Showing posts with label তন্ময় ধর. Show all posts
Showing posts with label তন্ময় ধর. Show all posts

ছড়া-কবিতা:: রঙে রঙে রঙিন - তন্ময় ধর


রঙে রঙে রঙিন
তন্ময় ধর

রঙে রঙে যেই দিয়েছি এঁকে
দূরের আকাশ বলে আমায় ডেকে -
তোমার রঙ একটু আমায় দেবে?
কী যে বলি, পাই না আমি ভেবে!

দূরের পাহাড় রঙের কথা জেনে
আমার খাতায় প্রশ্ন দিল এনে -
নীলসবুজের রঙ কি পেতে পারি?
না দিলে তোমার ভাবের ঘরে আড়ি!

এবার এল দুষ্টুমিঠেল নদী
বললে - তুমি রঙ ছড়ালে যদি
আমার জলের অনেক কথা আছে
রঙ যদি দাও তাদের ব্যথার কাছে

সামান্য রঙ তবুও তাই দিয়ে
ওদের হাতে বাঁধি আমার রাখী
রঙবেরঙের আমার ছোটো ঘরে
অচিন রঙে হাসে অচিন পাখি

আমার রঙেই রাঙিয়ে দিয়ে আমায়
চলছে রঙে রঙে রঙিন খেলা
সূর্যদীঘল সাতটি রঙের পথে
রঙে রঙে পড়ে আসে বেলা

ফুরায় না রঙ সেই তো আবার যখন
নীহারিকার আলোয় মাখা রাতে
তারায় তারায় স্বপ্ন আঁকা রঙে
লুকোচুরি খেলে নয়ন পাতে

স্বপ্নরঙা ঘুমের শেষে আমি
এমনি করেই ভোরের নয়নপাতে
এ রঙ থেকে ও রঙটুকু নিয়ে
রঙ ভরে নিই নিজের জীবনটাতে
----------
ছবি - আন্তর্জাল

ছড়া-কবিতা:: দুটি কবিতা - তন্ময় ধর


দুটি কবিতা
তন্ময় ধর

ছড়ায় ছড়ায়

যেই না আমি লিখব ছড়া
করবি তোরা মশকরা
এই না ভেবে কই না কথা
হয় না তোদের বশ করা।।
ইচ্ছে তো হয় তোদের ধরে
দিই গুছিয়ে বেশ করে’
ত্যাঁদড়ামি আর বাঁদরামি সব
এক ঘায়ে দিই শেষ করে’।।

ছড়া লেখা নয় রে সহজ
হয় সাজাতে ছড়ার গা
ছন্দ বুঝে মারতে যে হয়
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।।
খাঁড়ার ঘায়ে সব কি মরে
স্কন্ধকাটা শব্দ সব
তোদের ঘাড়ে চাপবে তারা
করবে বিষম উপদ্রব।।

তাই তো বলি, আমায় এখন
নির্বিবাদে লিখতে দে
পরে না হয় হাসিস তোরা
একটু এখন নে কেঁদে।।
দেখবি পরে কেমন করে
ছড়ায় জীবন ছড়িয়ে যায়।
আজ যা খালি ভরবে কালই
সে যে কেবল ভরিয়ে যায়।।

*             *             *

কথায় কথায়

তোর যে কথা স্বপ্ন এঁকে তারার চোখে ফুটল
দূর আকাশে দীপ হাতে ওই নীহারিকায় ছুটল
আঁধার-ঘরের দূরের আঁধার টুটল।
তোর কথা কোন গল্প হয়ে কান্নাহাসির রূপকথায়
মেঘ-আকাশে আঁকল জীবন চুপকথায়
জলপরিদের চুপ চুপ চুপ টুপ-কথায়।
তোর কথা আনন্দ হয়ে গাইছে গান
ভোরের পাখির ডানায় ভিজে করছে স্নান
স্বপ্নতুলির আলতো চোখে দিচ্ছে টান।
তোর কথা ওই সাতসাগরে তুলছে ঢেউ
সে কথার ভেতর একটু ব্যথা বুঝছে কেউ
স্বপ্ন-আলোয় অনেক দূরে মাখছে ঢেউ।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

ছড়া-কবিতা:: মিষ্টি মিঠেল স্বপ্ন - তন্ময় ধর


মিষ্টি মিঠেল স্বপ্ন
তন্ময় ধর

মিঠে স্বপ্নেতে ঠোঁটে ছুঁয়ে মিঠে কাপটা
দেখবি সামনে সাজানো যে পাটিসাপটা!
কাপও ভরবে মিঠে রাবড়ির স্বপ্নে
আলতো কামড়ে একটু ক্ষীরের চপ নে

স্বপ্নের প্লেটে এল সীতাভোগ-চমচম
যত মিষ্টির এল কি বৃষ্টি ঝমঝম!
অমৃতিসরভাজামিহিদানাজিলিপি
স্বপ্নের চাঁদকপালে লিখেছে কি লিপি?

মিষ্টি আবেশে দূর স্বপ্নের দেশেতে
ছুঁয়ে ক্ষীরপুলিরাজভোগদরবেশেতে
শেষে সে কি এসে জন্মদিনের পায়েসে
মিঠেল আরেক জন্ম লিখবে আয়েসে!
_____
ছবিঃ অতনু দেব

গল্পের ম্যাজিক:: অন্য ব্রহ্মাণ্ডে - তন্ময় ধর


অন্য ব্রহ্মাণ্ডে
তন্ময় ধর

‘রাস্তা ভুল হয়েছে, মোহনজি। চার কিলোমিটারের বদলে আমরা প্রায় ১৫ কিলোমিটার চলে এসেছি। গাড়ি থামিয়ে কাউকে একবার জিজ্ঞাসা করা উচিত
‘কাকে জিজ্ঞাসা করব? এতখানি রাস্তায় একটাও মানুষের মুখ দেখলেন? ৩৫ বছর ধরে কুমায়ুন-গাড়োয়ালে গাড়ি চালাচ্ছি। এত ঘন কুয়াশা আর এমন জনমানবহীন রাস্তা বাপের জন্মে দেখিনি,’ বলতে বলতেই হঠাৎ করে ব্রেক চাপলেন মোহন ঘিল্ডিয়াল, ‘যাক। একজন মানুষের দেখা পাওয়া গিয়েছে
রাস্তার ধারের সেই বৃদ্ধ মানুষটির আপাদমস্তক শীতবস্ত্রে মোড়া। মুখের যেটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে, তাতে বয়স অন্ততপক্ষে পঁচাত্তর তো হবেই। গাড়ির জানালার কাছে এসে প্রখর দৃষ্টিতে আমাদের তিন জনের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন এক্স-রে স্ক্যান করে নিলেন। তারপর ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বললেন, ‘দেবস্থল যাবেন? রাস্তা তো অনেক আগেই ভুল করেছেন। এখান থেকে বলে দিলেও বুঝবেন না, রাস্তাটা বড্ড গোলমেলে। যদি কিছু মনে না করেন, আমি আপনাদের সঙ্গে গাড়িতে আসতে পারি কি?’
ভদ্রলোকের কথায় কেমন যেন সন্দেহজনক একটা ইঙ্গিত। কিন্তু অজস্র কাটাকুটিতে ভরা মুখ আর শান্ত চোখে অদ্ভুত এক সারল্য। সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে মোহনজি আমার আর রোহিত রাওয়াতের মুখের দিকে তাকালেন।
আমি কিছু বলার আগেই রোহিত বিনীতভাবে বললেন, ‘নিশ্চয়। নিশ্চয়। তাহলে আমাদের খুব উপকার হয়। প্লিজ, গাড়িতে উঠে আসুন
ড্রাইভার মোহনের পাশের সিটে এসে বসলেন বৃদ্ধ। উঠেই সিটবেল্ট বেঁধে নিলেন। হাসলেন, ‘আমার নাম কুন্দনলাল বহুগুণা। দেবস্থলের টেলিস্কোপ অফিসেই সাধারণ কর্মচারী ছিলাম। দুর্ভাগ্যজনক একটা ঘটনায় চাকরি খোয়াতে হয়’ একটু থেমে বললেন, ‘একটা শর্টকাট রাস্তায় নিয়ে যাব। রাস্তাটা অবশ্য বেশ চড়াই এবং প্যাঁচালো। বাঁ দিকের এই নিচের রাস্তাটায় নামুন
ভয়ঙ্কর লাফাতে লাগল গাড়ি। চারপাশে বাদামি কুয়াশায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাইরের হাওয়াও যেন হঠাৎ করে ভীষণ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।
মোহনজি ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘এই রাস্তায় অনেকদিন কোনও গাড়ি চলেনি মনে হয়
‘মনোযোগ দিয়ে চুপচাপ গাড়ি চালান,’ একটু যেন ধমকের সুর বহুগুণার গলায় ‘ডাইনে-বাঁয়ে না তাকিয়ে সোজা রাস্তায় এগিয়ে চলুন,’ বলে গুনগুনিয়ে কুমায়ুনী লোকসঙ্গীত গাইতে শুরু করলেন।
আমার মনে কোথাও একটা সন্দেহ আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল। জোর করেই আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম বহুগুণার সঙ্গে, ‘কী একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আপনার চাকরি গিয়েছিল বলছিলেন, আপত্তি না থাকলে একটু যদি বলেন...’
‘অবশ্যই বলব। সেটা বলার জন্যেই তো গাড়িতে উঠে...’ থেমে গেলেন বহুগুণা ‘তবে গাড়িতে বসে তাড়াহুড়োয় শুনতে ভালো লাগবে না। একেবারে অকুস্থলে মানে দেবস্থলে গিয়ে শুনবেন...’ কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা অজানা পাখি তীব্র স্বরে বিচ্ছিরিভাবে ডেকে উঠল পথের ধারের কুয়াশার আড়ালে।
পথ আর ফুরোচ্ছে না। প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল। যত খারাপ রাস্তাই হোক, অন্তত কুড়ি কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এসেছি। রোহিত অধৈর্য্য হয়ে উঠল, ‘এই আপনার শর্টকাট রাস্তা? এতে তো আরও দেরি হচ্ছে। আপনি মনে হচ্ছে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছেন। আপনাকে বিশ্বাস করাটাই ভুল হয়েছে...’
‘এখন আর কিছু করার নেই। পথ ঠিক না ভুল - সেটা বিচার করার সুযোগ আর নেই। এখন আপনারা অন্য এক জগতে যাবেন। অন্য ব্রহ্মাণ্ড। প্যারালেল ইউনিভার্স,’ চওড়া হাসি হাসলেন বহুগুণা।
‘মানে?? আপনি কি আমাদের সঙ্গে মশকরা করছেন নাকি?’ রোহিত উত্তেজিত হয়ে উঠল।
‘বালাই ষাট। আই অ্যাম ড্যাম সিরিয়াস। একটু আগেই বরং মশকরা করছিলাম। এখন আমার আসল পরিচয়টা দিই। আমি এখানকার প্রিন্সিপল সায়েন্টিস্ট ছিলাম। ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রের শিকার হই আমি। তাই এটা আমার প্রতিশোধই বলতে পারেন। বাট ফর ইয়্যু, ইট উইল বি আ গ্রেট অ্যাডভেঞ্চার
রোহিতের বরাবরই মাথাগরম। ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘মামদোবাজি পেয়েছেন নাকি? আপনি একটা ভীমরতিপ্রাপ্ত বুড়ো আমাদের সঙ্গে মশকরা করবেন, আর আমরা ছেড়ে দেব? তিনজন জোয়ানের সঙ্গে পারবেন আপনি? ওই তো হাড়-ক’খানা-সার চেহারা, একটা টোকা মারলে পাহাড়ের খাদে পড়ে ছবি হয়ে যাবেন...’
‘তিনজনের সঙ্গে একা পারব বলেই তো একা এসেছি। নইলে তো দলবল নিয়েই আসতাম। দেবস্থলে যে সায়েন্টিস্টের ভরসায় তোমরা যাচ্ছ, সেই সৌরীশ সান্যালকে আমি আগেই সরিয়ে রেখেছি। তোমরা অপহৃত হওয়ার আগে কোথায় ছিলে, সে খবর কেউ জানে না। আর তোমাদের মোবাইল ফোন এখন কাজ করছে নাচেক করে দেখতে পারো। ফিরে যাওয়ার পথও নেই। তোমরা প্যারালেল ইউনিভার্সে ঢুকে পড়েছ...’
রোহিত ভয়ঙ্কর উত্তেজিত। মোহনজির দিকে তাকাল, ‘ড্রাইভারসাব, গাড়ি ঘোরান। আর এই পাগলকে এখানেই নামিয়ে দিন
বহুগুণা এবার অট্টহাস্য করলেন, ‘চেষ্টা করে দ্যাখো। গাড়ি ঘুরবেই না
সত্যিই গাড়ি ঘুরল না।
‘বাইরে তাকিয়ে দ্যাখো, কুয়াশা কেমন কালচে হয়ে গিয়েছে। কুয়াশার আড়ালের আবছা গাছপালা কেমন মেরুন হয়ে গিয়েছে। বিপরীত বস্তুর এক জগতে প্রবেশ করেছ তোমরা। গাড়ির চারপাশে আমি একটা উচ্চশক্তিমাত্রার শীল্ডের ব্যবস্থা করেছি। নইলে এতক্ষণে তোমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে। এই গাড়িটা এখন ভয়ঙ্কর জটিল একটি জ্যামিতিক তলের ওপর রয়েছে। তোমরা এম-থিওরি বোঝো? স্ট্রিং থিওরির ১১টি মাত্রা বোঝো?’
‘কী পাগলের পাল্লায় পড়লুম রে বাবা!’ রোহিত ভীষণ অসন্তুষ্ট।
আমিও এতক্ষণ ধৈর্য ধরে রেখেছিলাম। এবার বিরক্ত হয়ে মুখ খুললাম, ‘দেখুন, এসবে আমাদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। আমরা অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সের লোক। ইনসট্রুমেন্ট নিয়ে কাজ করি। অফিসের কাজে গত সাত দিন ধরে তিন জেলায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। আমাদের রেহাই দিন। পরে কখনও এসে আপনার এক্সপেরিমেন্ট দেখে যাব, আপনার কাহিনি শুনে যাব...’
‘পরে? ধুর, আমার কোনও ভবিষ্যৎ কালই নেই
রোহিতের মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বের হচ্ছে না। আমি হতাশ গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বেশ, আপনার কী ইচ্ছা বলুন? অন্য জগতে আমাদের এনে আপনার কী লাভ হচ্ছে? আর এটা করছেনই বা কীভাবে?’
‘লাভ বা ইচ্ছে – কোনোটাই আমার নয়। সবই সুবৃহৎ জগতের স্বার্থে। অনেক শক্তিশালী যন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে এই এক্সপেরিমেন্টে। সে সব তোমাদের ধারণার অতীত। অনেক ক্যালকুলেশন করে তবেই তোমাদের ধরেছি...’
‘কিন্তু আমাদেরই কেন? আমরা নিতান্তই অনিচ্ছুক, ক্লান্ত। বার বার অনুরোধ করছি, আমাদের অব্যাহতি দিন
‘তোমাদের ছাড়া হবে না। এক্সপেরিমেন্টটা শুরু হয়ে গিয়েছে। অনেক অঙ্ক কষে তোমাদের সিলেক্ট করা হয়েছে। তোমাদের বয়স, উচ্চতা, চিন্তা - সব ক্যালকুলেট করা হয়েছে। আর তোমাদের এমন একটা সময় অপহরণ করা হয়েছে যখন তোমরা চারপাশের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলে। বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়া করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাক্টিভেট, ফোন সুইচড অফ, ট্যুইটার-জিমেল-লিঙ্কড ইন সব বন্ধ। দুই বিজ্ঞানীর এক কেস। তোমাদের আধবুড়ো ড্রাইভার, সেও অবেলায় এক তরুণীর প্রেমে পড়ে ফোন-হোয়াটস অ্যাপ বন্ধ রেখেছিল। আমি মোক্ষম সময়ে লোক লাগিয়ে রেখেছিলাম। তারা তোমাদের পথ ভুলিয়েছে। তারপর আমি পিক আপ করেছি
‘কিন্তু অন্য ইউনিভার্সে যাওয়ার ব্যাপারটা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনি আমাদের পুরোনো ব্রহ্মাণ্ডে একবার ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে শুরু থেকে পুরো এক্সপেরিমেন্টটা আবার করে দেখান,’ রোহিত একটা নতুন চাল চালার চেষ্টা করল।
‘না ভাই। এই অনুরোধ রাখতে পারলাম না। এটা একমুখী প্রক্রিয়া। চালাকি করে পালাতে পারবে না,’ বহুগুণা হাসলেন, ‘এক্সপেরিমেন্টটা বুঝতে গেলে আগে বুঝতে হবে কোন ধরনের সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ডে আমরা যাচ্ছি। কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে বুঝতে চাইলে হিলবার্ট স্পেস নামে এক ধরনের তাত্ত্বিক ও বিমূর্ত স্থানের কথা ভাবতে হবে। এই তাত্ত্বিক স্পেস অসীম-মাত্রিক এবং একটি কোয়ান্টাম জগত এই হিলবার্ট স্পেসের সাপেক্ষে বিভিন্নভাবে ঘুরতে পারে। এই তত্ত্ব মতে যে ধরনের মহাবিশ্বের কথা বলা হয়, সেগুলো প্রত্যেকটি একই জায়গায় এবং একই সময়ে সহ-অবস্থান করছে, কিন্তু প্রত্যেকে আলাদা ডাইমেনশনে অবস্থিত বলে কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। যোগাযোগ করতে না পারলে কী হবে, প্রতিটি মুহূর্তে নেয়া আমার সিদ্ধান্তগুলো হয়তো আমার মতো অসংখ্য আমারই হুবহু প্রতিরূপের সঙ্গে মিলিতভাবেই নেয়া হচ্ছে। আমার নাকের ডগায়ই হয়তো একটি সমান্তরাল মহাবিশ্ব রয়েছে, শুধু আলাদা মাত্রায় অবস্থিত বলে তাকে ধরা ছোঁয়া যাচ্ছে না। এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতারা মনে করেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুত নিয়মগুলোর উৎপত্তি আসলে এরকম অসীমসংখ্যক সমান্তরাল মহাবিশ্বের যোগাযোগের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এ ধরনের সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলোকে লেভেল থ্রি প্যারালাল ইউনিভার্স বলা হয়। স্ট্রিং তত্ত্বে অন্তর্বর্তী জগতের মাত্রাগুলো বিভিন্ন ভাবে পেঁচিয়ে থাকার কারণে বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক নিয়মাবলী সমৃদ্ধ মহাবিশ্বের উদ্ভব হতে পারে। এ রকম আলাদা আলাদা নিয়মের মহাবিশ্বগুলোর সবকিছুই আলাদা। এমন সব মহাবিশ্বের বেশিরভাগই প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্য অনুপযোগী। যদিও আমরা এমন মহাবিশ্বের প্রমাণ পাইনি, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে এরকম মহাবিশ্বের সংখ্যা প্রায় অসীম, ১০-এর পিঠে ৫০০ খানা শূন্য আর এর ভিতর আমাদের মহাবিশ্বের মতো নিয়মযুক্ত মহাবিশ্বের সংখ্যাও অগণিত। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে স্পেস বা স্থানকে আমরা যেরকম সমতল বলে ভাবি, স্পেস আসলে তেমন না, বরং এটি বাঁকানো। আলো যখন মহাশূন্যের (স্পেস) ভিতর দিয়ে ভ্রমণ করে, তখন এই বাঁকানো স্পেসের ভেতর দিয়ে একটি বাঁকানো পথে চলতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই বাঁকা পথের পাশাপাশি একটি সংক্ষিপ্ত রাস্তাও আছে। এই সংক্ষিপ্ত পথই হল ওয়ার্মহোল বা আইনস্টাইন-রোজেন সেতু দুটি স্থানে যাবার এই বিভিন্ন রাস্তা থাকার কারণে গণিতবিদরা একে বহুভাবে সংযুক্ত স্থান বলেন। কিন্তু পদার্থবিদরা একে পোকার গর্ত বা ওয়ার্মহোল বলেন, কারণ, একটি পোকা যেমন মাটি খুঁড়ে পৃথিবীর এই প্রান্তের সঙ্গে অন্য প্রান্তের একটি সংক্ষিপ্ত রাস্তা তৈরি করতে পারে, তেমনি একটি ওয়ার্মহোলও মহাবিশ্বের দুটি স্থানের ভিতর একটি বিকল্প সংক্ষিপ্ত রাস্তা তৈরি করে।
'আমাদের সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রপুঞ্জ হল আলফা সেন্টরাই। সৌরজগৎ থেকে আলোর বেগে ভ্রমণ করলেও পার্শ্ববর্তী এই নক্ষত্রপুঞ্জে যেতে আমাদের কমপক্ষে ৪.৩ বছর সময় লাগবে (বাস্তবে যা অসম্ভব, কেন না কোনও কিছুর পক্ষেই আলোর বেগে ভ্রমণ সম্ভব নয়)। কিন্তু যদি কেউ একটি ওয়ার্মহোল দিয়ে যেতে পারে তবে কয়েক মুহূর্তে আলফা সেন্টরাই থেকে ঘুরে আসা সম্ভব। আইনস্টাইনের তত্ত্ব আমাদের মহাবিশ্বের দুটি ভিন্ন স্থানের মধ্যে ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে ভ্রমণের কথা বললেও, স্ট্রিং তত্ত্বের সমাধান অনুযায়ী আমরা যদি একটি ওয়ার্মহোল তৈরি করতে পারি তা আমাদের মহাবিশ্বের যে কোনও গালাক্সির পাশাপাশি অন্য মহাবিশ্বে ভ্রমণের সম্ভাব্যতার কথাও বলে। এমনকি একটি ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে শুধু দুটি ভিন্ন মহাবিশ্বেই নয়, এমনকি অতীত ও ভবিষ্যতেও ভ্রমণ করা সম্ভব। স্ট্রিং তত্ত্ব যে অতিরিক্ত মাত্রার কথা বলে, আমরা যদি সেই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো দিয়ে একটি আন্তঃমাত্রিক ভ্রমণের পথ তৈরি করতে পারি, তাহলে খুব কম সময়েই অন্য মহাবিশ্বের অন্য সময়ে গিয়ে উপস্থিত হতে পারব। স্ট্রিং ফিল্ড থিওরির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড. মিচিও কাকু একটি হাইপোথেটিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন করেছেন। এতে আমরা স্থান-কালের দেয়াল ভেদ করে ওয়ার্মহোল দিয়ে অন্য মহাবিশ্বে পাড়ি দিতে পারব। পদ্ধতিটি খুব বেশি জটিল নয়প্রথমে আমাদের যে কোনও একটি নক্ষত্রকে বেছে নিতে হবে। তারপর একটি শক্তিশালী গামা-রশ্মি সেই নক্ষত্রের চারিদিকে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে গামা-রশ্মিগুলোকে আবার নিজেদের উপরে ফেলতে হবে। এরকম শক্তিশালী রশ্মি নিজের উপর চক্রাকারে উপরিপাতন হবার ফলে শক্তির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। একসময় প্রচুর শক্তি সৃষ্টি হলে, স্থান-কালের দেয়ালে একটি ওয়ার্মহোল তৈরি হবে। এখন এই ওয়ার্মহোলকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য মহাবিশ্বে পাড়ি দেয়া যাবে! এই প্রক্রিয়াটিই আমরা এখন সফলভাবে করে চলেছি। বাইরে অত্যধিক গামা-রে ফগের জন্য তোমরা তাত্ত্বিকভাবে কিছু দেখতে পাচ্ছ না। আমরা বহু সহস্র আলোকবর্ষ পেরিয়ে এসেছি। তোমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সিকে ছ্যাঁদা করে বেরিয়ে এসেছি
‘কিন্তু আমার মাথা যে ভীষণ ঝিম ঝিম করছে,’ আমি হতবুদ্ধি মুখ করে বললাম।
‘করবেই তো। স্নায়ুতন্ত্রের পরমাণুতে পরমাণুতে ধাক্কা লেগেছে,’ বহুগুণার স্বর পালটে গেল, ‘আমার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, আমি আলো হয়ে গিয়েছি। আমি আর বস্তুগত জগতে নেই। তোমরাও এবার আলো হয়ে যাবে। প্রস্তুত হও
আর কী প্রস্তুত হব? মাথা তো কখন থেকেই ঝিমঝিম করছে। হঠাৎ প্রবল একটা ঝাঁকুনির পর দেখলাম চারপাশে শুধুই আলো। কোনও বস্তু নেইকোনও অন্ধকার নেই। কোনও শব্দ নেই। শুধু তীব্র এক আলো। আমি থেমে আছি, নাকি চলছি, কিছুই বুঝতে পারছি না। আলো, আলো, অনন্তবিস্মৃত এক আলো। সেই অসীম আলোর ভার অসহ্য হয়ে উঠল।
চেঁচিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। মুখ দিয়ে কোনও শব্দই বের হল না। শুধু আলো ছাড়া কিছুই যে কোথাও নেই। হঠাৎ কানে খুব মিহি একটা গানের সুর ভেসে এল। আমার মায়ের গলা। ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে আমায় ঘুম পাড়াচ্ছেন। আমার ঠাকুরদার গলা পেলাম। কী আশ্চর্য তরুণ স্বর। তাহলে কি হু-হু করে অতীতে ফিরে যাচ্ছি? হে ঈশ্বর, কোথায় গিয়ে এই যাত্রা থামবে?
অদ্ভুত একটা সেতারের শব্দের মতো শব্দ ভেঙে ভেঙে ভেসে এল। খুব মন দিয়ে শুনলাম। না, সেতারের শব্দ নয়। মানুষের কন্ঠস্বর। আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে। কিছু একটা বলতে চাইছে, ‘প্রাণপণে চেষ্টা করে আপনি নিজের ডান দিকে সরে যান। কিছুটা সরলেই আমরা আপনাকে উদ্ধার করতে পারব
আমি চেষ্টা করতে থাকি। হ্যাঁ, সত্যিই তো এবার দেহবোধ ফিরে আসছে। এই তো অন্ধকার এক পাথরের দেয়াল। তার ওপর ভর রেখে আস্তে আস্তে ডান দিকে সরতে লাগলামঠিক তখনই দড়িটা হাতে এসে লাগল।
‘শক্ত করে চেপে ধরুন,’ আদেশ ভেসে এল।
উদ্ধারকারী দলের তৎপরতায় প্রায় চল্লিশ মিনিটের চেষ্টায় নিরাপদ এক পাহাড়ী উপত্যকায় পৌঁছালাম। রোহিত আর মোহনকেও উদ্ধার করে আনলেন ওঁরা। টানা ছ’দিন নাকি আমরা নিরুদ্দেশ ছিলাম।
‘আপনাদের গাড়িটা দেবস্থলের কাছেই রাস্তার ধারে অক্ষত অবস্থায় দাঁড় করানো আছে। কিন্তু আপনারা কীভাবে কোথায় গিয়েছিলেন? আপনাদের শরীর থেকে এই পবিত্র গন্ধ আর দিব্য জ্যোতি বেরোচ্ছে কেন?’ হাজারো প্রশ্ন নিয়ে হামলে পড়লেন উদ্ধারকারী অফিসারেরা।
‘আমরা অন্য ব্রহ্মাণ্ডে গিয়েছিলাম,’ এই কথাটুকু বলার জন্য যেই না মুখ খুলেছি অমনি বিক্রমাদিত্যের বেতালের মতো হুশ করে সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল পুলিশ সমেত গোটা জগতটাই।
_____
ছবিঃ সুমিত রায়

গল্পের ম্যাজিক:: তুলোফুটকি আর ওর হারিয়ে-যাওয়া দিদিরা - তন্ময় ধর


তুলোফুটকি আর ওর হারিয়ে-যাওয়া দিদিরা
তন্ময় ধর

“পাপা, দ্যাখো কী সুন্দর পাখিটা জানালায় এসে বসেছে! কী নাম ওর?”
“ওর নাম তুলোফুটকি।”
“বাহ। কী সুন্দর নাম! আমায় তুলোফুটকি নামে ডাকতে পারো না?”
“বেশ। আজ থেকে তোকে তুলোফুটকি নামেই ডাকব।”
আমাদের খুকি তুলোফুটকির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মাতৃগর্ভেই মৃত্যু হয়েছিল ওর। কিন্তু ভোরের প্রথম আলোকবিন্দু এসে আমাদের ঘরের জানালা ছোঁয়, একটা শিশু তুলোফুটকি পাখি যখন ডেকে ওঠে, ভৈরবী রাগিনীর প্রথম কান্না এসে আমাদের ভোরের আধেকলীন স্বপ্নের প্যাথোস যখন ভিজিয়ে দিয়ে যায়, ঠিক সেই সময় ও এসে হারিয়ে যাওয়া উষামানবীদের কথা শুনতে চায়।
ঝাপসা চোখে ওর ছোট্ট আঙুল ধরে আমি হাঁটতে থাকি প্রাচীন এক পৃথিবীর মরুপর্বতময় প্রত্নস্থলে হারিয়ে যাওয়া উষামানবীদের পায়ের চিহ্ন ধরে।
“আজ আমরা কোথায় যাব, পাপা?” ভোরের আলোর মতো ল্যাপটপের ওপর ঝুঁকে পড়ে তুলোফুটকি।
“আজ আমরা যাব মধ্য এশিয়ার একটু পশ্চিমে। কৃষ্ণসাগর আর ক্যাস্পিয়ান সাগরের মাঝে একখন্ড তৃণভূমির মধ্যে হারিয়ে পাওয়া দমানিসি মানবীর খোঁজে...”
“দমানিসি! এ আবার কেমন নাম? কেমন যেন অমানিশি টাইপের...”
“সেইজন্যেই তো ওকে নিয়ে সেকালের কবিরা কবিতা লিখেছেন -
দমানিসি কিশোরী সে অমানিশি পেরিয়ে
পৃথিবীর রূপকথাদের সীমা এড়িয়ে
ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে ও চলতে
ভুলে গেছে কোন কথা রেখে যাবে বলতে...”
“ওরা কি বাংলা জানত নাকি?”
“না। তবে ওঁরা অস্ফুট ভাষায় যা বলতেন তা অনুবাদ করলে অমনই দাঁড়ায়। সে থাক, চল তুলোফুটকি, আমরা এখন ঠিক সেই জায়গাটায় যাব ঠিক যেখানে দমানিসি কিশোরীকে পাওয়া গিয়েছিল। দ্যাখ, কত নীল আকাশ এখানে! এপ্রিল মাসেও কেমন মিহি তুষারের কণা ছড়িয়ে আছে! গতকালই তুষারপাত হয়েছে। এই যে, এই প্রত্নস্থলেই দমানিসি কিশোরীর মাথার খুলিটা পাওয়া গিয়েছিল। ওর দাঁত দেখে বিজ্ঞানীরা বলছেন মাত্র তেরো বছর বয়সে ওর মৃত্যু হয়েছিল, আজ থেকে আঠারো লক্ষ বছর আগে। কিন্তু কেন যে মাত্র তেরো বছরেই ওর মৃত্যু হয়েছিল, সেটা জানা যায়নি। চল, জর্জিয়া ন্যাশনাল মিউজিয়ামে গিয়ে দেখে আসি, দমানিসি কিশোরীকে ঠিক কেমন দেখতে ছিল। জর্জিয়া আর ফরাসী প্রত্নবিজ্ঞানী আর শিল্পীরা বহু বছরের পরিশ্রমে দমানিসি কিশোরীর কী সুন্দর মূর্তি বানিয়েছে, দ্যাখ...”
“আহা গো! কী সুন্দর মেয়েটা! মাত্র তেরো বছরেই এমন রূপকথানীল আকাশের নিচের এমন সুন্দর দেশ ছেড়ে অজানার দেশে চলে গেল?”
“সে তো তুইও চলে গিয়েছিস, মাত্র ক’মাসেই। এই পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য্য দেখিসইনি...”
“আমার কথা আলাদা। আমি তো ভোরের পাখির গান হয়ে, প্রভাতকল্পার আলো হয়ে ফিরে ফিরে আসতে পারিতুমি দমানিসি কিশোরীর গল্পটা তাড়াতাড়ি শেষ করো...”
“দমানিসি কিশোরীর জীবাশ্ম যখন আবিষ্কৃত হল, তখন তার জাতিপরিচয় এবং সময়কাল নির্ধারণ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন বিজ্ঞানীরা। কার্বন-ডেটিং করে ওর সময়কাল যেটা দাঁড়াচ্ছে, সে সময়ের মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলছে না। আবার ওর চেহারাও আশেপাশের অঞ্চলের হোমো ইরেক্টাস গোষ্ঠীর সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। নতুন এক প্রজাতির প্রস্তাব দিলেন বিজ্ঞানীরা - হোমো স্যাপিয়েন্স জর্জিকাস। কিন্তু বিতর্ক পিছু ছাড়ল না। কেউ বললেন, দমানিসি কিশোরী আসলে হোমো এর্গাস্টার, কেউ বললেন বিশুদ্ধ হোমো ইরেক্টাস, কেউ বললেন আদিম হোমো হ্যাবিলিস এবং হোমো ইরেক্টাসের মিশ্র প্রজাতি। কেউ বললেন, ও নাকি ছোট্ট বয়সেই বাবা-মায়ের সঙ্গে বহু পথ পাড়ি দিয়ে সুদূর আফ্রিকা থেকে এই মধ্য এশিয়ায় এসেছে...”
“তাহলে ওর দাদু-দিদিমা নিশ্চয় আফ্রিকায় রয়েছে?”
“হ্যাঁ। রয়েছে তো। অনেক পুরোনো। ৩২ লক্ষ বছরের পুরোনো দিদিমা। তার নাম লুসি...”
“কাল সে গল্প শুনব। আজ আসি। বেলা হয়ে গেলে এমন চড়া রোদ্দুরে প্রাগিতিহাসের গল্পের মজা ঠিক জমে না।”
প্রত্নমানবী লুসির ভিডিও জোগাড় করে পরদিন প্রভাততরল আলোয় ল্যাপটপ খুলে বসলুম। তুলোফুটকি হেসে বলল, “পাপা, প্রাগিতিহাসের গল্প গরম কফি আর পেস্তা ক্রিম বিস্কুট ছাড়া ঠিক জমে না। আমার তো মুখ নেই। তুমি খাও, খেতে খেতে গল্প বলো। তাহলেই আমি মজা পাবআর ল্যাপটপে ব্যাকগ্রাউন্ডে সরোদে ভৈরব রাগিনী চালিয়ে দাও।”
আমরা পিতা-কন্যা হেঁটে চললাম ইথিওপিয়ার প্রত্নস্থলে। প্যালিওলিথিক সূর্যের স্নিগ্ধ আলো মাখা এক ভোরের রাস্তায় আমি কাহিনি বলে চললুম – “১৯৭৬ সালে এই হাদার প্রত্নস্থলেই আবিষ্কৃত আদিমানবীর জীবাশ্ম আলোড়ন ফেলেছিল প্রত্নবিদমহলে। জীবাশ্মের নাম রাখা হয়েছিল ‘লুসি’। স্থানীয় আমহারিক ভাষায় যার অর্থ ‘তুমি বিস্ময়কর’। মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এত বিখ্যাত বোধহয় আর কোনো জীবাশ্ম হয়নি। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে লুসির প্রতিরূপ নিয়ে অনেক প্রদর্শনী হয়েছে, বই লেখা হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘরে ঘরে সুপরিচিত নাম হয়ে গিয়েছে লুসি। লুসি ‘অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস’ গোষ্ঠীরই সদস্য। আর্গন-আর্গন ডেটিং পদ্ধতিতে লুসির বয়স নির্ধারিত হয়েছে প্রায় ৩২ লক্ষ বছর। প্রায় কয়েকশো হাড়ের টুকরো পাওয়া গিয়েছে লুসির। মাথার খুলির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং সমস্ত দাঁতসহ নিচের চোয়াল পাওয়া গিয়েছে। লুসির দেহ পুনর্নির্মাণ করে পুরাতত্ত্ববিদেরা বলছেন যে, লুসির পাকস্থলী ছিল বিশালাকৃতি এবং সে প্রচুর পরিমাণে শাকপাতা জাতীয় খাবার খেত। তার শরীরের রক্তপ্রবাহের ৬০ শতাংশ ব্যয়িত হত শুধু পৌষ্টিকতন্ত্রেই। মস্তিষ্কে ১০ শতাংশের বেশি রক্ত পৌঁছাত না, তাই মস্তিষ্কের তেমন বিকাশ হয়নি। বারো বছর বয়সে গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে লুসির মৃত্যু হয়।”
“গাছ থেকে পড়ে মৃত্যু হল? কেউ বাঁচাতে পারল না?”
“হ্যাঁ, ইতিহাস ওকে বাঁচিয়ে রাখল তো। হাদারের জল-বাতাস-ভূপ্রকৃতি সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে ওর জীবাশ্ম। ওর বাবা-মা-ভাই-বোনের দেহাবশেষ হারিয়ে গিয়েছে কবেই।”
টুপ করে ভোরের শিশিরের মতো জল গড়িয়ে পড়ে তুলোফুটকির চোখ থেকে। বত্রিশ লক্ষ বছর আগের এক মায়াময় শস্যশ্যামলা পৃথিবীর পথে পথে ঘুরতে লাগল ওর কল্পনা।
পরদিন ভোরে একটা পার্পল সূর্যপাখি এল তুলফুটকির সঙ্গে গল্প শুনতে।
“আজ আমরা স্টার্কফন্টেন গুহার ‘ছোট্ট পায়ের মেয়ে’-র গল্প শুনব। অস্ট্রালোপিথেকাস গোষ্ঠীর যত জীবাশ্ম আজ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে এই ছোট্ট পায়ের মেয়ের জীবাশ্ম সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ। তবে সব হাড়গুলো পাথরের মধ্যে একেবারে আষ্টেপৃষ্টে আটকানো ছিল, বিজ্ঞানীরা বহু পরিশ্রমে সেগুলো উদ্ধার করেন। ছোট্ট পায়ের মেয়ের হাত ও পায়ের হাড়ের গঠন দেখে বোঝা গিয়েছে যে, ও সোজা হয়ে হাঁটতে পারত। তবে ও রাতে মাটিতে শুয়ে ঘুমোত না, গাছে শুয়েই ঘুমোত। সম্ভবত গাছেই লতাপাতা দিয়ে চমৎকার এক বিছানা তৈরি করে নিয়েছিল। ফলমূল আর উদ্ভিজ্জ খাবারই খেত ছোট্ট পায়ের মেয়েটা...”
“ওকে নিয়ে অস্ট্রালোপিথেকাস কবিরা কবিতা বানায়নি?”
“হ্যাঁ। বানিয়েছে তো। কী যেন লাইনগুলো... হ্যাঁ... মনে পড়েছে -
ছোট্ট পায়ের মেয়ে
আকাশপানে চেয়ে
রূপকথাদের ঘুম ভাঙিয়ে
ফুলের রঙে সব রাঙিয়ে
চলছে যে কোন স্বপ্নতরী বেয়ে
আরও বানিয়েছে -
না-ফোটা তার কথার ঠোঁটে
সব কাননে কুসুম ফোটে
না-গাওয়া তার গানের সুরে
যুগ পেরিয়ে অনেক দূরে
জাগবে সবাই তারই পরশ পেয়ে
ছোট্ট পায়ের মেয়ে...”
ছড়া শুনে তুলোফুটকি হাততালি দিল, আর পার্পল সূর্যপাখিটা ডেকে উঠল খুব জোরে।
পরদিন সকালে আর্ডির গল্প শোনাতে শুরু করলাম তুলোফুটকিকে – “ইথিওপিয়ার আবাশ নদীর ধারে শুকনো জমিতে আর্ডির হাতের হাড়ের টুকরো খুঁজে পেয়েছিলেন এক কলেজ ছাত্র ইয়োহান্নেস। পরে বিজ্ঞানী টিম হোয়াইট জীবাশ্মের অন্যান্য অংশগুলি খুঁজে পান এবং বিজ্ঞানী আওয়েন লাভজয় সেই প্রত্নমানবীর পুনর্নির্মাণ করেন। তার বিজ্ঞানসম্মত নাম রাখা হল ‘আর্ডিপিথেকাস রামিডাস’, স্থানীয় ইথিওপিয়ান ভাষায় তার অর্থ ‘ভূমিচারী শিকড়’, সে শিকড় মানব বিবর্তনের। ডাকনাম ‘আর্ডি’। বিস্তর চর্চা হয়েছে আর্ডির জীবাশ্ম নিয়ে। আর্ডির জীবনচর্চারও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তার দৈহিক উচ্চতা ছিল ৩ ফুট ১১ ইঞ্চি, ওজন ছিল প্রায় ৫০ কিলোগ্রাম। পায়ের আঙুলের হাড়ের গঠন দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সে মাটিতে হাঁটতে যেমন স্বচ্ছন্দ ছিল, তেমনি ছিল গাছে চড়তে ওস্তাদ। দাঁতের এনামেল দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, আর্ডির মূল খাদ্য ছিল ফল এবং দানাশস্য। আর্ডির চেয়ে পুরোনো তোর কোনো দিদি এখনও পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নিওর বয়স ৪৪ লক্ষ বছর।”
“যাহ! গল্প ফুরিয়ে গেল। আর কোনো দিদি নেই? কাল তাহলে আমি কী শুনতে আসব?”
“আগামীকাল... খুঁজে দেখি... যদি কিছু পাই...” ভোরের হাওয়ার সামান্য স্পন্দনের দিকে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করি, “আচ্ছা, তুই ডেনীর গল্প তো শুনিসনি, না?”
“না। কাল তাহলে ডেনীর গল্পআর ব্যাকগ্রাউন্ডে বিভাস রাগ বাজাবে। আজ এলাম তাহলে...”
পরদিন সকালে সাইবেরিয়ার আলতাই পাহাড়ে ডেনিসোবা গুহায় এলাম ডেনীর খোঁজে। চারদিকে বরফ আর বরফ। তুলোফুটকি বলল, “আমি ডেনীর সঙ্গে স্নো বল ছোঁড়াছুঁড়ি খেলব। কোথায় লুকিয়ে আছে ও?”
ডেনীর ইতিহাস লুকিয়ে ছিল বরফের তলায়। মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এই নব্বই হাজার বছরের পুরোনো বালিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মা ছিল নিয়ান্ডারথাল জনগোষ্ঠীর আর বাবা ছিল ডেনিসোবানিয়ান জনগোষ্ঠীর। ২০১২ সালে ডেনীর জীবাশ্ম আবিষ্কার হওয়ার পর সুবিখ্যাত ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিট্যুটে ওর জিন নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে।
“পাপা, ডেনীকে নিয়ে কেউ ছড়া লেখেনি?”
“নিশ্চয় লিখেছে -
আমাদের ছোটো ডেনী
দুলিয়ে দুলিয়ে বেণী
খেলা করে সুগভীর বরফে
ছোট্ট ছোট্ট পায়ে
পৃথিবীর আলো-ছায়ে
লেখে ইতিহাস নয়া হরফে
আমাদের তরফে।
মাত্র তেরো বছর বয়সে ডেনীর মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি...”
“ডেনীর কোনো মূর্তি বানায়নি বিজ্ঞানীরা?”
“মূর্তি তো তার খুঁজে পেলুম না। তবে বিজ্ঞানীদের রিকনস্ট্রাকশনের ওপর ভিত্তি করে শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন। এই দ্যাখ সেই ছবি...”
“ওয়াও। কী সুন্দর গোলাপী রঙ! কিন্তু ওর চুলে তো বেণী বাঁধা নেই!”
“হুম,” আমি গম্ভীরভাবে বললাম, “শিল্পীরা নিজের খেয়ালে চলেন। কবিদের সঙ্গে কনসাল্ট করেন না বলেই অনেক ইতিহাস ফসকে যায়...”
“পাপা, ওই ছবিটা কার? কী সুন্দর দুধে-আলতা রঙ! ও কি ডেনীর বোন নাকি?”
“মাসতুতো বোন বলতে পারিস। ও জিব্রাল্টারের গুহায় হারিয়ে গিয়েছিল...”
“তবে যে তুমি বলছিলে, আর গল্প নেই? কাল আসব এই দুধে-আলতার গল্প শুনতে। ছড়া আর ছবি জোগাড় করে রেখো। ব্যাকগ্রাউন্ডে আশাবরী আর ভৈরবী মিশিয়ে বাজাবে। আজ চললুম।”
পরদিন ভোরের হাওয়ার মতো এসে তুলোফুটকি প্রথমেই আবদার করল, “আগে ছড়াটা শোনাও। তারপর গল্প...”
“বেশ। তাই হবে। নিয়ান্ডার্থাল কবিরা খুব দুঃখমেশানো ছড়া লিখেছিল ওকে নিয়ে -
এই তো জীবন ওরে দুধে-আলতা
আজ যা আছে, নেই দেখ আর কাল তা!
এই তো জীবন ওরে সুলোচনা
কার সাথে আর কী করবি আলোচনা?
ও ঠোঁটের হাসি আর ও চোখের ভাষাতে
ইতিহাস লেখা হয়ে থাক নয়া আশাতে
যে কাল ফুরোলো, যা রয়ে গেল বাকি
তোর হাতে বেঁধে দিই সে কালের রাখী।”
“কেন? এত দুঃখ কেন?”
“তখন পৃথিবী থেকে গোটা নিয়ান্ডার্থাল প্রজাতিই অবলুপ্ত হতে চলেছে। ক্রোম্যাগনন, ডেনিসোভান ইত্যাদি গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে না পেরে আইবেরিয়ান উপদ্বীপের একপ্রান্তে এসে ঠেকেছে। মৃতের উদ্দেশ্যে ফুল দেওয়া, খাবার দেওয়া, মাতৃ-উপাসনা, ছবি আঁকা, গয়না তৈরি ইত্যাদি আরো কত কী উদ্ভাবন করে মানব বিবর্তনের ইতিহাস সমৃদ্ধ করে তারা নিজেরাই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে সে সময়। নিয়ান্ডার্থাল কবিরা তখন উদাস হয়ে ভূমধ্যসাগর তীরে বসে দেখছে, বালুকাবেলায় পায়ের চিহ্ন মুছে দিচ্ছে ঢেউ। দুধে-আলতা মেয়েটি ঝিনুক কুড়োতে কুড়োতে অস্ফুট ভাষায় ওদের প্রবোধ দিত - সব ঠিক হয়ে যাবে...”
“তারপর?”
“ঠিক আর হল না সব। পৃথিবী আরও উষ্ণ হল, খাবারের অভাব হল, যুদ্ধ হল। আস্তে আস্তে পায়ের চিহ্ন মুছে গেল ওদের। সে সব দেখার আগে গুহার অন্ধকারে পথ হারিয়ে মৃত্যু হল দুধে-আলতার...”
তুলোফুটকির কান্নার মতো টুপ টুপ করে ঝরতে লাগল ভোরের শিশির। পৃথিবীর কোমলতম সেই শব্দের সামনে থেকে আমিই হারিয়ে গেলাম এক সময়।
_____
ছবিঃ অতনু দেব