বহুরূপী :: জঙ্গলের ডায়ারিঃ লেপার্ড – লেখা ও ছবি স্বর্ণ চক্রবর্তী


জঙ্গলের ডায়ারিঃ লেপার্ড
স্বর্ণ চক্রবর্তী

লেপার্ড, ভারতবর্ষের জঙ্গলে যেন একটুকরো জ্বলন্ত আগুন। এর নিশ্চুপে চলাফেরা, শিকার করা কিংবা অলস ভাবে গাছের উপর পা ঝুলিয়ে সময় কাটানো সবটাই অনবদ্য এবং ভারতবর্ষে থাকা আর সব বড় বন্য বেড়ালদের তুলনায় অপূর্ব সুন্দর। ভারতীয় লেপার্ড বা Common Leopard (Panthera.pardus.fusca) ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত রকম জঙ্গলেই দেখতে পাওয়া যায়। এর গায়ের রঙ মূলত হলুদ আর তাতে ছড়িয়ে রয়েছে কালো রঙের বুটি, যা এর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জঙ্গলে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইতে লেপার্ড তুলনায় অন্যদের থেকে একটু হলেও এগিয়ে রয়েছে কারণ খাবারের ব্যাপারে লেপার্ড কোনও বাছবিচার করে না। হরিণ, বাঁদর, খরগোশ, ময়ূর, বনমুরগী থেকে শুরু করে গ্রামের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুর কোনওটাতেই অরুচি নেই। যেহেতু লেপার্ড সাংঘাতিক ভালো গাছে উঠতে পারে তাই অনেক সময়েই শিকার ধরার পর তা বাঘের হাত থেকে বা বুনো কুকুরদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যও গাছের উপর উঠিয়ে নিয়ে যায়। সাধারণতঃ দিনে রাতে দু’বেলাই চোখে পড়লেও লেপার্ড বেশি সক্রিয় থাকে রাতের বেলায়।
ভারতবর্ষের উত্তরপূর্বের গভীর পাহাড়ি অরণ্যে এবং পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বৃষ্টিঅরণ্যে অনেকসময়েই কালো রঙের লেপার্ড দেখতে পাওয়া যায়। এই কালো লেপার্ড বা কালো চিতাই ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ নামে পরিচিত। জিনগত কারণে আসলে এদের গায়ের রঙ হয়েছে কালো।
লেপার্ডকে আমরা অনেক সময়েই বাংলায় ‘চিতাবাঘ’ বলি। চিতা কথাটার উৎপত্তি কিন্তু ভারতবর্ষ থেকেই (‘চিতি’ যার অর্থ ছোপ)। ভারতবর্ষের লেপার্ড আর আফ্রিকার মাঠে দুর্বার গতিতে দৌড়ানো চিতা (Cheetah – Acionyx jubatus ) এ দুটি আলাদা প্রজাতি। একসময় ভারতবর্ষের মাঠে চিতা বা Cheetah কে ছুটে বেড়াতে দেখা যেত। কিন্তু বিশ শতকে এরা পুরোপুরি হারিয়ে যায় ভারতবর্ষের বুক থেকে, সেই সঙ্গে থেমে যায় এদের দম বন্ধ করা দৌড়ও। লেপার্ডের সাথে চিতার বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন — তুলনায় লেপার্ড একটু মোটাসোটা কিন্তু চিতা রোগা ছিপছিপে। লেপার্ডের পা গুলি বেশ শক্তিশালী আর চওড়া যার জন্য শিকারকে নিয়ে সরাসরি গাছে উঠে যেতে পারে। আর চিতার পা গুলি সরু ফলে মাঠের উপর অবিশ্বাস্য গতিতে (৮৫-৯০ কিলোমিটার/ ঘণ্টা বেগে) দৌড়তে পারে। এই গতির জন্যই চিতা পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণী। এছাড়া যখন লেপার্ড তার পায়ের নখগুলি ব্যবহার করে না তখন সেগুলিকে থাবার ভিতর ঢুকিয়ে রাখে কিন্তু চিতার পায়ের নখ সবসময় বাইরে বেরিয়ে থাকে। লেপার্ডের মুখটা কালো ছোট ছোট বুটিতে ভর্তি। কিন্তু চিতার বেলায় চোখ থেকে উপরের ঠোঁট পর্যন্ত গাঢ় কালো দাগ নেমে এসেছে।
লেপার্ড কিন্তু শুধু ভারতবর্ষেই আটকে নেই, সারা পৃথিবীতেই সে তার উপস্থিতি গর্বের সঙ্গে প্রমাণ করেছে। পৃথিবীতে মোট নয় প্রজাতির লেপার্ড রয়েছে - African Leopard (P.p.pardus), Indian Leopard (P.p.fusca), Arabian Leopard (P.p.nimr), Persian Leopard (P.p.saxicolor), North Chinese Leopard (P.p. japonensis), Amur Leopard (P.p.orientalis), Indo-Chinese Leopard (P.p.delacouri), Javan Leopard (P.p.melas) এবং Srilankan Leopard (P.p.kotiya)এছাড়াও ভারতবর্ষের হিমালয় অঞ্চলে বরফ ঢাকা পাহাড়চূড়ায় ঘুরে বেড়ায় তুষার চিতা বা Snow Leopard (Panthera uncia) আর নেপাল ভুটানের গভীর পাহাড়ি জঙ্গলে  এবং অরুণাচল প্রদেশের ঘন অরণ্যে বাস করে Clouded Leopard (Neofelis nebulosa) বা “মেঘ চিতা”। একে আবার দক্ষিণ এশিয়ার ঘন জঙ্গলেও দেখতে পাওয়া যায়।

________
ছবি - লেখক

No comments:

Post a comment