Showing posts with label আইভি দত্ত রায়. Show all posts
Showing posts with label আইভি দত্ত রায়. Show all posts

ভ্রমণ:: ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮ (৩য় পর্ব) - আইভি দত্ত রায়

আগের দুই পর্ব এখানে - প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব


ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮
আইভি দত্ত রায়

।।  তৃতীয় পর্ব ।।

সকালে ঘুম ভাঙল কুক্কু ক্লকের অ্যালার্মের আওয়াজে। শুয়ে শুয়ে ভাবছি কে এখানে অ্যালার্ম দিয়েছে? হঠাৎ বুঝলাম, এটা কোনও ঘড়ির অ্যালার্ম নয় – প্রাকৃতিক অ্যালার্মএকটা পাখি ডাকছে। আগে কখনও কুক্কু’র ডাক শুনিনি। ঘড়ির অ্যালার্মের কৃত্রিম আওয়াজে অভ্যস্ত মনে তাই প্রথমে ঘড়ির কথাই ভেবেছি। আজই প্রথম ওর ডাক শুনলাম কুক্কু... কুক্কু... কুক্কু – আমাদের চারপাশের জঙ্গলের গাছগুলোতে ঘুরে ঘুরে ডাকছে। ঘুম ভাঙার পর এত সুন্দর অনাবিল অনুভূতি শহরে হওয়ার তো অবকাশ নেই, তাই চুপ করে শুয়ে শুয়ে যতক্ষণ শোনা যায় শুনলাম। ধীরে ধীরে উঠে তৈরি হলাম; আজ হনুমান চটিতে নামব। জয়ারা এখনও ওঠেনি। চা খেতে খেতে বিপিন জানাল, ক্যাম্প সাইট থেকে একটু উঠে একটা টিলার মাথায় গেলে ফোনের কানেকশন পাওয়া যাবে। গিয়ে সকলের সঙ্গে একটু করে কথা বলে এলাম। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, সঙ্গম চটি’র পর একমাত্র ধারকোটের টং ছাড়া সীমার এই নির্দিষ্ট টিলাটার আগে আর কোথাও মোবাইলের কানেকশন পাওয়া যাবে না। যদিও পরিচিত একজন বলেছিলেন যে ভেবরা থেকে নাকি সব ক্যাম্পিং সাইটগুলোতেই ওয়্যারলেস ফোনে কথা বলা যাবে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তেমনটা ছিল না। ফিরে এসে দেখলাম ওরা এখনও ওঠেনি। বিপিনদের গোছগাছ প্রায় সারা। শুধু আমাদের তাঁবুটা বাকি। এরপর সব গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিচে নামা শুরু করলাম ন’টা চল্লিশে।
আজকের বারো কিলোমিটার রাস্তা পুরোটাই নামা। প্রথম নয় কিলোমিটার মতো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথর ফেলা পথ। শুনলাম এই রাস্তার টেন্ডার পাস হয়ে গেছে, দেড় কোটি টাকার কাজ; সম্ভবত এই বর্ষাটা গেলেই কাজ শুরু হবে। শুধুমাত্র তো ট্রেকাররাই নয়, গ্রামের মানুষ, গুর্জররাও এই রাস্তা ব্যবহার করে নানা প্রয়োজনে। পুরো জঙ্গলটা সন্নিহিত গ্রামগুলোর মধ্যে ভাগ করা আছে এলাকা হিসাবে। গুর্জররা যখন যে গ্রামের এলাকায় পশু চরায় তখন সেই গ্রামের পঞ্চায়েতকে ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে দেয়। জঙ্গল বেশ ঘনমৌরীন, মুরেটি, গুড়াস, খসার (স্থানীয় নাম) ইত্যাদি গাছ প্রধান। কিছু পাইন, সাইকাস-ও আছে। এর মধ্যে মৌরীন কাঠ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, আমাদের যেমন শাল কাঠ। বাড়ির কড়ি, খুঁটি ইত্যাদি এই কাঠে তৈরি করা হয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম চ’লে যায়। মুরেটির পাতা অনেকটা ম্যাপল পাতার মতো দেখতে, প্রধানত পশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। লাল গুড়াস থেকে পানীয় তৈরি হয়। জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে সমতল জায়গাও আছে। চলার পথে তিন-চারটে বেশ বড়ো নালা পেরোলাম। পৌনে একটা নাগাদ পৌঁছোলাম ‘কাণ্ডোয়া’ বলে একটা জায়গায়। জঙ্গল থেকে বেরিয়েই সবুজ ভেলভেটে মোড়া ঢেউখেলানো বিশাল প্রান্তর। একটু নিচের ঢালে ধাপচাষের জমি তৈরি করা আছে। কিছু বাড়ি, কিছু অর্ধসমাপ্ত ঘর, দুটো পাথরের চৌবাচ্চা চোখে পড়ল। গরু-মোষ চরছিল। একটা ছোটো গ্রাম বলেই মনে হল। বিপিন জানাল – ২০১৩-তে বন্যায় এখানে সাঙ্ঘাতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়; হনুমান চটির উলটোদিকে (উত্তর দিকে) পাহাড়ের ঢালে ‘বাঢ়োয়া’ গ্রাম সেই বন্যায় প্রায় ধুয়ে মুছে যায়। তখন গ্রামের লোকেদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে নতুন বসতি স্থাপনের জন্য জমি চাওয়া হয়। গ্রামের লোকজন নিজেদের পরিচিত এলাকার বাইরে যাবার জন্য তৈরি ছিলেন না। তখন এই ‘কাণ্ডোয়া’-তেই তাদের পুনর্বাসন দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে ঘর তৈরি করে দেওয়াও চলছে। পুনর্গঠন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, কাজ শেষ হলেই পুরো গ্রাম এখানে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। সবুজের মধ্যে বসে দুপুরের খাওয়া সারলাম। ওখান থেকেই হনুমান চটির ওপরের ‘দ্রুমিল’ গ্রাম নজরে পড়ছিল।


আবার নেমে চলা। একটা পঞ্চান্ন নাগাদ পৌঁছালাম ‘নিশনি’ – বেশ বড়ো, সম্পন্ন গ্রাম। এখানে বিপিনের গ্রাম সম্পর্কিত এক দিদির বাড়িতে নিয়ে গেল আমাদের। বাড়িটা এত সুন্দর! দিদি আমাদের চা খাওয়ালেন। আমার রামদানার আটার আবদার বিপিনের মাথায় ছিল। ও এখান থেকেই কিনিয়ে দিল আমাকে। একটু আড্ডাও হল। আড্ডায় এক বয়স্ক মহিলাও যোগ দিলেন এসে। আমরা ডোডিতাল হয়ে এসেছি শুনে খুব খুশি। গাড়োয়ালিতে অনেক কিছু বলে গেলেন। সব বুঝিনি। উনি হিন্দি বলতেও পারেন না। বিপিন দোভাষীর কাজ করল। উনি প্রতি বছর ওখানে যান। আমরা তো অবাক! গ্রামের দেবতা ৺সোমেশ্বর প্রতি আষাঢ় মাসে ডোডিতালের ঢুন্ডিরাজ মন্দিরে যাত্রা করেন। তখন গ্রামসুদ্ধ লোক শোভাযাত্রা করে ওনার সঙ্গে যান। ৺সোমেশ্বরের মন্দিরটা গ্রামে ঢোকার সময় দেখেছি, ছবিও তুলেছি। কিন্তু সময়াভাবে দর্শন করতে যেতে পারিনি। দুটো পঁয়ত্রিশ নাগাদ সবাইকে বিদায় জানিয়ে রওনা হলাম। বিপিনের দিদি আমাদের সঙ্গে চললেন খেত পরিচর্যা করতে। কতদূর যাবেন জিজ্ঞাসা করাতে বললেন প্রায় হনুমান চটির কাছাকাছি। দিনে দু-তিনবার যান, গম, রামদানা, আলু – এসব চাষ করেন। তবে এবারে শুধু আলু লাগিয়েছেন। এদিকের মানুষজনকে দেখেছি তারা চাষবাস ভালোবাসেন, জমির প্রতি মমত্ববোধ আছে। এমনিতে প্রয়োজনে শহরে থাকলেও চাষের মরসুমে গ্রামে চলে আসেন। তাও এবার আড়ু, আপেল দেখলাম না, যেটা এই সময় এখানকার গ্রামে ঢুকলে সাধারণ দৃশ্য থাকে – গাছ ভর্তি আড়ু, আপেল - সেটা অনুপস্থিত। জিজ্ঞেস করায় জানলাম ফল ধরার পর পর বেজায় শিলাবৃষ্টি হওয়ায় সব নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদূর আমাদের সঙ্গে চলার পর উনি খেতের মধ্যে দিয়ে নেমে গেলেন। আমরা রাস্তা ধরে চললাম।


কিছুটা নেমে একটা বড়ো নালা পেরোনোর পরই হনুমান গঙ্গাকে পাশে পেয়ে গেলামচোখের সামনে হনুমান চটির ঘড়বাড়িও ফুটে উঠল। আরও এক-দুই কিলোমিটার হেঁটে সাড়ে তিনটে নাগাদ হনুমান চটিতে পৌঁছালাম। প্রথমেই চোখে পড়ল একটু ওপরে পাহাড়ের গায়ে ৺হনুমানজী-র মন্দির আর নিচে হনুমান গঙ্গার ওপর ডাবল স্টিল গার্ডার-এর পোক্ত একটা পুল যার ওপর দিয়ে গাড়ি যাতায়াত করছে। বুঝলাম কাল যমুনোত্রী যাবার সময় আমাদের ওই পুল পেরিয়েই যেতে হবে। পুলের ওপর উঠে নিচে তাকাতেই - সঙ্গম। হনুমান গঙ্গা লীন হয়ে গেছে যমুনার শরীরে। ২০১৩-র বিধ্বংসী বন্যার পর এই অঞ্চলের সব ক’টা পুলই অল্পবিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিপজ্জনক হয়ে পড়েছিল, তাই সেগুলোকে বদলে ডাবল স্টিল গার্ডার-এর পুল তৈরি করা হয়েছে। আপাতত আমরা সোজা বিপিনের বাবার হোটেলে গিয়ে উঠলাম। এখানেই লব আমাদের মালপত্র নামিয়ে রেখে গেছে।
খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা পূর্বপরিকল্পনা মতো জানকী চটিতে যাওয়ার ব্যাপারে বিপিনের সঙ্গে কথা বললাম। বিপিন ওখানকার লোকেদের সঙ্গে কথা বলে জানাল যে ওখানে এখন প্রচুর ভিড়, তার চেয়ে ভালো হবে যদি আমরা এখানেই থাকি এবং কাল গিয়ে দর্শন সেরে এখানে ফিরে আসি। প্রচুর লোকাল গাড়ি যাতায়াত করে। কাজেই গাড়ি পাওয়া অসুবিধা হবে না। ফিরে পরদিন এখান থেকে বারকোট নেমে গিয়ে ওখান থেকে হরিদ্বারের টানা বাস পাওয়া যাবে, তাতে করে হরিদ্বার নেমে যাব। বেশ, তাই সিদ্ধান্ত হল। সুতরাং ঘর নিয়ে মালপত্র ঢুকিয়ে বিশ্রাম নিয়ে নিলাম একটু। এবার কালকের জন্য হালকা ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। কারণ তেমন প্রয়োজন হলে কাল জানকী চটিতে রাতটুকু থেকে যেতে হতে পারে। রাত্রে শুয়েও পড়লাম তাড়াতাড়ি। বিপিন কাল ছ’টায় ডাকবে চা নিয়ে। অতএব নিশ্চিন্ত নিদ্রা।
ঠিক পাঁচটা পঁয়ত্রিশে ঘুম ভাঙল হনুমানজী-র মন্দিরের আরতি শুনে। উঠে হাত-মুখ ধুতে ধুতে বিপিন চা নিয়ে হাজির। আমাদের সঙ্গে কথা বলে ওর খুড়তুতো ভাই-এর ওপর আমাদের দায়িত্ব দিয়ে ও চলে গেল। ওর হিসাবপত্র কালই মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাসন-কোসনগুলোও বেছে নিয়ে বস্তাবন্দি করে ও উত্তরকাশী রওনা হয়ে গেল। এরপর আমরা তৈরি হয়ে বেরোলাম সওয়া ন’টায়তারপর তো অপেক্ষা। গাড়ি আর পাওয়া যায় না। যোগেশ (বিপিনের খুড়তুতো ভাই) অনেককে ফোন করে একজনের সঙ্গে কথা হওয়ার পর জানাল যে একটা গাড়ি আসছে বারকোট থেকে, তাতে তিনটে সিট খালি আছে। সেই গাড়িতেই উঠলাম দশটা পঞ্চাশে।
জানকী চটি নয় কিলোমিটার সুন্দর রাস্তা। ভাগ্য ভালো কোনও যানজটও পাইনি। এগারোটা কুড়িতে নামলাম গাড়ি থেকে। একটু হেঁটে গিয়ে মন্দিরের রাস্তায় চড়া শুরু হল সাড়ে এগারোটায়। প্রথম বেশ খানিকটা রাস্তা বিভিন্ন দোকান, বাড়ি, হোটেল, অফিস এই সবের মধ্য দিয়ে চওড়া সিমেন্টের রাফ ঢালাই করা রাস্তা চলে গেছে। কিছুদূর অন্তর ঘোড়ার আস্তানা। ঘোড়া নেওয়ার জন্য হাঁক-ডাক। ‘অনেক উঁচুতে উঠতে হবে’, ‘শ্বাসকষ্ট হবে’ - ইত্যাদি ভীতি প্রদর্শন। আমরা এগিয়ে চললাম। জয়ার একট লাঠি নেওয়ার ছিল। খানিকটা চলার পর একটা দোকান থেকে নেওয়া হল লাঠি। নারী–পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহুরে-গ্রাম্য বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিছিলে সামিল হলাম। বহু মানুষই ঘোড়া, ডুলি-ডান্ডির সওয়ার হয়ে চললেন। আমরা দেখতে দেখতে চললাম। আমাদের পাশে পাশে বেগবতী যমুনা, কিছুদূর অন্তর চা-পানীয়-খাবার-দাবারের দোকান, যার কারণে নদীর দিকের পাহাড়ের ঢালে যথেচ্ছ আবর্জনা জমা হয়ে চলেছে। চায়ের কাপ, পানীয়ের প্যাকেট, বোতল, পলিথিনের প্যাকেট – কী নেই! এক-দুই কিলোমিটার দূরে দূরে শেড এবং বসে জিরোনোর বেঞ্চ করে দেওয়া আছে। আর আছে ঘোড়ার পটি। উফ! ভয়ানক অবস্থা। ৫-৭ কিলোমিটার রাস্তার প্রায় পুরোটাই ঘোড়ার পটিতে ঢাকা। সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তায় সে সব শুকিয়ে ধুলো হয়ে প্রশ্বাসের সঙ্গে ঢুকে যাচ্ছেগলায় অস্বস্তি হচ্ছে। ঘোড়ারা টয়লেট ব্যবহার করতে শেখেনি এখনও, রাস্তাতেই এক নম্বর, দুই নম্বর সেরে নিচ্ছে আর সুযোগসন্ধানী দু’পেয়ে পুরুষরা ঘোড়ার জলবিয়োগের জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজেদের জলবিয়োগও সেরে নিচ্ছে। মনে মনে নিশ্চয়ই এই ভেবে সান্ত্বনা দিচ্ছে নিজেকে যে –‘যাক আমি অন্ততঃ অন্য আর একটা পরিষ্কার জায়গাকে নোংরা করিনি’! অথচ তাদের ব্যবহারের জন্য ‘শৌচালয়’ তৈরি করা আছে নির্দিষ্ট দূরত্বে। কিন্তু ভাবখানা এই – ‘আমি যদি নাও নোংরা করি, ঘোড়া তো করবেই! অতএব আমার করাটা বেশি দোষের হবে না।’
যা হোক ঘোড়া, পালকি, ডুলি-ডান্ডি ইত্যাদির কারণে পদযাত্রীদের ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ‘সাইড সাইড’ চিৎকারে কেউ হয়তো ডানদিক থেকে বাঁদিকে যেতে গেল ঘোড়াকে জায়গা দিতে, সঙ্গে সঙ্গে ‘এক সাইড, এক সাইড’ চিৎকার করতে করতে বাঁদিক দিয়ে উপর থেকে নেমে আসছে পালকি – এবার যাও কোন সাইডে যাবে! এত প্রবল ঠেলা-ধাক্কা যে ঠিকমতো একটা ফোটো তুলতে পারিনি। ফোটো তুলতে গেলে রেলিং-এর দিকে যেতে হয়, ভয় হচ্ছে যে সে ক্ষেত্রে ঘোড়ার ধাক্কায় আমিই ফোটো হয়ে যেতে পারি। কোনোমতে আমি জয়াকে আর জয়া আমাকে পাহারা দিয়ে কিছু ছবি তোলা হল। আকাশে মেঘ মেঘ, আমরা হাঁটছি, বসছি, আবার হাঁটছি। তাড়া খুব ছিল না, তাড়া থাকলেও কারও সাধ্য নেই তাড়াতাড়ি হেঁটে যাবে।


যমুনোত্রী মন্দিরের দুই কিলোমিটার আগে ‘ভৈরোনাথের’ মন্দির। দর্শন-প্রণাম করে চললাম মূল মন্দিরের উদ্দেশে। দেড় কিলোমিটার আগে চোখে পড়ল মন্দিরের চূড়া। পেছনের উঁচু উঁচু পাহাড়গুলোর মাথায় বরফ জমে আছে জায়গায় জায়গায়, কালো সাদা প্রেক্ষাপটে পাহাড়ের কোলে উজ্জ্বল লাল-হলুদ মন্দির জ্বলজ্বল করছে যেন। পাহাড়ের উপরে আবহাওয়া খুব একটা ভালো বলে মনে হল না। মাঝখানে খানিকটা বৃষ্টিও হয়েছে। তাতে পথের ধারের দোকানের প্লাস্টিকের পঞ্চো বিক্রি বেড়ে গেল। ৩০ টাকা করে পঞ্চো। মাথার টুপি সমেত হাতাওয়ালা একটা আলখাল্লা। আমার একটা ছিলই, অনেকদিন আগে আমার সেজজ্যেঠু আমেরিকা থেকে এনে দিয়েছিলেন (তখনও এখানে ডেকাথলন-এর শোরুম হয়নি)। এতদিন প্রতিবারই পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছি কিন্তু ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। এ যাত্রায় ব্যবহার হল। এখন যমুনা অনেক কাছে এসে গেছে। মন্দিরের পাশ দিয়ে উ-ই-ই উপর থেকে নাচতে নাচতে নেমেছে যমুনা। পাথরে ধাক্কা খেয়ে ফেনিল হয়ে উঠছে। এমন চঞ্চল, ছটফটে পাহাড়ি নদী দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। মনে মনে ওর মতো আমিও নেচে নিই খানিক। কিন্তু যমুনার উচ্ছল ফেনিল জলে ওগুলো কী? বড়ো বড়ো, বিভিন্ন রঙের কাপড়ের টুকরো মনে হচ্ছে। এগুলো এত বিপুল সংখ্যায় এখানে কী করছে? বুঝলাম না। রাস্তার যে ঢাল নদীর দিকে নেমে গেছে তার গাছপালাগুলো তো আবর্জনার স্তূপ হয়ে আছে। মাঝে মাঝে রাস্তা থেকে একটু নিচে লোহার জাল লাগিয়ে ঐ সব আবর্জনার নদীতে ভেসে যাওয়া রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নস্যি। এসব দেখে মনটা কেমন একটা বিরক্তিতে ছেয়ে আছে। এত সুন্দর পরিবেশে এমন একটা ভাবগম্ভীর ধর্মীয় স্থানে গেলে মনে যে প্রশান্তি, স্থৈর্য আসে তা রাস্তাতেই উবে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে মন্দিরের নিকটবর্তী হলাম। একটা ব্রিজ পেরোলেই মন্দির চত্বরে প্রবেশ করব। ব্রিজটা যমুনার উপরেই। এখানে দাঁড়িয়ে উপরে চাইলেই দেখা যায় চঞ্চলা, চপলা যমুনা ঝমঝম-ছমছম করে পাহাড় থেকে পাথরের মধ্যে দিয়ে নেমে আসছেটিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। ক্যামেরা বের করলাম ছবি তুলব বলে। হে ভগবান! কীসের ছবি তুলব? সেই রঙ্গীন কাপড়ের কথা বলেছিলাম মনে আছে? নদীতে দেখা যাচ্ছিল রাস্তা থেকে? সেগুলোই অসংখ্য হয়ে নদীর সারা শরীরে লেপটে আছে ঘায়ের মতো। পাথরের খাঁজে খাঁজে আটকে নদীর স্রোতে গা ভাসিয়ে রেখেছে। এখন বুঝলাম - ওগুলো গোটা গোটা শাড়ি। একটু ওপরেই ‘উষ্ণ কুণ্ড’ওখানে স্নান সেরে মহিলারা মা যমুনাকে শাড়ি উৎসর্গ করছেন। কী কাণ্ড! নদীর সারা শরীরে ক্ষতের মতো ভক্তের দান দগদগ করছে। ছবি তোলার ইচ্ছেটাই চলে গেল। আমি বেশ কয়েকটা পাহাড়ি নদী-নালা উৎস থেকে দেখেছি, কিন্তু উৎসের কাছে কারও এমন জর্জরিত রূপ দেখিনি। ছবি তুললাম বটে, কিন্তু মনটা বড়ো ভারাক্রান্ত হয়ে গেল।
বাকিটা অন্যান্য তীর্থের মতোই। মন্দির চত্বরে ঢুকলাম, জুতো রাখলাম। পূজার সামগ্রী কিনলাম। পূজারিও জুটে গেলেন। আমাদের কাছে যমুনোত্রীর মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করে মূল মন্দিরের বাইরের চাতালে আমাদের পুজো করিয়ে দিলেনঅন্যান্য বহু পুজোই এই ভাবে হচ্ছে। পুজো করাতে করাতে অন্য এক পুরোহিত এসে আমাদের পুরোহিতের কাছ থেকে ‘তিলক থালি’ নিয়ে চলে গেল, আমাদের পুরোহিত অন্য দিকে দৌড়ালো আরেকটা ‘তিলক থালি’ জোগাড় করে আনতে। এসে বলল – ‘ইঁহা এয়সা হোতা রহতা হ্যায়’ - চমৎকার! ‘মা যমুনা’ অবশ্যই পুজোর ব্যাঘাত নিজ গুণে ক্ষমা করে দেন। উনি নানাবিধ পৌরাণিক এবং ধর্মীয় কথা শোনালেন। উষ্ণ কুণ্ডের উদ্ভবের কাহিনি বললেন, আমার পর্যবেক্ষণ হল – পুরো যমুনোত্রী মন্দিরটা একটা উষ্ণ প্রস্রবনের উপর স্থাপনা করা হয়েছে। মন্দিরের মেঝে গরম, মেঝের পাথরের ফাঁক-ফোকর দিয়ে গরম ভাপ বার হচ্ছেএকটা দারুণ প্রাকৃতিক ঘটনা। মূল মন্দিরের গায়ে উষ্ণ কুণ্ডে জল টগবগ করে ফুটছে, নিয়ম মতো তাতে চালের পুঁটুলি চুবিয়ে আধসিদ্ধ ভাত বানিয়ে নিচ্ছে সবাই। এটাই প্রধান প্রসাদ। কুণ্ডের ব্যারিকেডের ভিতর ভবিষ্যতের পুরোহিতের দল দাঁড়িয়ে চাল সিদ্ধ করে দেবার দায়িত্ব নিচ্ছে। বদলে আবার প্রণামিও নিচ্ছে। সব সেরে মূল মন্দিরে ঢুকলাম। শনিদেব সূর্যদেব আর যমুনাদেবীর মূর্তি দর্শন করলাম। মূর্তিগুলো খুবই সুন্দর, আসনসজ্জাও তদনুরূপ – ঝলমল করছে। বাইরের মালিন্যের ছোঁয়া বাঁচিয়ে দেবী এখানে যেন স্বরূপে মন্দির আলো করে বিরাজ করছেন। প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম।


টিপ টিপ বৃষ্টি পড়েই চলেছে। সারা মন্দির চত্বর কাদায় কাদা। পা টিপে টিপে নিচে নেমে এলাম। পা পরিষ্কার করে জুতো পরে বেরিয়ে এলাম। উষ্ণ কুণ্ডের স্নানের জায়গায় যাবার আর ইচ্ছে হয়নি। বেরিয়ে কিছু খেয়ে এবার নামার পালা। পাঁচটা দশ বেজে গেছে। নিচে গিয়ে ফেরার গাড়ি পাব কিনা কে জানে? যদিও প্রয়োজনে এখানে (জানকি চটি) থেকে যাবার মতো প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা ফিরে যাওয়ার, কাল নিচে নেমে যেতে হবে। অতএব চলা শুরু। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ। বৃষ্টি বেড়েছে। কর্দমাক্ত কংক্রিটের রাস্তায় জুতো পিছলে যাচ্ছে। নিচে নামার সময় ঘোড়ার নাল পিছলাচ্ছে ভয়ংকরভাবে। ভয় লাগছে – পিছলে যাওয়া ঘোড়ার ধাক্কায় আমরা না নিচে পড়ে যাই। ভগবানকে স্মরণ করতে করতে পা টিপে টিপে নামতে থাকলামবাবুয়া তিনবার আছাড় খেল। জয়া একবার পড়ল, একবার পড়তে পড়তে বাঁচল। এসব দেখে আমি আরও ভয়ে জবুথবু। কোনোমতে যখন নিচে এসে নামলাম তখন গলা শুকিয়ে কাঠ, পায়ের বুড়ো আঙ্গুল আর পেশিগুলো সব ব্যথা হয়ে গেছে। ছ’টা পঁয়ত্রিশ বেজে গেছে। বৃষ্টির তেজ বাড়ল। তার মধ্যেই শুরু হল গাড়ির খোঁজ। গাড়ির স্ট্যাণ্ড খুঁজে পেতেই কুড়ি-পঁচিশ মিনিট গেল। নামার সময়-ই  দেখেছিলাম যমুনোত্রী মন্দিরের পিছনের পাহাড়ের মাথায় ঘনঘোর মেঘের জমায়েত। বুঝেছিলাম যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে এবং আমরা ফিরতে গেলে যে দণ্ড দিতে হবে তার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখি একটাই গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু প্যাসেঞ্জার নেই, আর এত রাত্রে প্যাসেঞ্জার হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। অতএব যেতে গেলে গাড়ি বুক করেই যেতে হবে। দর কষাকষির পর নয় কিলোমিটার রাস্তার জন্য ছ’শো টাকা দণ্ড দিয়ে ড্রাইভারকে রাজি করানো গেল। সাতটা চল্লিশে ছেড়ে আটটা দশে হনুমান চটি পৌঁছালাম। আসতে আসতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলাম যে ‘সপ্তর্ষি কুণ্ডের’ পরিকল্পনাটা বাতিল হয়ে ভালোই হয়েছে, কারণ ওপরে যা আবহাওয়ার নমুনা দেখলাম তাতে এখানে পৌঁছে সে পরিকল্পনা এমনিই বাতিল করতে হত। মাঝখান থেকে পোর্টার চার্জ হিসেবে বেশ কিছু টাকা গচ্চা যেত। কোথাও একটু সান্ত্বনা পেলাম যেন।
একেবারে খাওয়া-দাওয়া সেরেই উপরে উঠলাম। এবার গোছগাছ করতে হবে। কাল নিচে নামববিপিনদের পরামর্শমতো কথা ছিল বরকোট নেমে গিয়ে ঐ দিনটা ওখানে থেকে পরদিন ওখান থেকে সরাসরি হরিদ্বারের বাস ধরব, কিন্তু আজ যে ড্রাইভার আমাদের জানকী চটি থেকে নিয়ে এল সে বলল – ‘বরকোট কেন যাবেন? ওখান থেকে তো হরিদ্বারের গাড়ি পাবেন না। তার থেকে দেরাদুন হয়ে যাওয়া অনেক ভালো। গাড়িও প্রচুর পাওয়া যাবে।’ হোটেলে এসে যোগেশের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলা হল। যোগেশ জানাল যাত্রার সময় সমস্ত লোকাল জিপ যাত্রীদের নিয়ে চলে যায় বলে গাড়ি পাওয়া খুব অসুবিধা হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও ও সাধ্যমতো চেষ্টা করার আশ্বাস দিল; অনেক ড্রাইভার ওদের হোটেলে চা খেয়ে যমুনোত্রীর দিকে যায়। তাদের কারও সঙ্গে কথা বলে ও আমাদের নিচে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে বলল। সব সেরে শুতে শুতে মধ্যরাত পার হয়ে গেল।

কালকের মতোই হনুমানজির আরতি সঙ্গীতে ঘুম ভাঙল। আজ যোগেশ চা নিয়ে এসেছিল। তাড়াতাড়ি সব সেরে তৈরি হয়ে ন’টার মধ্যে মালপত্র নিয়ে নিচে নেমে এলাম। এরপর তো অপেক্ষা। যোগেশ বহু চেষ্টার পর একটা মালবাহী ম্যাক্স গাড়ি ব্যবস্থা করতে পারল। ওটা বিকাশ নগর অবধি যাবে। এই গাড়িতে ড্রাইভারের সিটের পিছনে কেবিনেই চারটে সিট থাকে। অতএব আমাদের অসুবিধা হল না কোনও। মালপত্র পিছনে তুলে দিয়ে আমরা ভিতরে বসে সাড়ে এগারোটায় দুগ্‌গা বলে রওনা হলাম। এরপর বিকাশ নগর পৌঁছে সেখান থেকেই দেরাদুনের বাসে দেরাদুন বাসস্ট্যাণ্ড এবং অবশেষে সেখান থেকে হরিদ্বারের বাস ধরে রাত এগারোটা দশে হরিদ্বার পৌঁছালাম। অর্থাৎ মোট এগারো ঘন্টা চল্লিশ মিনিট যাত্রা করলাম আজ (এত তাড়াতাড়ি হরিদ্বার পৌঁছানোর জন্য সরকারি বাসের চালকের ঋণ স্বীকার করতেই হবে। কারণ, তিনি অত বড়ো বাসটাকে ভীষণ যানজটের মধ্যে দিয়ে যে ভাবে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে এলেন সেভাবে মোটরবাইক চালাতেও আচ্ছা আচ্ছা বাইকার সাহস পাবে না। ওভাবে না এলে আমাদের হরিদ্বার পৌঁছাতে রাত একটা বেজে যেত)। মধ্যে, আমরা বাঙালি জেনে, ম্যাক্স গাড়ির ড্রাইভার মধ্যাহ্নভোজে তার পরিচিত এক হোটেলে আমাদের নিয়ে গেছিল যাতে আমরা মাছের ঝোল-ভাত খেতে পারি। এখানকার বেশিরভাগ হোটেলেই আমিষ পাওয়া যায় না, যাত্রার সময় তো একেবারেই না (হনুমান চটির হোটেলে বিপিনের বাবা আমাদের অনুরোধে ডিমের অমলেট পরিবেশন করার একটু পরেই পুলিশ এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। সেখানে তখন দু’জন বিদেশি খাওয়া সারছিলেন, তাদের দেখিয়ে উনি কোনোমতে ছাড় পান। বিদেশিদের জন্য কিছু ছাড় আছে)। কিন্তু এই হোটেলে পাওয়া যায়। হোটেলের পিছনেই একটু দূর দিয়ে বইছে যমুনা। নদী থেকে ধরা টাটকা মাছ, না ভেজে খুব স্বাদিষ্ট একটা ঝোল বানালেন মালিক ভদ্রলোক। খুব তৃপ্তি করে খেয়েছি। যেন আমাদের সুন্দর, তৃপ্তিদায়ক যাত্রার যথাযোগ্য পরিসমাপ্তি। কোনোরকম অসুবিধার সম্মুখীন না হয়ে, সুস্থ শরীরে, একদিনও বৃষ্টিতে না ভিজে একটা দারুণ উপভোগ্য যাত্রা শেষ করলাম। প্রকৃতি যেন আমাদের জন্যই নিজেকে অপরূপা করে সাজিয়ে রেখেছিল। আমাদের দেখাতেই তার পরিপূর্ণতা, সার্থকতা। ভেবরা, মানঝির বন্য সৌন্দর্য, কাজলকালো মোহময়ী ডোডিতাল, দারোয়া পাসের প্রহরী উত্তুঙ্গ বন্দরপুঞ্ছ, ফুল বিছানো সবুজ কানসার আর সীমা বুগিয়াল – সবাই মনকে আবিষ্ট করে রাখবে বহুকাল। অলস মুহূর্তে অবচেতন থেকে স্মৃতির ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝেই উঁকি দিয়ে যাবে চেতন মনে।
এবার পাঠকের সুবিধার জন্য যাত্রাপথের প্রধান জায়গাগুলোর উচ্চতা নিচে দিলাম। প্রচলিত উচ্চতার হিসাবের সঙ্গে আমার দেওয়া তথ্য হয়তো মিলবে না, কারণ যাওয়ার আগে আমাদের কাছে যে তথ্য ছিল যাওয়ার পর ওখানের বিভিন্ন জায়গায় লাগানো সরকারি নির্দেশ-বোর্ডে লিখিত উচ্চতার সঙ্গে তা মেলেনি। আমি সেই অনুযায়ীই হিসাব দিলাম –
সঙ্গম চটি – ৫০৮০ ফুট, ভেবরা – ৬৫৭০ ফুট, ধারকোট – ৮২৫০ ফুট, মানঝি – ৮৮১১ ফুট, ভৈঁরো ঘাঁটি – ৯৫৭০ ফুট, ডোডিতাল – ১০,০৩২ ফুট, দারোয়া পাস – ১৩,০৩৫ ফুট, দারোয়া টপ – ১৩,৯৬২ ফুট এবং সীমা – ১১,২৭০ ফুট।

পরিশেষে, যাত্রার মুখ্য খরচগুলোর একটা আন্দাজ দিয়ে দিচ্ছি –
গাইড – ১৫০০/- প্রতিদিন *
পোর্টার – জনপ্রতি ৮০০/- প্রতিদিন *
খচ্চর – খচ্চরপ্রতি ১০০০/- প্রতিদিন *
২ শয্যা বিশিষ্ট ঘরভাড়া (হরিদ্বার) – ৫০০/- প্রতিদিন (ব্যক্তির পছন্দের উপর নির্ভরশীল) #
২ শয্যা বিশিষ্ট ঘরভাড়া (উত্তরকাশী) – ৪০০/- প্রতিদিন (ব্যক্তির পছন্দের উপর নির্ভরশীল) #
সঙ্গমচটি পর্যন্ত জিপ ভাড়া – ৫০০/-
টেন্ট লাগানো আর টয়লেট ব্যবহারঃ ভেবরাতে – ৩০০/-, মানঝিতে - ১০০/-, ডোডিতালে - ৯০০/-
স্থানীয় গাড়িতে হনুমান চটি থেকে যমুনোত্রী – জনপ্রতি ৩০/-
৩ শয্যা বিশিষ্ট ঘরভাড়া (হনুমান চটি) – ৭০০/- প্রতিদিন #
ম্যাক্স গাড়িতে হনুমান চটি থেকে বিকাশ নগর – ১৫০০/-
বিকাশ নগর থেকে দেরাদুন বাসভাড়া – জনপ্রতি ৪০/-
দেরাদুন থেকে হরিদ্বার বাসভাড়া – জনপ্রতি ৭৫/-

*মোট হাঁটার দিনের সঙ্গে ১ দিন অতিরিক্ত যোগ করে হিসাব করতে হবে।
# বছরের কোন সময়ে যাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে কম-বেশি হতে পারে। ২ শয্যা বিশিষ্ট ঘরে ৩ জন ভালোভাবেই থাকা যায়।
এছাড়াও আরও টুকটাক কিছু খরচ আছে। যেমন, আমাদের একটা চার জনের আর একটা দুই জনের উপযুক্ত তাঁবু ছিল তাই সেটা ভাড়া করতে হয়নি, নয়তো সেটা ভাড়া করতে হত। বাসনকোসন, স্টোভ  লাগলে সেটা ভাড়া নিতে হবে, ইত্যাদি।
এটা ২০১৮-র খরচের হিসাব। যেহেতু প্রতি বছরই খরচ বাড়ছে, তাই হিসাবও পরিবর্তনশীল।
(সমাপ্ত)
_____

ছবিঃ লেখক

ভ্রমণ:: ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮(২য় পর্ব) - আইভি দত্ত রায়

আগের পর্ব এখানে - প্রথম পর্ব

ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮
আইভি দত্ত রায়

।।  দ্বিতীয় পর্ব ।।

সকাল সকাল উঠে বেরোনোর তোড়জোড় শুরু করেও বেরোতে সেই ন’টা বাজতে পাঁচ। আমার কিছুটা উদ্বেগ ছিল, কাল এখান থেকেই উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর হু...ই উঁচুতে একটা গিরিশিরার ঢেউখেলানো অবয়ব দেখিয়ে বিপিন বলেছিল ঐখানে যেতে হবে আমাদের। ওটাই ‘দারোয়া টপ’ আর তার পাশের খাঁজটাই ‘দারোয়া পাস’। সুতরাং, কত উঁচুতে চড়তে হবে, কত সময় লাগবে, রাস্তা কেমন – এইসব ভাবতে ভাবতে হন্টন আরম্ভ করলাম। আমি একটু আস্তে হাঁটি বলে সবার আগে হাঁটা শুরু করতে চেষ্টা করি। রাস্তায় বসি না, হাঁপিয়ে গেলে দাঁড়াই, জল খাই, আবার চলি। প্রথম চার কিলোমিটার রাস্তা ডোডিতালের ফিডার নালার পাশ বরাবর উপরে উঠে গেছে দু’পাশের দু’টো পাহাড়ের মধ্য দিয়ে। মাঝারি চড়াই। পাথরের উপর দিয়ে কখনও নালা আমাদের ডান পাশে আবার কখনও বাঁ পাশে। যদিও নালার জলধারা খুব চওড়া নয়; নালার খাতের সিংহভাগ জুড়ে আছে বিশাল বিশাল বোল্ডার আর বিরাট বিরাট গাছের দেহাংশ। শুনলাম, ২০১৩ সালের আগে এই নালা নাকি আরও চওড়া ছিল। ২০১৩-য় এই অঞ্চলে হাই অলটিচিউড গ্লেসিয়াল লেকগুলোর ওপর বেশ কয়েকটা মেঘ ভাঙা বৃষ্টির ঘটনা ঘটে। কেদার মন্দির বিপর্যয়ের কথা নিশ্চয় মনে আছে? এর ফলস্বরূপ আশেপাশের প্রায় সব উপত্যকাগুলোতেই নদী-নালাগুলো ফুলেফেঁপে প্রচুর পরিমাণ ডেব্রিস (বিশাল বোল্ডার, পাথর, বড়ো গাছ, ইত্যাদি) নিয়ে নিচে নেমে আসেএই ডেব্রিস আমরা ডোডিতালের ফিডার নালার মুখেও দেখেছি, এমনকি তালের জলের নিচেও জমে থাকতে দেখেছি। ডোডিতালের বিস্তার এবং গভীরতাও বেশ খানিকটা কমে গেছে এর কারণে।
ওহ! এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, উত্তরকাশী পৌঁছে ভাগবতের অফিসে বসে কথাবার্তার সময় একটা খবর পেলাম যে গঙ্গা নাকি গোমুখ থেকে বেরিয়ে তার বয়ে চলার দিক পরিবর্তন করে ফেলেছে। মানে? মানে হল - গঙ্গা গোমুখ থেকে বেরিয়ে গঙ্গোত্রী হিমবাহের বাঁ দিক বরাবর বইত (তপোবনের গিরিশিরার নিচ দিয়ে), কিন্তু এখন সে ঠিক উলটো দিক দিয়ে বইছে (নন্দনবনের গিরিশিরার নিচ দিয়ে)। অর্থাৎ, তপোবন পৌঁছোতে হলে গঙ্গোত্রী হিমবাহ পার হওয়ার জন্য যে দিক দিয়ে হিমবাহের উপর উঠতে হত সেখান দিয়েই গঙ্গা এখন বইছেন। কারণ কী এমন অদ্ভুত ঘটনার? কারণ সেই মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। এটা হয়েছিল মাউন্ট শিবলিংএর গিরিশিরার উপরে অবস্থিত ‘নীল তাল’-এর ওপর। ফলে নীল তাল ফেটে বিপুল পরিমাণ ডেব্রিস নিচে নেমে সোজা সদ্যোজাত গঙ্গায় পড়ে গঙ্গার গতি রুদ্ধ করে দেয়। কিন্তু একমাত্র ৺মহেশ্বর ছাড়া যার গতি আজ অবধি আর কেউ রুদ্ধ করতে পারেনি, সামান্য ‘বোল্ডার’ তার কী করবে? সুতরাং সুরধুনী আপন খেয়ালে নিজের পথ নিজে করে নিলেনআধ কিলোমিটার-তক ঐদিক দিয়ে বয়ে এসে নিজের পুরোনো পথের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। গঙ্গা পার করিয়ে অভিযাত্রীদের তপোবনের নিচে পৌঁছে দেবার জন্য রোপ ওয়ে বসছে সম্ভবতঃ এটা কেবল অভিযাত্রীদের জন্যই হবে, কারণ এই যাত্রাটাও কতটা নিরাপদ হবে সে ব্যাপারে এজেন্সির লোক, গাইড, পোর্টার সকলেই সন্দিহান। এক ঝলক নিজেদের ২০১২-র তপোবনে আসার কথাটা মনে পড়ল। হিমবাহে ওঠার একটু আগে একটা সমতল জায়গা ছিল, দেরি হয়ে গেছিল বলে আমরা ঐখানেই সেই রাতের মতো তাঁবু লাগিয়েছিলাম। সেখান দিয়ে এখন গঙ্গা বইছে!!!

ডোডিতাল ছেড়ে দারোয়া পাসের পথে
যা হোক, স্মৃতি ছেড়ে বাস্তবে ফিরি। সামনে দুটো খচ্চরের পিঠে মাল বোঝাই। আমরা পর পর লাইন দিয়ে পাথরের খাঁজ-ভাঁজের মধ্যে দিয়ে চলেছি – নিজেদের হঠাৎ কেমন প্রাচীন ভিনদেশীয় বণিকদের মতো মনে হচ্ছিল, যারা অনেক দূর দেশ থেকে বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে, কঠিন গিরিবর্ত্ম পেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে সওদা চাপিয়ে বাণিজ্যে আসত। জয়া শুনে বলল, “ঠিকই আছে। আমরা কষ্ট বেচে একটু আনন্দ কিনতে যাচ্ছি – সে বাণিজ্যই তো হোল।” চার কিলোমিটার চলে একটু থামলাম। হালকা খাওয়া-দাওয়া, চা খাওয়া হল। এখান থেকে পাস চোখে পড়ল এখনও দুই কিলোমিটার চলতে হবে, উঠতে হবে আরও খানিকটা উপরে। তবে কোথাওই রাস্তা ভীষণ খাড়া নয়। সারা রাস্তায় ঘাস জমি, ফুল, গাছ রয়েছে। গাছের মধ্যে রডোডেনড্রনই প্রধান হাঁটতে কষ্ট হয় না। এখানেও বুনো ফুল অজস্র ফুটে আছে। বিপিন বলল আর ক’দিন পর এই উপত্যকায় একরকম ফুল ফুটবে যার গন্ধ নাকে গেলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, ঘুমিয়েও পড়তে পারে। নিচের বনে রডোডেনড্রন ফোটা শেষ, কিন্তু এখানে উচ্চতার জন্য অজস্র ফুটে আছে। চললাম টুক টুক করে। কিলোমিটার খানেক বাকি থাকতে আস্তে আস্তে চোখের ডান কোণ দিয়ে ফুটে উঠল প্রথমে ব্ল্যাক পিক, এরপরেই বন্দরপুঞ্ছ ঠিক পাস-এ ওঠার মুখে তিরিশ-চল্লিশ মিটার মতো রাস্তা ঝুরো পাথর মাটির। এই ধরনের রাস্তাতে আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই, বড্ড জুতো পিছলে যায়। বিপিন সাহায্য করল। বাবুয়া পিছন থেকে আওয়াজ দিল – ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে চলিতে পারি না’। দিক্‌ গে! আমি তো নির্বিঘ্নে উঠে এলাম পাস-এর ওপর। উফফ্‌! শেষ অবধি পৌঁছোতে পারলাম! বাঁ দিকের ছোট্ট একটা ঢিপি পেরিয়ে উঠে এলাম গিরিপথ-এর মাথার ঢালু ঘাসজমিতে।

ওই ইংরিজি U অক্ষরের মতো দেখতে নিচু জায়গাটাই দারোয়া পাস
পাসে পৌঁছোনোর পথে
উঠেই তাকালাম উত্তর-পূর্ব কোণে, ব্ল্যাক পিক এবং বন্দরপুঞ্ছ এখন আরও পরিষ্কার। পাসে ওঠার ঠিক আগেই ডান দিকে একটা পায়ে-চলা পথ উলটো দিকে চলে গেছে। বিপিন বলল ওটা ‘বামসারু পাস’ যাবার রাস্তা। বামসারু পাসও দারোয়া পাসের মতো গঙ্গা ভ্যালির সঙ্গে যমুনা ভ্যালিকে জুড়েছে। ঘড়ি বলছে একটা কুড়ি। যাক্‌, খুব একটা খারাপ হাঁটিনিনিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়ালাম। এবার পুজোটা সেরে নেবার পালা। আলাদা করে কাজু, কিশমিশ, আঞ্জীর, চকোলেট এনেছিলাম, ডোডিতালের মন্দিরের পূজারির থেকে একটু ধুনো-ধূপও চেয়ে আনা হয়েছিল। ওখানে দেখলাম একটা নরম মাটির গোলাকার জায়গায় গোছা গোছা হলুদ ফুল ফুটে আছে। আমার মনে হল এইরকম একটা জায়গার পাশেই প্রসাদটা রেখে ধুনো-ধূপ জ্বালিয়ে দিলে আর আলাদা করে ফুল তুলতে হবে না। সেইমতো পুজো সারা হল, প্রসাদ বিতরণও হল। বিপিন ওখান থেকেই খানিকটা নিচে আমাদের ‘কানসার বুগিয়াল’ দেখাল। ওইখানেই তাঁবু লাগাতে হবে। কানসার হল যমুনা উপত্যকার একটি পরিচিত বুগিয়াল। অন্য বুগিয়ালগুলোর মধ্যে ‘বায়াংকুলা’, ‘সীমা’ – এরাও নামী। দারোয়া টপের উত্তর দিকের ঢালে দারোয়া পাস আর কানসার টপের উত্তর দিকের ঢালে কানসার বুগিয়াল। বুগিয়ালের জমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে গিরিখাতের দিকে। খাতের উলটো দিকেই বিশাল বন্দরপুঞ্ছ পর্বতপুঞ্জ। শৃঙ্গগুলির পিছন দিকটা দেখা যায় এখান থেকে। আর দেখা যায় ভয়ংকর খাড়াই ঢালগুলো। বেশিটাই পাথুরে ঢাল, মধ্যের খাঁজগুলোতে বরফ জমে আছে।

পাসের ওপর
বিপিনের তাড়ায় ঢাল বেয়ে নেমে চলতে লাগলাম ক্যাম্পসাইটে। এও প্রায় এক-দুই কিলোমিটার মতো পথ। নিচের ভ্যালি থেকে মেঘ উঠে আসছিল, তাই বিপিন চেষ্টা করছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁবু লাগিয়ে ফেলা যায়প্রচণ্ড হাওয়াও চলছিল। এসব জায়গায় আবহাওয়ার কোনো ভরসা নেই, হঠাৎই বিগড়ে যেতে পারে। আমাদের তাঁবু-টাবু গুছিয়ে দিয়ে বিপিন যাবে আমাদের পরদিনের পথ অগ্রিম পরীক্ষা করে আসতে, যেটা কানসার টপ পেরিয়ে গিরিশিরার দক্ষিণ ঢাল বরাবর। ওখানে একটা বড়ো, গভীর নালা আছে। যদি ঐ নালায় বরফ থাকে, তবে সেখান দিয়ে খচ্চর নিয়ে যাওয়া মুশকিল হবে। তখন বিপিনকে বিকল্প রাস্তা দিয়ে আমাদের নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে পথের দৈর্ঘ্য বাড়বে। যেহেতু এই পথে এই মরসুমে আমরাই প্রথম দল, তাই রাস্তার অবস্থা সম্পর্কে আগাম কোনো খবর নেই আমাদের কাছে। কিছুদিন আগে টাটা-র একটা দল বরফের জন্য নালা পেরোতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং আগে থেকে রাস্তা দেখে আসা বা রুট রেইকি করা খুবই জরুরি।
ক্যাম্প সাইট-টা খুব সুন্দরসবুজ ঘাসে মোড়া প্রায়-সমতল একটা চাতাল। ঘাসে বিছিয়ে আছে নীল, হলুদ, গোলাপি ছোট্ট ছোট্ট ফুল। একটু নিচে দু’দিক দিয়ে সরু নালা তিরতির করে বয়ে যাচ্ছেচাতালটার সীমানা বরাবর টানা রডোডেনড্রন ঝোপ - গোলাপি, সাদা। ছোট্ট অফ হোয়াইট রডোডেনড্রনের একটা প্রজাতিও প্রচুর ছড়িয়ে আছে। মধ্যে মধ্যে আবার জুনিপার ঝোপও আছে। পূর্বদিকে পাস-এর দেওয়াল, উত্তরে বিশাল বন্দরপুঞ্ছ, দক্ষিণে দারোয়া টপ-এর গিরিশিরা আর পশ্চিমে ক্রমশঃ ঢালু হয়ে বুগিয়াল নেমে গেছে অনেক নিচে, আর দূরে একটা গিরিশিরার ছোটো ছোটো মাথাগুলো উঁকি দিচ্ছে। যদিও বন্দরপুঞ্ছ-এর মাথায় মেঘ জমেছে, ভালো দেখা যাচ্ছে না, তবুও যা দেখেছি তাতেই আমরা মোহিত। কাল এখানেই বিশ্রাম নেব। আশা করি পরিষ্কার আকাশে একটা দারুণ সূর্যোদয় দেখতে পাব। রোদ থাকতে থাকতে নালার ঠাণ্ডা জলে হাত-পা-মুখ ধুয়ে নিলাম। গত তিন দিন পায়ে জল লাগেনি, পা-টা ধুয়ে খুব আরাম হল। হালকা স্ন্যাকস নিচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি পশ্চিম দিগন্তে টুকটুকে লাল সূর্যটা ডুব দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার সামনের পাহাড়ের সারির পিছন দিকের মেঘগুলো একটা গোলাপি বলয় তৈরি করেছে যেন তাদের মাথার পিছনে। অনবদ্য! ছবি তুললাম। যদিও জানি না যে, সেই লালচে গোলাপি মায়াবি আলোটাকে আমার ফোনের ক্যামেরা ধরতে পারল কিনা ঠিকঠাক। কিন্তু আমার মনের ক্যামেরাতে এ আলো ধরা থাকবে চিরকাল আর আমাকে লোভ দেখাবে বারবার ফিরে আসার জন্য।
আজ বিশ্রাম। তাই ওঠার তাড়া ছিল না। গাইড, খচ্চরওয়ালা, খচ্চর সবাই ক্লান্ত। এই বিশ্রামটা সবারই দরকার ছিল। কাল আবার লম্বা হাঁটা। আমি উঠেছি সকলের আগে। বেরিয়ে গেছি তাঁবু থেকে, যদি সূর্যোদয়টা দেখতে পাই - এই আশায়। কিন্তু আকাশ একটু মেঘলা। উপরন্তু পূর্বদিকে পাস-এর গিরিশিরার আড়াল থাকায় সূর্য একটু উপরে না উঠলে দেখতে পাব না বুঝলাম। একটু পরে আমাদের মাথার ওপরের আকাশ পরিষ্কার হল ঠিকই, সূর্যকেও গিরিশিরার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। কিন্তু বন্দরপুঞ্ছ-এর গিরিশিরা ধোঁয়াশায় ঢাকা। নিচের পশ্চিমাকাশও তাই। কাল যে গিরিশিরাটার পিছনে সূর্যকে অস্ত যেতে দেখেছিলাম সেটাকে দেখতেই পাচ্ছি না। অনেক বেলাতেও দৃশ্যপট পরিষ্কার হল না। বিপিনকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলল সম্ভবত আশেপাশের কোনো পাহাড়ের জঙ্গলে আগুন লেগেছে, না হলে এমন ধোঁয়াশা হওয়ার কথা নয়আমাদের স্লিপিং ব্যাগ এবং অন্যান্য কিছু জিনিসপত্র রোদে দিলাম। ছোটোখাটো কিছু জিনিস ধুয়েও দিলাম। জল বরফগলা, হাত কেটে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। বাবুয়ার ফেঁসে যাওয়া স্লিপিং ব্যাগের কল্যাণে ওর নিজের তো পালক-ছাড়ানো মুরগির মতো অবস্থা, সঙ্গে সারা টেন্ট পালকে ভর্তি হয়ে আছে। ও বসল সেটাকে ঠিক করবে বলে।


আজ আকাশ আর পরিষ্কার হল না। হঠাৎ দেখি কানসার টপের পিছন থেকে মেঘের দল হালকা চালে উপরে উঠছে। আমি দেখলাম হালকা সাদা মেঘ, হাওয়ার সঙ্গে উড়ে যাবে। কিন্তু বিপিন ভ্রু কুঁচকে বলল – আজ তাড়াতাড়ি মেঘলা হয়ে যাবে। আমার ঠিক বিশ্বাস হল না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সত্যিই এরপর থেকে ক্রমাগত মেঘের দল হানা দিতে থাকল। একেকবার তো এমন ছায়া হয়ে যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। মাঝে মাঝেই তেড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে তেমন কোনো কাজ নেই, তাই তাঁবুর আশেপাশেই ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। জীবনের পথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়, কিন্তু এখানে পথ আক্ষরিক অর্থেই ‘কুসুমাস্তীর্ণ’। সারা বুগিয়ালের ঘাসজমি ছোটো ছোটো বিভিন্ন রঙের ফুলে ছেয়ে আছে, যেন সবুজ ভেলভেটের কাপড়ে চুমকি বসানো। মন না চাইলেও তাদের মাড়িয়েই চলতে হবে। বুগিয়ালের ধার বরাবর রডোডেনড্রনের নেকলেস, সুন্দরী বুগিয়াল যেন জড়োয়া গয়নায় সেজেছে। এখান ওখান দিয়ে জলধারা বয়ে চলেছে – বুগিয়ালের লাইফ লাইন। জলের ধারার পাশ বরাবর বড়ো বড়ো হলুদ ফুল গোছায় গোছায় ফুটে আছে। কঠিন চড়াই, রুখুসুখু প্রান্তর পেরিয়ে আসা অভিযাত্রীর কাছে বুগিয়াল যেন একখন্ড মরূদ্যান। ভেড়াওয়ালারা আষাঢ় মাসের প্রথমে তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে চলে আসবে বুগিয়ালে। মাস তিনেক থেকে শীতের শুরুতে গ্রামে ফিরবে। এই তিন মাস ভেড়াগুলো পর্যাপ্ত কচি ঘাস খেয়ে তাগড়া হবে। আমাদের খচ্চরওয়ালা লব এই ভেবেই আশ্বস্ত যে ভেড়াওয়ালারা আসার আগেই আমরা এসেছি, ওর খচ্চররা ভালো করে খেতে পাবে; নয়তো ভেড়ার পাল চড়তে শুরু করলে একটু ঘাসও বাঁচবে না। আপাতত ও খচ্চরদের একটু দূরে চরাতে নিয়ে গেছে। এই উচ্চতায় পাখির সংখ্যা খুবই কম, যে ক’জন আছে – পুঁচকে পুঁচকে – তারা রডোডেনড্রনের ঝোপেই থাকে। বড়ো পাখির মধ্যে সামান্য কিছু সংখ্যক চৌ আর কিছু দাঁড়কাক হেঁড়ে গলায় ডাকতে ডাকতে বুগিয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা উড়ে বেড়াচ্ছে। ভেড়াওয়ালা, অভিযাত্রী - এদের থেকেই খাওয়াদাওয়া পায় বোধহয়। শীতে হয়তো নিচের দিকে চলে যাবে। ডোডিতালেও প্রচুর দাঁড়কাক দেখেছি। যা হোক, এখানকার পাখিরা পুঁচকে হলেও গলার আওয়াজ কিন্তু বেজায় তীক্ষ্ণ। তাদের কিচিরমিচির সারাক্ষণই শোনা যায়। কাল সারা রাত টংক টংক – নাইটজার-এর ডাক শুনেছি। কয়েকরকম প্রজাপতি দেখছি উড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ ফড়ফড় আওয়াজে পিছনে তাকিয়ে দেখি বিপিনদের তাঁবুর সামনে একটা দাঁড়কাক একটা পলিথিন প্যাকেট নিয়ে টানাটানি করছে। উফফ! ওদের তাঁবুতে কেউ ছিল না, ওখানেই রান্নাবান্না হচ্ছে। সুতরাং সুযোগসন্ধানী দণ্ডবায়স ওখানেই হানা দিয়েছে। আমি উঠে দাঁড়াতেই ওটা প্যাকেট ছেড়ে উড়ে গেল, আর প্যাকেটটা যেহেতু খালি ছিল তাই সেটা হু….স করে গড়িয়ে চলতে লাগল হাওয়ায়। কোনোমতেই প্লাস্টিক উড়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আমি ছুটলাম ওটাকে ধরব বলে। এর মধ্যে জয়া তাঁবু থেকে বেরিয়ে ধরল ওটাকে।
ভেবেছিলাম ব্রেকফাস্ট করে একটু দারোয়া টপের দিকে যাব। কিন্তু ব্রেকফাস্ট দেরিতে হওয়ায় লাঞ্চ-এর তৈয়ারির সময় হয়ে গেল। এখন বিপিন আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলে লাঞ্চ–ও অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই লাঞ্চ সেরে যাওয়াই ঠিক হল। দেড়টা নাগাদ রওনা দিলাম টপের উদ্দেশে। যতদূর পারি যাব। টুক টুক করে উঠতে লাগলাম উপরে, আমি আর জয়া। বাবুয়া আসেনি। কিছুদূর পূব দিকে চলার পর আমাদের ডান দিকে দারোয়া টপের অবয়ব পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠতে লাগল। গিরিশিরায় ওঠার একটু আগে বিপিন আমাদের মুখোমুখি একটা উঁচু হাম্প দেখিয়ে বলল যে ওটা নাকি ‘বেবি দারোয়া টপ’দেখলাম এই ঢিপিটাই ক্রমশ ওপরে গিয়ে একটু ডান দিকে মোচড় মেরে উঁচু হয়ে দারোয়া টপ তৈরি করেছে। যারা কোনো কারণবশতঃ মূল টপ–এ চড়তে পারে না তারা বেবি টপ–এ চড়ে দুধের সাধ ঘোলে মেটায়। আমরা তো এতদূরও চড়তে পারব ভাবিনি। গিরিশিরায় চড়ে বেশ উত্তেজিত লাগল। কিছুটা নিচে বাঁদিকে পাস, যেটা গতকাল পেরিয়ে এসেছি। অনেক নিচে ডোডিতাল এলাকার ছোট্ট একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নিচ থেকে নিয়ে উলটো দিকের পুরো বন্দরপুঞ্ছ রেঞ্জ মেঘে ঢাকা। বোঝা যাচ্ছে পিকগুলোর ওপর স্নো ফল হচ্ছে। রোদ মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়েই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। নাকের নিচটা জ্বালা করতে শুরু করল, বোধহয় ফেটে গেল। এখানেই খানিকক্ষণ বসলাম আমরা। বসে বসে সামনের রাস্তাটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল টপ অবধি চলে যেতে পারবমোটেই চড়াই নয়, কিন্তু রাস্তাটা লম্বা। জয়া বলল, “চল, চলে যেতে পারব, আর তো বেশি চড়াই নেই।” বিপিনকে বলাতে ও বলল, “মুশকিল।” কারণ, তখনই সোয়া দুটো বাজে। ঐ রাস্তা পেরোতে অন্তত আরো তিরিশ-চল্লিশ মিনিট লাগবে। এরপর এতটা নামতেও তো হবে। মেঘ কখন বেশি ঘন হয়ে গিয়ে বর্ষাতে আরম্ভ করবে তার কোনো স্থিরতা নেই। ওর কথায়, “পাহাড় কা মৌসম ওউর মুম্বাই কা ফ্যাশন – কব বদল যায়ে কোই ভরোসা নেহি।” ছোকরা রসিক আছে (খুব হালকা একটা ফাঁকিবাজির ঝোঁকও আছে)অগত্যা নামা শুরু করলাম। ঘাসজমির মধ্যে দিয়ে ট্র্যাভার্স করে অর্থাৎ আড়াআড়ি নামা। তিনটে নাগাদ ফিরে এলাম ক্যাম্পে। এসেই গরম গরম চা, দারুণ লাগল। ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাত-মুখ জমে গেছে। ঠিক সাতটায় লাল টুকটুকে সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেল পাহাড়ের পিছনে, আমরাও টুক করে তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম। সন্ধে কাটল আড্ডা দিয়ে আর তাস খেলে। সাড়ে ন’টার মধ্যে খেয়ে শুয়ে পড়াকাল গন্তব্য ‘সীমা’। বিপিনের হিসেবে রাস্তা কঠিন নয়, খুব লম্বাও নয় - আট কিলোমিটার, তাও বরফ-টরফ মাঝেমধ্যে থাকতে পারে। সময় বেশি লাগবে। তাই তাড়াতাড়ি রওনা হওয়া দরকার।


ঘুম ভেঙে গেল সকাল পাঁচটা কুড়ি নাগাদ। সূর্য উঠে গেছে, কিন্তু উপত্যকায় আলো আসেনি। বন্দরপুঞ্ছের মাথায় আলোর আভা। ছ’টা নাগাদ হলুদ সূর্যটা চোখের সামনে উঁকি দিল। কিন্তু তুষারশৃঙ্গগুলো আজও ধোঁয়া ধোঁয়া। যা হোক, সব সেরে রওনা হতে ন’টা কুড়ি। প্রথমে হালকা হেঁটে কানসার টপ-এর পাশের নিচু জায়গাটা পেরিয়ে গিরিশিরার দক্ষিণ ঢালে চলে এলামবিপিনের কথায়, “আজ কা রাস্তা - বস্‌ ডাউন ডাউন, অউর বীচ্‌ বীচ্‌ মে সিধা সিধা।” কার্যক্ষেত্রে, সারাদিন পাহাড়ি ছাগলের মতো একটার পর একটা গিরিশিরার গা বেয়ে চললাম আর অসংখ্য স্পার অর্থাৎ উপগিরিশিরা পেরোলাম। রাস্তা খুব কষ্টকর কোথাওই নয়। কিন্তু সারাদিন টং টং করে একই ধরনের স্পার, রিজ, বোল্ডার পেরোনোটা বেশ বিরক্তিকর। তার ওপর একটু উঁচু কোনো জায়গায় উঠলেই সাঁই সাঁই করে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া চলছেহাওয়ার দাপটে মালভর্তি ন্যাপ স্যাক উলটে পড়ে যাচ্ছে। খাবারভর্তি প্যাকেট ধরে না থাকলে উড়ে যাচ্ছে। রোদেরও তেজ নেই, মেঘাচ্ছন্ন। মাঝখানে কয়েকটা বরফ প্রান্তর পেরোলাম। অবশ্যই বিপিনের সহায়তায়। পথের সব বরফ এখনও গলেনি। প্রথম আইস ফিল্ডটা পেরোনোর সময়ই দারুণ একটা ব্যাপার হল। এই প্রথম গোল্ডেন ঈগল দেখলাম। প্রথমে জয়া যখন দেখাল তখন আমি ভাবলাম চৌ। হলদে একটা ঠোঁট-ই দেখেছিলাম শুধু। তারপর ভালো করে দেখি, আরে! তাই তো! এটা আকারে অনেক বড়ো, গলা হলুদ পালকে ঢাকা; ঠোঁট বড়ো, বাঁকা, হলুদ রঙের ও বোধহয় নিরিবিলিতে খাবার খুঁজতে এসেছিল (এখানে প্রচুর pica আছে)। আমরা এসে পড়াতে বিরক্ত হয়ে উড়াল দিল। গলা থেকে পেট সোনালি, কী দারুণ দেখতে! আমাদের মাথার ওপর দুটো চক্কর লাগাল। আমিও এই সুযোগে ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। ছবি তো তুললাম, কিন্তু আলো তেমন না থাকায় রংটা বোধহয় আসবে না ছবিতে। শুনেছি গোল্ডেন ঈগলের দেখা পাওয়া সহজ নয়। বিপিন বলল, এটা ওর এলাকা, নিচে আর একজন থাকে। ফুল তো আছেই সারা রাস্তা জুড়ে।
কানসার গিরিশিরার দক্ষিণ ঢাল বেয়ে নামা থেকে ক্রমাগত পশ্চিম অভিমুখে চলে বেলা প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ একটা গিরিশিরার ওপর থেকে অনেক নিচে ‘সীমা’ বুগিয়ালের প্রথম দর্শন হল। বিপিন বলল, এই বুগিয়ালের দুটো ক্যাম্প সাইট, একটা আপার, একটা লোয়ার সীমা লোয়ার-টাই বেশি ভালো, আর কাল ঐ দিক দিয়েই নামতে হবে, অতএব আজ এই রাস্তাটুকু নেমে থাকলে ভালোই হবে। জয়া প্রথমে এতটা নামতে চায়নি। এতখানি ক্লান্তিকর হাঁটা, খিদে, ঠাণ্ডা - সব মিলিয়ে পরিশ্রান্ত ছিলাম। কিন্তু আমার মনে হল, ঠিকই আছে। এইটুকু নেমে থাকলে কাল সুবিধাই হবে। এই ভেবে জয়াকে বুঝিয়ে নিচে যেতে রাজি হয়ে গেলাম। বিপিন আর লব মালপত্র সমেত খচ্চর নিয়ে আগে চলে গেল, আমরা একটু বিশ্রাম নিয়ে নামা শুরু করলাম। নামা বলে নামা! পাথুরে রাস্তা দিয়ে ঠাঁই ঠাঁই সোজা নিচে নামা। খাড়াই প্রায় সত্তর ডিগ্রি, রাস্তা প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার। এতটা পথ নামতে হবে বুঝিনি। জলও শেষ হয়ে গেছিল, পৌঁছে যাব বলে আর ভরিনিগলা শুকিয়ে কাঠ। লব মালপত্র রেখে ফিরে এসে মাঝপথ থেকে বাকি রাস্তা আমাদের সঙ্গ দিল। শেষ পর্যন্ত পৌনে পাঁচটায় ক্যাম্প সাইটে পৌঁছোলাম।
পৌঁছেই প্রায় চিৎপাত হয়ে পড়ার মতো অবস্থা, বিপিন চা তৈরি করে রেখেছিল। চা-বিস্কুট খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে ভালো করে ক্যাম্প সাইটটা দেখলাম। অপূর্ব সুন্দর, সবুজ ঘাসে ফুল ছড়ানো ঢেউ খেলানো বুগিয়াল। মাঝখানে হৃষ্টপুষ্ট জলের ধারা বইছে। চারপাশের পাহাড়ে বড়ো বড়ো গাছের জঙ্গল। সামনে বিশাল বন্দরপুঞ্ছ - সব মিলিয়ে আঁকা ছবি। আমরা যখন পৌঁছেছি তখন ওখানে একপাল গরু-বলদ চরছিল। বিপিন বলল, গ্রামের লোকেরা এদের এখানে ছেড়ে গেছে চরার জন্য। পাঁচ-ছয় দিন অন্তর একজন এসে খোঁজ নিয়ে যায়গরুরা চরতে চরতে স্বচ্ছন্দে এক বুগিয়াল থেকে অন্য বুগিয়ালে চলে যায়। তবে এখানকার জঙ্গলে লেপার্ড আছে। গরুর পালের মধ্যে কোনো প্রাণহানি হলে, যে লোক খবর নিতে আসে সে গিয়ে গরুর মালিককে খবর দেয়। শুনেছিলাম সীমা থেকে সূর্যাস্ত নাকি দারুণ দেখায়, কিন্তু আমাদের সেই অদ্ভুত সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা হল না। সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম দিগন্ত মেঘে ঢাকাকেবল মেঘের পিছন থেকে অস্তরবির রশ্মিচ্ছটা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হল। আমার অবশ্য সে জন্য কোনো দুঃখ নেই। কানসার বুগিয়াল থেকেই যে অসাধারণ সুন্দর সূর্যাস্ত দেখেছি তার তুলনা নেই।
সন্ধে হতেই বিপিন আর লব কাঠ জড়ো করে বেশ বড়ো আগুন জ্বালাল। তাপও পাওয়া যাবে, রান্নাও হবে, আবার কোনো বন্য জন্তুও কাছে আসবে না। আগুন দেখেই মাথায় একটা জব্বর ফন্দি এল। আমরা ভর্তা খাব বলে বেগুন কিনে এনেছিলাম। ছোটোবেলায় দোলের আগের দিন ন্যাড়াপোড়ায় বুড়ির ঘরে বেগুন, আলু, টমেটো সব দিয়ে আগুন লাগাতাম। তারপর সেই সব পোড়া মেখে জুৎ করে খেতাম। সেটা মনে করেই ওদের বললাম বেগুন, আলু, টমেটো সব আগুনে দিয়ে পোড়াতে। ওরা বেশ অবাক হল, কারণ ওরা এ যাবৎ শুধু আলু পোড়াই খেয়েছে। খাওয়ার সময় সবাই কিন্তু খুব তৃপ্তি করেই পোড়া-মাখা আর রুটি খেলাম। আমাদের ক্যাম্প ফায়ার ভালোই উদ্‌যাপন হল।
রাতে বেশ কিছুক্ষণ আগুনের পাশে বসে আড্ডাও দিলাম এবং কথাবার্তার মধ্যেই বিপিনকে চেপে ধরলাম, “সচ্‌ বাতাও তো, আজ কিতনা রাস্তা চলে হম?” ব্যাটা মহা পাজি, খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল, “কিঁউ? আট কিলোমিটার হি হ্যায়!” কক্ষনও আট কিলোমিটার নয়, হতে পারে না। আমাদের মনে হচ্ছিলই যে, অনেকটা বেশি হেঁটেছি। আবার জিজ্ঞাসা করাতে উলটে আমাদেরই জিজ্ঞাসা করল, “কিঁউ? আপ লোগোকো কিতনা লগ্‌ রহা হ্যায়?” ব্যাটার ঠোঁটের ফাঁকে মিচ্‌কে হাসি। আমরা বললাম, মনে হচ্ছে বারো-তেরো কিলোমিটার, অন্তত বারো-র কম তো কিছুতেই নয়। তখন পাজিটা বলে কিনা, “বারাহ্‌ সে থোড়া হি জেয়াদা হ্যায়।” বলেই কী হাসি! একেবারে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। বোঝো কাণ্ড! আজ বারো কিলোমিটারের উপর হেঁটেছি, অথচ জানতাম না বলে সেই অনুযায়ী খাবার নেওয়া হয়নি সঙ্গে, তাই অত খিদে পেয়ে গেছিল। সত্যিটা বলেই সঙ্গে সঙ্গে ওর যুক্তি – যদি ও হাঁটার শুরুতেই আমাদের বলত যে এতটা পথ হাঁটতে হবে তবে নাকি তখনই আমাদের উৎসাহ কমে যেত, আমরা এত ভালোভাবে হাঁটা শেষ করতে পারতাম না। কী বলব? যাক গে, হাঁটা তো হয়ে গেছে। (জানিয়ে রাখা ভালো, এ পথে না এসে অন্য একটা পথেও কানসার থেকে সীমা আসা যায়, সে পথ ‘বায়াংকুলা’ হয়ে। সে ক্ষেত্রে, গিরিশিরা না পেরিয়ে সোজা কানসার বুগিয়ালের ঢালু পশ্চিমদিক দিয়ে নেমে বায়াংকুলা পৌঁছে সেখান থেকে চড়তে হবে সীমা। যদিও সময় কম লাগবে কিন্তু বায়াংকুলা থেকে সীমার চড়াইটা তীব্র।)
কাল নিচে নামব। কাল কত রাস্তা? কালও ওই বারো কিলোমিটার মতোই হাঁটতে হবে। জয় মহেশ্বর! আকাশে চাঁদের আয়তন বাড়ছে। প্রথমে আকাশ একটু মেঘলা ছিল, পরে সব পরিষ্কার হয়ে গিয়ে ফটফটে জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। সামনেই পূর্ণিমা। সুরক্ষার জৈবিক তাগিদে সব গরুগুলো এসে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। তাদের মধ্যে একটা গরু মনে হল কাশছিল মাঝে মাঝে, পরদিন বিপিনকে বলাতে ও বলল যে, ঠাণ্ডা নয়, গরুটা কোনোভাবে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলেছে, সেটা ওর গলার নিচে আটকেছে। ও আর বেশিদিন বাঁচবে না। আমাদের সভ্যতার অবদান! কী মর্মান্তিক মূল্য দিচ্ছে অবলা প্রাণী (যেমন দিল থাইল্যাণ্ডের সমুদ্রতটে ভেসে আসা মৃত তিমি মাছটা, যার পেট কেটে চল্লিশটি প্লাস্টিকের প্যাকেট বেরোল)। জলের আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।
(এরপর আগামী সংখ্যায়)
_____
ছবিঃ লেখক

ভ্রমণ:: ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮ - আইভি দত্ত রায়


ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮
আইভি দত্ত রায়

।।  প্রথম পর্ব ।।

“বাবুয়া, তোর নিমকিটা এনেছিস? দে তো, বাইরেটা বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে,” জয়া বলল। নিমকি? আমি তো অবাক, সেটা আবার কী? জানলাম, সেটা একটা ছোট্ট টর্চ, ট্যাবলেট ব্যাটারিতে চলে। অল্প সময়ের জন্য ভালো কাজ দেয়।
বসে আছি ‘ভেবরা’ ক্যাম্প সাইটে। মূল গন্তব্য ডোডিতাল হয়ে দারোয়া পাস অতিক্রম করে হনুমান চটি। গতবছর সমস্ত প্রস্তুতি সারা হয়ে যাবার পর অনিবার্য কারণে যাওয়া রদ করতে হয়েছিল। মনটা খারাপ হয়ে গেছিল, কিন্তু কোনও উপায়ও ছিল না। সে দুঃখ কিছুটা লাঘব হয়েছিল ডিসেম্বরে ‘দেওরিয়া তাল’–এর স্থির জলে ‘চৌখাম্বা’-র অপরূপ প্রতিবিম্ব আর তুঙ্গনাথের পথে রাশি রাশি জমা বরফ দেখে। কিন্তু ডোডিতাল-এর ভাবনাটা মনের গহিনে সযত্নে লালিত হচ্ছিল। তাই এ বছর সুযোগ তৈরি হতেই পূর্ণ উদ্যমে লেগে পড়লাম গত বছরের খসড়া পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করতে। প্রায় সবই তৈরি ছিল – প্রতিদিনের যাত্রাপথ, সম্ভাব্য খরচের হিসাব, রসদের পরিমাপ, স–অ–ব। বাকি শুধু বিষ্ণু বা ভাগবতকে ফোন করে একবার ঝালিয়ে নিয়ে ওদের এজেন্সি, ‘স্নো স্পাইডার’-এর সঙ্গে চুক্তিটা করে নেওয়া। এ বছর শুরুতে আমাদের পাঁচ জনের দল ছিল। হিসাবপত্র দেখে আমরা আগের বারের পরিকল্পনাটাকে আর একটু বাড়িয়ে যমুনার উৎস ‘সপ্তর্ষি কুণ্ড’ পর্যন্ত যাওয়া ঠিক করলাম। গঙ্গার উৎস তো দেখেছি, যমুনার উৎসটাও যদি দেখে আসতে পারি - এই ভাবনা থেকেই পরিকল্পনা পরিবর্ধন। অবশ্য অন্য একটা ব্যাপারও এই ভাবনার পিছনে কাজ করেছিল। শুনেছিলাম এবং পড়েওছিলাম যে, ‘সপ্তর্ষি কুণ্ড’ - যেটি আদতে একটি হিম সরোবর (Glacial Lake), তার অবস্থান অসাধারণ সুন্দর পারিপার্শ্বিকে। জায়গাটা দুর্গম বটে, আবার দারুণ সুন্দরও বটে। কথিত আছে যে, আমাদের পুরাণের বিখ্যাত সপ্ত ঋষি এই কুণ্ডের চারপাশে ধ্যানে বসেই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এই গম্ভীর, গভীর সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখার সাধ ছিল। আরও আছে, যমুনোত্রী থেকে কুণ্ডের পথ যে বনের মধ্য দিয়ে গেছে সেই বন বিভিন্ন ভেষজ গাছ-গাছড়ার ভাণ্ডার। অসংখ্য সহজলভ্য এবং দুষ্প্রাপ্য ওষধি পাওয়া যায় এই জঙ্গলে। হনুমান গন্ধমাদন নিয়ে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার সময় নাকি সেই পর্বত এখানে নামিয়ে একটু জিরিয়েছিলেন। তাই এখানকার পর্বত-অরণ্য সেই গন্ধমাদনের অংশ, আর যেখানে হনুমান যমুনার জলে হাত-পা ধুয়ে ক্লান্তি কাটিয়েছিলেন সেখানে ‘হনুমান চটি’ (দুটি জায়গার মধ্যে দূরত্ব যদিও ১৪-১৫ কিমি)। এই পর্বত-অরণ্যের মতোই ‘উত্তরাখণ্ড’ হল কল্পকাহিনির ভাণ্ডার। সে ঘটনা যাই হোক, ওষধি গাছ-গাছড়ার প্রতি আমার প্রবল ঝোঁক। সব মিলিয়েই বেশ উত্তেজিত ছিলাম। প্রস্তুতি চলছিল। বিষ্ণু’র সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করে নেওয়া হয়েছিল। গাইড, খচ্চরএর ভাড়া আগের বারের তুলনায় একটু বেশিতাও ‘জনপ্রতি খরচ’ আমাদের আওতার মধ্যেই ছিল।
মুশকিলটা হল যখন কয়েকদিনের ব্যবধানে পর পর দু’জন যাওয়া বাতিল করল। আমাদের তো মাথায় হাত! যাওয়ার সাত দিন আগে আবার বসতে হল। আমি, জয়া আর বাবুয়া – টিকে আছি এই তিনজন। হিসাব করতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! খরচ আয়ত্ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। যাঃ, তাহলে কি এবারও যাত্রা বাতিল করতে হবে? অনেক আলোচনার পর প্রোগ্রামটা রিভিউ করে দেখা গেল যে, যদি সপ্তর্ষি কুণ্ডের অংশটা বাদ দেওয়া যায় তবে খানিকটা বেশি হলেও ‘জনপ্রতি খরচ’ একেবারে অসম্ভব হবে না। অতএব আবার সেইমতো ভাগবতের সঙ্গে কথা বলা হল এবং মূল ট্রেকিং প্রোগ্রাম ‘হনুমান চটি’-তে শেষ হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হল। তাও যা হোক, একটা অংশ তো হবে! ওখান থেকে আমরা আমাদের মতো যমুনোত্রী দর্শন করে নীচে নেমে যাব। পরিবর্তিত অবস্থায় আমাদের যাত্রা কয়েকদিন আগেই শেষ হবে, সুতরাং ফেরার টিকিটও এগিয়ে আনতে হবে। খবর নিয়ে জানা গেল ঐ সময় হরিদ্বার থেকে কোনও ট্রেনে টিকিট নেই। অগত্যা দিল্লি থেকে শিয়ালদা দুরন্ত-তে টিকিট কাটা হল। অর্থাৎ, হরিদ্বার থেকে দিল্লি এসে ট্রেন ধরতে হবে। মানে খরচ আরও একটু বাড়ল। যাই হোক, শেষ অবধি যাচ্ছি।

আর কী! ১৭ মে চড়ে বসলাম কুম্ভ এক্সপ্রেসে ‘আর এ সি’ টিকিট। বিকেল নাগাদ একটা বার্থ পাওয়া গেল। ট্রেন পাক্কা তিন ঘন্টা লেট করে সন্ধে সাতটা চল্লিশে হরিদ্বার ঢুকল‘মিশ্র ভবন’-এ বলা ছিল। হাত-মুখ ধুয়ে, খাওয়াদাওয়া সেরে, মালপত্র একটু গোছগাছ করে শুয়ে পড়লাম। কাল সকাল সকাল বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে উত্তরকাশী যাবার বাস ধরতে হবে।
সকাল সাড়ে সাতটায় বাস ছাড়ল উত্তরকাশীর। ২১১ কিমি রাস্তা। শেষ হল বিকেল সাড়ে চারটেয় এর মধ্যে খাওয়ার বিরতি এবং পাংচার হওয়া টায়ার পালটানোর বিরতি আছে। ভয় ছিল এই সাত-আট ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা কষ্টকর হবে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে অতখানি কষ্ট হয়নি। তবে চার ধাম যাত্রার ভিড় ছিল। চম্বাতে অর্ধেক বাস খালি হয়ে যাওয়ায় আমরা বাসের সামনের দিকে সুবিধাজনক জায়গায় বসতে পেরেছি। উত্তরকাশী ঢুকে আমাদের প্রথম চিন্তা ছিল একটা ভদ্রস্থ থাকার ব্যবস্থা করা। প্রথম পছন্দের ভাণ্ডারী হোটেল কানায় কানায় ভর্তি থাকায় তার পাশের ‘গঙ্গোত্রী সেবা সমিতি’-তে ঘর নেওয়া গেল। এদের ব্যবস্থাও ভালোই। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার চার ধাম যাত্রীর সংখ্যা বেশ কম, তাই হোটেল-ধর্মশালাগুলো মোটের ওপর খালিই আছে। আসলে এবার যাত্রা শুরু হওয়ার অল্পদিন পরই এই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় ‘যাত্রা’ কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছিল। তাই হয়তো যাত্রী কম। যা হোক, ঘরের ব্যবস্থা হতেই ছুটলাম ‘স্নো স্পাইডার’-এর অফিসেঅনেকগুলো কাজ সারতে হবে। ভাগবত অফিসে ছিল। ও আমাকে চিনতে পারেনি। খুব স্বাভাবিক। ২০০৪-এর পর আর ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ফোনে যে দু-একবার আমাদের কথা হয়েছে তাতে আমি আমার পরিচয় ওকে বিশদে দিইনি। কাজেই, কথাবার্তার সূত্রে আমার পরিচয় পেয়ে ও খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে জানতে চাইল আমাদের ঘর নেওয়া হয়ে গেছে কিনা। ‘হ্যাঁ’ বলাতে অনুযোগ জানাল, কেন ওদের বাড়িতে না উঠে হোটেলে উঠলাম, কেন আগে পরিচয় দিলাম না... ইত্যাদি (আসলে ওদের পুরো পরিবারের সঙ্গেই আমার পরিচয় সেই ২০০৪ থেকে। মাঝের সময়টাতে দেখাসাক্ষাত হয়নি, কিন্তু ফোনে ওর ভাই বিষ্ণুর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল)। যাই হোক, আমাদের আসন্ন যাত্রার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে বাজার চললাম। বিষ্ণু আজই কেদার ডোম এক্সপিডিশন থেকে ফিরেছে। কোথাও গেছিল, দেখা হল না। কাল সকালে টাকাপয়সা দিতে আসব, তা ছাড়া আরও অনেক কাজ সারতে হবে।
সকাল থেকে শুরু হল দৌড়াদৌড়ি। বাজারের ফর্দ ঠিক করা, টুকটাক কেনাকাটা, এজেন্সির টাকাপয়সা মেটানো, রান্নাবান্না, নিজেদের জিনিসপত্র মোটামুটি ঠিক করে রাখা – এইসব করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। ভেবেছিলাম দুপুরে খেয়েদেয়ে ভাগবতদের বাড়ি গিয়ে সকলের সঙ্গে দেখা করে আসব, কিন্তু ভাগবত ডিনারের নেমন্তন্ন করায় ঠিক করলাম যে, একেবারে এদিকের বাজার-দোকান সব সেরেই ওদের বাড়ি যাব। সেইমতো লাঞ্চ সেরে বেরোলামকথা ছিল মালপত্র ওদের অফিসে পৌঁছে দিলে ওরা প্যাকিংটা করিয়ে রাখবে। অতএব রেশন, তাঁবু, বাসনপত্র, জ্বালানি তেল - সব ওদের অফিসে পৌঁছে সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ বিষ্ণুর সঙ্গে চললাম ওদের বাড়িযাদের খুব ছোট্ট ছোট্ট দেখেছি তারা অনেক বড়ো হয়ে গেছে। সবার সঙ্গেই নতুন করে আলাপ হল। ওদের বড়ো দাদা প্রকাশ NIM–এ চাকরি করে। সে তখনও অফিস থেকে ফেরেনি। ওর ছেলে সবে পর্বতারোহণে অ্যাডভান্স কোর্স করে ফিরেছে। প্রকাশের স্ত্রী সুমতি-ও আমাকে চিনতে পারেনি। এতদিন পর দেখছে তো! ভাগবত ওর ঘরে নিয়ে গেল, ওর স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ হল। ওর ওখানেই খাওয়ার ব্যবস্থা। অনেক আয়োজন করেছিল, রান্নাও বেশ ভালো হয়েছিল। খেতে খেতেই প্রকাশ এল। ও আমাকে ঠিক চিনেছে। এরপর তো কত কথা, কত স্মৃতি রোমন্থনকখন যে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি। এবার তো ফিরতে হয়। কাল যাত্রা শুরু। প্রকাশ নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিল আর বার বার করে বলল যে, এরপর উত্তরকাশীতে এলে যেন কখনোই হোটেলে না উঠি, যেন ওর বাড়িতেই উঠি। ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র গোছগাছ করে শুয়ে পড়লাম। মনে স্মৃতিরা ভিড় করে এল। পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু স্মৃতিরা যেন নতুনের মতো টাটকা।


গাড়ি আসার কথা ছিল সকাল আটটায়কিন্তু যথারীতি উঠতে দেরি অতএব ওদের ফোন করে সাড়ে ন’টায় গাড়ি পাঠাতে বলা হল। শেষমেশ রওনা হলাম পৌনে দশটায়। আজ গন্তব্য ‘ভেবরা’। গাড়ি আমাদের ‘সঙ্গম চটি’ পর্যন্ত নিয়ে যাবে, ওখান থেকে হাঁটা শুরু। গাড়ির রাস্তা তিরিশ-চল্লিশ মিনিটের। দশটা কুড়িতে পৌঁছোলাম ‘সঙ্গম চটি’। আমাদের গাইড বিপিন আর ভাগবতের ম্যানেজার মণীশ আমাদের সঙ্গেই গাড়িতে এল। খচ্চরওয়ালা লব এখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলমণীশ আমাদের সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দিয়ে একসঙ্গে জলখাবার খেয়ে ফিরে গেল। বিপিন বলল, “ভাগবত ভাই নে বোলা হ্যায় কি, মেরে ঘরকে লোগ হ্যায়, ঠিক সে লে জানা। কোই তকলিফ নেহি হোনি চাহিয়ে’ সত্যি – ভাগবত অনেক বদলে গেছে। ২০০৪-এর সেই উদ্ধত, গোঁয়ার ভাগবতের থেকে অনেক অন্যরকম। বয়স এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হয়তো এভাবেই পালটে যায়।
আমাদের চলা শুরু হল সকাল সোয়া এগারোটায়। ভেবরার দূরত্ব সাত কিলোমিটারপ্রথম দিনের চলা, মন্দ লয়ে চললাম কিছু চড়াই, কিছু সমান আবার কিছু হালকা উৎরাই পেরিয়ে। মাঝে মাঝে বিশ্রামও নিলাম। দুপুর আড়াইটে নাগাদ প্রথম গ্রামটা পেলাম – ‘ধন্দালকা’। গ্রামে ঢোকার আগে একটা বড়োসড়ো পাহাড়ি নালা পেরোলাম। দু’ধারে অজস্র বুনো ফুল ফুটে আছে। পাহাড়ের গা বেয়ে গ্রামের পথ ধরে আরও এগিয়ে পেলাম ‘আগোড়া’ গ্রাম। এটি আগেরটির তুলনায় একটু বড়ো গ্রাম। পাহাড়ের ঢালে ধাপ চাষ হয়েছে। আখরোট, পিচ ইত্যাদির বড়ো গাছ চোখে পড়ছে। আর তিন কি.মি. গেলেই ভেবরা। কোনও তাড়া নেই, ধীরে ধীরে এগোচ্ছিএমন সময় বিপিন বলল, “ম্যাম, চায় পিওগে?”
“চায়? কাঁহা?”
ও তখন রাস্তার ধারের একটু উঁচুতে একটা বাড়ি দেখিয়ে বলল যে ওটা ওর পিসির বাড়িআমাদের কথাবার্তার আওয়াজে পিসি বেরিয়ে এসেছিলেন, বিপিনকে দেখে খুব খুশি হয়ে ভিতরে ডাকলেন। ওর সঙ্গে আমরাও ঢুকলাম বাড়ির চৌহদ্দিতে। বেশ গরম ছিল। আমাদের জন্য বাড়ির ছায়ায় চেয়ার পেতে বসার ব্যবস্থা হলআমাদের চলার রাস্তা পাহাড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম ঢালে হওয়ায় সূর্যকে সঙ্গে নিয়েই চলছি, অতএব ছায়ায় বসে বেশ আরাম পেলাম। বিপিন চায়ের কথা বলাতে পিসি বললেন, এত রোদে হেঁটে চা খাওয়ার থেকে মাঠা খাওয়া বেশি উপকারি হবে। বাড়ির তৈরি মাঠা আছে। বিপিন একটু কুন্ঠিত ভাবে প্রস্তাবটা আমাদের কাছে পেশ করল, কারণ ও সন্দিহান ছিল যে আমাদের মতো শহুরে মানুষেরা মাঠা পছন্দ করব কিনা। আমরা তো বেজায় খুশিদারুণ স্বাদিষ্ট মাঠা খেতে খেতে কিছু গল্পগাছা হল পিসির সঙ্গেউনি সারা বছর এখানে থাকেন না। দেরাদুনে থাকেন। চাষবাসের সময় দু-তিন মাস থেকে ফিরে যান। এখানে অনেকেই তাই করেন শুনলাম। পিসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।
আগোড়ার পর থেকে রাস্তায় মাঝে মাঝে গাছপালার ছায়া আছে, তাই এই পর্যায়ে চলাটা ততখানি কষ্টকর হল না। শেষ পর্যন্ত ভেবরা ক্যাম্প সাইটে পৌঁছোলাম চারটে বেজে চল্লিশ মিনিটেএখানে থাকার ব্যবস্থাও আছে, আবার তাঁবু লাগাবার জায়গাও আছে। কিচেন, টয়লেট তৈরি করা আছে। তাঁবু ফেলা এবং কিচেন টয়লেট ব্যবহার করার জন্য একটা চার্জ দিতে হয়। ব্যবস্থা ভালোই। আগোড়ার পর এই পথে আর কোনও গ্রাম নেই। আজকের মতো চলা শেষ। তাঁবু লাগিয়ে খাওয়ার আয়োজন শুরু হল। বেশি ঠাণ্ডা নেই। ক্যাম্প সাইটের পাশ দিয়ে একটা উচ্ছল পাহাড়ি নালা বয়ে চলেছে বলে মাঝে মাঝে একটা ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। রাত্রের আকাশ চকচকে পরিষ্কার। আকাশভর্তি তারা দেখে মন বলল, কাল নিরুপদ্রবেই ‘মানঝি’ পৌঁছোবো, বৃষ্টি বিরক্ত করবে না।

ভেবরা ক্যাম্পিং সাইট
মানঝি ভেবরা থেকে নয় কিলোমিটার, উচ্চতা অনেকটা বেশিরাস্তা মোটামুটি কালকের মতোই। কেবল প্রথম আড়াই কি.মি. চলার পর দেড় কিলোমিটারের একটা খাড়া চড়াই আছে। একটা টং – ‘ধারকোট’। এই টং-এ একটা গোল চত্বর বাঁধিয়ে টিনের ছাউনি করা আছে। আমরা চলা শুরু করেছিলাম সোয়া ন’টায়এক কিলোমিটার চলার পর একটা গিরিশিরায় উঠে সোজাসুজি উত্তর-পূর্ব কোণে একটা সম্পূর্ণ ন্যাড়া, বিশাল উঁচু পাহাড়ের মাথা দেখা গেল। তার চারপাশের সবুজ মাথাওয়ালা পাহাড়গুলোর মধ্যে এ যেন বেজায় বেমানান। চূড়া থেকে কিছুটা নিচে বাটি আকৃতির বুগিয়ালের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। বুঝলাম, ওটা কোনও টপ বা পাস হবে। বিপিনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ওটা ‘ঘোসলা টপ’। এই পথের চারদিক ঘিরে আছে নানা টপ, পাস আর বুগিয়াল। ধারকোটের উলটো দিকে বিশাল বিস্তৃত ‘দয়ারা বুগিয়াল’, ট্রেকারদের মধ্যে খুবই পরিচিত এবং পছন্দের। বুগিয়ালের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ধারকোটে বসেই আমরা প্যাকড লাঞ্চের সদগতি করলাম বারোটা নাগাদ। ফের চলা শুরু সাড়ে বারোটায়। আড়াই কিলোমিটার চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এলাম একটা শুকনো নালার ধারে – ‘কাচেড়ু নালা’। আজকের পথ প্রায় পুরোটাই জঙ্গলের ছায়ায় ছায়ায়, তাই রোদে চলার কষ্টটা নেই। জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই বয়ে গেছে এই বিশাল নালা। এখন একদম খটখটে শুকনো, তবে জুনের প্রথম সপ্তাহেই এতে জল এসে যাবে। নালার পাশের বড়ো বড়ো পাথরে বসে খানিক জিরিয়ে নেওয়া, জল-টল খাওয়া এবং আবার চলা। কাচেড়ু নালার ধার থেকে পাঁচশ মিটার গেলেই মূল রাস্তা থেকে ডানদিকে জঙ্গলের মধ্যে একটা রাস্তা নেমে গেছে। পাশে লাগানো নির্দেশ বোর্ড থেকে জানতে পারলাম যে, ঐ রাস্তা দয়ারা বুগিয়াল গেছে, দূরত্ব পনেরো কিলোমিটার

ধারকোট টপে কিছুক্ষণ বিশ্রাম এবং দুপুরের খাওয়াদাওয়া
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রোদ-ছায়ার জাফরি বিছানো বাকি পথটুকু হেঁটে মানঝি ক্যাম্প সাইটে পৌঁছোলাম সাড়ে তিনটেয়। বড়ো বড়ো গাছের ফাঁকে ক্যাম্প করার জায়গাকিচেন তৈরি করা আছে, জ্বালানি কাঠ পাওয়া যাবে। ভেবরার মতো এখানেও তাঁবু লাগানো এবং কিচেন ব্যবহারের জন্য একটা চার্জ দিতে হয়। তবে এখানে টয়লেট নেই। তার ব্যবস্থা নিতান্ত প্রাকৃতিক। পৌঁছে, মালপত্র রেখে, একটু দূরের নালায় হাত-মুখ ধুয়ে এসে রান্নাঘরে গিয়ে বিপিনদের সঙ্গে খাবার তৈরিতে হাত লাগালাম। চিঁড়ের পোলাও তৈরি হল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিপিন আর লবের সঙ্গে গল্পগুজবও চলল। বিপিনের বাড়ি ভাঙ্কোলি গ্রামে (আগোড়া থেকে আরও ওপরে)। ওরা এক ভাই এক বোন। বোনের বিয়ে হয়েছে দেরাদুনে। বাড়িতে মা, বউ আর দু’বছরের বাচ্চা মেয়ে আছে। বাবা হনুমান চটিতে একটা হোটেল চালান, মাঝে মাঝে বাড়ি আসেন। গ্রামে ওদের কিছু জমি-জায়গা আছে, চাষবাস হয় – আলু, গম, রামদানা – এইসব।  ফসল ওঠার সময় ও বাড়ি যায়। কাটাই, ঝাড়াই, বস্তাবন্দি করে বিক্রির ব্যবস্থা করে। শুনেই আমি ওর কাছে আর্জি পেশ করলাম যে, যদি সম্ভব হয়, ও যেন আমাকে কিলোখানেক রামদানার আটা জোগাড় করে দেয়। একটু চেখে দেখার ইচ্ছা আছে। এই আটা থেকে নাকি হালুয়া, লাড্ডু এসবও হয়। বিপিন গাইডের পেশায় আছে বছর ছয়েকরাস্তা সম্পর্কে জ্ঞান ভালোই। লবের বাড়িও বিপিনের গ্রামেই। ওর বয়স বছর তেইশ-চব্বিশ হবেএর আগে ও একবারই পোর্টারের কাজ করেছে একটা এক্সপিডিশন টিমেপরে খচ্চর কিনে ভাড়া খাটানো শুরু করেছে। এ ব্যাপারে বিপিনই ওর ফিলজফার অ্যান্ড গাইড। ওর অভিভাবকত্বেই লব তৈরি হচ্ছে। অল্পস্বল্প রান্নার কাজও শিখে নিচ্ছে আর বিপিনের মাধ্যমে কাজও পেয়ে যাচ্ছে ‘স্নো স্পাইডার’-এর বিভিন্ন প্রোগ্রামেওর ভাই কুশ এবার মাধ্যমিক দিয়েছে। কাল রেজাল্ট বেরোবে। কিন্তু রেজাল্টের খবর লব ‘সীমা’ পৌঁছোবার আগে পাবে না, মানে চার দিন পর, ফোনের নেটওয়ার্ক নেই। তাই ও একটু অন্যমনষ্ক ছিল। কথার মাঝেই আমাদের মুখ চলছিল। পোলাওটা বেশ ভালো হয়েছিল খেতে। শেফার্ড ডগ-ও যে এত রেলিশ করে চিঁড়ের পোলাও খায় সেটা আজই জানলাম আগত দুই মক্কেলকে দেখে। জয়া আর আমি তো তাদের গুছিয়ে খাওয়ালাম। লব বলল, ওদের মালিকরা শুধু আটাগোলা খাওয়ায়, তাই ট্রেকাররা এলে ওরা মুখ বদলাতে আসে। রাত্রে তাদের একজনের ডাক শুনে তো চমকে উঠেছি, হঠাৎ মনে হল পাড়ার অনুষ্ঠানে সাউন্ড বক্স বেজে উঠল বুঝি! গুরুগম্ভীর হাউ হাউ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে গেল। বেশ গরম লাগছিল। স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঘেমে যাচ্ছিলাম। শেষে তাঁবুর চেইন অর্ধেকটা খুলে দিতে একটু আরাম হল।

মানঝি ক্যাম্প সাইটে ঢোকার মুখে
স্নেক লিলি
ভোরের ঘুম ভাঙাল নানা রকম পাখির মিষ্টি সুরেলা ঐকতান। এই পথের পুরোটাই যাত্রীদের সঙ্গী মিষ্টি পাখির ডাক। নানান রকম পাখি – ছোটো, বড়ো, ছটফটে, ধীরস্থির। কেউ তীব্র সুরে শীষ দিচ্ছে, কেউ ধীর সুরেলা গলায় ডাকছে, কেউ কেউ তো এত ছোট্ট যে গাছের পাতা পড়ল না পাখি গাছ থেকে নামল বোঝা যায় না। অনেক খুঁজেও খুব কমজনেরই দেখা পেয়েছি। একটা পাখি তো এমন করে ডাকছিল যে মনে হচ্ছিল সদ্য চোখফোটা কুকুর ছানা মাকে দেখতে না পেয়ে কাঁদছে।
আমাদের আজকের গন্তব্য ‘ডোডিতাল’ পাঁচ কিলোমিটার রাস্তার পুরোটাই প্রায় সমান সমান। কেবল পথের মাঝামাঝি একটা গিরিশিরায় উঠে তারপর এগোতে হবে। গিরিশিরার উচ্চতা ভালোই (২৯০০ মিটার) - ‘ভৈরোঘাঁটি’ এখানে ৺ভৈরবের মন্দিরে প্রণাম করে চললাম জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। ‘অসি নালা’ চলল আমাদের সঙ্গে সঙ্গেআমরা তো ওর উৎসের দিকেই চলেছি! আরাম করে হেঁটে সাড়ে বারোটায় পৌঁছোলাম ডোডিতাল। রওনা হয়েছিলাম ন’টা চল্লিশেআড়াই কিলোমিটার মতো চলার পর থেকেই অসি নালা আমাদের সঙ্গী হয়েছে। একেই অনেকে ‘অসি গঙ্গা’ বলেন এবং এর উৎস হিসাবে ডোডিতালকেই বলা হয়। কিন্তু সব দেখে যা বুঝলাম তা হল, অন্য কোনও উৎস থেকে একটা বড়ো নালা বা নদী এসে লেকটা তৈরি করে উপচে নীচে বয়ে গেছে নদী হয়ে। তাত্ত্বিক কচকচানি থাক, চোখের সামনে তালটা ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেআহ! অপূর্ব! অসাধারণ! কী যে অদ্ভুত সৌন্দর্য লেকটার বলে বোঝানো যাবে না। প্রায় গোলাকার হ্রদের উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিক পাহাড়ে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে স্প্রুস, জুনিপার, পাইন এবং অন্যান্য বড়ো গাছের জঙ্গল হ্রদের জলকে কাকচক্ষুর মতো টলটলে রূপ দিয়েছে। উত্তর দিক থেকে ফিডার নালা এসে হ্রদে পড়েছে এবং দক্ষিণ দিক দিয়ে ‘নদী’ হয়ে বেরিয়ে গেছে। হ্রদের জলের এই ‘বহমান’ চরিত্র দেখে কোনও সাহেব কিছু ট্রাউট মাছ এই হ্রদে ছেড়েছিলেন। একটা সময়ে সবাই এখানে আসত ট্রাউট মাছ ধরে খাবার জন্য। কিন্তু ‘অসি’ সাধারণ নালা থেকে ‘গঙ্গা’ হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই মাছ ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হয়তো চোরাগোপ্তা এখনও চলে, তবে নিষেধ থাকায় মাছের সংখ্যা বেড়েছে। ডোডিতালকে প্রথম দর্শনেই এত ভালো লেগে গেল যে মনে হচ্ছিল, যদি মাছ হয়ে ঝপাং করে লাফিয়ে জলে পড়তে পারতাম তবে বেশ হত! অনেকে ‘দেওরিয়া তাল’–এর সঙ্গে এই তালের তুলনা করেনআমি কিন্তু সেই তুলনাটা আনতে পারলাম না। অবস্থানগত এবং চরিত্রগত দিক থেকে দুটো তাল সম্পূর্ণ আলাদা। দু’জনেরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। মাউন্ট চৌখাম্বা-র মতো একজন হেভিওয়েট প্রতিবেশী যে তালের আয়নার মতো স্থির জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়, সে তাল নিঃসন্দেহে ফেলনা নয়। কিন্তু, জঙ্গল-পাহাড়-ঢালু ঘাসজমি এবং সর্বোপরি অন্তরে এক সদা বহমান প্রাণ-স্পন্দন এই হ্রদকে অনেক বেশি মোহময়ী করেছে – অন্ততঃ আমার কাছে। এর একটা ধর্মীয় ভাব-গম্ভীরতাও আছে – পুরাণ মতে এটি ঢুণ্ডিরাজ গণেশের জন্মস্থান (ঢুণ্ডিতাল -> ডোডিতাল) কথিত আছে, এই লেকের ভিতরে নাকি একটা শিবলিঙ্গ আছে যাকে দেখা যায় না। কলিযুগ যেদিন শেষ হবে, সেদিন এই শিবলিঙ্গ ভেসে উঠে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আরও কথিত আছে যে, এই তাল সন্নিহিত জঙ্গলে নাকি এক ব্রাহ্মণ বাস করেন। এঁকেও দেখা যায় না এবং এঁকেও কলিযুগ শেষের দিনে দেখা যাবে, তবে তিনিও ফেটে চৌচির হয়ে যাবেন কিনা সে ব্যাপারে কিছু জানা গেল না (অশ্বত্থামা??) মানে – শেষের সে দিন ভয়ংকর!

ডোডিতাল পৌঁছনোর মুখে
ডোডিতাল থেকে সৃষ্ট অসিগঙ্গার উৎসমুখ
যা হোক, প্রাণভরে বিভিন্ন দিক থেকে তালকে দেখলাম, ছবিও তুললাম। ঢুণ্ডিরাজের মন্দিরে প্রণাম করে এলাম। এখানকার ক্যাম্প সাইটটাও দারুণ; বড়ো বড়ো গাছের মধ্যে হালকা ঢালু জমি, সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া, সারা গালিচা জুড়ে হলুদ বুনো ফুল ছড়িয়ে আছে। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য। তবে এখানেও টয়লেট নেই, যা এখানকার অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। গুর্জরদের মোষ চরছিল ঘাসজমিতে। বাচ্চাদের আলাদা রাখা হয়েছে মায়েদের থেকে। হঠাৎ লুকিয়েচুরিয়ে কোনও বাচ্চা হয়তো তার মায়ের কাছে চলে গেছিল, পাছে দুধ খেয়ে ফেলে তাই তার মালিক লাঠি নিয়ে দৌড়ল বাচ্চাকে সরাতে। এদিকে লাঠি দেখে মা জননী ঘাবড়ে গিয়ে দৌড়ে নীচে নামতে লাগল। তার নামার রাস্তার সঙ্গে সরলরেখায় ছিল আমাদের তাঁবু। সে বেচারা অতবড়ো শরীর নিয়ে নামার বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সরাসরি ধাক্কা দিল তাঁবুতে। হঠাৎ হৈ হৈ। আমি আর জয়া একটা ছোটো চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম, বাবুয়া-বিপিন-লব-এর সমবেত চ্যাঁচামেচি শুনে বেরিয়ে দেখি মালিক মোষকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দৌড়লাম সব ঠিক আছে কিনা দেখতে। বাইরে থেকে খালি এক কোণের একটা প্রেগ উপড়ে এসেছিল। সেটাকে ঠিক করে পুঁতে দেওয়া হল। কোথাও ছিঁড়ে-টিড়ে যায়নি। নিশ্চিন্ত হয়ে তাঁবুতে ঢুকতে গিয়ে দেখি – হে ভগবান! সামনের পোল ধাক্কার চোটে বেঁকে ‘দ’ হয়ে গেছে। এ তো এখানে ঠিক করা যাবে না, কলকাতায় ফিরেই যা করার করতে হবে। তবু কাজ চলছে – এটাই রক্ষে।
এবার আমরা তৈরি হয়ে মন্দিরে চললাম আরতি দেখতে। গিয়ে জানতে পারলাম যে, কাল এখানে ‘গঙ্গা দশহরা’-র বিশেষ পুজো হবে বড়ো করে। আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসবে। বিকেল থেকেই ছেলে-মেয়ে-বউ-লোকের দল পৌঁছোতে আরম্ভ করেছে। এরা একদিনে বাইশ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে এসেছে কাল গঙ্গা দশহরার পূজা দিতে। এই লেক এখানে গঙ্গার মতোই পবিত্র এবং ঢুণ্ডিরাজের সঙ্গে এখানে তাঁর জননী অন্নপূর্ণারও পূজা হয়। সাড়ে ছ’টায় সন্ধ্যারতি আরম্ভ হল কাল এমন শুভ দিনে এখান থেকে যাত্রা করব ভেবে ভালো লাগল। আমাদের অজান্তেই একটা ভালো সংযোগ ঘটে গেল (যদিও আমাদের এখানে গঙ্গা দশহরা ছিল আমরা ফিরে আসার পর - ২৩শে জুন, মানে আরও ২৮ দিন পরঅর্থাৎ, ওদের ওখানকার তিথি পালন আমাদের এখানকার থেকে আলাদা)সে যাই হোক, কাল আমাদের যাত্রার অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ দিন, পরিকল্পনামতো কাল আমরা ‘দারোয়া পাস’ পার হব। বিপিন আমাদের বার বার মনে করাতে থাকল যাতে কাল আমরা সকাল সকাল রওনা হই, কারণ কালকের পুরো রাস্তাটাই চড়াই। যদিও দূরত্ব বেশি নয় মোটেই, মাত্রই ছয় কিলোমিটার; কিন্তু বেলাবেলি পাস পেরোতে না পারলে আবহাওয়া খারাপ হয়ে গিয়ে মুশকিলে পড়তে পারি। সেই মতো তাড়াতাড়ি রাত্রের খাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম। যতক্ষণ ঘুম আসেনি ততক্ষণ ছেলেছোকরাদের হৈ হল্লা শুনেছি। ঠাণ্ডা ভালোই আছে, তবু – এরা বোধহয় আজ আর ঘুমোবে না।

ঢুণ্ডিরাজ গণেশের মন্দির
ডোডিতালের ক্যাম্প সাইট
উত্তরের ফিডার নালার দিক থেকে ডোডিতালের দৃশ্য
(এরপর আগামী সংখ্যায়)
_____
ছবিঃ লেখক