গল্পের ম্যাজিক:: অন্য ব্রহ্মাণ্ডে - তন্ময় ধর


অন্য ব্রহ্মাণ্ডে
তন্ময় ধর

‘রাস্তা ভুল হয়েছে, মোহনজি। চার কিলোমিটারের বদলে আমরা প্রায় ১৫ কিলোমিটার চলে এসেছি। গাড়ি থামিয়ে কাউকে একবার জিজ্ঞাসা করা উচিত
‘কাকে জিজ্ঞাসা করব? এতখানি রাস্তায় একটাও মানুষের মুখ দেখলেন? ৩৫ বছর ধরে কুমায়ুন-গাড়োয়ালে গাড়ি চালাচ্ছি। এত ঘন কুয়াশা আর এমন জনমানবহীন রাস্তা বাপের জন্মে দেখিনি,’ বলতে বলতেই হঠাৎ করে ব্রেক চাপলেন মোহন ঘিল্ডিয়াল, ‘যাক। একজন মানুষের দেখা পাওয়া গিয়েছে
রাস্তার ধারের সেই বৃদ্ধ মানুষটির আপাদমস্তক শীতবস্ত্রে মোড়া। মুখের যেটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে, তাতে বয়স অন্ততপক্ষে পঁচাত্তর তো হবেই। গাড়ির জানালার কাছে এসে প্রখর দৃষ্টিতে আমাদের তিন জনের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন এক্স-রে স্ক্যান করে নিলেন। তারপর ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বললেন, ‘দেবস্থল যাবেন? রাস্তা তো অনেক আগেই ভুল করেছেন। এখান থেকে বলে দিলেও বুঝবেন না, রাস্তাটা বড্ড গোলমেলে। যদি কিছু মনে না করেন, আমি আপনাদের সঙ্গে গাড়িতে আসতে পারি কি?’
ভদ্রলোকের কথায় কেমন যেন সন্দেহজনক একটা ইঙ্গিত। কিন্তু অজস্র কাটাকুটিতে ভরা মুখ আর শান্ত চোখে অদ্ভুত এক সারল্য। সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে মোহনজি আমার আর রোহিত রাওয়াতের মুখের দিকে তাকালেন।
আমি কিছু বলার আগেই রোহিত বিনীতভাবে বললেন, ‘নিশ্চয়। নিশ্চয়। তাহলে আমাদের খুব উপকার হয়। প্লিজ, গাড়িতে উঠে আসুন
ড্রাইভার মোহনের পাশের সিটে এসে বসলেন বৃদ্ধ। উঠেই সিটবেল্ট বেঁধে নিলেন। হাসলেন, ‘আমার নাম কুন্দনলাল বহুগুণা। দেবস্থলের টেলিস্কোপ অফিসেই সাধারণ কর্মচারী ছিলাম। দুর্ভাগ্যজনক একটা ঘটনায় চাকরি খোয়াতে হয়’ একটু থেমে বললেন, ‘একটা শর্টকাট রাস্তায় নিয়ে যাব। রাস্তাটা অবশ্য বেশ চড়াই এবং প্যাঁচালো। বাঁ দিকের এই নিচের রাস্তাটায় নামুন
ভয়ঙ্কর লাফাতে লাগল গাড়ি। চারপাশে বাদামি কুয়াশায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাইরের হাওয়াও যেন হঠাৎ করে ভীষণ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।
মোহনজি ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘এই রাস্তায় অনেকদিন কোনও গাড়ি চলেনি মনে হয়
‘মনোযোগ দিয়ে চুপচাপ গাড়ি চালান,’ একটু যেন ধমকের সুর বহুগুণার গলায় ‘ডাইনে-বাঁয়ে না তাকিয়ে সোজা রাস্তায় এগিয়ে চলুন,’ বলে গুনগুনিয়ে কুমায়ুনী লোকসঙ্গীত গাইতে শুরু করলেন।
আমার মনে কোথাও একটা সন্দেহ আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল। জোর করেই আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম বহুগুণার সঙ্গে, ‘কী একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আপনার চাকরি গিয়েছিল বলছিলেন, আপত্তি না থাকলে একটু যদি বলেন...’
‘অবশ্যই বলব। সেটা বলার জন্যেই তো গাড়িতে উঠে...’ থেমে গেলেন বহুগুণা ‘তবে গাড়িতে বসে তাড়াহুড়োয় শুনতে ভালো লাগবে না। একেবারে অকুস্থলে মানে দেবস্থলে গিয়ে শুনবেন...’ কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা অজানা পাখি তীব্র স্বরে বিচ্ছিরিভাবে ডেকে উঠল পথের ধারের কুয়াশার আড়ালে।
পথ আর ফুরোচ্ছে না। প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল। যত খারাপ রাস্তাই হোক, অন্তত কুড়ি কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এসেছি। রোহিত অধৈর্য্য হয়ে উঠল, ‘এই আপনার শর্টকাট রাস্তা? এতে তো আরও দেরি হচ্ছে। আপনি মনে হচ্ছে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছেন। আপনাকে বিশ্বাস করাটাই ভুল হয়েছে...’
‘এখন আর কিছু করার নেই। পথ ঠিক না ভুল - সেটা বিচার করার সুযোগ আর নেই। এখন আপনারা অন্য এক জগতে যাবেন। অন্য ব্রহ্মাণ্ড। প্যারালেল ইউনিভার্স,’ চওড়া হাসি হাসলেন বহুগুণা।
‘মানে?? আপনি কি আমাদের সঙ্গে মশকরা করছেন নাকি?’ রোহিত উত্তেজিত হয়ে উঠল।
‘বালাই ষাট। আই অ্যাম ড্যাম সিরিয়াস। একটু আগেই বরং মশকরা করছিলাম। এখন আমার আসল পরিচয়টা দিই। আমি এখানকার প্রিন্সিপল সায়েন্টিস্ট ছিলাম। ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রের শিকার হই আমি। তাই এটা আমার প্রতিশোধই বলতে পারেন। বাট ফর ইয়্যু, ইট উইল বি আ গ্রেট অ্যাডভেঞ্চার
রোহিতের বরাবরই মাথাগরম। ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘মামদোবাজি পেয়েছেন নাকি? আপনি একটা ভীমরতিপ্রাপ্ত বুড়ো আমাদের সঙ্গে মশকরা করবেন, আর আমরা ছেড়ে দেব? তিনজন জোয়ানের সঙ্গে পারবেন আপনি? ওই তো হাড়-ক’খানা-সার চেহারা, একটা টোকা মারলে পাহাড়ের খাদে পড়ে ছবি হয়ে যাবেন...’
‘তিনজনের সঙ্গে একা পারব বলেই তো একা এসেছি। নইলে তো দলবল নিয়েই আসতাম। দেবস্থলে যে সায়েন্টিস্টের ভরসায় তোমরা যাচ্ছ, সেই সৌরীশ সান্যালকে আমি আগেই সরিয়ে রেখেছি। তোমরা অপহৃত হওয়ার আগে কোথায় ছিলে, সে খবর কেউ জানে না। আর তোমাদের মোবাইল ফোন এখন কাজ করছে নাচেক করে দেখতে পারো। ফিরে যাওয়ার পথও নেই। তোমরা প্যারালেল ইউনিভার্সে ঢুকে পড়েছ...’
রোহিত ভয়ঙ্কর উত্তেজিত। মোহনজির দিকে তাকাল, ‘ড্রাইভারসাব, গাড়ি ঘোরান। আর এই পাগলকে এখানেই নামিয়ে দিন
বহুগুণা এবার অট্টহাস্য করলেন, ‘চেষ্টা করে দ্যাখো। গাড়ি ঘুরবেই না
সত্যিই গাড়ি ঘুরল না।
‘বাইরে তাকিয়ে দ্যাখো, কুয়াশা কেমন কালচে হয়ে গিয়েছে। কুয়াশার আড়ালের আবছা গাছপালা কেমন মেরুন হয়ে গিয়েছে। বিপরীত বস্তুর এক জগতে প্রবেশ করেছ তোমরা। গাড়ির চারপাশে আমি একটা উচ্চশক্তিমাত্রার শীল্ডের ব্যবস্থা করেছি। নইলে এতক্ষণে তোমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে। এই গাড়িটা এখন ভয়ঙ্কর জটিল একটি জ্যামিতিক তলের ওপর রয়েছে। তোমরা এম-থিওরি বোঝো? স্ট্রিং থিওরির ১১টি মাত্রা বোঝো?’
‘কী পাগলের পাল্লায় পড়লুম রে বাবা!’ রোহিত ভীষণ অসন্তুষ্ট।
আমিও এতক্ষণ ধৈর্য ধরে রেখেছিলাম। এবার বিরক্ত হয়ে মুখ খুললাম, ‘দেখুন, এসবে আমাদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। আমরা অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সের লোক। ইনসট্রুমেন্ট নিয়ে কাজ করি। অফিসের কাজে গত সাত দিন ধরে তিন জেলায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। আমাদের রেহাই দিন। পরে কখনও এসে আপনার এক্সপেরিমেন্ট দেখে যাব, আপনার কাহিনি শুনে যাব...’
‘পরে? ধুর, আমার কোনও ভবিষ্যৎ কালই নেই
রোহিতের মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বের হচ্ছে না। আমি হতাশ গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বেশ, আপনার কী ইচ্ছা বলুন? অন্য জগতে আমাদের এনে আপনার কী লাভ হচ্ছে? আর এটা করছেনই বা কীভাবে?’
‘লাভ বা ইচ্ছে – কোনোটাই আমার নয়। সবই সুবৃহৎ জগতের স্বার্থে। অনেক শক্তিশালী যন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে এই এক্সপেরিমেন্টে। সে সব তোমাদের ধারণার অতীত। অনেক ক্যালকুলেশন করে তবেই তোমাদের ধরেছি...’
‘কিন্তু আমাদেরই কেন? আমরা নিতান্তই অনিচ্ছুক, ক্লান্ত। বার বার অনুরোধ করছি, আমাদের অব্যাহতি দিন
‘তোমাদের ছাড়া হবে না। এক্সপেরিমেন্টটা শুরু হয়ে গিয়েছে। অনেক অঙ্ক কষে তোমাদের সিলেক্ট করা হয়েছে। তোমাদের বয়স, উচ্চতা, চিন্তা - সব ক্যালকুলেট করা হয়েছে। আর তোমাদের এমন একটা সময় অপহরণ করা হয়েছে যখন তোমরা চারপাশের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলে। বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়া করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাক্টিভেট, ফোন সুইচড অফ, ট্যুইটার-জিমেল-লিঙ্কড ইন সব বন্ধ। দুই বিজ্ঞানীর এক কেস। তোমাদের আধবুড়ো ড্রাইভার, সেও অবেলায় এক তরুণীর প্রেমে পড়ে ফোন-হোয়াটস অ্যাপ বন্ধ রেখেছিল। আমি মোক্ষম সময়ে লোক লাগিয়ে রেখেছিলাম। তারা তোমাদের পথ ভুলিয়েছে। তারপর আমি পিক আপ করেছি
‘কিন্তু অন্য ইউনিভার্সে যাওয়ার ব্যাপারটা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনি আমাদের পুরোনো ব্রহ্মাণ্ডে একবার ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে শুরু থেকে পুরো এক্সপেরিমেন্টটা আবার করে দেখান,’ রোহিত একটা নতুন চাল চালার চেষ্টা করল।
‘না ভাই। এই অনুরোধ রাখতে পারলাম না। এটা একমুখী প্রক্রিয়া। চালাকি করে পালাতে পারবে না,’ বহুগুণা হাসলেন, ‘এক্সপেরিমেন্টটা বুঝতে গেলে আগে বুঝতে হবে কোন ধরনের সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ডে আমরা যাচ্ছি। কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে বুঝতে চাইলে হিলবার্ট স্পেস নামে এক ধরনের তাত্ত্বিক ও বিমূর্ত স্থানের কথা ভাবতে হবে। এই তাত্ত্বিক স্পেস অসীম-মাত্রিক এবং একটি কোয়ান্টাম জগত এই হিলবার্ট স্পেসের সাপেক্ষে বিভিন্নভাবে ঘুরতে পারে। এই তত্ত্ব মতে যে ধরনের মহাবিশ্বের কথা বলা হয়, সেগুলো প্রত্যেকটি একই জায়গায় এবং একই সময়ে সহ-অবস্থান করছে, কিন্তু প্রত্যেকে আলাদা ডাইমেনশনে অবস্থিত বলে কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। যোগাযোগ করতে না পারলে কী হবে, প্রতিটি মুহূর্তে নেয়া আমার সিদ্ধান্তগুলো হয়তো আমার মতো অসংখ্য আমারই হুবহু প্রতিরূপের সঙ্গে মিলিতভাবেই নেয়া হচ্ছে। আমার নাকের ডগায়ই হয়তো একটি সমান্তরাল মহাবিশ্ব রয়েছে, শুধু আলাদা মাত্রায় অবস্থিত বলে তাকে ধরা ছোঁয়া যাচ্ছে না। এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতারা মনে করেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুত নিয়মগুলোর উৎপত্তি আসলে এরকম অসীমসংখ্যক সমান্তরাল মহাবিশ্বের যোগাযোগের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এ ধরনের সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলোকে লেভেল থ্রি প্যারালাল ইউনিভার্স বলা হয়। স্ট্রিং তত্ত্বে অন্তর্বর্তী জগতের মাত্রাগুলো বিভিন্ন ভাবে পেঁচিয়ে থাকার কারণে বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক নিয়মাবলী সমৃদ্ধ মহাবিশ্বের উদ্ভব হতে পারে। এ রকম আলাদা আলাদা নিয়মের মহাবিশ্বগুলোর সবকিছুই আলাদা। এমন সব মহাবিশ্বের বেশিরভাগই প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্য অনুপযোগী। যদিও আমরা এমন মহাবিশ্বের প্রমাণ পাইনি, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে এরকম মহাবিশ্বের সংখ্যা প্রায় অসীম, ১০-এর পিঠে ৫০০ খানা শূন্য আর এর ভিতর আমাদের মহাবিশ্বের মতো নিয়মযুক্ত মহাবিশ্বের সংখ্যাও অগণিত। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে স্পেস বা স্থানকে আমরা যেরকম সমতল বলে ভাবি, স্পেস আসলে তেমন না, বরং এটি বাঁকানো। আলো যখন মহাশূন্যের (স্পেস) ভিতর দিয়ে ভ্রমণ করে, তখন এই বাঁকানো স্পেসের ভেতর দিয়ে একটি বাঁকানো পথে চলতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই বাঁকা পথের পাশাপাশি একটি সংক্ষিপ্ত রাস্তাও আছে। এই সংক্ষিপ্ত পথই হল ওয়ার্মহোল বা আইনস্টাইন-রোজেন সেতু দুটি স্থানে যাবার এই বিভিন্ন রাস্তা থাকার কারণে গণিতবিদরা একে বহুভাবে সংযুক্ত স্থান বলেন। কিন্তু পদার্থবিদরা একে পোকার গর্ত বা ওয়ার্মহোল বলেন, কারণ, একটি পোকা যেমন মাটি খুঁড়ে পৃথিবীর এই প্রান্তের সঙ্গে অন্য প্রান্তের একটি সংক্ষিপ্ত রাস্তা তৈরি করতে পারে, তেমনি একটি ওয়ার্মহোলও মহাবিশ্বের দুটি স্থানের ভিতর একটি বিকল্প সংক্ষিপ্ত রাস্তা তৈরি করে।
'আমাদের সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রপুঞ্জ হল আলফা সেন্টরাই। সৌরজগৎ থেকে আলোর বেগে ভ্রমণ করলেও পার্শ্ববর্তী এই নক্ষত্রপুঞ্জে যেতে আমাদের কমপক্ষে ৪.৩ বছর সময় লাগবে (বাস্তবে যা অসম্ভব, কেন না কোনও কিছুর পক্ষেই আলোর বেগে ভ্রমণ সম্ভব নয়)। কিন্তু যদি কেউ একটি ওয়ার্মহোল দিয়ে যেতে পারে তবে কয়েক মুহূর্তে আলফা সেন্টরাই থেকে ঘুরে আসা সম্ভব। আইনস্টাইনের তত্ত্ব আমাদের মহাবিশ্বের দুটি ভিন্ন স্থানের মধ্যে ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে ভ্রমণের কথা বললেও, স্ট্রিং তত্ত্বের সমাধান অনুযায়ী আমরা যদি একটি ওয়ার্মহোল তৈরি করতে পারি তা আমাদের মহাবিশ্বের যে কোনও গালাক্সির পাশাপাশি অন্য মহাবিশ্বে ভ্রমণের সম্ভাব্যতার কথাও বলে। এমনকি একটি ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে শুধু দুটি ভিন্ন মহাবিশ্বেই নয়, এমনকি অতীত ও ভবিষ্যতেও ভ্রমণ করা সম্ভব। স্ট্রিং তত্ত্ব যে অতিরিক্ত মাত্রার কথা বলে, আমরা যদি সেই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো দিয়ে একটি আন্তঃমাত্রিক ভ্রমণের পথ তৈরি করতে পারি, তাহলে খুব কম সময়েই অন্য মহাবিশ্বের অন্য সময়ে গিয়ে উপস্থিত হতে পারব। স্ট্রিং ফিল্ড থিওরির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড. মিচিও কাকু একটি হাইপোথেটিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন করেছেন। এতে আমরা স্থান-কালের দেয়াল ভেদ করে ওয়ার্মহোল দিয়ে অন্য মহাবিশ্বে পাড়ি দিতে পারব। পদ্ধতিটি খুব বেশি জটিল নয়প্রথমে আমাদের যে কোনও একটি নক্ষত্রকে বেছে নিতে হবে। তারপর একটি শক্তিশালী গামা-রশ্মি সেই নক্ষত্রের চারিদিকে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে গামা-রশ্মিগুলোকে আবার নিজেদের উপরে ফেলতে হবে। এরকম শক্তিশালী রশ্মি নিজের উপর চক্রাকারে উপরিপাতন হবার ফলে শক্তির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। একসময় প্রচুর শক্তি সৃষ্টি হলে, স্থান-কালের দেয়ালে একটি ওয়ার্মহোল তৈরি হবে। এখন এই ওয়ার্মহোলকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য মহাবিশ্বে পাড়ি দেয়া যাবে! এই প্রক্রিয়াটিই আমরা এখন সফলভাবে করে চলেছি। বাইরে অত্যধিক গামা-রে ফগের জন্য তোমরা তাত্ত্বিকভাবে কিছু দেখতে পাচ্ছ না। আমরা বহু সহস্র আলোকবর্ষ পেরিয়ে এসেছি। তোমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সিকে ছ্যাঁদা করে বেরিয়ে এসেছি
‘কিন্তু আমার মাথা যে ভীষণ ঝিম ঝিম করছে,’ আমি হতবুদ্ধি মুখ করে বললাম।
‘করবেই তো। স্নায়ুতন্ত্রের পরমাণুতে পরমাণুতে ধাক্কা লেগেছে,’ বহুগুণার স্বর পালটে গেল, ‘আমার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, আমি আলো হয়ে গিয়েছি। আমি আর বস্তুগত জগতে নেই। তোমরাও এবার আলো হয়ে যাবে। প্রস্তুত হও
আর কী প্রস্তুত হব? মাথা তো কখন থেকেই ঝিমঝিম করছে। হঠাৎ প্রবল একটা ঝাঁকুনির পর দেখলাম চারপাশে শুধুই আলো। কোনও বস্তু নেইকোনও অন্ধকার নেই। কোনও শব্দ নেই। শুধু তীব্র এক আলো। আমি থেমে আছি, নাকি চলছি, কিছুই বুঝতে পারছি না। আলো, আলো, অনন্তবিস্মৃত এক আলো। সেই অসীম আলোর ভার অসহ্য হয়ে উঠল।
চেঁচিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। মুখ দিয়ে কোনও শব্দই বের হল না। শুধু আলো ছাড়া কিছুই যে কোথাও নেই। হঠাৎ কানে খুব মিহি একটা গানের সুর ভেসে এল। আমার মায়ের গলা। ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে আমায় ঘুম পাড়াচ্ছেন। আমার ঠাকুরদার গলা পেলাম। কী আশ্চর্য তরুণ স্বর। তাহলে কি হু-হু করে অতীতে ফিরে যাচ্ছি? হে ঈশ্বর, কোথায় গিয়ে এই যাত্রা থামবে?
অদ্ভুত একটা সেতারের শব্দের মতো শব্দ ভেঙে ভেঙে ভেসে এল। খুব মন দিয়ে শুনলাম। না, সেতারের শব্দ নয়। মানুষের কন্ঠস্বর। আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে। কিছু একটা বলতে চাইছে, ‘প্রাণপণে চেষ্টা করে আপনি নিজের ডান দিকে সরে যান। কিছুটা সরলেই আমরা আপনাকে উদ্ধার করতে পারব
আমি চেষ্টা করতে থাকি। হ্যাঁ, সত্যিই তো এবার দেহবোধ ফিরে আসছে। এই তো অন্ধকার এক পাথরের দেয়াল। তার ওপর ভর রেখে আস্তে আস্তে ডান দিকে সরতে লাগলামঠিক তখনই দড়িটা হাতে এসে লাগল।
‘শক্ত করে চেপে ধরুন,’ আদেশ ভেসে এল।
উদ্ধারকারী দলের তৎপরতায় প্রায় চল্লিশ মিনিটের চেষ্টায় নিরাপদ এক পাহাড়ী উপত্যকায় পৌঁছালাম। রোহিত আর মোহনকেও উদ্ধার করে আনলেন ওঁরা। টানা ছ’দিন নাকি আমরা নিরুদ্দেশ ছিলাম।
‘আপনাদের গাড়িটা দেবস্থলের কাছেই রাস্তার ধারে অক্ষত অবস্থায় দাঁড় করানো আছে। কিন্তু আপনারা কীভাবে কোথায় গিয়েছিলেন? আপনাদের শরীর থেকে এই পবিত্র গন্ধ আর দিব্য জ্যোতি বেরোচ্ছে কেন?’ হাজারো প্রশ্ন নিয়ে হামলে পড়লেন উদ্ধারকারী অফিসারেরা।
‘আমরা অন্য ব্রহ্মাণ্ডে গিয়েছিলাম,’ এই কথাটুকু বলার জন্য যেই না মুখ খুলেছি অমনি বিক্রমাদিত্যের বেতালের মতো হুশ করে সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল পুলিশ সমেত গোটা জগতটাই।
_____
ছবিঃ সুমিত রায়

No comments:

Post a comment