ভ্রমণ:: ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮(২য় পর্ব) - আইভি দত্ত রায়

আগের পর্ব এখানে - প্রথম পর্ব

ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮
আইভি দত্ত রায়

।।  দ্বিতীয় পর্ব ।।

সকাল সকাল উঠে বেরোনোর তোড়জোড় শুরু করেও বেরোতে সেই ন’টা বাজতে পাঁচ। আমার কিছুটা উদ্বেগ ছিল, কাল এখান থেকেই উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর হু...ই উঁচুতে একটা গিরিশিরার ঢেউখেলানো অবয়ব দেখিয়ে বিপিন বলেছিল ঐখানে যেতে হবে আমাদের। ওটাই ‘দারোয়া টপ’ আর তার পাশের খাঁজটাই ‘দারোয়া পাস’। সুতরাং, কত উঁচুতে চড়তে হবে, কত সময় লাগবে, রাস্তা কেমন – এইসব ভাবতে ভাবতে হন্টন আরম্ভ করলাম। আমি একটু আস্তে হাঁটি বলে সবার আগে হাঁটা শুরু করতে চেষ্টা করি। রাস্তায় বসি না, হাঁপিয়ে গেলে দাঁড়াই, জল খাই, আবার চলি। প্রথম চার কিলোমিটার রাস্তা ডোডিতালের ফিডার নালার পাশ বরাবর উপরে উঠে গেছে দু’পাশের দু’টো পাহাড়ের মধ্য দিয়ে। মাঝারি চড়াই। পাথরের উপর দিয়ে কখনও নালা আমাদের ডান পাশে আবার কখনও বাঁ পাশে। যদিও নালার জলধারা খুব চওড়া নয়; নালার খাতের সিংহভাগ জুড়ে আছে বিশাল বিশাল বোল্ডার আর বিরাট বিরাট গাছের দেহাংশ। শুনলাম, ২০১৩ সালের আগে এই নালা নাকি আরও চওড়া ছিল। ২০১৩-য় এই অঞ্চলে হাই অলটিচিউড গ্লেসিয়াল লেকগুলোর ওপর বেশ কয়েকটা মেঘ ভাঙা বৃষ্টির ঘটনা ঘটে। কেদার মন্দির বিপর্যয়ের কথা নিশ্চয় মনে আছে? এর ফলস্বরূপ আশেপাশের প্রায় সব উপত্যকাগুলোতেই নদী-নালাগুলো ফুলেফেঁপে প্রচুর পরিমাণ ডেব্রিস (বিশাল বোল্ডার, পাথর, বড়ো গাছ, ইত্যাদি) নিয়ে নিচে নেমে আসেএই ডেব্রিস আমরা ডোডিতালের ফিডার নালার মুখেও দেখেছি, এমনকি তালের জলের নিচেও জমে থাকতে দেখেছি। ডোডিতালের বিস্তার এবং গভীরতাও বেশ খানিকটা কমে গেছে এর কারণে।
ওহ! এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, উত্তরকাশী পৌঁছে ভাগবতের অফিসে বসে কথাবার্তার সময় একটা খবর পেলাম যে গঙ্গা নাকি গোমুখ থেকে বেরিয়ে তার বয়ে চলার দিক পরিবর্তন করে ফেলেছে। মানে? মানে হল - গঙ্গা গোমুখ থেকে বেরিয়ে গঙ্গোত্রী হিমবাহের বাঁ দিক বরাবর বইত (তপোবনের গিরিশিরার নিচ দিয়ে), কিন্তু এখন সে ঠিক উলটো দিক দিয়ে বইছে (নন্দনবনের গিরিশিরার নিচ দিয়ে)। অর্থাৎ, তপোবন পৌঁছোতে হলে গঙ্গোত্রী হিমবাহ পার হওয়ার জন্য যে দিক দিয়ে হিমবাহের উপর উঠতে হত সেখান দিয়েই গঙ্গা এখন বইছেন। কারণ কী এমন অদ্ভুত ঘটনার? কারণ সেই মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। এটা হয়েছিল মাউন্ট শিবলিংএর গিরিশিরার উপরে অবস্থিত ‘নীল তাল’-এর ওপর। ফলে নীল তাল ফেটে বিপুল পরিমাণ ডেব্রিস নিচে নেমে সোজা সদ্যোজাত গঙ্গায় পড়ে গঙ্গার গতি রুদ্ধ করে দেয়। কিন্তু একমাত্র ৺মহেশ্বর ছাড়া যার গতি আজ অবধি আর কেউ রুদ্ধ করতে পারেনি, সামান্য ‘বোল্ডার’ তার কী করবে? সুতরাং সুরধুনী আপন খেয়ালে নিজের পথ নিজে করে নিলেনআধ কিলোমিটার-তক ঐদিক দিয়ে বয়ে এসে নিজের পুরোনো পথের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। গঙ্গা পার করিয়ে অভিযাত্রীদের তপোবনের নিচে পৌঁছে দেবার জন্য রোপ ওয়ে বসছে সম্ভবতঃ এটা কেবল অভিযাত্রীদের জন্যই হবে, কারণ এই যাত্রাটাও কতটা নিরাপদ হবে সে ব্যাপারে এজেন্সির লোক, গাইড, পোর্টার সকলেই সন্দিহান। এক ঝলক নিজেদের ২০১২-র তপোবনে আসার কথাটা মনে পড়ল। হিমবাহে ওঠার একটু আগে একটা সমতল জায়গা ছিল, দেরি হয়ে গেছিল বলে আমরা ঐখানেই সেই রাতের মতো তাঁবু লাগিয়েছিলাম। সেখান দিয়ে এখন গঙ্গা বইছে!!!

ডোডিতাল ছেড়ে দারোয়া পাসের পথে
যা হোক, স্মৃতি ছেড়ে বাস্তবে ফিরি। সামনে দুটো খচ্চরের পিঠে মাল বোঝাই। আমরা পর পর লাইন দিয়ে পাথরের খাঁজ-ভাঁজের মধ্যে দিয়ে চলেছি – নিজেদের হঠাৎ কেমন প্রাচীন ভিনদেশীয় বণিকদের মতো মনে হচ্ছিল, যারা অনেক দূর দেশ থেকে বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে, কঠিন গিরিবর্ত্ম পেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে সওদা চাপিয়ে বাণিজ্যে আসত। জয়া শুনে বলল, “ঠিকই আছে। আমরা কষ্ট বেচে একটু আনন্দ কিনতে যাচ্ছি – সে বাণিজ্যই তো হোল।” চার কিলোমিটার চলে একটু থামলাম। হালকা খাওয়া-দাওয়া, চা খাওয়া হল। এখান থেকে পাস চোখে পড়ল এখনও দুই কিলোমিটার চলতে হবে, উঠতে হবে আরও খানিকটা উপরে। তবে কোথাওই রাস্তা ভীষণ খাড়া নয়। সারা রাস্তায় ঘাস জমি, ফুল, গাছ রয়েছে। গাছের মধ্যে রডোডেনড্রনই প্রধান হাঁটতে কষ্ট হয় না। এখানেও বুনো ফুল অজস্র ফুটে আছে। বিপিন বলল আর ক’দিন পর এই উপত্যকায় একরকম ফুল ফুটবে যার গন্ধ নাকে গেলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, ঘুমিয়েও পড়তে পারে। নিচের বনে রডোডেনড্রন ফোটা শেষ, কিন্তু এখানে উচ্চতার জন্য অজস্র ফুটে আছে। চললাম টুক টুক করে। কিলোমিটার খানেক বাকি থাকতে আস্তে আস্তে চোখের ডান কোণ দিয়ে ফুটে উঠল প্রথমে ব্ল্যাক পিক, এরপরেই বন্দরপুঞ্ছ ঠিক পাস-এ ওঠার মুখে তিরিশ-চল্লিশ মিটার মতো রাস্তা ঝুরো পাথর মাটির। এই ধরনের রাস্তাতে আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই, বড্ড জুতো পিছলে যায়। বিপিন সাহায্য করল। বাবুয়া পিছন থেকে আওয়াজ দিল – ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে চলিতে পারি না’। দিক্‌ গে! আমি তো নির্বিঘ্নে উঠে এলাম পাস-এর ওপর। উফফ্‌! শেষ অবধি পৌঁছোতে পারলাম! বাঁ দিকের ছোট্ট একটা ঢিপি পেরিয়ে উঠে এলাম গিরিপথ-এর মাথার ঢালু ঘাসজমিতে।

ওই ইংরিজি U অক্ষরের মতো দেখতে নিচু জায়গাটাই দারোয়া পাস
পাসে পৌঁছোনোর পথে
উঠেই তাকালাম উত্তর-পূর্ব কোণে, ব্ল্যাক পিক এবং বন্দরপুঞ্ছ এখন আরও পরিষ্কার। পাসে ওঠার ঠিক আগেই ডান দিকে একটা পায়ে-চলা পথ উলটো দিকে চলে গেছে। বিপিন বলল ওটা ‘বামসারু পাস’ যাবার রাস্তা। বামসারু পাসও দারোয়া পাসের মতো গঙ্গা ভ্যালির সঙ্গে যমুনা ভ্যালিকে জুড়েছে। ঘড়ি বলছে একটা কুড়ি। যাক্‌, খুব একটা খারাপ হাঁটিনিনিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়ালাম। এবার পুজোটা সেরে নেবার পালা। আলাদা করে কাজু, কিশমিশ, আঞ্জীর, চকোলেট এনেছিলাম, ডোডিতালের মন্দিরের পূজারির থেকে একটু ধুনো-ধূপও চেয়ে আনা হয়েছিল। ওখানে দেখলাম একটা নরম মাটির গোলাকার জায়গায় গোছা গোছা হলুদ ফুল ফুটে আছে। আমার মনে হল এইরকম একটা জায়গার পাশেই প্রসাদটা রেখে ধুনো-ধূপ জ্বালিয়ে দিলে আর আলাদা করে ফুল তুলতে হবে না। সেইমতো পুজো সারা হল, প্রসাদ বিতরণও হল। বিপিন ওখান থেকেই খানিকটা নিচে আমাদের ‘কানসার বুগিয়াল’ দেখাল। ওইখানেই তাঁবু লাগাতে হবে। কানসার হল যমুনা উপত্যকার একটি পরিচিত বুগিয়াল। অন্য বুগিয়ালগুলোর মধ্যে ‘বায়াংকুলা’, ‘সীমা’ – এরাও নামী। দারোয়া টপের উত্তর দিকের ঢালে দারোয়া পাস আর কানসার টপের উত্তর দিকের ঢালে কানসার বুগিয়াল। বুগিয়ালের জমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে গিরিখাতের দিকে। খাতের উলটো দিকেই বিশাল বন্দরপুঞ্ছ পর্বতপুঞ্জ। শৃঙ্গগুলির পিছন দিকটা দেখা যায় এখান থেকে। আর দেখা যায় ভয়ংকর খাড়াই ঢালগুলো। বেশিটাই পাথুরে ঢাল, মধ্যের খাঁজগুলোতে বরফ জমে আছে।

পাসের ওপর
বিপিনের তাড়ায় ঢাল বেয়ে নেমে চলতে লাগলাম ক্যাম্পসাইটে। এও প্রায় এক-দুই কিলোমিটার মতো পথ। নিচের ভ্যালি থেকে মেঘ উঠে আসছিল, তাই বিপিন চেষ্টা করছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁবু লাগিয়ে ফেলা যায়প্রচণ্ড হাওয়াও চলছিল। এসব জায়গায় আবহাওয়ার কোনো ভরসা নেই, হঠাৎই বিগড়ে যেতে পারে। আমাদের তাঁবু-টাবু গুছিয়ে দিয়ে বিপিন যাবে আমাদের পরদিনের পথ অগ্রিম পরীক্ষা করে আসতে, যেটা কানসার টপ পেরিয়ে গিরিশিরার দক্ষিণ ঢাল বরাবর। ওখানে একটা বড়ো, গভীর নালা আছে। যদি ঐ নালায় বরফ থাকে, তবে সেখান দিয়ে খচ্চর নিয়ে যাওয়া মুশকিল হবে। তখন বিপিনকে বিকল্প রাস্তা দিয়ে আমাদের নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে পথের দৈর্ঘ্য বাড়বে। যেহেতু এই পথে এই মরসুমে আমরাই প্রথম দল, তাই রাস্তার অবস্থা সম্পর্কে আগাম কোনো খবর নেই আমাদের কাছে। কিছুদিন আগে টাটা-র একটা দল বরফের জন্য নালা পেরোতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং আগে থেকে রাস্তা দেখে আসা বা রুট রেইকি করা খুবই জরুরি।
ক্যাম্প সাইট-টা খুব সুন্দরসবুজ ঘাসে মোড়া প্রায়-সমতল একটা চাতাল। ঘাসে বিছিয়ে আছে নীল, হলুদ, গোলাপি ছোট্ট ছোট্ট ফুল। একটু নিচে দু’দিক দিয়ে সরু নালা তিরতির করে বয়ে যাচ্ছেচাতালটার সীমানা বরাবর টানা রডোডেনড্রন ঝোপ - গোলাপি, সাদা। ছোট্ট অফ হোয়াইট রডোডেনড্রনের একটা প্রজাতিও প্রচুর ছড়িয়ে আছে। মধ্যে মধ্যে আবার জুনিপার ঝোপও আছে। পূর্বদিকে পাস-এর দেওয়াল, উত্তরে বিশাল বন্দরপুঞ্ছ, দক্ষিণে দারোয়া টপ-এর গিরিশিরা আর পশ্চিমে ক্রমশঃ ঢালু হয়ে বুগিয়াল নেমে গেছে অনেক নিচে, আর দূরে একটা গিরিশিরার ছোটো ছোটো মাথাগুলো উঁকি দিচ্ছে। যদিও বন্দরপুঞ্ছ-এর মাথায় মেঘ জমেছে, ভালো দেখা যাচ্ছে না, তবুও যা দেখেছি তাতেই আমরা মোহিত। কাল এখানেই বিশ্রাম নেব। আশা করি পরিষ্কার আকাশে একটা দারুণ সূর্যোদয় দেখতে পাব। রোদ থাকতে থাকতে নালার ঠাণ্ডা জলে হাত-পা-মুখ ধুয়ে নিলাম। গত তিন দিন পায়ে জল লাগেনি, পা-টা ধুয়ে খুব আরাম হল। হালকা স্ন্যাকস নিচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি পশ্চিম দিগন্তে টুকটুকে লাল সূর্যটা ডুব দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার সামনের পাহাড়ের সারির পিছন দিকের মেঘগুলো একটা গোলাপি বলয় তৈরি করেছে যেন তাদের মাথার পিছনে। অনবদ্য! ছবি তুললাম। যদিও জানি না যে, সেই লালচে গোলাপি মায়াবি আলোটাকে আমার ফোনের ক্যামেরা ধরতে পারল কিনা ঠিকঠাক। কিন্তু আমার মনের ক্যামেরাতে এ আলো ধরা থাকবে চিরকাল আর আমাকে লোভ দেখাবে বারবার ফিরে আসার জন্য।
আজ বিশ্রাম। তাই ওঠার তাড়া ছিল না। গাইড, খচ্চরওয়ালা, খচ্চর সবাই ক্লান্ত। এই বিশ্রামটা সবারই দরকার ছিল। কাল আবার লম্বা হাঁটা। আমি উঠেছি সকলের আগে। বেরিয়ে গেছি তাঁবু থেকে, যদি সূর্যোদয়টা দেখতে পাই - এই আশায়। কিন্তু আকাশ একটু মেঘলা। উপরন্তু পূর্বদিকে পাস-এর গিরিশিরার আড়াল থাকায় সূর্য একটু উপরে না উঠলে দেখতে পাব না বুঝলাম। একটু পরে আমাদের মাথার ওপরের আকাশ পরিষ্কার হল ঠিকই, সূর্যকেও গিরিশিরার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। কিন্তু বন্দরপুঞ্ছ-এর গিরিশিরা ধোঁয়াশায় ঢাকা। নিচের পশ্চিমাকাশও তাই। কাল যে গিরিশিরাটার পিছনে সূর্যকে অস্ত যেতে দেখেছিলাম সেটাকে দেখতেই পাচ্ছি না। অনেক বেলাতেও দৃশ্যপট পরিষ্কার হল না। বিপিনকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলল সম্ভবত আশেপাশের কোনো পাহাড়ের জঙ্গলে আগুন লেগেছে, না হলে এমন ধোঁয়াশা হওয়ার কথা নয়আমাদের স্লিপিং ব্যাগ এবং অন্যান্য কিছু জিনিসপত্র রোদে দিলাম। ছোটোখাটো কিছু জিনিস ধুয়েও দিলাম। জল বরফগলা, হাত কেটে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। বাবুয়ার ফেঁসে যাওয়া স্লিপিং ব্যাগের কল্যাণে ওর নিজের তো পালক-ছাড়ানো মুরগির মতো অবস্থা, সঙ্গে সারা টেন্ট পালকে ভর্তি হয়ে আছে। ও বসল সেটাকে ঠিক করবে বলে।


আজ আকাশ আর পরিষ্কার হল না। হঠাৎ দেখি কানসার টপের পিছন থেকে মেঘের দল হালকা চালে উপরে উঠছে। আমি দেখলাম হালকা সাদা মেঘ, হাওয়ার সঙ্গে উড়ে যাবে। কিন্তু বিপিন ভ্রু কুঁচকে বলল – আজ তাড়াতাড়ি মেঘলা হয়ে যাবে। আমার ঠিক বিশ্বাস হল না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সত্যিই এরপর থেকে ক্রমাগত মেঘের দল হানা দিতে থাকল। একেকবার তো এমন ছায়া হয়ে যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। মাঝে মাঝেই তেড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে তেমন কোনো কাজ নেই, তাই তাঁবুর আশেপাশেই ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। জীবনের পথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়, কিন্তু এখানে পথ আক্ষরিক অর্থেই ‘কুসুমাস্তীর্ণ’। সারা বুগিয়ালের ঘাসজমি ছোটো ছোটো বিভিন্ন রঙের ফুলে ছেয়ে আছে, যেন সবুজ ভেলভেটের কাপড়ে চুমকি বসানো। মন না চাইলেও তাদের মাড়িয়েই চলতে হবে। বুগিয়ালের ধার বরাবর রডোডেনড্রনের নেকলেস, সুন্দরী বুগিয়াল যেন জড়োয়া গয়নায় সেজেছে। এখান ওখান দিয়ে জলধারা বয়ে চলেছে – বুগিয়ালের লাইফ লাইন। জলের ধারার পাশ বরাবর বড়ো বড়ো হলুদ ফুল গোছায় গোছায় ফুটে আছে। কঠিন চড়াই, রুখুসুখু প্রান্তর পেরিয়ে আসা অভিযাত্রীর কাছে বুগিয়াল যেন একখন্ড মরূদ্যান। ভেড়াওয়ালারা আষাঢ় মাসের প্রথমে তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে চলে আসবে বুগিয়ালে। মাস তিনেক থেকে শীতের শুরুতে গ্রামে ফিরবে। এই তিন মাস ভেড়াগুলো পর্যাপ্ত কচি ঘাস খেয়ে তাগড়া হবে। আমাদের খচ্চরওয়ালা লব এই ভেবেই আশ্বস্ত যে ভেড়াওয়ালারা আসার আগেই আমরা এসেছি, ওর খচ্চররা ভালো করে খেতে পাবে; নয়তো ভেড়ার পাল চড়তে শুরু করলে একটু ঘাসও বাঁচবে না। আপাতত ও খচ্চরদের একটু দূরে চরাতে নিয়ে গেছে। এই উচ্চতায় পাখির সংখ্যা খুবই কম, যে ক’জন আছে – পুঁচকে পুঁচকে – তারা রডোডেনড্রনের ঝোপেই থাকে। বড়ো পাখির মধ্যে সামান্য কিছু সংখ্যক চৌ আর কিছু দাঁড়কাক হেঁড়ে গলায় ডাকতে ডাকতে বুগিয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা উড়ে বেড়াচ্ছে। ভেড়াওয়ালা, অভিযাত্রী - এদের থেকেই খাওয়াদাওয়া পায় বোধহয়। শীতে হয়তো নিচের দিকে চলে যাবে। ডোডিতালেও প্রচুর দাঁড়কাক দেখেছি। যা হোক, এখানকার পাখিরা পুঁচকে হলেও গলার আওয়াজ কিন্তু বেজায় তীক্ষ্ণ। তাদের কিচিরমিচির সারাক্ষণই শোনা যায়। কাল সারা রাত টংক টংক – নাইটজার-এর ডাক শুনেছি। কয়েকরকম প্রজাপতি দেখছি উড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ ফড়ফড় আওয়াজে পিছনে তাকিয়ে দেখি বিপিনদের তাঁবুর সামনে একটা দাঁড়কাক একটা পলিথিন প্যাকেট নিয়ে টানাটানি করছে। উফফ! ওদের তাঁবুতে কেউ ছিল না, ওখানেই রান্নাবান্না হচ্ছে। সুতরাং সুযোগসন্ধানী দণ্ডবায়স ওখানেই হানা দিয়েছে। আমি উঠে দাঁড়াতেই ওটা প্যাকেট ছেড়ে উড়ে গেল, আর প্যাকেটটা যেহেতু খালি ছিল তাই সেটা হু….স করে গড়িয়ে চলতে লাগল হাওয়ায়। কোনোমতেই প্লাস্টিক উড়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আমি ছুটলাম ওটাকে ধরব বলে। এর মধ্যে জয়া তাঁবু থেকে বেরিয়ে ধরল ওটাকে।
ভেবেছিলাম ব্রেকফাস্ট করে একটু দারোয়া টপের দিকে যাব। কিন্তু ব্রেকফাস্ট দেরিতে হওয়ায় লাঞ্চ-এর তৈয়ারির সময় হয়ে গেল। এখন বিপিন আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলে লাঞ্চ–ও অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই লাঞ্চ সেরে যাওয়াই ঠিক হল। দেড়টা নাগাদ রওনা দিলাম টপের উদ্দেশে। যতদূর পারি যাব। টুক টুক করে উঠতে লাগলাম উপরে, আমি আর জয়া। বাবুয়া আসেনি। কিছুদূর পূব দিকে চলার পর আমাদের ডান দিকে দারোয়া টপের অবয়ব পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠতে লাগল। গিরিশিরায় ওঠার একটু আগে বিপিন আমাদের মুখোমুখি একটা উঁচু হাম্প দেখিয়ে বলল যে ওটা নাকি ‘বেবি দারোয়া টপ’দেখলাম এই ঢিপিটাই ক্রমশ ওপরে গিয়ে একটু ডান দিকে মোচড় মেরে উঁচু হয়ে দারোয়া টপ তৈরি করেছে। যারা কোনো কারণবশতঃ মূল টপ–এ চড়তে পারে না তারা বেবি টপ–এ চড়ে দুধের সাধ ঘোলে মেটায়। আমরা তো এতদূরও চড়তে পারব ভাবিনি। গিরিশিরায় চড়ে বেশ উত্তেজিত লাগল। কিছুটা নিচে বাঁদিকে পাস, যেটা গতকাল পেরিয়ে এসেছি। অনেক নিচে ডোডিতাল এলাকার ছোট্ট একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নিচ থেকে নিয়ে উলটো দিকের পুরো বন্দরপুঞ্ছ রেঞ্জ মেঘে ঢাকা। বোঝা যাচ্ছে পিকগুলোর ওপর স্নো ফল হচ্ছে। রোদ মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়েই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। নাকের নিচটা জ্বালা করতে শুরু করল, বোধহয় ফেটে গেল। এখানেই খানিকক্ষণ বসলাম আমরা। বসে বসে সামনের রাস্তাটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল টপ অবধি চলে যেতে পারবমোটেই চড়াই নয়, কিন্তু রাস্তাটা লম্বা। জয়া বলল, “চল, চলে যেতে পারব, আর তো বেশি চড়াই নেই।” বিপিনকে বলাতে ও বলল, “মুশকিল।” কারণ, তখনই সোয়া দুটো বাজে। ঐ রাস্তা পেরোতে অন্তত আরো তিরিশ-চল্লিশ মিনিট লাগবে। এরপর এতটা নামতেও তো হবে। মেঘ কখন বেশি ঘন হয়ে গিয়ে বর্ষাতে আরম্ভ করবে তার কোনো স্থিরতা নেই। ওর কথায়, “পাহাড় কা মৌসম ওউর মুম্বাই কা ফ্যাশন – কব বদল যায়ে কোই ভরোসা নেহি।” ছোকরা রসিক আছে (খুব হালকা একটা ফাঁকিবাজির ঝোঁকও আছে)অগত্যা নামা শুরু করলাম। ঘাসজমির মধ্যে দিয়ে ট্র্যাভার্স করে অর্থাৎ আড়াআড়ি নামা। তিনটে নাগাদ ফিরে এলাম ক্যাম্পে। এসেই গরম গরম চা, দারুণ লাগল। ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাত-মুখ জমে গেছে। ঠিক সাতটায় লাল টুকটুকে সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেল পাহাড়ের পিছনে, আমরাও টুক করে তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম। সন্ধে কাটল আড্ডা দিয়ে আর তাস খেলে। সাড়ে ন’টার মধ্যে খেয়ে শুয়ে পড়াকাল গন্তব্য ‘সীমা’। বিপিনের হিসেবে রাস্তা কঠিন নয়, খুব লম্বাও নয় - আট কিলোমিটার, তাও বরফ-টরফ মাঝেমধ্যে থাকতে পারে। সময় বেশি লাগবে। তাই তাড়াতাড়ি রওনা হওয়া দরকার।


ঘুম ভেঙে গেল সকাল পাঁচটা কুড়ি নাগাদ। সূর্য উঠে গেছে, কিন্তু উপত্যকায় আলো আসেনি। বন্দরপুঞ্ছের মাথায় আলোর আভা। ছ’টা নাগাদ হলুদ সূর্যটা চোখের সামনে উঁকি দিল। কিন্তু তুষারশৃঙ্গগুলো আজও ধোঁয়া ধোঁয়া। যা হোক, সব সেরে রওনা হতে ন’টা কুড়ি। প্রথমে হালকা হেঁটে কানসার টপ-এর পাশের নিচু জায়গাটা পেরিয়ে গিরিশিরার দক্ষিণ ঢালে চলে এলামবিপিনের কথায়, “আজ কা রাস্তা - বস্‌ ডাউন ডাউন, অউর বীচ্‌ বীচ্‌ মে সিধা সিধা।” কার্যক্ষেত্রে, সারাদিন পাহাড়ি ছাগলের মতো একটার পর একটা গিরিশিরার গা বেয়ে চললাম আর অসংখ্য স্পার অর্থাৎ উপগিরিশিরা পেরোলাম। রাস্তা খুব কষ্টকর কোথাওই নয়। কিন্তু সারাদিন টং টং করে একই ধরনের স্পার, রিজ, বোল্ডার পেরোনোটা বেশ বিরক্তিকর। তার ওপর একটু উঁচু কোনো জায়গায় উঠলেই সাঁই সাঁই করে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া চলছেহাওয়ার দাপটে মালভর্তি ন্যাপ স্যাক উলটে পড়ে যাচ্ছে। খাবারভর্তি প্যাকেট ধরে না থাকলে উড়ে যাচ্ছে। রোদেরও তেজ নেই, মেঘাচ্ছন্ন। মাঝখানে কয়েকটা বরফ প্রান্তর পেরোলাম। অবশ্যই বিপিনের সহায়তায়। পথের সব বরফ এখনও গলেনি। প্রথম আইস ফিল্ডটা পেরোনোর সময়ই দারুণ একটা ব্যাপার হল। এই প্রথম গোল্ডেন ঈগল দেখলাম। প্রথমে জয়া যখন দেখাল তখন আমি ভাবলাম চৌ। হলদে একটা ঠোঁট-ই দেখেছিলাম শুধু। তারপর ভালো করে দেখি, আরে! তাই তো! এটা আকারে অনেক বড়ো, গলা হলুদ পালকে ঢাকা; ঠোঁট বড়ো, বাঁকা, হলুদ রঙের ও বোধহয় নিরিবিলিতে খাবার খুঁজতে এসেছিল (এখানে প্রচুর pica আছে)। আমরা এসে পড়াতে বিরক্ত হয়ে উড়াল দিল। গলা থেকে পেট সোনালি, কী দারুণ দেখতে! আমাদের মাথার ওপর দুটো চক্কর লাগাল। আমিও এই সুযোগে ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। ছবি তো তুললাম, কিন্তু আলো তেমন না থাকায় রংটা বোধহয় আসবে না ছবিতে। শুনেছি গোল্ডেন ঈগলের দেখা পাওয়া সহজ নয়। বিপিন বলল, এটা ওর এলাকা, নিচে আর একজন থাকে। ফুল তো আছেই সারা রাস্তা জুড়ে।
কানসার গিরিশিরার দক্ষিণ ঢাল বেয়ে নামা থেকে ক্রমাগত পশ্চিম অভিমুখে চলে বেলা প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ একটা গিরিশিরার ওপর থেকে অনেক নিচে ‘সীমা’ বুগিয়ালের প্রথম দর্শন হল। বিপিন বলল, এই বুগিয়ালের দুটো ক্যাম্প সাইট, একটা আপার, একটা লোয়ার সীমা লোয়ার-টাই বেশি ভালো, আর কাল ঐ দিক দিয়েই নামতে হবে, অতএব আজ এই রাস্তাটুকু নেমে থাকলে ভালোই হবে। জয়া প্রথমে এতটা নামতে চায়নি। এতখানি ক্লান্তিকর হাঁটা, খিদে, ঠাণ্ডা - সব মিলিয়ে পরিশ্রান্ত ছিলাম। কিন্তু আমার মনে হল, ঠিকই আছে। এইটুকু নেমে থাকলে কাল সুবিধাই হবে। এই ভেবে জয়াকে বুঝিয়ে নিচে যেতে রাজি হয়ে গেলাম। বিপিন আর লব মালপত্র সমেত খচ্চর নিয়ে আগে চলে গেল, আমরা একটু বিশ্রাম নিয়ে নামা শুরু করলাম। নামা বলে নামা! পাথুরে রাস্তা দিয়ে ঠাঁই ঠাঁই সোজা নিচে নামা। খাড়াই প্রায় সত্তর ডিগ্রি, রাস্তা প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার। এতটা পথ নামতে হবে বুঝিনি। জলও শেষ হয়ে গেছিল, পৌঁছে যাব বলে আর ভরিনিগলা শুকিয়ে কাঠ। লব মালপত্র রেখে ফিরে এসে মাঝপথ থেকে বাকি রাস্তা আমাদের সঙ্গ দিল। শেষ পর্যন্ত পৌনে পাঁচটায় ক্যাম্প সাইটে পৌঁছোলাম।
পৌঁছেই প্রায় চিৎপাত হয়ে পড়ার মতো অবস্থা, বিপিন চা তৈরি করে রেখেছিল। চা-বিস্কুট খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে ভালো করে ক্যাম্প সাইটটা দেখলাম। অপূর্ব সুন্দর, সবুজ ঘাসে ফুল ছড়ানো ঢেউ খেলানো বুগিয়াল। মাঝখানে হৃষ্টপুষ্ট জলের ধারা বইছে। চারপাশের পাহাড়ে বড়ো বড়ো গাছের জঙ্গল। সামনে বিশাল বন্দরপুঞ্ছ - সব মিলিয়ে আঁকা ছবি। আমরা যখন পৌঁছেছি তখন ওখানে একপাল গরু-বলদ চরছিল। বিপিন বলল, গ্রামের লোকেরা এদের এখানে ছেড়ে গেছে চরার জন্য। পাঁচ-ছয় দিন অন্তর একজন এসে খোঁজ নিয়ে যায়গরুরা চরতে চরতে স্বচ্ছন্দে এক বুগিয়াল থেকে অন্য বুগিয়ালে চলে যায়। তবে এখানকার জঙ্গলে লেপার্ড আছে। গরুর পালের মধ্যে কোনো প্রাণহানি হলে, যে লোক খবর নিতে আসে সে গিয়ে গরুর মালিককে খবর দেয়। শুনেছিলাম সীমা থেকে সূর্যাস্ত নাকি দারুণ দেখায়, কিন্তু আমাদের সেই অদ্ভুত সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা হল না। সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম দিগন্ত মেঘে ঢাকাকেবল মেঘের পিছন থেকে অস্তরবির রশ্মিচ্ছটা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হল। আমার অবশ্য সে জন্য কোনো দুঃখ নেই। কানসার বুগিয়াল থেকেই যে অসাধারণ সুন্দর সূর্যাস্ত দেখেছি তার তুলনা নেই।
সন্ধে হতেই বিপিন আর লব কাঠ জড়ো করে বেশ বড়ো আগুন জ্বালাল। তাপও পাওয়া যাবে, রান্নাও হবে, আবার কোনো বন্য জন্তুও কাছে আসবে না। আগুন দেখেই মাথায় একটা জব্বর ফন্দি এল। আমরা ভর্তা খাব বলে বেগুন কিনে এনেছিলাম। ছোটোবেলায় দোলের আগের দিন ন্যাড়াপোড়ায় বুড়ির ঘরে বেগুন, আলু, টমেটো সব দিয়ে আগুন লাগাতাম। তারপর সেই সব পোড়া মেখে জুৎ করে খেতাম। সেটা মনে করেই ওদের বললাম বেগুন, আলু, টমেটো সব আগুনে দিয়ে পোড়াতে। ওরা বেশ অবাক হল, কারণ ওরা এ যাবৎ শুধু আলু পোড়াই খেয়েছে। খাওয়ার সময় সবাই কিন্তু খুব তৃপ্তি করেই পোড়া-মাখা আর রুটি খেলাম। আমাদের ক্যাম্প ফায়ার ভালোই উদ্‌যাপন হল।
রাতে বেশ কিছুক্ষণ আগুনের পাশে বসে আড্ডাও দিলাম এবং কথাবার্তার মধ্যেই বিপিনকে চেপে ধরলাম, “সচ্‌ বাতাও তো, আজ কিতনা রাস্তা চলে হম?” ব্যাটা মহা পাজি, খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল, “কিঁউ? আট কিলোমিটার হি হ্যায়!” কক্ষনও আট কিলোমিটার নয়, হতে পারে না। আমাদের মনে হচ্ছিলই যে, অনেকটা বেশি হেঁটেছি। আবার জিজ্ঞাসা করাতে উলটে আমাদেরই জিজ্ঞাসা করল, “কিঁউ? আপ লোগোকো কিতনা লগ্‌ রহা হ্যায়?” ব্যাটার ঠোঁটের ফাঁকে মিচ্‌কে হাসি। আমরা বললাম, মনে হচ্ছে বারো-তেরো কিলোমিটার, অন্তত বারো-র কম তো কিছুতেই নয়। তখন পাজিটা বলে কিনা, “বারাহ্‌ সে থোড়া হি জেয়াদা হ্যায়।” বলেই কী হাসি! একেবারে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। বোঝো কাণ্ড! আজ বারো কিলোমিটারের উপর হেঁটেছি, অথচ জানতাম না বলে সেই অনুযায়ী খাবার নেওয়া হয়নি সঙ্গে, তাই অত খিদে পেয়ে গেছিল। সত্যিটা বলেই সঙ্গে সঙ্গে ওর যুক্তি – যদি ও হাঁটার শুরুতেই আমাদের বলত যে এতটা পথ হাঁটতে হবে তবে নাকি তখনই আমাদের উৎসাহ কমে যেত, আমরা এত ভালোভাবে হাঁটা শেষ করতে পারতাম না। কী বলব? যাক গে, হাঁটা তো হয়ে গেছে। (জানিয়ে রাখা ভালো, এ পথে না এসে অন্য একটা পথেও কানসার থেকে সীমা আসা যায়, সে পথ ‘বায়াংকুলা’ হয়ে। সে ক্ষেত্রে, গিরিশিরা না পেরিয়ে সোজা কানসার বুগিয়ালের ঢালু পশ্চিমদিক দিয়ে নেমে বায়াংকুলা পৌঁছে সেখান থেকে চড়তে হবে সীমা। যদিও সময় কম লাগবে কিন্তু বায়াংকুলা থেকে সীমার চড়াইটা তীব্র।)
কাল নিচে নামব। কাল কত রাস্তা? কালও ওই বারো কিলোমিটার মতোই হাঁটতে হবে। জয় মহেশ্বর! আকাশে চাঁদের আয়তন বাড়ছে। প্রথমে আকাশ একটু মেঘলা ছিল, পরে সব পরিষ্কার হয়ে গিয়ে ফটফটে জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। সামনেই পূর্ণিমা। সুরক্ষার জৈবিক তাগিদে সব গরুগুলো এসে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। তাদের মধ্যে একটা গরু মনে হল কাশছিল মাঝে মাঝে, পরদিন বিপিনকে বলাতে ও বলল যে, ঠাণ্ডা নয়, গরুটা কোনোভাবে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলেছে, সেটা ওর গলার নিচে আটকেছে। ও আর বেশিদিন বাঁচবে না। আমাদের সভ্যতার অবদান! কী মর্মান্তিক মূল্য দিচ্ছে অবলা প্রাণী (যেমন দিল থাইল্যাণ্ডের সমুদ্রতটে ভেসে আসা মৃত তিমি মাছটা, যার পেট কেটে চল্লিশটি প্লাস্টিকের প্যাকেট বেরোল)। জলের আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।
(এরপর আগামী সংখ্যায়)
_____
ছবিঃ লেখক

No comments:

Post a comment