
মুখ
পুড়ল হনুমানের
তাপস
মৌলিক
এক গ্রামে
এক বুড়ি ছিল। একদিন সে গেছিল পাশের গ্রাম থেকে এক হাঁড়ি গুড় কিনে আনতে। ফেরার পথে
গাছগাছালি ছাওয়া জংলা রাস্তায় এক গাছের শেকড়ে হোঁচট খেয়ে বুড়ি আছাড় খেল দড়াম করে।
তার গুড়ভর্তি মাটির হাঁড়ি গেল ভেঙে, সমস্ত গুড় ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে।
বুড়ি তো
প্রথমে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল। বিলাপ করে কাঁদতে লাগল –
হা
ভগবান, এ
কোন বিধান,
কী করিলাম ভুল!
হাঁড়িও
গেল গুড়ও গেল,
হারাইল দুই কূল!!
বেশ খানিক
হাপুসনয়নে কান্নাকাটি করার পর ধীরে ধীরে উঠল বুড়ি। মাটি থেকে কাঁচিয়ে ভাঙা হাঁড়ির
একটা টুকরোয় যতটুক গুড় ধরে ততটুক তুলে ব্যাজার মুখে রওনা দিল গাঁয়ের দিকে।
এদিকে একটা
হনুমান গাছের ওপর থেকে সব কিছু দেখছিল এতক্ষণ। বুড়ি চলে যেতেই গাছ থেকে নেমে এল
সে, মাটিতে ছড়িয়ে থাকা চটচটে তরলটা শুঁকে দেখতে লাগল। জিনিসটা কী? বেশ ভালো গন্ধ
আছে দেখছি! চেটে একটু দেখব নাকি? আহহ, এ যে দেখি দারুণ মিষ্টি!
ব্যস, আর
তাকে পায় কে! কিছুক্ষণের মধ্যেই চেটে চেটে সমস্ত গুড় সাবাড় করে দিল হনুমান, ছড়িয়ে
থাকা হাঁড়ির ভাঙা টুকরোগুলোয় অল্প অল্প যেটুকু লেগে ছিল ছাড়ল না সেটুকুও।
মুখ চাটতে
চাটতে গাছের ডালে আয়েশ করে বসে ভাবতে লাগল সে, এমন মিষ্টি জিনিসটার নাম জানি কী! পাবই
বা কোথায়! কী বলে যেন কাঁদছিল বুড়ি? ‘হারাইল দুই কূল’! বলছিল, ‘হায় হায়, আমার দুই
কূল গেল।’ বুঝেছি, জিনিসটার নাম তাহলে ‘দুই কূল’! বুনো কুল তো খেয়েছি ঢের। টোপা
কুল, নারকেলি কুল – আরও কত আছে। কিন্তু এমন মিষ্টি কুল তো খাইনি জীবনে! জিনিসটা হাঁড়িতে
করে নিয়ে যাচ্ছিল বুড়ি, হয়তো কিনেছে কোনো দোকান
থেকে। যাই দেখি, মুদি দোকানে গিয়ে খোঁজ করি একটু। দুই কূলই যখন এমন মিষ্টি তখন তিন
কূল কি চার কূল না জানি আরও কত মিষ্টি হবে!
এই ভেবে
পাশের গ্রামের মুদি দোকানে হাজির হল হনুমান। জিজ্ঞেস করল মুদিকে, “তোমার এখানে দুই
কূল পাওয়া যায়?”
মুদি তো
আকাশ থেকে পড়ল। দুই কূল! মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝে না সে হনুমানের কথার! হনুমান তখন
তাকে বিস্তারিত বলল পুরো ঘটনা – বুড়ির কথা, হাঁড়ির কথা, আছাড় খেয়ে বুড়ির পড়ার কথা
– সমস্ত। তখন মুদি বুঝতে পারল সব। পারবে না কেন! সকালবেলা তার দোকান থেকেই যে বুড়ি
এক হাঁড়ি গুড় কিনে নিয়ে গেছে।
“আছে তোমার
কাছে দুই কূল?” ফের জিজ্ঞেস করল হনুমান।
মুদি সেয়ানা
কম না। ব্যবসায়ী মানুষ বলে কথা! ততক্ষণে সে চিনে ফেলেছে হনুমানকে। এ সেই পাজি
নচ্ছার হনুমানটা না? সেদিন যখন জঙ্গলের রাস্তা ধরে পাশের গাঁয়ে যাচ্ছিল মুদি তখন খামোখা
গাছের ওপর থেকে নারকেল ছুঁড়ে মেরেছিল? দাঁড়াও, আজ তোমায় বাগে পেয়েছি! দেখাচ্ছি
মজা।
“ওহো, দুই
কূল! মানে দুই কূলের আচার! তাই বলো। আছে বই-কি,
নিশ্চয়ই আছে। থাকবে না কেন? এই তো এই বয়াম ভর্তি – অনুকূল আর প্রতিকূল – দু-রকম কূল দিয়ে তৈরি আচার। ভারী মিষ্টি খেতে। চেখে দেখবে নাকি
একটু?” লংকার আচার ভর্তি একটা বয়াম দেখিয়ে বলল মুদি।
একগাদা গুড়
খেয়ে হনুমানের তখন খিদে ছিল না, তাই সে বলল, “এ জিনিস তো খেলাম একটু আগেই, কেমন
স্বাদ জানা আছে আমার। কিন্তু তিন কূল বা চার কূল কি আছে তোমার
দোকানে? সে নিশ্চয়ই আরও মিষ্টি হবে। থাকলে সেটাই নিতাম কিনে।”
“হ্যাঁ, সেও
আছে। এই যে এই বয়ামে। অনুকূল, প্রতিকূল, নদীকূল আর উপকূল – চার রকম কূলের আচার। দু-কূলের ডবল মিষ্টি,” এবার যে বয়ামটা মুদি হনুমানকে দেখাল
তাতে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল লংকা দিয়ে তৈরি এক মোক্ষম আচার।
“বাঃ বাঃ,
বেশ। এর চেয়েও মিষ্টি কিছু হয় না? আট কূল বা দশ কূল?” মুগ্ধ চোখে বয়ামটা দেখতে
দেখতে বলে হনুমান।
“হবে না
কেন? তাও হয়। তবে আমার কাছে নেই। কুল যে কতরকম তার কি কূলকিনারা আছে! আকুল,
ব্যাকুল, নকুল, বকুল, গোকুল, মুকুল, বাঁটকুল, বিলকুল, বরকুল, ছিটকুল – তবে সে সব
দেশি কুল, হ্রস্ব উ দিয়ে তৈরি, কুলতলি কিংবা নালিকুল থেকে আসে, ইস্কুলের ছেলেরা
ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিনে চেটে চেটে খায়। ও সব দেশি কুলের আচার আমি রাখি না। আমার
কূল সব খাঁটি দীর্ঘ ঊ দিয়ে বানান আমার গিন্নি, সমুদ্রোপকূল থেকে আমদানি করা দীর্ঘ
ঊ।”
“আচ্ছা, তা
চার কূল-টা কত পড়বে?”
“দু-কূল দুশো টাকা, চার কূল চারশো। সোজা হিসেব।”
“বেশ, চার
কূল যে ক’টা বয়াম আছে দাও দেখি সব আমায়।”
“চার কূল তো
এই এক বয়ামই আছে। আর তো বানানো নেই,” বলল মুদি।
“মাত্র এই
এক বয়াম! এ তো আজ বিকেলেই শেষ হয়ে যাবে। কী করি তাহলে?” হতাশ হয়ে বলে হনুমান,
“আমার যে অনেক অনেক চাই। যত টাকা লাগে দেব।”
“তাহলে এক
কাজ করতে পারো,” প্রস্তাব দেয় মুদি, “এই বয়ামটা
নিয়ে যাও আর চার কূল যে রকম যতটা আছে বাড়িতে সব একটা বস্তায় বেঁধে দিচ্ছি, দরকার
মতো ছেঁচে বেটে একসঙ্গে মিশিয়ে নিও, তাহলেই আচার তৈরি হয়ে যাবে।”
হনুমান মহা
খুশি, “বেশ বেশ, তাই দাও তবে।”
“চারশো আর
ছ’শো, মোট হাজার টাকা পড়বে কিন্তু।”
“আরে টাকা
নিয়ে চিন্তা কোরো না, এই নাও তোমার হাজার টাকা,” ট্যাঁক থেকে দশটা কড়কড়ে একশো
টাকার নোট বার করে বলে হনুমান। মুদিও টাকাটা বুঝে নিয়ে গুনগুন করে সুর ভাঁজতে
ভাঁজতে ভেতরবাড়িতে চলে যায়।
বাড়ি পাহারা
দেওয়ার জন্য মুদির চারটে তাগড়াই কুকুর ছিল। সে করল কী, চারটে কুকুরকে ধরে একটা
চটের বস্তায় পুরে বেঁধে দিল মুখটা, তারপর নিয়ে এল হনুমানের কাছে।
“এই নাও
তোমার চার কূল। বাড়ি গিয়ে বস্তার মুখটা খুলে দিও
কিন্তু, আলোবাতাস না পেলে ভেতরের কূল সব পচে যাবে। আরেকটা কথা, খাঁটি দীর্ঘ ঊ দিয়ে
তৈরি কূল কিনা, তাই নাড়াচড়া পড়লে বস্তার ভেতরে ঘেউ ঘেউ কিংবা কেঁউ কেঁউ আওয়াজ হতে
পারে, কান দিও না ওতে।”
খুশিতে ডগমগ
হয়ে হনুমান তো লাফাতে লাফাতে হাতে বয়াম পিঠে বস্তা ফিরে এল জঙ্গলে। বস্তার ভেতর
থেকে মাঝে মাঝে কুকুরের কেঁউ কেঁউ-এর মতো একটা আওয়াজ আসছিল বটে, মুদির কথামতো তাতে
আমল দিল না সে। এবারে নিরিবিলি কোনো জায়গা
খুঁজে জুত করে বসতে হবে, যেখানে বিরক্ত করবে না কেউ।
খুঁজে খুঁজে
একটা ছোট্ট ডোবার ধারে হাজির হল হনুমান, চার পাশে বেশ ঘন জঙ্গল, বড়ো বড়ো গাছের
ছায়া পড়ে কালো হয়ে আছে ডোবার জল। একটা শিমুল গাছের গোড়ায় পিঠের বস্তাটা নামিয়ে
মুখের বাঁধন খুলে দিল সে। আর যায়
কোথা! বস্তার ভেতর থেকে তড়াক তড়াক করে লাফিয়ে বেরিয়ে এল যমদূতের মতো চার-চারটে
কুকুর। এতক্ষণ গাদাগাদি করে দমবন্ধ বস্তার ভেতরে থেকে রেগে কাঁই হয়ে আছে তারা,
বেরিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ল হনুমানের ওপর।
কোনোরকমে তড়বড়
করে শিমুল গাছে চড়ে বসল হনুমান। খুব জোর বাঁচা গেছে যা হোক! আরেকটু হলেই হয়েছিল আর
কী! ব্যাটা পাজি মুদি, চার কূলের বদলে কিনা চারটে কুকুর ভরে দিয়েছে বস্তায়! জোর
ঠকান ঠকিয়েছে। অবশ্য পুরোপুরি ঠকাতে পারেনি। আচারের বয়ামটা আছে। গাছে ওঠার সময়
বয়ামটা সঙ্গে নিতে ভোলেনি হনুমান, এক হাতে বুকে চেপে গাছে চড়েছে। এবারে আরাম করে
বসে তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া যাবে সেই আচার। ভাবতেই
হনুমানের জিভ লালায় সকসক করে উঠল। নীচে গাছটা ঘিরে
কুকুর চারটে তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করে চলেছে। চ্যাঁচা তোরা কত চ্যাঁচাবি এবার। কতক্ষণ
চিৎকার করবি? গাছ থেকে আর নামছি না আমি। খিদেও পেয়েছে খুব। কোন সকালে সেই দুই কূল
খেয়েছিলাম, আর এখন বেলা পড়ে এল। ঘোরাঘুরিও হয়েছে বিস্তর। মনের সুখে আচারটা খাব এবার,
পুরো বয়াম খালি করব, তারপরই নামব গাছ থেকে।
এই ভেবে
বয়ামটা খুলে একেবারে দু-খাবলা আচার
তুলে যেই না মুখে পুরেছে হনুমান, আর যায় কোথা! ঝালের চোটে তার জিভ মুখ সব জ্বলে
উঠল। ঝাল বলে ঝাল! উরেব্বাস রে বাস! যেন আগুন ছুটতে লাগল তার মুখ চোখ নাক থেকে।
চোখ দুটো হয়ে উঠল জবাফুলের মতো লাল, নাক দিয়ে গড়াতে লাগল গরম জল, আর মুখে ক্রমাগত
– উলসস্, আলসস্, স্লরররপ্। ‘বাবা গো, মা গো, মরে গেলাম গো,’ বলে পরিত্রাহি চিৎকার
শুরু করল সে।
এমন সময় তার
কুকুরগুলোকে খুঁজেপেতে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে মুদিও এসে হাজির হল সেখানে। বহু দূর
থেকেই সে কুকুরের চিৎকার শুনেছে, তাই জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধে হয়নি। শিমুল গাছের নীচে
পৌঁছে ব্যাপারস্যাপার দেখে তো সে হেসেই বাঁচে না! হাসতে হাসতে হনুমানকে বলল মুদি,
“চার কূল খেতে গিয়ে তুমি যে অকূল পাথারে পড়লে দেখছি! খুবই বিপদসংকুল অবস্থা! কুলপি
না খেলে তোমার মুখের জ্বালা কমবে না। ভালো কুলপি আছে আমার দোকানে, দামও বেশি নয়।
খাবে তো চলো।”
ঝালের চোটে
উহ্ আহ্ করতে করতে হনুমান তেড়েমেড়ে বলল, “ব্যাটা হতচ্ছাড়া ঠগ জোচ্চোর কুলাঙ্গার
কোথাকার! ফের ফাজলামো হচ্ছে! আর তোর চক্করে পড়ি আমি? এক্ষুনি যদি এই কুকুরগুলো
নিয়ে তুই না পালিয়েছিস তবে তোর এই আচারের বয়াম ছুড়ে তোরই মাথায় ভাঙব।” এই বলে
আধখালি বয়ামটা তুলে মুদির দিকে তাক করল সে।
মুদি ভাবল,
ঢের হয়েছে, আর এখানে থেকে কাজ নেই! ওই ভারী কাচের বয়াম যদি সত্যি সত্যি মাথায় ছোড়ে
হনুমান তাহলে আর দেখতে হবে না। পোষা কুকুরগুলোকে ডেকে নিয়ে মানে মানে কেটে পড়ল সে।
কুকুরগুলো
চলে যেতেই তড়িঘড়ি গাছ থেকে নেমে এল হনুমান। ঝালের চোটে তখন একেবারে নাজেহাল অবস্থা
তার। জল, জল! শিগগির জল চাই। জল না খেলে এ জ্বালা জুড়োবে না। ঠান্ডা কালো জলের
ডোবাটা কখন থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে, কুকুর চারটে নীচে
থাকায় নামতেও পারছিল না ছাই! পড়ি কি মরি ডোবায় নেমে আঁজলা ভরে জল মুখে দিতে গিয়েও
থমকে গেল সে। কালো জলে তার মুখের ছায়া পড়েছে, লংকার আচারের ঝালে সে মুখ পুড়ে কালো
হয়ে গেছে একেবারে।
সেই যে মুখ
পুড়ল হনুমানের, সেই থেকে সমস্ত হনুমানেরই মুখ কেলে হাঁড়ির মতো পোড়া। লোকে বলে
মুখপোড়া হনুমান।
____________________
ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর একটি লোককথা
অবলম্বনে
ছবি: এ আই (নির্মাণ: তাপস মৌলিক)
No comments:
Post a Comment