনও ধীর গতিতে ছুটলেন, গতি আরও কমিয়ে খানিক হাঁটলেনও, তারপর ফের দৌড়োতে শুরু করলেন। ভক্তদের দেখে হাত নাড়লেন। প্রায় ৩০০ মিটার দৌড়োনোর পর, মশাল তুলে দিলেন পরের জনের হাতে। মিশে গেলেন উচ্ছ্বসিত জনতার ভিড়ে। ছবি তুলতে দিলেন ইচ্ছেমতো। বললেন, “জীবনের সেরা ঘটনা। দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত।স্বীকার করলেন, “এই বয়সে এতটা দৌড়োনো খুব কষ্টকর। কিন্তু চারপাশ থেকে সবাই খুব উৎসাহ দিচ্ছিল। বিদেশের মাটিতে এমন ঘটনায় আমি সত্যিই বিস্মিত। অলিম্পিকের মশাল হাতে দৌড়োবো, কোনোদিন ভাবিনি।
২০১২ লন্ডন অলিম্পিক্সের মশাল দৌড়ে সামিল হয়ে এমনই অনুভূতি হয়েছিল শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চনের।

‘ম্যাজিক ল্যাম্প’-এর বন্ধুরা, সদ্য শেষ হল টোকিও অলিম্পিক ২০২০। পদক তালিকায় প্রথম পঞ্চাশে স্থান করে নিয়েছে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। সেই উদ্দেশ্যেই আজ অলিম্পিক মশালের প্রসঙ্গ উত্থাপন।
তোমাদের অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, কবে থেকে শুরু হল অলিম্পিকে এই মশাল জ্বালানোর রীতি? কোথায়ই বা এর সূত্রপাত?
ইতিহাস ও পুরাণের পাতায় চোখ রাখলে জানা যায়, পশ্চিম গ্রিসের অলিম্পিয়া নামক এক জায়গায়, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন অলিম্পিকের সূচনা হয়েছিল। সেখানেই ঘন্টাখানেকের একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো থেকে জ্বালানো হয় সেই অগ্নিশিখা, যা ক্রীড়ানুষ্ঠান শেষ হবার আগে পর্যন্ত কখনোই নেভে না। আগুন জ্বালানো হয় মাটিতে রাখা একটি অবতল আয়না থেকে। এতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে এমন তাপের সৃষ্টি করা হয় যা থেকে মশাল জ্বালানো যায়। এগারোজন মহিলার মধ্যে থেকে একজন শিখা প্রজ্জ্বলন করেন।
এরপর তা থেকে জ্বালানো হয় আরেকটি অলিম্পিক মশাল - যা তুলে দেওয়া হয় একজন ক্রীড়াবিদের হাতে। এ ছাড়াও তুলে দেওয়া হয় একটি জলপাই গাছের শাখা। আরেকজন উড়িয়ে দেন একটি সাদা পায়রা, যা শান্তির প্রতীক।
এই অলিম্পিয়াতেই ৭৭৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে শুরু হয়েছিল প্রাচীন যুগের অলিম্পিক - যা অনুষ্ঠিত হত প্রতি চার বছর অন্তর। সেখানে ছিল গ্রিক দেবতাদের রাজা জিউসের মন্দির এবং তার সম্মানেই অনুষ্ঠিত হত ক্রীড়ানুষ্ঠান। আজ সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

প্রাচীন অলিম্পিকে মশাল দৌড়ের প্রচলন থাকলেও, আধুনিক অলিম্পিকের শুরুতেই সেই সংস্কৃতি উধাও হয়ে যায়। ১৯২৮ সাল থেকে অলিম্পিক মশাল পুনরায় চালু হলেও, ছিল না মশাল দৌড়ের কোনো ব্যাপারই। এই মশাল দৌড় শুরু হয়েছিল নাৎসি জমানায়। উনিশশো ছত্রিশ সালে বার্লিন অলিম্পিকে নাৎসি জোসেফ গোয়েবলসের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় অলিম্পিকে মশাল দৌড়। গ্রিস থেকে মশাল বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে পৌঁছয় বার্লিনে। গ্রিস থেকে বার্লিন - দীর্ঘ তিন হাজার একশো সাতাশি কিলোমিটার পথ তিন হাজার তিনশো একত্রিশজন দৌড়বীরের হাত ধরে তা পৌঁছয় অলিম্পিকের মূল স্টেডিয়ামে। পরবর্তীতে অলিম্পিক মশাল দৌড় শুধুমাত্র স্থলপথে নয়, জলপথে এমনকি আকাশপথেও পৌঁছেছে বিভিন্ন দেশে। প্রথমবার ১৯৪৮ সালে অলিম্পিক মশালকে ইংলিশ চ্যানেল পার করাতে ব্যবহৃত হয়েছিল নৌকা। ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে আকাশপথে পাড়ি দিয়েছিল মশাল। এমনকি ১৯৭৬ সালে রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে অলিম্পিকের শিখার প্রেরণ করা হয়েছিল ও তা প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল।
১৯২৮ সালে আমস্টারডাম অলিম্পিকে চালু হয় অলিম্পিক মশাল। মজার ব্যাপার, মশালের ওজন ও দৈর্ঘ্য এক থাকলেও, বদলেছে মশালের উপকরণের তালিকা। ১৯৪৮-এ লন্ডন অলিম্পিকে সাতচল্লিশ সেন্টিমিটার লম্বা ও নশো ষাট গ্রাম ওজনের মশাল তৈরি হয়েছিল হিডুমিনিয়াম-অ্যালুমিনিয়ামের সংকর ধাতু দিয়ে। ১৯৫৬-তে মেলবোর্ন অলিম্পিকে সেই উপকরণ বদলে হয় ম্যাগনেশিয়াম-অ্যালুমিনিয়াম। এরপরও বদলেছে উপকরণ। এমনকি মশালের শিখাও তৈরি হয়েছে বিভিন্ন উপকরণে। কখনও ব্যবহৃত অলিভ অয়েল, কখনও বা প্রপিলিনের মতো তরল গ্যাস।
অলিম্পিকের সংখ্যা যত বেড়েছে, বেড়েছে পথ এবং একই সঙ্গে বেড়েছে মশালবাহকের সংখ্যাও। ২০০৪-এ মশাল দৌড় প্রথমবার বিশ্বের সব প্রান্তে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। আটাত্তর দিনে মশালের বিশ্ব ভ্রমণে আটাত্তর হাজার পথ মশাল অতিক্রম করে এগারো হাজার তিনশো মশাল বাহকের হাত ধরে।
তোমরা হয়তো অনেকেই জানো, অলিম্পিকের রেওয়াজ অনুযায়ী আয়োজক দেশের মূল স্টেডিয়ামে মশাল দৌড়ের শেষে অলিম্পিক কলড্রন বা বিশাল কড়াইয়ের মতো অলিম্পিক মশালের আধারে আগুন জ্বালান বিখ্যাত কোনো ক্রীড়াবিদ। যেমন - ১৯৫২ সালে মশালের শিখা জ্বালিয়েছিলেন পাভো নুরমি। ১৯৯২-এ প্লাতিনি, ১৯৯৬-এ মহম্মদ আলি।
বিভিন্ন দেশের মধ্যে কুটনৈতিক বিভিন্ন সংঘাত জারি থাকলেও অলিম্পিকের ময়দানে তারা একত্রিত হয়। অলিম্পিকের মশাল এই ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আলোকিত হয়, সমাপনী অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত যে আগুন নেভে না, রয়ে যায় অনির্বাণ।
অলিম্পিকের খাতা খুলে বসলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারো ইতিহাসের ঘটনা। আবার কখনও সময় পেলে তোমাদের সঙ্গে সেই সব কথা ভাগ করে নেব’খন।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

অপরাজিত:: খেলায় অভিযান, অভিযানের খেলা - রাজীবকুমার সাহা

খেলায় অভিযান, অভিযানের খেলা
রাজীবকুমার সাহা

সুবিশাল ভারতবর্ষে প্রকৃতি দেবী যেন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। অঞ্চলভেদে নানান বৈচিত্রের যেমন অভাব নেই, তেমনই রয়েছে সুউচ্চ পাহাড়-পর্বতশ্রেণি, সুগভীর সমুদ্র, ঘন বনাঞ্চল, সুতীব্র স্রোতস্বিনী পার্বত্য ঝর্ণা। আর রয়েছে নানা রীতিনীতি, পাগলপারা কিছু খেলাপ্রেমী। সেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই চালু হয়েছে বেশ কিছু দম বন্ধ করা দুর্ধর্ষ অভিযানমূলক খেলাধুলো যেগুলোর জনপ্রিয়তা দিন কে দিন বেড়েই চলেছে।


১। প্যারাগ্লাইডিং
আমাদের পাখিদের মতো পাখা নেই জেনেও কখনও-সখনও ওদের মতোই আকাশে উড়ে বেড়াতে ভীষণ ইচ্ছে হয়। স্বপ্নটা অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব প্যারাগ্লাইডিংয়ের মাধ্যমে। পশ্চিমি দুনিয়ার মতো আমাদের দেশেও প্যারাগ্লাইডিং বা হ্যাং-গ্লাইডিংকে একটা দুরন্ত স্পোর্ট হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মূলত প্যারাশ্যুট থেকেই ১৯৬০ সালে প্যারাগ্লাইডিংয়ের ধারণার জন্ম। অন্যসব খেলাধুলোর মতো এ খেলাতেও পেশাদার প্রশিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্যারাগ্লাইডার ওজনে খুবই হালকা আর এটাকে পা ব্যবহার করে উড়াতে হয়। এর ডানাদুটো দু’স্তর বিশিষ্ট একধরনের বিশেষ ফেব্রিক কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। ভারতবর্ষে প্যারাগ্লাইডিং সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে জম্মু ও কাশ্মীরের লাদাখ, পুনের কামশেত, পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, হিমাচল প্রদেশের সোলাং উপত্যকা প্রভৃতি অঞ্চলে।


২। রিভার র‍্যাফটিং
ভারতবর্ষে রিভার র‍্যাফটিং একটি জনপ্রিয় খেলা। পার্বত্য খরস্রোতা নদীর জলে বোট নিয়ে নামা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। গোটা ভারতবর্ষে একশোরও বেশি অপারেটর রয়েছেন যারা পুরো অভিযানটাকে সংগঠিত করেন। সবচেয়ে বিখ্যাত রিভার র‍্যাফটিং সাইটগুলো হচ্ছে জান্সকর, মানালি, হৃষীকেশ, কুর্গ এবং ব্রহ্মপুত্র।


৩। বাঞ্জি জাম্পিং
ভারতে অ্যাডভেঞ্চারাস স্পোর্টসগুলোর মধ্যে বাঞ্জি জাম্পিং অন্যতম। এই খেলায় কিন্তু সাংঘাতিকরকমের মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে। লাফ দেওয়ার প্রাথমিক ভয়টা কোনওমতে কাটিয়ে উঠতে পারলেই ব্যস। এরপর পাখির উড়ানের অনুভূতি। হৃষীকেশ, গোয়া, দিল্লি এবং ব্যাঙ্গালুরু হচ্ছে ভারতের বিখ্যাত বাঞ্জি জাম্পের আখড়া।


৪। হেলি স্কিয়িং
হেলি স্কিয়িং আসলে হেলিকপ্টার স্কিয়িংয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ। স্কিয়ারদের একটা হেলিকপ্টারে করে এনে বরফাবৃত পর্বতের অপেক্ষাকৃত একটা সমতল জায়গায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে ওই হেলিকপ্টারের পাহারায় শুরু হয় স্কিয়িং। এর জন্যে হিমালয়ান রেঞ্জ হচ্ছে সর্বোত্তম। ভারতের কাশ্মীরের গুলমার্গে আর হিমাচল প্রদেশের মানালিতেও দারুণ হেলি স্কিয়িং হয়।


৫। ওয়াটারফল র‍্যাপেলিং
ঝরনা প্রকৃতির আশ্চর্যজনক সৃষ্টিগুলোর মধ্যে একটি। তাই ওয়াটারফল র‍্যাপেলিং একটি জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার। পাহাড়ের মাথায় দড়িদড়া বেঁধে তারপর সেই দড়িকে সম্বল করে ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পণে নীচে নেমে আসা দারুণ অভিজ্ঞতা বটে। মহারাষ্ট্রের ভিহিগাঁও আর কর্ণাটকের কুর্গ ওয়াটারফল র‍্যাপেলিংয়ের জন্যে বিখ্যাত।


৬। স্নরকেলিং
জলের গভীরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে তা উদ্ঘাটন করতে হলে স্নরকেলিং আদর্শ। এই অভিযান শুরু জলের একেবারে ওপরের তল থেকে। তারপর তলিয়ে যেতে হয় গভীর থেকে গভীরে। এর জন্যে অবশ্য বিশেষ কিছু যন্ত্রপাতির প্রয়োজন পড়ে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডাইভিং মাস্ক। আন্দামান ও নিকোবরের মতো দ্বীপপুঞ্জ ছাড়াও গোয়া, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং লাক্ষাদ্বীপেও এই খেলা জনপ্রিয়।


৭। সাইকেল ট্রেকিং
হুটহাট অভিযানে বেরিয়ে পড়তে পাহাড়ের তুলনা নেই। পাহাড়ে একটি জনপ্রিয় খেলা হচ্ছে সাইকেল ট্রেকিং। ভারতের হিমালয়ান রেঞ্জ আর কেরালাতে মনোরম পরিবেশে এই ট্রেকিংয়ের সুবন্দোবস্ত রয়েছে।


৮। হট এয়ার বেলুনিং
দানবাকৃতি বেলুনের নিচের দিকে যান্ত্রিক কৌশলে আগুন ধরিয়ে উড়ে চলে যাওয়া যায় সুনীল আকাশে। নিচের দৃশ্য থেকে তখন আর চোখ ফেরানো যায় না। রাজস্থানের পুষ্কর, রণথম্ভোর আর জয়পুরে দুর্দান্ত হট এয়ার বেলুনিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।


৯। স্কাই ডাইভিং
এরোপ্লেন যখন সর্বোচ্চ উচ্চতায় তখন হঠাৎ সেখান থেকে মাটিতে পড়ে গেলে মনের গতিটা কেমন হবে ভাবা যায়? ঠিক এরকম অবস্থার অনুভব হয় যারা স্কাই ডাইভিং করেন। এই খেলায় অনেক নিয়মাকানুন মেনে আর প্যারাসুটের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নামতে হয়। মধ্যপ্রদেশের আম্বি ভ্যালি, ধানা, কর্ণাটকের মাইসোর আর গুজরাটের দীসা প্রভৃতি স্থানে এই খেলা হয়।


১০। স্কুবা ডাইভিং
স্কুবা ডাইভিং পৃথিবীর সেরা অ্যাডভেঞ্চারাস খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে খেলায় নামার আগে এর সম্পর্কে জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ, এটা পৃথিবীর জটিল খেলাগুলোর মধ্যেও একটি কিন্তু। গভীরতম জলের তলায় স্বপ্নের মতো সুন্দর পরিবেশে একটা অচেনা নতুন পৃথিবী থাকে সত্যি, কিন্তু এর খাঁজে খাঁজে বিপদআপদও কম লুকিয়ে নেই। গোয়া বা নেত্রানি দ্বীপ তালিকায় থাকলেও ভারতবর্ষে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ হচ্ছে স্কুবা ডাইভিংয়ের স্বর্গ।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

অপরাজিত:: কিছু জানা, কিছু অজানা - রাজীবকুমার সাহা

কিছু জানা, কিছু অজানা
রাজীবকুমার সাহা


·     ১৮৯৬ সাল থেকে শুরু হওয়া আধুনিক অলিম্পিকে একমাত্র গ্রীস আর অস্ট্রেলিয়াই সব ধরনের খেলায় অংশগ্রহণ করে আসছে।
·        চাঁদের বুকে গলফই হচ্ছে একমাত্র খেলা যা অ্যালান শেপার্ড ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে খেলেছিলেন।
·    যে চারজন ক্রিকেটার ব্যাটিং অর্ডারের দশটি পজিশনেই খেলেছেন তারা হলেন ল্যান্স ক্লুজনার, আব্দুর রজ্জাক, শোয়েব মালিক এবং হাসান তিলকরত্নে।
·        একটা সকার বল ৩২টি চামড়ার টুকরো ৬৪২টা সেলাই করে তৈরি করা হয়। পাশাপাশি একটা বেসবলে ঠিক ১০৮টা আর একটা ক্রিকেট বলে ৬৫ থেকে ৭০টা সেলাই থাকে।
·        মহম্মদ আজহারউদ্দীনের প্রথম তিনটি টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড রয়েছে।
·        একেকটা উইম্বলডন চ্যাম্পিয়নশিপের কমবেশি ৬৫০টা ম্যাচে প্রায় ৪২,০০০ টেনিস বল দরকার পড়ে।


·        ১৯০১ সালের আগে পর্যন্ত বক্সিং আইনত নিষিদ্ধ ছিল।
·      ভারতীয় ক্রিকেটের বয়স ১৬৮ বছর। ১৮৪৮ সালে ভারত প্রথমবারের মতো ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিল।
·        ফিশিংয়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রতিযোগী অংশ নেন।
·        কিংবদন্তী মুষ্টিযোদ্ধা রকি মারসিয়ানো ফ্যাক্স মেশিন আবিষ্কার করেন।
·     সৌরভ গাঙ্গুলিই একমাত্র ক্রিকেটার যিনি পরপর চারটে ম্যাচে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছেন।
·        মোট পরিমাণ যাই হোক না কেন, জকিদের পয়সাতেই পেমেন্ট করার নিয়ম। নোটে নয়।
·        প্রকৃত গলফ বল গরুর শুষ্ক অক্ষিগোলক দ্বারা তৈরি করা হয়।
·        কপিল দেবের অপরাজিত ১৭৫ রানই ভারতীয় ক্রিকেটে প্রথম ওয়ান ডেয়ার সেঞ্চুরি।
·    ১৯৪৯ সালে একজন ব্রিটিশ খেলোয়াড়ের সর্পাঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত উইম্বলডনের কোর্টে দুই ইঞ্চি লম্বা ঘাস রাখা হত।
·        গলফ বলে গড়ে ৩৩৬টা টোল থাকে।


·    বিশ্ব-ক্রিকেটের ইতিহাসে ক্রিস গেইল হচ্ছেন একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি কোনও টেস্ট ম্যাচের প্রথম বলেই সিক্সার হাঁকিয়েছিলেন।
·        ইফতিখার আলি খান পতৌদি ছিলেন একমাত্র ক্রিকেটার যিনি ভারত এবং ইংল্যান্ড উভয় দেশের হয়েই টেস্ট খেলেছেন।
·   একমাত্র দেশ হিসেবে ভারতের ৬০ ওভার, ৫০ ওভার আর ২০ ওভার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
·        অ্যালেক স্টুয়ার্টের টেস্ট ক্রিকেটে সর্বমোট রানের সংখ্যা হচ্ছে ৮৪৬৩। তার জন্ম তারিখও ৮-৪-৬৩।
·   তারিখ ১১/১১/১১। সময় ১১:১১। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার দরকার ছিল আর ১১১ রান।
·    ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেসলি হিলটন হচ্ছেন একমাত্র ক্রিকেটার যাকে খুনের দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয়।
·        স্যার ডন ব্র্যাডম্যান তার ক্রিকেট জীবনে মাত্র ছয়টা সিক্সার হাঁকিয়েছিলেন।
·        জেনেদিন জিদান কখনও অফসাইড করেননি।
·        ১৯৬০ সালের আগে অবধি হকি স্টিক একদম সোজা ছিল।
·      ভারতীয় ক্রিকেট দলের জার্সিতে বিসিসিআই-এর লোগোর ওপর তিনটে স্টার থাকে কেন? ওগুলো তিনবার বিশ্বজয়ী হওয়ার প্রতীক।
·        ঘুড়ি ওড়ানো থাইল্যান্ডের একটি পেশাগত খেলা।
·        ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শেফিল্ড এফ.সি. পৃথিবীর প্রাচীনতম ফুটবল ক্লাব।
·        কোলাজেন উপস্থিত এমন প্রাণীর অন্ত্র, যেমন, ভেড়া, গরু ও ছাগল, এসব প্রাণীর অন্ত্র দিয়ে টেনিস র‍্যাকেটের স্ট্রিং তৈরি করা হয়।
·        জিম ল্যাকার আর অনিল কুম্বলে হচ্ছেন এমন দুজন বোলার যারা এক ইনিংসে সবক’টি উইকেট একাই তুলে নিয়েছিলেন।
·        শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল অ্যামেচার পোর্টসমাউথ অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল ক্লাবে গোলকিপার হিসেবে খেলেছেন।
·        সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে পকেটে একটা পয়সা রেখে খেলতে নামা গলফারদের একটা সাধারণ কুসংস্কার।


·     খালি পা থাকার দরুন ফিফা ভারতীয় ফুটবল টিমকে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে খেলতে অনুমতি দেয়নি।
·        কঙ্গোতে একবার বাজ পড়ে পুরো একটা ফুটবল দল মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অপর দলটি বিন্দুমাত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
·        একজন ফুটবল খেলোয়াড় একটা বড়ো ম্যাচে প্রায় ১১ কিমি দৌড়ান।
·     একদিনের ক্রিকেটে প্রথম বলে ব্যাটসম্যান ছিলেন জেফরি বয়কট আর বোলার ছিলেন গ্রাহাম মেকেঞ্জি।
·        আমেরিকানরা বছরে প্রায় ৬৩০ মিলিয়ন ডলার গলফ বলের পেছনে খরচ করেন।
·        অলিম্পিকের পাঁচটা রিংয়ে পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশের জাতীয় পতাকার রং রয়েছে।
·        বিশ্বক্রিকেটে দ্রুততম (১৬১.৩ কিমি/ঘণ্টা) বল করার রেকর্ড রয়েছে শোয়েব আখতারের ঝুলিতে।
·        বেসবল খেলোয়াড় বেব রুথ মাথা ঠাণ্ডা রাখতে টুপির নিচে একটা বাঁধাকপির পাতা রেখে খেলতে নামতেন। প্রত্যেক দ্বিতীয় ইনিংসে সেটা পালটে ফেলতেন।


·        মাত্র তিনজন ব্যাটসম্যানের একদিনের ক্রিকেটে ডবল সেঞ্চুরি রয়েছে। তারা হলেন সচিন, সেহওয়াগ ও রোহিত শর্মা।
·        অলিম্পিক-২০০০ থেকে অন্তর্ভুক্ত তাইকুন্ডুর জন্মস্থান দক্ষিণ কোরিয়া।
·    হিতেশ মোদী আর তার পিতা সুভাষ আর. মোদী একই ম্যাচে প্লেয়ার আর আম্পায়ার হিসেবে ছিলেন। পিতা পুত্রকে এল.বি.ডব্লিউ দিয়েছিলেন।
·     প্রথম মহিলা পর্বতারোহী হিসেবে ১৯৭৫ সালে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছিলেন জাপানের জুঙ্কো তবেই।
·        আইস স্কেটিং হকি খেলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ বাঁধে স্কেটদুটোর মধ্যে।
·        ১৯৬৪ সালের ১২ জানুয়ারি চেন্নাইয়ে ভারতের স্পিনার বাপু নাডকর্নি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরপর ২১ ওভার বল মেইডেন করেছিলেন।
·        নভজ্যোত সিং সিধুর স্ত্রীর নাম হচ্ছে নভজ্যোত কউর সিধু।
·        নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যান মার্টিন গাপ্টিলের বাঁ পায়ে মাত্র দুটি আঙুল আছে।
·        তিরন্দাজি ভুটানের জাতীয় খেলা।
·     ১৯৯৩ সালে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২৭৭ রান করার পর ব্রায়ান লারা নিজের মেয়ের নাম সিডনি রাখেন।

_____

অপরাজিত:: অলিম্পিয়ান ম্যাসকট-চরিত - রাজীবকুমার সাহা

অলিম্পিয়ান ম্যাসকট-চরিত
রাজীবকুমার সাহা

ম্যাজিক ল্যাম্পের শারদসংখ্যা প্রকাশ পেতে পেতে রিও অলিম্পিকের যৌবন তখন অতিক্রান্ত, প্রৌঢ়ত্বের ভারে অনেকটাই ন্যুব্জ। তাছাড়া সবরকম সংবাদপত্র, বিভিন্ন ম্যাগাজিন আর টিভি চ্যানেলগুলোতে এ নিয়ে লেখালিখি, সাক্ষাৎকার আর টক-শো এত পরিমাণে হয়েছে যে অলিম্পিকের ২০১৬-এর গোটা ইভেন্ট নিয়ে নতুন করে লেখার কিছুই নেই। অথচ ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-কে নিয়ে কিছু একটা না লিখলেই নয়। তাই কলম কামড়াতে কামড়াতে হঠাৎ অলিম্পিকের ম্যাসকটগুলোর পেছনে লেগে পড়লাম। এখানে ১৯৬৭ সালের গ্রেনোবল অলিম্পিক থেকে শুরু করে হালে সমাপ্ত রিও অলিম্পিক পর্যন্ত বিভিন্ন চরিত্রের ম্যাসকটগুলোর জন্মকথা, কিছু ইতিহাস আর কিছু খুঁটিনাটি পেশ করা হল।
অলিম্পিক ম্যাসকটগুলো সাধারণত একেকটা কল্পিত চরিত্র হিসেবেই তৈরি করা হলেও এতে আয়োজক দেশের বা তার নির্দিষ্ট কোনও অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহকের পরিচায়ক প্রসিদ্ধ কোনও ব্যক্তি বা জীবজন্তুর আদলেই রূপদান করা হয়ে থাকে। লোগোর পাশাপাশি একেকটা ম্যাসকট পুরো অলিম্পিক ইভেন্টগুলো কচিকাঁচাদের আকর্ষণ করতে একটা উপযোগী কৌশল হিসেবে কাজ করে কিন্তু। এই কৌশল বা প্রক্রিয়াটির বয়স কিন্তু কম নয়। সেই ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সের গ্রেনোব্‌ল-এ শীতকালীন আসরের সময়ই অলিম্পিক দুনিয়া তার প্রথম ম্যাসকটের মুখ দেখেছিল। তবে ১৯৮০ সালে মস্কোতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে Misha নামের ম্যাসকটটি সর্বপ্রথম সার্বিক পরিচিতি লাভ করে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায়।

নামঃ SCHUSS
সৃষ্টিকর্তাঃ Mme Lafargue
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Grenoble, France
সালঃ ১৯৬৮

১৯৬৮ সালের ফ্রান্স অলিম্পিকের সেই প্রথম ম্যাসকটের নাম ছিল Schussস্কিয়ের ওপর দাঁড়ানো একজন ছোট্ট মানুষের একটা বিমূর্ত ছবি যাতে ব্যবহার করা হয়েছিল ফ্রান্সের জাতীয় পতাকার তিনটি রঙ – নীল-সাদা-লাল।

নামঃ WALDI
সৃষ্টিকর্তাঃ Otl Aicher
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Munich, Germany
সালঃ ১৯৭২



অফিসিয়াল অলিম্পিক ম্যাসকট Waldi নামে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭২ সালে মুনিচের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে। জার্মানির ব্যাভারিয়ার এই জনপ্রিয় শিকারি কুকুরের প্রতিমূর্তিকে অ্যাথলেটদের ধৈর্য, সহ্যশক্তি ও তৎপরতার রূপক হিসেবে তুলে ধরা হয়। অলিম্পিকের পাঁচটি রংয়ের কমপক্ষে তিনটি এই ম্যাসকটের শোভা ছিল।
দ্য অলিম্পিক ম্যারাথন (২০০০) নামক বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালের অলিম্পিক ম্যারাথনের রুট তার ম্যাসকটের আকার-আকৃতি অনুসারেই তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিযোগীদের মুখ থাকবে পশ্চিমদিকে আর তাঁরা ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে দৌড়োবেন। আসলে Waldi-এর জন্ম হয়েছিল ১৫ই ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর মুনিচ অলিম্পিক অর্গানাইজিং কমিটির হাতে। কর্মকর্তারা সেদিন ক্রিসমাস পার্টিতে মগ্ন ছিলেন এবং প্রত্যেককে রঙিন চক, কাগজের দিস্তে আর মূর্তি গড়ার জিনিসপত্র হাতে তুলে দিয়ে বলা হয়েছিল আগামী অলিম্পিকের ম্যাসকটের ডিজাইন বানাতে।
Cherie von Birkenhof নামের লম্বা লোমের এক কুকুরের প্রতিমূর্তি এই ম্যাসকটকে গেমস অর্গানাইজিং কমিটির প্রেসিডেন্ট Willi Daume শেষে ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট Félix Lévitan-এর হাতে সমর্পণ করেন ১৯৭০ সালে।
Waldi এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সারা বিশ্বজুড়ে প্রায় দুই মিলিয়ন Waldi সম্পর্কিত জিনিসপত্র যেমন, খেলনা, বোতাম, পোস্টার, স্টিকার, পিন ইত্যাদি বিক্রি হয়েছিল।

নামঃ SCHNEEMANN
সৃষ্টিকর্তাঃ Walter Pötsch
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Innsbruck, Austria
সালঃ ১৯৭৬

জার্মান ভাষায় Schneemann নামের অর্থ তুষারমানব। ১৯৬৪ সালে ইন্সব্রুক-এ আয়োজিত অলিম্পিকের সময় তুষারপাতের অভাব দেশবাসীকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। তাই এই অলিম্পিকেও যাতে সেই অভাব পরিলক্ষিত না হয় সেজন্য একরকম মানসপুত্র হিসেবেই তুষারমানবরূপী ম্যাসকটের জন্ম দেওয়া হয়েছিল। আর সকল কর্মকর্তাদের মুখরক্ষা করে সেইসময় প্রচুর বরফও পড়েছিল। তুষারমানবের আদলে তৈরি লাল টুপি পরিহিত Schneemann দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

নামঃ AMIK
সৃষ্টিকর্তাঃ Yvon Laroche, Pierre-Yves,
Pelletier, Guy St-Arnaud
এবং George Huel
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Montreal, Canada
সালঃ ১৯৭৬


কানাডার মন্ট্রিলে অনুষ্ঠিত ১৯৭৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ম্যাসকট ছিল উত্তর আমেরিকার এক বন্যপ্রাণী BeaverAnishinaabe ভাষায় Amik কথার অর্থ হল Beaverকানাডার স্থানীয় বন্যপ্রাণী Beaver-কে কঠোর পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
তিন সৃষ্টিকর্তার হাত ধরে জন্ম নেয় Amik

নামঃ RONI
সৃষ্টিকর্তাঃ Donald Moss
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Lake Placid, New York, U.S.A.
সালঃ ১৯৮০

Lake Placid-এর স্থানীয় ভাষা Iroquoian-এর ‘Racoon’ শব্দ থেকে Roni-এর উৎপত্তি। নির্বাচন করেছিল স্থানীয় স্কুল পড়ুয়ারা। Adirondacks নামক পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত লেক প্ল্যাসিডের স্থানীয় জন্তু হচ্ছে র‍্যাকুন। তার আদলেই ডিজাইনার ডোনাল্ড মস ১৯৮০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকের ম্যাসকট তৈরি করেন। সৃষ্টিকর্তা অলিম্পিক রিংয়ের পাঁচটি রংয়ের সমন্বয় ঘটান এই ম্যাসকটে।
রকি নামের এক জীবন্ত র‍্যাকুনকেই প্রথমে এই আসরের ম্যাসকট হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু অলিম্পিক শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে রকির মৃত্যু ঘটলে Roni-কে বেছে নেওয়া হয়।

নামঃ MISHA
সৃষ্টিকর্তাঃ Victor Chizhikov
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Moscow, USSR
সালঃ ১৯৮০

Victor Chizhikov নামের বাচ্চাদের বই-পুস্তকের এক রাশিয়ান অলঙ্করণ শিল্পী এই ম্যাসকটের রূপদান করেন। Misha ছিল প্রথম ক্রীড়াসংক্রান্ত পণ্যদ্রব্য যা বাণিজ্যিকরূপে সবচেয়ে বেশি সফলতা অর্জন করেছিল। শুধু তাই নয়, মিশাকে কেন্দ্র করে অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম এবং টেলিভিশন সিরিজও তৈরি করা হয়েছিল। আর ম্যাসকটকে নিয়ে এই প্রবণতা আজও শুধু অলিম্পিকের আসরগুলোতেই নয়, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ এবং অপরাপর খেলাধুলোর আসরেও বিদ্যমান।
Misha শব্দটি রাশিয়ান নাম মিখাইল এবং মিশকার সংক্ষিপ্ত রূপ। ১৯৭৭ সালে মস্কো অলিম্পিকের আয়োজন কর্তারা ম্যাসকটরূপী ভালুকের ছবি আঁকার এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। আর এতে Victor Chizhikov-এর আঁকা ম্যাসকটটি বেছে নেওয়া হয় এবং ওই সালের ১৯শে ডিসেম্বর Misha-কে মস্কো অলিম্পিকের অফিসিয়াল ম্যাসকট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আজও Misha-কে অলিম্পিকের অন্যতম সেরা ম্যাসকট হিসেবে মানা হয়।

নামঃ VUčKO
সৃষ্টিকর্তাঃ Jože Trobec
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Sarajevo, Bosnia
and Herzegovina
সালঃ ১৯৮৪

১৯৮৪ সালের শীতকালীন অলিম্পিকের ম্যাসকট বিশ্ববাসীর সামনে এসে দাঁড়াল এক নেকড়ের বেশে। Dinaric Alps-এর বনাঞ্চলে এই নেকড়ের হামেশাই দেখা মেলে। ৮৩৬ জন প্রতিযোগীর মধ্যে Jože Trobec-এর শিল্পকে মনোনীত করা হয়। বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনের ভোটে মোট ছয়টি দফায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে বিখ্যাত কার্টুনিস্ট Nedeljko Dragic য়ুগোস্লাভিয়ার বিভিন্ন দৈনিক এবং সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে Vucko-কে তার নায়ক হিসেবে কার্টুন পরিবেশন করেন।

নামঃ SAM
সৃষ্টিকর্তাঃ Robert Moore
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Los Angeles, U.S.A.
সালঃ ১৯৮৪

সেবছর আমেরিকার জাতীয় পাখি ন্যাড়া ঈগল ছিল অলিম্পিকের ম্যাসকট। নাম দেওয়া হয়েছিল Sam সৃষ্টিকর্তা রবার্ট মূর ছিলেন ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির একজন বিশিষ্ট কার্টুনিস্ট। ডিজনির আঙ্কল স্যামের পরিপূরকরূপে এই ঈগল স্যামের জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে। ১৯৮৩ সালে জাপানে ঈগল স্যাম নামে একটা অ্যানিমেটেড সিরিজও তখন সাফল্যের সঙ্গে সম্প্রচারিত হচ্ছিল।

নামঃ HIDY and HOWDY
সৃষ্টিকর্তাঃ Sheila Scott
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Calgary, Canada
সালঃ ১৯৮৮

এই Hidy এবং Howdy মেরু-ভল্লুকদ্বয়কে প্রায় ৭০০০ হাজার প্রতিযোগীকে পরাজিত করে শীলা স্কটের হাতে জন্ম নিতে হয়েছিল। হাউডি এবং তার বোন হাইডি ছিল অলিম্পিকের প্রথম দ্বৈত ম্যাসকট। পরবর্তী সময়ে ক্যালগ্যারির বিশপ ক্যারল হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের দ্বারা এই হাইডি ও হাউডি চরিত্রদুটি মঞ্চস্থ করা হয়। শুধু তাই নয়, ১৯৯৩ সালে ক্যালগ্যারি অলিম্পিকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘কুল রানিংস’ সিনেমায় ক্যামিও রোল হিসেবে এই দুই ভাইবোনের পুনরায় আত্মপ্রকাশ ঘটে।
একসময় ‘ওয়েলকাম টু ক্যালগ্যারি’ সাইন হিসেবে ক্যালগ্যারি শহরে অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকত তারা। পরে ২০০৮ সালে স্থানীয় সরকার পক্ষে তাদের জন্য ‘কানাডা অলিম্পিক পার্ক’-এ স্থায়ী বাসস্থানের বন্দোবস্ত করা হয়।

নামঃ HODORI
সৃষ্টিকর্তাঃ Kim Hyun
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক  
স্থানঃ Seoul, South Korea
সালঃ ১৯৮৮

কোরিয়ান শব্দ ‘Ho’ হচ্ছে বাঘ আর ‘Dori’ ব্যবহৃত হয় পৌরুষব্যঞ্জক অর্থে সে দেশের সাধারণ নাগরিকদের পাঠানো মোট ৪৩৪৪টি এন্ট্রির মধ্যে ২২৯৫ জন বাছাই করা প্রতিযোগীর মধ্য থেকে Kim Hyun-এর Hodori নির্বাচিত হয়। খরগোশ, কাঠবেড়ালি, হাঁস আর বাঘের ফাইনাল প্রতিযোগিতার মধ্যে  Hodori শৌর্য, বীরত্ব আর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রমাণিত করে জয়ী হয় তার মাথায় ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান টুপি ‘sangmo’ আর গলায় ঝুলছে অলিম্পিকের পাঁচটি বলয়। এই বছরই কার্টুনের বই ‘Come Along Hodori’ কোরিয়ান কার্টুন প্রতিযোগিতায়ও শ্রেষ্ঠ হিসেবে পুরস্কৃত হয়।

নামঃ MAGIQUE
সৃষ্টিকর্তাঃ Philippe Mairesse
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Albertville, France
সালঃ ১৯৯২


Magique’-এর জন্ম হয়েছিল বড়ো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। প্রচুর সংখ্যক মডেল হাতে পেয়েও কর্মকর্তাদের কোনওটাই পছন্দ হচ্ছিল না। উপায়ান্তর না দেখে কর্মকর্তারা অলঙ্করণ শিল্পী Michel Pirus-এর আঁকা একটি পার্বত্য ছাগলের মডেল নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। শেষে ‘ম্যাজিক’ শব্দটার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে  Philippe Mairesse আসরের দুইবছর আগে এই ম্যাসকটের সৃষ্টি করেন। রঙ নির্বাচন করা হয় ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা থেকে। তারকাকৃতি এই ম্যাসকট স্বপ্ন এবং কল্পনার প্রতীক। ‘Magique’-এর বিশেষ পাণ্ডিত্যমূলক ভূমিকাও ছিল সেই অলিম্পিকে। মোট ৭৯২৪ জন স্বেচ্ছাসেবীকে কম্পিউটার প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য, ভূমিকা আর কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত করেছিল সে

নামঃ COBI
সৃষ্টিকর্তাঃ Javier Mariscal
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Barcelona, Spain
সালঃ ১৯৯২

Cobi-কে সর্বপ্রথম জনসমক্ষে আনা হয় ১৯৮৭ সালে অর্থাৎ, ১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিকের প্রায় পাঁচবছর আগেই। ফলে ম্যাসকটটি বিভিন্ন বিপণন সংস্থার বিজ্ঞাপনে, ‘The Cobi Troupe’ নামে মোট ২৬ পর্বের অ্যানিমেশন সিরিজে এবং বিভিন্ন পোস্টারে সহজদৃশ্য হয়ে ওঠে। মোট ছয়টি ডিজাইন থেকে এই ম্যাসকটটিকে পছন্দ করা হয়। ৫ – ১২ বছর বয়সী দর্শকদের জন্যে নির্মিত ওই সিরিজ দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বার্সেলোনা অলিম্পিকের প্রচারকেও দৃঢ় করে তোলে। মোট ২৪টা টিভি চ্যানেল এই শোয়ের স্বত্ত্ব কিনেছিল।

নামঃ HAAKON and KRISTIN
সৃষ্টিকর্তাঃ Kari and Werner Grossman
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Lillehammer, Norway
সালঃ ১৯৯৪


ভাইকিং পোশাকে সজ্জিত Haakon আর kristin দুজনেই নরওয়েবাসী। হাকন চতুর্থ হাকনসন, যিনি ১২১৭ – ১২৬৩ সাল পর্যন্ত নরওয়ের সম্রাট ছিলেন, আর তার মাতৃস্থানীয়া ক্রিস্টিনের স্মৃতিচারণায় এই দ্বৈত ম্যাসকট তৈরি করা হয়। এটিই অলিম্পিকের ইতিহাসে মানবরূপী ম্যাসকট হিসেবে প্রথম। ১৯৯৪ সালের Lillehammer অলিম্পিকে ১০ – ১১ বছর বয়সী প্রায় ১০,০০০ ছেলেমেয়েদের মধ্যে মোট আট জোড়া ছেলেমেয়েকে ‘জীবন্ত ম্যাসকট’ হিসেবে অভিনয় করতে নির্বাচন করা হয়েছিল। তারা একেকজন ছিল নরওয়ের একেকটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রতিনিধিস্বরূপ। Kari আর Werner Grossman মিলে এই ম্যাসকটের জন্ম দিলেও মূল ধারণা ছিল Javier Ramirez Campuzano-এর।

নামঃ IZZY
সৃষ্টিকর্তাঃ John Ryan
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Atlanta, U.S.A.
সালঃ ১৯৯৬

Izzy সম্পর্কে সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার যেটা তা হচ্ছে এই ম্যাসকট বন্যপ্রাণী বা মানব বা নির্দিষ্ট কোনও বস্তুই নয়। বস্তুত এই নামও তার আসল নয়। ‘Whatizit’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ উচ্চারণ করতে গিয়েই আসলে Izzy-এর সৃষ্টি। Kirby, Starz, Zack, Gleamer এবং Izzy – এই মোট পাঁচটি নাম থেকে ৭ – ১২ বছর বয়সী ৩২জন আমেরিকান ছেলেমেয়ে এই নামটি বেছে নিয়েছিল। এই অলিম্পিকের ম্যাসকটের নামকরণ বিষয়ে ১৬টা দেশ থেকে মোট ৩৩০০ পরামর্শ এসেছিল। ১৯৯৫ সালের শরতে কার্টুন নেটওয়ার্ক চ্যানেলে Izzy-কে নিয়ে ত্রিশ মিনিটের এক শিক্ষামূলক কার্টুন শো সম্প্রচার করা হয়।

নামঃ SUKKI, NOKKI, LEKKI and TSUKKI

সৃষ্টিকর্তাঃ Landor Associates

আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Nagano, Japan
সালঃ ১৯৯৮



Sukki, Nokki, Lekki আর Tsukki আদতে চার-চারটি প্যাঁচা। এদেরকে একসাথে ‘Snowlets’ নামেও অভিহিত করা হয়। মোট ৪৭,৪৮৪টি জমাকৃত মডেল থেকে এরা উঠে এসেছিল। Landor Associates নামের যে সংস্থাটি এই ম্যাসকটের জন্ম দিয়েছিল তারাই গত আটলান্টা অলিম্পিকের মশাল ডিজাইন করেছিল এবং পরবর্তী সল্ট লেক সিটি অলিম্পিকের ম্যাসকট নির্মাণেও অংশগ্রহণ করেছিল। গ্রীকপুরাণ অনুসারে বুদ্ধিমত্তার দেবী এথেনার বাহন হচ্ছে প্যাঁচা। Sukki, Nokki, Lekki আর Tsukki – এই চারটি প্যাঁচা যথাক্রমে অগ্নি, বায়ু, ধরিত্রী ও জলের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। পাশাপাশি এরা জাপানের প্রধান চারটি দ্বীপেরও প্রতিনিধি।

নামঃ SYD, OLLY and MILLIE
সৃষ্টিকর্তাঃ Matthew Hatton
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Sydney, Australia
সালঃ ২০০০


সমগ্র অস্ট্রেলিয়া আর বেশ কয়েকটি দেশে চালানো সার্ভের মাধ্যমে এই ত্রয়ী ম্যাসকটটি মনোনীত করা হয়। Matthew Hatton অস্ট্রেলিয়ার সুপরিচিত ক্যাঙ্গারু আর কোয়ালা বাদ দিয়ে যখন সার্বিক অর্থে কম পরিচিত তিনটি প্রাণী platypus (Syd), kookaburra (Olly) এবং echidna বা spiny anteater (Millie)-এর স্কেচ জমা দিলেন তখন তা এককথাতেই মনোনীত হয়ে গেল। এই তিনটি প্রাণী যথাক্রমে জল, বায়ু আর পৃথিবীর প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হয়। এটাই অলিম্পিকের ইতিহাসে প্রথম ত্রয়ী ম্যাসকট।

নামঃ POWDER, COAL and COPPER
সৃষ্টিকর্তাঃ Landor/Publicis
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Salt Lake City, U.S.A.
সালঃ ২০০২


এই ম্যাসকট তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি এর স্বীকৃতি দান করে। Salt Lake City-এর Triad Center-এ ১৯৯৯ সালের ১৫ই মে তারিখে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই ম্যাসকট সর্বসাধারণের জন্য উন্মোচিত করা হয়। পরে ওই বছরই ২৫শে সেপ্টেম্বর তারিখে এই ত্রয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। ৪২,০০০-এরও বেশি ছাত্রছাত্রী এই ম্যাসকটের জন্যে নাম পাঠায়। শেষে কার্যকরী কমিটি জাতীয় মতদানের মাধ্যমে এর নাম নির্বাচিত করে। অন্যসব নামগুলোর মধ্যে Sky, Cliff, Shadow এবং Arrow, Bolt, Rocky ছিল অন্যতম।
এই ম্যাসকটে Powder একটি snowshoe hare, Copper একটি coyote আর Coal হচ্ছে একটি black bearএই অলিম্পিকের মোটো ছিল Citius, Altius, Fortius (দ্রুত, উচ্চতর ও শক্তিমান) যা খরগোশের গতি, কোয়োটের উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ছোঁয়ার ক্ষমতা আর কালো ভল্লুকের শক্তিকে নির্দেশ করে।

নামঃ PHEVOS and ATHENA
সৃষ্টিকর্তাঃ Spiros Gogos
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Athens, Greece
সালঃ ২০০৪

PHEVOS এবং ATHENA নামের এই ম্যাসকটদ্বয়কে প্রাচীন গ্রীস এবং আধুনিক অলিম্পিকের মধ্যে সমন্বয়কারী হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে। এরা হলেন অলিম্পাসের দুই সহোদর-সহোদরা দেবদেবী; আলোক এবং সঙ্গীতের দেবতা এপোলো যার আরেক নাম ‘Phoebos’ এবং এথেন্সের রক্ষাকর্ত্রী ও বুদ্ধিমত্তার দেবী এথেনাএই ম্যাসকটের ডিজাইন কী হবে তা নিয়ে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে সারা বিশ্বের ১৯৬ ডিজাইন এজেন্সি এবং ব্যক্তি নিজেদের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল।

নামঃ NEVE and GLIZ
সৃষ্টিকর্তাঃ Pedro Albuquerque
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Turin, Italy
সালঃ ২০০৬


ইতালিয় ভাষায় Neve মানে তুষার আর Gliz–এর অর্থ বরফ। এই ম্যাসকটে Neve একটা তুষারগোলক আর Gliz হচ্ছে বরফঘনক। লালজামা গায়ে বালিকা Neve সমন্বয় আর নীলজামার বালক Gliz অ্যাথলিটদের ক্ষমতা ও শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ম্যাসকট রূপদানের উদ্দেশ্যে অলিম্পিকের তিনবছর আগে একটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২০০৩ সালের ২০ মে-এর মধ্যে জমা পড়ে মোট ২৩৭টি ডিজাইন। এগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটিকে ফাইনালিস্ট হিসেবে নির্বাচিত করা হয় এবং পর্তুগিজ ডিজাইনার Pedro Albuquerque-কে অর্গানাইজিং কমিটির প্রেসিডেন্ট অফিসের তরফে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ২০০৪ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর এই ম্যাসকট অলিম্পিক কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হয়। ১৯৯২ সালে বার্সেলোনা ম্যাসকটের জনক Javier Mariscal এই প্রতিযোগিতায় অন্যতম জুরি ছিলেন।

নামঃ BEIBEI, JINGJING, HUANHUAN, YINGYING, NINI
সৃষ্টিকর্তাঃ Han Meilin
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Beijing, China
সালঃ ২০০৮



কোনও শিশুকে তার নাম পরপর দু’বার উচ্চারণ করে ডাকা চিনাদের একটি পরম্পরা। এতে স্নেহের প্রকাশ ঘটে। এই ম্যাসকটের প্রকৃত নামগুলো যথা – Bei, Jing, Huan, Ying Nini আসলে ‘Welcome to Beijing’-এরই প্রতিরূপ। এই পাঁচমূর্তি প্রত্যেককে অলিম্পিকের পাঁচটা রিংয়ের আলাদা আলাদা রঙ দেওয়া হয়েছে।
BeiBei: সে একটি মাছবিশেষ। তার রঙ নীল এবং সে সমৃদ্ধি কামনা করে। তার মাথায় চুলের ঢেউগুলো ঐতিহ্যবাহী চিনা অঙ্কনশিল্পের পরিচয়বাহী।
JingJing: বনজঙ্গলের প্রতিনিধি এই পাণ্ডা সুখ কামনা করে এবং তার রঙ কালো। তার মাথার পদ্মফুলের সজ্জা সং রাজত্বের (৯৬০ – ১২৩৪ খ্রিস্টাব্দ) বিখ্যাত Porcelain paintings থেকে অনুপ্রাণিত।
HuanHuan: সে অগ্নির প্রতীক। তার লাল রং ক্রীড়ার আবেগ চিহ্নিত করে।
YingYing: হলুদবর্ণের এই তিব্বতি হরিণকে ধরিত্রীর প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সে সুস্বাস্থ্য কামনা করে।
NiNi: নিনি আকাশের প্রতিনিধি। তার রঙ সবুজ এবং সে সৌভাগ্য কামনা করে। তার ডিজাইন চিনা ঘুড়ি থেকে অনুপ্রাণিত।

নামঃ QUATCHI and MIGA
সৃষ্টিকর্তাঃ Meomi design
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Vancouver, Canada
সালঃ ২০১০

Quatchi আর Miga ২০০৭ সালের ২৭শে নভেম্বর প্রথম জনসমক্ষে আসে উপস্থিত ছিল প্রায় ৮০০জন স্কুল পড়ুয়া। ভ্যাঙ্কুভার অলিম্পিকের ম্যাসকট নির্বাচনে আয়োজক কমিটি এক টেন্ডারের আয়োজন করলে বিভিন্ন অলঙ্করণ সংস্থা এবং শিল্পীদের মধ্য থেকে মোট ১৭৭টা আবেদনপত্র জমা পড়ে। ২০০৬ সালে কানাডিয়ান-আমেরিকান দ্বৈত সংস্থা মিওমি ডিজাইনের কাজ মনোনীত হয়।
Quatchi: একে ‘sasquatch’ নামের কানঢাকা এবং বুটজুতো ব্যবহারকারী এক অতিকায় বনমানুষের আদলে তৈরি করা হয় যাদের কানাডার গভীর জঙ্গলে আজও অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
Miga: মিগা এক পৌরাণিক সামুদ্রিক ভল্লুক যার দৈহিক আকার আংশিক হিংস্র তিমি আর কিছুটা ভল্লুকের মতোভ্যাঙ্কুভারের দ্বীপগুলোতে তাদের দেখা মিলত বলে পুরাণে কথিত আছে।

নামঃ WENLOCK
সৃষ্টিকর্তাঃ Iris design agency
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ London, U.K.
সালঃ ২০১২

২০০৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকের ম্যাসকট নির্বাচনী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ১০০-রও বেশি ডিজাইনার, শিল্পী আর এজেন্সি তাদের নিজস্ব প্রস্তাব জমা করেন।
Shropshire-এর Much Wenlock শহরের নামানুসারে এই ম্যাসকটের নামকরণ করা হয়। এর জন্ম আসলে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলশ্রুতি। Michael Morpurgo-এর বক্তব্য অনুযায়ী, লন্ডনের অলিম্পিক স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় গলিত স্টিলের শেষবিন্দু থেকেই আচমকা এই ম্যাসকটের জন্ম হয়েছিল। এর মাথার আলোকটি লন্ডনের বিখ্যাত কালো ট্যাক্সির পরিচায়ক। কপালের আকার দেওয়া হয়েছে স্টেডিয়ামের ছাদের আদলে। চোখটা আসলে একটা ক্যামেরার লেন্স যা দিয়ে সে তার দেখা সবকিছুকে ক্যামেরাবন্দি করে। কবজিতে পরে আছে অলিম্পিকের পাঁচটা আলাদা রঙের ব্রেসলেট। আর মাথার তিনটি চুড়ো হচ্ছে তিনজন বিজয়ীর মঞ্চ। তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য লন্ডনে সারা বিশ্ববাসীকে আমন্ত্রণ জানায়।
অলিম্পিক চলাকালে লন্ডনের রাস্তাঘাট, পার্ক, ভূতল স্টেশনগুলোর প্রবেশদ্বারে Wenlock-এর মোট ৮৪টি ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো হয়েছিল। মোট ২২জন ডিজাইনার সাজিয়েছিলেন এগুলোকে।

নামঃ THE HARE, THE POLAR BEAR and THE LEOPARD
সৃষ্টিকর্তাঃ Silviya Petrova (Hare)
Oleg Seredechniy (Polar Bear)
Vadim Pak (Leopard)
আসরঃ শীতকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Sochi, Russia
সালঃ ২০১৪



ম্যাসকটের এই তিনমূর্তি বিজয়ী মঞ্চের তিন স্থানাধিকারী। এই ম্যাসকট নির্বাচনে প্রায় ২৪,০৪৮টি ড্রয়িং জমা পড়েছিল সারা বিশ্ব থেকে। প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় ধাপে বিশেষজ্ঞ জুরি দ্বারা মাত্র ১০টি আঁকা নির্বাচিত হয়। ২০১১ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে এই ম্যাসকট মনোনীত হয়। ২০১২ সালে রাশিয়াতে এই ম্যাসকটের ২৫-রুবল কয়েন বাজারে ছাড়া হয়।

নামঃ VINICIUS
সৃষ্টিকর্তাঃ Birdo Produções
আসরঃ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক
স্থানঃ Rio De Janeiro, Brazil
সালঃ ২০১৬

এই ম্যাসকট ব্রাজিলিয়ান সঙ্গীতশিল্পী Vinicius de Moraes-এর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘস্বরূপ তৈরি করা হয়রিও ২০১৬ ম্যাসকট সৃষ্টিতে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে এক টেন্ডার ডাকা হয় যাতে ব্রাজিলের ডিজাইন, অ্যানিমেশন আর ইলাস্ট্রেশন জগতের দিকপালরা অংশগ্রহণ করেন২০১৩ সালে ম্যাসকটের চূড়ান্ত ডিজাইন নির্বাচন করা হয়। ২০১৪ সালের ২৩শে নভেম্বর তারিখে Vinicius পৃথিবীর আলো দেখে। তিন সপ্তাহ পরে এর নামকরণের ব্যাপারে জনমত সংগ্রহ করা হয়। মোট ৩,২৩,৩২৭টি ভোট পড়ে। শেষ অবধি তিন ফাইনালিস্ট, Oba Eba; Tiba Tuque Esquindim; এবং Vinicius Tom-এর মধ্যে শেষেরটি ৪৪% যোগ্য ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। ব্রাজিলের রিও-তে অবস্থিত প্রাক্তন আই.ও.সি প্রেসিডেন্টের নামে উৎসর্গীকৃত স্পোর্টস স্কুল Ginásio Experimental Olímpico Juan Antonio Samaranch-এ Vinicius জনসাধারণের সামনে আনা হয়।
_____
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ আন্তর্জাল