গল্প:: রামছাগলের নাতি - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী


রামছাগলের নাতি
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

- ‘রামছাগলের নাতি?’
এ কথাটার আসল অর্থ কী, কথাটা ভালো না খারাপ, কথাটা কোনো নিষিদ্ধ শাস্তিযোগ্য শব্দ কিনা সেটা নিয়ে আজ আলোচনা হচ্ছে।
আলোচনা হচ্ছে রোবট কাউন্সিলে। এই কাউন্সিল দেখে কোনো মানুষ কোনো রোবটকে অপমান করেছে কিনা। এরকম কোনো অপমানের জন্যে সেই ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি দেওয়ার দরকার আছে কিনা।
এই তো সেদিন এক রোবটের গায়ে থুথু দেওয়ার অপরাধে একজনকে একশো মিটার নাকখত দিতে হয়েছে ‘আই লাভ রোবট’ বলতে বলতে।
কিন্তু এক্ষেত্রে মুশকিল হয়েছে ‘রামছাগলের নাতি’ এই শব্দটা কোনো নিষিদ্ধ শব্দের তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি এর আসল অর্থও বোঝা যাচ্ছে না সবরকম ডেটা পয়েন্ট থেকে।
আজকের আলোচনার কেন্দ্রে রোবট গণেশ। ২০৩০ সালে কেনা খুব বেসিক গ্রেডের ডোমেস্টিক বা বাড়ির কাজের রোবট। সেই প্রথমদিককার রোবট যখন চলতে ফিরতে পারলেই আর মানুষের দু-একটা কাজ করে দিলেই, মানুষ ‘আহা আহা’, ‘কী অপূর্ব’ এসব আদিখ্যেতা করত। রোবটের সঙ্গে সেলফি তুলে আশেপাশের পড়শিদের পাঠিয়ে ক্ষমতা দেখাত।
গণেশকে তৈরি করা হয়েছিল বয়স্কদের কথা বলার সঙ্গী হিসেবে। একই সঙ্গে বাড়ির ছোটোখাটো কাজ করতে সাহায্য করার জন্যে।
তবে সেই গণেশ আর আজকের গণেশের মধ্যে অবশ্য অনেক ফারাক। গণেশকে একইরকম দেখতে লাগলেও সমানে আপগ্রেড করে নেওয়া হয়েছে। অর্কবাবুর কোনোরকম পরিবর্তন পছন্দ নয়। সেজন্যে বাড়িও বদলাননি পঞ্চাশ বছরে, রোবটও বদলাননি পনেরো বছরে।
এখনও তাই ২০৪৫ সালে গণেশ টিকে থাকতে পেরেছে। অর্কবাবুর বয়স হয়েছে। সামান্য কারণে রেগে যান ও রেগে গিয়ে গণেশকে বারকয়েক ‘রামছাগলের নাতি’ বলেছেন। অভিযোগটা এই গালাগালের জন্যে হলেও গণেশ নিজে সেটা করেনি। বলা যায় সে কথা ও নিজে ভাবতেও পারে না।
কিন্তু মুশকিল অন্য জায়গায়। এখন এসব রোবটের মধ্যে এমন কিছু চিপ থাকে, যা দিয়ে রোবট ইউনিয়ন এসব জিনিসের উপরে লক্ষ রাখে। কোনো মানুষ রোবটদের অপমান করছে কিনা, মারধর করছে কিনা, বাজে ব্যবহার করছে কিনা।
সেজন্যেই অটোম্যাটিকালি রিপোর্ট হয়েছে। কথাটা কতটা অপমানকর সেটা বোঝার জন্যেই আজ রোবট কাউন্সিল বসেছে। নানা ধরনের শাস্তির বিধান আছে, যদি প্রমাণ পাওয়া যায়। খুব বাজে ব্যবহারের জন্যে, গায়ে হাত তোলার জন্যে এরকমও শাস্তি হতে পারে যে সেরকম কোনো লোকের বাড়ি কোনো রোবট কাজ করবে না। যাকে বলে কমপ্লিট সোশাল আইসোলেশন। এখনকার দিনে কারও বাড়িতে রোবট কাজ করতে না চাইলে সেই ব্যক্তির অবধারিত মৃত্যু সেটা বলে দিতে হবে না। বাজার করা হোক, রান্না করা হোক, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করা হোক – সব ব্যাপারেই মানুষ এখন রোবটনির্ভর। কম খারাপ শব্দ ব্যবহারের জন্যে মালিকের আর্থিক জরিমানা হয়। এরকম অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী নানান ধরনের শাস্তি হয়।


যাই হোক, এখন গণেশের এই অপমানের কারণ খুব সায়েন্টিফিকালি বিচার চলছে। সবার চোখের সামনের স্ক্রিনে একটা বড়ো রামছাগলের ভিডিও ফুটে উঠল। পাতা চিবোচ্ছে। মাথায় বড়ো শিং। চোখে উদাসীন দার্শনিক দৃষ্টি।
তাকে দেখে খুব খারাপ লাগল না কারোরই। এমনকি রোবটদের মধ্যে অনেকেই এটাও বলল যে গণেশের থেকে ওই রামছাগলটা দেখতে মোটেও তেমন খারাপ নয়। এমনকি যেভাবে গম্ভীরভাবে ‘ব্যা ব্যা’ করে ডাকছে, তাতে তার বেশ ব্যক্তিত্বও আছে বলতে হবে।
“কিন্তু লোকটা তো এই রামছাগলের কথা বলেনি, বলেছে এর নাতির কথা।” - কোনো এক রোবট প্রশ্ন তুলল।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে সেরকম একটা রামছাগলের ছানা পাওয়া গেলেও তার মধ্যেও তেমন অপমানকর কেউ কিছু খুঁজে পেল না। তার ব্যবহার যেন আরও মিষ্টি।
অনেক আলোচনা তর্কবিতর্কের পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে সঠিক বিচারের জন্যে মানুষের ভাষা বোঝা দরকার। যাতে কথার অর্থ বোঝা যায়, তার জন্যে আরও বেশি ডেটা দরকার। আরও বেশি মানুষের কথা শোনা দরকার।
এখানে একদম আধুনিক রোবট ‘পলাশ ২০৪৫’ বলে উঠল – “কিন্তু আজকাল তো মানুষরা নিজেদের মধ্যেই কোনো কথা বলে না। আমরা বুঝব কী করে? আগে লোকে কত কথা বলত। এখন ওরা যা কথা বলে, সব আমাদেরই সঙ্গে। নিজেদের মধ্যে তো কেউ কোনো কথাই বলে না। শুধু কীসব সিম্বল পাঠায়। ভালো লাগলে একরকম সিম্বল, হাসলে একরকম। তা আসলে কী উদ্দেশ্যে যে ওই কথা বলেছেন, তা বুঝব কী করে?”
কথাটা সত্যি। এখন মানুষে মানুষে যোগাযোগ একেবারে কমে গেছে। সবাই নিজের নিজের জগতে মেতে থাকে। যা কথা বলে, সবই বাড়ির বা রাস্তার রোবটদের সঙ্গে। সে জন্যে এই ধরনের কথার তাৎপর্য বোঝাও দিন কে দিন শক্ত হয়ে উঠেছে।
আরও কিছুক্ষণ আলোচনার পরে মিটিং মুলতুবি হয়ে গেল। যদিও তাতে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে, কথাটা ভালো না মন্দ বোঝার জন্যে গণেশও ওই একই কথা ওই লোকটাকে অর্থাৎ অর্কবাবুকে বলতে পারে। তার প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যাবে কথাটা ভালো না খারাপ।
পরবর্তী আলোচনা হবে চারঘণ্টা বাদে সারা বিশ্বে সব ধরনের ভাষায় আরেকটু রিসার্চের পরে। গণেশকে এই পুরো আলোচনায় যোগ দিতে অবশ্য কোথাও যেতে হয়নি। পুরোটাই বাড়ি থেকে। এই নির্দেশ ও পেয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। অর্থাৎ পরিস্থিতি বুঝে সুবিধেমতো গণেশকেও অর্কবাবুকে ‘রামছাগলের নাতি’ বলতে হবে। তাতেই বোঝা যাবে কথার অর্থ।

২


অর্কবাবুর বয়স হয়েছে। ১০৪। স্ত্রী বহুদিন আগে মারা গেছেন। এক ছেলে বেঁচে থাকলেও প্রায় কুড়ি বছর দেখেননি সামনা সামনি। সে পৃথিবীতে থাকলেও এখন বেশিরভাগ সময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই চব্বিশ ঘণ্টার সঙ্গী বলতে একমাত্র গণেশই।
সন্ধের দিকে একটা ভারচ্যুয়াল গেম নিয়ে মেতে থাকেন অর্কবাবু। এই খেলাতে ইচ্ছেমতো যে কোনো দেশে যাওয়া যায়। কাকে নিয়ে যাবেন সেই সঙ্গীও ইচ্ছেমতো নির্বাচন করা যায়। এই মানস ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে আবার বেশ কিছু সারপ্রাইজ থাকে। যাদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে থাকে, সে ওনার স্ত্রী হোক, কি ছেলে হোক, কি বাবা-মা হোক, তাদের সঙ্গে গেমের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। খুব ইন্টারেস্টিং গেম। হয়তো যে দোকানে ঢুকেছেন সুইজারল্যান্ডে খাবার কিনতে, হঠাৎ করে দেখলেন সেখানে কাউন্টারে কুণাল মানে ওর ছেলে দাঁড়িয়ে। তখন নানান কথা হয়। আড্ডা হয়। খেলতে খেলতে অনেক সময় অর্কবাবু ভুলেই যান যে ছেলের সঙ্গে দেখা হয়নি গত কুড়ি বছর, কথাও বলা হয়নি তাও এক বছর হয়ে গেছে। শুধু মাঝে জন্মদিনে কিছু হার্ট সিম্বল পেয়েছেন ছেলের কাছ থেকে। এসব গেমে যে কুণালের সঙ্গে দেখা হয়, তাকে অবশ্য ছেলে বলা উচিত নয়, ঠিক ছেলের মতো দেখতে ডিজিটাল চরিত্র যার বয়স অর্কবাবুই ঠিক করেন। ঠিক সেরকম বয়সে যেরকম দেখতে ছিল, যেভাবে কথা বলত, ঠিক সেরকম ভার্সন।
তবে মুশকিল হয়েছে গতকাল কুণালের সঙ্গে দেখা হয়নি। আজও দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
অর্কবাবু চেঁচিয়ে ডাকলেন – “গণেশ ও গণেশ – দেখ তো, শুধু পাশের বাড়ির ওই বুলডগটা মাঝেমধ্যে এসে দেখা দিচ্ছে। সেটিং করতে গিয়ে কী যে করেছি!”
গেমের সেটিং কী কী করতে হয় সেটা গণেশ ভালো জানে। তার উপরেই নির্ভর করে কার কার সঙ্গে দেখা হবে ওই যাত্রাপথে। গণেশ আবার ঠিক সেরকম করে দিল।
কিন্তু অর্কবাবু খেলা ফের শুরু করতে যাবেন, ঠিক তার আগেই হঠাৎ ওঁর কাছে যে মেসেজটা এল সেটা দেখে অর্কবাবুর হৃৎস্পন্দন প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। রোবট কাউন্সিল ঠিক করেছে, গণেশকে অপমান করার জন্যে, ‘রামছাগলের নাতি’ এরকম একটা খারাপ কথা মাঝেমধ্যে ব্যবহার করার জন্যে এ বিষয়ে কোনো ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পর্যন্ত গণেশ কোনো কাজ করবে না। যদি অবশ্য গণেশ নেহাত কাজ করতে চায়, করতে পারে। তবে সেটা রেকমেন্ডেড নয়।
তার মানে সব কাজ সেক্ষেত্রে অর্কবাবুকেই করতে হবে। বাজার থেকে রান্না। চা করতেও উনি একেবারে ভুলে গেছেন।
শুধু তাই নয়, গণেশ সঙ্গে থাকবে তো? তাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকার কথা অর্কবাবু ভাবতে পারেন না। ও-ই অর্কবাবুর সব কিছু।
কী ব্যাপার, কী করেছেন - কিছুই বুঝলেন না। মাথাও কাজ করছে না। গলা দিয়ে প্রথমে আওয়াজই বেরোল না কিছুক্ষণ।
তারপরে কোনোরকমে গলা খাঁকরে চিঁ চিঁ করে বলে উঠলেন – “গণেশ - ও গণেশ – কোথায় গেলি তুই রামছাগলের নাতি - তুই কি আমায় ছেড়ে চলে যাবি? এসব কি মেসেজ আসছে!” বলে মেসেজটা দেখালেন।
গণেশ পাশে এসে দাঁড়িয়ে অর্কবাবুর দুধ চা-টা সযত্নে টেবিলে রেখে অর্কবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল – “যেতে বললেই যাব নাকি? এটাই তো আমার বাড়ি। আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও কোনোদিন যেতে পারি? রামছাগলের নাতি।”
অর্কবাবু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে খানিকক্ষণ বসে থেকে একটু বাদে বিষয়টা বুঝতে পেরে ‘হো হো’ করে হেসে উঠলেন।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

No comments:

Post a Comment