ভ্রমণ:: মতি বাহাদুর - রবীন্দ্রনাথ হালদার

হিমালয় অভিযান

মতি বাহাদুর
রবীন্দ্রনাথ হালদার

মতি বাহাদুর নেপালের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা বছর সাতাশ-আঠাশের শীর্ণকায় এক যুবক। না খেতে পাওয়া ভগ্ন চেহারার এই যুবককে দেখে ভেবেই অবাক হচ্ছিলাম, এ কি সত্যিই পিঠে মাল বইতে পারবে? পোর্টারদের দলের লিডার মান বাহাদুর, যিনি আমাদের দলের গাইড, ওনাকেই জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনাদের এই ছেলেটির যা চেহারা, ও কি মাল বইতে পারবে?” মানবাহাদুরের উত্তরে একটু আশ্চর্য হলাম - “স্যার, একজন পোর্টার আঠাশ কিলো মাল বহন করবে। মতি আমাদের সঙ্গে থেকে যতটা মাল নিতে পারবে নেবে, বাদবাকি ওজনের মাল আমরা সকলে ভাগ করে নেব ও হচ্ছে বোকাহাবা একজন মানুষ, তার উপর ভীষণ গরিব। আমরাও গরিব, কিন্তু ওর পরিবারের অবস্থা নিশ্চয়ই ওর চেহারা ও পোশাক দেখেই বুঝতে পারছেন
না খেতে পেয়ে মতির চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে। দু’পাশের গাল দুটো তুবড়ে ভিতরে ঢুকে আছে। কলার বোন দুটো ঠিকরে উপরের দিকে উঠে রয়েছে। পরনে একটা ফুল হাতা নোংরা জামা। দু’কাঁধের উপরে ফাটা, বগলেও একই হাল। জামার তলার দিকের দুটো বোতাম লাগানো আছে। উপর দিকের সব বোতামগুলো ছিঁড়ে গেছে, তারই ফাঁক দিয়ে বুকের খাঁচার হাড়গুলো হারমোনিয়াম রিডের মতো উঁকি মারছে। পরনের ফুল প্যান্টটা সামনের দিকে দুটো হাঁটুর উপর ফাটা। মতি যখন সামনের দিকে ঝুঁকে বা নিচু হয়ে কোনো কাজ করছে তখন প্যান্টের পিছনের ফাটা অংশ দিয়ে পশ্চাদ্দেশের ফরসা চামড়া দুটো আঁখির মতো উঁকি মারছে আর সে নিজের লজ্জা লুকিয়ে রাখতে পারছে না এ হল চরম শোষণের এক বাস্তব রূপ, চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। মানব সভ্যতার অপঘাতে মৃত্যুর এই চিত্র না জানি কতকাল এ সমাজ বহন করে চলবে। নুড়ি পাথর আর বরফের দেশের মানুষ মতি। সে আমাদের মতো নরম মাটি ও ঘাসের ছোঁয়া কখনও পায়নি। জন্মের পর থেকে যখন সে হাঁটা শিখেছে তখন থেকে জুতো কী বস্তু আর তার কী উপযোগিতা, এই সাতাশ বছর পর্যন্ত ও বুঝে উঠতে পারেনি। খালি পায়ে কত পথ হাটতে হাঁটতে ওর পায়ের তলার চামড়া আজ সারশূন্য হয়ে আছে। পুরো গোড়ালি ফেটে চৌচির। আজও মতি খালি পায়ে হেঁটেই চলেছে। শোষকের বিলাসিতার চামড়াকে ও আজ নিজের পায়ের ভৃত্য করে রেখেছে। মান বাহাদুর অতি বিনয়ী ভাষায় আমাদের ঘুমিয়ে থাকা বিবেককে জাগিয়ে তুলল। মতি আমাদের অভিযান দলের সঙ্গে থেকে গেল
গঙ্গোত্রী বেশ ঠান্ডা। মতি ঐ একটা ছেঁড়া জামা ও একটা ফাটা প্যান্টকে সম্বল করেই গঙ্গোত্রী পৌঁছে গেল ঐ পরিধানেই ও সকলের ফাইফরমাস খেটেই যাচ্ছে। ও যে আমাদের দলে কাজ পেয়েছে এবং দলের সঙ্গে থাকতে পেরেছে এতেই ও খুশি। শীত ও পরিশ্রম দু’জনাই মতির কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। গঙ্গোত্রী থেকে ভুজবাসা হয়ে রক্তবর্ণ বেস ক্যাম্পে মতি পৌঁছে গেল আমাদের সঙ্গেঐ ঠান্ডার মধ্যে কোনো কাজে বিরক্তি নেই, আর সব সময়ে মুখে ছোট্ট একটা হাসি লেগেই আছে। বেস ক্যাম্পে পৌঁছে এক দিন বিশ্রামের পর দ্বিতীয় দিনে আমরা ছোট্ট একটা দল তৈরি করে এগিয়ে যাই থেলু পর্বত আরোহণ করতে। বাকি দল বেস ক্যাম্পেই রয়ে যায়। ওদের সঙ্গে মতিও বেস ক্যাম্পে থেকে যায়। আমরা দ্বিতীয় দিনে থেলু আরোহণ করে তৃতীয় দিনে ফিরে আসি বেস ক্যাম্পে। পিক জয়ের আনন্দে দলের সকলেই খুব উল্লসিত। নিচে ফিরে গিয়ে খুব বড়ো করে একটা পিকনিক হবে। পাহাড়ি ভাষায় যাকে বলে বড়া খানা। এই আলোচনাই সবার মুখে মুখে ফিরছে। সকলে আরও এক দিন বেস ক্যাম্পে বিশ্রাম নিলাম। এর পরে তিন জনের একটা ছোট্ট দল, সঙ্গে গাইড মান বাহাদুর ও দ্বিপ বাহাদুরকে নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম কোটেশ্বর পর্বতের দিকে আরোহণের জন্য। বাকিরা সকলেই রয়ে গেল বেস ক্যাম্পে। যাওয়ার আগে সিদ্ধান্ত হল, ঠিক তিন দিনের মাথায় বেস ক্যাম্প থেকে ক্যাম্প ওয়ানে একজন পোর্টারকে পাঠিয়ে দিতে হবে। সে ওখান থেকে আমাদের কিছু মালপত্র নামিয়ে নিয়ে আসবে। আমরা যথাসময়ে কোটেশ্বর পর্বত জয় করে ঠিক তিন দিনের মাথায় ক্যাম্প ওয়ানে নেমে আসি। আমাদের মালপত্র নামিয়ে আনার জন্য বেস ক্যাম্প থেকে ঠিক সময়ে একজন নয় - দু’জন পোর্টার ক্যাম্প ওয়ানে পৌঁছে যায়। আসতে বলা হয়েছিল এক জনকে, এল দু’জনা। বিষয়টা সেই মুহূর্তে অনুধাবন করা যায়নি কেন দু’জনা এলএকটু পরে আমাদের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হল কেন দুজন এসেছে। যাক ভালোই হল, আমাদের কষ্ট কম হবে। আমরা বেলা একটা নাগাদ কোটেশ্বরের সামিট ক্যাম্প থেকে ক্যাম্প ওয়ানে পৌঁছে অপেক্ষা করছিলাম, নিচে থেকে ঐ পোর্টার আসার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাম্প ওয়ানে ঐ দু’জন পোর্টার পৌঁছে যায়।
আমাদের পিক জয়ের আনন্দটা ওদের জানাতেই দেখলাম ওরা বড়োই নিরাশ এবং চুপচাপ। দুটো মুখই খুব বিষণ্ণও বটে। আমাদের কাছে বিষয়টা যেন কী রকম একটা বিষাদের মতো মনে হল। ওদের কাছে জানতে চাইলাম, “কী ব্যাপার, কী হয়েছে তোমাদের?” একজনা হাঁটুর উপর মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিল মান বাহাদুর, দ্বিপ বাহাদুর আর আমরা তিন সদস্য সকলেই ওর কান্না দেখে নিমেষেই হতচকিত হয়ে গেলাম। কী হল বিষয়টা! মান বাহাদুর নিজেই এগিয়ে গিয়ে যখন ওকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, তুমি কাঁদছ কেন?” তখন অপর জনা বলতে শুরু করলগতকাল দুপুর থেকে মতি নিখোঁজ। ঐ কথা শুনে পিক জয়ের আনন্দ তো দূরে থাক, আমাদের সকলের মাথায় হঠাৎ করে যেন বাজ পড়ে গেল। সর্বনাশ, ও কী বলছে! জানতে চাইলাম, “সে কী, ওকে খোঁজা হয়েছে?”
“হ্যাঁ, ক্যাম্পের সকলেই গ্রুপ করে আশেপাশে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। কোথাও কোনো হদিস আমরা পাইনি তার
কয়েক দিন আগেই গঙ্গোত্রীতে গাড়োয়ালিদের অত্যাচারে একজন নেপালি পোর্টার আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। এরপরে মতিও যদি নিখোঁজ হয়ে যায় তাহলে ব্যাপারটা যে ঘোরতর হয়ে উঠবে! কোথায় গিয়ে যে দাঁড়াবে আমরা কেউই ভেবেই উঠতে পারছি না। এক মুহূর্ত দেরি না করে সকলেই যত তাড়াতাড়ি পারি বেস ক্যাম্পে নামতে শুরু করি। বেলা তিনটেয় নেমে আসি বেস ক্যাম্পে। ক্যাম্পে পৌঁছনোর পর ক্যাম্পের চেহারা দেখে বাক্যহীন হয়ে পড়লাম। সকলের মুখের চেহারা দেখে বেশ কিছুক্ষণ টেন্টের বাইরে কপালে হাত দিয়ে বসে রইলাম। মাথায় তখন কিচ্ছু আসছে না। এখন কী করব? বুঝেই উঠতে পারছি না। কুক বেচারা মনমরা অবস্থায় হট ড্রিঙ্কস বানিয়ে নিয়ে এল মুখে দিয়ে তার কোনো স্বাদই অনুভব করতে পারলাম না। তাড়াতাড়ি সবাইকে নিয়ে আবার মিটিং-এ বসা হল। সেখানে সিদ্ধান্ত হল, সন্ধের আগে পর্যন্ত আর একবার আমরা শেষ বারের মতো খুঁজে দেখব। শেষ চেষ্টা চালাতেই হবে। হাল ছাড়লে হবে না।
চারটে গ্রুপ করে বেরিয়ে পড়লাম চারদিকে। একটা গ্রুপ নালার উপর দিকে, আর একটা গ্রুপ নালা ধরে নিচের দিকে, বাকি দুটো গ্রুপ দেখবে বোল্ডার জোনের উপর ও নিচের দিকটা। এইভাবে সবাই আবার বেরিয়ে পড়লাম মতিকে খুঁজতে। এতগুলো চোখ কোথাও খুঁজে পেলাম না মতিকে। সন্ধ্যার আগে সবাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম ক্যাম্পে। আবার সবাই মিলে মিটিং-এ বসলাম। মতির নিখোঁজের ব্যাপারে এখন আমরা কী সিদ্ধান্ত নিতে পারি? কী আমাদের করা উচিত? অভিযানে গিয়ে পাহাড়ে এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। হিমালয়ে অভিযান করতে এসে বহু অভিযাত্রী আর কোনো দিনই ফেরেনি। অদৃষ্টের সেই পরিহাস আজ আমাদের সঙ্গী। নিচে ফিরে গিয়ে জনে জনে আমাদের এই কৈফিয়ত দিতে হবে। অথচ আমরা কেউ বুঝতেই পারলাম না মতির অদৃশ্য হওয়ার কারণটা কী! মিটিং-এ ওর হারিয়ে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে সেটা নিয়েই চলছিল আলোচনা। আলোচনাটা মিনিট দশেক গড়িয়েছে। এমন সময় কিচেনের পাশ থেকে একজন পোর্টারের হঠাৎ একটা চিৎকার শোনা গেল। সে নিচের নালার দিকে দৌড় লাগাল - মতি আসছে, মতি আসছে। আমরা সকলেই টেন্ট থেকে তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে বেরিয়ে দেখি - হ্যাঁ, ঠিক। ঐ পোর্টার দৌড়ে গিয়ে সত্যি মতিকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে। মতি হাসছে আর্ সেই পোর্টার হাউহাউ করে কাঁদছে। এই সাময়িক দৃশ্য সবার চোখেই জল এনে দিল। মতির মুখ থেকে একটাই শব্দ বেরিয়ে এল, বহুত ভুখ লগা। তাড়াতাড়ি ওকে টেন্টের পাশে একটা পাথরের উপর নিয়ে গিয়ে বসানো হল। সকলকে বলা হল, ওকে এই মুহূর্তে কেউ বিরক্ত কোরো না। আগে ওকে কিছু খেতে দেওয়া হোক। ও আগে খেয়ে নিক। মতিকে পেয়ে ক্যাম্পের চেহারা নিমেষেই পালটে গেলকুক হরি বাহাদুর তাড়াতাড়ি মতির জন্য চা আর ম্যাগি বানিয়ে নিয়ে এল দেড় দিন ধরে মতি অভুক্ত ছিল খাবার তো দূরের কথা, ঐ দেড় দিনে মতি একটু জল পর্যন্ত পায়নি।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় তিরিশ ঘন্টা বাদে মতি বেস ক্যাম্পে ফিরে এল আগের দিন দুপুরে খাওয়ার পর সে বাসনপত্র ধোয়ার জন্য জল আনতে নিচের দিকের নালায় গিয়েছিল। ওখানে যাওয়ার পর মতির কী হয়েছিল? রামায়ণের সেই পৌরাণিক গল্প - রাজা দশরথ বেরিয়ে ছিলেন মৃগয়ায়, যদিও শিকার করার জন্য তার হাতে ছিল তির-ধনুক, এই ক্ষেত্রে আমাদের মতি ছিল নিরস্ত্র। অভুক্ত মতির খাওয়ার শেষে মান বাহাদুর নিজের ভাষায় জানতে চাইল, এই দীর্ঘ সময় সে কোথায় ছিল? ওর চারিদিকে তখন সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। সবার মধ্যে তখন একটা টান টান উত্তেজনা। কী বলবে মতি, এই দীর্ঘ সময় ও কোথায় ছিল! শুরু হল এক রোমহর্ষক কাহিনি। মুখটা তুলে সেই স্বভাবসিদ্ধ লাজুক হাসি। ভারি সরল মানুষ ও। কোনো ভয় বা চিন্তার এতটুকু ছাপ এই মুহূর্তে ওর মুখের উপর নেই। এবার ও মন খুলে ধীরে ধীরে কথা বলতে লাগল -
“নালায় জল আনতে গিয়ে দেখলাম নালার ওপারে অনেকগুলো হিরণ [পাহাড়ি হরিণ] দাঁড়িয়ে আছে। তখন ভাবলাম, কিচেনে জল রেখে একটা হিরণ ধরে, না হয় তো মেরে নিয়ে আসি। তাহলে আমাদের যে বড়া খানা হবে সেখানে মাংস কিনতে হবে না। আমি জল রেখে নালা টপকে ওদের ধরতে যাই। ঐ হিরণের দলটা আমাকে দেখে পালাতে শুরু করে। আমিও ওদের পিছনে পিছনে তাড়া করতে থাকি। বার বার একটুর জন্য ফসকে যাচ্ছিল, ধরতে পারছিলাম না। পাথর ছুড়েও বহুবার মারার চেষ্টা করেছি, কিন্তু মারতে পারিনি। ঐভাবে ওদের তাড়া করতে করতে সন্ধে হয়ে যায়। ওরা শেষ পর্যন্ত বরফের উপর উঠে যায়। আমিও তাড়া করতে করতে একটুখানি উঠে গিয়েছিলাম বরফের উপর। যখন দেখলাম সন্ধে হয়ে আসছে, তখন আমি ফিরতে শুরু করি। যখন বেশ খানিক অন্ধকার নেমে এল, তখন একটা বড়ো পাথরের আড়ালে বসে পড়ি, কারণ এই অন্ধকার রাত্রে আমি পথ চিনতে পারব না। এত দৌড়েছি হিরণের পিছনে যে আমি তখন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সারা রাত ভয়েতে ঘুমাইনি, কারণ আমার চারিদিকটা ঘন অন্ধকার ছিল, শুধু মাথার উপর আকাশ ভর্তি তারা ছিল; আর আমার চারিদিকে যে বড়ো বড়ো পাথরগুলো ছিল সেই পাথরগুলিকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন অন্ধকারের মধ্যে আমার দিকে তেড়ে আসছে। রাত্রে খুব ঠান্ডা লাগছিল, আর ভয়ানক ভূতের ভয় পাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার ভাগ্য ভালো রাত্রে কোনো ভূত আসেনি। তাহলে আমাকে মেরে ফেলত খুব ভোরেই আবার হাঁটতে শুরু করি। তখন অনেকটা কুয়াশাও ছিল। আমি না... রাস্তা বুঝতে পারছিলাম না। খিদেয় আর চলতে না পেরে মাঝে মাঝে রাস্তায় বসে পড়ছিলাম। মাথাও চক্কর দিচ্ছিল। কিছুতেই আমি আমাদের তাঁবুগুলো খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রাস্তায় ঘন ঘন বসে পড়ছিলাম। খিদেয় চলতেও পারছিলাম না। চলতে চলতে পা দু’টো কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিল। বার বার মনে হচ্ছিল এখনই বুঝি পড়ে যাব। ভাবছিলাম, কী জানি, সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেল কিনা। খুব ভয় হচ্ছিল। যদি সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়, তাহলে আমি একা রাস্তা চিনে আর কোনোদিন বাড়ি ফিরে যেতে পারব না। সেই সময় আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। ভাবছিলাম আমি একা আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারব না। আমার কী হবে! এই কিছুক্ষণ আগে আমি অনেক দূর থেকে তোমাদের দেখতে পেয়েছি। তোমরা ঐ নালার পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে কয়েকজন নিচের দিকে যাচ্ছিলে। তখনই মনে খুব আনন্দ হল, আমি চলে এসেছি। আর একটু কষ্ট করলেই ক্যাম্পে পৌঁছে যাব। এখানে আসতে‍ একটু দেরি হয়ে গেল...” বলেই মাথা চুলকাতে চুলকাতে লাজুকভাবে মুখটা নিচু করে হেসে দিল মতি ভারি লাজুক হাসি। ও এটাও জানে না যে ওর ফিরে আসাটা কতটা প্রয়োজন ছিল দলের ও সমাজের কাছে। সেটা শুধু আমাদের জন্য নয়। ওর মুখ চেয়ে বসে আছে যে আপনজনেরা, অপেক্ষা করে রয়েছে সেই সুদূর দেশের গ্রামের বাড়িতে! সেই একটা তেলচিটে ছেঁড়া ফুল শার্ট, হাঁটু ও পেছন-ফাটা নোংরা ফুল প্যান্ট আর উলঙ্গ পায়ে প্রকৃতিকে জয় করে মতি ফিরে এল বেস ক্যাম্পে। ও এতটাই সরল, তাই ও বুঝতে পারল না ও কী সামিট করে ফিরল। যারা যুগ যুগ ধরে তোমার উপর শোষণের চাবুক চালিয়েছে, হে বীর, তাদের সমস্ত শোষণের অহংকার সমর্পিত হোক তোমার ঐ উলঙ্গ চরণে।
----------
শীর্ষচিত্র: গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে সুদর্শন শৃঙ্গ, ফোটো অর্পিত রাওয়াত

3 comments:

  1. এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলোই মনে থেকে যায়। খুব ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  2. অপূর্ব রচনা। মর্মস্পর্শী। পরন্তু শিক্ষনীয় ও বটে।
    আমরা আমাদের জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দের হেরফের ঘটলেই পরস্পর কে দোষারোপ করি। অথচ এই সরল পাহাড়িয়া মানুষেরা এত অভাবের মধ্যে থেকেও কোনো রাগ করতে জানেনা। ভারবাহী এই মানুষগুলো একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসে। সমব্যথী হয়।
    রচনাকার শ্রী রবীন্দ্রবাবু প্রাঞ্জল ও সহজ ভাষায় এই মানুষগুলির জীবনকথা তুলে ধরেছেন। পাঠকের মনে আলোড়ন তুলেছে, আগামী পাঠকরাও আলোড়িত হবেন, আশা করি।
    সত্যিই সমৃদ্ধ হলাম। প্রনাম জানাই রচনাকার ও তার সহযোদ্ধাদের কে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. গল্পটা খুব মন দিয়ে পড়লাম ভীষন ভালো লাগলো আসলে নেপালিরা ভীষন খোলা ও সরল স্বভাবের হয়।
      দাদা তুই কেমন আছিস? আমরা সবাই ভালো আছি।

      Delete