
হিমরাজ্যের রক্ষক
সায়নদীপা পল্মল্
১
উত্তরের ওই নিষিদ্ধ পাহাড়গুলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে
তাকিয়েছিল ঊর্ণ। আজকে সূয্যিমামার আদরে তুষারে ঢাকা পাহাড়গুলো যেন একটু বেশিই
সুন্দর লাগছে। গ্রামের সবাই বলে ওই পাহাড়ে যাওয়া মানা, ওখানে নাকি আদিম দৈত্যদের আত্মারা
ঘুরে বেড়ায়। এখানকার সব ছেলেমেয়েরা ওই পাহাড়কে ভয় পায়, ব্যতিক্রম কেবল ঊর্ণ। ওই পাহাড় যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
আজকে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকাই তার
চোখ গেল পাহাড়ের তলদেশে নীল স্ফটিকের জলে। জলের পাশে ওইটা কী দেখা যাচ্ছে! ফুল!
ঊর্ণ দুই হাতের আঙুল গোল করে চোখের সামনে ধরে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। কী অপূর্ব লাল রং! এমন ফুল ঊর্ণ
আগে কোনোদিন দেখেনি। ফুলটার কাছে যাওয়ার ভারী লোভ হল তার। কিন্তু কয়েক পা এগোবার
পরেই পেছন থেকে বন্ধুদের ডাক শুনে আর এগোতে সাহস হল না।
রোজকার মতো সন্ধ্যাবেলা দাদুর সঙ্গে খানিক গল্পগুজব হল তার। আজকেও গল্প
করতে করতে উঠে এল উত্তরের ওই পাহাড়ের কথা। গ্রামের লোকে যাই বলুক, দাদুর মুখে বেশিরভাগ সময় এক অন্যরকম গল্প শুনেছে ঊর্ণ। আজকেও তেমনই কিছু
শুনল। আর পাহাড়ের কথা বলতে বলতে দাদুর গল্পে উঠে এল তাদের কথাও। কিন্তু ঊর্ণ যখনই
আরও বেশি করে শুনতে চাইল সেই গল্প, তখনই দাদু কথাটা এড়িয়ে
যাওয়ার জন্য রাতের খাবার বানানোর অছিলায় উঠে চলে গেলেন। দাদু চলে গেলে পুরানো
কুলুঙ্গি থেকে সেই কাপড়খানি টেনে বের করে আনল ঊর্ণ। পুরাতন সাদা কাপড়টার ওপর রং দিয়ে তোলা বিচিত্র এক জন্তু - গায়ে বরফ-সাদা লোম,
পিঠে নীল আলোর মতো লম্বা দাগ, কাচের মতো স্বচ্ছ শিং, চোখে
চাঁদের মতো নরম আলো। ডানা নেই, তবুও
যেন মনে হচ্ছে উড়ছে। এই হল হিমরোহ, নিষিদ্ধ পাহাড়ের সেই
আদিম দৈত্য। সবাই বলে ওরা দৈত্য, ওরা নাকি খুব ভয়ংকর। কিন্তু এই ছবিটা যতবার দেখে ঊর্ণ, ততবার কেমন যেন
মায়া লাগে প্রাণীটার জন্য। ওই কুতকুতে চোখগুলো দেখলে বিশ্বাসই করতে ইচ্ছে করে না
যে ওরা মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে।
রাতের বেলা একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। ঘুমের মধ্যে ঊর্ণ
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই ফুলটারই স্বপ্ন দেখতে লাগল। তার বারবার মনে হতে লাগল ফুলটা
যেন পাপড়ি নেড়ে তাকে কাছে ডাকছে, যেন ঊর্ণকে কিছু বলার আছে তার।
২
পরের দিন সকালে উঠেও স্বপ্নটার কথা কিছুতেই ভুলতে
পারছিল না ঊর্ণ। তার ওপর জঙ্গলে যাওয়ার আগে শোনে আজকে কোনো বন্ধুই জঙ্গলে যাবে
না। কারুর নাকি শরীর ভালো নেই। আসলে তাদের রাজ্যের মানুষের প্রায়দিন শরীর খারাপ লেগেই থাকে।
বদ্যিমশাই পথ্য দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দিলেও একেবারে সুস্থ করতে পারেন না কাউকেই।
আর বেশিরভাগ সময় শিশুরাই বিভিন্নরকম রোগ জ্বরে আক্রান্ত হয়।
আজকে বন্ধুরা যাবে না শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল
ঊর্ণর। প্রথমে ভাবল সেও যাবে না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, সারাদিন বাড়িতে থেকেই বা কী করবে
সে! তার ওপর আজ হয়তো সে সুস্থ আছে, কাল
যদি সে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়ে! এতগুলো কথা মনের মধ্যে একসঙ্গে চলল ঊর্ণর। শেষমেশ
সে একলাই যাবে বলে মনস্থির করল।
ফল সংগ্রহ করতে করতে আজ আবার ঊর্ণর চোখ চলে গেল
ফুলটার দিকে। কী আশ্চর্য! কাল স্বপ্নে যেমনটা দেখেছিল, ফুলটা অবিকল সেই ভঙ্গিমায় পাপড়ি
নাড়াচ্ছে এখন। ওইদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল ঊর্ণর।
তারপর সে জানে না তার মধ্যে ঠিক কী হল, কিন্তু তার মন বলে
উঠল ওই ফুলটা কেন ডাকছে, সেটা তাকে জানতেই হবে। গুটিগুটি
পায়ে ফুলটার কাছে পৌঁছে গেল সে। কাছে গিয়ে দেখল স্বপ্নে যেমন দেখেছিল, ঠিক তেমনই উজ্জ্বল তার পাপড়ি, মিষ্টি তার সুবাস।
সেই ফুলের গায়ে হাত বোলাতেই ঊর্ণর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল, আনন্দে
শিহরিত হল তার শরীর।
তারপর আচমকাই ঘোড়ার খুরের শব্দ উঠল বাতাসে। চমকে উঠল
ঊর্ণ। নীচের দিকে তাকাতেই তার রোম খাড়া হয়ে গেল। সে দেখল, দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এইদিকেই
উঠে আসছে রাজা উষ্ণিকের সৈন্যরা। ওদের উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধা হল না ঊর্ণর। ওরা
নিশ্চয় নীল স্ফটিকের জল থেকে স্ফটিক সংগ্রহ করতে আসছে। ঊর্ণকে একবার দেখে ফেললেই
সর্বনাশ। নীচের দিকে নামতে গেলে নির্ঘাত ওদের চোখে পড়ে যাবে, আর ওপরের দিকে নিষিদ্ধ পাহাড়। এই নীল স্ফটিকের জলাশয়ের কাছাকাছি সাধারণ
মানুষের আসা বারণ, ধরা পড়লে মৃত্যুদণ্ড অবধারিত। আর ওপরের
দিকে গেলে... মুহূর্তের মধ্যে নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলল ঊর্ণ। এখন ওপরের দিকে
যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
মাথা নীচু করে ঊর্ণ গুটিগুটি পায়ে ওপরের দিকে এগোতে
থাকল। এগোতে এগোতে একসময় তুষার ঢাকা ভূমিতে পা রাখল সে, তবুও থামল না। আরও খানিকটা উঠে গিয়ে
একটা পাথরের আড়াল পেয়ে তার পেছনে সে নিজের শরীরটাকে লুকাল অবশেষে। সেখান থেকে
দেখতে লাগল রাজার সৈন্যদের স্ফটিক সংগ্রহ। এই সুন্দর স্ফটিকগুলো নিয়ে ওরা কী করে
কে জানে!
একটা একটা করে মুহূর্ত কেটে যাচ্ছিল। ঊর্ণ এমনই মুগ্ধ
হয়ে স্ফটিকগুলোকে দেখছিল যে সে ভুলেই গিয়েছিল সে আসলে নিষিদ্ধ পাহাড়ের এলাকায়
দাঁড়িয়ে। তার সংবিৎ ফিরল যখন সৈন্যরা কাজ সেরে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। খানিক বাদে ওরা
চলে গিয়েছে নিশ্চিত হয়ে ফেরার পথ ধরতে গেল ঊর্ণ। কিন্তু তখনই কীসে যেন ধাক্কা খেয়ে উলটে পড়ল সে। এক হাতে কোমরটা
ঘষতে ঘষতে কীসে ধাক্কা খেয়েছে দেখতে গিয়েই সে খুঁজে পেল ওই
অদ্ভুত জিনিসটাকে। তুষারের ভেতর অর্ধেকটা ঢাকা হয়ে রয়েছে। যেটুকু বাইরে রয়েছে,
তার থেকে হালকা নীল আলো বেরোচ্ছে। সে তুষার সরাতেই জিনিসটা পুরোপুরি
বেরিয়ে এল। ঊর্ণ অবাক হয়ে দেখল ওই শক্ত জিনিসটা অনেকটা ডিমের মতো দেখতে। কিন্তু সাধারণ ডিমের তুলনায় প্রায় দশগুণ আয়তন তার। ওই জিনিসটার
ওপর হাত রাখতেই ঊর্ণর মনে হল ওটার ভেতর থেকে যেন হৃদস্পন্দনের মতো শব্দ আসছে। ধুকধুক… ধুক… ধুক...
ঊর্ণর বুক কেঁপে উঠল। সে চারপাশে তাকাল। কেউ নেই। সে ভয়ে ভয়ে ডিমটাকে জড়িয়ে
ধরল। এটা যদি সত্যিই কোনো প্রাণীর ডিম হয়, তাহলে এখানে
অযত্নে পড়ে তা তো নষ্ট হয়ে যাবে। ওর ভেতরে থাকা প্রাণীটার জন্য মায়া হল ঊর্ণর।
সে ঠিক করল ডিমটা সে বাড়িতে নিয়ে যাবে।
৩
অতি সন্তর্পণে ডিমটা নিয়ে ঊর্ণ বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
কিন্তু পড়বি তো পড়, একেবারে দাদুর সামনে। একদিকে ঊর্ণর বাড়ি ফেরায় তিনি যেমন আশ্বস্ত হলেন,
অন্যদিকে ঊর্ণর পেটের মধ্যে লুকিয়ে রাখা জিনিসটা দেখতে পেয়েই
আঁতকে উঠলেন, “সর্বনাশ! এ জিনিস তুমি কোথায় পেলে, দাদুভাই?”
প্রশ্নটা করেই উত্তরের অপেক্ষা না করে দাদু তড়িঘড়ি
ঘরের সব দরজা জানালা লাগাতে উদ্যত হলেন। অবাক হয়ে গেল ঊর্ণ। দাদুর চোখে থাকা
আতঙ্ক তাকে বিচলিত করল, “এটা দেখে তুমি অমন ভয় পাচ্ছ কেন দাদু?”
দাদু প্রায় দৌড়ে এসে ঊর্ণর মুখ চেপে ধরলেন, “চুপ! কেউ যেন না শুনতে পায়।”
“কিন্তু কেন? এটা কীসের ডিম?”
“হিমরোহের!”
একটামাত্র শব্দ... ঊর্ণর শিরদাঁড়া বেয়ে যেন শীতল
স্রোত বয়ে গেল। হিমরোহ! মানে নিষিদ্ধ পাহাড়ের সেই আদিম দৈত্য! তারা তো অনেক আগেই
বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তাহলে?
দাদু ফিসফিস করে জানতে চাইলেন ঊর্ণ কীভাবে এই ডিমটা পেল। ঊর্ণ এক এক
করে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল দাদুকে। সব শুনে দাদু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
দাদুকে এমন করতে দেখে ভয় পেয়ে গেল ঊর্ণ। সে ধীরে ধীরে দাদুর পাশে বসে জিজ্ঞাসা
করল, “এই দৈত্য কি আমাদের মেরে ফেলবে বলে তুমি ভয় পাচ্ছ?”
“নাহ,” মাথা নাড়লেন দাদু, “আমি ভয় পাচ্ছি, ওকে কীভাবে শয়তানদের হাত থেকে
রক্ষা করব সেই ভেবে, আর তার সঙ্গে তোর জন্যও চিন্তা হচ্ছে বই-কি।”
“হিমরোহরা তো নিজেরাই শয়তান দৈত্য, তাদের
আবার কার থেকে ভয়?” অবাক গলায় প্রশ্ন করল ঊর্ণ।
“লোকে তেমনটাই ভাবে। কিন্তু আসল সত্যিটা যে অন্য।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন দাদু। তারপর বললেন, “হিমরোহরা
কোনোদিন মানুষের শত্রু ছিল না, মানুষের শত্রু আসলে মানুষই।”
“মানে?”
দাদুর মুখের বলিরেখাগুলো কঠিন হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে
তিনি বলতে শুরু করলেন, “অনেক বছর আগে এই হিমরাজ্য এমন ছিল না। তখন মানুষ আর হিমরোহ একসঙ্গে বন্ধুর
মতো থাকত। উত্তরের ওই পাহাড় ছিল হিমরোহদের আবাস। প্রবল
তুষারঝড় এলে ওরাই নিজেদের অলৌকিক শক্তি দিয়ে পুরো রাজ্যকে রক্ষা করত। পাহাড়ের
নদীগুলোর গতিও ওরাই নিয়ন্ত্রণ করত, তাই এই বরফের দেশেও ফসল
ফলত, বন সবুজ থাকত। আর ওই নীল স্ফটিকের জলাশয়… সেটা ছিল আশীর্বাদ। ওই স্ফটিক রোগ সারাতে পারত, মানুষের
দুঃখকষ্ট দূর করতে পারত, এবং এই ভূমিকে শক্ত করে বেঁধে রাখত।
কিন্তু হিমরোহরা কখনও কাউকে লোভ করে স্ফটিক নিতে দিত না। যতটুকু প্রয়োজন, কেবল ততটুকুই নেওয়া যেত। আর ওই যে লাল ফুল দেখেছিস, ওই ফুল ছিল হিমরোহদের পুষ্টির উৎস। ওর মধু পান করে তারা শক্তি পেত।”
“তারপর?” চোখ বড়ো
বড়ো করে প্রশ্ন করল ঊর্ণ।
দাদুর গলাটা আরও কঠিন হয়ে উঠল, “তারপর
একদিন বিদেশ থেকে এল উষ্ণিক। ভীষণ শক্তিশালী এক জাদুকর। প্রথমে সে এখানকার মানুষের
বন্ধু সেজে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মানুষের মনে বিষ ঢালতে শুরু করল। আর দেখে দেখে
সেই সময়ই রাজ্যে এক ভয়ানক মহামারি ছড়িয়ে পড়ল। উষ্ণিক
সবাইকে বোঝাল, হিমরোহরা নাকি লোভী হয়ে গিয়েছে। ওরা মানুষের
ওপর শাসন করতে চায়। তাই নীল স্ফটিককে বিষাক্ত করে দিয়েছে। ভয় মানুষকে অন্ধ করে
দেয়। মানুষও উষ্ণিকের কথা বিশ্বাস করল। শুরু হল যুদ্ধ। মানুষ আর হিমরোহ মুখোমুখি
দাঁড়াল। কিন্তু আসল শয়তান ছিল উষ্ণিক নিজেই। তার চক্রান্তেই মহামারি ছড়িয়েছিল, যুদ্ধ লেগেছিল। তার কালো জাদুর সামনে
আহত, প্রতারিত হিমরোহরা বেশিদিন টিকতে পারল না। একে একে তারা
হারিয়ে গেল এই পৃথিবী থেকে।”
“আর মানুষ?…”
দাদু মাথা নাড়লেন, “মানুষ তারপর থেকে আর কোনোদিন সুখী
হয়নি। রোগব্যাধি, বন্যা খরা... এইসব মানুষের জীবনের
নিত্যসঙ্গী হয়ে গেল।”
“কিন্তু উষ্ণিক এমনটা করল কেন?”
একটু দম নিয়ে জবাব দিলেন দাদু, “লোভ... সে ধীরে ধীরে এখানকার রাজা
হয়ে গেল। তাদের দেশ থেকে লোক এনে সেনাদল তৈরি করে মানুষকে দমিয়ে রাখতে শুরু করল।
আর ওই স্ফটিক তুলে বিদেশের বাজারে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে থাকল। সময়
এগিয়ে চলল, উষ্ণিকরা বংশ পরম্পরায় এখানের রাজা হয়ে বসল আর
ধীরে ধীরে মানুষের মন থেকে অতীতের সুদিনের কথা মুছে গেল। বন্ধু হিমরোহরা মানুষের
মনে দৈত্য নামে জায়গা করে নিল।”
এতদূর বলে একটু থামলেন দাদু, তারপর বললেন, “তবে
তুমি আমার কথা মিলিয়ে নিও দাদুভাই, এই অনাচার আর বেশিদিন
চলবে না। আমার গণনা বলে নীল স্ফটিকের সংখ্যা ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। খুব শীঘ্রই এই
হিমরাজ্যের বুকে সর্বনাশ নেমে আসবে। পাহাড়ে ধস নামবে, নদীর
জল হয় শুকিয়ে যাবে আর নয়তো বান আসবে। স্ফটিকের শক্তি ছাড়া
হিমরাজ্য ধুলোয় মিশে যাবে। হিমরোহরা থাকলে ওরা ওদের মায়াবী
শক্তি দিয়ে সেই প্রলয়কে আটকাতে পারত। কিন্তু...”
দাদুর কথা শুনে ঊর্ণর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
হিমরাজ্য ধুলোয় মিশে যাবে!
তাকে বাঁচানোর কি কোনো উপায় নেই! ঊর্ণ প্রশ্নটা সবে দাদুকে করতে যাবে এমন সময়
কারা যেন দরজায় কড়া নাড়তে লাগল জোরে জোরে, “তাড়াতাড়ি
দরজা খোলো, নাহলে ভেঙে ফেলব।”
দাদু আর ঊর্ণ চমকে উঠল। দাদু ফিসফিস করে বললেন, “শিগগির দাদুভাই, ডিমটা কম্বলের তলায় লুকিয়ে আড়াল করে রেখে দাও। আমার ধারণা এটা শেষ
হিমরোহের ডিম। এত বছর ধরে তুষারের নীচে সুরক্ষিত ছিল। একে কিছুতেই উষ্ণিকের হাতে
পড়তে দেওয়া যাবে না।”
দাদুর নির্দেশ মতো ক্ষীপ্রগতিতে কাজ সারল ঊর্ণ। দাদু নিশ্চিত হয়ে দরজা
খুলে দিলেন। দরজা খুলতেই সৈন্যরা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। একজন ঊর্ণর দিকে
তলোয়ার উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “অ্যাই বাচ্চা, তুই আজ উত্তরের পাহাড়ে গিয়েছিলি?”
“আমি!” চমকে উঠল ঊর্ণ।
“একদম চালাকি করবি না,” বলল লোকটা,
“আমাদের কাছে খবর আছে। বল, কী করতে গিয়েছিলি?”
“আমি... আমি তো...,” আমতা আমতা করতে
লাগল ঊর্ণ। সেই দেখে অন্য একজন বলল, “সময় নষ্ট না করে এদের
রাজার কাছে নিয়ে চল। নিয়ম ভাঙার শাস্তি তিনিই দেবেন।”
সঙ্গে সঙ্গে দাদুর আর ঊর্ণর কোমরে দড়ি বাঁধা হয়ে
গেল। কষ্ট হল ঊর্ণর, আজ তার জন্য দাদুর এই অবস্থা। বাঁচার কি কোনো পথ নেই?
৪
সৈন্যরা হিড়হিড় করে টানতে টানতে দাদু আর ঊর্ণকে
বাইরে নিয়ে এল। আর তখনই ঘটে গেল সেই অঘটন। আচমকা হিমরাজ্যের ভূমি কাঁপতে শুরু
করল। চাঁদের আলোয় দেখা গেল উত্তরের হিম পাহাড়ে ধস নেমেছে। চমকে গেল ঊর্ণ। দাদুর
গণনা এত দ্রুত সত্যি হবে সে ভাবেনি।
চারিদিকে শোরগোল উঠল। মানুষ যে যেদিকে পারল ছুটে
বেড়াতে লাগল। রাস্তায় রাস্তায় বড়ো বড়ো ফাটল দেখা দিল। পাহাড় থেকে বড়ো বড়ো বরফের চাঁই তীব্র গতিতে নামতে লাগল নীচের দিকে।
দাদু বিড়বিড় করে উঠলেন, “প্রলয় এসেই গেল। কারুর মুক্তি
নেই। বাঁচাতে পারলে একমাত্র...”
দাদুর কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা তাদের ঘরের ভেতর
থেকে অদ্ভুত এক নীল আলো বেরিয়ে এল। সেই আলো এতটাই উজ্জ্বল যে দাদু আর ঊর্ণ তো
বটেই, এমনকি পথে ছুটতে
থাকা মানুষ আর উষ্ণিকের সৈন্যরাও অবাক হয়ে সেই দিকে তাকাল। অন্য কেউ না বুঝলেও
ঊর্ণরা স্পষ্ট বুঝতে পারল আলোটা কোথা থেকে আসছে। আলোটা ক্রমশ উজ্জ্বল হতে হতে
আচমকাই ফট করে একটা শব্দ হল। উত্তেজনায় দাদু ঊর্ণর হাত চেপে ধরলেন।
সকলের অলক্ষে ডিমটার গায়ে একটা সরু ফাটল
ধরল। তারপর আরেকটা। এই করতে করতে পুরো খোলসটা ভেঙে বেরিয়ে এল ছোট্ট একটা প্রাণী।
বরফ সাদা লোমে ঢাকা তার শরীর, পিঠে নীল আলোর রেখা, কাচের মতো স্বচ্ছ দুটো ছোট্ট শিং। তার বড়ো বড়ো চোখদুটো চাঁদের আলোর মতো কোমল। টলোমলো পায়ে সে বাইরে বেরিয়ে এল। ঊর্ণ-সহ সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট হিমরোহটা কাঁপতে কাঁপতে এসে ঊর্ণর
কোলে উঠে পড়ল। মনে হল প্রাণীটার যেন ঠান্ডা লাগছে। ঊর্ণ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে
ধরতেই আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটল। হিমরোহটার শরীর ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠল। তারপর তার
শিং থেকে বেরিয়ে এল দুটো সরু আলোর রেখা। সেগুলো মাটিতে পড়ল না। বাতাসের মধ্যে
দিয়ে সোজা ছুটে গেল উত্তরের পাহাড়ের দিকে। আর সেদিক থেকেও ধাম করে একটা অদ্ভুত
আওয়াজ শোনা গেল। মনে হল যেন পাহাড়ের বুক থেকে কেউ উত্তর দিল হিমরোহটাকে। তারপরেই
উত্তরে এক ঝলক নীল আলো দেখা গেল, তারপর আরেক ঝলক। তারপর
একসঙ্গে শত শত নীল আলোর রেখা ছুটে এল পাহাড় থেকে।
নীল স্ফটিকের জলাশয়ও যেন আচমকা জেগে উঠল। জলের গভীর
থেকে আলো উঠতে লাগল। একটার পর একটা স্ফটিক জ্বলে উঠল। সেই আলো মাটির নীচে, নদীর তলদেশে, পাহাড়ের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
ছোট্ট হিমরোহটা তখন ঊর্ণর কোলে দাঁড়ানোর চেষ্টা
করছে। ঊর্ণ তাকে সোজা করতেই সে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। তারপর অদ্ভুত শব্দে
ডেকে উঠল আচমকা, “আঁউউউউউউউউ...!”
তার সেই ডাক এতটাই তীক্ষ্ম ছিল যে সবার কানে তালা
লেগে গেল। আর ডাকটা বেরিয়ে আসতেই বাতাসও যেন থমকে গেল। কিন্তু প্রলয় থামল না।
বরফের বিশাল চাঙড় তখনও পাহাড় থেকে ছুটে আসছে।
একটা বিরাট বরফখণ্ড সোজা রাজ্যের দিকে ধেয়ে আসতে
লাগল। মানুষজন আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। ঊর্ণ চোখ বন্ধ করে ফেলল। একটা একটা করে
মুহূর্ত কাটতে লাগল। কিন্তু যখন কিছুই হল না, তখন সাহস করে চোখ খুলল ঊর্ণ। দেখল, বিশাল
বরফখণ্ডটা তাদের মাথার ঠিক ওপরে এসে থেমে গিয়েছে। একেবারে মাঝ আকাশে। একটুও নড়ছে
না। মনে হচ্ছে কেউ যেন অদৃশ্য শক্তিবলে আটকে দিয়েছে তাকে। তারপর ধীরে ধীরে
হিমরোহর শরীর থেকে বেরিয়ে একটা নীল আলোর জাল ছড়িয়ে পড়ল ওটার গায়ে। বরফখণ্ডটা
ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করল। খানিক বাদে আস্তে আস্তে সেটা ঘুরে গিয়ে পাহাড়ের
ঢালে স্থির হয়ে বসে গেল। একইসঙ্গে রাস্তায় তৈরি হওয়া ফাটলগুলো থেকে নীল আলো
বেরিয়ে এল। তারপর ফাটলগুলোও ধীরে ধীরে জোড়া লাগতে শুরু করল। একটা... দুটো... করে
সব ক’টা। দূরের উন্মত্ত নদীর স্রোতও ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে
এল।
চারপাশের মানুষ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এই ছোট্ট
হিমরোহটার কারণে এত বড়ো প্রলয় থমকে গেল! তবে যে এতদিন ধরে সবাই বলত হিমরোহরা দৈত্য! তারা
মানুষের শত্রু! সে সব কি তবে মিথ্যে?
৫
ঘটনার আকস্মিকতা তখনও কাটেনি। ঘোড়ায় চেপে সেখানে
এসে পৌঁছাল রাজা উষ্ণিক। ছোট্ট হিমরোহটাকে দেখে তার চোখ জ্বলে উঠল লোভে।
“ওটাকে ধরো!” চিৎকার করে উঠল সে,
আর মনে মনে বিড়বিড় করল, “ওর শক্তি আমার চাই!”
কিন্তু এবার সৈন্যরা এগোল না। এগোলো না রাজ্যের
মানুষও। উষ্ণিক চিৎকার করে উঠল,
“কী হল, কথা কানে যাচ্ছে না? দৈত্যটাকে শেষ করো। ওর জন্যই এই প্রলয় আসছিল।”
শেষ মিথ্যেটা উচ্চারণ করতে গিয়ে আজ যেন উষ্ণিকের কণ্ঠও কেঁপে উঠল খানিক।
মানুষজন এগোল, তবে হিমরোহের দিকে না, উষ্ণিকের
দিকে। কেউ লাঠি তুলল, কেউ পাথর। বহু বছরের ভয় আর ভুল ভেঙে
গিয়ে তাদের চোখ জ্বলে উঠল ক্রোধে।
“আর না!” গর্জে উঠল এক বৃদ্ধ। “অনেক সর্বনাশ করেছ তোমরা! এই তোমার জুলুমের শেষ...”
মুহূর্তের মধ্যে উষ্ণিককে ঘিরে ফেলল সবাই।
কয়েকদিন পর...
হিমরাজ্য আবার নতুন করে সেজে উঠছে। সুখ আর শান্তির
বাতাস আবার বইতে শুরু করেছে মাথার ওপর। উত্তরের পাহাড়কে এখন আর কেউ নিষিদ্ধ
পাহাড় বলে না। ওদিকে যেতে কেউ আর ভয় পায় না। নীল স্ফটিকের জল আপাতত স্থির।
সেখানে নতুন করে স্ফটিক তৈরি হতে সময় লাগবে। ততদিন ধৈর্য্য ধরতে হবে মানুষকে।
দাদু ছোট্ট হিমরোহটার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে
বললেন, “দেখলি দাদুভাই,
আবার শুরু হল মানুষ আর হিমরোহের বন্ধুত্ব। এই বন্ধনই যুগ যুগ ধরে
হিমরাজ্যকে রক্ষা করবে।”
ঊর্ণ আকাশের দিকে তাকাল। তুষারের ওপর তখন নীল আলো
খেলছে। আর তার কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে ছোট্ট হিমরোহটা।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)
No comments:
Post a Comment