গল্পের ম্যাজিক:: টু্ম্বার স্পেশাল প্রাইজ - জলি নন্দী ঘোষ


টু্ম্বার স্পেশাল প্রাইজ
জলি নন্দী ঘোষ

দারুণ দেখতে দাবার বোর্ডটা জন্মদিনে গিফট পেয়েছিল টুম্বাদাবা খেলা মোটেও জানত না তখন ওচকচকে সাদা আর কালো গুটিগুলো নিয়ে খেলত শুধুতা দেখে ওর দাদু একদিন বলল, “এই খেলা এমনভাবে খেলতে হয় না দাদুভাইবোর্ডের ওপরে নিয়ম মেনে গুটি সাজাতে হয় আগেদুই দিকে দুই পক্ষমাঝখানে যুদ্ধক্ষেত্র।
যুদ্ধক্ষেত্র? তার মানে এটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা?” চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করে টুম্বা
হুম, খানিকটা ধরো তাই
তারপর? যুদ্ধ কে আগে শুরু করবে?”
সাদা সৈন্যদল মানে সাদা গুটির পক্ষ এই যুদ্ধে আছেন রাজামশাই আছেন মন্ত্রীমশাই আছে সৈন্য আর আছে হাতি, ঘোড়া, নৌকা এরা সব
কী মজার! শেখাও আামাকে প্লিজ, বায়না করে টুম্বা
দাদু ওকে একটু একটু করে শেখায় দাবা খেলার কায়দা, কৌশল, নিয়মকানুন দাদু আরও বলে, দাবা এমন একটি খেলা যা নিয়মিত অভ্যাসে ধৈর্য্য বাড়ে, মনসংযোগ বাড়ে, স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি ক্ষুরধার হয়
সেই থেকে রোজ সন্ধেবেলা পড়াশোনা শেষ করে, দাদুর খাটের ওপর দাবার বোর্ড সাজিয়ে দাদুকে ডাকে টুম্বা, “দাদু কাম, লেট স্প্লে চেস্ দাদু নাতি মিলে, জমিয়ে দাবা খেলে দু-তিন বোর্ড
টুম্বার ভালো নাম মানে স্কুলের নাম হল ঐশিকঐশিক রায় কলকাতার একটি নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ফোর-এ পড়ে ও টুম্বাকে যারা চেনে সব্বাই বলে টুম্বার মতো গুড বয় আর দুটি হয় না এই বয়সেই এমন সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারে! ওর মিষ্টি গলার গান শুনলে যে কারোর মন ভালো হয়ে যায় নিমেষেখুব ভালো ছবিও আঁকতে পারে ও আবার লেখাপড়াতেও ভালো টুম্বা প্রায় সব সাবজেক্টেই নাইন্টি পারসেন্ট মার্কস পায় ও এই ছেলেকে সবাই গুড বয় বলবে না তো কি ও পাড়ার ভুলোকে বলবে?
কিন্তু সব সাবজেক্টে ভালো করলেও ম্যাথস টুম্বার একেবারেই ভালো লাগে না অঙ্ক করতে বসলেই ওর মাথার মধ্যে গোলমাল হয়ে যায় মায়ের সামনে যে অঙ্কটা এইমাত্র পুরো ঠিকঠাক করল, পরমুহূর্তেই সেটা ভুল করে ফেলে এ নিয়ে তার মায়ের চিন্তার শেষ নেইপরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড হাতে নিয়ে চোখে জল চলে আসে টুম্বার মায়েরম্যাথসে ওনলি থার্টি সেভেন ওর প্রত্যেকটা বন্ধু ওর থেকে বেশি পেয়েছে অঙ্কে লজ্জায় মায়ের মাথা হেঁট হয়ে গেছে স্কুল থেকে ফিরে এসে অবধি মুখ ভারটুম্বার বাবা খুবই পজিটিভ আর মজার মানুষরিপোর্ট কার্ড দেখে বকার বদলে আদর করে টুম্বাকে বলে, “ডোন্ট ওরি টুম্বা শোন, তোর বয়সে একবার অঙ্কে আমি নয় পেয়েছিলাম একশোতে সবাইকে যে অঙ্কে একশোয় একশো পেতে হবে তার মানে আছে? এই যে তুই অন্য সাবজেক্টে ভালো করেছিস, তা কিছু নয়? কত্ত সুন্দর গান গাইতে পারিস, ভালো আঁকতে পারিস, তার বেলা?” বাবার কথায় মুখে হাসি ফোটে টুম্বার সত্যিই তো, ও তো অনেক কিছুই ভালো পারে কই মা তো সেগুলো নিয়ে একটা কথাও বলে না একবারও গুড বয় বলে না ওকে সারাক্ষণ শুধু ম্যাথসে ভালো না করার জন্য বকেই যায়
মায়ের চিন্তা বাড়তে থাকে সেইসঙ্গে মনখারাপও আর কিছুদিন পরেই টুম্বাদের স্কুলে অ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন ডে ওর বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই প্রাইজ পাবে সেদিনলাস্ট ইয়ারেও ফার্স্ট ফাইভ র‍্যাঙ্কে এসেছিল টুম্বা প্রাইজ পেয়েছিল কিন্তু এ বছর ম্যাথস-এর খারাপ মার্কস-এর জন্য ওর র‍্যাঙ্ক নেমে গেছে অনেক নিচে কোনো প্রাইজই পাবে না ও চোখ ফেটে জল আসে টুম্বার মায়ের খুব কষ্ট হয় মনে এ নিয়ে অবশ্য টুম্বার কোনো হেলদোল নেইদিব্যি আছে ও ভাবছে আর বলছেও, বন্ধুদের সঙ্গে সে প্রাইজ পাবে এবারও লাস্ট ইয়ারের মানে ক্লাস থ্রি-এর আ্যানুয়ালে ক্লাস টিচার সুজাতা ম্যাম-এর হাত থেকে প্রাইজ নেওয়ার ছবিটা ল্যামিনেট করে ড্রয়িংরুমের শেলফে রাখা আছে প্রাইজটাওসেটা দেখিয়ে টুম্বা ওর মাকে বলে,এবারের প্রাইজটাও কি এর পাশেই রাখবে মা? দুটো প্রাইজ একসঙ্গে ইট উইল বি জাস্ট গ্রেট না মা?”
আ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন ডে-তে আ্যাকাডেমিক, স্পোর্টস, এক্সট্রা কারিকুলার, স্পেশাল প্রাইজ দেওয়ার পাশাপাশি নানান রকম প্রোগ্রামও হয়ে থাকে টুম্বাদের স্কুলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয় নিশ্চয়’ গানটা কোরাসে গাইবে টুম্বা মিউজিক টিচার ক্লাস ফোর থেকে একমাত্র টুম্বাকেই সিলেক্ট করেছেন স্কুলে রিহার্সাল চলছে পুরোদমে ওর বাবা অফিস যাবার পথে ওকে স্কুলে ড্রপ করে দেয় তিন ঘণ্টা পর ওর মা গিয়ে নিয়ে আসে ওকে বাড়িতেও দাদুর কাছে প্র্যাকটিস করছে টুম্বা দাদু একটা নিউজপেপার রোল করে টুম্বার মুখের সামনে ধরে আর বলে, এবার আপনাদের সামনে গান গেয়ে শোনাচ্ছেন ফেমাস সিঙ্গার শ্রীমান ঐশিক রা... মাথা নেড়ে নেড়ে, ছোট্ট নাকটা ফুলিয়ে, হাসি হাসি মুখে গান গায় বিখ্যাত গায়ক টুম্বা ওর মিষ্টি সুর ছড়িয়ে পড়ে বাড়ির প্রতিটি কোনায়, ভেসে বেড়ায় বাতাসে টুম্বাদের বাড়ির গেটের বাঁ দিকে বসে থাকা অন্ধ ভিখিরিটা ঘাড় উঁচিয়ে শোনে টুম্বার গানশুকনো মুখে হাসি ফোটে ওর ব্যালকনিতে রাখা টবের গাছগুলোও মাথা দোলায় গানের তালে ভালো লাগা জানায়
পরদিন প্রোগ্রাম ইনভিটেশন কার্ডের নিয়ম অনুযায়ী বাবা মা আর দাদু স্কুলে যাবে টুম্বার সঙ্গে গান গাওয়ার জন্য স্পেশাল ড্রেস পরবে টুম্বাসাদা পাঞ্জাবি, সাদা চুড়িদার আর জমকালো নকশাদার জ্যাকেট কেনা হয়েছে সব কিছু সবই হচ্ছে, শুধু টুম্বার মায়ের মন থেকে কষ্টটা কিছুতেই যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার টুম্বার কয়েকজন বন্ধুর মা ফোন করে বা হোয়াটসআ্যাপে মেসেজ করে জানতে চেয়েছে টুম্বা এবার প্রাইজ পাচ্ছে কিনা কেউ আবার জিজ্ঞেস করেছে, কেন এবার টুম্বা প্রাইজ পেল না কেউ সিমপ্যাথি দেখিয়ে বলেছে, টুম্বা প্রাইজ না পাওয়ায় তাদের খুউব খারাপ লাগছেকেউ আবার সাজেশন দিয়েছে... কী করলে, কোন টিচারের কাছে ম্যাথসের টিউশন নিলে টুম্বা নেক্সট ক্লাসে ঠিকই আবার ভালো মার্কস পাবে ম্যাথস-এ
সেন্ট মারলিন স্কুলের অডিটোরিয়াম উপচে পড়ছে স্টুডেন্ট আর গার্জিয়ানদের ভিড়ে উদ্বোধনী সংগীত শেষ হয়েছে সবে এবার প্রিন্সিপাল ম্যামের স্পিচমন দিয়ে শুনছে সবাইআাশপাশ থেকে ভেসে আসা টুকরো কথা কানে আসে টুম্বার মায়ের... ‘আরে, ওই যে দেখছ না, ওরাই তো ঐশিকের বাবা-মা ইশ্, বেচারা! কী লজ্জা বলো তো ওদের? হি হ্যাজ গট সো..ও পুওর মার্কস ইন ম্যাথস! নো র‍্যাঙ্ক, নো প্রাইজও মাই গুডনেস!’
একে একে সব বিভাগের প্রাইজ দেওয়া শেষ হল বাকি শুধু আর একটি মাত্র বিভাগস্পেশাল প্রাইজ বিভাগ পড়াশোনা, খেলাধুলো, গানবাজনা, আাঁকাজোকা, ক্রাফট এসব ছাড়াও বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে যারা অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে, তাদেরকেই দেওয়া হয় এই বিশেষ প্রাইজ সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে, কারা এই প্রাইজ পেল তা জানার জন্যপ্রিন্সিপাল ম্যাম নিজে বিশেষ পুরস্কার প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেন আর তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চিফ গেস্ট স্বয়ংএবারের চিফ গেস্ট খুবই বিখ্যাত মানুষইন্ডিয়ান চেস গ্র্যান্ডমাস্টার অর্ক গাঙ্গুলি টুম্বাদের স্কুলে নতুন চেস আ্যাকাডেমি খুলতে চলেছে কিছুদিনের মধ্যেইসেখানে চিফ ট্রেনার হিসেবে জয়েন করবেন উনি
প্রিন্সিপাল ম্যাম নাম ঘোষণা করছেন এইবারে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে মাত্র একজন স্টুডেন্টসে হল ক্লাস ফোর-এর ঐশিক রায় নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না টুম্বার মায়ের সে কি ভুল শুনছে? টুম্বা এতক্ষণ গম্ভীর মুখে বসেছিল চুপচাপ, বাবা-মায়ের মাঝখানে প্রিন্সিপাল ম্যামের মুখে নিজের নাম শুনে ও ঝটপট উঠে পড়েছে সিট ছেড়ে আর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেছে স্টেজের দিকেস্কুলের একজন আন্টি ওকে হাত ধরে স্টেজে তুলে দেয়এগিয়ে আসেন প্রিন্সিপাল ম্যাম বুকে জড়িয়ে ধরেন টুম্বাকে বলেন,উই আর প্রাউড অফ ইউ মাই চাইল্ড গড ব্লেস ইউ।গ্র্যান্ডমাস্টার অর্ক গাঙ্গুলি আদর করে প্রাইজ আর সার্টিফিকেট তুলে দেন টুম্বার হাতে ছোট্ট দুই হাতে সেগুলো বুকে চেপে ধরে টুম্বাচোখে মুখে খুশি উপচে পড়ে ওর তারপর প্রিন্সিপাল ম্যাম সংক্ষেপে বলেন কী কারণে ঐশিককে এই বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হল
কোনো একদিন টুম্বার মা জ্যামে আটকে পড়ে ওকে নিতে স্কুলে পৌঁছোয় বেশ দেরি করে টুম্বাকে রিসেপশনে বসিয়ে রাখা হয় অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও মা না পৌঁছানোয় অধৈর্য্য হয়ে টুম্বা বাইরে বেরিয়ে আসে বেশিরভাগ স্টুডেন্ট বাড়ি চলে যাওয়ায় স্কুল প্রায় ফাঁকা তখন সবার নজর এড়িয়ে কী করে টুম্বা মেইন গেটের কাছাকাছি চলে যায় দরোয়ান অবশ্য গেটেই ছিল, আর গেটে তালাও লাগানো ছিল সে সময় হঠাৎ করে একজন ছেঁড়াখোঁড়া শাড়ি পরা, ভিখারির মতো চেহারার মহিলা গেটের সামনে আসে তার কোলে রোগা-সোগা ছোটো একটা বাচ্চা কড়া রোদ্দুরেও বাচ্চাটার গায়ে কোনো জামা ছিল না, আর দেখে মনে হচ্ছিল ও খুব অসুস্থদরোয়ান ওকে দেখতে পেয়েই ‘কী চাই এখানে?’ করে ছুটে যায় মহিলা করুণ মুখে বলে, ওর বাচ্চার খুব অসুখ, আর খিদেও পেয়েছে কিছু টাকা পেলে ওর চিকিৎসা করাতে পারে, খাবারও কিনতে পারে হাই মাই করে দরোয়ান বলে, এটা স্কুলপড়ালেখা করার জায়গাভিক্ষা করার জায়গা নয় এমন সময়ে হঠাৎ দরোয়ানের ফোনটা বেজে ওঠেকথা বলতে একপাশে সরে যায় ও দূর থেকে এই ঘটনা দেখছিল টুম্বাদরোয়ান সরে যেতেই গেটের একেবারে সামনে চলে আসে টুম্বামহিলাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার কী চাই?” “কিচু নয় বাবা,বলে চলে যেতে চায় সে টুম্বা ওকে ডাকে বলে, আমি জানি, তোমার বাচ্চার খুব অসুখতোমার টাকা চাই, খাবার চাই কিন্তু আমার তো টাকা নেই এগুলোই আছে শুধুতুমি এগুলো নাও। নিজের ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করে ওর না খাওয়া কেক, বিস্কুট, আপেল সব দিয়ে দেয় গরিব মহিলাকে জলের বোতলটাও দিয়ে দেয় ওর সুইমিং স্যুট, স্পেয়ার জামা-প্যান্টটা অবধি ব্যাগ থেকে বের করে ওর হাতে দেয় মহিলা প্রথমটায় নিতে রাজি হয় না টুম্বা খুব জোর করলে শেষমেষ হাত পেতে জিনিসগুলো নেয়প্রাণভরে আাশির্বাদ করে টুম্বাকেতারপর চলে যায়
পুরো ব্যাপারটাই দারোয়ান দেখতে পায়ছোটো একটা বাচ্চার মনে মানুষের প্রতি এমন দয়ামায়া দেখে খুবই অবাক হয় সে, সমস্ত ঘটনা ভাইস প্রিন্সিপালকে জানায় তারপরই স্কুল কর্তৃপক্ষ টুম্বাকে স্পেশাল প্রাইজের জন্য সিলেক্ট করে
চিফ গেস্ট অর্ক গাঙ্গুলি টুম্বার কচি হাতটা তুলে ধরেছেন স্টুডেন্টদের উদ্দেশে বলছেন,ডিয়ার চিলড্রেন, শুধু পরীক্ষায় ভালো মার্কস পাওয়াটাই সব নয় সবার আগে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে তোমাদেরঐশিকের কাছে শেখা উচিত আমাদের সব্বার হি হ্যাজ মেড আস অল প্রাউড
বুকটা ভরে যাচ্ছিল টুম্বার মায়েরম্যাথসে খারাপ নাম্বার পাওয়ার কষ্টটা ধুয়েমুছে যাচ্ছিল তার মন থেকেমনে পড়ে যাচ্ছিল তার... টিফিন বক্স, সুইমিং স্যুট, স্পেয়ার জামা হারানোর জন্য সেদিন খুব বকেছিলেন টুম্বাকে মেরেওছিলেনচুপচাপ মার খেয়েছিল ও একটা কথাও বলেনি
স্টেজ থেকে নেমে আসে টুম্বা ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে টুম্বার মা আর টুম্বা? উজ্জ্বল হাসিতে ভরে ওঠে ওর মিষ্টি মুখখানা সেই হাসির আলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকেঝলমল করে ওঠে ওর বাবা, মা, দাদু সব্বার মন
_____
ছবিঃ সুজাতা ব্যানার্জী

No comments:

Post a comment