Showing posts with label Travel. Show all posts
Showing posts with label Travel. Show all posts

ভ্রমণ:: উরগিন লান্ডুপ - রবীন্দ্রনাথ হালদার


উরগিন লান্ডুপ
রবীন্দ্রনাথ হালদার

১৯৮৯ সাল, মাঝখানে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। আজও যে মানুষটাকে ভুলতে পারা যায়নি তার একটা ছোট্ট সিদ্ধান্তের জন্য, তার নাম উরগিন লান্ডুপ। ভদ্রলোক লাদাখ অধিবাসী একজন বুদ্ধিস্টএই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষরা কতটা ন্যায়পরায়ণ হয়, তার সেইদিনের কাজই আমাদের কাছে সেটার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। ঘটনাটা আপাতদৃষ্টিতে খুবই ক্ষুদ্র হলেও সেইদিন তিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছিলেনইছাপুর রাইফেল ফ্যাকটরির অভিযান ছিল লাদাখের গোলাপ কাংরি ও পরচা কাংরিতে। কলকাতা থেকে দশ সদস্যের দল চলেছি লাদাখে। সকলের মধ্যেই তখন চলছে এক বিশেষ উত্তেজনা। কারণ লাদাখ ছিল তখন মানুষের কাছে অনেকটাই কল্পনার জগত আজকের মতন সেই দিনগুলিতে ট্যুরিজমের এত রমরমা ছিল না। তাই মানুষের কাছে লাদাখ ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। ট্রেনের রাস্তা জম্মুতে শেষ। তারপরেই শুরু হয় লড়াই। সেই দিনের যা পরিস্থিতি, খুব বেশি যে গাড়িঘোড়া চলত তা নয়। কারণ রাস্তার নানা প্রতিকূলতা, তার সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত সমস্যা। ট্রেন থেকে নামার পর জম্মু থেকে সড়কপথে শ্রীনগর যেতে সময় লাগত বারো ঘণ্টা। আবার কখনও কখনও সেটা চলে যেত একেবারে অনিশ্চয়তায়। রাস্তায় অনেক জায়গায় ধসে আটকে যেতে হত, যেটা আমাদের ক্ষেত্রেও হয়েছিল, যদিও আমাদের অভিযানের পুরো দলটাই আর্মি কনভয়ের সঙ্গেই ছিলাম। এর একমাত্র কারণ রাইফেল ফ্যাকটরির প্রশাসন ভারতীয় সেনা বিভাগের নিয়ন্ত্রণেসেই কারণেই অভিযানের পুরো দলটাকেই সেনা নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে লাদাখ যাতায়াত করতে হয়েছিল। এই সাহায্যটা না পেলে অভিযানটা ব্যর্থই হত। সেটা পরবর্তী অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝেছিলাম। কলকাতা থেকে ফোনেই জম্মু রেলওয়ে স্টেশন থেকে লাদাখ পর্যন্ত যাওয়া এবং আসা আর্মির গাড়িতেই ব্যবস্থা হয়েছিল। জম্মু থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত প্রাইভেট বাস সব সময় চলতে থাকে, কিন্তু শ্রীনগর থেকে লে যাওয়ার বাস সম্পূর্ণ নির্ভরশীল সেনা বিভাগের অনুমতির উপর, কারণ দ্রাস থেকে কারগিল খুব স্পর্শকাতর জায়গা, পাকিস্তান মাঝে মধ্যেই এই অঞ্চলে হামলা চালাতে থাকে। এর পরেও শ্রীনগরে প্রায়ই বাস ও অন্যান্য গাড়িঘোড়া কারফুর জন্য অচল হতে থাকে।
আমাদের দল জম্মু আর্মি ইউনিটে একরাত কাটানোর পরের দিন সকালে আর্মি কনভয়ের বাসে চলে যাই শ্রীনগরে, যদিও মাঝে মাঝে রাস্তায় ধসের জন্য আটকে যেতে হয়। সন্ধে ছটায় শ্রীনগরে পৌঁছানোর কথা ছিল, কিন্তু সেখানে রাত দেড়টায় শ্রীনগর আর্মি ইউনিটে পৌঁছে এক অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। সে এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই প্রথম খুব কাছ থেকে সেনাদের রাত কাটানো দেখা হল যখনই কনভয় ঢুকবে শ্রীনগরে তখনই প্রত্যেক সেনাকে নিজ নিজ ইউনিটে যাওয়ার জন্য অফিস থেকে লিখিয়ে স্ট্যাম্প করে নিতে হবে। রাত দেড়টা তখন, সব অফিস বন্ধ। যে যার বেড রোল খুলে ঐ ঠান্ডায় কম্বল পেতে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে পড়ল আমাদের দল ঐ অবস্থা দেখে বুঝে গেলাম আমাদেরও কী করতে হবে। ঐ রাতে একটা গাছের তলায় সকলে আশ্রয় নিলাম। মনের মধ্যে তখন দলের প্রত্যেকেরই ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে একমাত্র লিডার ও ডেপুটি লিডার ছাড়া। এতদিন বাইরে থেকে তাদের পোশাক-আশাক দেখে এসেছি। আর দেখেছি তাদের যে কোনো কাজে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া এবং ঝাঁপিয়ে পড়া। এর বাইরে সেনাবাহিনী সম্বন্ধে আর তেমন কোনো ভাবনার অবকাশ সম্ভব ছিল না। রাতের ঐ শীতের দাপট হেলায় উড়িয়ে দিয়ে খোলা আকাশের নিচে দেশের জন্য জীবনকে সঁপে দেওয়া চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা তো দূরের কথা, অলীক বা মিথ্যা বলেই মনে হত। এইভাবে দিনে দিনে জীবনে কঠিন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে নিজেদেরকে সেনারা গড়ে তোলে দেশের কাজের জন্য। এখান থেকেই ওরা সঞ্চয় করে আত্মবিশ্বাস ও জীবন বলিদানের প্রেরণা বিষয়টা সাধারণ মানুষ কখনোই বাইরে থেকে অনুধাবন করতে পারবেন না। চলতে চলতে সেনাবাহিনীর আরও কিছু দেখেছি যা কল্পনাতীত। সীমান্তের কাছাকাছি থাকা সেনাদের যে জীবন সেটা আরও কঠিন। আর্মি কনভয়ে শ্রীনগর থেকে লে-র পথে শুরু হয় আমাদের যাত্রা। রাস্তায় মাঝে দু-রাত কাটিয়ে তৃতীয় দিনে পৌঁছাতে হবে লাদাখ আর্মি ট্রানজিট ক্যাম্পে।
শ্রীনগর থেকে প্রথম দিন সোনমার্গ হয়ে ক্যাপটেন মোড় পেড়িয়ে দ্রাস। সোনমার্গ থেকে ক্যাপটেন মোড় পর্যন্ত রাস্তা পুরোটাই চড়াই। ক্যাপটেন মোড়ের পর থেকে রাস্তা একটু একটু করে পাকদণ্ডি হয়ে নেমে গেছে দ্রাসে। আমাদের অভিযানের দল ছিল লিড কনভয়ের সঙ্গে গাড়ি ক্যাপটেন মোড় পৌঁছাতেই গাড়ি থামিয়ে ক্যাপটেন চৌধুরীর স্মৃতিফলকে নারকেল ভেঙে তার নির্মল জল ও ধূপকাঠি জ্বেলে পুজো দিয়ে দ্রাসের উদ্দেশে গাড়ি এগিয়ে চলেএখানে ক্যাপটেন মোড় এবং ক্যাপটেন চৌধুরীর উল্লেখ না করলে ও তার স্মৃতিচারণে দু-এককথা না বললে তাকে অসম্মানই করা হবে।
এই ক্যাপটেন চৌধুরী ছিলেন ভারতীয় সেনার এক দক্ষ অফিসার। শুধু তাই নয়, উনি ছিলেন এক জাতীয় সম্পদও বটেশ্রীনগর থেকে দ্রাসের এই পথ উনি ম্যাপ ঘেঁটে আবিষ্কার করেন এবং ওনার পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সড়ক তৈরি হয়। যখন সড়ক উদ্বোধন হয় তখন দেখা যায় সড়কের নামকরণ হয়েছে ঐ ব্যাটেলিয়নের যিনি কর্নেল ছিলেন তার নামে ক্যাপটেন চৌধুরী এই চরম অপমান এবং যন্ত্রণার শিকার হওয়ায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং এক জোঙ্গা জিপে চড়ে এই মোড় থেকে ঐ জিপ-সহ ঝাঁপ দিয়ে আনুমানিক তিন হাজার ফিট নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা শতদ্রু নদীর জলে নিজেই নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন দেশের জন্য। সেই থেকে আগের নাম বদলে ক্যাপটেন চৌধুরীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই মোড়ের নামকরণ হয় ক্যাপটেন মোড়। না জানি এমন কত ঘটনাই নিভৃতে মানুষের অজান্তে গুমরে মরে! এই পাহাড় সংক্রান্ত তেমনই এক বঞ্চনার শিকার রাধানাথ সিকদারের ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়।
পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গের আবিষ্কারক হলেন রাধানাথ সিকদার, কিন্তু ১৮৫২ সালে সারভেয়ার জেনারেল অ্যানড্রু ওয়াগ দাবি করেন, “আমি পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ আবিষ্কার করে ফেলেছি ঐ শৃঙ্গের আগে নাম ছিল পিক-১৫। সেই সময় পিক চিহ্নিত করার জন্য নাম রাখা হত সংখ্যায়। ঐ অ্যানড্রু সাহেবই নামকরণ করেন আগের সারভেয়ার জেনারেল জর্জ এভারেস্টের নামে। এই অ্যানড্রুও পরে সারভেয়ার জেনারেল হয়েছিলেন। ধারণা করা হয় ঐ পদ পাওয়ার জন্যই হয়তো উনি আগের ঘটনাটা ঘটিয়েছিলেন। অ্যানড্রুর পরে যিনি সারভেয়ার জেনারেল হন তার নাম কর্নেল সিডনি জেরাল্ড বারার্ড। ঐ ব্রিটিশ ভদ্রলোক চেয়ারে বসেই সমস্ত পুরোনো তথ্য ঘেঁটে আবিষ্কার করেন পিক ১৫-এর আবিষ্কারক হলেন অতি উচ্চস্তরের গণিতবিদ রাধানাথ সিকদার। সেই সময় ত্রিকোণমিতির সাহায্যে হিমালয়ের ঐ অংশের জরিপ করা হয়েছিল, সঙ্গে থিওডোলাইট যন্ত্রের সাহায্যে এই পর্যবেক্ষণ হয়েছিল। ঐ সার্ভের নাম ছিল দ্য গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভে অ্যানড্রু ছিলেন অতি সাধারণ স্তরের একজন ইঞ্জিনিয়র। সিডনি জেরাল্ড বারার্ড এই মিথ্যে তথ্য ফাঁস করে ব্রিটেনের নেচার পত্রিকায় ১৯০৪ সালে একটি প্রবন্ধ লেখেন মাউন্ট এভারেস্ট নামে। সেখান থেকেই সমস্ত তথ্য পাওয়া যায়। আসলে রাধানাথ যত বড়ো গণিতবিদই হোন না কেন তিনি যে ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ! যুগ যুগ ধরে এই বঞ্চনার ইতিহাস চলে আসছে

দ্রাসের সেই একটা রাত আমাদের দলের কাছে খুব ত্রাসেই কাটে সেনাদের কষ্ট দেখে, যা চিরকাল দেশের মানুষের কাছে অজানাই থেকে যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়ে রাশিয়ার সাইবেরিয়ার ভার্গনস্কে। ঠিক তার পরের দ্বিতীয় স্থানটা হল ভারতের দ্রাসে। ঐ ঠান্ডার মধ্যে সেনাবাহিনীর কাজের প্রতিটা মুহূর্ত কত কষ্টের সেটা না দেখলে হৃদয়ঙ্গম করা অসম্ভব। খোলা আকাশের নীচে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সারা রাত ক্রস মার্চিং ডিউটি, একদিন নয় লাগাতার দিনের পর দিন চলতেই থাকে। দ্রাস থেকে বুথখারবুর পথে কোনো এক জায়গায় কনভয় থেমে যায়। আমাদের পথের বাঁদিকের যে গিরিশিরা তার অপর প্রান্তে পাকিস্তানের সীমানা। ভারতীয় সেনাদের এই অঞ্চলটায় মাটির উপরে কোনো ক্যাম্প নেই। সবই মাটির তলায় বাঙ্কারে থাকার ব্যবস্থা। খারবু থেকে কারগিল হয়ে পরের দিন বিকেলে লাদাখ ট্রানজিটে পৌঁছালাম। কার্গিল অতিক্রম করে লাদাখ ঢোকার দোরগোড়ায় গুরুদুয়ারা। কারগিল থেকে এই গুরুদুয়ারার আগে পর্যন্ত এক লম্বা সমতলভূমি (PLATO), যার উপর দিয়ে চলে গেছে বেশ চওড়া ও লম্বা পাকা রাস্তা। ১৯৬০ সালে ভারত-চিন যুদ্ধের সময় চিন সিয়াচিন হিমবাহ অতিক্রম করে কার্গিল পর্যন্ত এই পাকা সড়ক তৈরি করেছিল, যদিও পরবর্তীকালে এই অঞ্চলসহ সিয়াচিন ভারতের দখলে চলে আসে। এই প্লেটোটা এতটাই লম্বা যে পৃথিবীর এই উচ্চতায় এত বড়ো লম্বা রাস্তা আর কোথাও নেই। লাদাখের ট্রানজিট ক্যাম্পে পৌঁছানোর পরে মেজর জামলকির তত্ত্বাবধানে আমাদের থাকতে হয় এই ক্যাম্প থেকে লে শহর দশ কিলোমিটার পথ। এই মেজর জামলকির অনুমতি নিয়ে পরের দিকে আমরা চলে যাই লে শহরে। কারণ অভিযানের সরকারি অনুমতির সব কিছুই হবে লে শহরে। সব সরকারি অফিস লে শহরেই অবস্থিত। ফৌজি অনুশাসন থেকে বেরিয়ে ঐ শহরে ঢুকতেই অন্য সমস্যা শুরু হয়ে গেল। শহরে প্রায়ই কার্ফু চলতে থাকে, কারণ লাদাখ জম্মু কাশ্মীরের অন্তর্গত, ফলে সব সরকারি অফিসে মুসলিমরাই কাজ করছে, লে-লাদাখের স্থানীয় বৌদ্ধিস্টদের চাকুরি প্রায় নেই বললেই চলে। সেই সমস্যা নিয়ে বৌদ্ধিস্টদের ঐ সময় লাগাতার আন্দোলন চলছিল। সেই আন্দোলন থামাতেই মাঝে মধ্যেই কার্ফু হচ্ছিলঐ কার্ফুর জন্য আমাদের দলের কাজ যাতে ব্যাহত না হয় সেই জন্য ডিএম অফিস থেকে স্পেশাল পারমিশন নেওয়া হয়েছিল। অভিযানে শীতের পোশাকের জন্য J & K ট্যুরিজমকে আগে থেকেই চিঠি দিয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। ঐ চিঠির কপি নিয়ে ডাইরেক্টরের সঙ্গে দেখা করলাম। দরজার বাইরে সোনালি রঙের মেটাল দিয়ে ইংরেজি অক্ষরে লেখা রয়েছে উরগিন লান্ডুপ (URGIN LANDUP) দরজার বাইরে বসে আছেন মাঝবয়সি একজন চাপরাশি। তাঁকে হিন্দিতে জানালাম ডাইরেক্টরের সঙ্গে দেখা করবউনি আমাদের বাইরে দাঁড় করিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। বেরিয়ে এসে বললেন - যান। অনুমতি নিয়ে দলের লিডার এবং ডেপুটি লিডার দুজনেই ঢুকলাম। আমাদের বিস্তারিত সব পরিচয় দিয়ে IMF-এর পারমিশন দেখিয়ে ট্যুরিজমের চিঠির কপিটা ওনার হাতে তুলে দিতেই উনি ভালো করে পড়লেন। তারিখানুযায়ী পুরোনো ফাইলগুলো ভালো করে ঘেঁটে দেখলেন। শ্রীনগর হেডকোয়ার্টার থেকে তখনও ওনার কাছে কোনো ইনস্ট্রাকশন বা চিঠি আসেনি। উরগিন লান্ডুপের ফাইল ঘাঁটার সময় নজরে এল ঘরের মধ্যে একটাই বড়ো ছবি দেয়ালে ঝুলছে, সেটা নেতাজির সৈনিক বেশে ঘোড়ায় চড়ার। রুমটায় সবুজ কার্পেট পাতা। বড়ো সেক্রেটারিয়েট টেবিলের তিন দিকটায় চেয়ার দিয়ে সাজানো। বেশ একটা রুচিসম্পন্ন ঘর এবং মনোরম পরিবেশ। ঘরের সঙ্গে মানানসই তাঁর চেহারা এবং পরিধানও। গায়ের রং খুবই ফরসা পায়ে কালো পালিশ করা লেশ বাঁধা শুপরনে অফ হোয়াইট কালারের প্যান্ট, সঙ্গে হালকা নীল রঙের চেক হাফশার্টটা গুঁজে পরা। উচ্চতাও বেশ ভালো। এক কথায় সৌম্যদর্শন চেহারা। ঘরে অনুমতি নিয়ে ঢুকতেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উলটোদিক থেকে হাতটা বাড়িয়ে আমাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বসতে বললেন। প্রথম সাক্ষাতেই ভদ্রলোকের ব্যবহারে আমরা দুজনাই অভিভূত এক নিরহংকারী মানুষ। উনি হলেন বৌদ্ধিস্ট। বৌদ্ধ ধর্মের মূলমন্ত্র অহংকারকে ত্যাগ করা। শুধু তাই-ই নয়, যখন ফাইল ঘেঁটে দেখলেন শ্রীনগর হেড অফিসের কোনো পারমিশন ওনার ফাইলে আসেনি তখন বললেন, “কিছু তো একটা আপনাদের জন্য করতে হবে।ঐ অচেনা পরিবেশে এই কথা শুনে কিছুটা যেন পায়ের তলায় মাটি ফিরে পেলামনিশ্চয়ই কিছু একটা পজিটিভ রাস্তা আমাদের জন্য উনি ভাববেন। কিছুক্ষণ আমাদের সঙ্গে কথা বলে উরগিন লান্ডুপ যখন জানতে পারলেন আমাদের দল আর্মি ট্রানজিট ক্যাম্পের মাধ্যমেই লে শহরে পৌঁছেছি, সঙ্গে সঙ্গেই উনি বললেন, “আর্মির কোনো অফিসারকে দিয়ে একটা গ্যারান্টার লেটার এনে দিন। ওটা না পেলে তখন অন্য কোনো চিন্তা করব শীতের পোশাক না হলে আমাদের এই অভিযান যে খুব কষ্টকর হয়ে উঠবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একজন লাদাখবাসী হয়েও উনি আমাদের জন্য এইটুকু অনুভব করেছেন, এই কারণে অভিযানের দল ওনার কাছে যথেষ্ট কৃতজ্ঞ থাকবে। একথা কোনোদিন ভুলবার নয়। সেদিনের মতন উরগিন লান্ডুপকে অভিবাদন জানিয়ে আমরা দুজন ওনার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

পরের দিন লে শহর থেকে লিডার ও ডেপুটি লিডার দুজনাই ছুটলাম আর্মি ট্রানজিট ক্যাম্পে মেজর জামলকির সঙ্গে দেখা করতে। প্রায় দশ কিমি রাস্তা দুজনা হেঁটেই চলে গেলাম। এই লাদাখ উপত্যকাকে বলা হয় হিমালয়ের ডেজার্ট বা মরু উপত্যকা। চারিদিকটা পর্বত গিরিশিরা দিয়ে ঘেরা। গাছপালার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। শুধু নদীতটে (RIVER BED) ছোটো ছোটো কিছু সবুজ গাছ প্রকৃতির পানে চেয়ে বেঁচে থাকার শেষ লড়াইটুকু চালিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে শুধু রুক্ষ ও শুষ্ক পাথর আর বালি মাটি। বছরে দুই থকে আড়াই ইঞ্চি বৃষ্টির পরিমাপ। অক্টোবরের শেষের থেকে শুরু হয় বরফ বৃষ্টি ও তুষার পাত। চলে সেই মার্চ মাস পর্যন্ত। পাঁচ মাস এই দেশটা থাকে বরফের চাদরে ঢাকা। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমতল ভূমি থেকে অনেক কম থাকায় বড়ো গাছপালা বিশেষ কিছু নেই, আর যা আছে তার বাড়বাড়ন্ত ভীষণ কম। রুক্ষ ও শুষ্ক মরূদ্যান। দেখেই শ্বাসকষ্ট এমনিতেই শুরু হয়ে যায়। কিন্ত এরই মধ্যে এক অপার সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে। মনটাকে নিমেষেই টেনে নিয়ে যায় মরুভূমির দেশগুলির সেই আরব্য উপন্যাসের কহিনিতে। ভাবনার জগত হাত ধরে টানতে টানতে কখন যেন পার করে দেয় এয়ারপোর্টের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের এই দীর্ঘ পথ। আমাদের দুজনার কথার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে উরগিন লান্ডুপের মুখটা, কারণ তাঁরই পরামর্শে ছুটে আসা এই ট্রানজিট ক্যাম্পে মেজরের কাছে। এই রুক্ষ মাটি ও আবহাওয়ায় একটা মানুষ কতটা অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন আমাদের পাশে দাঁড়াতে ও সাহায্য করতে, হয়তো বৌদ্ধ ধর্মেরই এটা বিশেষ গুণ সময় ও দীর্ঘ পথকে উপেক্ষা করে পৌঁছে যাই আর্মি ট্রানজিট ক্যাম্পে।
মেজর জামলকির সাক্ষাতে সমস্ত বিষয়টা খুলে জানাতেই বললেন, “বসুন, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।প্রথমে জানতে চাইলেন, “এখানে এলেন কীভাবে? পায়ে হেঁটে?” বললাম, “হ্যাঁউনি একটু আশ্চর্য হয়ে উত্তর দিলেন, “আপনাদের কাছে আমাদের ট্রানজিট ক্যাম্পের ল্যান্ড ফোন নাম্বার দেওয়া আছে। একটা ফোন করলেই আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিতাম। আপনাদের এই অভিযানের জন্য একটা গাড়ি সবসময় আলাদা করে রাখা আছে। আপনারা লে শহরের মধ্যে সেটা ব্যবহার করতে চাননি বলেই গাড়িটি ফিরে এসেছে। এখন থেকে যে কোনো কাজে গাড়ি প্রয়োজন হলে একটা ফোন করবেন, গাড়ি চলে যাবে।কথার ফাঁকে অফিস বয় গরম কফি নিয়ে এল। মেজর জামলকি স্টেনোগ্রাফারকে ডেকে গ্যারান্টারের বয়ানে একটা চিঠি বানিয়ে আনতে বললেন। দশ মিনিটের মধ্যে চিঠি হাজির। ঐ অফিসে আমাদের অভিযানের জন্য নতুন একটা ফাইল খোলা হল। চিঠির উপর সরকারি সিল ও মেজরের সিল লাগিয়ে সই করে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ডেকে আমাদের ছেড়ে দিলেন। ঐ গাড়ি নিয়ে সোজা ট্যুরিজম অফিসে পৌঁছে গেলাম। ওখানে লন্ডুপ স্যারকে চিঠিটা দেখানো হল। চিঠিটা দেখে উনি একটু মুচকি হেসে বললেন, “বাঃ, এতেই কাজ হয়ে যাবে। আগামীকাল সকাল দশটায় আসুনআমি আপনাদের শীতের পোশাকগুলি বুঝিয়ে দিয়ে দেব।ঐ গাড়ি আমাদের হোটেলে ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেল ট্রানজিট ক্যাম্পে গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে সবসময় একজন জুনিয়র কমান্ডিং অফিসার থাকেন (JCO) যাবার আগে তিনিও বলে গেলেন, “স্যার, যখনই গাড়ির প্রয়োজন হবে একটা ফোন করে দেবেন।অচেনা আজানা পরিবেশে যে মানুষ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন বা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ওঠেন তারা আলাদা করে নিজেদের পরিচয় রেখে যান। এই বিষয়ে উরগিন লান্ডুপের সঙ্গে মেজর জামলকিও অন্যতম।

মূল অভিযানে বেরোনোর ঠিক পূর্বমুহূর্তেই মেজর জামলকিকে ফোনে গাড়ির প্রয়োজনের কথা জানাতেই বললেন, “ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই গাড়ি হোটেলে পৌঁছে যাবে।দলের সবাই স্যাক গুছিয়ে অপেক্ষা করছি। গাড়ি এলেই সোজা ট্যুরিজম অফিস থেকে শীতবস্ত্র তুলে নিয়ে ঐ গাড়িতেই পৌঁছে যাব আমাদের নির্দিষ্ট স্থানে। সেই স্টোক ভিলেজে, যেখান থেকে শুরু হবে আমাদের অভিযানের পথ চলা। সকাল আটটায় গাড়ি এসে থামল আমাদের হোটেলের দরজায়। উরগিন লান্ডুপের কথানুযায়ী ঠিক সাড়ে নয়টায় আমরা পৌঁছে যাই ট্যুরিজম অফিসে। উনি না আসা পর্যন্ত আমরা গাড়িতেই অপেক্ষা করতে থাকি। আমাদের চরিত্র অনুযায়ী দলের দু-একজন মন্তব্য করতে থাকে, “দেখুন, উরগিন লান্ডুপ দশটায় আসে না বারোটায় আসে!” দশটার ঠিক দশ মিনিট আগেই উনি অফিসের দরজার সামনে হাজির হলেন। আমরাও একে একে ওনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিজেই বলতে লাগলেন, “অভিতক অফিস খুলা নহি!” এর মানে প্রত্যেক দিন যে এই সময় অফিসটা খুলে যায় সেটা বোঝা গেল। অফিসের অন্যান্য কর্মচারীরাও তখন পৌঁছে গেছেন। অফিস খুলতে দেরি হচ্ছে দেখে ওনার বিরক্তি প্রকাশের ভাবটা আরও বেড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজনকে নির্দেশ দিলেন পাশের একটা জায়গা থেকে একটা হাতুড়ি আর একটা হ্যাক-শ ব্লেড নিয়ে আসার জন্য। তিনি দৌড়ে গিয়ে লোহা কাটা করাত ও একটা হাতুড়ি নিয়ে চলে এলেন লান্ডুপ নিজে হাতেই তালার কিছু অংশ কেটেই হাতুড়ি দিয়ে ঘা মারতেই তালাটা ভেঙে গেল। ততক্ষণে চাবির কেয়ারটেকার ভদ্রলোক চলে এসেছেন। তখন ঘড়িতে দশটা বেজে পাঁচ মিনিট হয়েছে। ডিরেক্টরের ঐ কাজ দেখে বাইরে দাঁড়ানো সকল কর্মচারী নিমেষেই ভয়ে যেন চুপসে গেলেন। ভয়ে সকলেই তটস্থ, কারও মুখে কোনো কথা নেই। দরজা খুলে সবার আগে দ্রুতগতিতে দোতলায় উঠে নিজের চেম্বারে ঢুকে চেয়ারে বসেই বেল বাজাতেই একজন দৌড়ে এলেন। তাকে দিয়ে স্টোর ম্যানকে ডেকে পাঠালেন। লজ্জিত মুখে ততক্ষণে আমাদের চেয়ারে বসিয়ে সামান্য পাঁচ মিনিট দেরি হওয়ার জন্য ক্ষমা চাইলেন। যার কাছে অফিসের চাবি ছিল তাকেও ডেকে পাঠালেন। তিনি ডিরেক্টরের চেম্বারে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বলে দিলেন হাজিরা খাতায় সই না করতে এবং স্টেনোকে চাবি বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে যেতে বললেন। মাথা নিচু করে ভদ্রলোক কথা শুনে ভয়ে আস্তে করে বেরিয়ে গেলেন। পাঁচ মিনিট দেরির জন্য এমন ঘটনা হতে পারে, এটা দেখে বিষয়টা আমাদের খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। স্টোরকিপার আসতেই আমাদের দশ পিস জ্যাকেট রেডি করে ওনাকে জানাতে বললেন। ততক্ষণে আমাদের সকলের জন্য টেবিলে কফিও এসে গেছে। আমরা কফি পান করতে করতেই স্টোরকিপার খবর দিয়ে গেলেন - স্যার জ্যাকেট সব রেডি। লান্ডুপ বললেন, “একটু অপেক্ষা করুন, আসছি। এই কফি পানের ফাঁকে উনি আমাদের অভিযানের বিষয় নিয়ে খুব আগ্রহের সঙ্গে খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করছিলেন। ঠিক সেই সময়ে একটু সাহস করে খুবই বিনয়ের সঙ্গে লান্ডুপজিকে অনুরোধ করলাম, “স্যার, আমাদের একটা আবেদন আছে সমস্ত দলের পক্ষ থেকে।উনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন। মনের মধ্যে ভয় থাকলেও নির্দ্বিধায় বললাম, “আজকে অফিসের তালা ভেঙে দরজা খোলার ঘটনায় চাবির কেয়ারটেকারকে ক্ষমা করে দিন।শুনে একটু মুচকি হাসলেন। উনি আমাদের কোনো অসম্মান না করেই খুব বিনয়ের সঙ্গে বুঝিয়ে কিছু কথা বললেন, যে কথাগুলি শুনে আমাদের দলের অমর্যাদা হওয়া তো দূরের কথা, সকলেই খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম সেই দিন।
উরগিন লান্ডুপ শুরু করলেন, আমায় ক্ষমা করবেন আপনারা। এই চেয়ারে বসে আমি কোনো অধর্ম করতে পারি না। আর ব্যক্তিজীবনেও আমি কোনো অধর্ম করি না। সকলেই ওনার মুখের দিকে চেয়ে ভাবলাম এই ঘটনার সঙ্গে ধর্মের কী সম্পর্ক আছে! আসলে ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি তা হল ঈশ্বরকে মানা না মানা, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু সংস্কার বা নিদান। উনি ধর্মের যে সংজ্ঞা আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করে বোঝালেন তা হল সঠিক কর্ম করা। সময়ের কাজ সময়ের মধ্যেই করা। সেই সময়কে লক্ষ্য স্থির করে সতর্ক থাকা। এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যাতে অন্যের কোনো সময় নষ্ট হয়ে যায়। এর সঙ্গে সৎ চিন্তা সৎ আদর্শ অবশ্যই থাকা উচিত, যাতে অফিসের অন্যের কোনো কাজকর্ম ব্যাহত না হয়। আজ যদি ওনাকে ক্ষমার চোখে দেখা হয় তাহলে আগামি দিনে কেউ দেরি করে অফিসে ঢুকলে তাকেও ক্ষমা করতে হবে, না করলেই বিতর্কে জড়িয়ে যেতে হবে এবং অফিসের কাজকর্মের প্রতি কর্মীরা অশ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে। সেই সঙ্গে আমিও অসৎ চিন্তার সঙ্গী হয়ে উঠব কোনো অন্যায় বা কোনো অনিয়মকে সমর্থন করার অর্থ হল নিজেকেই অপরাধী তৈরি করা। অল্প পরিসরে এই ছোট্ট বিষয়টা এমনভাবে ব্যক্ত করলেন যে সমস্ত পৃথিবীটাই ধর্মের নির্ঘণ্টের উপর চলছে। যেখানেই বিচ্যুতি সেখানেই স্খলন। ধর্ম বলতে উনি যেটা বোঝালেন, সৎ চিন্তা দ্বারা কর্মের নিষ্ঠা। এরপর এও বোঝালেন, “আপনারা সুদূর কলকাতা থেকে এসেছেন। আজ যদি আমি এবং আমার অফিস আপনাদের সঠিক সাহায্য না করতে পারি এবং আপনাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে আমার কাজের মধ্যে ত্রুটি থেকে যাবে। আর সেই ত্রুটির জন্য অভিযানে ঠান্ডায় যদি কোনো প্রাণহানি ঘটে, আমি কি সেই দায় এড়াতে পারি? আপনারা লাদাখের ট্যুরিজম সম্বন্ধে কী ধারণা নিয়ে কলকাতায় ফিরে যাবেন?” খুবই বড়ো এক প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম সকলেই। কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, “চলুন, আপনাদের জ্যাকেটগুলি বুঝিয়ে দেই। গটগট করে আগে আগে বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে। আমরা সকলেই ওনার পিছনে। আমাদের অপেক্ষায় স্টোরকিপার সব রেডি করে দাঁড়িয়ে আছেন। স্টোরে ঢুকেই উরগিন লান্ডুপ নিজে হাতে একটা একটা করে দশটা জ্যাকেটই নিরীক্ষণ করলেন। এবার আমরা সব জ্যাকেটগুলি এক এক করে বুঝে নিলাম। মালগুলি বুঝিয়ে দেওয়ার পর উনি আমাদের কাছে একটা অনুরোধ করলেন, “একদম নতুন মাল সিল ভেঙে আপনাদের দেওয়া হল, একটু সাবধানে ব্যবহার করবেন। নোংরা হলে অসুবিধা নেই, পরিষ্কার করে নেওয়া যাবে, কিন্তু অন্যভাবে যেন ক্ষতি না হয়, কারণ এর পরে এই জ্যাকেটগুলি ব্যবহারের জন্য অন্যদেরও দিতে হবে। সরকারি জিনিস হলেও একজন আধিকারিকের যে যথেষ্ট দায়িত্ব থেকে যায় এটাই তার প্রমাণ। মাল বুঝিয়ে দেওয়ার পরেও গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে এসে আমাদের অভিযানের শুভেচ্ছা কামনা করে বিদায় জানিয়ে গেলেন।

অভিযান সফল করে পুনরায় ট্যুরিজম অফিসে উরগিন লান্ডুপের কাছে যেতে হয়েছিল জ্যাকেটগুলি ফেরত দেবার জন্য। সেদিনও যথেষ্ট আপ্যায়ন করে কফি পান করিয়েছিলেন। তখনই জানতে পারি, চাবির কেয়ারটেকারকে শো কজ করে চিঠি দিয়েছেন ঐ দিনের বিলম্বের কারণ জানতে চেয়ে। শেষ সময়ে ভদ্রলোক যেচেই আমাদের আরও একটা সাহায্য করেছিলেন। ওনার অফিস থেকেই মেজর জামলকিকে ফোন করতে চেয়েছিলাম দুটি কারণে প্রথম কারণ হল অভিযানের দল নিরাপদে লে শহরে ফিরে এসেছে এবং অভিযান সফল হয়েছে এই খবর দেওয়া, দ্বিতীয়ত ট্রানজিটে ফিরতে আমাদের গাড়ি লাগবে সে অনুরোধ করাকিছুতেই ফোনে যোগাযোগ হচ্ছিল না। উনি জানতে চাইলেন, “তাহলে আপনারা ট্রানজিটে ফিরবেন কী করে?” জানালাম, “আগামীকাল পায়ে হেঁটে লিডার এবং ডেপুটি লিডার দুজনেই পৌঁছে যাব ট্রানজিটে মেজর জামলকিকে অভিযানের সুখবরটা পৌঁছে দিতে। তখনই গাড়ির কথাটা সেরে নেব।সব কথা শুনে বললেন, “আগামীকাল সকাল সাড়ে দশটায় আমার গাড়িটা নিয়ে ট্রানজিট ক্যাম্পে চলে যাবেন। পরের দিন আমরা দুজনে ওনার গাড়িতেই ট্রানজিট ক্যাম্পে যাই এবং লে শহরে ফিরে আসি।

পৃথিবীর যে কোনো দেশে ও পরিবেশে মানুষ নিরন্তর ভালোকেই খুঁজতে থাকে। সেই কারণেই অন্তর্নিহিত সৃষ্টি এবং সুখ দুই লুকিয়ে থাকে তারই মধ্যে। খারাপ কর্মকে কখনও কেউই মেনে নিতে চায় না, কারণ সুকাজের যে সম্মান ও ভালোবাসা সে শুধু মানুষকেই এগিয়ে নিয়ে যায় না, সে এগিয়ে নিয়ে যায় একটা জাতি, একটা সমাজ ও সময়কেও। পৃথিবীতে যা শাশ্বত তা অনাদিকাল ধরেই রয়ে যায়, সে কখনও মলিনতার অক্টোপাসে বাঁধা পড়ে না। প্রকৃতির ধর্ম, জীবজগতের ধর্ম নিজ নিজ কর্মসূত্রেই আবদ্ধ। ধর্ম কোনো আবেগতাড়িত কুসংস্কার ও সংস্কার নয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ কিন্তু সেখানেই পড়ে আছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী একজন মানুষ কর্মের নিষ্ঠা দিয়েই তার ধর্ম ও জাত চিনিয়েছে। সে কোনো বিশেষ পরিধান বা গুম্ফায় আবদ্ধ নয়। তার সেইদিনের ন্যায়পরায়ণ কর্মনিষ্ঠা আজও দৃষ্টান্তস্থাপনের জন্য প্রায়ই হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় লে শহরের সেই ছোট্ট ঘরটায় আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে উরগিন লান্ডুপের সেই কাজ ও তার সঙ্গে ভেসে আসে ওর সৌম্যদর্শন অম্লান অবয়ব। দীর্ঘ তিন দশক ধরে আমার হৃদয় কুর্নিশ করে চলেছে ঐ মানুষটাকেই। আজও তাই চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে উরগিন লান্ডুপ আর তার ঘরের দেয়ালে মাথার উপর টাঙানো নেতাজীর ছবিটা, যিনি কর্তব্যপরায়ণ একজন নিষ্ঠাবান মানুষের দৃষ্টান্তস্বরূপ, যুগের প্রতীক হয়ে একটা সভ্যতা, সমাজ, সময় ও জাতিকে আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন
----------
শীর্ষচিত্র - লে শহর ২০২২, ফোটো - তাপস মৌলিক

ভ্রমণ:: সম্রাটের গ্রীষ্মাবাস - অমিয় আদক

সম্রাটের গ্রীষ্মাবাস
অমিয় আদক

প্যারিস মহানগরের কুর্‌বেভোয়া মূলত বাণিজ্যিক এলাকা কুর্বেভোয়ার পার্ক দ্যু মিলেনিয়ার বসতি এলাকাএখানে অনেক ছোটো বড়ো মাঝারি পার্ক বসতি এলাকায় বহুতলগুলির লাগোয়া রাস্তাগুলিও বেশ শোভন সেই সব রাস্তার পাশে, বাঁকে বাঁকে পার্কের শোভা পার্কগুলির অর্ধেকের বেশি শিশু এবং মায়েদের জন্য সংরক্ষিত বহু সংখ্যক পার্কের শোভায় ভূষিত এলাকার নাম পার্ক দ্যু মিলেনিয়ার সেখানেই দশতলা অট্টালিকার সাততলায় পুত্রের আস্তানা।
পার্ক দ্যু মিলেনিয়ার থেকে বেরিয়ে পড়ি আমরা চারজন শীত-পোশাকের মোড়কে শরীর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা না হলেও, বেশ ঠান্ডা বলাটাই সঙ্গত পিঠের ব্যাগে লাঞ্চপ্যাক, ক্যামেরা, ডায়েরি হেঁটে পৌঁছাই লাদেফঁন্স স্টেশনসময় সকাল সাড়ে সাতটা। সেখান থেকে ট্রেনে কয়েক মিনিটেই হাজির গার্দেনিয়ার ষ্টেশন।
গার্দেনিয়ার থেকে আমাদের ট্রেন ছোটে মেলোঁ-র (Melun) পথে প্যারিস মহানগরের উচ্চ অট্টালিকার বাহার পেরোই সিন নদীর সেতু পেরিয়ে ট্রেন এগিয়ে চলে প্যারিস মহানগরের সীমানা পেরোই ট্রেনের অভিমুখ দক্ষিণ-পূর্বে। উৎসুক চোখদুটো ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখায় ব্যস্ত গ্রামীণ ফ্রান্সের চেহারা তেমন নজরে আসে না রেল লাইনের দু’পাশে বিশ্বকর্মার সাম্রাজ্য ছোটো, বড়ো, মাঝারি শিল্প-কারখানামাঝে মাঝে কিছু ফসলের খেত
অনেক খেতেই অর্ধশুষ্ক ভুট্টাগাছগ্রামীণ ফ্রান্সের চাষের খেতগুলো প্রায় এক কিমি লম্বা। চওড়াতেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাত-আটশো মিটার তারা পাকা ফসলের তৃপ্তি মাথায় নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে। কিছু খেত কাটা ফসলের স্মৃতি বুকে নিয়ে বিমর্ষ। বেশ কিছু খেতে পরবর্তী ফসলের প্রস্তুতি প্রায় সারা সেইসব জমিতে ট্রাকটরের সমান্তরাল কর্ষণরেখা দেখে অবাক সমান্তরাল কর্ষণ রেখারা যেন অনেক দূরে দিগন্তে হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টায়সেই সব খেতের মাঝেই স্থায়ী গাছপালায় শোভিত ফার্ম-হাউস
মাঝে মাঝে ছিটেফোঁটা গ্রামীণ ফ্রান্সের চেহারা বিচ্ছিন্ন বনভূমি রেল লাইনের দু’পাশেই তারা যেন নিপুণ শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা ছবি তারা অনবরত পিছনে সরে যায় শরতের আকাশে ছেঁড়া সাদা মেঘেদের অলস আনাগোনা এইসব দেখতে দেখতে আমাদের বাহন ট্রেন হাজির মেলোঁ স্টেশনে। ট্রেন থেকে নামি
বেশ ছিমছাম স্টেশন। প্ল্যাটফর্মে যাত্রীর ভিড় অনুপস্থিত। স্টেশন এবং প্ল্যাটফর্মের অঙ্গসজ্জা বেশ দৃষ্টিনন্দন স্টেশন সংলগ্ন বাহারি ফুলের বাগিচা সত্যই দৃষ্টিনন্দন স্টেশনের বাইরে বের হওয়ার রাস্তাও ফুলের বাহারে সেজে আছে আধা শহরের স্টেশন সারা স্টেশন জুড়ে মনকাড়া পরিচ্ছন্নতা সেখানে পরিচ্ছন্নতা শুচিতা রক্ষার বিজ্ঞাপন অনুপস্থিত শুচিতার বিজ্ঞাপন না থেকেও, শুচিতা লেপটে তার সারা অঙ্গে। মেলোঁ শহরটিও তার স্টেশনের মতোই সুন্দরীসে নিঃশব্দে সাদর আহ্বান জানায় আমাদের
স্টেশনের গেট পেরিয়ে বাইরে যাই দু’শো মিটার দূরেই বাসস্ট্যান্ড। স্টেশনের বাইরে পথ নির্দেশ তেমনটাই হেঁটেই হাজির বাসস্ট্যান্ডে। মোহিনী গড়নের একটি বাস থামে বাস থামে মৃদু-মিষ্টি ব্রেক চাপার আওয়াজ দিয়ে। আমরা এবং আমাদের মতো আরও কয়েকজন যাত্রী বাসের উদরে প্রবেশ করেন
কী সুন্দর বাসের অভ্যন্তর! এমন পরিচ্ছন্ন সুদৃশ্য বাস অবশ্য প্যারিসেও। বসার সিটটা পাই জানালার পাশেই তাই মনের ভিতর খুশির জলতরঙ্গশ’তিনেক মিটার গিয়েই সামনে ত্রিপথের সঙ্গম ত্রিসঙ্গমের বামদিকের বাঁকে আমাদের বাহন অভিমুখ বদলায়আমাদের বাহন মেলোঁ শহরের মায়া কাটাতে আগায় সেই বাঁকেই ফন্টেনব্লুর দিকে প্রধান সড়কে দ্রুতগতিতে ছুটতে থাকে বাসটি আমাদের দেশের দ্রুতগামী বাসের চেয়েও অনেক বেশি দ্রুততায়
বাহন মেলোঁ নগর সীমানা ছাড়ায় প্রবেশ করে প্রকৃতির অরণ্য রাজত্বে। দু’পাশে কেবল মধ্যম ঘনত্বের অরণ্যভূমি। প্রবীণ মহীরূহদের ছায়ার আলপনায় প্রায় ঢাকা বিস্তৃত রাজপথ। পাতা ঝরার শঙ্কায় বেশিরভাগ পর্নমোচিদের শরীরে হলুদ বিষণ্ণতা। পথে পিষ্ট অঢেল ঝরে পড়া পাতা তাদের হালকা বাদামি অবশেষ সামান্য ওড়ে শরৎ বাতাসে
ফ্রান্সের শরৎ পাতা ঝরানোর ঋতু। তার মাঝেও হরিৎ সমারোহের অভাব নেইপথের দু’পাশেই মাঝারি ঘনত্বের অরণ্যের বিস্তারপ্রবীণ পাদপেরা শরৎ বাতাসের ঝিরিঝিরি শব্দ শোনায় দাঁড়িয়ে তারা যেন ফিসফিস করে কাছে দূরে। প্রশস্ত রাজপথের উপর ছড়িয়ে অঢেল মনমরা হলুদ, ঈষৎ বাদামি রঙের পাতা।
আমরা হাজির ‘ফনটেনব্লু’-তে (Fontainebleau) বাসের উদর মুক্ত অদূরেই নজরে আসে অতীতের গ্রীষ্মাবাস-প্রাসাদ সেই বিশাল প্রাসাদ এবং সংলগ্ন বাগিচা সমূহ, মিউজিয়াম ইত্যাদি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পর্যটনক্ষেত্র ফরাসী সরকার এই পর্যটন দপ্তরের দায়িত্বে ফন্টেনব্লু তার নিকটবর্তী বনভূমির সৌন্দর্যের জন্যও বিখ্যাত। একসময় এই বনভূমিকে রাজপুরুষগণ প্রমোদ শিকারের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন। বর্তমান বনভূমি প্রায় আগের পরিসরেই বর্তমানঘাটতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য নয়। বনভূমির বুক চিরেই প্রায় সোজা প্রশস্ত রাজপথ।

ইংলিশ গার্ডেন

বেলি অ ফাউনটেন (ইংলিশ গার্ডেন)

আমরা এগিয়ে চলি পায়ে পায়ে রাজপ্রাসাদের দিকে। রাজপ্রাসাদের আগেই দি ইংলিশ গার্ডেন। মনোরম, অতি পরিছন্ন, সুবিন্যস্ত উদ্যান। শিল্পীর নিপুণ তুলিতে আঁকা ছবির মতোই অনুপম সুষমা। সবুজ ঘাসের মখমলের উপরেই হাঁটাপথগাছের শাখা প্রশাখায় অজ্ঞাতনামা পাখিদের মিষ্টি ডাক সামান্য শব্দিত পরিবেশ। চলমান তাদের চঞ্চল ডানার ওড়াউড়ি। এইসব দেখতে দেখতেই হাঁটা বা হাঁটতে হাঁটতেই দেখা সবুজের সমারোহপরেই পাই পাথর বাঁধানো পথতার দু’পাশে যত্নে লালিত সবুজ ঘাসের মখমল
দি ইংলিশ গার্ডেন মূলত পাইন, ফার, উইলো, উইপিং উইলো ইত্যাদি গাছের সুরম্য উদ্যান। তার কেন্দ্রীয় অংশে বেলি-অ (Belle-Eau) ফাউনটেন। বেলি-অ ফাউনটেনের সামনে কয়েকটা ছবি ওঠেদি ইংলিশ গার্ডেনের পাথর বাঁধানো পথ হাঁটতে হাঁটতে দেখি প্রকৃতির অসীম রূপবৈভবকে
গাইড জানালেন, দি ইংলিশ গার্ডেনের পূর্বনাম পাইন গার্ডেন। তখন সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিসের আমল। পাইন গার্ডেনের মতন আরও অনেকগুলি ছোটো ছোটো বাগিচাকে একত্রিত করেন সম্রাট চতুর্দশ লুই। একত্রিত বাগিচার নামকরণ করেন দি ইংলিশ গার্ডেন। অনেক বিশেষ প্রজাতির গাছে বাগিচাটি সজ্জিত করার ব্যবস্থা করেনপরবর্তীকালে এই বাগিচা আরও সমৃদ্ধির সুবাস পায়তখন সম্রাট প্রথম নেপোলিয়নের রাজত্বকাল। তাঁরই উদ্যোগে বাগিচা স্থপতি হার্টঅল্ট বাগানটির সৌন্দর্য্যায়ন ঘটাননেপোলিয়ানের পছন্দের অনেক গাছ বাগিচায় জায়গা দখল করে
সেই বাগানে গাছের ছায়ামাখা পাথর বাঁধানো পথ সেই পথেই হেঁটে এগিয়ে যাই বেশ খানিক সময় কাটেপ্রকৃতির অনুপম বাহার দেখায় পরিতৃপ্ত দুই চোখ বাগিচার সব গাছে চিকন সবুজের সমারোহ অনুপস্থিতআগত শরতে অনেক গাছের পাতায় শঙ্কার হলুদ বিষণ্ণতা। পেয়েছে পাতা ঝরানোর খবর তাতেও সেই বাগিচার প্রাকৃতিক রূপভাণ্ডারে তেমন ঘাটতি নেইসবুজ, হলুদ, হালকা বাদামি রং-এর অঢেল আয়োজন সারা বাগিচায়।

দি ক্যুইনস ফাউনটেন (গ্র্যান্ড পার্টেরি)

রাজপ্রাসাদের পিছনের দৃশ্য

কার্প পন্ড

হেঁটে চলি পূর্ব মুখে। রাজবাড়ির পিছনের পথে। দক্ষিণ অভিমুখী রাস্তায় গিয়ে পাই একটা সংযোগকারী সেতু। সেই সেতু প্রাসাদের দুটি অংশের সংযোজকসেতুর অর্ধবৃত্তাকার আর্চের নিচে দাঁড়িয়ে নাতনি রাই আবিষ্কার করে প্রতিধ্বনির আনন্দ। আমরাও অনুভব করি একটানা ত্রিশ সেকেন্ড ‘হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো’ শব্দের ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া মিষ্টি অনুরণন।
আমরা হাজির রাজকীয় পুষ্প বাগিচায়। সেটির পরিমাপ আশি একরের বেশি। বাগিচার বিশালত্বের জন্যই নাম দি গ্র্যান্ড পার্টেরি। সম্পূর্ণ ফরাসি বাগিচা-বিন্যাসেই রূপায়িত বাগিচার অন্দরে জ্যামিতিক ক্ষেত্রগুলির বিন্যাসে তাই প্রমাণিতসম্রাট ষোড়শ লুইয়ের বাগিচা বিশারদ লে নোট্রে এই বাগিচার স্থপতি এবং রূপকারবাইরের বোর্ডে সেটাই বিজ্ঞাপিত
বাগিচার পূর্বদিকে একটি চতুর্ভুজাকৃতি জলাশয়। সেই জলাশয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত দি কুইন’স ফাউনটেননিরন্তর ঢেলেই চলে জলের ধারা এই বাগিচার পরে একটি সংকীর্ণ খালপথ। সেটি সম্রাট চতুর্থ হেনরির আমলে নির্মিতএই বাগিচার উত্তর এবং পশ্চিম দিকের পথগুলি তুলনায় উঁচু এবং বিস্তৃতপথের দুপাশে সারিবদ্ধ চিনার জাতীয় বাহারি পাতার গাছ। সেইসব পাদপছায়ার নিচেই দর্শনার্থীদের বসার কংক্রিটের বেঞ্চ বেঞ্চগুলির দূরত্ব আনুমানিক পাঁচ মিটার
তেমনই এক বেঞ্চে বসি রূপসী বাগানের রূপকে আমার পিপাসিত দু’চোখ পান করতে থাকে ক্যামেরাবন্দি করি বাগিচার কিছু অংশের সৌন্দর্যকে লোভ সামলাতে পারি নাহেঁটে এগিয়ে যাই গ্র্যান্ড পার্টেরির কিনারায়বিনা অনুমতিতেই প্রবিষ্ট বাগিচার অন্দরে। ফুল এবং ফুল গাছের সৌন্দর্য, বাগিচা খণ্ডের জ্যামিতিক বিন্যাস বৈভব চাক্ষুষ করে সত্যিই বিস্মিত
এই বাগিচার পশ্চিমে বিশাল কার্প-পন্ড। কার্প-পন্ডের পাড়ে গাছের ছায়ায় বসি তার স্বচ্ছ গভীর নীলাভ জলে বড়ো চেহারার মাছেদের আনন্দ সন্তরণ রাজপরিবার এই পুকুরের মাছ খেতেন কিনা, তা জানার সুযোগ নেইঅনেকেই মাছেদের, হাঁস, রাজহাঁসদের খাবার দিতে ব্যস্ত তাঁদের দেখাদেখি নাতনি রাই যায় কিছু খাবার নিয়ে। রাজহাঁসদের ডেকে ডেকে আদর করে খাবার দেয়সেই ঘটনার ছবিও ওঠে
এই দৃশ্য বড়োদের কাছেও সমান উপভোগ্য। সেজন্যই পুকুরের জলের সীমানার কাছাকাছি ছোটোদের সঙ্গেই ঘুরতে থাকি রাই-এর খাবার খাওয়ানো শেষ হতেই চায় না হাঁসেদের খাবার দেওয়ার আনন্দ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে একান্তই অরাজি প্রায় জোর করেই তাকে কার্প-পন্ডের পাড় থেকে ফিরিয়ে আনি
এবার উদর পূরণের পালা। মাথার উপর দি ইংলিশ গার্ডেনের পাদপ ছায়া। পায়ের নিচে পুরু কার্পেট সবুজ ঘাস। মৃদু তাপের রোদ সেথায় পৌঁছায় না শুকায়নি শিশিরের আর্দ্রতা। সেই সবুজ মখমলে সামান্য ভিজে ভাব। তার উপরেই পা ছড়িয়ে বসিকোলের উপর টিসু পেপার। তার উপরে পেপার প্লেট। পরোটা, আলুভাজি, ডিমের মশলা কারি পরিবেশিত লম্বা হাঁটাহাঁটির জমাটি খিদে। তাড়াতাড়িই খাদ্য বস্তুসমূহ উদরে প্রবিষ্ট সেখানেই মিনিট দশেকের বিশ্রাম। তারপরেই প্রবেশের পালা রাজবাড়ির অভ্যন্তরে, একাধিক মিউজিয়ামে ফরাসি ইতিহাসের ডেরায়
ফন্টেনব্লু’-এর সংক্ষিপ্ত অতীত জানাই পাঠকদের জন্য এই সংক্ষিপ্ত অতীত আহরণ করি মিউজিয়ামে প্রদত্ত বুকলেট থেকে এই গ্রীষ্মাবাস তৈরি সম্রাট সপ্তম লুইয়ের আমলে। সময়কাল দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগ। সম্রাট প্রথম ফ্রন্সিস পনেরোশো আটাশ খ্রিস্টাব্দে এই প্রাসাদের সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেন। তিনি ইতালীয় স্থাপত্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে গোল্ডেন গেট তৈরি করানসেটির অবস্থান ডিম্বাকার চত্বরের প্রবেশপথে। ডিম্বাকার চত্বরের চারদিকেই সম্রাট এবং রাজপরিবারের পরিজনদের নিমিত্ত সমস্ত কক্ষগুলি নির্মিত বলরুম অংশটি সম্পূর্ণ সম্রাট দ্বিতীয় হেনরির আমলে।
বেলি চেমিনি কক্ষসারি এবং তার সংলগ্ন রাজকীয় ইতালিয়ান সিঁড়ি সত্যই দর্শনীয়। এই প্রাসাদের কিছু অংশের গঠনশৈলীতে ফরাসি স্থাপত্যে ইতালিয়ান রেনেসাঁর প্রভাব পরিষ্কার। সপ্তদশ শতকে সম্রাট চতুর্থ হেনরির প্রচেষ্টায় এই প্রাসাদের বিশালত্ব বৃদ্ধি পায় তাঁর আমলে প্রাসাদে গির্জাও স্থাপিত। সেই গির্জায় ত্রয়োদশ লুইয়ের ব্যাপটিজম ঘটে চতুর্থ হেনরির আমলেই স্থাপিত ডায়ানা গ্যালারি, স্ট্যাগ গ্যালারি, অ্যাভিয়ারি এবং জিউ দ্য পুমে কোর্ট।

রট আয়রন গেট

অষ্টাদশ শতকে সম্রাট পঞ্চদশ লুইয়ের আমলে আগের ইউলিসিস গ্যালারির সংস্কার ঘটে স্থপতি গ্র্যাব্রিয়েলের সহায়তায় নির্মিত হয় বিরাট প্যাভেলিয়ান ফরাসি বিপ্লবের পর এই প্রাসাদ সাময়িক পরিত্যক্ত। সম্রাট নেপোলিয়ান এই গ্রীষ্মাবাসকে রাজকীয় আবাসে পরিণত করেন। তাঁর আমলেই রট আয়রন গেট তৈরি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ানের আমলে এই বিশাল প্রাসাদের আভ্যন্তরীণ বিন্যাসে লাগে ব্যাপক শিল্পের ছোঁয়া।
মিউজিয়াম বিষয়ে খোঁজ নিই ইনফরমেশন অফিসে। একটা খুশির বিষয় জানতে পারি, মিউজিয়ামের কোনো প্রবেশমূল্য লাগে না। ক্যামেরা নিয়ে মিউজিয়ামে প্রবেশে বাধা নেই। সঙ্গে ব্যাগ থাকা নিষেধ। সেগুলি রাখার ব্যবস্থা বিনা ভাড়ার ভল্ট পাওয়া যায়চাবি নিজেদের কাছেই রাখা যায়। কেবল বিশেষ সিকিউরিটি চেকিং করেই রাজপ্রাসাদের মিউজিয়ামে প্রবেশের অনুমতি মেলেআমি এবং আমার স্ত্রী বিদেশি পর্যটক হিসাবে পাসপোর্টের প্রতিলিপি জমা দিয়ে সিকিউরিটি চেকিং-এর সুযোগ পাই
সিকিউরিটি চেকিং সমাপ্ত। হাতে মিউজিয়ামের প্রতিটি প্রধান অংশের নন স্কেলড্‌ ম্যাপসমেত বুকলেটতাতেই সূচিত ফন্টেনব্লুর সংক্ষিপ্ত অতীত, প্রধান দর্শনীয় বস্তুর ধরন এবং মিউজিয়ামগুলির অবস্থান প্রদর্শনীর প্রথম অংশ নেপোলিয়ন মিউজিয়াম। দ্বিতীয় অংশ দি পোপ’স অ্যাপার্টমেন্ট। তৃতীয় অংশ দি গ্রেট অ্যাপার্টমেন্ট। চতুর্থ দ্রষ্টব্য চাইনিজ মিউজিয়াম। প্রথম তিনটি দ্রষ্টব্য রাজপ্রাসাদের দ্বিতলে শেষ দ্রষ্টব্যের অবস্থান নিচের তলায়

দি পোপ্ অ্যাপার্টমেন্টের করিডর

কোর্ট এবং মন্ত্রণালয়

সিঁড়ি দিয়ে উপরে যাই প্রথমেই প্রবিষ্ট নেপোলিয়ান মিউজিয়ামে। সে এক বিশাল পোর্টেডের রাজত্ব। গ্যালারিতে সাজানো প্রথম নেপোলিয়ান বা নেপোলিয়ান বোনাপার্ট এবং তাঁর পূর্বপুরুষদের, তাঁর উত্তরসূরিদের পরিবার ও পরিজনদের ছবি। ছবিগুলি অবশ্যই ফ্রান্সের মহান শিল্পীদের অমূল্য সৃজন। সেই শিল্পসম্ভারের সামনে দাঁড়িয়ে অজ্ঞাত মহান শিল্পীদের প্রতি অন্তর শ্রদ্ধানত হতে বাধ্য। বিস্ময়াভিভূত অবস্থায় ধীর পায়ে এগিয়ে চলিগ্যালারির শেষে রাজপরিবারের ব্যবহৃত আসবাবপত্রের বিন্যাসেও পাই অপার মুগ্ধতা। বিস্ময় যেন সীমাহীন
গ্যালারির দ্বিতীয় অংশ দি পোপ’স অ্যাপার্টমেন্টএখানের একটি কক্ষে আঠারোশো চার খ্রিষ্টাব্দে পোপ সপ্তম পায়াস থাকেন কদিন সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের রাজ্যাভিষেকের জন্য প্যারিস যাওয়ার পথে তৎকালীন এই গ্রীষ্মাবাসে কদিনের অতিথিসেই থেকেই রাজপ্রাসাদের এই অংশের নাম দি পোপ’স অ্যাপার্টমেন্ট।
প্রকৃতপক্ষে এই অংশের কক্ষগুলি রানি মায়েদের জন্য সেই কক্ষগুলির শিল্পমাধুর্য অনুপম। প্রতিটি কক্ষের সিলিং এবং দেয়ালের সঙ্গে মেঝে, আসবাবপত্রের বিন্যাস প্রতিটি দর্শককে অবাক করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। নিজের চোখে দেখাকে তো অবিশ্বাস করতে পারি না। অস্বীকার করার উপায় নেই, ফরাসি শিল্পকলা তার আপন সুষমার কারণেই বিশ্ববরেণ্য
সর্বশেষ অংশ দি গ্রেট অ্যাপার্টমেন্ট। এই অংশে রাজাদের কক্ষগুলিকে আগের মতোই সাজানো। চোখে দেখা সৌন্দর্য্য ভাষায় প্রকাশ করা একান্তই অসম্ভব। প্রতিটি কক্ষের সিলিং আর্ট অনবদ্য। দেয়ালের উপর কাপড়ে আঁকা চিত্রগুলি আজও অমলিন। কিছু ক্ষেত্রে ফ্রেসকো বা দেয়াল চিত্রও বর্তমান। সেই সব পুরানো চিত্রকলায় ফরাসি শিল্পীদের শিল্প নৈপুণ্যই প্রকাশিতসেগুলির সৌন্দর্য্যসুষমা ভাষায় প্রকাশ করার যোগ্যতা আমার নেই
রাজা এবং রাজপরিবারের পরিজনদের ব্যক্তিগত কক্ষ, বিশ্রামকক্ষ, শয়নকক্ষ, অতিথিদের সাক্ষাতের কক্ষ, রাজার মন্ত্রণাকক্ষ, আরও বিভিন্ন ধরণের প্রয়োজনের কক্ষগুলি অবাক চোখে দেখতে দেখতে এগিয়ে চলিরাজকীয় নাট্যশালা বা থিয়েটার এই গ্যালারির মধ্যেই। দি গ্রেট অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যেই জিউ দ্য পুমে কোর্ট বা রাজকীয় বিচারালয়।
গ্যালারির শেষ অংশে একটা বিশেষ গ্যালারি। সেটির নাম গ্যালারি অফ ডায়ানা। এই গ্যালারির সামনেই একটি বিশাল গ্লোব। গ্লোবটি স্থাপিত আঠারোশো একষট্টি খ্রিষ্টাব্দে। গ্যালারিটি আশি মিটার লম্বা। গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট চতুর্থ হেনরি। সময়কাল সপ্তদশ শতকের প্রথম দশক। রানির অন্য মহিলাদের সঙ্গে প্রমোদনৃত্য এবং ব্যায়াম ইত্যাদির জন্য এই গ্যালারি নির্মিত এবং ব্যবহৃত এই অংশে মৃদু শব্দাবেশ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে নৃত্যের তালবাদ্য। গ্যালারি যন্ত্রসঙ্গীতের মৃদু মূর্ছনায় পরিপূর্ণকেবল নৃত্যরতা সুন্দরীরাই অনুপস্থিত।
এখানে অর্ধবৃত্তাকার সিলিংয়ে চিত্রগুলির সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক বেশিরভাগ চিত্রই যুদ্ধের দেবী ডায়ানার মিথকে অবলম্বনে অঙ্কিত। পরবর্তীকালে সেই সিলিং চিত্রাবলীর দু’পাশে ফরাসি রাজবংশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বয়সের ছবি কালানুক্রমে সজ্জিতসেগুলির মধ্যে সম্রাট নেপোলিয়ান বা প্রথম নেপোলিয়ানের ছবির সংখ্যাই সর্বাধিক সম্রাট ষোড়শ লুই এই গ্যালারিতে কিছু নিওক্ল্যাসিক চিত্রও যুক্ত করার ব্যবস্থা করেন।
অতীতে গ্যালারিটি রানি, রাজকন্যা, তাঁদের সহচরিদের নৃত্যচর্চা এবং নৃত্যানুষ্ঠানের বাদ্যানুষঙ্গে আচ্ছন্ন থাকতএখন কেবল সাক্ষী মাত্র। বর্তমানে গালারিটি একটি মূল্যবান পুস্তকের সংগ্রহালয়। এই গ্যালারির দুই পাশের আলমারিতে বহু মূল্যবান পুস্তক সংরক্ষিতসব কিছু দেখে একটা কথাই বার বার মনে ভাসে‘আহা কী দেখিলাম! জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না’।
বিস্ময়ের ঘোর নিয়েই নির্গত দি গ্রেট অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। আসি নিচের তলায়নিচের তলায় মিউজিয়ামের অফিস এবং দ্রষ্টব্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক পরীক্ষাগার ও গবেষণাগার। এখানেই মিউজিয়ামের সর্বশেষ অংশ চাইনিজ মিউজিয়াম। প্রবেশ করি চাইনিজ মিউজিয়ামে। এই মিউজিয়ামের দ্রষ্টব্য বিভিন্ন সময়ের রানিদের এশিয়ান আর্টের সংগ্রহ। সঙ্গে আছে সিয়ামের রাজার উপহার। এইসব উপহার সিয়ামের রাজা মহামান্য ফরাসি সম্রাটকে পাঠান আঠারোশো একষট্টি খ্রিষ্টাব্দে আঠারোশো ষাট খ্রিষ্টাব্দে ফ্রেঞ্চ-ব্রিটিশ যৌথ বাহিনীর লুটের মালগুলিও এখানের দ্রষ্টব্যবেজিং-এর ওল্ড সামার প্যালেস লুট করে পাওয়া শিল্পসামগ্রীও এই চাইনিজ মিউজিয়ামের প্রদর্শ তালিকায় চাইনিজ মিউজিয়াম বেশ দক্ষতার সঙ্গে বিন্যস্ত
চাইনিজ মিউজিয়ামে রানিদের ব্যবহৃত পাঁচটি ওক কাঠের নকশাদার রত্নখচিত পালকি সযত্নে রক্ষিতবিভিন্ন সময়ের রানিদের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনে এগুলি ব্যবহৃত চিনের সিয়ামির রাজমুকুট এবং সপ্তদশ শতকের নকশাদার চীনা পর্দাও সংরক্ষিত যত্নের সঙ্গে সেইসব সংগ্রহগুলি অবাক চোখে দেখিবিস্ময়ের ঘোর যেন কাটতেই চায় না।
সবশেষে যাই সম্রাজ্ঞী জোসেফিনের ব্যক্তিগত কক্ষে। কক্ষটির মধ্যে প্রাচীন এবং আধুনিক অলঙ্কার ও অন্যান্য আসবাবপত্রের সমাহার ভীষণ নজরকাড়া। এই কক্ষটি পূর্বে সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের পত্নী মারি আঁতোয়ানেতের ব্যক্তিগত কক্ষ ফরাসী বিপ্লবের পর এটি সম্রাজ্ঞী জোসেফিনের ব্যক্তিগত কক্ষ হিসাবে পুনর্বিন্যস্তআজও সম্রাজ্ঞী জোসেফিনের কক্ষ দর্শকদের আলাদাভাবেই আকর্ষণ করে। কক্ষের আসবাবপত্রের বিন্যাস, দেয়ালচিত্র, আসবাবের নকশা, পালিস, সিলিং আর্ট ইত্যাদি অনবদ্য। বিস্ময়ে আবিষ্টই থাকিবেরিয়ে আসি সেই কক্ষ থেকে। বেরিয়ে আসি সম্রাটদের গ্রীষ্মাবাসের বাইরে।
এবার ঘোড়ার গাড়ি চড়ার পালা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে গ্র্যান্ড পার্টেরির চৌহদ্দি ঘুরতে যাইআয়তাকার গ্র্যান্ড পার্টেরির চারদিকেই চওড়া পাথর বাঁধানো রাস্তা। সেই রাস্তায় যেতে যেতেই গ্র্যান্ড পার্টেরির বিভিন্ন অংশের সৌন্দর্য আবার নতুন করে উপভোগ করি ফাউ পাই রাস্তায় ছোটো ছোটো বাচ্ছাদের খুশির ছুটোছুটি। গ্র্যান্ড পার্টেরির পশ্চিমে খাল। খালের অপর পারে বেশ কয়েকটা আঙুরের খেতআঙুর তোলায় ব্যস্ত কিষাণ কিষাণি ছুটন্ত ঘোড়ার গাড়ির দিকে তাকান মাঝে মাঝে।
গ্র্যান্ড পার্টেরির দক্ষিণেও অনেক আঙুরের খেত রাস্তার পাশেই। ঘোড়ার গাড়ি থামানোর ইঙ্গিত করেন দৌড়ে আসা আঙুর চাষি। তিনি তাঁর খেতের প্রথম তোলা আঙুর আমাদের খাওয়াতে ইচ্ছুকআমাদের সকলকে এক থোকা করে আঙুর উপহায় দেনআমরাও ধন্যবাদ জানাইতিনিও আমাদের প্রথম ফসল উপহার দিয়ে আপ্লুতখুশিতে তাঁর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল। গাড়ি ছাড়ে, তিনি সবাইকে বিদায় জানান নিজস্ব ভঙ্গিমায়।
ঘোড়ার গাড়ি চড়ার সঙ্গে আঙুর পেয়ে সবাই খুশি। বেজায় মিষ্টি আঙুর একটা একটা করে মুখের মধ্যে পড়তে থাকেঘোড়ার গাড়ি থেকে নামার পরেও শেষ হয় না হেঁটে এগিয়ে চলি ফন্টেনব্লু সিটি সেন্টারের দিকে, অ্যাভন সমাধিক্ষেত্র দেখার তাগিদে।
অ্যাভন সমাধিক্ষেত্রে যাই দশ মিনিটের জন্য। রাশিয়ার দার্শনিক আইভোনিচ গার্দিজেফ এবং নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত লেখিকা ক্যাথেলিন ম্যান্সফিল্ড মুরির সমাধি বুকে নিয়ে আছে এই শহরের প্রখ্যাত অ্যাভন সমাধিক্ষেত্র। খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসি, তাঁদের মনে মনে শ্রদ্ধা জানিয়ে। বাস এবং পরবর্তী ট্রেন ধরার তাড়া বাস স্ট্যান্ডে যাইমেলোঁ যাবার বাসে চড়িমেলোঁতে এসেই ট্রেন পাই কয়েক মিনিটের মধ্যে প্যারিসে ফিরি, পার্ক-দ্যু মিলেনিয়ারে পুত্রের আবাসে। তখন রাত্রি সাড়ে ন’টা। কান্তিতে অগাধ ক্লান্তি, কিন্তু অন্তর পূর্ণ অনাবিল আনন্দে, সুখকর অভিজ্ঞতায়।
----------
ছবি - লেখক